রাজা সূর্যকুমার গুহরায়

রাজা ‍সূর্যকুমার গুহরায়

‘রাজা সূর্যকুমার’ এক কিংবদন্তি নাম। জেলার নামকরণে লক্ষীকোল জমিদার বাড়ির পরিচিতি ‘রাজবাড়ি জেলার নামকরণ’ শিরোনাম নিবন্ধে আলোচনা করেছি। এ বিষয়ে আবশ্যকীয় মন্তব্য হল ১৮৮০‘র দশকে জমিদার সূর্যকুমার বৃটিশ রাজ কর্তৃক ‘রাজা’ উপাধিপ্রাপ্ত হলে ‘লক্ষীকোলের রাজার বাড়ি’ রাজবাড়ির ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। প্রায় এক দশক যাবৎ বিভিন্ন সূত্র থেকে রাজা সূর্যকুমারের জীবন ইতিহাস জানার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তাঁর সামগ্রীক জীবনপঞ্জী সংগ্রহ করতে পারিনি। লক্ষীকোল রাজার বাড়ি দর্শন, রাজার পারিবারিক সূত্র, লোকমুখে এবং শ্রী ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্য লিখিত ‘আমার স্মৃতিকথা’ গ্রন্থ থেকে সূর্যকুমার সম্বন্ধে যতটা জেনেছি সে তথ্যবলীর আশ্রয়ে রাজা সূর্যকুমারের জীবন ইতিহাস লিখিত হল। উল্লেখ্য শ্রী ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্য রাজার আশ্রয়ে তাঁর বাসভবনে থেকে রাজার হাতে গড়া ‘রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশনের’ (R.S.k) লেখাপড়া করেন। ১৮৮৮ সালে রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশনটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৮৯ সালে ত্রৈলোক্যনাথ ঐ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ১৮৯৪ সালে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা (বর্তমান এসএসসি) পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এ সময় তিনি রাজার বাড়িতে লজিং থেকে সূর্যকুমার ও রানী মাতাদের স্নেহ মমতায় লেখাপড়া করেন। ত্রৈলোক্যনাথ যখন কলিকাতায় এফএ (বর্তমান আই,এ) পড়তে যান তখনও তিনি রাজার কলিকাতার বাড়িতে থাকতেন। অতঃপর ত্রৈলোক্যনাথ ১৯০০ সালে আরএসকে ইনস্টিটিউশনে প্রথমে সহকারী প্রধান এবং পরে প্রধান শিক্ষক হিসেবে রাজার জীবিতকালে ও পরে শিক্ষাকতা করেন। রাজাকে তিনি কাছে থেকে দেখেছেন, রাজার স্টেটের ইকসিকিউটর ছিলেন। রাজার শ্যালক, সন্তান ও আত্মীয়দের সাথে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। রাজা, রানী, রাজার বাড়ি, লক্ষীকোল এস্টেটের অনেক কাহিনী ও ঘটনার সাক্ষী ত্রৈলোক্যনাথ। এর অনেক বিষয় তিনি ‘আমার স্মৃতিকথা’ গ্রন্থে লিখেছেন। গ্রন্থটির বিষয়ে জানা থাকলেও কোনোভাবেই তা সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছিল না। অনেক চেষ্টার পর আমার বন্ধু প্রফেসর ও প্রাক্তন অধ্যক্ষ নিত্যরঞ্জন ভট্রাচর্যা জানুয়ারি ২০০৯ এ কলিকাতা থেকে গ্রন্থটি সংগ্রহ করে আমার হাতে দেন। তাঁর এ অবদান স্মরণীয়।

বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী সূর্যকুমার ছিলেন দরদী ও প্রজাপ্রেমী। সমাজসচেতন রাজা, সমাজ উন্নয়নের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন গেছেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, পাঠাগার, রাস্তাঘাট, পোস্ট অফিস, মন্দির। তাঁর আশ্রয়ে লালিত পালিত হয়েছেন ছাত্র, আশ্রয়হীন বালক, দরিদ্র ঘরের অসহায় সন্তান। রাজার দুই রানী। কোনো রানীরই সন্তান না থাকায় রাজা যেন সকলের সন্তানকে আপন সন্তান ভাবতেন। নিজের শ্যালকদের পুত্রবৎ স্নেহে স্বগহে আশ্রয় দিয়ে পালন করেছেন। তৎকালীন জমিদারের শোষণ, অত্যাচারের নানা কাহিনী ইতিহাসে লেখা আছে কিন্তু প্রতাপশালী রাজা সূর্যকুমারের এরুপ কোনো ঘটনা রাজবাড়ির কোনো মানুষের মুখে শোনা যায় না। বরং একজন তেজস্বী, অথচ কোমল হৃদয়ের মানুষ হিসেবে তিনি পরিচিত। প্রতাপশালী বৃটিশ রাজার কাছে তিনি মাথা নোয়াবার পাত্র ছিলেন না। স্বদেশী ও স্বরাজ আন্দোলনে পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন। জাতীয় চেতনায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত সজাগ। লোকমুখে জানা যায় একবার বড়লাট অত্র এলাকার সকল জমিদারদের দরবারে ডেকে পাঠান। সবাই জুতা খুলে লাটের দরবারে প্রবেশ করেছিল কিন্তু সুর্যকুমার জুতা পায়ে লাটের দরবারে প্রবেশ করলে লাট সাহেব বললেন ‘রাজা বটে’? অনেকে মনে করেন সেই ঘটনা থেকে রাজা বলে পরিচিত। কিন্তু ব্যাপারটা এমন নয়। সূর্যকুমারের ব্যক্তিত্ব, জনহিতকর কাজ, শিক্ষার প্রতি অনুরাগ এবং প্রজা প্রেমের জন্য ১৮৮০‘র দশকে কারোনোশনের মাধ্যমে তাঁকে ‘রাজা’ উপাধি দেওয়া হয়। লক্ষীকোল এস্টেটের উত্তরাধিকারী জমিদার দীগিন্দ্র প্রসাদ গুহ রায়ের কোনো সন্তান না থাকায় অনুমান ১৮৪০ এর দশকের শেষে সূর্যকুমারকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেন। প্রবীনদের মুখে শোনা যায় দীগিন্দ্র প্রসাদ দত্তক গ্রহণে সূর্যনগরের নিকটবর্তী কোনো গ্রামে (মতভেদে চরনারায়ণপুর) পালকি প্রেরণ করেন। সুর্য্যকুমারেরা ছিলেন দুই ভ্রাতা। দৈহিক কান্তির যে ছেলেটিকে দত্তক নেওয়ার কথা ছিল সে পালকিতে চড়ে না। শীর্ণকায় ভাইটি পালকিতে ওঠে। এই ভাইটি সুর্যকুমার। দীগিন্দ্র প্রসাদের মৃত্যুর পর সূর্যকুমার এস্টেটের উত্তরাধিকারী নিযুক্ত হন। প্রথম অবস্থায় লক্ষীকোল, বিনোদপুর মৌজা এবং লক্ষীকোলের উত্তর পূর্বে কাশিমনগর পরগনার পদ্মা তীরের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে লক্ষীকোল এস্টেটের বিস্তৃতি ছিল। উল্লেখ্য রাজা সূর্যকুমারের মৃত্যুর পর লক্ষীকোল এস্টেট তেঁওতার রাজার সাথে মামলায় জড়িয়ে পরে। এ প্রসঙ্গে ত্রৈলোক্যনাথ লিখেছেন ‘আমি যখন এই বিল্ডিং এর কাজে হাত দিলাম (RSK-১৯১৪) ঠিক সেই সময়ে লক্ষীকোল স্টেট একটি বড় রকমের মোকদ্দমায় জড়িত হইয়া পড়ে। পদ্মার চর লইয়া তেঁওতার জমিদারদের সঙ্গে মামলার জন্য স্টেট হইতে টাকা দিয়া বিল্ডিং শেষ করা সম্ভব হয় নাই’ (আমার স্মৃতিকথা-ত্রৈলোক্যনাথ – পৃষ্ঠা-২৬)। কাশিমনগর পরগনার পদ্মার তীরবর্তী অঞ্চল, (পদ্মা তখন লক্ষীকোল থেকে ৬ মাইল/প্রায় ১০ কিমি উত্তর দিয়ে প্রবাহমান ছিল), সূর্যনগর, দিনাজপুর, ভুবেনেশ্বর, কলিকাতা, কাবিলপুর পরগনায় সূর্যকুমারের জমিদারী প্রতিষ্ঠা পায়। এ সকল জমিদারী থেকে লক্ষীকোলে এস্টেটের বাৎসরিক আয় তখনকার দিনে ছিল প্রায় দেড় লক্ষ টাকা। রাজপ্রাসাদ ও রাজার বাড়ির নাম ছিল দেশখ্যাত। প্রায় ৬০ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত প্রাসাদ, অতিথিশালা, পোস্ট অফিস, আঙ্গীনা, বাগানবাড়ি, শান বাঁধানো পুকুর ঘাট, টোল, বৈঠকখানা, অফিস কর্মচারী, পাইক পেয়াদা, গোশালা, আস্তাবল নিয়ে রাজার বাড়ি ছিল জমজমাট। এ ছাড়া রাজা কলিকাতায় বাসস্থান নির্মাণ করেন। দুই রানীর মধ্যে কোনো রানীরই সন্তানদি না থাকায় রাজা ১৮৯০ এর দশকের শুরুতে নরেন্দ্রনাথকে প্রথমে দত্তক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। নরেন্দ্রনাথ মেট্রোপলিটান কলেজিয়েট স্কুলে পড়ালেখা করতেন এবং ক্লাসে প্রথম স্থান অধিকার করতে থাকে। কিন্তু সহসাই কলেরা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এর পূর্বে রাজার এক শ্যালক হীরালাল যাকে রাজা পুত্রবৎ স্নেহ করতেন তিনিও রাজবাড়িতে দুর্ঘটানায় মারা যান। স্নেহপ্রবণ রাজা শ্যালক ও পুত্রের অকাল মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে পুরিধামে গমন করেন এবং পুরিতে ৬০,০০০.০০ (ষাট হাজার) টাকা ব্যয়ে সমুদ্র তীরে বাড়ি নির্মাণ করে বাস করতে থাকেন। রাজা ঐ বাড়ির নাম রাখেন, নরেন্দ্র কুটির। পুত্রের স্মৃতি রক্ষার্থেই এ নামকরণ করা হয়। অবশ্য রাজার মৃত্যুর পর ঐ বাড়ির নাম দেওয়া হয়, ভিক্টোরিয়া ক্লাব। রাজা ভবেশ্বরেও একখানি বাড়ি তৈরি করেন এবং সেখানে অনক ভূ-সম্পত্তি করেন।

রাজা সূর্য কুমার ১৮৬০ দশকের মাঝমাঝি বরিশালের গাভা নিবাসি উমাচরণ ঘোষ দস্তিদারের কন্যা ক্ষীরোদ রানীকে বিবাহ করেন। বিবাহের সময় রাজা দুই শ্যালক হীরালাল ও মতিলালকে সঙ্গে নিয়ে আসেন এবং পুত্রবৎ তাদের লালন পালন করেন। ১৭/১৮ বছর দাম্পত্য জীবনে ক্ষীরোদ রানীর গর্ভে সন্তানাদি জন্মায় না। রানীর পরামর্শে রাজা লক্ষীকোলের নিকটবর্তী গ্রাম ভবদিয়ায় বসবাসরত কুচবিহারের মোক্তার অভয়চরণ মজুমদারের কন্যা শরৎ সুন্দরীকে বিবাহ করেন। এ ঘরেও কোনো  সন্তানাদি জন্মায় না। অনুমান ১৮৯১ সালে রাজা স্ত্রীদের পরামর্শে রাজবাড়িতেই নরেন্দ্রনাথকে পোষ্যপুত্র গ্রহণ করেন। এ সময় ত্রৈলোক্যনাথ রাজার বাড়িতে সূর্যকুমার ইনস্টিটিউমনে লেখাপড়া করতেন। রাজার দুই শ্যালক, ত্রৈলোক্যনাথ এবং পোষ্যপুত্র নরেন্দ্র একসাথে চলাফেরা করতেন। বিশেষ করে রাজার শ্যালকদের সাথে ত্রৈলোক্যনাথের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। এ সময় একটি দুর্ঘটনা ঘটে। ত্রৈলোক্যনাথের কথায়—‘এ সময় রাজবাড়িতে একটি দুর্ঘটনা ঘটে। পুত্রেষ্টি উপলক্ষে রাজবাড়িতে খুব ধুমধাম হয়। যাত্রা, থিয়েটার, বাজী পোড়ান ইত্যাদিতে বহু অর্থ ব্যয় হয়। বাহির আঙ্গিনায় বৃহৎ মঞ্চ তৈয়ারী হইতেছে, মঞ্চ বাঁধিতে অন্যসব লোকের সঙ্গে রাজার শ্যালক হীরালালও মঞ্চে গিয়া ওঠে এবং হঠাৎ পড়িয়া গিয়া প্রাণ হারায়। যাহা হউক উৎসব নিরানন্দের মধ্যে কোনো রকমে শেষ হইয়া গেল বটে কিন্তু রাজা এই দারুণ ধাক্কা সহ্য করিতে পারিলেন না—–দেশত্যাগী হইয়া কলিকাতাবাসী হইলেন। রাজা তখন স্বপরিবারে কলিকাতাবাসী হলেও রাজবাড়ির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হয় না। নরেন্দ্রের মৃত্যুর পর রাজা পুরিধামে বসবাস করতে থাকেন এবং পুনরায় দত্তক গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। রাজা ও দুই রানীসহ রাজা শ্রীমান সৌরেন্দ্র মোহনকে দত্তক গ্রহণ করেন। এ উৎসব পুরিধামে নিজ বাড়িতে সম্পন্ন হয়।’ (আমার স্মৃতিকথা, ত্রেলোক্যনাথ, পৃ-১১)।

যথা সময়ে সৌরিন্দ্র মোহন সাবালক হলে লক্ষীকোল এস্টেটের উত্তরাধিকারী হন। তিনি ‘কুমার বাহদুর’ হিসেবে রাজবাড়িতে সকলের নিকট পরিচিত ছিলেন। রাজা সূর্য কুমারের অমর কীর্তির মধ্যে লক্ষীকোলে সুদৃশ্য প্রাসাদ নির্মাণ, লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা, হাসপাতাল নির্মাণ, লক্ষীকোল পোস্ট অফিস স্থাপন, রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশন প্রতিষ্ঠা, নিজ জমিদারী সূর্যনগরে রেলস্টেশন প্রতিষ্ঠা অন্যতম কাজ। লক্ষীকোল রাজার বাড়ি ছিল ঐতিহ্যের ধারক। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ‘রাজবাড়ি’ দর্শনে আসত। দেশের দর্শনীয় ঐতিহ্য হিসেবে পরিগণিত হত। স্বাধীনতার পর লক্ষীকোল রাজবাড়ির ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে ‘রাজবাড়ি’ একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। চলচ্চিত্রটি কয়েকবার টিভি পর্দায় দেখান হয়েছে। রাজার বাড়ির ধবংসাবশেষ বলতে বর্তমানে কিছুই নেই। ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি বটবৃক্ষ। শান বাঁধানো পুকুরট ভরাট হলেও পুকুরের স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে। প্রতি বছর এখানে নববর্ষের আগমনে বৈশাখী মেলা বসে। তবে ১৮৮৮ সালে তাঁর হাতে গড়া রাজা সূর্যকুমার প্রতিষ্ঠিত আর.এস.কে ইনস্টিটিউশন তাঁর স্মৃতি বহন করছে।

রাজা সূর্যকুমার আমোদপ্রবণ ও রসিক প্রকৃতির ছিলেন। তাঁর সময়েই লক্ষীকোল মেলা জেলার ঐতিহ্যবাহী মেলায় পরণত হয়। রাজবাড়িকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের উৎসব অনুষ্ঠান হত। বসত সঙ্গীত, যাত্রা ও পালাগানের আসর। রাজার বাড়ির অন্দর মহলের আনন্দ উচ্ছাস বিষয়ে ত্রৈলোক্যনাথের কথায়—–‘রাত্রে রাজবাড়ির চেহারা বদলাইয়া যাইত। বৈঠকখানায় গান, বাজনা, আমোদ প্রমোদ—–মদ পর্যন্ত চলত। রাজা মদ খাইতেন কোনো কোনো দিন নামমাত্র-ইয়ার বন্ধুদের যোগাইতেন প্রচুর। বড় মা (বড় রানী) আমাকে একদিন বলিলেন তুমি নায়েব মশাইকে বল চাকর গিয়া টাকা চাহিলেও যেন না দেন। বলিবে আমার হুকুম। আমি বলিলাম, কিন্তু রাজা যদি আমাকে ঘাড় ধরিয়া বাহির করিয়া দেন তখন? বটে! তাহা আমি বুঝিব, তুমি যাও। আমি তাহার আদেশ পালন করিলাম। রাজা আমাদের ষড়যন্ত্র টের পাইলেন। তবে আমাকে কিছু বলিলেন না। বরং তখন হইতে আমাকে অধিকতর স্নেহ করিতে লাগিলেন। তার কিছু দিন পর অনুমান ১৮৯১ নরেন্দ্রনাথকে পোষ্যপুত্র লওয়া হইল। তখন রাজবাড়ি হইতে মদ‘তো উঠিয়া গেলই বাদ্যযন্ত্র সব, পাখোয়াজ, তবলা, বেহালা প্রভৃতি বন্ধুবান্ধদিগের মধ্যে বিলাইয়া দিলেন, বলিলেন—–এসব থাকিলে ছেলে নষ্ট হইবে—-তার লেখাপড়া কিছু হইবে না।’ (আমার স্মৃতিকথা-৯ পৃষ্ঠা)। পারিবারিক স্নেহ মমতায় আবিষ্ট রাজা ছিলেন অত্যন্ত কৌতুক প্রিয় এবং গভীর জ্ঞানের অধিকারী। আমাদের দেশে এখনো নতুন ঘর বা পাকা বাড়ি নির্মাণের সময় প্রথমত দুই চার কোপ মাটি কেটে মোনাজাত করা হয়। অনেক সময় গর্তের মধ্যে টাকা পয়সা ফেলা হয়। তখনকার দিনে গর্তমধ্যে সোনা, রুপা দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। রাজা আর,এস,কে স্কুলের মূল বিল্ডিংটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকালে সোনা আনা হয়েছিল কিন্তু রুপা আনা হয় নাই। ত্রৈলোক্যনাথের পকেটে দুই আনার রুপার মুদ্রা ছিল। তিনি তা গর্তমধ্যে ফেললে রাজা হেসে বললেন, ‘বেশ হইল, এই স্কুল বিল্ডিং এর দুই আনা যত্ন হইল তোমার।’  আমি বলিলাম এ হাতি পোষা রাজরাজাদেরই খাটে—-গরীব স্কুল মাস্টারের কাজ নয় (স্মৃতিকথা-২১)।

আর একদিনের কথা, স্বাস্থ্য পরিবর্তনের জন্য রাজা ঢাকা থেকে গ্রীনবোট এনে বেলগাছি নিয়ে পদ্মা নদীতে অবস্থান করছিলেন। ত্রৈলোক্যনাথের কথায়—-‘আমি গিয়া বোটে উঠিলাম। রাজা তখন নৌকায় বসিয়া ছিপ দিয়া মাছ ধরিতেছিলেন। আমাকে দেখিয়াই বলিলেন, কী হে, ব্যাপার কী? ঠিক ঐ সময়ে ভারী ওজনের একটি কাতলা মাছ লাফ দিয়া নৌকা গর্ভে পড়িল। তিনি আনন্দিত হইয়া বলিলেন—-‘তুমি তো আচ্ছা মৎস্যরাশির মানুষ? আমি এক ঘন্টা বসিয়া আছি একটি মাছেও টোপ গিলছে না, আর তুমি আসা মাত্র তোমাকে দেখিতে আসিল। (পৃষ্ঠা-১৭)।

ত্রৈলোক্যনাথ গ্রীনবোটে রাজার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন একটি বিষয়ে পরামর্শ করতে। ফরিদপুরের সেটেলমেন্ট অফিসার জ্যাক সাহেব (আইসিএস) গ্রাজুয়েটদের মধ্য থেকে কানুনগো নিয়োগ করছেন। যারা এখন ঢুকবে তারা কানুগো কাজ শেষ হইলে সাব ডেপুটির কাজ পাবে। ত্রৈলোক্যনাথ জ্যাক সাহেবের সাথে দেখা করে চাকরিত যোগদানের জন্য সাতদিনের সময় নিয়ে এসেছেন। এখন রাজার অনুমতি পেলে যোগদান করবেন। ত্রৈলোক্যনাথের সব কথা শুনে রাজা বললেন, ‘বেশ তো স্কুল ঘরে তালা লাগাইয়া যাও। আমি স্কুল করিয়াছিলাম যখন রাজবাড়ির চর্তুদিকে ২০ মাইলের মধ্যে কোনো স্কুল ছিল না। একমাত্র ফরিদপুর জেলা স্কুল ছাড়া রাজবাড়িতে মাত্র ঈশ্বর পণ্ডিতের ছাত্রবৃত্তি স্কুল ছিল। তাহাও ভালোরুপ চলিত না। আমি স্কুল করিবার ৫ বছর পর বাণীবহের বাবুরা স্কুল করিলেন (গোয়ালন্দ হাইস্কুল)। তখান আর আমার স্কুল রাখিবার কী প্রয়োজন ছিল? একমাত্র তোমার জন্যই স্কুল রাখিয়াছিলাম। তুমি ডাকঘরে চাকরি পাইলে তাতে মন বসিল না। আসিলে রাজবাড়ি স্কুলে-২৫০ টাকা ছাড়িয়া ৫০টাকায় এখন চাও মেঠো আমিনী করিতে। জ্যাক সাহেবের বাচ্চা —-জল কাদা ভাঙ্গিয়া, ঝড় বৃষ্টি মাথায় করিয়া বুট পায়ে ছুটবে মাঠে ঘাটে। তোমাকেও দৌড়াইতে হইবে। তোমাকেও সঙ্গে সঙ্গে দৌড়াইতে হইবে। পারিবে তাল সামলাইতে?’ (পৃ-১৭১৮)। এরপর ত্রৈলোক্যনাথ স্কুল ছেড়ে যাননি। সুদীর্ঘ ৪২ বছর উক্ত বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।

রাজা বিদ্যান ছিলেন না কিন্তু বিদ্যার প্রতি ছিল গভীর অনুরাগ। গোয়ালন্দ মহকুমার গভর্ণমেন্ট সাহায্যকৃত হাইস্কুলটি পদ্মার ভাঙ্গনে নদীগর্ভে বিলীন হলে রাজবাড়ি উঠে আসে এবং তৎকালীন ডিপিআইসিএ মার্টিন সাহেবের অনুরোধে রাজা সূর্যকুমার এর পরিচালনার ভার গ্রহণ করেন। রাজা সূর্যকুমার প্রতিষ্ঠিত হাসপাতাল সংলগ্ন স্থানে (বর্তমান এসপি ও সিভিল সার্জন এর বাসা যে স্থানে ঐ স্থানটিতে সূর্যকুমার প্রতিষ্ঠিত হাসপাতল ছিল। পরে তা সিভিল সার্জনের অফিস ছিল)। স্থানান্তর করা হয়। কোনো কারণে বিদ্যালয়টি পরিচালনা সম্ভব না হওয়ায় রাজা ১৮৮৮ সালে রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশনটি (R.s.k) প্রতিষ্ঠা করেন। কেবল রাজবাড়ির ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর এস কে ইনস্টিটিউশনর প্রতিষ্ঠাতাই নন, নিজ গৃহে গড়ে তোলেন লাইব্রেরি। রাজার মৃত্যুর পর শ্যালক মতিলাল জমিদারী দেখাশোনা করতেন। তিনি কিছুটা অপ্রকৃতস্থ ছিলেন। লাইব্রেরি বিষয়ে ত্রৈলোক্যনাথ লিখেছেন—‘একদিন শুনিলাম মতিলাল রাজার লাইব্রেরিটি রাজবাড়ি উডহেড লাইব্রেরিকে দান করিয়া বসিয়াছেন। —-আলমারী বুককেসসহ এবং এসডিও আর এস দাসকে কথা পর্যন্ত দিয়া ফেলিয়াছেন। আমি সারা থেকে (ত্রৈলোক্যনাথ ১৯১৯ হইতে ১৯২৪ পর্যন্ত সারা স্কুলে ছিলেন) ছুটিয়া আসিয়া এসডিও’র সঙ্গে দেখা করিয়া বললেন, ঐ লাইব্রেরিটি রানীদের —-তাহারা বহু টাকা ব্যয় করিয়াছেন উহার পিছনে। তাহারা এখনো জীবিত। তাছাড়া আমরা স্টেটের  একজিকিউটর মাত্র। স্টেটের বা অন্যের সম্পত্তি দান করিবার কোনো অধিকার আমাদের নেই। আপনি কিছু মনে করিবেন না।’ অতঃপর মতিকে বললেন, ‘একি তোমার পৈত্রিক সম্পত্তি যে দান করিয়া বসেছিলে।’ (পৃষ্ঠা-৮০)? এর পর মতিলাল ঘোষ দস্তিদার কাবিলপুর পরগনা পরিদর্শন করতে যেয়ে ‘জগন্নথ’ বেশ ধারণ করেন। প্রকৃতপক্ষে তার মুস্তস্ক বিকৃতি ঘটে(১৯২২)। পূর্বেই বলা হয়েছে রাজা ভুবেনশ্বরে একখানি বাড়ি এবং ভূ-সম্পত্তি করেন। রানীদের নিয়ে রাজা শেষজীবন ভূবেনশ্বরেই কাটান। অনুমান ১৯১২ সালে রাজা ভূবেনশ্বরে দেহত্যাগ করেন। সেখানেই রাজার শ্রদ্ধাদি এবং পারলৌকিক কার্যাদি সম্পন্ন হয়। রাজার শ্রদ্ধাতে এক হাজার ব্রাহ্মণ নিমন্ত্রিত হন। পাণ্ডাদের সাহায্যে এবং নিমন্ত্রিত অতিথেদের ভোজন ও দক্ষিণা দ্বারা আপ্যায়িথ ও পরিতুষ্ট করা হয়। পূর্ব হইতেই রাজাকে যেখানে দাহ করা হয় সেখানে শিব মন্দির প্রতিষ্ঠার সঙ্কল্প ছিল এবং যথাসময়ে রাজার প্রথম পক্ষের শ্যালক এবং দ্বিতীয় পক্ষের সম্পর্কীয় শ্যালক অম্বিকাচরণ মজুমদার (ফরিদপুর) এবং ত্রৈলোক্যনাথ এর সহযোগিতায় শিবমন্দির নির্মাণ করা হয় শিবমন্দির নির্মাণ করতে অনেক টাকা কড়ি খরচ হয় যা রাজবাড়ির জমিদারী থেকে লওয়া হয়।

মৃত্যুর পূর্বে রাজা উইল রেখে যান। উক্ত উইলে রাজার দুই রানী, শ্যালক মতিলাল ঘোষ এবং শ্রী ত্রৈলোক্যনাথকে এস্টেটের একজিকিউটর নিযুক্ত করেছেন। উইলে আরো একটি শর্ত ছিল রাজার জীবনান্তে মতিলাল ও তার স্ত্রী পুত্রগণ (সাবালক না হওয়া পর্যন্ত ) মাসোহারা পাইবেন। কুমারের (সৌরিন্দ্র) তখন সাবালক হওয়ার এক বছর বাকি ছিল। এরমধ্যে মতিলাল জমিদারী দেখাশোনা করলেও তার মানসিক ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। ত্রৈলোক্যনাথ তখন ফরিদপুরের ডিএস-জেএ উডহেড (আইসিএস) এবং উকিল অম্বিকাচরণ মজুমদারের সাথে আলাপ করে সৌরেন্দ্র মোহনের হাতে স্টেটের ভার বুঝিয়া দেওয়ার প্রস্তাব করেন। এতে ডিএস সম্মত হন। সৌরেন্দ্র মোহনকে স্টেটের ভার বুঝিয়ে দিওয়া হয়। এদিকে অপ্রকৃতস্থ মতিলালকে একরকম জোর করে বরিশালে নেওয়া হয়। সে খুব কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করতে থাকে। অপ্রকৃতস্থ হলেও মতিলাল রাজবাড়ি এসে উকিলের সাহয্যে উইলের শর্ত ধরে কুমারের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তাকে ১০ হাজার টাকা দিয়ে ত্রৈলোক্যনাথ মামলা তুলে নেওয়ার ব্যাবস্থা করেন। সৌরিন্দ্র মোহন এস্টেটের মালিক হয়ে জমিদারী পরিচালনা করেন। উল্লেখ্য সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জেসমিন চৌধুরী পিএইচডি এর লক্ষে, ‘রাজা সুর্যকুমার ও সমকালীন মুসলমানদের আর্থ সামাজিক অবস্থা’ অভিসন্দর্ভ (থিসিস) রচনায় কর্মরত আছে।

ধর্মীও সম্প্রদায়

ধর্মীয় সম্প্রদায়

১২০৬ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজীর পূর্বে এদেশের রাজা ও প্রজা প্রায় সকলেই ছিল বৌদ্ধ ও হিন্দু। কেবল মুসলমানদের রাজত্ব শুরু হবার পর থেকে মুসলমান প্রবাহের শুরু হয়। এ ধর্ম কখন বিশেষভাবে প্রসার লাভ করে তার একটা পরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায় বঙ্গদেশে নির্মিত মসজিদের সংখ্যা এবং অবস্থান থেকে। ত্রয়োদশ শতকে মসজিদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৬টি। পরের শতাব্দীতে এই সংখ্যা আনুপাতিক সেটেই বৃদ্ধি পায়। এ শতাব্দীতে এরুপ মসজিদ নির্মিত হয় সাতটি। পনের শতকে এ সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং মসজিদ তৈরি হয় ৬৬টি। আর যোল শতকে ৭৫টি। তারপর সতের শতকে ঢাকা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, নোয়াখালি, কুমিল্লা ইত্যাদি অঞ্চলের মসজিদের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পায়। ক্রেমারের গবেষণা থেকে জানা যায় ১২০৪ সালে বঙ্গদেশে মোট জনসংখ্যা ছিল ১২.৫৮ মিলিয়ন (১ কোটি ২৫ লক্ষ প্রায়) তা ১৮৭২-এ দাঁড়ায় ৩৬.৭ মিলিয়ন (৩ কোটি ৭০ লক্ষ প্রায়)।

১৯০১ এ দাঁড়ায় প্রায় ৪কোটি (উভয় বাংলা)। পানিনি প্রদত্ত গ্রাফে দেখা যায় ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের পূর্ববঙ্গে মুসলমান ছিল খুবই কম। তবে ১৮৭২-এর দেখা যায় হিন্দু মুসলমান প্রায় সমান এবং গ্রাফটিতে ১৯০১-এ মুসলমানদের সংখ্যা হিন্দুদের ছাড়িয়ে যায়।

প্রায় একশত বছর পূর্বে ফরিদপুর জেলায় হিন্দু, মুসলমান, ব্রাহ্ম, খ্রিস্টান এই চার জাতির বাস ছিল। হিন্দুর সংখ্যা ৭,৩৩৫৫ জন। তম্মোধ্যে পুরুষ ৩৬০০১২ স্ত্রী ৩,৭৩,৫৪৩। ব্রাহ্ম ৮৩ জন। পুরুষ ৪০, মহিলা ৪৩। মুসলমান মোট সংখ্যা ১১,৯৯,৩৫১ জন। তম্মোধ্যে পুরুষ ৬,০৭,৬৮৮ ও স্ত্রী ৫,৯১৬৬৩ জন। খ্রিস্টান ৩,৬৫৭ জন (ফরিদপুরের ইতিহাসে আনন্দনাথ রায় পৃষ্ঠা-২২)।

১৯৬১ সালে আদমশুমারী অনুযায়ী ফরিদপুর জেলার মোট জনসংখ্যা ৩১,৭৮,৯৪৫। এরমধ্যে ২৩,৪৭,১৭৩ জন মুসলমান। ২,২৮,৫০৬ জন কাষ্ট হিন্দু। ৬,৯৬,৫৫৮ জন শিডিউল কাষ্ট (নমশুদ্র), ৯,১৫৮ জন খ্রিস্টান এবং অন্যান্য ৫৫০ জন। এ সময় গোয়ালন্দ মহকুমার হিন্দু ও মুসলমান জনসংখ্যার পরিমাণ ছিল নিম্নরুপ——

মহকুমা গোয়ালন্দ ১৯৬১ সেনসাস

মহকুমার

থান/নাম

সমস্ত ধর্মের লোকসংখ্যা মুসলমান কাষ্ট হিন্দু শিডিউলকাষ্ট হিন্দু মোট হিন্দু ক্রীশ্চিয়ান অন্যান্য
গোয়ালন্দ মহাকুমা ৪৩৪৪০৭ ৩১৫৮৮৬ ৫১০৯৩ ৬৭৩৪৯ ১১৮৪৪২ ৩০ ৭৯
পাংশা  থানা ১৫৮৩৩১ ১২৪২৯৫ ১৮০১৪ ১৬০২২ ৩৪০৩৮ ০০ ৩০
বালিয়াকান্দি থান ১১৮০৩৬ ৬৫৭১৫ ১৭৪৩২ ৩৪৮৮৯ ৫২৪৪৯ ০০ ৩০
রাজবাড়ি থানা ১১৩৪৪৯ ৮৯৩৭৬ ১৪৪৪৮ ৯৫৩৬ ২৩৯৮৪ ৩০ ৪৯
গোয়ালন্দ ঘাট ৪৪৬০১ ৩৬৫০০ ১১১৯ ৬৯০২ ৮০২৯ ০০ ০০

উল্লেখিত বিবরণ, গ্রাফ ও তথ্যসূচী থেকে জেলায় মুসলমান সংখ্যা বৃ্দ্ধির স্পষ্ট নিদর্শন মেলে।

বঙ্গে ইসলাম প্রবাহের কয়েকটি কারণ উল্লেখযোগ্য যথা—–তরবারি, সামাজিক সাম্য, পীরদরবেশ ও আউলিয়াদের ধর্ম প্রচার, বৌদ্ধ ও হিন্দুদের সামাজিক অবস্থা এবং বঙ্গের সহজ জীবন ব্যবস্থা। ভারতবর্ষে যদি কেবল তরবারির দ্বারা ইসলামের প্রসার ঘটত তাহলে দিল্লী, আগ্রাতেই মুসলমান বেশি থাকত। কিন্তু তুলনামূলক দেখা যায় ইসলাম ধর্মের প্রসার ঘটেছে দ্রুত এবং তা আবার ১৫ শতকের পর অর্থাৎ মোগল শাসনকাল থেকে। মোগলরা আবার ধর্মপ্রচারে উদাসীন ছিলেন বলেই ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয়।

নবম শতাব্দী থেকে আরব বণিকরা চট্রগ্রাম অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। অবশ্য তারা র্ধম প্রচার করতে আসেননি। বখতিয়ার খলজির মতো তারাও এসেছিলেন ইহলৌকিক লাভের আশায়। এদেশে বণিক ও যোদ্ধা ছাড়া আরো এসেছিলেন ধর্ম প্রচারকরা। তারা দেশ শাসন বা ব্যবসা করতে আসেননি। তারা এসেছিলেন ধর্মপ্রচারে দ্বারা পুণ্য অর্জন করতে। মহম্মদ এনামুল হকের মতে এ রকম একজন প্রচারক বাবা আদম এসেছিলেন দ্বাদশ শতকের গোড়ায়। জানা যায় তিনি, নাকি বল্লভ সেনের সাথে যুদ্ধ করে ১১১৯ সালে মারা যান। তারপরে আসেন শাহ মুহম্মদ সুলতান। সে কালের প্রখ্যাত সুফি সৈয়দ জালালউদ্দিন মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার কিছু আগে বঙ্গে এসেছিলেন। তারা সে সময় আগমন করলেও ইসলাম প্রচারে বিশেষ সুবিধা করতে পারেননি। কারণ তখন রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকাতার অভাব ছিল। তবে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠায় ইসলাম প্রচার প্রসারে ব্যাপক সাহায্য করেছিল। সুলতানদের লক্ষ্য না হলেও তারা আদৌ ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন না। তারা বরং বিদ্বেষের কর্তৃত্বকে প্রতিষ্ঠিত এবং জোরদার করার জন্য অকাতরে ধর্মের নাম এবং প্রতীক ব্যবহার করেছেন। সেই সঙ্গে ব্যাবহার করেছেন তরবারি। নিজেদের নামে খুৎবা প্রচলন রীতি তখন প্রকাশ্যে রীতি হিসেবে গৃহীত হয়েছিল। মুসলমানদের সংখ্যা কম হলেও তারা বহু মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন ও নির্মাণ করতে সাহায্য করেছিলেন। বস্তুত মসজিদ ধর্ম প্রচারের প্রতিকে পরিণত হয়েছিল। নতুন কর্তৃত্বের সমকালীন ঐতিহাসিক মিনহাজ এর বিবরণ থেকে জানা যায়, জাহাঙ্গীর খিলজী গোবিন্দ পালের রাজধানী অজন্তপুরী আক্রমন করে এবং রাজধানী দখলের পর বৌদ্ধবিহার লুটপাট এবং বৌদ্ধ ভিক্ষুদের  হত্যা করে। অনেক বৌদ্ধ সে সময় মুসলমানদের অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দক্ষিণ পূর্ববাংলায় এবং নেপালে আশ্রয় নেয়। হিন্দু মন্দিরও ভেঙ্গে ফেলেন। এছাড়া তাদের মূর্তিপূজা বিরোধী মনোভাব ছিল। সুলতানি আমলেও প্রথম দিকে বৌদ্ধ বিহার ও মন্দির ধবংসের ঘটনা কমবেশি ঘটে থাকলেও জোর জুলুম করে হিন্দু প্রধান বাংলায় রাজ্যশাসন স্থায়ী হবে না তা তারা বুঝেছিলেন। এছাড়া গোটা দেশ জুড়ে ছিল ছোট বড় হিন্দু রাজা ও জমিদার। তাদের বশে না-রাখতে পারলে ভূমি রাজস্ব পাওয়া যাবে না। এ কারণে সুলতানি শাসনের পরবর্তীকালে শাসকগণ ধর্ম প্রচারে উৎসাহিত ছিলেন না। বাংলায় ইসলাম ধর্মের বিকাশে যত মতবাদই থাক না কেন এদেশে মুসলিম শাসনের প্রাক্কালে আরব, তুরস্ক, ইরাক থেকে যে সংস্কৃতির প্রবাহের ঢেউ এসে ধাক্কা দেয় তা ধীরে ধীরে বাংলার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ে। একথা কোনো ইতিহাসবিদ অস্বীকার করতে পারবেন না। একথা ঠিক যে, কোনো অঞ্চলে সভ্যতার উন্মেষ ঘটলে তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ‍উভয় প্রভাব সর্বত্র ছড়েয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে প্রত্যক্ষভাবে মুসলমান বিজয়ীরা মুসলিম সংস্কৃতির বিকাশ বঙ্গে ঘটেয়েছিল। তবে প্রথম দিকে তা ফরিদপুর অঞ্চলে বা পূর্ববঙ্গে ঘটেনি। পূর্ববঙ্গ তখনও মুসলিম শাসনের আওতায় আসে নাই। ১২৭৫ খ্রি. সুলতান মুগীস উদ্দিন তুগরিল দিল্লীর বশ্যতা অস্বীকার করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং নিজ নামে খুৎবা পাঠ এবং মুদ্রা চালু করেন। তিনি পদ্মা নদীর দুই তীরবর্তী অঞ্চলে বিশেষ করে বর্তমান রাজবাড়ি ফরিদপুর এবং ঢাকা জেলার পশ্চিম-দক্ষিণাংশের উপর কর্তৃত্ব স্থাপন করেন।

সুলতান রুকুনউদ্দিন বরবক শাহের পুত্র শামসুদ্দিন ইউসুফ শাহ (১৪৭৪-১৪৮১) সাত বছর বাংলা শাসন করেন। ইউসুফ শাহের মৃত্যুর পর তার পুত্র সিকান্দার শাহকে (১৪৮১) সরিয়ে রুকুনউদ্দিন বরবক শাহের ছোট ভাই ফতেহ শাহ (১৪৮১-১৪৮৯) ক্ষমতা দখল করেন। ফতেহ শাহর সময়ে গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, ফুলেশ্বরী, ইদিলপুর, রাজবাড়ি মোগল শাসকরা বসতি স্থাপন করে। ১৪৮৭ থেকে ১৪৯৩ হাবশী ক্রীতদাসগণ বাংলা শাসন করেন। এ সময় ছিল অশান্তির যুগ। ১৪৯৩ খ্রিস্টাব্দের সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ লক্ষ্ণৌতে তথা বাংলার সিংহাসনে আসিন হন। তার সময়েই ফতেহবাদ অঞ্চল সরাসরি মুসলমানদের অধিকারে আসে। ফতেহবাদ অঞ্চলকে নুশরতশাহী, মাহমুদশাহী, ইউসুফশাহী ও মাহমুদাবাদ নামকরণ করেন। এরমধ্যে রাজবাড়ি নশরত শাহী ও ফতেহাবাদে অন্তভুক্ত হয়। (পরগনা হিসেবে রাজবাড়ি নুশরতশাহী দেখা যায়।) সুলতানি শাসনকালে প্রায় ২০০ বছর ফতেহাবাদ উল্লেখযোগ্য শাসন কেন্দ্রে পরিণত হয়। ফতেহবাদ টাকশালি থেকে মুদ্রা উত্তোলন হত। দীর্ঘকাল ও অঞ্চল মুসলিম শাসনাধীন থাকায় ইসলামের প্রসার ঘটাই স্বাভাবিক। এরমধ্যে হুসেন শাহের বংশের রাজত্বকাল ১৪৯৩-১৫৩৮। সুদীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর রাজত্বকালে হুসেন শাহ ও তার পুত্র নশরত শাহ ইসলাম ধর্ম প্রচারে অনেক মসজিদ নির্মাণ করেন। নশরত শাহের নির্মিত গৌড়ের সোনা মসজিদ, কদম-রসুল মসজিদ, বার দুয়ারী মসজিদ স্মৃতিস্বরুপ ইসলাম প্রসারের দৃষ্টান্ত বহন করে। ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী থানায় অবস্থিত সাতৈর মসজিদ তাঁর কীর্তি (ফরিদপুরের ইতিহাস, আনম আবদুস সোবহান, পৃষ্ঠা-৩৬)। নশরত শাহ ও তাঁর পিতা হুসেন শাহ প্রজাহিত কাজ ও ইসলাম প্রচারে আরো মসজিদ সরাইখানা নির্মাণ করেন। রাজবাড়ি অঞ্চলটি ফতেহাবাদ, নশরতশাহী এবং মাহমুদাবাদের অংশবিশেষ। রাজবাড়িতে কালুখালির অদূরে ‘রুপসা গায়েবী মসজিদ’, সূর্যনগরের নিকটবর্তী ‘বাগমারা গায়েবী মসজিদ’, আলাদীপুর ইউনিয়নের ‘শিঙ্গা গায়েবী মসজিদ’ নামে ৫০০-৭০০ বছরের পুরানো এসকল মসজিদের ধবংসাবশেষ এখনো দেখা যায়। এ বিষয়ে পরে আলোচনা করা যাবে। মসজিদগুলি হুশেণী বংশের রাজত্বকালে নির্মিত।

তুর্কি শাসনের শুরু থেকে বাংলায় মোগল শাসনের পূর্বকালে প্রায় ৪০০ বছর ধরে ধীরে ধীরে বঙ্গে ইসলাম প্রসার লাভ করেছে। এ প্রসারের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে (১) মুসলমানদের শাসন প্রভাব ও পৃষ্ঠপোষকতা (২) ধর্মে মূর্তির বদলে অমূর্তের আদর্শে জোরপূর্বক হিন্দু দেবদেবী ধবংস (৩) পীর আউলিয়াদের ধর্ম প্রচারে স্বেচ্ছায় ধর্মান্তরিত হওয়া ইত্যাদি। রামাই পণ্ডিতের শূন্য -পূরাণে ইসলাম ধর্মের প্রসারের চিত্র এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

যথেক দেবতাগণ/ সভে হৈয়্যা একমন/ আনন্দেতে পরিলা ইজার/ ব্রাহ্মহৈল্যা মহামদ/ বিষ্ণু হইলা পেকাস্বর/ অদম্ফ হইল্যা শুলপানি। গণেশ গাজী/ কাত্তিক হইল্যা কাজী। ফকীর হইল্যা যথামুনি তেজিয়্যা আপন ভেক/ নারদ হইল্যা শেক, পুরন্দর হইল্যা মওলানা। আপনি চণ্ডিকা দেবী/ তিহ হইল্যা হায়া বিবি/ পদ্মাবতী হইল্যা বিবিনুর। যথেক দেবতাগণ/ সভে হয়্যা একমন/ প্রবেশ করিলা জাজপুর। দেউল দোহারা ভাঙ্গে/ ক্যাড়া ফ্যিড়া খায় বঙ্গে/ পাখর পাখর বলে বোল।

এখানে জাজপুরের মন্দিরে প্রবেশ করে দেবতাদের মূর্তি ভাঙ্গার যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে তা সুলেমান কারবানীর সেনাপতি কালাপাহাড়ের মন্দির তছনছ করার ঘটনা। সে ঘটনা ঘটে ২৫৬৮তে। তবে এ কাব্য রচিত হয় কালাপাহাড় কিংবদন্তিতে পরিণত হওয়ার পর। হয়ত সপ্তদশ শতকের কোনো এক সময়ে। ফলে সত্যের সঙ্গে অতিরঞ্জন মিশে গেছে। বঙ্গদেশে ইসলাম ব্যাপকভাবে প্রচারিত ঠিকই কিন্তু দেবতারা সবাই এক হয়ে রাতারাতি মুসলমান হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিলেন তা ঠিক নয়। বরং ধারণা করা সঙ্গত হবে যে ইসলাম ধর্ম তড়িৎগতিতে নয়, পূর্ববঙ্গসহ বাংলার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল ধীরে ধীরে । তবে উক্ত চিত্র থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে মোগল শাসনের পূর্ব পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণির হিন্দু ইসলামের দীক্ষাগ্রহণ করেন। কেবল হিন্দু নয় এ অঞ্চলে ব্যাপকহারে বৌদ্ধদের বসবাস ছিল। বৌদ্ধরাই বেশি হারে ইসলাম গ্রহণ করে।

অনেক খ্যাতনামা সাহিত্যিকদের লেখায় ‘ন্যাড়া’ ‘যবন’ ইত্যাদি শব্দ পাওয়া যায়। বালিয়াকান্দি ও পাংশা এলাকায় ‘নম’; ও ‘নাড়ে’ বিপরীতমূখী দুটি কূট শব্দ সাধারণ্যে ব্যবাহর হয়। শব্দ দুটি অপমানজনক শব্দ বলে উভয় সম্প্রদায় মনে করে। এ নিয়ে অতীতে কাইজা ফ্যাসাদ ঘটত। মূলত ন্যাড়া থেকে না’ড়ে শব্দটি উদ্ভুত। বর্তমানে অন্য ধর্মের কেহ ইসলাম ধর্মগ্রহণ করলে তাকে নওমুসলিম বলা হয়। অনুরুপ ত্রয়োদশ, চতুর্দশ শতকে বৌদ্ধরা ইসলাম গ্রহণ করলে তাকে ন্যাড়া মুসলমান বলা হত। পরবতীতে স্পর্শকাতর ন্যাড়া বা না’ড়ে বলে মুসলমানদের উপহাস করা হত। ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে বাংলায় ইসলাম ধর্মের দ্রুত বিস্তার ঘটতে থাকে। এর ফলে দলে দলে দেশীয় লোকেরা অর্থাৎ বাঙালিরা ইসলাম ধর্মগ্রহণ করে। বর্ণহিন্দুদের নির্যাতন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ও নিম্নবর্ণের হিন্দুরা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়ে বাংলার মুসলমান সমাজকে বিরাট আকার প্রদান করে। বাংলাদেশের মুণ্ডিত মস্তক বৌদ্ধদের প্রায় পুরো অংশটিই মুসলমান হয়ে যাওয়ার কারণে উচ্চ বর্ণের হিন্দুরা মুসলমানদের নেড়ে বলে অভিহিত করেন। বঙ্কিমচন্দ্র এই নেড়ে শব্দ তার আনন্দমঠ উপন্যাসে মুসমানদের জন্য ব্যাবহার করেছেন।

রাজবাড়িতে ১৩৩৭ সালে বালিয়াকান্দি উপজেলার জঙ্গল ইউনিয়নের নমঃশুদ্র হিন্দু ও নাড়ুয়া ইউনিয়নের মুসলমানদের মধ্যে গরু  কোরবানী নিয়ে ব্যাপকাকারে  এক কাইজা বাঁধে। এ নিয়ে সে সময় এক গ্রাম্য সায়ের রচিত হয় সায়রের কিঞ্চিত নিম্নরুপ———

সন ১৩৩৭ সাল ৮ই জ্যৈষ্ঠ শুক্রবার

নমঃ সাথে বাধলোরে গোলমাল

দেশে এলোরে জঞ্জাল।

আজকে না’ড়ে পড়ছো ফেরে, ও শরকীর আগায় নেব জান

না’ড়ে খাব ভাতে দিয়ে কাঁদিবে তোর যতেক মুসলমান।

এরুপ না’ড়ে শব্দের গণব্যবহারে ধারণা করা যায় এ অঞ্চলের মণ্ডিত মস্তক বৌদ্ধরা বিপুলাকারে মুসলমান ধর্মে দীক্ষিত হয়। ১৮ শতকে বঙ্গে মুসলমানের সংখ্যা হিন্দুর সংখ্যা ছাড়িয়ে যায়। অবশ্য মোগলরা ইসলাম প্রচারে উদাসীন ছিলেন। তা সত্ত্বেও ইসলাম প্রসারের কারণ কী? এ বিষয়ে কয়েকটি কারণ নির্দেশ করা যাবে। প্রথমত মোগল শাসনকালে বাংলায় মুসলিম আধিপাত্য বৃদ্ধি পায়। মোগল শাসকদের মধ্যে অনেকে স্থায়ী বসতি স্থাপন করে। এছাড়া সেনাপতি, দেওয়ান, ফৌজদার, আমলা, কর্মচারী অনেকে স্থায়ী বসতবাড়ি গড়ে তোলে। তাদের শাসনকালে অনেকে ব্যাবসা, বাণিজ্য, জমিদারী কর্তৃকত্ব গ্রহণ করে। ১৫৭৪ সালে সম্রাট আকবর মোরাদ খাকে বাংলা অধিকারে পূর্ববঙ্গ পাঠান। আকবরনামায় দেখা যায় তিনি ফতেহাবাদ (ফরিদপুর) বা সরকার বাকলা বা বাকের গঞ্জকে আকবরের রাজ্যভুক্ত করেন। সুবাদারগণ ফরিদপুর শহরের তের মাইল উত্তর পশ্চিমে বর্তমান রাজবাড়ি সদর থানার অন্তর্গত খানখানাপুর গ্রামে বসবাস করতেন। মাত্র ছয়বছর রাজত্বের পর তিনি পরলোকগমন করেন। (আসকার ইবনে শাইখ, বাংলার শাসনকর্তা, পৃষ্ঠা-৩৩)। এরুপ অনেকেই বঙ্গে থেকে যান।

দ্বিতীয় যে বিশেষ কারণ তা হল পীর, আউলিয়া, দরবেশ ধর্মপ্রচারদের আগমন, স্থায়ী বসতি এবং ধর্ম প্রচার। সুলতানি আমল থেকে পীর দরবেশ আগমন করেন। তাদের সংখ্যা ছিল কম। চৌদ্দ শতকের সবচেয়ে উল্লেখ্য পীর ও ধর্ম প্রচারক হলেন হযরত শাহ জালাল (১৩৪৫)। খুলনায় পীর খানজাহান আলী (১৪৫৯)। যোদ্ধার বেশে এসে পীর খানজাহান আলী পীর পরিচিতিতে পরিচিত হন। তিনি যশোর, খুলনা জয় করে খলিফাতাবাদ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং ইসলাম প্রচার করেন। এরপর  দিনাজপুরে ইসলাম প্রচার করেন সাহ বদরুদ্দিন পাবনায়, মখদুম শাহ দৌলা , ঢাকায় শাহ আলী বাগদাদী, ফরিদপুরে  ফরিদ উদ্দিন (শেখ ফরিদ) নোয়াখালিতে আহমদ নবী এবং চট্রগ্রামে বদর শাহ। এরপর দলে-দলে আগমন করেন সূফী দরবেশ, পীর ও ফকীর। তাঁরা আবার ছিলেন বিভিন্ন তরীকাভুক্ত যেমন চিশতিয়া, কালান্দরিয়া, মাদারিয়া, কাদেরিয়া, নখশাবন্দিয়অ, আহমদিয়া ইত্যাদি।

ধর্মচেতনা, ধর্মপালন আমাদের জীবন ব্যবস্থায় নিত্যসঙ্গী। হাজার হাজার বছর ধরে বংশ পরস্পরায় মানব জাতি ধর্মাচরণে অভ্যস্থ। পৃথিবীতে যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ধর্ম সংস্কৃতির ছায়ায় মানুষ বসবাস করছে সে সব ধর্মের বিকাশ ঘটেছে খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৫০০ শত বছর পূর্বে ও পরে। এ সময়ের মধ্যে হিন্দু ধর্ম রামায়ণ, মহাভারত, ‍উপনিষদ, পুরাণ, উপপুরাণভিত্তিক স্বকীয় সত্ত্বা লাভ করে। গৌতম বুদ্ধ, যিশুখ্রিস্ট এবং হযরত মুহম্মদ (সঃ) এর আবির্ভাব এ সময়ের মধ্যে। যুগে যুগে সর্ব ধর্মই নানা ভাগে বিভক্ত হয়েছে, নানা কুসংস্কারে আটকে গেছে। বঙ্গে ইসলামের যে স্বচ্ছ ধারাটি প্রায় ৫০০ বছর ধরে চলে আসছিল উপনেবেশিক ইংরেজ শাসনকালে বিশেষ করে উনবিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকে বিংশ শতাব্দীর সংস্কার আন্দোলন পর্যন্ত তার হাল বেহাল হয়ে পড়ে। ১৯২৬ সালের ‘রওশন হেদায়েত’ পত্রিকায় এ সম্বন্ধে যা লেখা হয়েছিল তা থেকে তৎকালীন ধমীয় অবস্থার মুসলমানদের আভাস পাওয়া যায়——

 বহু নাদান মোছলমান কালী পূজা, দুর্গাপূজা, লক্ষী পূজা, সরস্বতী পূজা, বাসন্তি পূজা, চড়ক পূজা, রথ পূজা পাথর পূজা, দরগা পূজা, কদর পূজা, মানিকপীর পূজা, মাদারবাঁশ পূজা, ইত্যাদিতে যোগদান করে শেরেকের মন্ত্রতন্ত্র ব্যবহার করে, কালী, দুর্গা, কামগুরু কামাক্ষা ইত্যাদি নামের দোহাই দেয়, ইত্যাদি শরিয়ত গর্হিত কার্য করতঃ অমূল্য ইমানকে হারাইয়া কাফেরে পরিণত হইয়া জাহান্নামের পথ পরিস্কার করিতেছে। (হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি, গোলাম মুরশিদ)

উনিশ শতকে বঙ্গের মুসলমান কেবল গোত্র এবং নামেই নয় কাজকর্মেও তারা অধমে পরিণত হয়। যে মুসলমান জাতি শত শত বছর ধরে রাজা বাদশার জাতি বলে গৌরবান্বিত, মাত্র শত দেড়শত বছরের মধ্যে তাদের সামাজিক অবস্থান একেবারে পিছন কাতারে পৌঁছে গেছে। প্রায় শতভাগ মুসলমান নিম্ন বুদ্ধিজীবী, কুলি, নৌকাবাহক, পালকিবাহক, গাড়িয়াল, তেলি, কুলু, বেদে, মুটে, মজুরও জমিদারের আজ্ঞবাহকে পরিণত হল। মুসলমানদের এ দুরাবস্থার বিষয়ে ঐতিহাসিকগণ সাধারণভাবে ইংরেজি না শেখা ইংরেজদের থেকে দূরে থাকার নীতিকেই দায়ী করেন। তবে গবেষকগণ এর সাথে আরো অনেক কারণ নির্দেশ করে থাকেন। মূলত সুলতান, পাঠান ও মোগল শাসনকালে ‍সুদীর্ঘ প্রায় ৪০০ শত বছরে বঙ্গের সুলতানদের মধ্যে জাতিস্বত্ত্বার বিকাশ ঘটেনি যা হিন্দুদের মধ্যে ৭ম/৮ম শতকে ঘটেছিল। ভাগ্য-বিড়ম্বনায় ভারত তথা বঙ্গের হিন্দু মুসলিম বৃটিশ শাসনাধীনে থাকলেও শিক্ষা, সাহিত্য, রাজকাজ থেকে মুসলমানেরা দূরে ছিল। এদিকে মোগল শাসনকালে মুসলিম শাসকরা দিল্লী সালতানাতের ঐশ্চর্য বৃদ্ধিতেই ব্যস্ত থাকতেন, প্রজাপালনে নয়। এদিকে বৃটিশ শাসনকালের প্রারম্ভে বাবু ও ভদ্রলোক শ্রেণির নামকরণে একটি শ্রেণির উদ্ভব ঘটে যারা দ্রুত উচ্চ শ্রেণিতে পরিণত হয়। প্রথমত এই বাবু ভদ্রলোক শ্রেণির উন্মেষ কলিকাতা কেন্দ্রীক থাকলেও ধীরে ধীরে তা সারা বঙ্গের বাবু কালচারে পরিণত হয়।

তৎকালীন অঞ্চল বিশেষ রাজবাড়ির মুসলমানদের অবস্থা ত্রৈলোক্যনাথের লেখা ‘রাজবাড়িতে একটি মুসলমান সভা থেকে ধারণা পাওয়া যায়——-

‘১৯১২ বা ১৯১৩ সালে রাজবাড়িতে এক মসলমান সভায় সমবেত শ্রোতাদের সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। কিছু হিন্দুও যোগ দিয়েছে। সংখ্যা বিশ পঁচিশ। চট্রগ্রাম থেকে এসেছেন একজন মওলানা, সাথে কয়েকজন মৌলবি। মওলানা সাহেব ওয়াজ করছেন—-দেখ ভাইসব, ইংরেজ নহে হিন্দুরাই আমাদের উপর রাজত্ব করছে। ছোট বড় সরকারি কাজে হিন্দুদেরই প্রাধান্য। আমরা কয়জন পাই? আমরা নাকি অশিক্ষিত, মূর্খ। এখন হইতে তোমরা সজাগ হও। হিন্দুর বাড়ি চাকরি করতে যাবে না। ঘরামির কাজে যাবে না। হিন্দুর ভাত খাবে না ইত্যাদি। ঐ সভায় রাজবাড়ির দুই নামকরা মোক্তার গোবিন্দ চন্দ্র রায় ও চন্দ্রনাথ লাহিড়ী উপস্থিত ছিলেন। গোবিন্দ রায় ছিলেন হাস্যরসিক ও স্পষ্টভাষী। তিনি মওলানা সাহেবকে সম্বোধন করে বললেন শ্রদ্ধেয় মওলানা সাহেব, আপনি আমাদের যে যে উপদেশ দিলেন শুনিলাম। কিন্তু আপনার বোধ হয় ভুল হইয়া গিয়াছে আর একটি উপদেশ দিতে। আপনার বলা উচিত ছিল ‘হিন্দু বাড়ি চুরি করতেও যাইবে না’ তাহা হইলে আমরা অনেকটা নিশ্চিন্ত হইতে পারিতাম। দেখুন আমি মোক্তারী করি এই মহকুমায় যত মোকদ্দমা হয় দেখিতে পাই আসামী শ্রেণিতে মুসলমানই সংখ্যায় বেশি। অবশ্য হিন্দুর মধ্যেও বাগদী, ডোম, মুর্দাফরাস কিছু কিছু আছে। আমাদের এই অঞ্চলের মুসলমানেরা বড় গরীব তারা হিন্দুদের বাড়ি কাজ কর্ম  করিয়া দুধ বেচিয়া কোনো রকমে সংসার চালায়। মুসলমানদের অনেকেরই অনটনের সংসার। টাকার দরকার হইলে হিন্দু মহাজনের শরনাপন্ন হয়। তারপর ধান পাট জন্মাইলে বিক্রয় করিয়া দেনা শোধ করে।’ (আমার স্মৃতিকথা, ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্য, পৃ-১০১)

এ থেকে রাজবাড়িতে তৎকালীন মুসলমানদের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

শিক্ষা, সচেতনতা ও স্বাজত্ববোধ কোনো জাতি বা গোষ্ঠীর মুক্তির অনিবার্য শর্ত। ইংরেজ শাসনকালে মুসলমানদের পশ্চাৎপদতার অন্যতম কারণ শিক্ষার অভাব। ইংরেজ শাসনের শুরু থেকেই মুসলমানের ইংরেজি ও পাশ্চাত্য শিক্ষাকে পাপ মনে করে তা বর্জন করে। মুসলমানদের পুনর্জগরণ এবং চেতনা বিকাশের লক্ষ্যে আঠারো শতকের শুরু থেকে সৈয়দ আহম্মেদ, তিতুমীর নেতৃত্ব  দেন। উনিশ শতকে এনায়েত আলী, কেরামত আলী, তরীকায়ে মোহাম্মাদিয়া (মোহাম্মদের পথ) আন্দোলনের নামে শুদ্ধ পথে ধর্ম প্রচারের বন্যা বইয়ে দেন। ২৪ পরগনা, যশোর, ফরিদপুর, রাজশাহী, নোয়াখালি, ঢাকা এলাকায় তা ব্যাপক প্র্রসার লাভ করে। ফরিদপুরের কাজী শরিয়তুল্লাহ (১৭৮১-১৮৪০) ফরায়েজী আন্দোলনের নামে কোর-আন শিক্ষা বা ফরজ পালনে জোর তৎপরতা চালান। এসময় অনেক ফরায়েজী পণ্ডিত রাজবাড়ির মানুষের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি করেন। হাজী শরিয়তুল্লাহর ছেলে পীর দুদু মিয়া কোরআন সুন্নাহভিত্তিক শুদ্ধি আন্দোলন এবং নীলবিদ্রোহে নেতৃত্ব দান কালে সোনাপুরের হাসেম আলীসহ শত শত মুসলমান তার অনুগামী হয়ে ওঠেন। ফরিদপুরের নওয়াব আব্দুল লতিফ ১৮৬৩ সালে মুসলমানদের সুসংগঠিত করার ‍উদ্দেশ্যে ‘মোহামেডান লিটারেরী সোসাইটি’ স্থাপন করেন। কলিকাতাভিত্তিক এ সংগঠনে যোগদান করেন পদমদির (রাজবাড়ি) নবাব মীর মোহাম্মদ আলী। মীর মোহাম্মদ আলী কুষ্টিয়া ও পদমদিতে দুটি ইংলিশ স্কুল স্থাপন করেন। এরমধ্যে পদমদিতে ১৮৫০ এর মাঝামাঝি প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি রাজবাড়ি জেলায় স্থাপিত প্রথম মাইনর ইংলিশ স্কুল।

ঊনিশ শতকের শেষে প্রথম মুসলিম সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেনের বিষাদ সিন্ধু প্রকাশ পায়। গ্রন্থখানার মর্মবাণী মুসলমানদের হৃদয় মথিত করে। রাজবাড়ি শিক্ষিত পরিবারে গ্রন্থটির পাঠ গঠন চলতে থাকে। ইমাম হোসেন এর বিয়োগান্তক অংশটি দল বেঁধে আসা শ্রোতার চোখে অশ্রু ঝরায়। নিরক্ষর গ্রাম্য চাষীরা ইসলামের গৌরব অনুভব করে। এসব তাদের স্বাজাত্য বোধে উদ্ধুদ্ধ করে। এছাড়া তিনি লেখেন মুসলমানদের বাঙ্গালা শিক্ষা-প্রথম ভাগ, এসলামের জয়, জমিদার দর্পণ, কুলসুম জীবনী ইত্যাদি। এসব গ্রন্থ পাঠে অত্র অঞ্চলের মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার অনুরাগ বৃদ্ধি করে। বিশেষ করে মোসলমানদের বাঙ্গালা শিক্ষা গ্রন্থখানি বাংলা ভাষা শিক্ষা এবং ইসলামী মূল্যবোধের প্রসার ঘটায়। মীর মশাররফ হোসেনের সমসাময়ীক কালে পাংশায় রওশন আলী চৌধুরী ‘কোহিনুর’ পত্রিকা প্রকাশ করেন ( ১৮৯৮)। তৎকালীন সময়ের অতি আলোচিত এই পত্রিকায় মুসলিম জাগরণের পুরোধা পুরুষ  কবি কায়কোবাদ, কবি মোজাম্মেল হক, শেখ ফজলুল করিম, মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, এয়াকুব আলী চৌধুরী প্রমুখ। অত্র অঞ্চলের মুসলমান জাগরণ, সংগ্রাম ও সচেতনাত বৃদ্ধিতে পত্রিকাটি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে।

ঊনিশ শতকের শেষে রাজবাড়িতে প্রথম গ্রাজুয়েট আলীমুজ্জামান চৌধুরী। তিনি ছিলেন অত্র এলাকার সমাজসেবক ও প্রজাহিতৈষী জমিদার। ফরিদপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান।তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলমান সমাজ অগ্রগামী হয়।

বিশ শতকের শুরু থেকে বৃটিশ শাসনের অবসানকাল পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত বছরে রাজবাড়ির মুসলমান সমাজ শিক্ষা-দীক্ষাসহ সামাজিক ও আর্থিক ভিত সুদৃঢ় করে তোলে। এ সময়ের কিছু পূর্ব থেকে অত্র এলাকার প্রথম ইংরেজি উচ্চ বিদ্যালয় রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশন এবং এর ৪ বছর পর ১৮৯২ সালে গোয়ালন্দ মডেল হাই স্কুল (বর্তমান সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয়) স্থাপিত হওয়ায় গরিব মুসলমান সম্প্রদায় শিক্ষিত হয়ে উঠতে থাকে। স্থানীয় জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতা এবং স্থানীয় হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়ের উৎসাহে খানখানাপুর সুরুজমোহনী হাই স্কুল, বালিয়াকান্দি হাই স্কুল, পাংশা জর্জ হাইস্কুল, নলিয়া জামালপুর হাইস্কুল, গোয়ালন্দ নাজির উদ্দিন হাই স্কুল, বেলগাছি আলীমুজ্জাম হাই স্কুল, হাবাসপুর হাই স্কুলসহ অনেক উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। মুসলমান ছাত্রদের মধ্যে মৌলবী তমিজ উদ্দিন খান, এয়াকুব আলী চৌধুরী, কাজী মোতাহার হোসনে, কাজী আব্দুল ওদুদ, খোন্দকার নাজির উদ্দিন আহমেদ (খাতক পত্রিকার সম্পাদক) ডা. কেএস আলম,  ব্যারিস্টার শেলী, প্রিন্সিপ্যাল কেতাব উদ্দিন আহম্মেদ, আহমদ আলী মৃধা, ফখর উদ্দিন আহমেদ, কাজী আবুল কাশেম, কাজী আব্দুল মাজেদ, ডা. একে এম আসজাদ, ইউসুফ হোসেন চৌধুরী, এবিএম নুরুল ইসলাম, অধ্যাপক আব্দুল গফুর, এ্যাডভেকেট আব্দুল জলিল, এ্যাডভোকেট আবুল কাশেশ মৃধা, খলিল উদ্দিন জজ সাহেব, তোফাজ্জেল হোসেন জজ সাহেব প্রমুখ উচ্চ শিক্ষিত মুসলমান ছাত্র অঞ্চলভিত্তিক ও জাতীয় উন্নয়নে স্ব-স্ব ভূমিকা রাখেন।

১৯৪৭ সালে বৃটিশ শাসনের অবসানে পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে। ভারতের সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলমান এলাকা নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়। এ সময় পূর্ব-পাকিস্তানের অন্যান্য এলাকার মতো জমিদার শ্রেণিসহ অনেক হিন্দু পরিবার স্থায়ীভাবে রাজবাড়ি ত্যাগ করে। অন্যদিকে ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ মোহাজের ও অবাঙালি বিহারী মুসলমানের অভিবাসন ঘটে। তার স্থায়ীভাবে রাজবাড়ি শহর ও পল্লী এলাকায় স্থায়ী বসতি গড়ে তোলে। ১৯৬০ এর দশকের শুরুতে নোয়াখালি ও কুমিল্লা থেকে অনেক মুসলমান পরিবার রাজবাড়ির বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে বাণীবহ, বহরপুর, রামদিয়া, সোনাপুর বসতি স্থাপন করে। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর ভারত থেকে অনেক মোহাজের মুসলমান রাজবাড়ি বিসিক এলাকায় বসতি গড়ে তোলে। কালপ্রবাহে স্বাধীন দেশের রাজবাড়ির মুসলমান অসাম্প্রাদায়িক চেতনায় শিক্ষিত ও মর্যাদাশীল সম্প্রদায় হিসেবে বিবেচিত।

প্রাচীন জনপদ

প্রাচীন জনপদ

প্রাচীন রাষ্ট্রযন্ত্রের বিন্যাসে ভূক্তি, বিষয়, মন্ডল, বীথি ও গ্রামের উল্লেখ আছে। এ ক্ষেত্রে রাষ্টীয় বিভাগের নাম ভুক্তি যা কয়েকটি বিষয় নিয়ে গঠিত হত। বিষয় গঠিত হত কয়েকটি মন্ডল নিয়ে এবং মন্ডল গঠিত হত কয়েকটি বীথি আর বীথি গঠিত হত কয়েকটি গ্রাম নিয়ে। এতে বোঝা যায় বিষয়ের আয়তন প্রদেশ প্রায় এভং মন্ডল জেলা প্রায়। নবম দশম শতকে এ অঞ্চলটি স্মাতট পদ্মাবতী বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল যার স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে কেশব সেনের ইদিলপুর লিপি বা পট্রলীতে। দশম শতকের শেষে চন্দ্র বংশীয় রাজারা বিক্রমপুর, চন্দ্রদ্বীপ, হরিকেল অর্থাৎ পূর্ব দক্ষিণ অংশ জুড়ে রাজত্ব করতেন। এই বংশের মহারাজাধিরাজ শ্রীচন্দ্র তার ইদিলপুর লিপি (বর্তমানে শরীয়তপুর) দ্বারা স্মতট পদ্মাবতী বিষেয়ের অন্তর্গত কুমার তালক মন্ডলে জনৈক ব্রাহ্মণকে একখন্ড ভূমি দান করেন। তৎকালীন সময়ে ব্রাহ্মণকে পুনর্বাসনের জন্য ভূমিদান করা হত। স্মতট পদ্মাবতী বিষয় পদ্মানদীর দুই তীরবর্তী প্রদেশকে বোঝায় তাতে সন্দেহ নেই। এ থেকে বোঝা যায় এ অঞ্চল তখন পদ্মাবতী বিষয়ের অন্তর্গত ছিল। কুমার তালক মন্ডলের উল্লেখ আরো লক্ষণীয়। ‘কুমার তালক এবং বর্তমান গড়াই নদীর অদূরে কুষ্টিয়ার অন্তর্গত কুমারখালি দুই-ই কুমার নদীর ইঙ্গিত বহন করে। বর্তমান কুমার বা কুমারখালি পদ্মা উৎসারিত মাথা ভাঙ্গা নদী থেকে বের হয়ে বর্তমানে গড়াইয়ের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।

মূলতঃ মাথাভাঙ্গা নদীয়া জেলার উত্তরে জলাঙ্গীর উৎপত্তির প্রায় ১০ মাইল পূর্ব দিকে পদ্মা হতে বের হয়ে আলমডাঙ্গা স্টেশনের প্রায় ৫ মাইল পশ্চিমে এসে দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে। কুমার নামে শাখাটি পূর্বমুখে গিয়ে আলমডাঙ্গা স্টেশনের কিছুটা উত্তরে রেল লাইনের নিচে দিয়ে নদীয়া, যশোর ও খুলনা জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। কুমারের পূর্বগামী আর একটি শাখা শৈলকুপা, শ্রীপুর, মাগুরা হয়ে গড়াইয়ে মিলেছে।

 

কুমার আবার মধুখালির পাঁচমোহনী হয়ে বর্তমান ফরিদপুরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত। অনেক সময় গড়াই ও কুমারকে অভিন্ন মনে করা হয়েছে। কুমার প্রাচীন নদী এবং এর প্রবাহ ব্যাপক। অনুমান করা যায় ফরিদপুরের পশ্চিমাঞ্চল, যশোরের উত্তরাঞ্চল এবং কুষ্টিয়া স্মতট পদ্মাবতী বিষয়। সেই হিসেবে রাজবাড়ি স্মাতট পদ্মাবতী বিষয়ের অন্তর্গত। অন্যদিকে কুমার তালক বা কুমারের তল বা নিম্নভূমি নিয়ে পদ্মাবতীর যে মন্ডল তা কুমার তালক মন্ডল। সেই হিসেবে গড়াই আর কুমার যদি অভিন্ন হয় তাহলে অবশ্যই বর্তমান রাজবাড়ি কুমার তালক মন্ডল ছিল। কুমার তালক মন্ডলের সীমানা নির্ধারণ দুরুহ। ইতিপূর্বে কুমারখালির কথা বলা হয়েছে। প্রতীয়মান হয় কুমার থেকেই কুমারখালি এসেছে এবং গড়াইকে একসময় কুমার বলা হতো। গড়াই এর আলোচনা থেকে বলা যায় গড়াইয়ের উৎস মুখ কখনো খনন করা হয়ে থাকবে বলে উৎস মুখে তা গৌড়ী এবং খননের পরে তা হয়েছে গড়াই। এ হিসেবে রাজবাড়ির বেশির ভাগ অঞ্চল বিশেষ করে পূর্বাংশে সামান্য বাদ দিয়ে এটা কুমার তালক মন্ডল আর বিষয় হিসেবে স্মতট পদ্মাবতী। *নিবন্ধটি নীহাররঞ্জন রায়ের বাঙালির আদি ইতিহাস প্রথম খন্ডের অনুসরণে লেখা। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দে দিগ্বিজয়ী বীর আলেকজান্ডার এর ইতিহাস পর্যালোচনায় অত্র অঞ্চলে গঙ্গারিডি জাতি বলে এক পরাক্রমশালী জাতির উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে গ্রীক লেখকগণের বর্ণনায় তা আরো স্পষ্ট হয়।

দিওদোরসের লেখনীতে গঙ্গারিডি জাতির বিপুল সেনাবাহিনী ও ৬ হাজার রণহস্তীর উল্লেখ আছে। খ্রিস্টীয় ১ম ও ২য় শতকে পেরিপ্লাস গ্রন্থে টলেমীর বিবরণ হতে জানা যায় এই সময়ে স্বাধীন গঙ্গারিডি রাষ্ট্র বেশ প্রবল ছিল। গঙ্গা রাষ্ট্রের বাইরে সমসাময়িক বাংলায় আর যে সব রাজা ও রাষ্ট্র বিদ্যমান ছিল তাদের সঙ্গে গঙ্গার রাষ্ট্রের কি সম্বন্ধ তা জানার উপায় নাই। তবে মহাভারত ও সিংহলী পুরানের কাহিনী থেকে কিছু সংবাদ পাওয়া যায়। রাষ্ট্র বিন্যাসের একটি আভাস পাওয়া যায় খ্রিস্টীয় ২য় শতকে মহাস্থানের শিলাখন্ড লিপিটি থেকে। মৌর্য আমলে উত্তরবঙ্গ মৌর্য শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। উত্তরবঙ্গে মৌর্যশাসনের কেন্দ্র ছিল নুডনগল বা পুন্ড্রনগর বর্তমান বগুড়া জেলার ৫ মাইল দুরে। মহাস্থান গড়ে। টলেমির বর্ণনায় দেখা যায় গঙ্গারিডি রাষ্ট্রের রাজধানী ছিল গঙ্গাবন্দর। এই গঙ্গা বন্দরের অবস্থিতি ছিল তাম্রলিপ্তি বন্দরের আরো দক্ষিণপূর্বে ক্যামবেরীখন নদী (Kamberikhon) বা কুমার নদীর মোহনায়। কুমার নদীর তল ধরেই কুমার তালক মন্ডল। গঙ্গা বন্দরে অতি সূক্ষ্ণ কার্পাস বস্ত্র উৎপন্ন হত এবং নিকটে কোথাও সোনার খনি ছিল বলে নীহাররঞ্জনের উদ্ধৃতিতে পাওয়া যায়। পেরিপ্লাস গ্রন্থে নিম্নগাঙ্গেয় ভূমিতে ক্যালটিস নামক এক প্রকার সুবর্ণ মুদ্রার ব্যবহারের উল্লেখ রয়েছে। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া অঞ্চলে প্রাপ্ত ৬ষ্ঠ শতকের একটি লিপিতে সুবর্ণ বীথির উল্লেখ আছে। ঢাকা জেলার নারায়ণগঞ্জের সুবর্ণগ্রাম, মুন্সিগঞ্জের সোনারঙ্গ, রাজবাড়ির সোনাপুর, সোনাকান্দা বাংলার পশ্চিম প্রান্তে সুবর্ণরেখা নদী একথা স্মরণ করে দেয়। রাজবাড়ি অঞ্চলে সোনার টাকা ভরা গুপ্ত ধনের গল্প কাহিনী প্রচলিত আছে। সোনাপুর রাজবাড়ির গ্রাম হিসেবে অতি পুরাতন। সোনাপুর এটা ইঙ্গিতবহ হতে পারে। নলিয়া, আড়কান্দি, বহরপুর, বালিয়াকান্দি, অত্র অঞ্চলের সর্বাপেক্ষা উঁচু ভুমি। এর উত্থান এবং প্রাচীন বসতি অনেক পূর্ব থেকে। অত্র অঞ্চল সন্ধান করলে গুপ্তধন না হোক খনিজ সম্পদ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গঙ্গা নদী প্রাচীনকালে কুমার তালক মন্ডলে। এর মোহনা থাকা স্বাভাবিক। সে মোহনায় গঙ্গা বন্দর প্রাচীন কুমার তালক মন্ডল হতে পারে। রাজবাড়ি কুমার তালক মন্ডলের বীথি হতে পারে। এ সবই প্রাচীন গঙ্গা রাষ্ট্রের অঙ্গ বা এলাকা হতে পারে।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড ঢাকা কর্তৃক ষষ্ঠ শ্রেণী সমাজ বিজ্ঞান পাঠ্যপুস্তকে প্রাচীন যুগে বাংলাদেশ পরিচ্ছেদ পৃষ্ঠা-৩৬ এ যে প্রাচীন বাংলার মানচিত্র সন্নিবেশিত হয়েছে তাতে গঙ্গারিডি রাষ্ট্রের অবস্থান বর্তমান রাজবাড়ি, ফরিদপুর, যশোর দেখা যায় মানচিত্রটি সন্নিবেশিত হল।

 

রাজবাড়ি জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য /প্রফেসর মতিয়র রহমান

প্রাচীন জনপ্রবাহ, জনপদ ও শাসন

প্রাচীন জনপ্রবাহ, জনপদ ও শাসন (প্রথম খণ্ড)

রাজবাড়ি অঞ্চলে কবে? কখন থেকে? কোথায় প্রথম জনবসতি গড়ে উঠেছে তা নির্ণয় করা অসম্ভব। তবে বঙ্গে জনপ্রবাহের আলোকে রাজবাড়িতে জন প্রবাহের ঐতিহাসিক পর্যালোচনা সম্ভব। বর্তমানে রাজবাড়িতে ১০ লক্ষাধিক লোকের বাস। এই জনপ্রবাহের পূর্বপুরুষরা কখনো এ অঞ্চলে বসবাস শুরু করে থাকেন। মানুষের ইতিহাস বহু বছর পর্যন্ত প্রাঙনরের (Hominids) ইতিহাস। চীন, জাভায়, টাঙ্গানিকায়, পূর্ব জার্মানীতে এদের কয়েকটি নানাবিধ চিহ্ন পাওয়া গেলেও বাংলায় এর কোনো সন্ধান পাওয়া যায় নাই।প্রাচীন প্রস্তাব থেকে নব্য প্রস্তর তা থেকে ক্রমে ব্রঞ্জ ও ইস্পাতের যুগ এসেছে। এর অতিক্রমণ কাল প্রায় ২ লাখ বছর। ভারতে প্রাচীন বা নব্য প্রস্তর যুগের তেমন নির্দশন পাওয়া যায় না। তবে বর্ধমান জেলার অজয় নদীর তীরে ১৯৬৩-৬৪ সালে পাণ্ড্রু রাজার ঢিবি আবিষ্কৃত হয়। যেখানে নব্য প্রস্তর যুগের সন্ধান মেলে। এ সভ্যতা খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দের তাম্র সভ্যতার যুগ। বাংলার বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের শারীরিক গঠন বিশ্লেষণ করে পণ্ডিতগণ বাংলায় যে সমস্ত জাতিকে বর্তমান বাঙালিদের পূর্বপুরুষ বলে মনে করেন তারা নিগ্রোবটু, আদি অষ্ট্রালয়েড, আদি নরডিক, আদি ভোটচীন, গোষ্ঠীর মানুষ। নিম্নবর্ণের বাঙালি এবং আদিম অধিবাসি যাদের মধ্যে জনের প্রভাব বেশি নৃতত্ত্ববিদগণ তাদের আদি অষ্ট্রালয়েড বলে নামকরণ করেছেন। পণ্ডিতগণ মনে করেন এই জন এক সময় মধ্যভারত হতে আরম্ভ করে দক্ষিণ ভারত ও সিংহল হয়ে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এ ছাড়া আলপেনীয় নিগ্রোবটু, ভোটচীন, দ্রাবিড় গোষ্ঠীর মানুষও প্রাচীন বাংলার আদিবাসী। আদিমতম স্তরে আদি অস্ট্রেলিয় তারপর দীর্ঘমুন্ডু ভূমধ্য নরগোষ্ঠী, গোলমুন্ড আলপেনীয়, দীনারীয় নরগোষ্ঠী এবং সর্বশেষ উত্তর ভারতের আদি নরডিক বা আর্যজাতীর ধারায় মিলনে গাঙ্গেয় প্রদেশের এই বাংলায় খ্রিস্টাপূর্ব ৭ম ও ৬ষ্ঠ থেকে ধর্ম, সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রবাহ প্রবাহিত হতে থাকে। খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ শতক থেকে ভারতে আর্য আগমন ঘটলেও আদি অস্ট্রেলিয়, নিগ্রোবটু, দ্রাবিড় গোষ্ঠীর কৌম সমাজের মানুষেরা বসবাস করত এরও পূর্বে।

 

প্রাচীন বাংলার জনপ্রবাহের তেমন কোনো নিদর্শন নাই। তবে জনপ্রবাহের কিন্তু সংবাদ পাওয়া যায় বেদপুরাণ, মহাভারত গ্রন্থ, আলেকজেন্ডার, টলোমির বর্ণনা এবং বিভিন্ন লিপি ও পট্টলী সংবাদ থেকে। ঐতরিয় আরণ্যক গ্রন্থে সর্বপ্রথম বঙ্গের উল্লেখ পাওয়া যায়। বোধায়ন ধর্মসূত্রে বঙ্গের স্পষ্ট উল্লেখ আছে। পুরানে দেশসমূহের তালিকায় অঙ্গ, বিদেহ, পুণ্ড্র ইত্যাদির সঙ্গে বঙ্গ যোগ করা হয়েছে। মহাভারতেও বঙ্গের উল্লেখ আছে। বঙ্গ কথাটি অনেকের মতে বঙ্গা থেকে এসেছে। বঙ্গাকৌম অর্থে বঙ্গাজনা। এভাবে  বঙ্গা, রাঢ়া,গৌড়া অর্থাৎ বঙ্গজনা, রাঢ়াজনা, গৌড়াজনা। উপরোক্ত সূত্রগুলিতে বঙ্গের উল্লেখ পাওয়া গেলেও এর ভৌগোলিক অবস্থান সম্বন্ধে কোনো সম্যক ধারণা পাওয়া যায় না। মহাভারতে বেশ কয়েকটি রাজ্যের বা ভূভাগের নাম দেওয়া আছে তা থেকে মনে হয় বঙ্গ একটি পুর্বাঞ্চলীয় দেশ যার অবস্থিতি ছিল অঙ্গ, সুম্ম, তাম্রলিপ্তি, মগধ এবং পুণ্ড্রের কাছাকাছি। কালিদাসের রঘুবংশে রঘুর ‍দিগ্বিজয়ের কথায় গঙ্গাস্রোত হন্তারেষু। তার ব্যাখ্যায় সকলে স্বীকার করেন যে, এর অর্থ গঙ্গাস্রোত অন্তর্বতী ভূভাগ অর্থাৎ ভাগীরথীর পূর্বে এবং পদ্মার দক্ষিণে ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, নদিয়া অঞ্চল নিয়েই প্রাচীন বঙ্গ। আলেকজেন্ডার ও ‍খ্রিস্টীয় প্রথম/দ্বিতিয় শতকে টলেমির বর্ণনায় যে গঙ্গারিডি জতি ও রাষ্ট্রের উল্লেখ পাওয়া যায় তা এই গঙ্গাতীরবর্তী অঞ্চলকেই বোঝায়। এ জাতির ছিল ৬ হাজার রণহস্তী এবং জাতিটি ছিল পরাক্রমশালী। বিভিন্ন লিপি, পট্টলী প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার ও ঐতিহাসিক যুক্তি প্রমাণে বারক মণ্ডল, কুমার তালক মণ্ডল ও নব্য কাশিকার সভ্যতার স্পষ্ট প্রমাণাদি পঞ্চম শতক থেকে আরম্ভ হয়েছে। ঢাকার আশ্রাফপুর, শরিয়তপুরের ইদিলপুর, নব্যকাশিকা বা কোটালীপাড়া, বারক মণ্ডল, পদ্মা স্মতট কুমার তালক মণুলে জনপ্রবাহের সৃষ্টি হয়েছিল। ঐতিহাসিকদের মতে ভারতে আর্যীকরণ আরম্ভ হয় খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ থেকে। আর্যীকরণের প্রক্রিয়ায় অষ্ট্রোলয়েড, দ্রাবিড়, নিগ্রোবটু আদিম গোষ্ঠীর মানুষ ধীরে ধীরে নব উত্থিত বঙ্গের দিকে সরে আসে এবং ইতর জীবন যাপন করে। এরা বিভিন্ন কৌমভুক্ত জাতি। মহাভারতে বাংলার বিভিন্ন কৌমভুক্ত জাতিকে মেলেচ্ছ বলা হয়েছে। আর্যবহিনর্ভূত প্রান্তসীমায় বৌদ্ধ আর্যমুঞ্জুলিকা গ্রন্থে গৌড়,সমতট ও হরিকেলের ভাষাকে অসুর ভাষা বলা হয়েছে। আর্যরা এদের দস্যু, পাপ, মেলেচ্ছ প্রভৃতি উন্নাষিকতায় চিহ্নিত করেছে। প্রাচীন বাংলায় এ অঞ্চলে আদি অষ্ট্রোলয়েড, দ্রাবিড় গোষ্ঠীর বসবাস ‍খ্রিস্টপূর্ব থেকে শুরু হতে পারে। পুণ্ড্রের উত্থান অপেক্ষাকৃত বঙ্গের সমতটীয় অঞ্চলের অনেক পূর্বে হওয়ায় তাদের আগমন ঐ অঞ্চলে পূর্বে শুরু হয়। রাজবাড়ী অঞ্চল সমতটীয় অঞ্চল হলেও ভৌগোলিক কারণেই এর উত্থান দক্ষিণাঞ্চলের পূর্বে। যে কারণে এ অঞ্চলে প্রাচীন গোষ্ঠীর কৌম সমাজের বিস্তর ঘটতে পারে। আর্যীকরণের পর বর্ণভেদের উদ্ভব হয় আর বর্ণাশ্রমের বাইরে তৎকালীন কৌম সমাজের মানুষের পরিচয় হয় চণ্ডাল, চাঁড়াল, বাউরি, ঘট্রজীবী, ঢোলবাহি, মালো, হাড্ডি, বাগদি। প্রাচীন নিগ্রোবটু ও অষ্ট্রিকজাতির সমকালে কিছু দ্রাবিড় জাতির আগমন ঘটে এবং সভ্যতার উন্নত বলে অষ্ট্রিকজাতিকে গ্রাস করে। রাজবাড়ি জেলার দক্ষিণ বালিয়াকান্দি থানার জঙ্গল ইউনিয়নে অধিবাসীদের প্রায় ৯৮% শূদ্র পর্যায়ের। এদের শরীরের রং তামাটে পীতবর্ণ। আচার আচরণে হিন্দুদের অন্যান্য বর্ণ থেকে আলাদা। এদের মুখমণ্ডল প্রশস্ত হলেও ভালোভাবে লক্ষ্য করলে দেখ যাবে নাক কিছুটা দাবা। রাজবাড়ির সার্বিক জনপ্রবাহে প্রশ্ন আসে তাদের সংখ্যা এখানে এত বেশি কেন? অনেকের ধারনা পালশাসনের সময়ে কৈবর্ত বিদ্রোহে যে বিপুল সংখ্যক কৈবর্ত এ অঞ্চলে আগমন ঘটে এরা তাদেরই একটি অংশ। এরা প্রকৃতপক্ষে প্রাচীন নিগ্রোবটু ও দ্রাবিড় গোষ্ঠীর লোক। সোনাপুর, বহরপুর, বালিয়াকান্দি, সোনাইকুড়ী, আড়াকান্দি, বাগদুল অঞ্চলের শুদ্রদের থেকে এরা আলাদা। রাজবাড়ি জেলার কালুখালির উত্তরে বর্তমানে পদ্মার পাড় এলাকায় প্রকীর্থ বলে একটি গ্রাম আছে। উক্ত গ্রামে ২০/২৫টি প্রাচীন জাতিগোষ্ঠীর লোক বাস করে। এদের চেহারা সম্পূর্ণ পীতবর্ণ এবং আচরণ সাঁওতাল জাতীয়। ধারণা করা যায় এরা আদি অষ্ট্রিক গোষ্ঠির লোক।

 

দ্রাবিড় গোষ্ঠীর ভাষা বিশ্লেষণে দেখা যায় এদের মধ্যে পুর, উর, দিয়া, দির ব্যবহার ছিল। পুর, পুরপাল বা নগরপাল। যে সমস্ত গ্রামের শেষে পুর রয়েছে তা অপেক্ষাকৃত পুরাতন জনের বাসস্থান। রাজবাড়ির পুর দিয়ে গ্রাম বিনেদপুর, ভবানীপুর, গঙ্গাপ্রসাদপুর, সজ্জনকান্দা, বেড়াডাঙ্গা থেকে বেশি পুরাতন। রাজবাড়ি জেলার সোনাপুর, বহপুর, চন্ডিপুর, মধুপুর, ‍নিশ্চিন্তপুর, তারাপুর, মদাপুর কালিকাপুর এরুপ অসংখ্যা পুরের গ্রাম। এ পুরের বেশির ভাগ গ্রামই অনেক পুরাতন। ধারণা করা যায় এক সময় এ অঞ্চলে প্রাচীন দ্রাবিড় গোষ্ঠীর ব্যবহৃত পুর থেকে এত পুরের ব্যবহার এসেছে। তা ছাড়া পদমদি, রতনদিয়া দি, দিয়া দ্রাবিড় ব্যবহৃত শব্দ। রাজবাড়ি জেলার পশ্চিমে বাগদিপাড়া ছিল। এ ছাড়া জেলার অন্যান্য স্থানে বাগদি, ডোলবহী, মুচি, চণ্ডাল, চাড়ালের আধিক্য রয়েছে। প্রকৃত অর্থই এরা আদি কোমজনের উত্তরসূরী এবং আদি গোষ্ঠীর জন। রাজবাড়ি অঞ্চলে কৌম কথাটি বহুল প্রচলিত। প্রাচীন কৌম জানা বা বিভিন্ন কৌমভুক্ত মানুষের প্রাচীন ব্যবহৃত এ কথাটি এ অঞ্চলের মানুষের পরিচয় বহন করে। বিভিন্ন লিপি ও পট্টলী থেকে পাওয়া সংবাদ এ অঞ্চলে সপ্তম, অষ্টম শতকের জনপ্রবাহের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

 

প্রাচীনকালে ভূমি ব্যবস্থা সম্পর্কিত যেসব পট্টলী বংলায় পাওয়া গেছে ঐগুলির দু’একটি কোথাও রাজবাড়ি জেলার জনসংবাদ পাওয়া যেতে পারে। খ্রিস্টোত্তর পঞ্চম হতে অষ্টম শতক পর্যন্ত পট্টলীগুলি ভূমিদান বিক্রয়রীতির বিষয়। এরমধ্যে পাহাড়পুর পট্টলী, আশ্রাফপুর পট্টলী, ইদিলপুর পট্টলী, ধনাইদহ পট্টলী, দামোদর পট্টলী, বিক্রমপুর পট্টলী, নব্যকাশিকা পট্টলী, ব্রাক্ষণকে বা দেবতার উদ্দেশ্যে ভূমিদানরীতি তাম্র পাট্টাস বা ফলকে লেখা। ভূমিদানের বিষয়ে অত্র অঞ্চলে পট্টলী চালু ছিল তা বোঝা যায় এসব পট্টলীতে ব্যবহৃত ভূমির মাপ, প্রকারভেদ, ভূমির মূল্য নিরুপন থেকে। ভূমির পরিমাপ ব্যবহারের ক্ষেত্রে নল ব্যবহার হত। নল আজও রাজবাড়ি ফরিদপুর অঞ্চলে ব্যবহার হয়। বাস্ত্তভিটায় এবং কর্ষণযোগ্য ভূমি নাল, খিল এখনো ব্যবহার হয়। এ ছাড়া জোলা, জোলক, তালক, পাঠক, খাল, বিল এখনো এ অঞ্চলে প্রচুর ব্যবহৃত দ্রাবিড় শব্দ। নীহাররঞ্জন এর কথায় – ‘পদ্মার খাঁড়িতে ফরিদপুর অঞ্চল হইতে অরম্ভ করিয়া ভাগীরথীর তীরে ডায়মন্ড হারবারের সগর সঙ্গম পর্যন্ত বাকেরগঞ্জ, ফরিদপুর, খুলনা, বরিশাল, চব্বিশ পরগনার নিম্নভূমি ঐতিহাসিক কালে কখনো সমৃদ্ধ জনপদ, কখন গভীর অরণ্য, কখনো নদীরগর্ভ বিলীন আবার কখনো খাঁড়ি খাঁড়িকা অন্তর্নিহিত হইয়া নতুন স্থল ভূমির সৃষ্টি। ফরিদপুর জেলার কোটালীপাড়া অঞ্চল ষষ্ঠ শতকের তাম্র পট্টলীতে নব্যকাশিকা বলিয়া অভিহিত হইয়াছে। ষষ্ঠ শতকে নব্যকাশিকা (কোটালীপাড়া) সমৃদ্ধ জনপদ এবং এ অঞ্চলে নৌবাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র। কোটালীপাড়া সমুদ্রতটায় আর এ অঞ্চলকে সমতটীয় অঞ্চল বলা হইয়াছে। ইউয়াং চোয়াং সপ্তম শতকে সমতটে এসেছিলেন। তার বর্ণনায় সমতট সমুদ্র তীরবর্তী দেশ। ইউয়াং চোয়াং এর সমতট বর্তমানে রাজবাড়ি, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মাগুরা, যশোর ও খুলনার পূর্ব অঞ্চল। সমতটের দক্ষিণ অঞ্চল থেকে রাজবাড়ি সাগর থেকে অনেক উত্তরে গঙ্গার মুখে থাকায় এ অঞ্চল দ্বীপ বা ভূ-উত্থান অপেক্ষাকৃত প্রাচীন যাকে পুরাতন সমতটীয় অঞ্চল বলা যেতে পারে। এ পুরাতন সমতটীয় অঞ্চলে প্রাচীন গোষ্ঠীর মানুষের বসবাস শুরু হয়ে থাকবে যা নবম দশম শতক পূর্ণরুপ গ্রহণ করেছে।

বেশিরভাগ গ্রামের সাথে পুর পরিচিতি

বেশিরভাগ গ্রামের নামের সাথে পুর পরিচিতি

পূর্বে বলা হয়েছে পুর শব্দের অর্থ জননিবেশ। পুর পরিচয়ে বেশিরভাগ গ্রাম অপেক্ষাকৃত পুরাতন বসতির গ্রাম। জেলার এসব গ্রাম খ্রিস্টীয় ২/৩য় শতক থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যে গড়ে উঠেছে বলে ধারণা করা হয়।

রাজবাড়ি সদর

বিনোদপুর, চককেষ্টপুর, গঙ্গপ্রসেদপুর, ভবানীপুর, ইন্দ্রনারায়ণপুর, কালীচরণপুর, কল্যাণপুর, শিবরামপুর, রাধাকান্তপুর, বসন্তপুর, লক্ষ্মীপুর, রাজাপুর, চাঁদপুর, কৃষ্ণপুর, রামচন্দ্রপুর, জয়রামপুর, উদয়পুর, কমলাপুর, খানখানাপুর, দর্পনারায়ণপুর, গৌরীপুর, মধুপুর, রুপপুর, রামপুর, রামকান্তপুর, বাসুদেবপুর, মহাদেবপুর, গোপালপুর, ভবানীপুর, জগৎপুর, রাজেন্দ্রপুর, আহলাদীপুর, আলীপুর, বারবাকপুর, রঘুনাথপুর, মোহাম্মদপুর, নিজাতপুর, কাসিমপুর, সুলতানপুর, নুরপুর, ইত্যাদি।

 

পাংশা উপজেলা

নারায়ণপুর, বলরামপুর, গোপীনাথপুর, জয়কৃষ্ণপুর, কল্যাণপুর, কেশবপুর, রঘুনাথপুর, রামচন্দ্রপুর, শ্রীকৃষ্ণপুর, তারাপুর, গৌরীপুর, তেজপুর, কোমরপুর, শ্যামসুন্দরপুর, ব্রক্ষাপুর, কাষ্ণনপুর, মনিরামপুর, নিভাকৃষ্ণপুর, শ্যামপুর, কাশিমপুর, চাঁদপুর, গতমপুর, বাঘাবিষ্ণুপুর, গোপালপুর, রঘুনাথপুর, নিশ্চিন্তপুর, তির্তীপুর, লক্ষ্মীপুর, রায়পুর, শিবসুন্দরপুর, বাহাদুরপুর, বকশিপুর, শাহমতিপুর, জফরপুর, নিয়ামতপুর, ইত্যাদি।

 

বালিয়াকান্দি উপজেলা

নিশ্চিন্তপুর, আজীনারায়ণপুর, রায়পুর, শ্যামসুন্দরপুর, সোনাপুর, করমচাঁদপুর, নারানপুর, রাজধরপুর, দুর্গাপুর, বহরপুর, নবাবপুর, গোবিন্দপুর, জামালপুর, শাশাপুর, গঙ্গারামপুর, সদাশিবপুর, ত্রিলোচনপুর ইত্যাদি।

 

গোয়ালন্দ উপজেলা

বিষ্ণুপুর, গোপীনাথপুর, দুর্গাপুর, লক্ষ্মীমানপুর, জয়পুর, শ্যামপুর, শীতলপুর, দেবীপুর, সাইদুরপুর, কাজিমপুর, ইত্যাদি।

 

পার্শ্ববতী জেলাসমূহ বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের জেলাসমূহ থেকে রাজবাড়ি জেলার গ্রামসমূহের নামের পরিচয়ে পুরের আধিক্য রয়েছে। আবার এসব গ্রামগুলোর নাম মানুষের নামে এবং তাদের ধর্মীয় পরিচয় হিন্দু। এলাকাটি প্রাচীনকাল থেকেই হিন্দু প্রধান হওয়ায় মোগল শাসনের পূর্ব কালেই ঐ গ্রামের ভিত্তি গড়ে ওঠে। তুলনামূলক মুসলমান পরিচয়ে পুরের গ্রাম কম হওয়ায় ধারণা করা যায় ঐ সকল গ্রামের ভিত্তি গড়ে উঠেছে সপ্তদশ অষ্টদশ শতাব্দীতে।

 

দি, দিয়া, রিয়া, বাড়িয়া-সহ গ্রামের নাম ও উৎপত্তি

ভবদিয়া, মধুরদিয়া, পাকুরিয়া, চৌবাড়িয়া, গোপীনাথদিয়া, জালদিয়া, নয়নদিয়া, আড়াবাড়িয়া, বাঘিয়া, দৌলতদিয়া, হামুরিয়া, কান্তাদিয়া, নয়নদিয়া, কুলটিয়া, গজারিয়া, আমবাড়িয়া, বোয়ালিয়া, মাসুমদিয়া, পাকাশিয়া ভেল্লাবাড়িয়া, পাঁচবাড়িয়া, নাদুরিয়া, ডামকদিয়া, সূর্যদিয়া, ভারকুদিয়া, কলকলিয়া, পিপুল বাড়িয়া, মুকুদিয়া, ঘরঘরিয়া, কুলটিয়া, পাটুরিয়া, বেড়াদি, পদমদি, তেঘারিয়া, আলোকদিয়া, ভেকুলিয়া, রামদিয়া, পদমদি, লক্ষণদিয়া, পাঁচবাড়িয়া, কোলাবাড়িয়া, খালিয়া, ভারকুলিয়া, গঙ্গাসিন্দদিয়া, ধুবুরিয়া, তেলিগাতি, কলকলিয়া, পাঁচুরিয়া, মধুরদিয়া, মাসুমদিয়া, মালিয়াট, আলোকদিয়া, হাড়োয়া, রতনদিয়া, আব্দুলিয়া, প্রেমাটিয়া, দেলুয়া, ইন্দুরদি, ভান্ডারিয়া, তেলাই, কান্তদিয়া, দৌলতদিয়া ইত্যাদি।

 

দ্বীপ ও নদী সংলগ্ন এলাকাকে  দি বা দিয়ারা বলা হয়। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর ফরিদপুর জেলার নদী সংলগ্ন এলাকায় নতুন ভূমি রাজস্ব আদায়ের আওতাভুক্ত করে রাজস্বের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়। ১৮৮১ সালে দিয়ারা সার্ভেতে মোট ২৮৭৮৮ একর জমি দিয়ারা হিসেবে খাজনার আওতায় আনয়ন করা হয়। এই দিয়ারা থেকে অনেক গ্রামের নামের পরিচিতি দিয়া বা দি এবং অপভ্রংশে রিয়া, লিয়া ইত্যাদি হয়। জেলার বেশির ভাগ অঞ্চল ভাগ নদীবেষ্টিত হওয়ায় নদী সংলগ্ন জেগে ওঠা ঐ সমস্ত চরদ্বীপের পরিচিতি হিসেবে ‘দি’ ব্যবহৃত হয়েছে। উল্লেখ্য দি, দিয়া, রিয়া, ইত্যাদি নামের গ্রামের উৎপত্তি ষোড়শ শপ্তদশ শতকে গড়ে ওঠে।

 

কান্দা, কান্দি দিয়ে গ্রামের নাম  

প্রবাহমান নদীর কিনার, বাঁক এবং বিল হওড়ের পার্শ্বস্থ এলাকাকে কান্দা, কান্দি, কিনার বলা হয়। জেলায় অনেক নদীর প্রবহমান ছিল। বিশেষ করে পদ্মা,হড়াই, গড়াই ও চন্দনার তীরবর্তী অঞলে যে সব জনপদ গড়ে ওঠে তা কান্দি নামে পরিচিত হয়। উড়াকান্দা, সোনাকান্দা, আড়কান্দি, বালিয়াকান্দি, তেরাইকান্দি, মালিকান্দা, শ্যামপুরকান্দা, লিকান্দা। কান্দা পরিচিতিমূলক শব্দ হলেও আড়, পাইক বালি অর্থ যেমন পাইক অর্থ পাখি, আড় অর্থ নদীর বাঁক, বালি অর্থ বেলে চর বোঝায়।

 

বাড়ি, বাড়িয়া, নগর, গ্রাম,পাড়া দিয়ে গ্রামের নাম ও উৎপত্তি

গ্রামের ভিত্তি গড়ে উঠলে তা বাড়ি, বাড়িয়া, গ্রাম, নগর এসব নামে পরিচিত হতে থাকে। টেংড়াপাড়া, আড়াপাড়া, গোয়াবাড়ি, বিষ্ণবাড়ি, পাঁচবাড়ি, চরকান্দবাড়ি, দক্ষিণবাড়ি, দক্ষিণবাঘাবাড়ি, পশ্চিমবাঘাবাড়ি, পাটকিয়াবাড়ি, আমবাড়িয়া, পাঁচবাড়িয়া, দেবনগর, কালিনগর, ভেল্লাবাড়িয়া, রায়নগর, বনগ্রাম, চৌবাড়িয়া, জাগিয়ালপাড়া, পিপুয়ালপাড়া, দেওবাড়ি, কোলানগর, ছায়েদপাড়া, হাজারাপাড়া ইত্যাদি।

 

খাল,খালিয়া, কালিয়া,কোলা দিয়া গ্রাম

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। যত নদী এখন আছে তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি নদী ছিল ৫০০ বা একহাজার বছর পূর্বে। নদীর বিশেষত্ব এমন যে, দীর্ঘকালে নদী ভরাট হয়ে মরে যায়। অনেক ক্ষেত্রে মরা নদী দীর্ঘকালে খালে পরিণত হয়। নদীতে অনেক সময় প্রয়োজনে খাল কাটতে হয়। নদী বাঁক গ্রহন করলে কোলে পরিণত হয়। খাল সংলগ্ন অনেক গ্রামের নাম খাল, খালিয়া কোলের পাশের গ্রাম কো বা কালিয়া বা কোল। হাজরাখালি, কান্তাখালি, কালুখালি, খালিয়া, বেজকোলা, সুরামখোলা, হিম্মতখালি ইত্যাদি।

 

বিল, ইল, ঝিল, হাওড়, দোহা, দহ পারিচিতিতে গ্রামের নাম ও উৎপত্তি

নদী মরে গেলে বিল হাওড়, দহ, দোহাতে পরিণত হয়। বিলমালেঙ্গা, বিলশ্যামসুন্দরপর, বিলসারিন্দা, বিলচৈত্রা, বিলকোনা, বিলগজারিয়া, বিলজেলা, বিলরঘুয়া, বিলছালুয়া, বিলধামু, বিলটাকাপুড়া, চাষাবিলা, বিলকাউলী, বিলবড়া, ইলাতেল, লবরদোহা, বাউলদোহা, মুচিদহ, বিলচড়া, মরাবিলা ইত্যাদি। রাজবাড়ি জেলার দক্ষিণাঞ্চলে অনেক সংখ্যক বিস্তৃত বিলের অস্তিত্ব ছিল। তেঢালা, গজারিয়া, পাকুড়িয়া, কাছমিয়া ইত্যাদি বিস্তৃত বিলের অঞ্চল ভর অঞ্চল বলে পরিচিত। এসব বিলের শাপলা শালুক এক সময়ে প্রাকৃতিক সৌর্ন্দযের লীলবৈচিত্র বহন করত।

 

 

মাছ, পাখি, পশু, ফল,বৃক্ষ, ফসলের পরিচিতিতে গ্রামের নাম ও উৎপত্তি:

গ্রাম সমাজের বিকাশের ধারায় যখন মানুষ স্থায়ী বসতি গড়ে তুলতে থাকে তখন তা বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিষয়ের পারিচিতিতে নামকরণ হতে থাকে। ঐসব বিষয়ের আধিক্যহেতু ঐ সকল নামে গ্রাম পরিচিত হয়। মহিষ-মহিষাখোলা, বেজি-বেজকোলা, নিম-নিমতলা, কৈ-কৈজুরি, খলিশা-খালিশা, পাঙ্গাস-পাঙ্গাশিয়া, শোল-শৈালকাঠি, বোয়াল-বোয়ালিয়া, শিং-শিঙ্গা, ঘুঘু-ঘুঘুশালি, বাঘ-বাঘমারা, গজার-গজারিয়া, পাট-পাটবাড়িয়া, টেংড়া-টেংড়াপাড়া, আম-আমবাড়িয়া, ভেল্লা-ভেল্লাবাড়িয়া, বাঘ-বাঘাবিষ্ণুপুর ধান-ধানুরিয়া, ঝাউগাছ-ঝউগ্রাম, হলুদ-হলুদবাড়িয়া, মাছ-মাছপাড়া, বেত-বেতবাড়িয়া, বাওই-বাওইখোলা, আখ-আখরজানি, বড়ই-বরইচারা, সরিষা-সরিষা, শামুক-শামুকখোলা, হাতি-হাতিমোহন, বন-বনগ্রাম, ইন্দুর-ইন্দুবদি, মাশুর-মাশুরাডাঙ্গী ইত্যাদি।

 

গ্রামের নাম বাঘ, হরিণ, দিয়া, গ্রামের নামকরণের পেছনে এলাকার প্রাচীনত্ব নির্দেশ করে। সে সাথে একসময় বনজঙ্গলে ঘেরা রাজবাড়ি এলাকায় এসব পশুর বসবাসের অস্তিত্ব প্রমাণ করে। সে সাথে একসময় বনজঙ্গলে ঘেরা রাজবাড়ি এলাকায় এসব পশুর বসবাসের অস্তিত্ব প্রমাণ করে। বলা যায় সেদিন পর্যন্ত অর্থাৎ ২০০০ শতকের মাঝামাঝিতে বন্য শুকরের বসবাস ছিল বিভিন্ন এলাকায়। মীর মশাররফ হোসেনে তাঁর ১২ বছর বয়সে অর্থাৎ ১৮৬০ সালের দিকে যখন কুষ্টিয়া থেকে পদমদি যাতায়াত করতেন সে বর্ণনা তাঁর লেখা ‘আমরা জীবনীগ্রন্থ’-এ পাই। আমার জীবনী গ্রন্থে তিনি চন্দনা নদীর তীরবর্তী বাঘের বসবাসের কথা লিখে গেছেন। যা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। বাঘের অঞ্চলে হরিণের বসবাস সকল স্থানেই দেখা যায়। তাই সে সময় হরিণও এলাকায় বসবাস করত। এ ছাড়া বন্য হাতি, মহিষও বসবাস করত। রজবাড়ি জেলার মধ্যবতী অঞ্চল বিশেষ করে চন্দনা নদী এলাকাই ছিল এদের বসবাসের আড্ডাখানা। কালক্রমে ওসব বন্য প্রাণী দক্ষিণে সরে ‍গিয়ে বর্তমানে সুন্দরবনে স্থান করে নিয়েছে। পাঙ্গাস, ইলিশ, কৈ, মাগুর, শোল, বোয়াল, শিং, খলিশা এসব নামের গ্রাম মৎস্য সম্পদের প্রাচুর্যের নিদর্শন। এসব নামের সাথে গ্রামের প্রাচীনত্ব ‍নিদের্শ করে। এ সব গ্রামের সৃষ্টি ৫০০ বৎসরের বেশি বলে ধারণা করা যায়।

 

ডাঙ্গা অপেক্ষাকৃত উচু ভূমি। বিস্তৃত মাঠের দিকে তাকালে দেখা যাবে সকল স্থানের ভূমি একই সমতল নয়। কোথাও উঁচু কোথাও নিচু। পানির সমতল থেকে উঁচু ভূমিকে ডাঙ্গা আবার চাষযোগ্য অপেক্ষাকৃত উঁচু ভূমিকে ডাঙ্গী বলে। অপেক্ষাকৃত উঁচু ভূমিতে যে সব গ্রাম উঠেছে তা ডাঙ্গা ‍দিয়ে গঠিত হোগলাডাঙ্গী, বেড়াডাঙ্গা, মৃগিডাঙ্গা, বহলাডাঙ্গী ইত্যাদি গ্রামের নাম।

 

চন্দনা-নদী

চন্দনা-নদী

 

  • চন্দনা চলতে পারি মন্দ না
  • চলত যখন চাঁদ সওদাগর
  • করত সবাই বন্দনা।
  • পালের নায়ে ঘোমটা দিয়ে
  • আর চলেনা রঞ্জনা,
  • শীর্ণ বুকে পা রাখে না খঞ্জনা
  • চন্দনা, চলছি দেখ মন্দনা।

চন্দনা বর্তমান পদ্মার একটি শাখা যা পাংশার পাশ দিয়ে প্রবাহিত। কালুখালির দক্ষিণে সোনাপুরের রামদিয়ার মাঝ দিয়ে প্রবাহিত বালিয়াকান্দি হয়ে পাঁচমোহনীতে মেশেছে। এই পাঁচমোহনী চন্দনা, হড়াই, কুমার গড়াইয়ের মিলনস্থল। ড. নীহাররঞ্জন যে চন্দনার গতিপথের বর্ণনা দিয়েছেন তা চন্দনার সঠিক তথ্য বহন করে না। তিনি লিখেছেন চন্দনা পদ্মার গর্ভে ভাগিরথীতে প্রবাহিত। ফ্যানডেন ব্রকেন নকশায় তা যশোরের পশ্চিম দিয়ে প্রবাহিত। প্রকৃত চন্দনা প্রাচীন নদী যা গঙ্গা হতে প্রাবাহিত হয়ে কুমারের সাথে মিশতো। উল্লেখ্য কুমার অতি প্রাচীন নদী এবং বর্তমান চন্দনা পাঁচমোহনীতে কুমারের সাথে মিশেছে। চন্দনা প্রাচীনকালে অনেক প্রশস্ত নদী ছিল।

 

তার প্রমাণ হিসেবে বলা যায় বর্তমান বেলগাছি ও কালুখালির অদূরে চরলক্ষীপুর, চরচিলকা, চরপাড়া, চরবোয়ালিয়া, চরমদাপুর চন্দনা নদীর প্রবাহিত চর। চন্দনার এ প্রবাহের দ্বারা প্রমাণিত হয় চন্দনা অনেক পূর্ব প্রশস্ত নদী। এছাড়া চন্দনা প্রবাহের দুই কান্দায় আড়কান্দি ও বেলেকান্দি। নদি এ সময়ে আড়কান্দি এসে বাঁক নিয়েছিল বলে আড়ে আড়কান্দি আর ডানে বেলেচর বালিয়াকান্দি। আড়াকান্দি আর বালিয়াকান্দির দূরত্ব ২ মাইল প্রায়। নদীর পাড় আরাকান্দি থেকে বালিয়াকান্দি দিকে সরে গিয়েছে। সপ্তদশ শতকে এ নদী যে অনেক বড় নদী ছিল তার আরো বড় প্রমাণ মেলে বঙ্গে রেলভ্রমণ পুস্তকের ১০৯ পৃষ্ঠার বর্ণনা থেকে-‘কালুখালি জংশন থেকে আড়কান্দি স্টেশন ১২ মাইল দূরে। ঐখানে চন্দনা তীরে বাণীবহ নাওয়াড়া চৌধুরীদের নৌকা নির্মাণের প্রধান কারখানা ছিল। ইবনে বতুতা রেহেলা গ্রন্থে তৎকালীন বঙ্গে জাহাজ শিল্পের ব্যাপক উন্নতির বিষয়ে উল্লেখ করেছেন। বার্থেমাও বিভিন্ন প্রকার নৌযান ও বৃহদাকার জাহাজ নির্মাণের কথা বলেছেন।

মঙ্গলকাব্যের নায়কেরা চাঁদ সওদাগর ধনপতি এ অঞ্চলে বাণিজ্য করত। আর সে বাণীজ্যের পথ ছিল (১৪০০ শতকে) এই চন্দনা, হড়াই,গড়াই। ধারণা করা যায় শুধু সপ্তদশ শতকে আড়কান্দিতে বাণীবহের নাওয়াড়াদেরই নৌকা তৈরি হত না এর ২০০ বৎসর পূর্বে সুলতানি আমলে সওদাগরদের জন্য ডিঙ্গা জাহাজ নির্মিত হত। বর্তমানে আড়কান্দির আদূরে তুলশী বরাট নৌকা নির্মাণের ঐতিহ্যবাহী স্থান। তুলশী বরাটের নৌকা এই সেদিন পর্যন্ত এ অঞ্চলের উন্নতমানের নৌকা হিসেবে গৃহীত ছিল। এ গ্রামের অনেক মিস্ত্রির সাথে আলাপ করে জানা যায় এটা তাদের প্রাচীন পূর্বপুরুষের আদি পেশা। চন্দনা নদী এখন মৃত। মীর মশাররফ হোসেনের বর্ণনা থেকে দেখা যায় ১০০ শত বৎসর পূর্বে এটা যথেষ্ট নাব্য ছিল। হযরত সাহ্ পাহলোয়ান এই নদীর উত্তর তীরে ষোড়শ শতকে ধর্ম প্রচারের জন্য সেকাড়া গ্রামে আস্তানা গড়ে তোলেন। বর্তমানে এই নদীর মুখ কেটে এবং খনন করলে হাজার হাজার একর জমি সেচের আওতায় আনা যাবে। রাজবাড়ী জেলের কৃষি, মৎস্য, পর্যটন শিল্পে উন্নয়নের কথা ভাবতে হলে পদ্মা, গড়াই, হড়াই, চন্দনা, চত্রা,সিরাজপুরের হাওড়া নিয়ে ভাবতে হবে। রাজবাড়ীর এই সম্পদ যেমন গর্ব তেমনি উন্নয়ন প্রকল্পের সহায়ক বিষয়।