মীর মশাররফ হোসেনের জীবনী

সৈয়দ মীর মশাররফ হোসেন (জন্ম:-নভেম্বর ১৩, ১৮৪৭ মৃত্যু:-ডিসেম্বর ১৯, ১৯১১) ছিলেন একজন বাঙালি ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক। তিনি বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান গদ্যশিল্পী ও বাঙালি মুসলমান সাহিত্যিকদের পথিকৃৎ। কারবালার যুদ্ধকে উপজীব্য করে রচিত বিষাদ সিন্ধু তার সবচেয়ে জনপ্রিয় সাহিত্যকর্ম।

তিনি তৎকালীন বৃটিশ ভারতে (বর্তমান বাংলাদেশ) কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালি উপজেলার চাঁপড়া ইউনিয়নের লাহিনীপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার লেখাপড়ার জীবন কাটে প্রথমে কুষ্টিয়ায়, পরে ফরিদপুরের পদমদীতে ও শেষে কৃষ্ণনগরের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে। তার জীবনের অধিকাংশ সময় ব্যয় হয় ফরিদপুরের নবাব এস্টেটে চাকরি করে। তিনি কিছুকাল কলকাতায় বসবাস করেন।

সৈয়দ মীর মশাররফ হোসেন তার বহুমুখী প্রতিভার মাধ্যমে উপন্যাস, নাটক, প্রহসন, কাব্য ও প্রবন্ধ রচনা করে আধুনিক যুগে মুসলিম রচিত বাংলা সাহিত্যে সমৃদ্ধ ধারার প্রবর্তন করেন।

প্রাথমিক জীবন

সৈয়দ মীর মশাররফ হোসেন খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালীর একটি ছোট গ্রাম লাহিনিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু তার জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দির পদমদীতে অতিবাহিত করেন। তবে তার জন্ম তারিখ ১৮৪৭ সালের ১৩ নভেম্বর বলে ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়। কিন্তু কিছু গবেষক তার জন্ম তারিখ ১৮৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর বলে দাবী করেন।তিনি নবাব সৈয়দ মীর মোয়াজ্জেম হোসেন (মুসলিম সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি, তৎকালীন পদমদী নবাব এস্টেটের জমিদার) এবং দৌলতুন্নেছার ঘরে জন্মগ্রহণ করেন।

সৈয়দ মীর মশাররফ হোসেনের স্কুল জীবন কেটেছে প্রথমে কুষ্টিয়ায়, পরে পদমদী এবং শেষে কৃষ্ণনগরশহরে। জগমোহন নন্দীর পাঠশালা, কুমারখালির ইংলিশ স্কুল, পদমদী নবাব স্কুল ও কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুল এ পড়ার কথা লেখকের আত্নজীবনীতে লেখা আছে।

‘বঙ্গবাসী মুসলমানদের দেশভাষা বা
মাতৃভাষা “বাঙ্গালা”। মাতৃভাষায়
যাহার আস্থা নাই, সে মানুষ নহে।
বিশেষ সাংসারিক কাজকর্ম্মে
মাতৃভাষারই সম্পূর্ণ অধিকার।
মাতৃভাষায় অবহেলা করিয়া অন্য
দুই ভাষায় বিখ্যাত পণ্ডিত হইলেও
তাহার প্রতিপত্তি নাই। পরিবার, আত্মীয়স্বজন, এমনকি প্রাণের প্রাণ
যে স্ত্রী, তাহার নিকটেও আদর নাই। অসুবিধাও বিস্তর। ইস্তক ঘরকন্নার
কার্য্য নাগাদে রাজসংশ্রবী যাবতীয়
কার্য্যে বঙ্গবাসী মুসলমানদের
বাঙ্গালা ভাষার প্রয়োজন।

মীর মশাররফ হোসেন (“আমাদের শিক্ষা” নামক প্রবন্ধ)

রচনাবলি

এখন পর্যন্ত মীর মশাররফ হোসেনের মোট ৩৬ টি বইয়ের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রকাশের তারিখ অনুসারে সেগুলো হল :

  1. রত্নবতী:সেপ্টেম্বর, ১৮৬৯ (৩০ শ্রাবণ,১২৭৬)
    গদ্যে রচিত প্রথম বাঙ্গালী মুসলমান রচিত গল্প।
    গোরাই-ব্রিজ অথবা গৌরী-সেতু:জানুয়ারী, ১৮৭৩ (পৌষ, ১২৭৯) (কবিতা)।
  2.  বসন্তকুমারী নাটক: ফেব্রুয়ারী, ১৮৭৩ (১৫ মাঘ, ১২৭৯) বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সাহিত্যিক রচিত প্রথম নাটক। নাটকটি তিনি নওয়াব আবদুল লতিফকে উৎসর্গ করেন।
  3.  জমীদার দর্পণ নাটক: মে, ১৮৭৩ (চৈত্র ১২৭৯)।
  4.  এর উপায় কি? : ১৮৭৫ প্রহসন।
  5.  বিষাদ সিন্ধু মহরম পর্ব: মে, ১৮৮৫ (১২৯১) উপন্যাস।
  6.  বিষাদ সিন্ধু উদ্ধার পর্ব: অগাস্ট, ১৮৮৭ (শ্রাবণ,১২৯৪)উপন্যাস।
  7.  বিষাদ সিন্ধু এজিদ-বধ পর্ব: মার্চ, ১৮৯১ (১২৯৭) উপন্যাস।
  8.  সঙ্গীত লহরী, ১ম খণ্ড: ১৮৮৭ (১২৯৪) গান।
  9.   গো-জীবন: মার্চ, ১৮৮৯ (২৫ ফাল্গুন, ১২৯৫) (প্রবন্ধ) এই গ্রন্থ রচনার দায়ে তাকে মামলায় জড়িয়ে পড়তে হয়।
  10.  বেহুলা গীতাভিনয়: জুন, ১৮৮৯ (৭ আশ্বিন, ১২৯৬) নাটক গদ্যে পদ্যে রচিত।
  11.  উদাসীন পথিকের মনের কথা: অগাস্ট, ১৮৯০ (১২৯৭) উপন্যাস আত্মজৈবনিক উপন্যাস, নীলকরদের অত্যাচারের কাহিনী এতে সুন্দরভাবে রুপায়িত হয়েছে।
  12.  তহমিনা: জানুয়ারি, ১৮৯৭ উপন্যাস জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ-এপ্রিল (একত্রে) এই তিন সংখ্যা মাসিক ‘হাফেজ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। উপন্যাসটি সমাপ্ত কি না বা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে কি না জানা যায় নি।
  13.  টালা অভিনয়: মার্চ-এপ্রিল, ১৮৯৭ প্রহসন ‘হাফেজ’ পত্রিকার মার্চ-এপ্রিল সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।
  14.  নিয়তি কি অবনতি: ডিসেম্বর, ১৮৯৮ নাটক ১৮৯৮ সালের ডিসেম্বর সংখ্যা (১ম বর্ষ, ৬ষ্ঠ সংখ্যা) এবং ১৮৯৯ সালের জুন সংক্যার (২য় বর্ষ, ২য় সংখ্যা) ‘কোহিনুর’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। নাটকটি সম্পূর্ণ হয়েছিল কি না বা গ্রন্থাকারে বের হয়েছিল কি না জানা নেই।
  15.  গাজী মিয়াঁর বস্তানী: ১৮৯৯ (১৫ আশ্বিন, ১৩০৬) নক্সা।
  16.  ভাই ভাই এইত চাই: ১৮৯৯ প্রহসন, গা.মি.ব. বইয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রকাশের সংবাদ দেওয়া হয়েছিল।
  17.  ফাস কাগজ: ১৮৯৯ প্রহসন গা.মি.ব. বইয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রকাশের সংবাদ দেওয়া হয়েছিল।
  18. এ কি?: ১৮৯৯ প্রহসন গা.মি.ব. বইয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রকাশের সংবাদ দেওয়া হয়েছিল।
  19.  পঞ্চনারী পদ্য কবিতা: ১৮৯৯ গা.মি.ব. বইয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রকাশের সংবাদ দেওয়া হয়েছিল।
  20.  প্রেম পারিজাত গদ্য: ১৮৯৯ রচনাগা.মি.ব. বইয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রকাশের সংবাদ দেওয়া হয়েছিল।
  21. রাজিয়া খাতুন গদ্য: ১৮৯৯ রচনাগা.মি.ব. বইয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রকাশের সংবাদ দেওয়া হয়েছিল।
  22.  বাঁধা খাতা প্রহসন: ১৮৯৯ গা.মি.ব. বইয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রকাশের সংবাদ দেওয়া হয়েছিল।
  23.  মৌলুদ শরীফ: ১৯০৩ ধর্ম বিষয়ক গদ্যে-পদ্যে রচিত ধর্ম্মোপদেশ।
  24.  মুসলমানের বাংলা শিক্ষা, ১ম ভাগঃ অক্টোবর, ১৯০৩ স্কুল পাঠ্য।
  25.  বিবি খোদেজার বিবাহ কাব্যঃ মে, ১৯০৫ (২ বৈশাখ, ১৩১২)।
  26.  হজরত ওমরের ধর্ম্মজীবন লাভ কাব্যঃঅগাস্ট, ১৯০৫ (১ শ্রাবণ, ১৩১২)।
  27.  হজরত বেলালের বেলালের জীবনী কাব্যঃ সেপ্টেম্বর, ১৯০৫।
  28.  হজরত আমীর হামজার ধর্ম্মজীবন লাভ কাব্যঃ নভেম্বর, ১৯০৫ (কার্ত্তিক, ১৩১২)।
  29.  মদিনার গৌরব কাব্যঃ ডিসেম্বর, ১৯০৬ (১৩১৩)।
  30.  মোসলেম বীরত্ব কাব্যঃ জুলাই, ১৯০৭ (২৫ আষাঢ়, ১৩১৪)।
  31.  এসলামের জয় গদ্য রচনাঃ অগাস্ট, ১৯০৮।
  32.  মুসলমানের বাংলা শিক্ষা, ২য় ভাগস্কুল পাঠ্য:মে,১৯০৮।
  33.  বাজীমাৎ নক্সা: ডিসেম্বর, ১৯০৮ কবিতায় রচিত নক্সা।
  34.  আমার জীবনী, ১ম খণ্ড:১৯০৮~১৯১০ আত্মজীবনী।
  35.  হজরত ইউসোফ গল্প: ১৯০৮ আমার জীবনীর প্রথম খন্ডে যন্ত্রস্থ বলে বিজ্ঞাপিত হয়েছে।
  36.  খোতবা গদ্য রচনা ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সাহিত্য সাধক চরিত মালাপুস্তকে বইটির কথা উল্লেখ করেছেন কিন্তু কোন বিবরন দেননি।
  37.  আমার জীবনীর জীবনী কুলসুম-জীবনী: মে, ১৯১০ (১১ চৈত্র, ১৩১৬) আত্মজীবনী।

বিবাহ ও মৃত্যু

মাত্র আঠার বছরে বয়সে তার পিতৃবন্ধুর কন্যা আজিজুন্নেসার সাথে বিয়ে হয়। ১৯ ডিসেম্বর, ১৯১১ সালে দেলদুয়ার এস্টেটে ম্যানেজার থাকাকালেই সৈয়দ মীর মশাররফ হোসেন পরলোকগমন করেন। তাকে পদমদীতে দাফন করা হয়।

নীল বিদ্রোহ ও নীল চাষের সমাপ্তি

নীল বিদ্রোহ ও নীল চাষের সমাপ্তি

১৮৫৮ সালে নীলবিদ্রোহের অগ্নি দেশময় ছড়িয়ে পড়লেও নীলচাষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উঠেছিল অনেক আগ থেকেই। ১৮১০ সাল থেকেই নীলচাষের বিরুদ্ধে প্রজা সাধারণ সংগঠিত হতে থাকে।

নীলকরদের অন্যায় অত্যাচার ছাড়াও জাত যাওয়ার মানসিকতায় তার সাহেবদের ভালো চোখে দেখত না। এ সময় পাদ্রীরা ব্যাপক হারে হিন্দু, মুসলমান উভয়ের দারিদ্রের সুযোগ নিয়ে খ্রিস্টান বানাতে থাকে। কথা উঠল, ‘জমির শত্রু নীল, কাজের শূল ঢিল, আর জাতীয় শত্রু পাদ্রী হীল।’ সে সময় থেকেই প্রজাগণ নীলকরদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনতেন। কিন্তু সরকার গোলমাল মেটাবার জন্য তেমন ব্যবস্থা করতেন না। ১৮৩০ অব্দে প্রজাদের পক্ষে এক চুক্তিনামার আইন পাস (Regulation V of 1830). হয়। কিন্তু পাঁচ বছর পর বেন্টিক এ আইন তুলে নেন। এছাড়াও নীল প্রধান জেলায় তৎকালীন বাংলার প্রথম বড়লাট হ্যালিডে সহকারী নীলকর ম্যাজিস্ট্রেট নিযুক্ত করতে লাগলেন। জনগণ ভাবতে আরম্ভ করল বুঝি সরকারই নীলের অংশীদার। নীলকরেরাও এই সুযোগ বুঝে অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দিল। প্রজার ধানের জমি, আখের জমি, খেজুরের বন কেটে এবং বিদ্রোহী প্রজার ঘর ভেঙ্গে ভিটের উপর নীল চাষ করতে বাধ্য করল। ‘ভিটের ঘুঘু চড়ান’ প্রবাদটি এখান থেকেই এসেছে। আজও কুষ্টিয়া রাজবাড়ীর মানুষ একটুতে একটু কিছু হলেই বলে, তোর ভিটেয় ঘুঘু চড়াব। তখন রাজবাড়ীর পার্শ্ববর্তী জেলা পাবনা নীলচাষের আওতা বহির্ভুত ছিল বা ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, খুলনার মতো ব্যাপক নীলচাষ হত না। তারা নীলকরদের অত্যাচারের আওতামুক্ত থেকে সুখে ছিল। রাজবাড়ির মানুষ বলত, যে যায় পাবনা তার নেই ভাবনা।

এ প্রবাদটি আজও কুষ্টিয়া রাজবাড়ীর মানুষের মুখের বুলি। প্রজা প্রহারের জন্য তারা এক প্রকার মুণ্ডর তৈরি করেছিল যাকে বলা হত —–শ্যামচাঁদ। ওই শ্যামচাঁদের আঘাতে প্রজারা জর্জরিত হতেন। কুঠির লোকেরা প্রচার করছিল যে, প্রজাদের শাস্তির জন্য সরকার অচিরেই ‘মুণ্ডরের আইন’ পাশ করতে যাচ্ছে। মুণ্ডরের আইন আর শ্যামচাঁদের ভয়ে প্রজারা থরহরি কম্পমান থাকতেন। কিছু কিছু বিদ্রোহী প্রজা নীল বুনতে অস্বীকার করলে ক্রোধান্বিত কুঠিয়ালরা পাখির মতো গুলি করে মারত। ধীরে ধীরে প্রজারা ক্রোধান্বিত হয়ে উঠতে লাগল। তারা প্রতিজ্ঞা করল জীবন গেলেও তারা নীলচাষ করবে না। ১৮৫৮ সালে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠলো ফরিদপুর, রাজবাড়ী, যশোর, কুষ্টিয়ায়। দেখা দিল ‘সংঘবদ্ধ বিদ্রোহ’ যা ইতিহাসে ‘নীলবিদ্রোহ’ বলে পরিচিত।

যশোর, ফরিদপুর, কুষ্টিয়াই নীলচাষের প্রধান ক্ষেত্র বলে বিবেচিত। যশোরের চৌগাছার বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস ও দিগম্বর বিশ্বাসের নেতৃত্বে প্রথম নীলবিদ্রোহ শুরু হয়। পরে তা সমগ্র অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ১৮৫৮ সালে শত শত নারী পুরুষ সংঘবদ্ধভাবে নীলচাষের বিরুদ্ধে ক্ষেপে ওঠে। ১৮৫৯ সালের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত এই বিদ্রোহ যশোর, ‍কুষ্টিয়া, নদীয়া, ফরিদপুর, ব্যাপককার ধারণ করে। নেতৃত্ব দেন চৌগাছার বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস, পলু মাগুরার শিশির কুমার ঘোষ, সাধুহাটির জমিদার মথুরানাথ আচার্য, শরিয়তপুরের হাজী শরীয়তুল্লাহর ছেলে পীর দুদু মিয়া, রাজবাড়ীর সোনাপুরের কৃষক হাশেম আলী, পাংশার জমিদার ভৈরব নাথ প্রমুখ। যশোরের চৌবাড়িয়ার নীলদর্পণ প্রণেতা দীনবন্ধু মিত্র, কলিকাতার হিন্দু প্যাট্রিয়ট সম্পাদক হরিশচন্দ্র মজুমদার, কুমারখালির কাঙ্গাল হরিনাথ, সুসাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেন, পাংশার রওশন আলী চৌধুরী খোন্দকার নজীর হোসেন লেখনীর মাধ্যমে বিদ্রোহীকে অগ্নিরুপ ধারণ করতে সাহায্য করেন।

১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে আশ্বিন মাসে দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়। এ নাটকে নীলকরপীড়িত বাংলাদেশের এক জীবন্ত চিত্র তুলে ধরা হয়। কয়েক মাসের মধ্যে এই পুস্তক পাদবী লং সাহেবের তত্ত্বাবধানে কবিবর মাইকেল মধুসূদন দত্তের লেখনীর সাহায্যে ইংরেজিতে অনূদিত হলে নীলকর মহলে হুলুস্থল পড়ে গেল। নীলকররা লং এর বিরুদ্ধে মামলা করলে তার একমাস জেল এবং ১ হাজার টাকা জরিমানা হল। কালীপ্রসন্ন সিংহ তৎক্ষাণাৎ কোর্টে এক হাজার টাকা জমা দিলেন। কিন্তু কারাদণ্ড মাফ হল না। কিন্ত প্রজার চোখে মহান হয়ে উঠলেন লং সাহেব। কবিরা গ্রাম্য সুরে গান রচনা করল—–‘নীলবাঁদের সোনার বাংলা করল এবার ছারে খার, অসময়ে হারিয়া মলো, লং এর হল কারগার—–প্রজার প্রাণ বাঁচা ভার।’ মহারানী ভিক্টোরিয়া ইংল্যান্ডে রাজ্যাসনে বসার পর ভারতের শাসন বিভাগে এক নবযুগের অবতারণা হয়েছিল। প্রসিদ্ধ গ্রান্ট মহোদয় (Sir, JP Grant) বাংলার বড়লাট এবং দয়ার সাগর বলে পরিচিত। লর্ড ক্যানিং ভারতের রাজ্য প্রতিনিধি হলেন। বস্তুত তাদের সহায়তাতেই এদেশে নীলকরের দৌরাত্ব হ্রাস পেয়েছিল। ১৭৯৩ সালে বর্তমান রাজবাড়ী জেলার অধিক অংশ ঘাট গোয়ালন্দকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল তা থেকে রাজবাড়ী জেলাকে বাদ দেওয়ার অবকাশ নেই। তাই যশোরের পলু মাগুরার শিশির কুমার এবং শরীয়তপুরের পীর দুদু মিয়া, পাংশার ভৈরব নাথ, সোনাপুরের হাসেম আলীর ভূমিকা আলোচনা প্রয়োজন।

১৮৫৮ সালে শিশির কুমারের বয়স মাত্র ১৮ বছর। এ যুবক যে জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়ে প্যাট্রিয়ট পত্রিকার জন্য প্রবন্ধ লিখতেন তাতে ইংরেজ কর্তৃপক্ষের তাক লেগে যেত। যশোরের ম্যাজিট্র্রেট মেলোনী ও স্কীনার সাহেব তাঁকে ভয় দেখালেন কিন্ত লেখা থেকে বিরত করতে পারলেন না। তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে নীলচাষের বিরুদ্ধে প্রজাদের সংগঠিত ও সাহসী করে তুলতেন। গ্রামের সীমানায় একস্থানে একটি ঢাক থাকত, নীলকরের সাহেবরা অত্যাচার করতে এলে কেহ ঢাক বাজিয়ে দিতেন। অমনি শত শত গ্রাম্য কৃষক লাঠিসোটা নিয়ে তাদের ঘিরে ফেলত এবং তারা অক্ষত দেহে ফিরে যেতে পারত না। নীলকরের অত্যাচার থেকে রক্ষা করতেই যেন শিশির বাবু ঈম্বর কর্তৃক প্রেরিত হয়েছিল। এই মনে করে হিন্দু কৃষকগণ তাঁকে দেবতার ন্যায় ভক্তি করত। মুসলমান কৃষকগণ তাঁর নামে সিন্নি দিত। তাকে ‘সিন্নিবাবু’ বলে সকলে সম্বোধন করত। তাঁর ডাকে হাজার হাজার কৃষক সমবেত হত।

নীলবিদ্রোহের কেন্দ্র বলে পরিচিত চৌগাছা, সিন্দুরিয়া, জোড়াদহ, নয়াহাটা, চুয়াডাঙ্গা ছাড়িয়ে গড়াই নদীর উত্তর পাড়ে রাজবাড়ী অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ল। মাদারীপুর, ফরিদপুরের বিভিন্ন অঞ্চলসহ রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি, জঙ্গল, সোনাপুর, মৃগী, পাংশা, সংগ্রামপুর, কুমারখালি অঞ্চলে বিদ্রোহের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। এ অঞ্চলে নীলবিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন শরিয়তপুরের পীর দুদু মিয়া, সোনাপুরের (বালিয়াকান্দি) হাসেম আলী, পাংশার ভৈরব বাবু প্রমুখ। পীর দুদু মিয়া জমিদারের বিরুদ্ধে দুর্দশাগ্রস্থ চাষীদের ভীষণভাবে ক্ষেপিয়ে তোলেন।

১৮৬৮ সালে ৩ সেপ্টেম্বর অমৃতবাজার পত্রিকায় দুদুমিয়ার শক্তির কিছু পরিচয় পাওয়া যায়, লেখা হয়—–‘কালে তার প্রভাব এতদূর বৃদ্ধি পায় যে কুঠিয়াল ইংরেজ ও জমিদারদের বিরুদ্ধে তিনি মনে করলে ৫০ হাজার লোক সংগ্রহ করতে পারতেন। সোনাপুরের হাসেম আলীর নেতৃত্বে শত শত চাষী সংঘবদ্ধ হয়। সোনাপুর, বহরপুর, বালিয়াকান্দি, বসন্তপুরসহ অনেক নীলকুঠিতে তাঁর নেতৃত্বে আগুন দেওয়া হয়।’ সে সময় পাংশার জমিদার ভৈরব বাবু নীলচাষের বিরুদ্ধে পাংশায় নেতৃত্ব দেন। ভৈরব বাবু ছিলেন অত্যন্ত সাহসী ও ডাকসাইটে জমিদার। নীলকরদের বিরুদ্ধে তিনি সক্রিয় গণবিদ্রোহের সূচনা করেন। তিনি পার্শ্ববর্তী কুঠি আক্রমণ করে বিপুল ধবংস সাধন করেন। এতে ক্ষুদ্ধ হয়ে টিআই ক্যানী ভৈরবনাথের ট্রেজারী লুট করে। ভৈরব বাবু পাবনা আদালতে ট্রেজারী লুটের মামলা করেন। এ মামলায় তিনি ১৪ হাজার টাকা ডিক্রী লাভ করেন। এর কিছুক্ষণ পর ক্যানীর লোকজন তাকে অপহরণ করে নিহত করেন। (পাংশা উপজেলার ইতিহাস, শেখ মুহাম্মদ সবুর উদ্দিন, পৃষ্ঠা-৩, ৪)। বেলগাছি অদূরে একটি গ্রামের নাম সংগ্রামপুর। ঐ গ্রামের মানুষেরা নীলচাষের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ায় এর নাম হয় সংগ্রামপুর। সংগ্রামপুর আজও নীলবিদ্রোহের ইতিহাস বহন করছে। জঙ্গল ইউনিয়নে ঠাঠাপড়ার ভিটার বিষয়ে বলা হয়েছে।

১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে নীলবিদ্রোহ গুরুতর আকার ধারণ করল। লর্ড ক্যানিং এ সংবাদে ব্যাতিব্যস্ত হয়ে উঠলেন। এ ব্যাপারে তিনি বাংলার বড়লাট গ্রান্ট সাহেবের পরিদর্শনের ভার দেন। ঐ বছর তিনি গড়াই, কুমার, কালীগঙ্গার নদীপথে ৭০ থেকে ৮০ মাইল স্টিমার যোগে পরিদর্শন করেন। প্রায় ১৪ ঘন্টা ব্যাপী এ ভ্রমণ চলে। নদীর উভয় কূলে হাজার হাজার কৃষক শ্রেণিবদ্ধভাবে জমায়েত হয়ে ফরিয়াদ জানায়। কথিত আছে গড়াই নদীর কূল দিয়ে যাওয়ার সময় রাজবাড়ী জেলার হাজার হাজার কৃষক দুদুমিয়া ও হাশেম আলীর নেতৃত্বে কামারখালি ঘাট থেকে সমাধিনগর, নাড়ুয়া মুখে সমবেত হয়। নদীর ধারে হাজার হাজার কৃষক হাতে দরখাস্ত নিয়ে ক্যাপ্টেনকে ঘাটে জাহাজ ভিড়াতে অনুরোধ করতে লাগল। কিন্তু ক্যাপ্টেন কোনো মতে জাহাজ ঘাটে ভিড়ান না। এতে প্রজারা প্রাণ বিসর্জন দেওয়ার উদ্দেশ্যে খরস্রোতা গড়াই নদীর পানিতে ঝাঁপ দিয়ে ভেসে যেতে লাগল। গ্রান্ট সাহেব এ দৃশ্য দেখে জাহাজ ঘাটে ভিড়াতে আদেশ দিলেন। প্রজারা জাহাজ ঘিরে ফেলল এবং গ্রান্ট সাহেবকে প্রতিজ্ঞা করাল যে তিনি প্রজাদের রক্ষা করবেন।

এরপর থেকে পাঁচজন সদস্য নিয়ে ‘ইন্ডিগো কমিশন’ গঠিত হয়। পরবর্তী ডিসেম্বর মাসে গ্রান্ট মহোদয় সুদীর্ঘ মন্তব্য করেন—-বাংলার প্রজা ক্রীতদাস নহেন। প্রকৃতপক্ষে জমির স্বত্ত্বাধিকারী। তাহাদের পক্ষে এরুপ ক্ষতির বিরোধী হওয়া বিস্ময়কর। যাহা ক্ষতিজনক তাহা করাইতে গেলে অত্যাচার অবশ্যম্ভবী। এই অত্যাচারের আতিশস্যাই নীল বপনে প্রজার আপত্তির মূখ্য কারণ—-(হেমেন্দ্র প্রসাদ ঘোষ লিখিত নীলদর্পণের ভূমিকা, কর মজুমদার সং-১ পৃ) কমিশন নিম্নলিখিত সুপারিশ এবং তদ্বারা ইশতেহার জারী করা হয়-(১) সরকার নীলচাষের পক্ষে বা বিপক্ষে নহেন (২) অন্য চাষের মতো নীলচাষ করা বা না করা সম্পূর্ণরুপে প্রজার ইচ্ছাধীন (৩) আইন অমান্য করে অত্যাচার বা অশান্তির কারণ হলে নীলকর বা প্রজা কেউই কঠোর শাস্তি হতে নিস্তার পাবেন না।

কমিশনের ইশতেহার প্রকাশের পর নীলচাষ প্রজার ইচ্ছাধীন হলেও নীলের ব্যবসা ও উৎপাদন বন্ধ হল না। তবে নীলচাষ ক্রমে ক্রমে হ্রাস পেতে থাকল। অনেক স্থানের কুঠি বন্ধ হলেও রাজবাড়ি অঞ্চলের নীলের চাষ চলতেই থাকে। এ সময় টমাস কেনীর অত্যাচারও যেন বেড়ে যায়। এ অঞ্চলের প্রজারা আরো বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। এ প্রসঙ্গে মীর মশাররফ হোসেনের আমার জীবনী গ্রন্থে ১১০ পৃষ্ঠায় —–‘নীলচাষের দৌরাত্ব সহ্য করিতে না পারিয়া সর্বসাধারণ প্রজা আবার নীলবিদ্রোহী হইয়াছেন। মীর সাহেব আলী বিদ্রোহের সময় প্রজার দলে মিশিয়াছেন। প্রজাসাধারণ এত ক্ষেপে উঠলো যে কি কৌশলে টমাস কেনীর প্রাণ হরণ করবেন, মিসেস কেনীর সর্বনাশ করবেন, কী কৌশলে সালঘর মধুয়ার কুঠি ভাঙ্গিয়া কালীগঙ্গায় নিক্ষেপ করবেন।’ সতীশ চন্দ্র মিত্র লিখেছেন নীলের দ্বিতীয় বিদ্রোহ শুরু ১৮৮৯ সালে। ডম্বল সাহেবের অত্যাচারে এ বিদ্রোহ দেখা দেয়। এ বিদ্রোহ মাগুরা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া ও রাজবাড়ি সীমাবদ্ধ ছিল। এ সময় পাটের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রজারা নীলচাষে একেবারেই অসম্মতি জানায়। ফলে নীলকরেরা নীলের দাম বৃদ্ধি করে নীলচাষ করতে চায় কিন্তু তারা ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্থ হতে থাকে। এরই মধ্যে জার্মান থেকে কৃত্রিম কৌশলে উৎপাদিত নীল সস্তা দামে দেশে দেশে আমদানী হওয়ায় নীলের চাষ ও ব্যবসা ১৮৯৫ সালের মধ্যে একেবারে উঠে গেল।

ইংরেজ শাসনকালে এ দেশে নীলচাষ, নীলবিদ্রোহ, নীলকরদের অন্যায় অত্যাচার ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়। শত বছরেরও অধিক কাল পূর্বে তা শেষ হয়েছে। তারপরও এদেশের মানুষকে ইংরেজ-পাকিস্তানি ও স্বজাতীয়দের দ্বারা কত দুঃখ যন্ত্রণাই না ভোগ করতে হয়েছে। ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ অনাহারে মারা যায়, ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হন। এখনো দেশে প্রায় ৩০ ভাগ মানুষ দারিদ্রপিড়ীত। রাজনৈতিক সহিংসতা মনে শঙ্কা জাগায়। সন্ত্রাস, দুর্নীতি উন্নয়নকে ব্যবহ করছে। এতদ্বসত্ত্বেও বাংলাদেশ একবিংশ শতকের চ্যালেঞ্জ নিয়ে দ্রুত বিশ্বায়নের পথে সতর্ক সম্পর্ক স্থাপন করে চলেছে। বাড়ছে মাথাপিছু আয়, বাড়ছে প্রযু্ক্তি, বাড়ছে মানুষের জীবনযাত্রার মান। বাংলাদেশের মানুষের বিগত দুই শত বছরের ইতিহাসের প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এ জাতি শত প্রতিকুলতার মধ্য দিয়ে স্বাধীকার, স্বকীয়তা, স্বাধীনতা ও আত্মবিকাশের পথে নিরন্তর চালনা করছে। এ ধারা অব্যাহত থাক, শত বছর পরের ইতিহাস পাঠক এ সংবাদ পাঠ করবে—-এ প্রত্যাশায়।

সংগ্রহ:kushtiatown.com

অগ্রহায়ণ বা অঘ্রান বাংলা

অগ্রহায়ণ বা অঘ্রান বাংলা সনের অষ্টম এবং শকাব্দের নবম মাস। এই মাসের আরেক নাম মার্গশীর্ষ। প্রাচীন বাংলা ভাষায় এই মাসটিকে আঘন নামে চিহ্নিত করা হত। মৃগশিরা নামক তারা থেকে ‘মার্গশীর্ষ’ নাম এসেছে।

তবে আমাদের কাছে এই মাসের নাম অগ্রহায়ণ। এখন এটি বাংলা সালের অষ্টম মাস। কিন্তু এক সময় অগ্রহায়ণ ছিল বছরের প্রথম মাস। ‘অগ্র’ শব্দের অর্থ ‘আগে’ আর ‘হায়ণ’ শব্দের অর্থ ‘বছর’। বছরের আগে বা শুরুতে ছিল বলেই এই মাসের নাম ‘অগ্রহায়ণ’।

এটি হেমন্ত ঋতুর দ্বিতীয় মাস। “অগ্রহায়ণ” শব্দের অভিধানিক অর্থ বছরের যে সময় শ্রেষ্ঠ ব্রীহি (ধান) উৎপন্ন হয়। অতীতে এই সময় প্রচুর ধান উৎপাদিত হত বলে এই মাসটিকেই বছরের প্রথম মাস ধরা হত।

বাঙালি হিন্দু সমাজের বিশ্বাস অনুযায়ী, অগ্রহায়ণ মাস বিবাহের পক্ষে বিশেষ শুভ মাস। পশ্চিমবঙ্গের লোকসমাজে অগ্রহায়ণ মাসকে ‘লক্ষ্মীর মাস’ মনে করা হয়। এই কারণে এই মাসেই নবান্ন উৎসব ও লক্ষ্মীপূজার বিশেষ আয়োজন করা হয়।

শহীদ খবিরুজ্জামান একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা

শহীদ খবিরুজ্জামান (জন্ম:১৯৫১ – মৃত্যু: ১২ অক্টোবর, ১৯৭১) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতা যুদ্ধে তার সাহসিকতার জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে বীর বিক্রম খেতাব প্রদান করে।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন
শহীদ খবিরুজ্জামানের বাড়ী রাজবাড়ী জেলা পংশা উপজেলা বাহাদুরপুর ইউনিয়নের কাজীপাড়া গ্রামে। তার বাবার নাম আবদুল জব্বার মৃধা এবং মায়ের নাম সুফিয়া খাতুন। তিনি অবিবাহিত ছিলেন।
কর্মজীবন
খবিরুজ্জামান ১৯৭১ সালে নৌকমান্ডোর প্রশিক্ষণ নেওয়ার প্রথম চট্টগ্রামে অপারেশনে অংশ নেন। পরবর্তীতে খুলনার চালনা বন্দরেযুদ্ধে যোগ দেন।

মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা
১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসের প্রথম দিকে খবিরুজ্জামানসহ তিনজন নৌ কমান্ডো ভারত থেকে রওনা হলেন মাদারীপুরের উদ্দেশে। এ দলের লক্ষ্য টেকেরহাট ফেরিঘাটে আক্রমণ। নিরাপত্তার কারণে তাদের রাতে চলাচল করতে হয় আর যাত্রাপথও তাদের অচেনা। নানা বাধা অতিক্রম করে কষ্টে যুদ্ধাস্ত্র, মাইনসহ তারা সাত দিনে পৌঁছালেন মাদারীপুরের রাজৈরে গোপন মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে। সেখানে অবস্থা পর্যবেক্ষণের পর তারা সিদ্ধান্ত নিলেন অক্টোবরের শেষ দিকে টেকেরহাট ফেরিঘাট আক্রমণের। তাদের নিরাপত্তা দেবে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল। নির্ধারিত দিন রাত একটায় খবিরুজ্জামান ও অন্য দুই নৌ কমান্ডো মাইন বুকে বেঁধে এগিয়ে যেতে থাকলেন। কিন্তু রেকিতে ভুল থাকায় খবিরুজ্জামান তার টার্গেট খুঁজে পাচ্ছিলেন না। এ জন্য তিনি পানি থেকে মাথা উঁচু করে তা খুঁজতে থাকলে পাকিস্তানি সেনারা তাকে দেখে ফেলে। সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাদের ছোড়া এক ঝাঁক গুলিতে খবিরুজ্জামানের মাথা ও দেহ ঝাঁঝরা হয়ে যায়। নৌকমান্ডো খবিরুজ্জামান সেদিন এখানে শহীদ হন। অন্য দুজন কমান্ডো সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। তাদের লাগানো মাইনে ফেরিঘাট সম্পূর্ণ ডুবে যায়। ঘটনার তিন দিন পর খবিরুজ্জামানের সহযোদ্ধারা জানতে পারেন টেকেরহাট থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরবর্তী এক স্থানে নদীতে ডুবুরির পোশাক পরিহিত খবিরুজ্জামানের লাশ ভেসে আছে। তখন তারা সেখানে গিয়ে খবিরের লাশ শনাক্ত করেন। কিন্তু পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ভয়ে তারা শহীদ খবিরের লাশ দাফন করতে না পেরে ডুবুরির পোশাক খুলে কুমার নদেই লাশটি ভাসিয়ে দেন। মুক্তিযুদ্ধে সাহসী ভূমিকা প্রদর্শনের জন্য শহীদ খবিরুজ্জামানকে মরণোত্তর বীর বিক্রম খেতাব দেওয়া হয়েছে।

রাজবাড়ী জেলার সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসম্পাদনা

রাজবাড়ী জেলার উত্তর দিকে প্রমত্তা পদ্মা নদী হাবাসপুর-সেনগ্রাম-ধাওয়াপাড়া ঘাট পর্যন্ত সরলভাবে প্রবাহিত হয়ে রাজবাড়ী জেলা শহরের কিঞ্চিৎ পশ্চিম হতে উত্তরে বাঁক নিয়ে দৌলতদিয়া পর্যন্ত প্রবাহিত । দৌলতদিয়ার সামান্য উত্তরে আরিচার ভাটিতে পদ্মা যমুনার সাথে মিলিত হয়েছে । পদ্মার অপর পারে পাবনা ও মানিকগঞ্জ জেলা । দক্ষিণে পদ্মার শাখা গড়াই নদী । গড়াইয়ের ওপারে ঝিনাইদহ ও মাগুরা জেলা । এ জেলার পূর্বে ফরিদপুর ও পশ্চিমে কুষ্টিয়া জেলা । পশ্চিমে পাংশা উপজেলার শেষ প্রান্ত গফুগ্রাম থেকে ১৫ কিঃমিঃ দুরে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঐতিহাসিক কুঠিবাড়ী কুষ্টিয়ার শিলাইদহ । জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত প্রাচীন নদী হড়াই, চত্রা ও চন্দনা মৃত প্রায় ।

জেলার নাতিশীতোষ আবহাওয়ায় তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৩৩ ডিগ্রি এবং সর্বনিম্ন ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস । বৃষ্টিপাত ২২.২৪ থেকে ৩৭.৭৭ মিঃমিঃ । বাতাসের আদ্রতা ৭৫ শতাংশ । ভৌগলিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে রাজবাড়ী জেলার রয়েছে নিজস্ব স্বকীয়তা । ফকীর সন্ন্যাস আন্দোলন, স্বদেশী আন্দোলন, মুজাহিদ আন্দোলন, ওহাবী আন্দোলন, ফরায়েজী আন্দোলন, সিপাহী বিদ্রোহসহ বৃটিশ বিরোধী বহু আন্দোলন, কমিউনিস্ট আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, ৬৯ এর গণ আন্দোলন, রেলশ্রমিক আন্দোলন এবং সর্বোপরি মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে রাজবাড়ীর ভূমিকা উল্লেখ করার মত । সাংস্কৃতিক অঙ্গণে উপ-মহাদেশ খ্যাত জলতরঙ্গ বাদক বামন দাস গুহের জন্মস্থান এই রাজবাড়ী । বিশ্বখ্যাত শিল্পী রশিদ চৌধুরীর জন্ম দিয়েছে এই জেলা । অমর কথা সাহিত্যিক বিষাদসিন্ধুর রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেন এর সমাধিও এ জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার পদমদীতে ছায়া সুনিবিড় সুশীতল পরিবেশে অবস্থিত । এ ছাড়া বহু কীর্তিমান রাজনীতিবিদ ও আমলার পূণ্য জন্মভূমি এই রাজবাড়ী । ক্রীড়াঙ্গণেও রয়েছে এ জেলার গৌরবময় অতীত । বর্তমানেও এ জেলার ছেলেমেয়েরা বিভাগীয় এবং জাতীয় পর্যায়ের সাঁতার, এ্যাথলেটিকস,ভলিবল, ফুটবল, ক্রিকেট প্রভৃতি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে কৃতিত্বের সাথে বিজয়ী হয়ে জেলার সম্মান বৃদ্ধি করেছে । সাঁতারে রাজবাড়ীর মেয়েরা জাতীয় পরিমন্ডল পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অংশগ্রহণ করেছে ।

১,০৯২.২৮ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এ জেলার জনসংখ্যা ৯,৫২,২৮০ জন । জনসংখ্যার ৯০ ভাগ মানুষ মুসলিম । দ্বিতীয় বৃহত্তম সম্প্রদায় সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু । এ ছাড়া খ্রীষ্টান ধর্মাবলম্বীরাও এ জেলায় বসবাস করে । জেলার মানুষ ধর্মপ্রাণ হলেও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বিশ্বাসী । অধিকাংশ মানুষ কৃষি নির্ভর । যুগের বিবর্তন ও সামাজিক পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের জীবিকার ব্যাপক পরিবর্তন হলেও আজও এ অঞ্চলের মানুষ কৃষির উপর নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি । শতকরা ১০ ভাগ স্বচ্ছল এবং শতকরা ২০ ভাগ মধ্যবিত্ত । সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে এ জেলায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কিছু শিল্প-কল-কারখানা গড়ে উঠলেও তা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেনি । বৃহৎ শিল্পের মধ্যে গোয়ালন্দ টেক্সটাইল মিল নামে একটি সুতাকল, রাজবাড়ী জুট মিল, সুনিপূন অর্গানিক্স নামে একটি রেক্টিফাইড স্পিরিট প্রস্তুতকারী কারখানা অন্যতম । এ ছাড়া শিল্পনগরী বিসিক এর অধীনে বেশ কিছু ক্ষুদ্র শিল্প কারখানা রয়েছে । মূলতঃ কৃষি নির্ভর হলেও চাকুরী, ব্যবসা, দিনমজুরি করা এ জেলার মানুষের অন্যতম পেশা । কামার, কুমার, তাতী, জেলে ও হরিজন প্রভৃতি পেশার লোকজনও এ জেলায় বসবাস করে । কিছুসংখ্যক অবাঙ্গালী পরিবারও এ জেলায় বসবাস করে ।

রাজবাড়ী জেলার অভ্যন্তরীণ ও বহিরাঞ্চলের সাথে যোগাযোগের জন্য সড়ক, রেলপথ ও নৌ-পথ রয়েছে । দৌলতদিয়া হতে ফরিদপুরগামী মহাসড়কের মাধ্যমে বরিশাল, যশোর, খুলনা তথা দক্ষিণাঞ্চলে এবং রাজবাড়ী-কুষ্টিয়া মহাসড়কের মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের সাথে সড়কপথে যোগাযোগের ব্যবস্থা রয়েছে । রাজবাড়ী হতে রেলপথেও খুলনা,রাজশাহী, রংপুর তথা উত্তরবঙ্গের সাথে যোগাযোগের ব্যবস্থা রয়েছে । এই রেলপথে প্রতিদিন স্থানীয় এবং আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করে । নৌপথেও রাজবাড়ী হতে পার্শ্ববর্তী জেলায় যোগাযোগের ব্যবস্থা আছে । দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া, দৌলতদিয়া-আরিচা, দৌলতদিয়া-নটাখোলা রুটে মানিকগঞ্জ, ঢাকা,ফরিদপুর ও তৎপার্শ্ববর্তী জেলা এবং জৌকুড়া ধাওয়াপাড়া-নাজিরগঞ্জ রুটে লঞ্চ ও ফেরী পারাপারের মাধ্যমে পাবনা তথা উত্তরবঙ্গের সংগে যোগাযোগের ব্যবস্থা আছে।

বাংলাদেশের বিজয় দিবস

বাংলাদেশের বিজয় দিবস: ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালে দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর এই দিনে বাঙালি জাতি অর্জন করেছে পূর্ণাঙ্গ বিজয়। ১৯৭১ সালের এই দিনে বাঙালিরা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে তাদেরকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেছিল। ৩০ লক্ষ শহিদের জীবন উৎসর্গ, অগণিত মা-বোনের সম্ভ্রমহানি এবং বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ৭১ এর এই দিনে পৃথিবীর মনচিত্রে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম হয়েছে বাংলাদেশের। তাই বিজয়ের এই দিনটি আমাদের জাতীয় জীবনে সর্বাপেক্ষা স্মরণীয়, আনন্দময় এবং গৌরবের দিন।

ঐতিহাসিক পটভূমি: প্রায় দুই শত বছর শোষণের পর ১৯৪৭ সালে তীব্র আন্দোলনের মুখে ব্রিটিশরা এ উপমহাদেশের দখলদারিত্ব ছাড়তে বাধ্য হয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর হিন্দু ও মুসলমান এই দুই ধর্মের সংখ্যাগরিষ্ঠতার উপর ভিত্তি করে ১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্ট যথাক্রমে পাকিস্তান ও ভারত এই দু’টি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম  হয়। মুসলমান অধ্যুষিত পাকিস্তান রাষ্ট্রটি মূলত দু’টি আলাদা ভূ-খন্ডে বিভক্ত ছিল। একটি অংশ হলো পশ্চিম পাকিস্তান এবং অন্যটি আমাদের বাংলাদেশ-তৎকালীন সময়ে যার নাম ছিল পূর্ব-পাকিস্তান। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের দেশ হওয়া সত্ত্বেও শুরু থেকেই গোটা পাকিস্তান রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী। রাষ্ট্রের যাবতীয় কাজকর্ম, অফিস, আদালত সবকিছু পশ্চিম পাকিস্তানের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতো। মোটকথা, পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক কোনো ক্ষেত্রেই স্বাধীনতা দেয়নি। ফলে সঙ্গত কারণেই পূর্ব-পাকিস্তানের বাঙালির মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ থেকে মুক্তিলাভের ইচ্ছা জাগে। ১৯৫২ সালে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে চাইলে বাঙালির মনে স্বাধীনতার গোপন ইচ্ছা তীব্রতর রূপ লাভ করে। মূলত ৫২-র এই ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের সূত্রপাত ঘটেছিল। ৬২ এর শিক্ষা-আন্দোলন, ৬৬ এর ছয় দফা এবং ৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বাধীনতা সংগ্রামের ভিত মজবুত হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে বিপুল ভোটে জয়যুক্ত করে বাঙালিরা তাদের আকাক্সক্ষার রূপদানের স্বপ্ন দেখলেও পাকিস্তানি স্বৈরশাসকের শোষণের কারণে তা অবাস্তবই থেকে যায়। পশ্চিম পাকিস্তানি সরকার নির্বাচিত সরকারের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা না দিয়ে বরং দমন-পীড়নের পথ বেছে নেয়। এরই প্রতিবাদে বাঙালির জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চ ১৯৭১ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বাঙালির আপামর জনসাধারণের উদ্দেশ্যে স্বাধীনতার ডাক দেন। ২৫ মার্চ রাতেই মেজর জেনারেল টিক্কা খানের নির্দেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী রাজধানীর ঘুমন্ত নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের উপর হামলা চালায়। বিশেষত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকা, রাজারবাগ পুলিশ লাইন প্রভৃতি স্থানে পাক সেনারা নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায়। এরপর ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। কৃষক-শ্রমিক, ছাত্র-শিক্ষক, শিল্পী-সাহিত্যিক, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এদেশের সাধারণ মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। অবশেষে ৭১ এর ১৬ ডিসেম্বরে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, যার জন্য আপামর জনসাধারণ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করেছিল। ঐদিন রেসকোর্স ময়দানে পাকসেনারা মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। এবং সূচনা ঘটে বাংলাদেশের মহান বিজয়, জন্ম  হয় একটি স্বাধীন দেশের, যার নাম বাংলাদেশ।

৭১ এর বিজয়োল্লাস: ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দিনটি ছিল বাঙালির বহু ত্যাগ-তিতীক্ষা ও সাধনার ফল। ৭ কোটি বাঙালির মহা উৎসবের দিন ছিল সেটি। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের দুঃসহ স্মৃতি, স্বজন-হারানোর বেদনা সবকিছু ভুলে মনুষ দলে দলে নেমে এসেছিল রাজপথে। সবার হাতে ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা।দুর্বিষহ অতীতকে ভুলে মানুষ স্বপ্ন দেখেছিল সম্ভাবনাময় আগামীর বাংলাদেশের। বাঙালির জাতীয় জীবনে এর থেকে আনন্দের দিন আর নেই।

দেশ স্বাধীন হলেও রাজবাড়ী মুক্ত হয় ১৮ ডিসেম্বর

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলেও রাজবাড়ী মুক্ত হয় ১৮ ডিসেম্বর। কারণ এখানে বিহারী, পাকিস্তানী বাহিনী ও রাজাকারা এক হয়ে যুদ্ধ অংশ নেয়। তাই ১৬ তারিখ দেশ স্বাধীন হলেও রাজবাড়ী বিহারী ও রাজকারদের দখলে থাকায় ও তারা আত্মসমর্পণ না করায় রাজবাড়ী মুক্ত হতে দেরি হয়।

পতাকা উত্তোলন: রাজবাড়ীতে সর্ব প্রথম স্বাধীনতার পতাকা উড়ান আওয়ামী লীগ নেতা নাজিবর রহমান। তার সঙ্গে ছিলেন লতিফ বিশ্বাস , আমজাদ হোসেন, চিত্তরঞ্জন গুহ, ফরিদ আহম্মেদ। মজিব বিল্ডিং এর উপরে ৭ মার্চ মহান স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করা হয়।

রাজবাড়ীতে যুদ্ধ:৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন তাতে তিনি পরিষ্কারভাবে নিজেদের প্রস্তুত করার নির্দেশ দেন। এর ওপর ভিত্তি করে এ দেশের মুক্তিকামী মানুষ নিজেদের প্রস্তুত করতে শুরু করে। ২৫ মার্চ পাকিস্তানী বাহিনীর আক্রমণের পর সারাদেশে স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হয়। এসময় রাজবাড়ী জেলা শহরের রেলওয়ে মাঠে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ শুরু হয়। ১৯৭১ সালের ২১ এপ্রিল ভোর ৫টার দিকে পাকিস্তানী বাহিনীরা গান বোটে করে পদ্মা নদী পার হয়ে গোয়ালন্দ ঘাট দিয়ে রাজবাড়ী শহরে ঢুকে। এই খবর নিমিষে রাজবাড়ী শহর ও গ্রামগঞ্জে ছাড়িয়ে পরে। সাধারণ মানুষ তখন শহর থেকে গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নিতে থাকে। আর বিহারীরা অস্ত্র হাতে সাধারণ মানুষকে হত্যার জন্য শহরে নেমে পরে। অন্যদিকে পাকিস্তানী বাহিনী রাজবাড়ী শহরে ঢোকার সময় রাস্তার আশপাশের বাড়ি-ঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। বাজারে আগুন লাগিয়ে দেয়। তখন রাজবাড়ীতে শুধু আগুন আর আগুন। সে সময় পাকিস্তানী বাহিনী ও বিহারীরা হাজার হাজার নারী-পুরুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে। রাজবাড়ীতে থেকে অনেকে ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। ভারতে ট্রেনিং শেষে ১১ জনের একটি গ্রুপ অস্ত্র নিয়ে বাংলাদেশে আসেন। ওই প্লাটুনের কমান্ডার ছিলেন, বাকাউল আবুল হাসেম। তিনি তার গ্রুপ নিয়ে রাজবাড়ী শহর থেকে ৩/৪ মাইল ভিতরে রশোড়া গ্রামে মুক্তি বাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন করেন। তার পাশে আরও একটি ক্যাম্প ছিল জলিল মিয়ার ক্যাম্প ।

পাঁচুরিয়ায় ছিল ইসলাম কমান্ডারের ক্যাম্প। নদীতে ছিল কামরুল হাছান লালন এর ক্যাম্প। মাটি পাড়ায় ছিল মজিব বাহিনীর সিরাজ আহমেদ এর ক্যাম্প। রাজবাড়ীতে মোটামুটি ৮টি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেন। তারপরও পাংশা ও কুষ্টিয়া থেকে আরও কয়েকটি গ্রুপ রাজবাড়ীতে এসে যুদ্ধে অংশ নেয়। রাজবাড়ীতে অনেক বড় ধরনের যুদ্ধ হয়।

রাজবাড়ীতে মুক্তিযুদ্ধে যারা শহীদ হন: আব্দুল আজিজ খুশি, আ. ছাদেক, পাংশার আ. রফিক, আ. শফিকসহ আরও অনেকে শহীদ হন। যুদ্ধে আহত হন বাকাউল আবুল হাসেম, ইলিয়াছ মিয়া, শহিদউদ্দিন, আ. গফুর ও হাতেম আলীসহ অনেকে।

মুক্তিযোদ্ধা এস এম নওয়াব আলী বলেন, ‘১৯৭১ সালে রাজবাড়ী সরকারি কলেজে পড়া অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেই। তৎকালীন গোয়ালন্দ সাব ডিবিশনের হাইকমান্ড জিল্লুল হাকিম কমান্ডার এবং আব্দুল মালেকের আন্ডারে দেশ মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ করি। শহীদ আব্দুল আজিজ খুশি আমার বন্ধু ছিল। সে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন সময় নভেম্বর মাসে জেলা সদরের আহলাদীপুর ব্রিজের কাছে রাজাকারদের গুলিতে শহীদ হয়। সারা বাংলাদেশ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ শত্রুমুক্ত হলেও রাজবাড়ী তখনো বিহারীদের দখলে ছিল। পরে যশোরের আকবর বাহিনী, পাংশার জিল্লুল হাকিমের বাহিনীসহ অন্য জায়গা থেকে আসা মুক্তিযোদ্ধারা সম্মিলিতভাবে যুদ্ধ করে রাজবাড়ীকে শত্রুমুক্ত করে। নতুনদের প্রতি আমাদের প্রত্যাশা ‘তারা যেন স্বাধীনতার চেতানাকে ধারণ করে, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলে।’

জেলা সদরের খানখানাপুর এলাকার মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল করিম লাল বলেন,‘স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল বাঙালির অস্তিত্বের যুদ্ধ। তখন আমরা কলেজে পড়ি। আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে রাজবাড়ী থেকে হেঁটে ইন্ডিয়ায় কাজী হেদায়েত হোসেন কল্যানি ক্যাম্পে যাই। সেখানে ১৫ দিন থাকার পর উত্তর প্রদেশের দেরাদুনে মুজিব বাহিনীর ট্রেনিং এ যাই। সেখানে আমাদের অস্ত্র নিয়ে ট্রেনিং দেওয়া হয়। ট্রেনিং শেষে আমাদের কলকাতায় নিয়ে আসা হয়। কলকাতার ব্যারাকপুর থেকে আমাদের অস্ত্র দেওয়া হয়। দেশে ঢুকে আমাদের টার্গেট ছিল রাজবাড়ী। রাজবাড়ীতে এসে সবাই এক হই এবং তখন আমাদের লিডার ছিল সিরাজ ভাই। সিরাজ ভাইয়ের নেতৃত্বে আমরা রাজবাড়ীতে যুদ্ধ করি।’

রাজবাড়ী জেলার পাংশা থানার মুক্তিযোদ্ধা নাসিরুল হক সাবু জানান,‘স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে একদিন আমরা ১০/১২ জন যুবক স্থানীয় অরূপ দত্তের বাড়িতে বসে ছিলাম। সে সময় রেডিওতে একটা গান বাজলো ‘মোরা একটি ফুল কে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি-মোরা একটি ফুলের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি’ সেদিনই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা যুদ্ধ করবো। তারপরের দিন আমরা ভারতে উদ্দেশে রওনা দেই। পরে ভারতের বনগ্রাম ট্রেনিং সেন্টারে গিয়ে ভর্তি হই। সেখান থেকে আমাদের চাকরিয়ায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে ২৬ দিন ট্রেনিং নেই। তারপর যশোরের বুনোগাতিতে গিয়ে যুদ্ধ করি। ওই যুদ্ধে ২১ জন রাজাকার ও পাকিস্তানী বাহিনী মারা যায়। পরে ৮ নম্বর সেক্টরে আমরা মেজর মঞ্জুর আন্ডারে যুদ্ধ করি। পরে রাজবাড়ীতে এসে পাকিস্তানী বাহিনী ও বিহারীদের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ হয়। সেখানে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা আহত হয়।

তিনি আরও বলেন,‘একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গর্ববোধ করি। নতুন প্রজন্মের সঠিক ইতিহাস জানা দরকার। দেশের জন্য, জাতির জন্য, নতুন প্রজন্মকে গড়ে তুলতে হবে।

গোয়ালন্দ ঘাট

গোয়ালন্দ ঘাট বাংলাদেশের ঢাকা বিভাগের রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার অন্তর্গত একটি ক্ষুদ্র শহর এবং পৌরসভা। গোয়ালন্দ ঘাট এবং গোয়ালন্দ বাজারে দুটি রেলওয়ে স্টপ আছে। শহরটি ৪.৮২ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে অবস্থিত এবং এর জনসংখ্যা প্রায় ২২,০০০ (২০০১ সালের গণনা অনুযায়ী)।

গোয়ালন্দ ঘাট পৌরসভা

গোয়ালন্দ ঘাট

স্থানাঙ্ক: ২৩°৪৪′ উত্তর ৮৯°৪৫.৭′ পূর্বদেশ বাংলাদেশ বিভাগ ঢাকা বিভাগ জেলা রাজবাড়ী জেলা উপজেলা গোয়ালন্দ উপজেলা আয়তন • মোট১৪৯.০৩ কিমি২(৫৭.৫৪ বর্গমাইল)জনসংখ্যা (১৯৯১) • মোট৯১,৬৭৫ • জনঘনত্ব৬২০/কিমি২ (১৬০০/বর্গমাইল)সময় অঞ্চল বিএসটি (ইউটিসি+৬)

ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে ১৮৭১ সালে পদ্মার দক্ষিণ তীরে, কলকাতা থেকে গোয়ালন্দ পর্যন্ত রেল লাইন চালু করে। গোয়ালন্দ বহু বছর ধরে পূর্ববঙ্গ ও আসাম অংশে যাতায়াতের জন্য পরিবহনের একটি প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ছিল।

এমনকি ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর, ইস্ট বেঙ্গল এক্সপ্রেস ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত এখানে চলাচল করেছিল। এরপর গোয়ালন্দের ঘাট রেল সংযোগ শুধুমাত্র বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ভ্রমণের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।

কাজী মোতাহার হোসেনের তিনি ছিলেন একজন পরিসংখ্যানবিদ, বিজ্ঞানী সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ ছিলেন

কাজী মোতাহার হোসেনের পৈতৃক বাড়ি ফরিদপুর জেলার পাংশা উপজেলার বাগমারা গ্রামে। তবে তার জন্ম কুষ্টিয়া (তখনকার নদীয়া) জেলার কুমারখালি থানার লক্ষ্মীপুর গ্রামে তাঁর মামাবাড়িতে ১৮৯৭ সালের ৩০ জুলাই। তাঁর পিতা কাজী গওহরউদ্দীন আহমদ ছিলেন সেটেলমেন্টের আমিন। মায়ের নাম তাসিরুন্নেসা। শৈশব কাটিয়েছেন ফরিদপুরের বাগমারায়।

১৯২১ সালে এম. এ শ্রেণিতে অধ্যয়নকালীন সময়ে কলকাতার তালতলা নিবাসী মোহাম্মদ ফয়েজুর রহমানের কন্যা সাজেদা খাতুনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। তাঁদের সংসারে চার পুত্র ও সাত কন্যা ছিল। তন্মধ্যে – সনজীদা খাতুন, ফাহমিদা খাতুন, মাহমুদা খাতুন, কাজী আনোয়ার হোসেন, কাজী মাহবুব হোসেন প্রমুখ রয়েছেন।

আমাদের সাথে থাকবেন, আমাদের উদ্দেশ্য রাজবাড়ী জেলার সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য তুলে ধরা।

মৌলভি তমিজউদ্দিন খান একজন বাঙালি রাজনীতিবিদ

মৌলভি তমিজউদ্দিন খান বা এম টি. খান (১৮৮৯ – ১৯ আগস্ট ১৯৬৩) ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের বহুল পরিচিত একজন বাঙালি রাজনীতিবিদ। অবিভক্ত বাংলায় তিনি মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বপালন করেছেন। তিনি ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান গণপরিষদ এবং ১৯৬২ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার ছিলেন। ১৯৪৯ সালে তিনি মূলনীতি কমিটির সদস্য ছিলেন।

জাতীয় পরিষদের স্পিকার কাজের মেয়াদ ১১ জুন ১৯৬২–১৯ আগস্ট ১৯৬৩। ডেপুটি মুহাম্মদ আফজাল চিমা পূর্বসূরী আবদুল ওয়াহাব খান উত্তরসূরী ফজলুল কাদের চৌধুরী কাজের মেয়াদ ১১সেপ্টেম্বর ১৯৪৮–১২ আগস্ট ১৯৫৫ ডেপুটি
এম. এইচ. গাজদার পূর্বসূরী মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ উত্তরসূরী আবদুল ওয়াহাব খান ব্যক্তিগত বিবরণ জন্ম ১৮৮৯ ফরিদপুর (রাজবাড়ি), বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত মৃত্যু ১৯ আগস্ট ১৯৬৩ (৭৩ বছর) ঢাকা, পূর্ব পাকিস্তান, পাকিস্তান রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ (১৯১৫-১৯৬৩) ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (১৯২১–১৯২৬) প্রাক্তন শিক্ষার্থী প্রেসিডেন্সি কলেজ সুরেন্দ্রনাথ কলেজ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় গভর্নর জেনারেল মালিক গোলাম মুহাম্মদ ১৯৫৪ সালে গণপরিষদ বাতিল করার পর তমিজউদ্দিন খান পদক্ষেপ নেন। তিনি আদালতে এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে আইনজীবী মনজুরে আলমের মাধ্যমে ১৯৫৪ সালের ৭ নভেম্বর সকালে মামলা করেন।[৩] মামলায় তিনি জয়ী হলেও আপিলের পর ফেডারেল আদালত গভর্নর জেনারেলের আদেশ বহাল রাখে।