গোয়ালন্দের অকাল মৃত্যু

মহকুমা গোয়ালন্দের অকাল মৃত্যু

অবিভক্ত ভারতে ভৌগলিক ও প্রশাসনিক কারণে থানা ও মহকুমার আন্তঃসমন্বয় ঘটেছে বারবার। ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার কর্তৃক ১৮৭৭ সালে প্রকাশিত ‘অ্যা স্ট্যাটিস্টিক্যাল একাউন্ট অফ বেঙ্গল (ভলিউম-৫)’ পর্যালোচনায় দেখা যায়, ফরিদপুর সদর ও গোয়ালন্দ মহকুমা দুটির সমন্বয়ে ছিল ফরিদপুর জেলা এবং গোয়ালন্দ, বেলগাছি ও পাংশা এই তিনটি থানার সমন্বয়ে ছিল গোয়ালন্দ মহকুমা (সাব-ডিভিশন)।

১৯২৩ সালে প্রকাশিত বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার (ফরিদপুর) অনুসন্ধানে দেখা যায়, ফরিদপুর সদর, গোয়ালন্দ, গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুর—এই চারটি মহকুমার (সাব-ডিভিশন) সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে ফরিদপুর জেলা। আর গোয়ালন্দ ঘাট, পাংশা, বালিয়াকান্দি ও গোয়ালন্দ—এই চারটি থানার (উপজেলা) সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে গোয়ালন্দ মহকুমা (সাব-ডিভিশন)। গোয়ালন্দ মহকুমার সর্বমোট আয়তন ছিল তখন ৪৪৩ বর্গ মাইল এবং জনসংখ্যা ৩,২৮,২১৯ জন। আর গোয়ালন্দ ঘাটের আয়তন তখন ৫০ বর্গমাইল এবং জনসংখ্যা ৪৩,২৮৬ জন। মহকুমা সদর দপ্তর ছিল গোয়ালন্দ থানা।

 

বিদ্যমান প্রশাসনিক কাঠামো অনুযায়ী ব্রিটিশ আমলে কয়েকটি থানা নিয়ে একটি মহকুমা গঠিত হত এবং কয়েকটি মহকুমা নিয়ে একটি জেলা গঠিত হত। মহকুমা হিসেবে গোয়ালন্দের মর্যাদা লাভ ১৮৭১ সালে। কলকাতা হতে যে প্রধান লাইনটি গোয়ালন্দ ঘাটে এসে শেষ হয় তা ছিল পদ্মা নদীর টার্মিনাল স্টেশন। তবে এটি কখনই স্থায়ী ঘাট হিসেবে গণ্য হয়নি। কেননা নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে প্রায়ই ঘাট পরিবর্তন করতে হত। উদ্বোধনের প্রায় ৩০ বছরের মধ্যে ১০ বার এর স্থান পরিবর্তন করতে হয়। ১৯১৩ সালে প্রকাশিত ‘ফ্রম দ্যা হুগলী টু দ্য হিমালয়েজ’ হতে জানা যায়, ‘ফরমারলি গোয়ালন্দ ওয়াজ সিচুয়েটেড এক্সেক্টলি অ্যাট দ্য জাংশন অফ দ্য রিভার্স পদ্মা এন্ড ব্রম্মপুত্র, এন্ড লার্জ সামস ওয়্যার স্প্যান্ট ইন প্রটেক্টিং দ্য সাইট ফ্রম ইরোসন; বাট ইন এইটিন সেভেন্টিফাইভ দ্য স্পার ওয়াজ ওয়াসড অ্যাওয়ে, এন্ড সিন্স দ্যাট ডেইট দ্য টার্মিনাস হ্যাজ কন্সটেন্টলি বীন অন দ্য মোভ, উইথ দ্য রেজাল্ট দ্যাট ইট ইজ নাও টু বি ফাউন্ড এবাউট সেভেন মাইলস সাউথ অফ ইটস ফরমার পজিশন। দিস বিং দ্য কেইস দেয়ার আর নো পার্মানেন্ট ল্যান্ডিং স্টেইজেস’। ঘাটের ভাঙ্গন এবং ঘাট রাজবাড়ি শহরের অদূরে অবস্থিত হওয়ায় রেলের সকল স্থাপনা রাজবাড়িতে গড়ে উঠে। গোয়ালন্দ মহকুমা ও থানার প্রশাসনিক কাজ সম্পাদিত হত রাজবাড়ি থেকে।

কালের পরিক্রমায় একদিকে পলি জমে সংকুচিত হয়েছে নদীপথ, অন্যদিকে বিস্তৃত হয়েছে রেলের নেটওয়ার্ক। ইস্টার্ণ বেঙ্গল রেলওয়ে এবং আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের পাশাপাশি এগুলোকে সংযুক্ত করে গড়ে ওঠে ঢাকা-ময়মনসিংহ স্টেট রেলওয়ে, বেঙ্গল সেন্ট্রাল রেলওয়ে, নর্দার্ন বেঙ্গল স্টেট রেলওয়ে, বেঙ্গল ডুয়ার্স রেলওয়ে কোম্পানী। শিয়ালদহ থেকে চট্টগ্রাম মেইল ছাড়ত সকালবেলায়। কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের লোকেরা সাধারণত চট্টগ্রাম মেইলে যাতায়াত করতেন। অনেকে চাঁদপুর থেকে আবার আসাম মেইল ধরতেন।

কমরেড মুজফফর আহমদ‍ এর লেখা ‘কাজী নজরুল ইসলামঃ স্মৃতিকথা’ তে ঢাকা মেইলের বর্ণনা মিলে। তিনি উল্লেখ করেছেন-‘১৯২১ সালে রেলওয়ে ও স্টীমারের ভাড়া অত্যন্ত কম ছিল। তাছাড়া আমরা থার্ড ক্লাসের হিসাব করছিলাম। কলকাতা হতে আমি রাত্রের ঢাকা মেইলে রওয়ানা হয়েছিলেম। কারণ সকালের চাটগাঁ মেইলে গেলে চালু স্টীমারখানা পাওয়া যেত না।’ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘ঢাকা মেইল’ এর বগিগুলো ছিল লাল রঙের। নারায়নগঞ্জ থেকে মেইল স্টিমার ভোর ছয়টা-সাড়ে ছয়টার মধ্যে গোয়ালন্দে পৌঁছে যেত। স্টিমারের যাত্রী এবং মাছের বগি নিয়ে সকাল সাতটায় ঢাকা মেইল গোয়ালন্দ থেকে শিয়ালদহের উদ্দেশ্য ছেড়ে যেত। দর্শনায় কাষ্টম চেকিং হত। শিয়ালদহ স্টেশন পৌঁছে যেত দুপুর দেড়টা-দুটোর মধ্যেই। আবার শিয়ালদহ থেকে ছেড়ে আসা ঢাকা মেইলটি গোয়ালন্দ এসে পৌঁছাত রাত নয়টার মধ্যে। পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়ের বগিগুলো ছিল সবুজ রঙের। বগিগুলোর গায়ে লেখা থাকত ইবিআর।

 

১৯৬১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি হতে লেখা হত ইস্ট পাকিস্তান রেলওয়ে (ইপিআর)। বগিগুলো ছিল চার শ্রেণীর। ফার্স্ট ক্লাশ, সেকেন্ড ক্লাশ, ইন্টার ক্লাশ এবং থার্ড ক্লাশ। শুধু নারীদের বসার জন্য ভিন্ন বগির ব্যবস্থা ছিল। সেখানে উর্দুতে লেখা থাকত ‘জেনানা’। ইন্টার এবং থার্ড ক্লাশের বগিতে চার সারিতে বসার বেঞ্চ থাকত। দুই দিকে জানালার পাশে দুই সারি এবং মাঝখানে পিঠাপিঠি দুই সারি। সব বগি সমান আকারের হত না। কোন কোন বগি আকারে বড় হত। বগির ভেতরে ‘৪০ জন বসিবেক’, ‘২৮ জন বসিবেক’, এরূপ সব নির্দেশনা থাকত।

‘দুই দশকের গোয়ালন্দ’ শীর্ষক নিবন্ধে ভারত ভাগ পরবর্তী সময়ের কথা বলতে গিয়ে জালাল মিঞা এভাবেই স্মৃতিচারণ করেছেন। ব্রিটিশ ভারতে গোয়ালন্দ ছিল ইউরোপীয় মানের প্রথম শ্রেণীর রেল স্টেশন। বাঙালি তো নয়ই, এমনকি কোন ভারতীয়কেও স্টেশন মাস্টারের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। ভারত ভাগের আগ পর্যন্ত মাস্টারের দায়িত্বে বরাবরই ছিলেন একজন ইংরেজ। ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত ইস্ট বেঙ্গল এক্সপ্রেস নামের ট্রেনটি শিয়ালদহ হতে গেদে-দর্শনা হয়ে গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত চলাচল করত। ফিরত আবার একই পথে। আর বরিশাল এক্সপ্রেস শিয়ালদহ হতে পেট্টোপোল-বেনাপোল হয়ে খুলনা পৌঁছাত এবং সেখান থেকে পুনরায় শিয়ালদহ ফিরে আসত। আসাম মেইলের আসা যাওয়া ছিল সান্তাহার থেকে গৌহাটি পর্যন্ত। দার্জিলিং মেইল শিয়ালদহ-রানাঘাট-হার্ডিঞ্জব্রীজ-ঈশ্বরদী-সান্তাহার-পার্বতীপুর-হলদিবাড়ি-জলপাইগুড়ি-শিলিগুড়ি পথে আসা-যাওয়া করতো। কত বিস্তৃত ছিল সেকালের রেলের সীমা! আজ চিন্তা করতেই হিমসিম খেতে হয়।

এতদঞ্চলে চলাচলরত বিশ শতকের চারটি প্যাডেল স্টিমার সচল আছে এখনো। বিআইডব্লিউটিসির তত্ত্বাবধানে রয়েছে এগুলো । স্কটিশ শিপবিল্ডের ওয়েবসাইট (ডব্লিউ.ডব্লিউ.ডব্লিউ.ক্লাইডেশিপস.সিও.ইউকে) হতে প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক দেখা যায়, ‘টার্ণ’ (১৯৪৯) ও ‘অস্ট্রিচ’ (১৯২৯) ছিল ইন্ডিয়া জেনারেল নেভিগেশন কোম্পানির। আর ‘মাহসুদ’ (১৯২৯) ও ‘লেপচা’ (১৯৩৭) ছিল রিভার্স স্টিম নেভিগেশন কোম্পানির। সবগুলো প্যাডেল স্টিমারই স্কটল্যান্ডের ‘উইলিয়াম ড্যানি এন্ড ব্রাদার্স’ শিপইয়ার্ডে প্রস্তুতকৃত। ১৯৫৯ সালে এগুলো পাকিস্তান রিভার স্টিমার্স লিমিটেডের মালিকানায় আসে। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে এগুলোর মালিকানা পায় বাংলাদেশ রিভার স্টির্মাস লিঃ এবং সর্বশেষ বিআইডব্লিউটিসি। ‘অস্ট্রিচ’ বাদে অন্য তিনটি স্টিমার বর্তমানে বিভিন্ন রুটে চলাচল করছে। প্যাডেল স্টিমার বিধায় এদের নামের আগে পিএস সংযুক্ত করে ডাকা হয় পিএস টার্ণ, পিএস অস্ট্রিচ, পিএস মাহসুদ ও পিএস ল্যাপচা। ইতিমধ্যে বিআইডব্লিউটিসি স্টিমার চারটিকে রাষ্ট্রীয় ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। ‘অস্ট্রিচ’ কে ২০১৯ সালে অ্যাকর্ট রিসোর্সেস নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নিকট পাঁচ বছর মেয়াদে ইজারা দেয়া হয়েছে। প্যাডেল স্টীমারগুলো ‘রকেট’ নামেও পরিচিত। সময়ের আবর্তনে এগুলোকে স্টিম ইঞ্জিন থেকে ডিজেল ইঞ্জিনে রূপান্তর করা হয়েছে।

যেই পদ্মাকে ঘিরে গোয়ালন্দের এত অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশ; কালের পরিক্রমায় প্রমত্ত পদ্মার সেই যৌবন আর নেই। ঢেউ আছড়ে পড়ে না স্টিমারের বাজুতে। পদ্মার এমন দশায় গোয়ালন্দের সেই নাম আর জৌলুসও নেই। ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ সকল মহকুমাকে জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু গোয়ালন্দকে জেলা হিসেবে ঘোষণা না করে জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয় রাজবাড়িকে! আর গোয়ালন্দ পরিণত হয় রাজবাড়ি জেলার অন্তর্ভুক্ত একটি উপজেলায়! বর্তমানে রাজবাড়ি জেলার আওতাধীন পাঁচটি উপজেলার মধ্যে আয়তনের দিক থেকে গোয়ালন্দ ক্ষুদ্রতম (৪৭ বর্গমাইল)। শতাধিক বছরের খ্যাতি হারিয়েছে গোয়ালন্দ রেল স্টেশন। বন্ধ হয়ে গেছে গোয়ালন্দগামী বেশ কিছু রেল লাইন। গোয়ালন্দ এখন শুধুই এক সাধারণ রেল স্টেশন। ক্ষয়ে যাওয়া লাল ইটের ভবনগুলো কালের সাক্ষী হয়ে রয়ে গেছে। পাল্টে গেছে ইলিশ যাত্রার পথও। আগে গোয়ালন্দে অন্ধ মালগাড়ির যাত্রী হতো ইলিশ। আর এখন বেনাপোল কিংবা আগরতলার পথে ট্রাকের যাত্রী হয় ইলিশ। টিকেট কাটা ঘরের পরিত্যক্ত জানালা, টাকা রাখার লকার, ট্রেনকে সিগন্যাল দেয়ার জন্য লকারের ওপরে বসানো ল্যাম্প, অন্যান্য যাত্রীদের সাথে স্টিমারের ডেকে চাদর বিছিয়ে স্থান করে নেয়া, রাতের নদী, গোয়ালন্দ ঘাটে নেমে হুড়াহুড়ি করে ট্রেনে ওঠা—সবই এখন সোনালী অতীতের ধূসর স্মৃতি।

পদ্মা নদীর-জন্মকাল ও ভাঙ্গাগড়ার খেলা

পদ্মা নদীর-জন্মকাল ও ভাঙ্গাগড়ার খেলা

নদ-নদী

পদ্মা, গড়াই, হড়াই, চন্দনা বাহিত পলি, কাঁকর দিয়ে সৃষ্টি রাজবাড়ী জেলা। রাজবাড়ীর প্রধান ঐতিহ্য এককালের রুপালি ইলিশ। আজও রাজবাড়ী অঞ্চলের মানুষের জীবন পরিচালিত হচ্ছে এ সব নদনদীর প্রভাবে। সঙ্গত কারণেই এ সব নদনদীর অতীত স্রোতধারা, তার জন্মকাল জানতে ইচ্ছে করে। জানতে ইচ্ছে করে এর ভাঙ্গাগড়ার খেলা।

 

পদ্মা

          নটিনী তটিনী আমি

          নির্ঝরিণী নিঃসঙ্গ,

          তরঙ্গ ভঙ্গিমায় ভঙ্গিল দেহ

          জন্ম নিলাম প্রমত্ত পদ্মা আমি

৫০০ বৎসর পূর্বে পদ্মা এমন ছিল না। তখন গঙ্গার প্রধান ধারা ভাগীরথী দিয়ে চলত। পলি পড়ে ভাগীরথীর নদীতল উঁচু হয়ে উঠলে ক্রমশঃ পূর্বে জলঙ্গী, মাথাভাঙ্গা, কুমার, গড়াই, হড়াই, চন্দনা দিয়ে গঙ্গার প্রধান প্রবাহ চলতে থাকে। গঙ্গা পরে তার পূর্বমুখী ধারা খুজে পায়। এ ক্ষেত্রে গঙ্গার প্রবাহ খুজতে গিয়ে মূলত গঙ্গার প্রাচীনত্বের ব্যাখ্যা প্রয়োজন যা অতি জটিল অধ্যয়ন। মধ্যপুরাণ ও মহাভারতে গঙ্গার পূর্বগামী ৩টি ধারা হলদিনী, পাবনী ও নলিনীর, উল্লেখ রয়েছে। অনেকের ধারণা পাবনী থেকে পন্মার নাম এসেছে যা পাবনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ২য় শতকে টলেমীর নকশা, সপ্তম শতকে হিউয়েন সাং এর বর্ণনা, ষোড়শ শতকে ডি ব্যরসের নকশা, বিখ্যাত সেচ ইঞ্জিনিয়ার উলিয়াম উইলকক্স, নীহাররঞ্জন ও কপিল ভট্টাচার্যের নদীর গতিপথ বর্ণনাসহ আনুষঙ্গিত উপাদানের সাহায্যে পদ্মার ঐতিহাসিক পর্যালোচনা করা যাবে, যা থেকে অতীত ও বর্তমান পদ্মা সম্বন্ধে একটি ধারণা পাওয়া সম্ভব। রাজমহলের সোজা উত্তর-পশ্চিম তেলিয়াগড় ও সিক্রিগলির গিরিবর্ত্ম গঙ্গার বাংলায় প্রবেশ পথ। প্রাচীন গৌড়ের প্রায় ২৫ মাইল দক্ষিণে গঙ্গার ধারা ভাগীরথী ও পদ্মা এই দুই ধারায় প্রবাহিত। ড. নীহাররঞ্জন ভাগীরথীকে মূলধারা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ঐতিহাসিক রাধাকমল মুখোপাধ্যায় মনে করেন ষোড়শ শতক থেকে পদ্মার পূর্বযাত্রা বা সূত্রপাত। রেনেল ও ফ্যানডেন ব্রকের নকশায় দেখা যায় ষোড়শ শতকে পদ্মা বেগবতী নদী। সিহাবুদ্দিন তালিশ (১৬৬৬), মির্যা নাথনের (১৬৬৪) বিবরণীতে গঙ্গা ব্রক্ষপুত্রের সঙ্গমে ইছামতির উল্লেখ করেছে।

 

ইছামতির তীরে যাত্রাপুর এবং তিন মাইল উত্তর পশ্চিমে ডাকচড়া (মানিকগঞ্জ) এবং ঢাকার দক্ষিণে গঙ্গা ব্রক্ষপুত্রের সম্মিলন প্রবাহের সমুদ্র যাত্রা। ড. নীহাররঞ্জন, ‘তখন গঙ্গার এ প্রবাহে পদ্মার নামকরণ দেখছি না। আইন-ই-আকবরী গ্রন্থে আবুল ফজল লিখেছেন (১৫৯৬-৯৭),‌ ‘কাজীর হাটের কাছে পদ্মা দ্বিধা বিভক্ত হয়ে একটি শাখা পূর্বগামিনী পদ্মাবতী নাম নিয়ে চট্টগ্রামের নিকট সুমদ্রে মিশেছে। মির্যা নাথানের বর্ণনায় করতোয়া বালিয়ার কাছে একটি বড় নদীতে পড়েছে। এই বড় নদীটির নাম পদ্মাবতী। ত্রিপুরা রাজ বিজয় মাণিক্য ১৫৫৯ ত্রিপুরা হতে ঢাকায় এসে ইছামতি বেয়ে যাত্রাপুর এসে পদ্মাবতীতে তীর্থস্নান করেছিলেন। এ হিসেবে তখনকার পদ্মা বর্তমান অবস্থান থেকে ১৫/২০ মাইল  উত্তরে প্রবাহিত হত এবং তা রেনেলের নকশা এবং টেলরের বর্ণনার সাথে মিলে যায়।

 

ষোড়শ শতকে পদ্মা ও ইছামতি প্রসিদ্ধ নদী। ষোড়শ শতকের ব্যারস এবং সপ্তদশ শদকের ব্রকের নকশায়ও তা পাওয়া যায়। চতুর্দশ শতকে ইবনে বতুতা (১৩৪৫-৪৬) চীন দেশে যাওয়ার পথ চট্টগ্রাম নেমেছিলেন। তিনি চট্টগ্রামের হিন্দু তীর্থস্থান গঙ্গা নদী ও যামুনা নদীর সঙ্গমস্থল বলেছেন। তাতে বোঝা যায় চর্তুদশ শতকে গঙ্গার মধ্যেবর্তী প্রবাহ পদ্মা চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তটভূমি প্রসারের সাথে সাথে চট্টগ্রাম এখন অনেক পূর্ব দক্ষিণে সরে গিয়েছে। ঢাকাও এখন পদ্মার উপর অবিস্থিত নয়। পদ্মা এখন অনেক দক্ষিণে নেমে এসেছে। ঢাকা এখন পুরাতন গঙ্গা পদ্মার খাত বুড়িগঙ্গার উপর অবস্থিত আর পদ্মা ব্রক্ষপুত্রের (যমুনা) সঙ্গম গোয়ালন্দের অদূরে।

পদ্মা তার খাত বারবার পরিবর্তন করেছে তার যথেষ্ট প্রমাণাদি এ পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। দশম শতকের শেষে এবং একাদশ শতকের গোড়ায় চন্দ্রবংশীয় রাজারা বিক্রমপুর, হরিকেল অর্থাৎ পূর্ব ও দক্ষিণ বঙ্গের অনেকটা জুড়ে রাজত্ব করতেন। এই বংশের মহারাজধিরাজ শ্রীচন্দ্র তার ইদিলপুর পট্টলীদ্বারা স্মতট পদ্মাবতী অঞ্চলের অন্তর্গত কুমার তালক মন্ডলের জনৈক ব্রাক্ষণকে একখন্ড ভূমি দান করেছিলেন। পট্টলীও সমসাময়িক সাহিত্য গ্রন্থেও পদ্মা নদীর উল্লেখ আছে। ‘বাজলার পাঁড়ী, পঁ-ঊ-আ খালে বাঁহিউ’ অর্থাৎ পদ্মাখালে বজরা নৌকা পাড়ি দিতেছে। এতে অনুমান করা যাচ্ছে নবম দশম শতকেও পদ্মার অস্তিত্ব ছিল তবে তা ছিল ক্ষীণতোয়া অপ্রশস্ত খাল বিশেষ। ব্রক্ষপুত্র বর্তমান যমুনার খাতে প্রবাহিত হতে শুরু করার আগে পদ্মা ধলেশ্বরী বুড়িগঙ্গার খাতে প্রবাহিত হত। ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে তিস্তা অকস্মাৎ তার পূর্ব যাত্রা পরিত্যাগ করে এবং তার বিপুল বন্যার বারিরাশি ব্রক্ষপুত্রের বন্যার পানির সঙ্গে মিশে যমুনার খাতে বইতে শুরু করে দেয় গোয়ালন্দের পাড়ে।

 

প্রাচীন রাজধানী বিক্রমপুরের মন্দির প্রাসাদ ধ্বংস করে পদ্মা কীর্তিনাশা নাম ধারণ করে। জেমস টেলরের বর্ণনায় কীর্তিনাশা ঢাকার শ্রীপুরের মফলৎগঞ্জ ও রাজনগরের কিছুটা উত্তর দিয়ে প্রবাহিত। এটাই গঙ্গার প্রধান শাখা যা প্রশস্ততা ছিল ৩/৪ মাইল। রেনেলের মানচিত্রে টেলরের বর্ণনায় কীর্তিনাশা কার্তিকপুরের উত্তরে মেঘনার সাথে মিলিত হয়েছে। গঙ্গার দ্বিতীয় শাখা টেলরের বর্ণনায় নয়াভাঙ্গনী নদী (আড়িয়াল খাঁ) ঢাকা জেলার কোল বেয়ে বকেরগঞ্জের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। মূলতঃ ৩০০/৪০০ বৎসর পূর্বে পদ্মার ধারা বর্তমান ধারা থেকে আরো উত্তরে বোয়ালিয়া (রাজশাহী শহর) পাবনার চলনবিল, ইছামতি (মানিকগঞ্জ) ধলেশ্বরী একাকারে ঢাকার দক্ষিণ দিয়ে শ্রীপুরের কীর্তিনাশা হয়ে সোজা দক্ষিণে প্রবাহিত হত। ২০০ থেকে ২৫০ বছরের মধ্যে পদ্মা অনেক দক্ষিণে সরে এসে বর্তমান খাতে রাজবাড়ী জেলার কোল ঘেঁষে জেলার উত্তর সীমানা দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। আবার কখনো উত্তরে ৫/৬ মাইল সরে গেছে। বর্তমানে রাজবাড়ী জেলার উত্তরে হাবাশপুর, ধাওয়াপাড়া ঘাট সোজা এসে মিজানপুর থেকে বাঁক নিয়ে ৬/৭ মাইল উত্তরে প্রবাহিত হয়ে পূর্বদিকে গোয়ালন্দের ৩ কিমি উত্তরে দৌলতদিয়ার অদূরে যমুনার ধারা বুকে নিয়ে পূর্ব মুখে প্রবাহিত হচ্ছে। পদ্মার তিনশত বছরের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় বর্তমান গোয়ালন্দ, রাজবাড়ী ও পাংশা থানার উত্তরাংশ পদ্মার নব উত্থিত চর দ্বারা সৃষ্টি। এসব দ্বীপ গোয়ালন্দের পঞ্চাশ হাজারী সমন্বিত চর বলে খ্যাত।

 

 

রাজবাড়ি জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য

প্রফেসর মতিয়র রহমান

(পৃষ্ঠা-৩০-৩২)