বাংলার দ্বারপথ গোয়ালন্দ

বাংলার দ্বারপথ গোয়ালন্দ-প্রাচীন গোয়ালন্দ ঘাটের ইতিহাস

বাংলাদেশে প্রারম্ভিক (১৯৭১-১৯৮৪) শাসনকালের সাবেক গোয়ালন্দ মহকুমাই বর্তমান রাজবাড়ী জেলা।  ইতিহাস ঐতিহ্যে গোয়ালন্দ বাংলাদেশের বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। মোগল ও বৃটিশ শাসন কালে ঢাকা, দিল্লী, কলিকাতা তথা পূর্ববাংলা ও সমগ্র ভারতবর্ষের যাতায়াত পথ ছিল গোয়ালন্দ। এ কারণে বৃটিশ শাসন কালে গোয়ালন্দ কেবল বৃহৎ গঞ্জই নয় বাংলার দ্বারপথ (Get way of Bengal) বলে খ্যাতি লাভ করে। স্থাল পথে কলিকাতা ও গোয়ালন্দের সংযোগ থাকায় প্রমত্তা পদ্মা পাড় হয়ে বাংলার পূর্ব সীমান্তের যাতায়াতে গোয়ালন্দই ছিল প্রবেশ পথ। ১৮৭১ সালে রেলপথ স্থাপন করা হলে গোয়ালন্দের গুরুত্ব অধিক মাত্রায় বেড়ে যায়। সারা ভারতবর্ষে গোয়ালন্দ একক নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। গোয়ালন্দ-দৌলতদিয়া ঘাট এখনো স্থলপথে বাংলাদেশের দক্ষিণের পথ। ঢাকা থেকে ফরিদপুর, বরিশাল, খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া এবং স্থলপথে কলিকাতা যেতে দৌলতদিয়া ঘাট পাড় হয়ে যেতে হয়।

 

প্রাচীনতার দিক থেকে পদ্ম ও যমুনার মিলনস্থল গোয়ালন্দ ইতিহাসের পাতায় চিহ্নিত। পদ্মার ভাঙ্গা গড়ার সাথে এর নানারুপ উত্থান ও পতন। কখনো গোয়ালন্দ রেল, স্টিমার, লঞ্চ, নৌকার হাজার মানুষের ভিড়ে রুপনগরী আবার কখনো প্রমত্ত পদ্মার ভাঙ্গনে, প্লাবনে পরিত্যক্ত ভূমি। এ পথেই সম্রাট বাহাদুর শাহকে পাঠান হয় রেঙ্গুনে। এ পথেই গমনাগমন করেছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম। এখানেই আস্তানা গড়ে তুলেছেলেন অমর গ্রন্থ ‘মরু তীর্থ হিংলাজে’র লেখক অবধূত। আট হাজারী দ্বিপ বলে ইতিহাস খ্যাত গোয়ালন্দের পটভূমিতেই মানিক বন্দ্যোপাধায় লিখেছেন বহুল আলোচিত উপন্যাস, পদ্মা নদীর মাঝি।

 

‘একদিন গোয়ালন্দে অধরের সঙ্গে কুবেরের দেখা হয়ে গেল। অধর বলিল, কয়েকদিন আগে কপিলা চরডাঙ্গায় আসিয়াছে কিছুদিন থাকিবে। পদ্মা নদীর মাঝি পৃষ্ঠা-১৬৫।

এ উপন্যাসটি বর্তমানে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্য। গোয়ালন্দের ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণে কলম ধরেছেন ঐতিহাসিক আনন্দনাথ রায়, রমেশ চন্দ্র মজুমদার, ডব্লিউ হান্টার। সরকারিভাবে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ারে ঘুরে ফিরে এসেছে ঘোয়ালন্ধের নাম।

১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালীশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় নসীবশাহী পরগনা এবং গোয়ালন্দ থানা হিসেবে যশোর কালেক্টরীর অন্তর্ভুক্ত হয়। নসীবশাহীর পরগনার আয়তন ছিল ৪৩০৯ একর এবং রাজস্ব নির্ধারিতত ছিল ১৫৮২১ টাকা (Faridpur District Gazetteer page 270)। মোগল শাসনকালে প্রাচীন ‘রাজগঞ্জ’ কখনো পর্তুগীজদের মুখে ‘গোয়ালীশ মুখে ‘গোয়ালীশ ল্যান্ড, কখনো জামালপুরে ইংরেজদের মুখে গ্যাংঞ্জেজ বন্দর । অবশ্য নদী ভাঙ্গনের কারণে গোদার বাজার, লক্ষ্মীকোল, লালগোলা, তেনাপচা, দুর্গাপুর, উড়াকান্দা, পুরশাহাট ঘাট পরিবর্তন হলেও গোয়ালন্দ নামেই এসব ঘাট পরিচয় বহন করে। ভাঙ্গনের বর্ণনায় ঐতিহাসিক রমেশ চন্দ্র মজুমদার লিখেছেন, বর্তমান শতাব্দি (বিংশ) আরম্ভ হইতে প্রথমে ছাত্র ও পরে শিক্ষকরুপে বহুবার স্টিমারে পদ্মা নদী দিয়া ঢাকা গিয়াছি। প্রথম প্রথম রাজবাড়ীর মঠ একটি দর্শনীয় উচ্চ চূড়া সৌধ দৃষ্টিগোচর হইত। একবার ইহার  ধার দিয়া আসিলাম কিন্তু ফিরিবার সময় তাহার দর্শন মিলিল না। বহু নগরী গ্রাম মন্দির প্রভৃতির ন্যায় এই মঠটি পদ্মার গর্ভে বিলীন হইয়াছে।  (রমেশ চন্দ্র মজুমদার প্রথম খন্ড-পৃষ্ঠা-৩)।

১৭৯৩ সালে গোয়ালন্দ থানা হিসেবে যশোরের সাথে যুক্ত হলেও গোয়ালন্দ স্থান হিসেবে এর পূর্ব পরিচিত ছিল। গোয়ালন্দ নামের পিছনে লোক মুখে নানা কথা প্রচলিত আছে। এক সময় এ অঞ্চল পর্তুগীজ, মগ, ফিরিঙ্গা জলদস্যু কবলিত ছিল। পর্তুগীজ জলদস্যু নেতা সেবাসটিয়ান গঞ্জালেশের একটি আস্তানা ছিল নদী তীরবর্তী গোয়ালন্দের কোনো স্থানে। লোকমুখে প্রচলিত গঞ্জালেশের নাম অনুসারে অপভ্রংশে গোয়ালন্দ নামরে উৎপত্তি। এক সময় গোয়ালন্দের দুগ্ধ ও মিষ্টান্ন উৎপাদনের খ্যাতি ছিল। পদ্মা পাড়ের গো-খাদ্যের প্রাচুর্য এবং বিস্তীর্ণ অনাবাদী চরাঞ্চলে গোয়ালারা দুগ্ধ উৎপত্তি। ঐতিহাসিক সূত্রে প্রাচীন রাজগঞ্জ ইংরেজ ও পর্তুগীজ বণিকদের মুখে ব্যবহৃত ‘গোয়ালীশ ল্যান্ড’ থেকে গোয়ালন্দ নামের উৎপত্তি। বার ভূঁইয়া জমিদার চাঁদ রায় ও তৎপুত্র কেদার রায়ের রাজ্য বিক্রমপুর, ঢাকা, ফরিদপুর ও বরিশালের অংশবিশেষে বিস্তৃতি লাভ করে। এ রাজ্য মকিমাবাদ, বিক্রমপুর ও রাজনগর পরগনায় বিভক্ত ছিল।  (আনন্দনাথ রায়ের ফরিদপুরের ইতিহাস, ডঃ তপন বাগচী সম্পাদিত, পৃষ্ঠা-১০০) রাজনগর পরগনা পদ্মা ও কালীগঙ্গা নদীর সঙ্গমস্থলের দক্ষিণ পূর্ব দিকে অবস্থিত ছিল। (বিক্রমপুরের ইতিহাস, যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত, পৃষ্ঠা-২০)। ফরিদপুরের পদ্মা তীরবর্তী উত্তর পর্ব অংশ রাজনগর পরগনার অন্তর্ভুক্ত ছিল।

 

কীর্তিনাশার (পদ্মার অপর নাম) দক্ষিণ তীরস্থ স্থানগুলি ফরিদপুরের অন্তর্গত হওয়ায় উহা

দক্ষিণ বিশেষণে বিশিষ্ট হইয়া দক্ষিণ বিক্রমপুর নামে অভিহিত (আনন্দনাথ রায় পৃষ্ঠা-১০২)। মোগল সম্রাট আকবরের সময় থেকে চাঁদ রায় দক্ষিণ বিক্রমপুরের শ্রীপুর নগরে রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেন এবং রাজনগর পরগনার রাজকার্য পরিচালনা করেন। Thus Rajnagar, the dominant in the south east, in the eighteen century, was curved out of the Haveli Dacca. Bikrampur and Solimabad and it continuasly got accession of territory until the end of the century. (Faridpur Gazetteer-page 209).

এ সময় রাজনগর পরগনার রাজকার্য পরিচালনার অন্তর্ভুক্ত পদ্মা তীরবর্তী অঞ্চলের রাজস্ব আদায়ের তহশীল অফিস ছিল বর্তমান রাজবাড়ির উড়াকান্দা বরাবর উত্তরে অবিস্থত- রাজগঞ্জে। পদ্মার ভাঙ্গা গড়ায় রাজগঞ্জ এখন নদীরগর্ভে। (আনন্দনাথ রায় লিখিত ফরিদপুর ইতিহাসে দ্বিতিয় খন্ড প্রকাশিত, ১২৪ পৃষ্ঠায় রাজবাড়ি থানার গ্রামসমূহের তালিকায় ‘রাজগঞ্জ’ গ্রামের নাম উল্লেখ আছে) এখানেই ছিল বিক্রমপুর/রাজনগর পরগনার তহশীল অফিস ও তাদের প্রশাসনিক কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু (রাজবাড়ি মুক্তিযুদ্ধে ড. মোঃ আব্দুস সাত্তার, পৃষ্ঠা-১৯)। সে সময় পর্তুগীজ ইংরেজ বণিকদর এদেশে আগমন ঘটেছে। রাজগঞ্জ তখন ঢাকা, বিক্রমপুরের সংযোগ নদীপথ হিসেবে বিবেচিত হত। রাজগঞ্জ অত্র অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এ পথে বৃহৎ নৌযানে পন্য আনা নেওয়া হত। পূর্ববাংলার ব্যবসা বাণিজ্যের মনোরম বন্দর রাজগঞ্জে প্রতি পর্তুগীজ ও ইংরেজ বণিকরা আকৃষ্ট হয়ে এখানে যাতায়াত করতে থাকে। বাণিজ্যের উদেশ্যে রাজগঞ্জ হয়ে ঢাকা কলিকাতা তারা যাতায়াত করে। পদ্মাতীরের রাজগঞ্জ ছিল খাওয়া ও থাকার সুভল স্থান। বিশেষ করে পদ্মার পলল মাটিতে উৎপন্ন ধান,শাকসবজি ও পদ্মার ইলিশসহ নানা জাতের মাছ ছিল সুলভ ও সুস্বাদু খাবারের উৎস। হোটেলগুলো খাবারের  একটা বিশেষ রীতি মেনে চলত আর তা হল, পেটচুক্তি খাবার। খদ্দের তার পছন্দ মতো ভাত, মাছ, মাংস, সবজি যত পরিমাণই খাবে না কেন, একটা ন্যুনতম দাম দিলেই চলবে।

 

এ ব্যবস্থা চল্লিশ বছর পূর্বেও রাজবাড়ির হোটেলগুলোতে চালু ছিল। আমি ছাত্র থাকাকালীন বর্তমান রেলগেট সংলগ্ন ইসলামিয়া হোটেল থেকে এরকম পেটচুক্তি খেয়েছি। এ বিষয়ে রাজবাড়িতে নানা গল্প প্রচলিত আছে। যেমন খদ্দেরকে পেটচুক্তি খাবার পরিবেশন করে খদ্দেরের খাওয়া অর্ধেক সমাপ্ত হলে বয় বেয়ারা বলত, ‘আরে ভাই ঐ যে ট্রেন হুইসেল দিচ্ছে এখনই ছেড়ে যাবে। খদ্দের আর কি করবে, এ কথা শুনেই অর্ধেক পেট খেয়ে দে দৌড়।

 

সস্তায় সুস্বাদু খাবার, স্থানীয় মানুষের দৃশ্যে আকৃষ্ট হয়ে পর্তুগীজ বণিকেরা রাজগঞ্জকে বলত ‘গোয়ালীশ ল্যান্ড’ বা মজার খাবারের দেশ। গোয়ালীশ পর্তুগীজ জাত শব্দ যার অর্থ অল্পজালের সিদ্ধ মাংস বা মাছের ফালি (Goulash-a stew of steak and vegetables-oxford learner’s Dictionary oxford press 1999)। এ অঞ্চলে উৎপাদিত ধনিয়া, পেঁয়াজ, রসুন, মশলায় পদ্মার স্বাদের ইলিশ, পাঙ্গাস, রুই, কাতলের কর্তিত ফালির মাছ মৃদু জ্বালে রান্নায় তা অপূর্ব স্বাদের খাবারে পরিণত হত। ফলে রাজগঞ্জ বন্দরসহ এর পার্শ্ববর্তীএলাকা গোয়ালীশ ল্যন্ড বা স্বাদের খাবারের অঞ্চল হিসেবে তাদের নিকট পরিচিত হয়ে ওঠে। পরবর্তী প্রায় চারশত বছর ধরে যাতায়াত, ব্যবসা বাণিজ্যের রাজগঞ্জ বন্দরটি পদ্মার ভাঙ্গনে বারবার ঘাটের স্থান পরিবর্তন হলেও ‘গোয়ালীশ ল্যান্ড’ নামটির পরিবর্তন হয় না। ভাষা পরিবর্তনের সাধারণ নিয়মানুযায়ী গোয়ালীশ ল্যান্ড এক সময় গোয়াল্যান্ডু বা গোয়ালন্দ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ইংরেজিতে গোয়ালন্দ বানানটি প্রাচিন নথিপত্রে ‘goalandu’ দেখা যায় ‘goalanda’ নয়। ১৭৯৩ সালে গোয়ালন্দ মহকুমা হয়নি। এ সময়েই বর্তমান রাজবড়ি জেলার নসিবশাহী, বেলগাছি, কাশিমনগর, নশরতশাহী ইত্যাদি পরগনা নাটোর রাজ, তেওতা রাজ, রানী হর্ষমুখীর জমিদারী হিসেবে যশোর কালেক্টরেভুক্ত হয়। পাংশা এলাকার মহিমশাহী পরগনা নদীয়ার অন্তর্ভুক্ত থাকে। ১৭৯৯ সালে যশোরের কালেক্টর কর্তৃক নাটোরের রাজার পরগনাগুলো নিলামে বিক্রি হয়। (আনন্দনাথ, পৃষ্ঠা-১১১)। এ সময় গোয়ালন্দ গোয়াল্যান্ড হিসেবেই সরকারী নথিপত্রে ব্যবহৃত হয়। ১৮৭১ সালে পূর্বদেশ রেল জগতি থেকে রাজগঞ্জ (রাজগঞ্জ এখন নদীগর্ভে) অভিমুখে রেল স্থাপন হয় এবং  ঐ বছরই গোয়ালন্দ মহকুমা প্রতিষ্ঠিত হয়। পরগনাভিত্তিক ঢাকা জালালপুর গঠন করা হয় ১৮০৭ সালে। ১৮১২ সালে ঢাকা জালালপুরের পশ্চিম সীমানা নির্ধারণ করা হয় চন্দনা ও গড়াই নদীর পূর্ব পাড় পর্যন্ত। ফলে পদ্মার পাড়াপড় ঘাট গোয়ালন্দ-ঢাকা-জালালপুর আওতাভুক্ত থাকে। ১৮৩৩ সালে ফরিদপুর জেলা গঠনকালে এ সীমানা অক্ষুন্ন থাকে। এ সময় পদ্মার উভয় তীরবর্তী গোয়ালন্দ ও মানিকগঞ্জ প্রায় ৩৭ বছর ফরিদপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত থেকে ১৮৫৬ সালে মানিকগঞ্জ ঢাকার অধীন হয় ( আনন্দনাথ রায়ের ফরিদপুরের ইতিহাস, ড. তপন বাগচী সম্পাদিত, পৃষ্ঠা-১১৭)।

১৮৭১ সালে ফরিদপুর জেলাকে ৪টি প্রশাসনিক ইউনিটে চারটি সাবডিভশন বা মহকুমায় বিভক্ত করা হলে গোয়ালন্দ মহকুমা গঠিত হয় এবং ঐ বছরই পূর্বদেশ রেল গোয়ালন্দ পর্যন্ত বিস্তৃত করা হয় (গৌড়ি সেতু-মীর মশাররফ হোসেন)। তবে মহকুমা প্রতিষ্ঠাকালে স্থান হিসেবে বর্তমান গোয়ালন্দ সেভাবে গেজেট ভুক্ত হয়নি। গোয়ালন্দ ঘাট পরিচয়ে নসিবশাহী, কাসিমনগর, নশরৎশাহী, পরগনা গোয়ালন্দ মহকুমায় পরিণত হয়। বেঙ্গল গেজেটিয়ার ১৯২৫ (ওমিলি প্রণীত) দেখা যায় বর্তমান গোয়ালন্দ বাজার থেকে প্রায় ১০ কিমি উত্তর পশ্চিমে এবং উড়াকান্দা বাজার থেকে প্রায় ৮ কিমি উত্তর পূর্বে পদ্মা যমুনার মিলনস্থলের নিকবর্তী কোনো স্থানে মহকুমা স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। এ সময় পূর্বদেশগামী রেলপথ পাংশা থেকে কালুখালির তিন কিলোমেটার উত্তর (বহর কালুখালি) এবং বর্তমান রাজবাড়ি ‘গোদার বাজারে’র নিকটবর্তী স্থান দিয়ে রাজগঞ্জের বিপরীত ঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। তখন থেকে ‘গোদার বাজার’, বাজার হিসেবে পরিচিত লাভ করে। পূর্ববঙ্গের শাসনকার্য পরিচালনার উদ্দেশ্য সহজ যাতায়াত এবং অত্র অঞ্চলের ব্যবসা বাণেজ্যের প্রসারের উদ্দেশ্যে রেলপথ স্থাপন করে। মহকুমার অফিস প্রতিষ্ঠানসহ রেলস্থাপনা গড়ে ওঠায় স্থানটি শহরের মর্যদা পায়। ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টারের বর্ণনায় দেখা যায় ১৮৭৫ সালের জনুয়ারি মাস পর্যন্ত ইস্টার্ন রেলওয়ে মাছপাড়া থেকে কালুখালি হয়ে বেলগাছি থেকে উত্তর পূর্ব দিকে রাজবাড়ির উত্তর দিয়ে গোয়ালন্দ ঘাটের নিকটবতী স্থানে পৌঁছায়। তৎকালীন সময়ে ১৩ লক্ষ টাকা ব্যয় ইংরেজ প্রকৌশলীগণ ঘাটের পরিকল্পনা, রেল স্টেশন, মহকুমা অফিসারের কার্যালয়, ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট স্থাপন করে। বন্যা প্রতিরোধসহ নদী শাসনে ব্যবহৃত হয় রেলের রড রেলিং ও পাথর। (উড়াকান্দার নিকটবর্তী নদীর মধ্যে এসব বৃহৎ স্থাপনার কিছু কিছু নিদর্শন বর্তমান আছে)। রাজগঞ্জকে কেন্দ্র করে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটতে থাকে। গড়ে ওঠে আড়ৎ, দোকান, হোটেল, আবাস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস ইত্যাদি। স্থানটি পূর্ববঙ্গের অন্যতম বন্দর হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। বৃটিশ শাসনকর্তা বন্দরের উন্নতি ও এর বিস্তার ঘটাতে অধিক তৎপর হয়। কিন্তু রাজগঞ্জ বন্দর অধিক সময় স্থায়ী হল না। সর্বনাশা বন্যা ও নদী ভাঙ্গনে রাজগঞ্জের সকল স্থাপনা নদীরগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। নদী ভাঙ্গন ও ঘাট বারবার স্থানান্তরিত হওয়ার কারণে গোয়ালন্দে অবস্থিত মহকুমার অফিস আদালত বিদ্যালয়সহ সকল স্থাপনা ১৮৭৫ থেকে ১৮৯০ এরমধ্যে  রাজবাড়িতে সরিয়ে আনা হয়। ‘গোয়ালন্দ মহকুমা যেখানে অবস্থিত ছিল, পদ্মাগর্ভে বিলীন হওয়ায় গভর্নমেন্ট সাহায্যকৃত হাইস্কুলটি রাজবাড়ি স্থানান্তরিত হয় এবং তৎকালীন ডিপিআই সিএ মার্টিন সাহেবের অনুরোধে লক্ষ্মীকোল রাজবাড়ির জমিদার রাজা সূর্যকুমার গুহরায় উহার পরিচালনার সম্পূর্ণ ভার নেন। (আমার স্মৃতিকথা ত্রৈলোক্যনাথ ভট্টাচার্য-পৃষ্ঠা-৪)।

 

রেল সম্প্রসারণ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা পরিচালনায় বর্তমান স্টেশন বরাবর পূর্বে ও দক্ষিণে প্রায় এক বর্গকি মিটার জায়গা হুকুম দখল করে রেল স্থাপনা গড়ে তোলা হয়। ১৮৭৫ থেকে ১৮৯৫ এই বিশ বছরে পদ্মার তীর প্রবল ভাঙ্গনের কবলে পতিত হওয়ায় গোয়ালন্দ ঘাট বারবার স্থানান্তর করা হয়। এ সময়ের মধ্যে ভাঙ্গনের প্রকোপ এত বেশি ছিল যে কয়েক মাস পর পর ঘাটের স্থান পরিবর্তন করতে হত। এভাবেই গোয়ালন্দ ঘাট লক্ষ্মীকোল থেকে লালগোলা, লালগোলা থেকে উড়াকান্দা থেকে পুরশাহাটে স্থানান্তর করা হয়। পুরশাহাট এলাকায় চর জেগে ওঠায় ঘাট জামালপুরে যায়। জামালপুরে চর জেগে উঠলে আরও পূর্বে বেথুলীতে সরে আসে। এরপর কোষাহাটা। কোষাহাটা ভেঙ্গে গেলে কাটাখালি, কাটাখালি ভেঙ্গে গেলে দুর্গাপুর, এরপর ঘিওর বাজার এবং সর্বশেষ ১৯১৪ সালে ঘাট উজানচরের ফকীরাবাদ স্থায়ী হয়। উজানচরের ফকীরাবাদে থেকে উত্তর দিকে এক থেকে ছয় নম্বর পর্যন্ত ঘাটের সংখ্যা বাড়তে থাকে। মৌসুম ভেদে পানির গভীরতা অনুযায়ী স্টিমার ভিন্ন ভিন্ন ঘাটে নোঙর করত। কোনো ঘাটে সারা বছর জাহাজ নোঙর করতে পারতো না। বর্ষামৌসুমে কখনো উড়াকান্দায় ঘাট পিছিয়ে গেছে আবার শীত মৌসুমে ঘাট ছয় নম্বর সরে এসেছে। তবে ঘাট ৪/৫ মাইলের মধ্যে অগ্র পশ্চাৎ করলেও মূল প্রশাসনিক কাজ ফকীরাবাদ থেকেই পরিচালিত হত। ফকীরাবাদ ঘাট দীর্ঘদিন স্থায়ী হয় এবং এখানে গোয়ালন্দ ঘাট থানার প্রশাসনিক স্থাপনা গড়ে ওঠে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্রের নৌ পরিবহনের হেড কোয়ার্টার স্থাপিত হয় গোয়ালন্দে। ঢাকা-কলিকাতা যাতায়াতে রেল ও স্টিমারসংযোগ পথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নৌপথে মাদারীপুর, বরিশাল, চাঁদপুর, নারায়ণগঞ্জ প্রভৃতি স্থানে যাতায়াতে স্টিমার, লঞ্চ, বড় বড় নৌকা ইত্যাদি নৌযান ব্যবহার হতে থাকে। এদিকে কলিকাতা গোয়ালন্দ স্থলপথে রেল যোগাযোগে ট্রেন সার্ভিস বৃদ্ধি পায়। ঢাকা মেল, আসাম মেল, ওয়ান আপ, টু ডাউন প্রভৃতি নামের ট্রেন গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত নিয়মিত চলাচল করতে থাকে। স্থলপথে ট্রেন এবং নৌপথে স্টিমারের সাথে যাতায়াত সংযোগ স্থাপন করা হয়। বাঙালি, বিহারী মারওয়ারী এবং কিছু বিদেশী নানা ব্যবসা জাঁকিয়ে তোলে। পদ্মার ইলিশের স্বাদ ভারত খ্যাত। ইলিশ, পাঙ্গাস, রুই ইত্যাদি মাছের চালান কলিকাতা দিল্লী পৌঁছে যেত। দেশী-বিদেশী অনেক পণ্যের বাজার বসে গোয়ালন্দে। গোয়ালন্দের চড়ে এক/ দেড়মনি তরমুজ জন্মাত। দূর ভারতে এর ব্যাপক কদর ছিল। কলিকাতা দিল্লীতে রপ্তানি হত। এ সময় স্টিমারও ট্রেন থেকে পণ্য বহনকারী প্রায় পাঁচ হাজার কুলি কাজে নিয়োজিত থাকত। তারা ঘাট কুলী বলে পরিচিত ছিল। এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা করা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। ঘাট অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। স্বদেশী, কংগ্রেসী, কমিউনিস্ট, মুসলিমলীগ সকল রাজনৈতিক কর্মকান্ড বিস্তার লাভ করে। বিশেষ করে কমিউনিস্টদের তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। সাহিত্যিক শিল্পী লেখকদের ভিড় জমে। গোয়ালন্দ কেবল গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নয়, ভারতবাসীর কাছে তা হয়ে ওঠে বাংলার দ্বারপথ। ইংরেজরা গোয়ালীশ ল্যান্ড না বলে, বলত Gate way of Bengal.

 

গোয়ালন্দ মহকুমার কাজ শুরু হয়েছিল ১৮৭১ সালে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় থেকেই গোয়ালন্দ ঘাট পুলিশ স্টেশনের ব্যবস্থা করা হয়। থানা হিসেবে বিভিন্ন সময়ে গেজেটিয়ার, ইতিহাস সেনসাসে রাজবাড়ি জেলার গোয়ালন্দ, বালিয়াকান্দি ও পাংশার নাম পাওয়া যায়। রাজবাড়ি থানার কার্যক্রম শুরু হয় পড়ে। তবে নদী ভাঙনের কারণে মহকুমা ও থানার স্থাপনা রাজবাড়িতে গড়ে ওঠে এবং প্রশাসনিক কার্য গোয়ালন্দ নামে রাজবাড়ি থেকে সম্পাদন করা হত। গোয়ালন্দে ‘ঘাট থানা’ হিসেবে থানার কাজ করা হত।

 

১৯২০ সালের একটি পরিসংখ্যান

মহকুমা থানা পুলিশ স্টেশন এরিয়া বর্গমাইল জনসংখ্যা
গোয়ালন্দ গোয়ালন্দ গোয়ালন্দ ১১৫ ৭৪৩৪৬
    গোয়ালন্দ ঘাট ৫০ ৪২২৯৬
  বালিয়াকান্দি বালিয়াকান্দি ১২৪ ৮৭৬৮৭
  পাংশা পাংশা ১৬১ ১.২০.১৯১

সূত্র: ফরিদপুর গেজেটিয়ার ১৯৭৫

 পরিসংখ্যান নির্দেশ করে ১১৫ বর্গমাইলের গোয়ালন্দ থানা বর্তমান রাজবাড়ি থানার এরিয়া নিয়ে গঠন করা হয়েছিল। গোয়ালন্দ মহকুমা ও থানার প্রশাসনিক কাজ রাজবাড়ি থেকে সম্পাদিত হলেও ইতিমধ্যে গোয়ালন্দ থানার প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানসহ নানা অফিস শিক্ষা প্রতিষ্ঠন গড়ে ওঠে। ১৯৮৪ সালে রাজবাড়ি জেলা গঠনকালে গোয়ালন্দবাসী গোয়ালন্দকে জেলা ঘোষণার দাবি রাখে। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। গোয়ালন্দ নামে মহকুমা হলেও কোর্ট কাচারী, অফিস আদালত, রেল স্থাপনাসহ রাজবাড়ি বৃহৎ শহর বিধায় রাজবাড়িবাসির দাবিতে শেষ পর্যন্ত ঐক্যমতের ভিত্তিতে ‘রাজবাড়ি’ নামে জেলা ঘোষণা করা হয়। গোয়ালন্দর সামনে চর জেগে ওঠার বিগত শতাব্দীর ৭০ দশকের মাঝামাঝি ঘাট দৌলতদিয়া স্থানান্তর করা হয়। দৌলতদিয়া এখন বাংলাদেশের দক্ষিণের দ্বারপথ।

প্রফেসর মতিয়র রহমান


মহানায়ক স্বামী সমাধি প্রকাশারণ্য

মহানায়ক স্বামী সমাধি প্রকাশারণ্য-মহানায়ক যাঁর তত্ত্ব, আদেশ, উপদেশ, কর্ম পরিধি

স্বামী সমাধি প্রকাশারণ্য কিংবদন্তির মহানায়ক যাঁর তত্ত্ব, আদেশ, উপদেশ, কর্ম পরিধি, বিদেশ বিভুঁইয়েও কথিত। রাজবাড়ী জেলা নলিয়া জামালপুরের ঊনবিংশ শতাব্দীর আশির দশকে জন্মগ্রহণ করেন স্বামী সমাধি প্রকাশারণ্য। বাল্যকালে তার নাম ছিল নরেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যয়। সাধারণ লোকে বলে নরেশ পাগলা। এই নরেশ পাগলাই পরে আর্যসংঘের প্রতিষ্ঠা ও সভাপতি।

স্বামী প্রকাশারণ্য তৎকালীন সময় প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে ইংরেজিতে এমএ পাশ করেন। ছাত্রকালীন শ্রী রামকৃষ্ণের মানসপুত্র ব্রহ্মনিন্দ মহারাজদের সাথে তার আলাপচারিতা ছিল। লেখাপড়া শেষে তিনি বালিয়াকান্দি হাই স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। পনের বছর তিনি এ পেশায় ছিলেন। ব্রক্ষচারী সাধক এতে তুষ্ট হননি। পিতা বিবহ দেন কিন্তু তিনি ঘর সংসারে আটকে থাকেন না। কোন সুদূরের পিয়াসা তার মধ্যে। শিক্ষক জীবনেই তার বানপ্রস্থ অবস্থা। শিক্ষকতা কাজে থাকাকালীন তার বেশভূষা দেখলেই বোঝা যেত তিনি একজন সাধক বা সাধু পুরুষ। পরনে হাঁটু পর্যন্ত লম্বিত পাজামা, গায়ে খদ্দরের হাফ জামা, পায়ে সেন্ডেল। মাথায় তেলহীন চিকন কালো চুল। দীর্ঘ ঋজু দেহ। গৌরকান্তি তেজোদ্দীপ্ত চেহারা দেখলেই বোঝা যায় তিনি অপবিগ্রহ সাধকের মূর্ত প্রতীক।

ফরিদপুর জেলার শিক্ষক সম্মেলনে যোগদান করেন। সেখানে তাঁর অভিভাষণ থেকে চালু হয় বিদ্যালয়ে প্রাথমিক ধর্ম শিক্ষা। যেখানে ধর্ম সভা, কীর্তন, ভাগবত পাঠ, ধর্মালোচনা সেখানেই মাস্টার মশাই। বাল্যকাল থেকেই ব্রাহ্মণ হয়ে আচণ্ডাল শুদ্রদির সাথে মিশে গেছেন। তাদের অন্ন ভোজন করেন। বুঝেছিলেন জাতি ভেদ প্রথা সমাজ প্রভূত ক্ষতিসাধন করছে। এর বিরদ্ধে ঘোষণা করেছিলেন বিদ্রোহ। লিখলেন, জাতিকথা পরশমণি। এসকল পুস্তকে প্রমাণ করলেন জাতিভেদ প্রথার অসারতা। সত্যের সন্ধানে দিনাজপুরের এক হাঁড়ি তার কাছে দীক্ষা প্রার্থী হলে স্বামীজি নিজেই দীক্ষাগ্রহণ করলেন দিনাজপুরে তার বাড়িতে যেয়ে।

ব্রহ্মচারীর মুক্তি মনুষ্য জীবনের পরম কাম্য। এ পথে আসতে হলে প্রয়োজন ব্রহ্মকালচার বা সমাধি সাধন। দীক্ষা গ্রহণের পর তিনি ‘স্বামী সমাধি প্রকাশারণ্য’ নাম গ্রহণ করেন। প্রতিষ্ঠা করেন আর্য সংঘ। আর্য সংঘের মাধ্যমে তিনি তাঁর মত, পথ ওত্ত্ব প্রকাশ করেন। তিনি বলেন জন্মান্ত রবাদ কোনো মিথ্যা নয়। উহার সদৃশ্য দার্শনিক যুক্তির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব। এর থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় সাংখ্য যোগ। তিনি ঘোষণা করেন সমাধি জাত বিজ্ঞানই সম্যক বিজ্ঞান। তা দ্বারাই দুঃখের নিবৃত্তি হয়। গৌতম বু্দ্ধ বা শ্রী রামকৃষ্ণের মতো তার মতবাদ তৎকালীন পূর্ববাংলাসহ ভারতে বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তার লাভ করে। গড়ে ওঠে সংঘ, মঠ, সমাধি, আশ্রম। এরই সূত্র ধরে তৎকালীন পশ্চাৎপদ জনপদ জঙ্গল ইউনিয়নে ১৯৩৯ সালে গুরুজীর ইচ্ছা ও দরদী মনের পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় আর্য সংঘ আশ্রম, মঠ ও মন্দির। স্থাপিত হয় হাট-বাজার পোস্ট অফিস, আর্য সংঘ বিদ্যালয়। আশ্রম প্রাঙ্গণে প্রতিষ্ঠা করলেন পার্থ সারথী মন্দির। স্থানের নাম দিলেন সমাধিনগর। এখানে বরেণ্য ব্যক্তির আগমন ঘটে। সমাধিনগর পার্থ সারথী মন্দির আশ্রম ভগ্নপ্রায়।

 

(প্রফেসর মতিয়র রহমান)

মথুরাপুরে সংগ্রাম সাহের দেউল

মথুরাপুরে সংগ্রাম সাহের দেউল-প্রফেসর মতিয়ার রহমান

বর্তমান মধুখালি পূর্বে গোয়ালন্দ মহকুমা এবং বালিয়াকান্দি উপজেলাধীন ছিল। সাম্প্রতিকালে মধুখালি ফরিদপুর জেলাভুক্ত করা হয়। মধুখালির সন্নিকটে মথুরাপুরে মন্দির সদৃশ্য প্রায় ৭০‌‍‍‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌ ফুট উঁচু, ১২টি কোণ অলম্কৃত দেওয়াল এবং ফাঁকে ফাঁকে ইটের কার্ণিশ বিশিষ্ট দেওয়াল। বির্ভিন্ন থাকের ফাঁকে ফাঁকে বিশেষ করে নিচের দিকে পোড়া মাটির চিত্রফলক বসানো। এগুলিতে রামায়ণ, মহাভারত ও অন্যান্য পৌরাণিত কাহিনীর চিত্র আছে। সর্ব সাধারণ্যে এটি ‘মথুরাপুরের দেউল’ বলে পরিচিত। দেউলটির ইতিহাস এবং নির্মাণকাল নিয়ে যেমন উৎসুক্য আছে তেমনি আছে নানা মতভেদ। ঐতিহাসিক আনন্দনাথ রায় এবং সতীশ চন্দ্র মিত্রের লেখা ফরিদপুরের ইতিহাস এবং যশোর-খুলনার ইতিহাসে উক্তি দেউলকে সংগ্রাম সাহর দেউল বলা হয়েছে। অনেকই মনে করেন মানসিংহের সাথে যশোহরের ভূমিরাজ প্রতাপাদিত্যের যে যুদ্ধ হয় তাতে প্রতাপ হেরে যান। বিজয় স্তম্ভ হিসেবে মানসিংহ তা নির্মাণ করেন। উল্লেখ্য মানসিংহ আগমন করেন ১৫৯৫ সালে এবং প্রস্থান করেন ১৬০৪ সালে। তিনি বাংলায় বার-ভূঁইয়া দমনের উদ্দেশন করেছিলেন। তখন প্রতাপাদিত্য ছিলেন যশোহরের রাজা আর মুকুন্দরাম ছিলেন ভূঁইয়া দমনের উদ্দেশ্যেই আগমন করেছিলেন।

১৬০৩ সলে ধুমঘাটে প্রতাপাদিত্যের সাথে মানসিংহের যুদ্ধে প্রতাপ পরাজিত হলে মানসিংহের সাথে তার সন্ধি হয়। এরপর প্রতাপাদিত্য ১৬০৯ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেন। প্রতাপাদিত্য ১৬০৯ খ্রিস্টব্দে ইসলাম খাঁর হাতে বন্দি হন। তার পর্বেই ১৯০৪ এর মানসিংহ আগ্রায় ফিরে যান। এদিকে ভূষণার রাজা মুকুন্দরামের সাথে মানসিংহের কোনো যুদ্ধই হয় নাই। তাই ভূষণার অন্তর্গত মথুরাপুরে মানসিংহ বিজয় স্তম্ভ নির্মাণ করবেন কেন? আনম আবদুস সোবাহান লিখিত ‘ফরিদপুরের ইতিহাস-বৃহত্তর ফরিদপুর’ গ্রন্থে ৪৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন ‘সীতারাম পতনের পর ভূষণার নিকটবর্তী মথুরাপুর গ্রামে একটি বিজয়স্তম্ভ নির্মিত হয়। সীতারাম নবাব মুর্শীদকুলি খাঁর নিকট পরাজিঁত হন।

মুর্শীদকুলি খাঁর দ্বারা তা নির্মিত হলে মুসলিম স্থাপত্য বহন করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু স্তম্ভটিতে রয়েছে হিন্দু স্থাপত্যসহ রাময়ণ, মহাভারতসহ পৌরাণিক বিষয়, যে কারণে বলা যায় তা হিন্দু স্থাপত্যসহ রামায়ণ, মহাভারতসহ পৌরাণিক বিষয়, যে কারণে বলা যায় তা হিন্দু কোনো সৈনিক বা রাজা তা নির্মাণ করেন। ইতিপূর্বে আমি রাজবাড়ি জেলার ইতিহাসে স্তম্ভটিকে সীতারামের দেউল বলে উল্লেখ করেছি। বস্ত্তত প্রাচীন ইতিহাস লিখন ব্যাপক গবেষণা নির্ভর। সে সময় রাজবাড়ি জেলার ইতিহাস রচনায় অতি নির্ভর আনন্দনাথ রায়ের ফরিদপুরের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসটি কোথাও খুঁজে পাই নাই। খন্ডিত যে অংশটি পেয়েছিলাম তাতে সংগ্রাম সাহর অংশটুকু ছিল না। এ ছাড়া যশোর-খুলনার ইতিহাস (সতীশ চন্দ্র মিত্র) গ্রন্থটির পরিপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে পরি নাই। এক্ষণে আনন্দনাথ রায়ের ১০০ বছর পূর্বে লেখা ফরিদপুরের ইতিহাস গ্রন্থটি ঢাকা থেকে পুনমুদ্রন (‘ম্যাগনাম ওপাস এবং ড. তপন বাগচী সম্পাদিত-শত বছরের শ্রদ্ধাঞ্জলি- আনন্দনাথ রায়ের ফরিদপুরের ইতিহাস, আহমদ কাউছার, বইপত্র, ৩৮/৪ বাংলাবাজার ঢাকা থেকে প্রকাশিত) হয়েছে। এ ছাড়া শত বছরের পুরোন-যোগেন্দ্র নাথ রচিত ‘বিক্রমপুরের ইতিহাস’ এবং ১৯২৮ সালে প্রকাশিত এলএন মিশ্রের ‘বাংলায় রেল ভ্রমণ’ গ্রন্থগুলি আমার হাতে থাকায়, এক্ষণে দেউলটির প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরতে পারব বলে বিশ্বাস রাখি।

প্রথমেই দেউল সম্পর্কে বলা যাক – দেউল বলতে বোঝায় দেবালয়। দেবকুল শব্দ থেকে দেউল শব্দের উৎপত্তি। দেবকুলিকা শব্দের অর্থ ক্ষুদ্র দেউল বা মন্দির। গবেষক অধ্যাপক কিলহর্ন দেবকুলিকাকে ক্ষুদ্র দেবমন্দির বলে আখ্যা দিয়েছেন। আবার এ বাক্যটি হয়ত অনেকেরই জানা ‘আছিল দেউল এক পর্ব্বত সমান। কাজেই দেউল বলতে বৃহদাকার দেব মন্দিরও বোঝায়। দেউল বা দেবমন্দির নির্মাণের প্রাচীন ইতিহাস রয়েছে। সেন রাজত্বকালে তান্ত্রীক মন্ত্রে দিক্ষিত সেনেরা স্থানে স্থানে দেবদেবী পূজায় দেউল নির্মাণ করত। তৎকালীন সেন রাজাদের রাজধানী বিক্রমপুরে দেউল নির্মাণ করত। তৎকালীন সেন রাজাদের রাজধানী বিক্রমপুরে দেউল বিষয়ে যা বলছিলাম তাতে দেউলের আকার আয়তনে দৃষ্ট হয় এটি ছিল বড় আকারের দেব মন্দির-দেবালয় বা দেউল। মথুরা পুরের দেউল বিষয়ে আনন্দ নাথের ফরিদপুরের ইতিহাসের ৮২ পৃষ্ঠায় ‘১৬৫৩ হইতে ১৬৮৪ পর্যন্ত প্রায় একত্রিংশ বৎসর পর্যন্ত এইরুপে আমরা বঙ্গদেশ ও রাজপুতনায় সংগ্রামকে দেখতে পাই। আবার এই সুদীর্ঘ সময় পর্যন্ত ঔরঙ্গজের বাদশাই দিল্লীর সিংহাসনে রাজত্বকারী ছিলেন। মোগল রাজবংশ মধ্যে আওরঙ্গজেব যত দীর্ঘকাল শাসনদন্ড পরিচালনা করেন সেরুপ আর কেহ পারেন নাই। এই সম্রাটের অধীন থাকিয়া যে একই সংগ্রাম বিভিন্ন স্থানে নানা কার্যসম্পাদন করিয়াছিলেন এদ্বিষয়ে কারো সন্দেহ থাকিতে পারে না। সম্রাট মধ্যবাঙলার ভূষণা, মাহমুদপুর প্রভৃতি স্থান তাকে জায়গীর অর্পণ করেন এবং কালিয়াতেও একটা জায়গির ছিল যাকে আজও নাওয়াড়া বলিয়া প্রসিদ্ধ আছে। ভূষণা পরগনার অন্তর্গত মথুরাপুর নামক স্থান তাহার প্রকাণ্ড বাড়ি বর্তমান ছিল। এই স্থানটি ফরিদপুর জেলার কোড়কদি ও মধুখালির স্থানদ্বয়ের সন্নিকটে অবস্থিত। কোড়কদির মাননীয় ভট্টাচার্য বংশের পূর্বপুরুষ তাহার গুরু ছিলেন। অদ্যাপি তৎপ্রদত্ত কতিপয় ভূ-বৃত্তির লিখন উক্ত মহাশয়দিগের নিকট বর্তমান আছে। মথুরাপুর গ্রামে আজিও প্রকান্ড মঠ দৃষ্ট হয় যাকে সাধারণে সংগ্রামের দেউল বলে।

এদিকে শ্রদ্ধেয় সতীশ চন্দ্র মিত্রের যশোর-খুলনার ইতিহাসের ৩৩৬ পৃষ্ঠায় ‘ভূষণার নিকটবর্তী কোড়কদি গ্রামের প্রখ্যাত ভট্টাচার্যগণ সংগ্রামের বারিত হইতে বধ্য হন। এখনো তাহাদের গৃহে সংগ্রাম প্রদত্ত ভূমি বৃত্তির সনদ আছে। যশোর কালেক্টরিতে তৎপ্রদত্ত আরো কয়েকখানি ব্রক্ষোত্তর তায়দাদ পাওয়া গিয়াছে। সংগ্রামের অন্য কীর্তির মধ্যে মথুরাপুরে তাহার সময়ে নির্মিত একটি দেউল বা মন্দির বর্তমান আছে। গল্প আছে। গল্প আছে তিনি একটি বিগ্রহ পরিচালনার জন্য মন্দিরটি নির্মাণ করিতেছিলেন, কিন্তু একজন রাজমিস্ত্রী দেউলের চূড়া হইতে পড়িয়া মৃত্যুমুখে পতিত হয় বলিয়া সে সস্কল্প পরিত্যক্ত হইয়াছিল।

সংগ্রাম সাহর বিশদ আলোচনার পর এ বিষয়ে আর সন্দেহ থাকার কথা নয় যে মথুরাপুরের দেউল অন্যকারো কীর্তি নায়। নিঃসন্দেহে দেউলটি সংগ্রাম সাহর-ই কীর্তি। বর্তমানে দেউলটি ভগ্ন প্রায়। রাজবাড়ি তথা এতদ্বঅঞ্চলে প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিজড়িত এ দেউলটি সংস্কার করতঃ ঐতিহ্যটি রক্ষা করা প্রয়োজন।

রাজবাড়ী জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য
প্রফেসর মতিয়ার রহমান

বার ভূঁইয়াদের স্মৃতি

বার ভূঁইয়াদের স্মৃতি ও শাসনাধীন

বঙ্গে শাসনতান্ত্রিক ধারায় ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় পাল ও সেন রাজাদের শাসনের পর বঙ্গ ধীরে ধীরে মুসলিম শাসনাধীন হয়। ১২০৪ মতান্তরে ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজির বঙ বিজয় থেকে শুরু হয়ে ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে নবাবই সিরাজ-উদ্-দৌলার পতন পর্যন্ত বঙে মুসলিম শাসনকাল স্থায়ী হলেও সমগ্র বঙে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা ছিল এক দীর্ঘকালীন প্রচেষ্টা। গৌড় অধিকার করেই পাঠানেরা বঙ্গের রাজা হয় নাই, বঙ্গ অধিকার করতে তাদের অনেকদিন লেগেছিল।খিলজীর পরবর্তী পাঠান রাজারা দেশীয় জমিদার ও প্রজার উপর অধিকার প্রতিষ্ঠা নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন। এ ছাড়াও তারা দিল্লীর সম্রাটদের সন্ত্তষ্ট রাখাতে ব্যাস্ত থাকত। দিল্লীতে সুলতান মইজুদ্দিন তুঘলকের মৃত্যুর পর সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের বংশধরগণ বাংলাদেশ শাসন করেন। তাদের মধ্যে প্রথম সুলতান বুঘরা খান ১২৮১ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু করে ১২৮৭ পর্যন্ত ছয় বছর ধরে লক্ষ্ণৌতে দিল্লীর শাসনকর্তা হিসেবে শাসন করেন। কিন্তু সুলতান বলবনের মৃত্যুর পর বুঘরা খান নেজেকে বাংলার স্বাধীন সুলতান বলে ঘোষণা করেন। এরপর থেকেই বাংলার স্বাধীন সুলতানি যুগের সুচনা। এ যুগেই মুসলমান রাজাদের ইতিহাসে বাংলার ইতিহাসের অধ্যায়ের সূচনা করে। এ সময় সমগ্র বংলাদেশ চারটি সুনির্দিষ্ট বিভাগে বিভক্ত হয় যথা লক্ষ্ণৌতি, সাতগাঁও, সোনারগাঁও, চাটিগাঁও (চট্টগ্রাম)। এ সময় শক্তি, সম্পদ ও ঐশ্বর্যে সোনারগাঁ লেক্ষ্ণৌতিকে অতিক্রম করে। তবে ২০/২২ জন পাঠান নৃপতি ১৪০ বছর যাবৎ বঙ্গদেশ শাসন করলেও সমগ্র বাংলা তাদের করায়ত্ব হয় নাই। খণ্ডিতভাবে সুলতানদের দ্বারা বাংলা শাসিত হত।

শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহ (১৩০১-১৩২২) কেবল পূর্ববঙ্গ অধিকার করতে সমর্থ হন। এরপর ১৩৩৯ খ্রিস্টাব্দে ফখরউদ্দিন মোবারক শাহ পূর্ববঙ্গ এবং শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ পশ্চিমবঙ্গে দিল্লীর অধীনতা অস্বীকার করে বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। পরে ইলিয়াস শাহ সমগ্র বঙ্গের স্বাধীন নৃপতি হন। এই সময় থেকেই সমগ্র বাংলাদেশ ‘বাঙলা সুবে’ বা ‘সুবে বাঙলা’ নামে আখ্যায়িত হয়। ১৩৫৮ সালে তাঁর মৃত্যুর পর নানা অরাজগতা শুরু হয়। বস্ত্তত বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমলে বিশেষ করে মোগল সম্রাট আকবরের বঙ্গ বিজয়ের (১৫৭৬) পূর্ব পর্যন্ত পাঠান, আফগান সুর করবানী বংশীয় শাসনকালে স্থানীয় জমিদর, প্রভাবশালী বীর সেনানায়কদের দ্বারা সুলতানগণ প্রায়শঃই প্রতিবাদের সম্মুখীন হতেন। ১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে দাউদ খান করবানীর পরাজয় ও হত্যার ফলে বাংলা মোগল সাম্রাজ্যের অধিকারভূক্ত হয়। কিন্তু বিশ বছর যাবৎ মোগলদের রাজ্য শাসন এদেশে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। বাংলায় একজন মোগল সবাদার ছিলেন এবং অল্প কয়টি সেনানিবাস স্থাপিত হয়েছিল। কেবলমাত্র রাজধানী ও সেনানিবাসের জনপদগুলো মোগল শাসন মেনে চলত, অন্যত্র ব্যাপক অরাজগতা ও বিশৃংখলা চরম পৌঁছেছিল। আফগান সৈন্যরা লুটতরাজ করত এবং মোগল সেনারাও এভাবে অর্থ উপার্জন করত। বাংলার বড় বড় জমিদারগণ করবানী রাজত্বের অবসানের পর নিজেদের জমিদারীতে স্বাধীনতা অবলম্বন করন। তাদের শক্তিশালী সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী ছিল।

এই সকল জমিদারগণ, ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি অবলম্বন করে পার্শ্ববতী অঞ্চল দখল করতে সচেষ্ট থাকতেন। কখনো কখনো জমিদারগণ সাময়িকভাবে বাংলায় মোগল শাসন প্রতিষ্ঠায় আকবরের সেনাপতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হতেন। এই জমিদারেরা বাংলায় বার ভূঁইয়া নামে পরিচিত। ভূঁইয়াদের বিষয়ে শ্রী সতীশ চন্দ্র মিত্র বলেন- ‘উহাদের কাহারো বা শাসনস্থল একটি পরগনাও নহে, আবার কেহ বা একখণ্ড রাজ্যের অধীশ্বর। কোথাও বা দশ বারোজন ভূঁইয়া একজনকে প্রধান বলিয়া মানিয়া তাহার বশ্যতা স্বীকার করিত। প্রতাপান্বিত ভূঁইয়ার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হইতেন। তখন রণবঙ্গ রাজায় রাজায় না হইয়া ভূঁইয়া ভূঁইয়া চলিত। আর প্রজাদিগের সকলেই সেই যুদ্ধ ব্যাপারে যোগ দিয়া ফলত্যাগী হইতে হইত। এই অরাজগতার যুগে কেহ নির্লিপ্ত থাকিতে পারিতেন না। সকলকেই রাজনৈতিকতায় যোগ দিতে হইত নইলে আত্ম পরিবারের প্রাণ রক্ষা পর্যন্ত অসম্ভব হইত। ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে বাবরের রাজ্য আরম্ভ হতে ১৫৫৬ খ্রিস্টব্দে আকবরের রাজ্য লাভ পর্যন্ত বঙ্গে কোনো সুশাসন প্রতিষ্ঠা হয় নাই। সুলেমান ফরায়েজীর কঠোর শাসনের মধ্যে যে শান্তিটুকু ছিল সেনাপতি কালাপাহাড়ের অত্যাচারে তাও তিরোহিত হয়। এই সময় সাধারণ প্রজাকুল মোগল কর্মচারী কর্তৃক নানাভাবে প্রতারিত হতে থাকে। কম্কনের ভাষায় তার পরিচয় পাওয়া যায় –মোগল ডিহিদার বা তহশীলদের ঘুষ নিয়ে খিল (পতিত) ভীমিতে নাল লিখে প্রজাদের প্রতারিত করত। ভূঁইয়াগণ ঐ সময় অনেক স্থলে ডিহিদারের হাত থেকে বিদ্রোহী প্রজাদের আশ্রয় দিত।

সরকার হইলা কাল, খিল ভূমি লেখে নাল
বিনা উপকারে খায় অতি (ঘুষ)
পোদ্দার হইল যম, টাকায় আড়াই আনা কম,
পায় লভ্য, পায় দিন প্রতি।
জমিদর পতিত আছে, প্রজারা পালায় আছে
দুয়ার চাপিয়া খায় থানা
প্রজা হইল ব্যকুলী, বেঁচে ঘরের কুড়ালী,
টাকার দ্রব্য বেঁচে দশ আনা-
(কবি কষ্কন চণ্ডী, পৃষ্ঠা-৫)

উক্ত ভূঁইয়া বা ভূঁইয়াগণকে শুদ্ধ ভাষায় ভৌমিক বলা হয়। ইংরেজ আমলে যাদের জামিদার বলা হত অনেকটা সেরকম। ভূঁয়াগণ আত্নরক্ষা ও রাজস্ব সংগ্রহের জন্য যথেষ্ট সৈন্য সংগ্রহে রাখতেন। অস্ত্রসহ দুর্গ ও নৌবাহিনীর আয়োজন করতেন। বীর বলে তাদের খ্যাতি ছিল। প্রজারা তাদের ভয় ভক্তিও করত। ঐতিহাসিকদের মতে সে সময় যে কত পরিচিত ও অপরিচিত ভূঁইয়া ছিলেন তার হিসেব কেউ রাখতেন না। তবে তাদের মধ্যে যারা বীরত্বে অগ্রগণ্য, যাদের রাজত্ব বিস্তীর্ণ এবং যারা বিপুল সৈন্যবলে শক্তি সম্পন্ন হতেন তাদের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ত। ইতিহাসগতভাবে এরুপ ১২ জন ভূঁইয়ার বিশেষ পরিচিতি পাওয়া যায় এবং তারা বঙ্গদেশে বার ভূঁইয়া বলে পরিচিত। তারা হলেন-

(১)  ঈশা খাঁ-মসনদ আলী খিজিরপুর বা কত্রাস্থ-সোনারগাঁ।
(২)  প্রতাপাদিত্য –যশোহর বা চাণ্ডিক্যান- বর্তমান রাজবাড়ীর পশ্চিমাংশ।
(৩)  চাঁদ রায় ও কেদার রায় – শ্রীপুর বা বিক্রমপুর।
(৪)  কন্দর্প রায় ও রামচন্দ্র রায়- বাকলা বা চন্দ্রদ্বীপ-বরিশাল।
(৫)  লক্ষণ মাণিক্য- ভূলুয়া- নোয়াখালি।
(৬)  মুকন্দরাম রায়- ভূষণা বা ফতেহাবাদ-ফরিদপুর- রাজবাড়ী।
(৭)  ফজল গাজী, চাঁদ গাজী- ভাওয়াল।
(৮)  হামীদ মল্ল বা বীর হম্বির- বিষ্ণুপুর।
(৯)  কংস নারায়ণ- তাহিরপুর।
(১০)  রামকৃষ্ণ- সঁ-তৈর বা সান্তোল।
(১১)  পিতাম্বর ও নীলাম্বর-পুঁঠিয়া।
(১২)  ঈসা খাঁ লোহানী ও ওসমান খাঁ-উড়িষ্যা ও হিলি।

ঐতিহাসিকদের মতে এদের মধ্যে প্রথম ছয়জন খুবই বিখ্যাত। ফলে দেখা যায় ভূঁইয়াদের উত্থান ঘটেছিল সোনার গাঁ, বিক্রমপুর, নোয়াখালি , ফরিদপুর, যশোহর ও বরিশাল। তাদের মধ্যে ভূষণা বা ফতেহাবাদের মুকুন্দরাম রায় ও প্রতাপাদিত্য রাজবাড়ী জেলার ইতিহাসে বিবেচ্য। (ইতিপূর্বে) ভূষণাধিপতি, অন্যতম ভূঁইয়া মুকুন্দরাম রায় আলোচিত।

রাজবাড়ি জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য

প্রফেসর মতিয়ার রহমান

 

মুকুন্দরাম রায় (ভূঁইয়া) বর্তমান রাজবাড়ী জেলার অতীত ইতিহাস

মুকুন্দরাম রায় (ভূঁইয়া)-বর্তমান রাজবাড়ী জেলার অতীত ইতিহাস

ভূষণার উত্থান পতনের সাথে জড়িয়ে আছে বর্তমান রাজবাড়ী জেলার অতীত ইতিহাস। ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে অনেকগুলি জমিদার এক হয়ে দিল্লিশ্বরের অধীনতা থেকে তাদের মুক্ত করতে প্রয়াসী হন। তারা বার ভূঁইয়া নামে পরিচিত। ভূঁইয়াদের সংখা ১২ কি আট সে বিতর্কে না যেয়ে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্য, চন্দ্রদ্বীপের কন্দর্প রায়, বিক্রম পুরের কেদার রায়, চাঁদ রায়, ভুলুরায় লক্ষণ মানিক্য, ভূষণার মুকুন্দ রায়, ভাওয়ালের ফজল গাজী, খিজিরের ঈশা খাঁ, পাবনার বিনোদ রায় ইতিহাসের পাতায় প্রসিদ্ধ। মোগল বাদশাগণের সময়ে বাদশাহের প্রতিনিধি স্বরুপ মুসলমান নবাব দ্বারা বঙ্গদেশ শাসিত হত। তবে দেশ রক্ষা ও সাধারণ প্রজাদের রক্ষণাবেক্ষণের ভার দেশীয় জমিদারগণের উপরই নির্ভর করত। এ কারণে প্রত্যেক জমিদারের অধীনেই পদাতিক, অশ্বারোহী, নৌযান, সদা প্রস্তুত থাকত।

আইনী আকবর গ্রন্থ থেকে জানা যায় বাদশা আকবরের রাজত্বকালে স্বদেশীয় জমিদাররা ২৩৩৩০ জন অশ্বারোহী, ৮০১১,৫০ জন পদাতিক, ১৭০টি হস্তী, ৪২৬০টি কামান এবং ৪৪০০ নৌকা সম্রাটের জন্য সদা প্রস্তুত রাখতেন। আকবরের রাজত্বকালে অনেক জমিদারই তাঁর আজ্ঞা শিরোধার্য বলে বিবেচনা করত। কিন্তু দ্বাদশ ভৌমিক তার বিরুদ্ধাচরণ কেন করল সে প্রশ্ন ইতিহাসবিদদের অভিমত বাদশাহের কর্মচারীদের সাথে তাদের বনিবনাও হত না। এছাড়া পরাজিত পাঠানদের অনেকই তাদেরকে উত্তেজিত করত। উররোরণ্ড টোডর মলের অন্যায় বন্দোবস্ত ভূম্যাধিকারীদের বিদ্রোহের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ভূষণার মুকুন্দরাম এমনি একজন সাধারণ জমিদার মুকুন্দরামের পূর্ব পুরুষের বিষয়ে আনন্দনাথ এর অভিমত চাঁদ রায় ও কেদার রায়ের পূর্ব পুরুষেরা ফাতেহাবাদ আগমন করেন। বিত্রমপুরের রায়রাজগণ, চন্দ্রদ্বীপের রাজরাজগণ, ফাতেহাবাদের রাজরাজগণ সকলেই উপাধিধারী কায়স্থ ছিলেন। বখতিয়ার খলজি যখন বাংলাদেশ আক্রমণ করেন অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন সেই সময় বাকলা চন্দ্রদ্বীপের ধনুজমর্দন রায়ের বংশাবলীর অনেক পূর্বে বঙ্গের অনেক স্থানে জমিদারী, সুষ্টি করলে তারা নানা সম্প্রদায়ের বিভক্ত হয়ে পড়েন। এই সময়ে ‘ভূষণা পট্টি বলয়া’ একটা সাধারণ সমাজের সৃষ্টি হয়। বরেন্দ্র ব্রাক্ষণগণ মধ্যে ‘ভূষাণা পিট্ট বলায়’ এক সম্প্রদায়ের বর্তমান দেখা যায়। এই রাজবংশের উৎসাহে ভূষণায় বিবিধ প্রকারে শিল্পকর্মের উৎকর্ষ সংগঠিত হয়। ভূষণা বর্তমান মধুখালির অন্তর্গত। ভূষণা বিভাগের বিশেষ করে বালিয়াকান্দি অঞ্চলের উৎপাদিত কার্পাস, পাট, ইউরোপে রপ্তানি হত। ফাতেহাবাদের স্থাপতিরা এক সময় যাবতীয় নির্মাণ কাজ করত। ভূষণার কাঁসা পিতল বিখ্যাত ছিল। এ অঞ্চলে রেশম,মসলা, পান সুপারি, খয়ের, তিল, তিসি কার্পাস, জাফরান ইত্যাদি ব্যবসা জমজমাট ছিল। এই স্থানেই মুকুন্দরাম জমিদারী গড়ে তোলেন। পাঠান কোতল খাঁ ফাতেহাবাদ আক্রমণ করলে মুকুন্দ রায় মোগলদের পক্ষ অবলম্বন করেন। এতে মানসিংহ সন্ত্তষ্ট হয়ে মুসমানদের অন্য কোনো শাসনকর্তা নিয়োগ না করে মুকুন্দ রায়কে রাজোপাধি অর্পণ করে তাঁকে ফাতেহাবাদের শাসনভার অর্পণ করেন।

মোরাদ খানের মৃত্যুর পর মুকুন্দরাম মোরাদের পুত্রগণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে সম্গ্র ফতেহাবাদের রাজা হন। সম্রাট অকবরের মন্ত্রী টোডরমল মুকুন্দরামকেই ভূষণার জমিদার বলে স্বীকার করেন (১৫৮২)। মুকুন্দরাম মাঝেমধ্যে নামে মাত্র পেশকাম পাঠিয়ে দিল্লি সম্রাটের অধীনতার ভান করতেন। কিন্তু কার্যত তিনি ছিলেন স্বধীন। আকবরের রাজত্বকালে শেষে বার ভূঁইয়াদের বিদ্রোহকালে বিদ্রোহীদের নেতা ছিলেন। প্রতাপাদিত্য ও কেদার রায়ের রাজ্য উৎসন্নে গেলেও মুকুন্দরাম দমিত হন নাই। জাহাঙ্গীরের সময় ইসলাম খাঁ (১৬০৮) বঙ্গের শাসনকর্তা হয়ে আসলে তিনি মুকুন্দরামের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করেন এবং তার অধীনে একদল সৈন্য পাঠিয়ে কোষহাজো (আসামের কামরুপ) অধিকার করেন। মুকুন্দরাম তখন গৌরহাটি ও পণ্ড্রর থানাদার নিযুক্ত হন। পরে তিনি তার পুত্র ছত্রাজিতকে রেখে ভূষণায় ফিরে আসেন। এসময় তিনি প্রবল পরাক্রান্ত হয়ে নামমাত্র পেশকামও বন্ধ করে দেন। মানসিংহের সময়ে সৈয়দ খাঁ যখন বঙ্গের শাসনকর্তা তখন সৈয়দ খাঁর সাথে যে যুদ্ধ হয় তাতে মুকুন্দরাম নিহত হন। এরপর তার পুত্র ছত্রাজিত মোগল বশ্যতা স্বীকার করেন। অধ্যাপক যদুনাথ সরকার কর্তৃক আবিস্কৃত আব্দুর লতিফের ভ্রমণ কাহিনী বিষয়ক গ্রন্থ থেকে জানা যায় ইসলাম খাঁ ঢাকা যাবার পথে ভূষণার রাজা ছাত্রাজিতকে কয়েকটি হাতি উপহার দিয়ে নবাবের সাথে সাক্ষাৎ করেন। নবাব পুনরায় কোষহাজো অধিকার করার জন্য যে সৈন্য প্রেরণ করেন তার সাথে ছত্রাজিত ছিলেন। ছত্রাজিত কোষহাজোর রাজ ভ্রাতা বলদেবের সাথে গুপ্ত ষড়যন্ত্র করে মোগলদের গতিবিধি জানানোর কারণে বন্দি হয়ে ঢাকায় আনিত হন এবং নিহত হন (১৬৩৬)

তথ্যসংগ্রহঃ রাজবাড়ী জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য

প্রফেসর মতিয়র রহমান

বাংলার বারো ভুঁইয়া

বারো ভুঁইয়া, মোগল সম্রাট আকবর-এর আমলে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল শাসনকারী কতিপয় জমিদার বা ভূস্বামী, বারো জন এমন শাসক ছিলেন, যাঁদেরকে বোঝানো হতো ‘বারো ভূঁইয়া’ বলে। বাংলায় পাঠান কর্‌রানী বংশের রাজত্ব দূর্বল হয়ে পড়লে বাংলাদেশের সোনারগাঁও, খুলনা, বরিশাল প্রভৃতি অঞ্চলে কিছু সংখ্যক জমিদার স্বাধীন রাজার মতো রাজত্ব করতে থাকেন। সম্রাট আকবর ১৫৭৫ সালে বাংলা দখল করার পর এসকল জমিদার ঐক্যবদ্ধ হয়ে মোগল সৈন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন।

বারো ভুঁইয়া নামে পরিচিত যে সকল জমিদাররা হলেন:

১. ঈসা খাঁ – খিজিরপুর বা কত্রাভূ,
২. প্রতাপাদিত্য – যশোর বা চ্যাণ্ডিকান,
৩. চাঁদ রায়, কেদার রায় – শ্রীপুর বা বিক্রমপুর,
৪. কন্দর্প রায় ও রামচন্দ্ররায় – বাক‌্লা বা চন্দ্রদ্বীপ,
৫. লক্ষ্মণমাণিক্য – ভুলুয়া,
৬. মুকুন্দরাম রায় ভূষণা বা ফতেহাবাদ,
৭. ফজল গাজী – ভাওয়াল ও চাঁদপ্রতাপ,
৮. হামীর মল্ল বা বীর হাম্বীর – বিষ্ণুপুর,
৯. কংসনারায়ন – তাহিরপুর,
১০. রামকৃষ্ণ – সাতৈর বা সান্তোল,
১১. পীতম্বর ও নীলম্বর – পুঁটিয়া, এবং
১২. ঈশা খাঁ লোহানী ও উসমান খাঁ লোহানীঃ – উড়িষ্যা ও হিজলী।

সম্রাট আকবর (১৫৫৬-১৬০৫) তাঁর জীবদ্দশায় সমগ্র বাংলার উপর মুঘল অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হননি।কারণ বাংলার বড় বড় জমিদারেরা স্বাধীনতা রক্ষার জন্যে মুঘলদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তেন।তাঁরা বারভূঁইয়া নামে পরিচিত।এখানে ‘বারো’ বলতে অনির্দিষ্ট সংখ্যা বুঝায়।

বার ভূঁইয়াদের নেতা ছিলেন ঈসা খাঁ। মুঘল সেনাপতি মানসিংহ জীবনে দুব্যক্তিকে পরাজিত করতে পারেননি-চিতরের রানা প্রতাপ সিং ও ঈসা খাঁ। ১৫৩৭ সালে ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার সরাইল পরগণায় ঈসা খাঁর জন্ম। তাঁর পিতা কালিদাস গজদানী ভাগ্যান্বেষণে অযোধ্যা থেকে গৌড়ে এসে স্বীয় প্রতিভা গুণে রাজস্বমন্ত্রী পদে উন্নীত হন।পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে তাঁর নাম হয় সুলাইমান খাঁ। তিনি সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহের (১৫৩৩-৩৮) মেয়েকে বিয়ে করে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার সরাইল পরগণা ও পূর্ব মোমেনশাহী অঞ্চলের জায়গীরদারী লাভ করেন।

১৫৪৫ সালে শের শাহের পুত্র ইসলাম শাহ দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করার পর সুলাইমান খাঁ দিল্লীর আনুগত্য অস্বীকার করলে কৌশলে তাঁকে হত্যা করে তাঁর দুই নাবালক পুত্র ঈসা খাঁ এবং ইসমাইল খাঁকে একদল তুরানী বণিকের নিকট বিক্রি করা হয়। ১৫৬৩ সালে ঈসা খাঁর চাচা কুতুব খাঁ রাজকার্যে নিযুক্তি লাভ করে বহু অনুসন্ধানের পর সুদূর তুরান দেশের এক ধনাঢ্য ব্যক্তির কাছ থেকে প্রচুর অর্থের বিনিময়ে ২ ভ্রাতুস্পুত্রকে উদ্ধার করেন। এ সময় ঈসা খাঁর বয়স মাত্র ছিল ২৭ বছর। সুলতান তাজ খাঁ কররানী (১৫৬৪-৬৫) সিংহাসনে আরোহণ করে ঈসা খাঁকে তাঁর পিতার জায়গীরদারী ফেরত দেন। বাংলার শেষ স্বাধীন সুলতান দাউদ খাঁ কররানীর রাজত্বকালে (১৫৭২-৭৬) ঈসা খাঁ বিশেষ প্রতিপত্তি লাভ করেন অসাধারণ বীরত্বের জন্যে।

প্রাচীন শাসন

রাজবাড়ী জেলার প্রাচীন শাসন ও জনপদ

রাজবাড়ী জেলা প্রাচীনবঙ্গের জনপদ। পদ্মার প্রবাহের দক্ষিণের ভাগীরথী ও প্রাচীন ব্রক্ষপুত্রের মধ্যবর্তী অঞ্চলের ব-দ্বীপের প্রাচীন পরিচিতি বঙ্গ। সমুদ্র গুপ্তের রাজত্ব কালে (৩৮০-৪১২ খ্রিস্টাব্দে) কবি কালিদাসের রঘু বংশের বঙ্গ পরিচিতে দেখা যায় গঙ্গার মুখের শাখা প্রশাখা দ্বীপ পুঞ্জই বঙ্গ যার অধিবাসীগন জীবনের সকল স্তরে এমন কি যুদ্ধে ও সমুদ্র ব্যবহারে নৌকা ব্যবহার করত। বঙ্গের শাসনকালের প্রাথমিক ধাপে গুপ্ত সাম্রাজ্যের (৩৮০-৫১২) পরিচয় পাওয়া যায়। সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ পশস্তি এবং দ্বিতীয় চন্দ্র গুপ্ত ও সমুদ্র গুপ্তের স্বর্ণ মুদ্রার আবিষ্কারের পর থেকে জানা যায় এ অঞ্চল তাদের অধীন ছিল।

গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া ফোর্টের সন্নিকটে পাওখোলা গ্রামের সোনাকান্দুরীতে স্বর্ণ মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়। চন্দ্র গুপ্তের ও ক্ষন্ধ গুপ্তের শাসন বলতে দক্ষিণ বঙ্গের ফরিদপুর, বরিশাল, যশোরের কিয়দংশকে বোঝানো হয়েছে। পরবর্তীতে এখানে তম্র পট্টলি পাওয়া যায় যাকে ই-ই পার্জিটার বিশ্লেষণ করে মতামত দেন ষষ্ঠ শতকে এখানে আর একটি রাজ্যের উত্থান ঘটে। ৫৩১ এবং ৫৬৭ সালের তাম্র পট্টলির ব্যাখ্যা দিয়ে পার্জিটার ধর্মাদিত্য ও গোপ চন্দ্রের রাজত্বকাল নির্ধারণ করেন। ধর্মাদিত্য ছিলেন অতি ন্যয়পরায়ন ও ধার্মিক রাজা। গোপচন্দ্র গোপীচন্দ্র বলে পরিচিত ছিলেন। কোটালীপাড়া ফোর্টের পশ্চিমাঞ্চলে ঘাঘর নদীর পিনহারির নিকট ঘুঘরাহাটিতে আর একটি তাম্র পট্টলি আবিষ্কৃত হয়। এতে রাজা সমাচার দেবের নাম দেখা যায়। পার্জিটারের মতে ৬১৫-৬২০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সমাচার দেব অত্র অঞ্চলে রাজত্ব করেন। গুপু সাম্রাজ্যের পর এ দেশের অঞ্চল সমাচার দেবের রাজত্বকাল ছিল। সমাচার দেবের রাজত্ব কালের আরো নিদর্শন পাওয়া যায় মুহাম্মদপুরের নিকটবর্তী আমুখালি নদীর তীরে আরো দুটি স্বর্ণ মুদ্রা আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে। নালিনীকান্ত ভট্টশালী এ মতামত স্বীকার করেন এবং বলেন সমাচার দেব ছিলেন রাজা (Monarch) তিনি গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধিকারী নন। তিনি শশাঙ্কের পূর্ব পর্যন্ত রাজত্ব করেন। ইউয়াং চোয়াং-এর বর্ণনা মতে বঙ্গ যথাসম্ভব ৭ম শতাব্দীর মাঝামাঝি সম্রাট হর্ষবধীন হয়। উল্লেখ্য, চৌনিক পরিব্রাজক ইউয়াং চোয়াং (৬৩০-৬৪৩ খিস্টাব্দে) ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল ভ্রমণ করেন।

৬৪৭ খিস্টাব্দে হর্ষবর্ধৃনের মৃত্যুর পর তার সাম্রাজ্য ভেঙ্গে যায় এবং বাংলায় স্বধীন রাজত্বের উদ্ভব হয়। ঢাকার অদূরে আশ্রাফপুর পট্টলিপিতে এর প্রমাণ মেলে। এ সময় স্কন্ধ রাজবংশের উদ্ভব হয়। স্কন্ধ রাজবংশীওরা ছিলিন বুদ্ধিষ্ট এবং রাজধানী ছিল কুমিল্লার সন্নিকটে বড়কামতা।

নবম এবং দশম শতকে চন্দ্রবংশীয় রাজাদের রাজত্ব বঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়। চন্দ্রবংশীয় রাজারা ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। তাদের রাজধানী ছিল ঢাকার বিক্রমপুরে। শরিয়াতপুর জেলার ইদিলপুর তাম্র পট্টলী থেকে জানা যায়। এ বংশের শ্রীচন্দ্র তার ইদিলপুর পট্টলী দ্বারা স্মতট পদ্মাবতী বিষয়ে ইতিপূর্বে আলোচিত হয়েছে। উল্লেখ্য ৮ম শতকের পুণ্ড্রভূমিতে (মহাস্থানগর বর্তমান বগুড়া) পাল শাসনের স্থাপত্য রয়েছে। পাল শাসনের নিদর্শন বঙ্গে তেমন না থাকলেও রাজবাড়ী পুণ্ড্রভূমির দক্ষিণ সীমান্তের কাছাকাছি বলে এ অঞ্চলে পাল শাসনের অধীন হয়। কালুখালির হারোয়াতে মদন মোহন জিউর বলে যে মূর্তিটি রয়েছে, অনেকে তা পাল শাসনের স্মৃতি বলে মনে করেন। ২০০৩ সালে রাজবাড়ীর তেঘারিতে একটি বিষ্ঞমূর্তি পাওয়া যায় যা বর্তমান ঢাকা মিউজিয়ামে সংরক্ষত আছে। চন্দ্রবংশীয় রাজাদের পর বিক্রমপুরে বর্ম রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্ম রাজবংশের রজ্রবর্মা, হরিবর্মা, সমলা বর্মা, ভোজ বর্মা এবং চন্দ্রবর্মা ১০৮০ থেকে ১১৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। কোটালীপাড়া চন্দ্রবর্মা ফোর্ট এ অঞ্চলে তাদের রাজত্বের নিদর্শন বহন করে।

পরবর্তীতে ১১৫০ থেকে ১২৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সেনবংশের রাজত্বকাল। সেনবংশের প্রথম রাজা বিজয় সেন। তিনি সম্ভবত বার’শ খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে বাংলার দক্ষিণপূর্ব থেকে পালদের বিতাড়িত করেন। বল্লাল সেন উভয়েই শিবের পূজারী ছিলেন। বল্লাল সেনের পূত্র লক্ষণ সেন ১১৭৮ থেকে ১২০৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলায় রাজত্ব করেন। বল্লাল সেনের রাজত্বকালে ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়র খলজী নদীয়া আক্রমণ করেন। লক্ষণ সেন পরাজিত হন এবং পলায়ন করে বিক্রমপুর আসেন। পরবর্তীতে লক্ষণ সেনের বংশধরগণ বেশ কিছুকাল বঙ্গে রাজত্ব করেন। এ বংশের বিশ্বরুপ সেনের শাসন ব্যবস্থার নির্দশন কোটালীপাড়া দক্ষিণ পশ্চিম পিঞ্জরীর নিকটপ্রাপ্ত তাম্র পট্টলী থেকে পাওয়া যায়। এ বংশ ত্রয়োদশ শতকের মধ্যবর্তীকাল পর্যন্ত নির্বিঘ্নে বঙ্গ শাসন করেন।

সেন বংশের শাসনের অবসান কালে বঙ্গের একক শাসন শক্তি লোপ পায়। এ সময় দেব বংশের দশরথ দেব দক্ষিণপূর্ববাংলা ( কুমিল্লা নোয়াখালি অঞ্চল) শাসন করেন। তার রাজ্য পরবর্তীতে ফরিদপুর অঞ্চলে বিস্তৃত হয়। দেব বংশের সমাচার দেবের রাজত্ব সম্বন্ধে ঘুঘ্রাঘাটি লিপিতে পাওয়া যায়। সমাচার দেবের ঘুঘ্রাঘাটি লিপিতে সুবর্ণবিথীর উল্লেখ আছে। এই সুবর্ণবিথী নব্যকাশিকার (কোটলীপাড়া) অন্তর্ভুক্ত ছিল। সবর্ণবিথীর অন্তর্ভুক্ত ছিল বারক মন্ডল, ধ্রবিলাটি।

ধ্রবিলাটি বর্তমানে ধুলদি গেট (ফরিদপুর)। দেব বংশের রাজা দনুজমর্দন দেব সোনারগাঁকে রাজধানী করে স্বাধীনভাবে বঙ্গে শাসন করেন। তার রাজত্বকাল ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত চলে। ১২৬৮ খ্রিস্টাব্দে তুঘরল খান দিল্লীর বেরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। বরনীর বিবরণ থেকে জানা যায় তুঘরিল খান লক্ষ্ণৌতি রাজ্যের সীমানা বৃদ্ধির জন্য মনোযোগ দেন। তিনি দনুজমর্দন দেবের শক্তি সোনারগাঁ দখল করার জন্য সোনারগাঁ রাজ্যের অদূরে একটি দুর্ভেদ্য দুর্গ নির্মাণ করেন। বরণী এ কিল্লাকে নরকিল্লা বা নারকিল্লা বলেছেন। ফরিদপুরের ইতিহাস লেখক আনম আবদুস সোবহান নারকিল্লাকে রাজবাড়ীর দক্ষিণপূর্বে ১০ মাইল অদূরে মনে করেন। এটা বর্তমানের নলিয়া হতে পারে। দনুজমর্দন দেবের সময় শাসন কেন্দ্র দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তা মুসলিম শাসনভুক্ত হয়। স্যার উইলিয়াম হান্টারের statistical Account of Dacca District ১১৯ পৃষ্ঠায় professor Blochman এর দক্ষিণ বাংলার শাসন সম্বন্দ্ধে বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। ১২০৪ খিষ্টাব্দে মুসলমান দ্বারা বিজিত হলেও দক্ষিণ বাংলা শতাব্দীকালেরও উর্ধ্বে বল্লাল সে‌নের বংশধর ও অন্যান্য স্থানীয় রাজাদের দ্বারা শাসিত হয়। ১৩৩০ সালে মুহম্মদ তুঘলক পূর্ববাংলা দখল করেন এবং রক্ষ্ণৌতি সাতগাঁ ও সোনারগাঁ তিনটি প্রদেশে বিভক্ত করেন (ঢাকাসহ)। সোনারগাঁয়ের গভর্নর ছিলেন তাতার বাহরাম খান।

১৩৩৮ সালে তার মূত্যুর পর ফকরউদ্দিন মোবারক শাহ সিংহাসন দখল করেন এবং মুবারক শাহ নাম করে প্রায় দশ বৎসরকাল রাজত্ব করেন। সোনারগাঁ পূর্ববাংলার শাসন কেন্দ্রে পরিণত হয়। ফখরউদ্দিন মুবারক শাহ এবং তার বংশধরদের রাজত্বকালে বাংলা বিভিন্ন কারণে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। অতঃপর ১৩৫১ সালে শামসুদ্দিন ইলিয়াশ শাহ সোনারগাঁ, সাতগাঁ ও লক্ষ্ণৌতিকে একত্র করে একচ্ছ্ত্র স্বাধীন সুলতান হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তার সময়েই বংলা একক স্বাধীন বাংলায় পরিণত হয় যা ইতিহাসে ‘সুবে বাংলা’ বলে পরিচিত। ১৩৫২ সালে সোনারগাঁ টাকশাল থেকে তার নামে মুদ্রা উৎকীর্ণ হয়। ইলিয়াস শাহের পুত্র সিকান্দার শাহ সোনারগাঁ শাসন করেন। তার বংশধরগণের শাসনকালে শাসন কেন্দ্র সোনারগাঁ দিল্লীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং স্বাধীন সুলতান হিসেবে সোনারগাঁ শাসন করে। সিকান্দর শাহের পুত্র আযম শাহ স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং কবি হাফিজকে সোনারগাঁয়ে আমন্ত্রণ করেন। আযম শাহের পর সোনারগাঁ সিংহাসন‌ রাজা কানস এর দ্ধারা অধিকৃত হয়। এ সময় ইলিয়াস শাহের বংশধরগণের দ্বারা ১৪৮৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সোনারগাঁ শাসিত হয়। এদের মধ্যে জালাল উদ্দিন ইতিহাসে বিশেষভাবে পরিচিত। মাহমুদ শাহের রাজত্বকালে বাংলার পূর্বাঞ্চল মেঘনা থেকে সিলেট পর্যন্ত মোয়াজ্জামাবাদ প্রদেশ গঠিত হয়। কিন্ত ঢাকার অঞ্চেল বিশেষ করে ফরিদপুর এবং বাকেরগঞ্জ নিয়ে গঠিত হয় জালালাবাদ ও ফতেহাবাদ প্রদেশ। ফতেহাবাদ যে ফরিদপুর তা আজ ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। যদিও চট্টগ্রামের ৮ মাইল উত্তরে অন্য একটি ফতেহাবাদের উল্লেখ রয়েছে। ফতেহাবাদ সন্বন্ধে ড. আব্দুল কবিম বাংলার ইতিহাস সুলতানি আমল পুস্তকের ২৪৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন, ‘জালালউদ্দিন ফতিহাবাদ ও রোতসপুর হতে মুদ্রা উৎকীর্ণ করেন। ফতেহাবাদ ও আধুনিক ফরিদপুর অভিন্ন। ইতিপূর্বে ফরিদপুর এলাকা মুসলমানদের অধীনে ছিল না। সেই অঞ্চলে এতদিন ছোট ছোট হিন্দু রাজারা রাজত্ব করতেন। সুতরাং ফতেহাবাদ হতে মুদ্রা উৎকীণ হওয়ায় আমরা বলতে পারি যে, জালাউদ্দিন ফরিদপুর জয় করেন এবং দক্ষিণ বঙ্গের দিকে রাজ্য বিস্তার করেন। মধ্যযুগের কবি বিজয় গুপ্ত ১৪৯৪-৯৫ সালের মধ্যে মনসামঙ্গল বা পদ্মাপুরাণ কাব্য রচনা করেন। কবি তার আত্মপরিচয়ে বলেন-
মূল্লুক ফতেহাবাদ বঙ্গজোড়া ইকলিম,
পশ্চিমে ঘাঘরা নদী পূর্বে ঘন্টেশ্বর।

ফতেহাবাদ মুল্লুকে ঘাঘড়া ও ঘন্টেশ্বরী নদীর মধ্যবর্তীস্থান ফুল্লেশ্রী গ্রামে কবির জন্ম। ফুল্লেশ্রী বর্তমান বরিশালের গৈলাগ্রামের একটি পল্লী। ফতেহাবাদ রাজ্যের অন্তর্গত ছিল বর্তমান রাজবাড়ির কিছু অংশ।

সুলতান নাসিরুদ্দীন মাহমুদের রাজত্বকালের মুদ্রা ভাগলপুর, সাতগাঁও বাগেরহাট হতে উৎকীর্ণ হয়েছে এবং তার শাসনামলের শিলালিপি পাওয়া গেছে। ১৪৫৯ সালে তিনি যশোহর, খুলনা পুনরুদ্ধারের জন্য খান জাহান আলী নামে এক সেনাপতিকে পাঠান। তিনি এ অঞ্চল জয় করে খলিফাতাবাদ শহর এবং প্রশাসনিক বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। সুলতানি আমলে দক্ষিণবঙ্গে ফতেহাবাদ ও খলিফাতাবাদ প্রশাসনিক বিভাগ ইকলিম হিসেবে ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। রাজবাড়ি জেলার ভৌগোলিক আবস্থানের বিশেষত্ব এই যে বর্তমান জেলাটি পুরাতন ফদিপুর ও যোশোর জেলার সংলগ্ন। আবার উত্তরে পাবনার সাথেও এর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তবে রাজবাড়ী জেলার অংশবিশেষ বেশির ভাগ সময় ফরিদপুর ও যোশর জেলার সাথে সংযুক্ত দেখা যায়। ১৭৯৩ সালে জেলাটির কিছু অংশ ঘাট গোয়ালন্দ হিসেবে যশোরের সাথে সংযুক্ত ছিল। কাজেই রাজবাড়ি তৎকালীন সময় ফতেহবাদ ও খলিফাতাবাদের সাথে সংযুক্ত থাকাই স্বাভাবিক এবং রাজবাড়ি পূর্বাংশে বাদ দিয়ে বাকি অংশ খালফাতাকবাদ প্রশাসনিক অঞ্চলের সাথে যুক্ত ছিল।

১৪৯৩ থেকে ১৫১৯ পর্যন্ত আলাউদ্দিন হুসেন শাহের রাজত্বকাল। Mr. Vincent Smith এর মতে হুসেন শাহ ছিলেন বাংলা সর্বশ্রেষ্ঠ মুসলিম শাসক। professor Blochman বলেন, Hussain shahn first obtained power in the district of Faridpur, Fathahabad where his earliest coins were struck. হুসেন শাহের সময় রাজবাড়ী তার অধিকারভুক্ত হয়। রাজবাড়ী জেলার নসিবশাহী পরগনা, নশরতশাহী পরগনা, মাহমুদশাহী পরগনা, ইউসুফশাহী পরগনার নামকরণ হুসেনশাহের ভ্রাতা ইউসুফ শাহ এবং ইউসুফ শাহের সন্তান নশরত শাহ এবং মাহমুদ শাহের নামকরণে এসব পরগনার নামকরণ হয়। উল্লেখ্য পাংশা, বালিয়াকান্দি, গোয়ালন্দ ও রাজবাড়ী উপজেলা নশরতশাহী, মাহমুদশাহী, নসিবশাহী, ইউসুফশাহী পরগনার নামে প্রাচীন পরিচিতি রয়েছে। এ সময় ফতেহাবাদ ছিল হুসেন শাহের প্রধান শাসন কেন্দ্র যা বর্তমান ফরিদপুর শহর। আইন-ই-আকবরী গ্রন্থে দেখা যায় জালালুদ্দীন ফতেহ শাহ লক্ষ্ণৌতিন শাসনকর্তা ছিলেন (১৪৮১-১৪৮৭)। তিনি কতকগুলি সরকারে বিভক্ত করেন। এই সরকারে ফরিদপুরের অংশবিশেষ, ঢাকার অংশবিশেষ, বাকেরগঞ্জ নিয়ে জালালাবাদ সরকার এবং ফরিদপুরের পশ্চিম অঞ্চল, যশোর এবং কুষ্টিয়াসহ মাহমুদাবাদ সরকার গঠিত হয়। বর্তমান রাজবাড়ী স্বাধীন সুলতানি আমলে ফতেহাবাদ, খলিফাতাবাদ, মাহমুদাবাদ রাজ্য হিসেবে শাসিত। মোগল শাসনকালে আকবর নামায় দেখা যায় ১৫৭৪ খ্রিষ্টাব্দে দক্ষিণপূর্ববাংলা জয় করার জন্য সেনাপতি মোরাদ খানকে পাঠান। সেনাপতি মোরাদ খান ফতেহাবাদ জয় করেন এবং বাকলা ও তার অধিকারভুক্ত হয়। মোরাদ খান এখানেই থেকে যান এবং সাত বৎসর পর মৃত্যুবরণ করেন। আকবর নামায় দেখায় যায় ফরিদপুরের পশ্চিমে বর্তমান রাজবাড়ী খানখানাপুরে তার বাসস্থান ছিল। এ সময় বার ভূঁইয়াদের উত্থান ইতিহাস খ্যাত। তাদের দমনের জন্য সম্রাট আকবর মানসিংহসহ একের পর এক সেনাপতি পাঠান। সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে (১৬০৬-১৬২৭) ইসলাম খান (১৬০৮-১৬১৩) বাংলার সুবাদার নিযুক্ত হন। তিনি সমগ্র বাংলার একচ্ছত্র শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হন। ইসলাম খানের পর ১৭৫৭ পর্যন্ত ২১ জন সুবেদার বাংলায় শাসন করেন। শেষের দিকে বাংলার সুবেদারগণ স্বাধীন নবাব হিসেবে বাংলায় রাজত্ব করতেন। খলিফাতাবাদ যশোর খুলনা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। যশোরের পরগনাসমূহের মধ্যে মাহমুদশাহী, মহিমশাহী, ইউসুফশাহী, নসিবশাহী, নশরতশাহী পরগণার মধ্যে রাজবাড়ী বালিয়াকান্দি নসিবশাহী, পাংশা কালুখালির মহিমশাহী, নশরতশাহী।

রাজবাড়ি জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য
প্রফেসর মতিয়র রহমান

রাজবাড়ীর নামকরণ ইতিহাস

রাজবাড়ী যে কোন রাজার বাড়ীর নামানুসারে নামকরণ করা হয়েছে এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। তবে কখন থেকে ও কোন রাজার নামানুসারে রাজবাড়ী নামটি এসেছে তার সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। বাংলার রেল ভ্রমণ পুস্তকের (এল.এন. মিশ্র প্রকাশিত ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়ে ক্যালকাটা ১৯৩৫) একশ নয় পৃষ্ঠায় রাজবাড়ী সম্বন্ধে যে তথ্য পাওয়া যায় তাতে দেখা যায় যে, ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে নবাব শায়েস্তা খান ঢাকায় সুবাদার নিযুক্ত হয়ে আসেন। এ সময় এ অঞ্চলে পর্তুগীজ জলদস্যুদের দমনের জন্যে তিনি সংগ্রাম শাহকে নাওয়ারা প্রধান করে পাঠান। তিনি বানিবহতে স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন এবং লালগোলা নামক স্থানে দুর্গ নির্মাণ করেন। এ লালগোলা দুর্গই রাজবাড়ী শহরের কয়েক কিলোমিটার উত্তরে বর্তমানে লালগোলা গ্রাম নামে পরিচিত। সংগ্রাম শাহ্ ও তাঁর পরিবার পরবর্তীকালে বানিবহের নাওয়ারা চৌধুরী হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

এল.এন. মিশ্র উক্ত পুস্তকে উল্লেখ করেন যে, রাজা সংগ্রাম শাহের রাজদরবার বা রাজকাচারী ও প্রধান নিয়ন্ত্রণকারী অফিস বর্তমান রাজবাড়ী, এলাকাকে কাগজে কলমে রাজবাড়ী লিখতেন (লোকমুখে প্রচলিত)।এ পুস্তকের শেষের পাতায় রেলওয়ে স্টেশন হিসেবে রাজবাড়ী নামটি লিখিত পাওয়া যায়। উল্লেখ্য যে, রাজবাড়ী রেল স্টেশনটি ১৮৯০ সালে স্থাপিত হয়। ঐতিহাসিক আনন্দনাথ রায় ফরিদপুরের ইতিহাস পুস্তকে বানিবহের বর্ণনায় লিখেছেন-নাওয়ারা চৌধুরীগণ পাঁচথুপি থেকে প্রায় ৩০০ বছর পূর্বে বানিবহে এসে বসবাস শুরু করেন। বানিবহ তখন ছিল জনাকীর্ণ স্থান। বিদ্যাবাগিশ পাড়া, আচার্য পাড়া, ভট্টাচার্য পাড়া, শেনহাটিপাড়া, বসুপাড়া, বেনেপাড়া, নুনেপাড়া নিয়ে ছিল বানিবহ এলাকা।

নাওয়ারা চৌধুরীগণের বাড়ি স্বদেশীগণের নিকট রাজবাড়ী নামে অভিহিত ছিল। মতান্তরে রাজা সূর্য কুমারের নামানুসারে রাজবাড়ীর নামকরণ হয়। রাজা সূর্য কুমারের পিতামহ প্রভুরাম নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার রাজকর্মচারী থাকাকালীন কোন কারণে ইংরেজদের বিরাগভাজন হলে পলাশীর যুদ্ধের পর লক্ষীকোলে এসে আত্মগোপন করেন। পরে তাঁর পুত্র দ্বিগেন্দ্র প্রসাদ এ অঞ্চলে জমিদারী গড়ে তোলেন। তাঁরই পুত্র রাজা সুর্য কুমার ১৮৮৫ সালে জনহিতকর কাজের জন্য রাজা উপাধি প্রাপ্ত হন। রাজবাড়ী রেল স্টেশন এর নামকরণ করা হয় ১৮৯০ সালে। বিভিন্ন তথ্য হতে জানা যায় যে, রাজবাড়ী রেল স্টেশন এর নামকরণ রাজা সূর্য কুমারের নামানুসারে করার দাবি তোলা হলে বানিবহের জমিদারগণ প্রবল আপত্তি তোলেন।

উল্লেখ্য, বর্তমানে যে স্থানটিতে রাজবাড়ী রেল স্টেশন অবস্থিত উক্ত জমির মালিকানা ছিল বানিবহের জমিদারগণের। তাঁদের প্রতিবাদের কারণেই স্টেশনের নাম রাজবাড়ীই থেকে যায়। এ সকল বিশ্লেষণ থেকে ধারণা করা হয় যে, রাজবাড়ী নামটি বহু পূর্ব থেকেই প্রচলিত ছিল। এলাকার নাওয়ারা প্রধান, জমিদার, প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তিগণ রাজা বলে অভিহিত হতেন। তবে রাজা সূর্য কুমার ও তাঁর পূর্ব পুরুষগণের লক্ষীকোলের বাড়ীটি লোকমুখে রাজার বাড়ি বলে সমধিক পরিচিত ছিল।

এই ভবনটিতে মিশে আছে রাজবাড়ী বাসীর শত বছরের ইতিহাস ঐতিহ্য । কিন্তু অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে থাকা এই ভবনটি আজ ধ্বংসের মুখে । পেজের পক্ষ থেকে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসনের ভবনটির ধ্বংসাবশেষ রক্ষার বিনীত অনুরোধ করছি । এছাড়া রাজবাড়ীর পাচুরিয়ায় ততকালীন জমিদারদের বাড়ি রয়েছে ।

এভাবেই আজকের রাজবাড়ী।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম-রাজবাড়ী মাটি ও মানুষের সাথে কবির ঘনিষ্ঠতা।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর স্পর্স পেয়েছে রাজবাড়ীর মাটি ও মানুষ। গোয়ালন্দ তৎকালীন বাংলার প্রবেশ পথ হওয়ার তিনি রেলপথে ঢাকা, কুমিল্লা যাতায়াত করেছেন ট্রেন ও স্টিমারযোগে গোয়ালন্দ দিয়ে। পূর্ববাংলার প্রকৃতি ও মানুষের সাথে ছিল তাঁর নিবিড় বন্ধন। ১৯৪০ সালে গোয়ালন্দ ঘাটে বসে ‘আমি পূরব দেশের পুরনারী’ সঙ্গীত রচনা করেন। ১৯২৫ সালে মহাত্মাগান্ধী ফরিদপুরে কংগ্রেসের প্রাদিশিক সম্মেলনে যোগদনকালে গান্ধীজীর সাথে কাজী নজরুল ইসলামের পরিচয় ঘটে। নজরুলের কণ্ঠে তার চরকার গান শুনে গান্ধীজী মুগ্ধ হন। সে সূত্রে নজরুল ইসলাম কংগ্রেসে যোগদান করেন।

১৯২৬ সালে নজরুল তমিজ উদ্দিন খান (খানখানাপুর, রাজবাড়ী) এর সাথে বঙ্গীয় বিধান সভায় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করে যান। নির্বাচনে কবির প্রতিদ্বন্দিতা সম্পর্কে ১২ অক্টোবর ১৯২৬ গণবাণীতে লেখা হয় ‘কালের বরেণ্য কবি কাজী নজরুল ইসলাম ঢাকা বিভাগের মুসলমান কেন্দ্র হতে ভারতীয় ব্যাবস্থাপক সভার সদস্য পদপ্রাথী হইয়াছেন’ (নজরুল রচনাবলী ২য় খণ্ড কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড-২৫ ডিসেম্বর ১৯৬৭ পৃষ্ঠা-৫৪৮)। উল্লেখ্য তখন ফরিদপুর, রাজবাড়ী ঢাকা নির্বাচন এলাকাভুক্ত ছিল। তমিজ উদ্দিন খান তাঁর আত্মজীবনীতে ১৯২৬ সালের নির্বচনে নজরুলের বিষয়ে কিছু বলেননি। এ নির্বাচন বিষয়ে নানা মতভেদ রয়েছে। তবে আবুল আহসান চৌধুরী নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর অপ্রকাশিত পত্রাবলীর গ্রন্থের ১৬ পৃষ্ঠায় লিখেছেন-‘হেমন্ত কুমার সরকার ও কাজী নজরুল ইসলামের উদ্যোগে ১৯২৬ সালে Bengal peasants and worker’s party প্রতিষ্ঠিত হয়। উল্লেখিত নানা তথ্যে প্রতীয়মান হয় ১৯২৬ এ নবগঠিত Bengal peasants and worker’s party থেকে প্রতিনিধিত্ব করেন বা নির্দলীয় প্রাথী হন। এ ক্ষেত্রে তমিজ উদ্দিন খান তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দী মোহন মিয়ার কথাই উল্লেখ করেছেন। গুরুত্বহীন peasants পার্টি বা উদীয়মান একজন কবিকে দুর্বল প্রার্থী ভেবে লেখার প্রয়োজন মনে করেননি। গোলাম মুরশীদ তার হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি গ্রন্থের ১৬৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন-

১৯২৬ সালের শেষ দিকে যখন নির্বাচন অনুষ্ঠান হয়, ৩৯টি মুসলিম আসনের মধ্যে ৩৮টি আসনে জয়ী হন আব্দুর রহিমের দলের প্রার্থীরা। কাজী নজরুল ইসলাম তখন অত্যন্ত জনপ্রীয় কবি। কৃষক শ্রমিকদের জন্য উচ্চকণ্ঠে বিদ্রোহের বাণীও শুনেছিলেন তিনি। তা সত্ত্বেও মুসলামান প্রধান ফরিদপুর থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও তিনি জিততে পারেননি। কারণ আব্দুর রহিমের সাম্প্রদায়িকতার শর্ত তিনি পূরণ করতে পারেননি।

এ সময় রাজবাড়ী মানুষের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। আরএসকে স্কুলের গণিত শাস্ত্রের প্রাক্তন শিক্ষক দেব ভট্টাচার্য (ডা. মাখনলাল মহাশয়ের বাড়িতে দীর্ঘদিন ভাড়ায় বসবাস করতেন) এর নিকট থেকে জানা যায় নজরুল সেসময় তাদের স্থায়ী বসতি পাংশার রুপিয়াট জমিদার বাড়ির সাথে গবীর আত্নীয়তা গেড়ে তোলেন। দেবুর পিতা অতুল দত্ত তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। নজরুল এ পথে আসলে রুপিয়াট জমিদার বাড়ি না হয়ে যেতেন না। দেবুর পিতা ও মাতার সাথে পত্রালাপ হত। কিন্তু পত্র তার নিকট ছিল কিন্তু যুদ্ধের সময় তা হারিয়ে যায়। দেবুর মায়ের নামে নজরুল একটি কাব্যগ্রন্থ উৎসর্গ করেন। রাজবাড়ীর নজরুল বিশেষজ্ঞ গোলাপ ভাইয়ের নিকট থেকে জানা যায় নজরুল ১৯৩০ এর দশকের কোনো এক সময় প্রাক্তন চেয়ারম্যান হবিবুর রহমান সাহেবের বাড়িতে আসেন। হাসিবুর রহমান তখন যুবক। তিনি নজরুলের সাথে একই খাটে শয়ন করেছিলেন। সাহিত্যিক এয়াকুব আলী চৌধুরীর (পাংশা) সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের গভীর সখ্যতা ছিল। ১৯১৯ সালে প্রথম মহাযুদ্ধের পর কবি ফিরে এসে ‘বঙ্গীয় সাহিত্য সমিতিতে’ যোগ দেন। কর্মসূত্রে সেখানেই এয়াকুব আলী চৌধুরী নজরুলকে আর্শিবাদ স্বরুপ বলেছিলেন-‘আপনাকে বাংলার মুসলমান বারীন ঘোষ হতে হবে। (সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতায় রাজবাড়ী, অধ্যাপক আবুল হোসেন মল্লিক, পৃষ্ঠা-৪৬)। কবি ১৯৩৩ সালে কলিকাত থেকে পাংশা সফরে আসেন। তিনি এখানে এক দিন এক রাত যাপন করেন। পাংশায় আনার দায়িত্ব দেওয়া হয় এয়াকুব আলী চৌধুরীকে। বিপুল আয়োজনে পাংশায় তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সংবর্ধনা কমিটিতে থাকেন এয়াকুব আলী চৌধুরী, তাহের উদ্দিন আহমেদ (সহসম্পাদক, দি মুসলমান পত্রিকা, কলিকাতা), সৈয়দ মাহমুদ (ডিএসআর), সুবোধচন্দ্র সাহা (কংগ্রেস নেতা, পাংশা), শ্রী অতুলচন্দ্র দত্ত (সিনেমা বিষয়ক পত্রিকা ‘জলসা’র সম্পাদক), খোন্দকার নজির উদ্দিন আহমদ (সম্পাদক খাতক), শ্যামলাল কুণ্ডু প্রমুখ। তাঁর থাকার ব্যবস্থা হয় শ্যামলাল কুণ্ডুর দ্বিতল ভবনে। বৃটিশ রাজরোষে পতিত হওয়া কারণে তাঁকে খোলা মাঠে সংবর্ধনা দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় মুচিরাম সাহার গুদাম ঘরে তাঁকে সংবর্ধনার ব্যবস্থা করা হয়। এ অনুষ্ঠানে কবি স্বকণ্ঠে ‘বিদ্রোহী’ ও ‘নারী’ কবিতা দুটি আবৃত্তি করেন। ‘টুনির মা’ নামে এক মহিলা নিজ হাতে সেলাই করা একখানি নকশী কাঁথা কবিকে উপহার দেন। পাংশা আড়ং বাজার রেলঘাটে তাঁর আগমন উপলক্ষ্যে যে মেলার আয়োজন করা হয় তা আজও বৈশাখা মেলা-(১ এপ্রিল) হিসেবে স্মৃতি বহন করছে। সেদিন এক ময়রা কবিকে কেজি চমচম উপহার হিসেবে দেন। প্রচুর লোক সমাগমে কবি সবাইকে শুভেচ্ছা বাণী দেন।

পাংশার কবি বন্ধু দি মুসলমান পত্রিকার সম্পাদক তাহের উদ্দিন তাঁর বিবাহ বৌভাতে আমন্ত্রণ করেন। দাওয়াত রক্ষায় অপারগ হলে কবি তাঁকে আশীর্বাদ স্বরুপ লেখেন।

রুপার সওদা সার্থক হল
রুপার শাহজাদী এসে
তব বাণিজ্য তরণী ভিড়িল
স্বপন পরীর দেশে।
অর্থের নীতি যাহার যাদুতে
হইল অর্থহীন
বেঁচে থাক সেই ফুলের ডেরারায়
ফুল হয়ে নিশিদিন।

কাজী নজরুল ইসলামের গভীর সখ্যতা ছিল পাংশার বাগমারা গ্রামের জাতীয় অধ্যাপক প্রখ্যাত সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, জাতীয় চেতনার দিশারী ড. কাজী মোতাহার হোসেনের সঙ্গে। কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন নজরুল অন্তরঙ্গ বন্ধু। নজরুল বন্ধুত্বে গভীর আলিঙ্গনে মোতাহার হোসেনকে ডাকতেন, আমার মতিহার । তাদের বন্ধুত্ব আজীবন অটুট ছিল। মোতাহার হোসেনের লেখা ‘নজরুল কাব্য পরিচিতি’ তাঁর অমর প্রতিদান।

মোতাহার হোসেনের কন্যা রবীন্দ্র গবেষক, শিল্পী সনজিদা খাতুন রচিত ‘মোতাহার হোসেন’ গ্রন্থ থেকে জানা যায় কাজী নজরুল ইসলাম ঢাকা এলে তাদের বাড়িতেই থাকতেন। নজরুল যেমন ছিলেন জাতীয় চেতনায় বিদ্রোহী সত্ত্বার অধিকারী তেমনি দৈহিক শাক্তি প্রয়োগে বিদ্রপ নিরসনের নায়ক। একদিন ঢাকায় দুইদল যুবক পরস্পর ঝগড়ার পর্যায়ে হাতাহাতিতে লিপ্ত হলে নজরুল তা নিষেধ করেন। কিন্তু নজরুলের কথা তারা শুনছিল না। এক পর্যায়ে নজরুল একটি লাঠি নিয়ে ভোঁ ভোঁ করে ঘোরাতে থাকেন এবং সকলকে তাড়িয়ে দেন। এই লাঠি নিয়েই মোতাহার হোসেনের বাসায় যান। এই লাঠি দীর্ঘদিন তাদের বাসায় ছিল আর লাঠির নামকরণ হয়েছিল, নজরুল মারা লাঠি। বন্ধুত্বের সূত্রে নজরুল কয়েকবার মোতাহার হোসেনের গ্রামের বাড়ি বাগমারা এসেছেন বলে জানা যায়। কাজী নজরুল ইসলাম সহসঙ্গী মোতাহার হোসেনের উদ্দেশ্যে ‘দাড়ি বিলাপ’ কবিতাটি রচনা করেন। দাড়ি বিলাপ কবিতার পাদটিকায় কোনো প্রফেসর বন্ধুর দাড়ি কর্তন উপলক্ষে লেখা আছে।

হে আমার দাড়ি
একাদশ বর্ষ পরে গেলে আজি ছাড়ি
আমারে কাঙ্গাল করে শূন্য করি বুক
শূন্য এ চোয়াল আজি, শূন্য এ চিবক।

কাজী মোতাহার হোসেন ছাত্রজীবন থেকেই দাড়ি কামাতেন না। দাড়ি ওঠার ১১ বছর পর তিনি একবার দাড়ি কর্তন করলে কবি এ কবিতাটি রচনা করেন। এ প্রসঙ্গে পথেয় ১৩৩৫ সালে ঢাকা সাপ্তহিক দরদীতে এবং দাড়ি বিলাপ মাসিক ‘শান্তি’তে প্রকাশিত হয়। দাড়ি বিলাপ কবিতার পাদটিকায় উল্লেখিত কোনো প্রফেসর বন্ধু হলেন অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন (নজরুল রচনাবলী, প্রাগুপ্ত, পৃ-৬৫৫)। ঢাকার বিদূষী কন্যা ফজিলাতুননেসার সঙ্গে নজরুল প্রণয়ে প্রয়াসী হন। এর মাধ্যম ছিলেন কাজী মোতাহার হেসেন। শিল্পী কাজী আবুল কাশেম (রাজবাড়ী) নজরুলের লেখা ‘দাদা মেখে দেয় দাড়িতে খেজাব’ কার্টুন এঁকে নজরুলকে দেখান। নজরুল তা দেখে খুব হেসেছিলেন।

সাহিত্যিক কাজী আব্দুল ওদুদ (বাগমারা নিবাসী) কাজী নজরুল ইসলামের অত্যন্ত গুণাগ্রাহী ছিলেন। এদিকে কাজী মোতাহার ও আব্দুল ওদুদ একই গ্রামবাসী ও হরিহর বন্ধু। কাজী নজরুল আব্দুল ওদুদের সাথে ঘনিষ্ঠতা সূতা ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনে উভয়কে পৃষ্ঠাপোষকতা দান করেন। কাজী আব্দুল ওদুদ ‘নজরুল প্রতিভা’ (১৯৪৯) রচনা করেন। চিল্লশের দশকের প্রথমে আব্দুল ওদুদ কলিকাতাবাসী হন। এ সময় কাজী নজরুল ও তার পরিবারের সাথে অতি ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েন। ১৯৫২ সাল। নজরুল পরিবারে তখন দুরাবস্থা। নানাভাবে নজরুলের চিকিৎসা করান হলেও উন্নতি নেই। আর্থিক অনটন লেগেই আছে। আব্দুল ওদুদ পরিবারে আর্থিক সাহায্য সহযোগিতা দিয়ে আসছিলেন। কবির উন্নত ও শেষ চিকিৎসার জন্য কবিকি ইউরোপ পাঠান দারকার। অনেক টাকার প্রয়োজন। কাজী আব্দুল ওদুদের উদ্যোগে কলিকাতা ‘নজরুল সাহায্য সমিতি’ গঠন করা হল। তাঁর উদ্যোগেই নজরুলকে ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়। তারপর ভিয়েনা। নজরুল আর সুস্থ হয়ে ওঠেননি। এভাবেই রাজবাড়ী মাটি ও মানুষের সাথে কবির ঘনিষ্ঠতা।

রাজবাড়ি জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য
প্রফেসর মতিয়র রহমান
(পৃষ্ঠা-২৯২)

মীর মশাররফ হোসেনের জীবনী

সৈয়দ মীর মশাররফ হোসেন (জন্ম:-নভেম্বর ১৩, ১৮৪৭ মৃত্যু:-ডিসেম্বর ১৯, ১৯১১) ছিলেন একজন বাঙালি ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক। তিনি বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান গদ্যশিল্পী ও বাঙালি মুসলমান সাহিত্যিকদের পথিকৃৎ। কারবালার যুদ্ধকে উপজীব্য করে রচিত বিষাদ সিন্ধু তার সবচেয়ে জনপ্রিয় সাহিত্যকর্ম।

তিনি তৎকালীন বৃটিশ ভারতে (বর্তমান বাংলাদেশ) কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালি উপজেলার চাঁপড়া ইউনিয়নের লাহিনীপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার লেখাপড়ার জীবন কাটে প্রথমে কুষ্টিয়ায়, পরে ফরিদপুরের পদমদীতে ও শেষে কৃষ্ণনগরের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে। তার জীবনের অধিকাংশ সময় ব্যয় হয় ফরিদপুরের নবাব এস্টেটে চাকরি করে। তিনি কিছুকাল কলকাতায় বসবাস করেন।

সৈয়দ মীর মশাররফ হোসেন তার বহুমুখী প্রতিভার মাধ্যমে উপন্যাস, নাটক, প্রহসন, কাব্য ও প্রবন্ধ রচনা করে আধুনিক যুগে মুসলিম রচিত বাংলা সাহিত্যে সমৃদ্ধ ধারার প্রবর্তন করেন।

প্রাথমিক জীবন

সৈয়দ মীর মশাররফ হোসেন খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালীর একটি ছোট গ্রাম লাহিনিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু তার জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দির পদমদীতে অতিবাহিত করেন। তবে তার জন্ম তারিখ ১৮৪৭ সালের ১৩ নভেম্বর বলে ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়। কিন্তু কিছু গবেষক তার জন্ম তারিখ ১৮৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর বলে দাবী করেন।তিনি নবাব সৈয়দ মীর মোয়াজ্জেম হোসেন (মুসলিম সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি, তৎকালীন পদমদী নবাব এস্টেটের জমিদার) এবং দৌলতুন্নেছার ঘরে জন্মগ্রহণ করেন।

সৈয়দ মীর মশাররফ হোসেনের স্কুল জীবন কেটেছে প্রথমে কুষ্টিয়ায়, পরে পদমদী এবং শেষে কৃষ্ণনগরশহরে। জগমোহন নন্দীর পাঠশালা, কুমারখালির ইংলিশ স্কুল, পদমদী নবাব স্কুল ও কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুল এ পড়ার কথা লেখকের আত্নজীবনীতে লেখা আছে।

‘বঙ্গবাসী মুসলমানদের দেশভাষা বা
মাতৃভাষা “বাঙ্গালা”। মাতৃভাষায়
যাহার আস্থা নাই, সে মানুষ নহে।
বিশেষ সাংসারিক কাজকর্ম্মে
মাতৃভাষারই সম্পূর্ণ অধিকার।
মাতৃভাষায় অবহেলা করিয়া অন্য
দুই ভাষায় বিখ্যাত পণ্ডিত হইলেও
তাহার প্রতিপত্তি নাই। পরিবার, আত্মীয়স্বজন, এমনকি প্রাণের প্রাণ
যে স্ত্রী, তাহার নিকটেও আদর নাই। অসুবিধাও বিস্তর। ইস্তক ঘরকন্নার
কার্য্য নাগাদে রাজসংশ্রবী যাবতীয়
কার্য্যে বঙ্গবাসী মুসলমানদের
বাঙ্গালা ভাষার প্রয়োজন।

মীর মশাররফ হোসেন (“আমাদের শিক্ষা” নামক প্রবন্ধ)

রচনাবলি

এখন পর্যন্ত মীর মশাররফ হোসেনের মোট ৩৬ টি বইয়ের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রকাশের তারিখ অনুসারে সেগুলো হল :

  1. রত্নবতী:সেপ্টেম্বর, ১৮৬৯ (৩০ শ্রাবণ,১২৭৬)
    গদ্যে রচিত প্রথম বাঙ্গালী মুসলমান রচিত গল্প।
    গোরাই-ব্রিজ অথবা গৌরী-সেতু:জানুয়ারী, ১৮৭৩ (পৌষ, ১২৭৯) (কবিতা)।
  2.  বসন্তকুমারী নাটক: ফেব্রুয়ারী, ১৮৭৩ (১৫ মাঘ, ১২৭৯) বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সাহিত্যিক রচিত প্রথম নাটক। নাটকটি তিনি নওয়াব আবদুল লতিফকে উৎসর্গ করেন।
  3.  জমীদার দর্পণ নাটক: মে, ১৮৭৩ (চৈত্র ১২৭৯)।
  4.  এর উপায় কি? : ১৮৭৫ প্রহসন।
  5.  বিষাদ সিন্ধু মহরম পর্ব: মে, ১৮৮৫ (১২৯১) উপন্যাস।
  6.  বিষাদ সিন্ধু উদ্ধার পর্ব: অগাস্ট, ১৮৮৭ (শ্রাবণ,১২৯৪)উপন্যাস।
  7.  বিষাদ সিন্ধু এজিদ-বধ পর্ব: মার্চ, ১৮৯১ (১২৯৭) উপন্যাস।
  8.  সঙ্গীত লহরী, ১ম খণ্ড: ১৮৮৭ (১২৯৪) গান।
  9.   গো-জীবন: মার্চ, ১৮৮৯ (২৫ ফাল্গুন, ১২৯৫) (প্রবন্ধ) এই গ্রন্থ রচনার দায়ে তাকে মামলায় জড়িয়ে পড়তে হয়।
  10.  বেহুলা গীতাভিনয়: জুন, ১৮৮৯ (৭ আশ্বিন, ১২৯৬) নাটক গদ্যে পদ্যে রচিত।
  11.  উদাসীন পথিকের মনের কথা: অগাস্ট, ১৮৯০ (১২৯৭) উপন্যাস আত্মজৈবনিক উপন্যাস, নীলকরদের অত্যাচারের কাহিনী এতে সুন্দরভাবে রুপায়িত হয়েছে।
  12.  তহমিনা: জানুয়ারি, ১৮৯৭ উপন্যাস জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ-এপ্রিল (একত্রে) এই তিন সংখ্যা মাসিক ‘হাফেজ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। উপন্যাসটি সমাপ্ত কি না বা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে কি না জানা যায় নি।
  13.  টালা অভিনয়: মার্চ-এপ্রিল, ১৮৯৭ প্রহসন ‘হাফেজ’ পত্রিকার মার্চ-এপ্রিল সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।
  14.  নিয়তি কি অবনতি: ডিসেম্বর, ১৮৯৮ নাটক ১৮৯৮ সালের ডিসেম্বর সংখ্যা (১ম বর্ষ, ৬ষ্ঠ সংখ্যা) এবং ১৮৯৯ সালের জুন সংক্যার (২য় বর্ষ, ২য় সংখ্যা) ‘কোহিনুর’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। নাটকটি সম্পূর্ণ হয়েছিল কি না বা গ্রন্থাকারে বের হয়েছিল কি না জানা নেই।
  15.  গাজী মিয়াঁর বস্তানী: ১৮৯৯ (১৫ আশ্বিন, ১৩০৬) নক্সা।
  16.  ভাই ভাই এইত চাই: ১৮৯৯ প্রহসন, গা.মি.ব. বইয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রকাশের সংবাদ দেওয়া হয়েছিল।
  17.  ফাস কাগজ: ১৮৯৯ প্রহসন গা.মি.ব. বইয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রকাশের সংবাদ দেওয়া হয়েছিল।
  18. এ কি?: ১৮৯৯ প্রহসন গা.মি.ব. বইয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রকাশের সংবাদ দেওয়া হয়েছিল।
  19.  পঞ্চনারী পদ্য কবিতা: ১৮৯৯ গা.মি.ব. বইয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রকাশের সংবাদ দেওয়া হয়েছিল।
  20.  প্রেম পারিজাত গদ্য: ১৮৯৯ রচনাগা.মি.ব. বইয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রকাশের সংবাদ দেওয়া হয়েছিল।
  21. রাজিয়া খাতুন গদ্য: ১৮৯৯ রচনাগা.মি.ব. বইয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রকাশের সংবাদ দেওয়া হয়েছিল।
  22.  বাঁধা খাতা প্রহসন: ১৮৯৯ গা.মি.ব. বইয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রকাশের সংবাদ দেওয়া হয়েছিল।
  23.  মৌলুদ শরীফ: ১৯০৩ ধর্ম বিষয়ক গদ্যে-পদ্যে রচিত ধর্ম্মোপদেশ।
  24.  মুসলমানের বাংলা শিক্ষা, ১ম ভাগঃ অক্টোবর, ১৯০৩ স্কুল পাঠ্য।
  25.  বিবি খোদেজার বিবাহ কাব্যঃ মে, ১৯০৫ (২ বৈশাখ, ১৩১২)।
  26.  হজরত ওমরের ধর্ম্মজীবন লাভ কাব্যঃঅগাস্ট, ১৯০৫ (১ শ্রাবণ, ১৩১২)।
  27.  হজরত বেলালের বেলালের জীবনী কাব্যঃ সেপ্টেম্বর, ১৯০৫।
  28.  হজরত আমীর হামজার ধর্ম্মজীবন লাভ কাব্যঃ নভেম্বর, ১৯০৫ (কার্ত্তিক, ১৩১২)।
  29.  মদিনার গৌরব কাব্যঃ ডিসেম্বর, ১৯০৬ (১৩১৩)।
  30.  মোসলেম বীরত্ব কাব্যঃ জুলাই, ১৯০৭ (২৫ আষাঢ়, ১৩১৪)।
  31.  এসলামের জয় গদ্য রচনাঃ অগাস্ট, ১৯০৮।
  32.  মুসলমানের বাংলা শিক্ষা, ২য় ভাগস্কুল পাঠ্য:মে,১৯০৮।
  33.  বাজীমাৎ নক্সা: ডিসেম্বর, ১৯০৮ কবিতায় রচিত নক্সা।
  34.  আমার জীবনী, ১ম খণ্ড:১৯০৮~১৯১০ আত্মজীবনী।
  35.  হজরত ইউসোফ গল্প: ১৯০৮ আমার জীবনীর প্রথম খন্ডে যন্ত্রস্থ বলে বিজ্ঞাপিত হয়েছে।
  36.  খোতবা গদ্য রচনা ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সাহিত্য সাধক চরিত মালাপুস্তকে বইটির কথা উল্লেখ করেছেন কিন্তু কোন বিবরন দেননি।
  37.  আমার জীবনীর জীবনী কুলসুম-জীবনী: মে, ১৯১০ (১১ চৈত্র, ১৩১৬) আত্মজীবনী।

বিবাহ ও মৃত্যু

মাত্র আঠার বছরে বয়সে তার পিতৃবন্ধুর কন্যা আজিজুন্নেসার সাথে বিয়ে হয়। ১৯ ডিসেম্বর, ১৯১১ সালে দেলদুয়ার এস্টেটে ম্যানেজার থাকাকালেই সৈয়দ মীর মশাররফ হোসেন পরলোকগমন করেন। তাকে পদমদীতে দাফন করা হয়।