পদ্মা নদীর-জন্মকাল ও ভাঙ্গাগড়ার খেলা

পদ্মা নদীর-জন্মকাল ও ভাঙ্গাগড়ার খেলা

নদ-নদী

পদ্মা, গড়াই, হড়াই, চন্দনা বাহিত পলি, কাঁকর দিয়ে সৃষ্টি রাজবাড়ী জেলা। রাজবাড়ীর প্রধান ঐতিহ্য এককালের রুপালি ইলিশ। আজও রাজবাড়ী অঞ্চলের মানুষের জীবন পরিচালিত হচ্ছে এ সব নদনদীর প্রভাবে। সঙ্গত কারণেই এ সব নদনদীর অতীত স্রোতধারা, তার জন্মকাল জানতে ইচ্ছে করে। জানতে ইচ্ছে করে এর ভাঙ্গাগড়ার খেলা।

 

পদ্মা

          নটিনী তটিনী আমি

          নির্ঝরিণী নিঃসঙ্গ,

          তরঙ্গ ভঙ্গিমায় ভঙ্গিল দেহ

          জন্ম নিলাম প্রমত্ত পদ্মা আমি

৫০০ বৎসর পূর্বে পদ্মা এমন ছিল না। তখন গঙ্গার প্রধান ধারা ভাগীরথী দিয়ে চলত। পলি পড়ে ভাগীরথীর নদীতল উঁচু হয়ে উঠলে ক্রমশঃ পূর্বে জলঙ্গী, মাথাভাঙ্গা, কুমার, গড়াই, হড়াই, চন্দনা দিয়ে গঙ্গার প্রধান প্রবাহ চলতে থাকে। গঙ্গা পরে তার পূর্বমুখী ধারা খুজে পায়। এ ক্ষেত্রে গঙ্গার প্রবাহ খুজতে গিয়ে মূলত গঙ্গার প্রাচীনত্বের ব্যাখ্যা প্রয়োজন যা অতি জটিল অধ্যয়ন। মধ্যপুরাণ ও মহাভারতে গঙ্গার পূর্বগামী ৩টি ধারা হলদিনী, পাবনী ও নলিনীর, উল্লেখ রয়েছে। অনেকের ধারণা পাবনী থেকে পন্মার নাম এসেছে যা পাবনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ২য় শতকে টলেমীর নকশা, সপ্তম শতকে হিউয়েন সাং এর বর্ণনা, ষোড়শ শতকে ডি ব্যরসের নকশা, বিখ্যাত সেচ ইঞ্জিনিয়ার উলিয়াম উইলকক্স, নীহাররঞ্জন ও কপিল ভট্টাচার্যের নদীর গতিপথ বর্ণনাসহ আনুষঙ্গিত উপাদানের সাহায্যে পদ্মার ঐতিহাসিক পর্যালোচনা করা যাবে, যা থেকে অতীত ও বর্তমান পদ্মা সম্বন্ধে একটি ধারণা পাওয়া সম্ভব। রাজমহলের সোজা উত্তর-পশ্চিম তেলিয়াগড় ও সিক্রিগলির গিরিবর্ত্ম গঙ্গার বাংলায় প্রবেশ পথ। প্রাচীন গৌড়ের প্রায় ২৫ মাইল দক্ষিণে গঙ্গার ধারা ভাগীরথী ও পদ্মা এই দুই ধারায় প্রবাহিত। ড. নীহাররঞ্জন ভাগীরথীকে মূলধারা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ঐতিহাসিক রাধাকমল মুখোপাধ্যায় মনে করেন ষোড়শ শতক থেকে পদ্মার পূর্বযাত্রা বা সূত্রপাত। রেনেল ও ফ্যানডেন ব্রকের নকশায় দেখা যায় ষোড়শ শতকে পদ্মা বেগবতী নদী। সিহাবুদ্দিন তালিশ (১৬৬৬), মির্যা নাথনের (১৬৬৪) বিবরণীতে গঙ্গা ব্রক্ষপুত্রের সঙ্গমে ইছামতির উল্লেখ করেছে।

 

ইছামতির তীরে যাত্রাপুর এবং তিন মাইল উত্তর পশ্চিমে ডাকচড়া (মানিকগঞ্জ) এবং ঢাকার দক্ষিণে গঙ্গা ব্রক্ষপুত্রের সম্মিলন প্রবাহের সমুদ্র যাত্রা। ড. নীহাররঞ্জন, ‘তখন গঙ্গার এ প্রবাহে পদ্মার নামকরণ দেখছি না। আইন-ই-আকবরী গ্রন্থে আবুল ফজল লিখেছেন (১৫৯৬-৯৭),‌ ‘কাজীর হাটের কাছে পদ্মা দ্বিধা বিভক্ত হয়ে একটি শাখা পূর্বগামিনী পদ্মাবতী নাম নিয়ে চট্টগ্রামের নিকট সুমদ্রে মিশেছে। মির্যা নাথানের বর্ণনায় করতোয়া বালিয়ার কাছে একটি বড় নদীতে পড়েছে। এই বড় নদীটির নাম পদ্মাবতী। ত্রিপুরা রাজ বিজয় মাণিক্য ১৫৫৯ ত্রিপুরা হতে ঢাকায় এসে ইছামতি বেয়ে যাত্রাপুর এসে পদ্মাবতীতে তীর্থস্নান করেছিলেন। এ হিসেবে তখনকার পদ্মা বর্তমান অবস্থান থেকে ১৫/২০ মাইল  উত্তরে প্রবাহিত হত এবং তা রেনেলের নকশা এবং টেলরের বর্ণনার সাথে মিলে যায়।

 

ষোড়শ শতকে পদ্মা ও ইছামতি প্রসিদ্ধ নদী। ষোড়শ শতকের ব্যারস এবং সপ্তদশ শদকের ব্রকের নকশায়ও তা পাওয়া যায়। চতুর্দশ শতকে ইবনে বতুতা (১৩৪৫-৪৬) চীন দেশে যাওয়ার পথ চট্টগ্রাম নেমেছিলেন। তিনি চট্টগ্রামের হিন্দু তীর্থস্থান গঙ্গা নদী ও যামুনা নদীর সঙ্গমস্থল বলেছেন। তাতে বোঝা যায় চর্তুদশ শতকে গঙ্গার মধ্যেবর্তী প্রবাহ পদ্মা চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তটভূমি প্রসারের সাথে সাথে চট্টগ্রাম এখন অনেক পূর্ব দক্ষিণে সরে গিয়েছে। ঢাকাও এখন পদ্মার উপর অবিস্থিত নয়। পদ্মা এখন অনেক দক্ষিণে নেমে এসেছে। ঢাকা এখন পুরাতন গঙ্গা পদ্মার খাত বুড়িগঙ্গার উপর অবস্থিত আর পদ্মা ব্রক্ষপুত্রের (যমুনা) সঙ্গম গোয়ালন্দের অদূরে।

পদ্মা তার খাত বারবার পরিবর্তন করেছে তার যথেষ্ট প্রমাণাদি এ পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। দশম শতকের শেষে এবং একাদশ শতকের গোড়ায় চন্দ্রবংশীয় রাজারা বিক্রমপুর, হরিকেল অর্থাৎ পূর্ব ও দক্ষিণ বঙ্গের অনেকটা জুড়ে রাজত্ব করতেন। এই বংশের মহারাজধিরাজ শ্রীচন্দ্র তার ইদিলপুর পট্টলীদ্বারা স্মতট পদ্মাবতী অঞ্চলের অন্তর্গত কুমার তালক মন্ডলের জনৈক ব্রাক্ষণকে একখন্ড ভূমি দান করেছিলেন। পট্টলীও সমসাময়িক সাহিত্য গ্রন্থেও পদ্মা নদীর উল্লেখ আছে। ‘বাজলার পাঁড়ী, পঁ-ঊ-আ খালে বাঁহিউ’ অর্থাৎ পদ্মাখালে বজরা নৌকা পাড়ি দিতেছে। এতে অনুমান করা যাচ্ছে নবম দশম শতকেও পদ্মার অস্তিত্ব ছিল তবে তা ছিল ক্ষীণতোয়া অপ্রশস্ত খাল বিশেষ। ব্রক্ষপুত্র বর্তমান যমুনার খাতে প্রবাহিত হতে শুরু করার আগে পদ্মা ধলেশ্বরী বুড়িগঙ্গার খাতে প্রবাহিত হত। ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে তিস্তা অকস্মাৎ তার পূর্ব যাত্রা পরিত্যাগ করে এবং তার বিপুল বন্যার বারিরাশি ব্রক্ষপুত্রের বন্যার পানির সঙ্গে মিশে যমুনার খাতে বইতে শুরু করে দেয় গোয়ালন্দের পাড়ে।

 

প্রাচীন রাজধানী বিক্রমপুরের মন্দির প্রাসাদ ধ্বংস করে পদ্মা কীর্তিনাশা নাম ধারণ করে। জেমস টেলরের বর্ণনায় কীর্তিনাশা ঢাকার শ্রীপুরের মফলৎগঞ্জ ও রাজনগরের কিছুটা উত্তর দিয়ে প্রবাহিত। এটাই গঙ্গার প্রধান শাখা যা প্রশস্ততা ছিল ৩/৪ মাইল। রেনেলের মানচিত্রে টেলরের বর্ণনায় কীর্তিনাশা কার্তিকপুরের উত্তরে মেঘনার সাথে মিলিত হয়েছে। গঙ্গার দ্বিতীয় শাখা টেলরের বর্ণনায় নয়াভাঙ্গনী নদী (আড়িয়াল খাঁ) ঢাকা জেলার কোল বেয়ে বকেরগঞ্জের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। মূলতঃ ৩০০/৪০০ বৎসর পূর্বে পদ্মার ধারা বর্তমান ধারা থেকে আরো উত্তরে বোয়ালিয়া (রাজশাহী শহর) পাবনার চলনবিল, ইছামতি (মানিকগঞ্জ) ধলেশ্বরী একাকারে ঢাকার দক্ষিণ দিয়ে শ্রীপুরের কীর্তিনাশা হয়ে সোজা দক্ষিণে প্রবাহিত হত। ২০০ থেকে ২৫০ বছরের মধ্যে পদ্মা অনেক দক্ষিণে সরে এসে বর্তমান খাতে রাজবাড়ী জেলার কোল ঘেঁষে জেলার উত্তর সীমানা দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। আবার কখনো উত্তরে ৫/৬ মাইল সরে গেছে। বর্তমানে রাজবাড়ী জেলার উত্তরে হাবাশপুর, ধাওয়াপাড়া ঘাট সোজা এসে মিজানপুর থেকে বাঁক নিয়ে ৬/৭ মাইল উত্তরে প্রবাহিত হয়ে পূর্বদিকে গোয়ালন্দের ৩ কিমি উত্তরে দৌলতদিয়ার অদূরে যমুনার ধারা বুকে নিয়ে পূর্ব মুখে প্রবাহিত হচ্ছে। পদ্মার তিনশত বছরের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় বর্তমান গোয়ালন্দ, রাজবাড়ী ও পাংশা থানার উত্তরাংশ পদ্মার নব উত্থিত চর দ্বারা সৃষ্টি। এসব দ্বীপ গোয়ালন্দের পঞ্চাশ হাজারী সমন্বিত চর বলে খ্যাত।

 

 

রাজবাড়ি জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য

প্রফেসর মতিয়র রহমান

(পৃষ্ঠা-৩০-৩২)

রাজবাড়ীর নামকরণ ইতিহাস

রাজবাড়ী যে কোন রাজার বাড়ীর নামানুসারে নামকরণ করা হয়েছে এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। তবে কখন থেকে ও কোন রাজার নামানুসারে রাজবাড়ী নামটি এসেছে তার সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। বাংলার রেল ভ্রমণ পুস্তকের (এল.এন. মিশ্র প্রকাশিত ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়ে ক্যালকাটা ১৯৩৫) একশ নয় পৃষ্ঠায় রাজবাড়ী সম্বন্ধে যে তথ্য পাওয়া যায় তাতে দেখা যায় যে, ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে নবাব শায়েস্তা খান ঢাকায় সুবাদার নিযুক্ত হয়ে আসেন। এ সময় এ অঞ্চলে পর্তুগীজ জলদস্যুদের দমনের জন্যে তিনি সংগ্রাম শাহকে নাওয়ারা প্রধান করে পাঠান। তিনি বানিবহতে স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন এবং লালগোলা নামক স্থানে দুর্গ নির্মাণ করেন। এ লালগোলা দুর্গই রাজবাড়ী শহরের কয়েক কিলোমিটার উত্তরে বর্তমানে লালগোলা গ্রাম নামে পরিচিত। সংগ্রাম শাহ্ ও তাঁর পরিবার পরবর্তীকালে বানিবহের নাওয়ারা চৌধুরী হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

এল.এন. মিশ্র উক্ত পুস্তকে উল্লেখ করেন যে, রাজা সংগ্রাম শাহের রাজদরবার বা রাজকাচারী ও প্রধান নিয়ন্ত্রণকারী অফিস বর্তমান রাজবাড়ী, এলাকাকে কাগজে কলমে রাজবাড়ী লিখতেন (লোকমুখে প্রচলিত)।এ পুস্তকের শেষের পাতায় রেলওয়ে স্টেশন হিসেবে রাজবাড়ী নামটি লিখিত পাওয়া যায়। উল্লেখ্য যে, রাজবাড়ী রেল স্টেশনটি ১৮৯০ সালে স্থাপিত হয়। ঐতিহাসিক আনন্দনাথ রায় ফরিদপুরের ইতিহাস পুস্তকে বানিবহের বর্ণনায় লিখেছেন-নাওয়ারা চৌধুরীগণ পাঁচথুপি থেকে প্রায় ৩০০ বছর পূর্বে বানিবহে এসে বসবাস শুরু করেন। বানিবহ তখন ছিল জনাকীর্ণ স্থান। বিদ্যাবাগিশ পাড়া, আচার্য পাড়া, ভট্টাচার্য পাড়া, শেনহাটিপাড়া, বসুপাড়া, বেনেপাড়া, নুনেপাড়া নিয়ে ছিল বানিবহ এলাকা।

নাওয়ারা চৌধুরীগণের বাড়ি স্বদেশীগণের নিকট রাজবাড়ী নামে অভিহিত ছিল। মতান্তরে রাজা সূর্য কুমারের নামানুসারে রাজবাড়ীর নামকরণ হয়। রাজা সূর্য কুমারের পিতামহ প্রভুরাম নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার রাজকর্মচারী থাকাকালীন কোন কারণে ইংরেজদের বিরাগভাজন হলে পলাশীর যুদ্ধের পর লক্ষীকোলে এসে আত্মগোপন করেন। পরে তাঁর পুত্র দ্বিগেন্দ্র প্রসাদ এ অঞ্চলে জমিদারী গড়ে তোলেন। তাঁরই পুত্র রাজা সুর্য কুমার ১৮৮৫ সালে জনহিতকর কাজের জন্য রাজা উপাধি প্রাপ্ত হন। রাজবাড়ী রেল স্টেশন এর নামকরণ করা হয় ১৮৯০ সালে। বিভিন্ন তথ্য হতে জানা যায় যে, রাজবাড়ী রেল স্টেশন এর নামকরণ রাজা সূর্য কুমারের নামানুসারে করার দাবি তোলা হলে বানিবহের জমিদারগণ প্রবল আপত্তি তোলেন।

উল্লেখ্য, বর্তমানে যে স্থানটিতে রাজবাড়ী রেল স্টেশন অবস্থিত উক্ত জমির মালিকানা ছিল বানিবহের জমিদারগণের। তাঁদের প্রতিবাদের কারণেই স্টেশনের নাম রাজবাড়ীই থেকে যায়। এ সকল বিশ্লেষণ থেকে ধারণা করা হয় যে, রাজবাড়ী নামটি বহু পূর্ব থেকেই প্রচলিত ছিল। এলাকার নাওয়ারা প্রধান, জমিদার, প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তিগণ রাজা বলে অভিহিত হতেন। তবে রাজা সূর্য কুমার ও তাঁর পূর্ব পুরুষগণের লক্ষীকোলের বাড়ীটি লোকমুখে রাজার বাড়ি বলে সমধিক পরিচিত ছিল।

এই ভবনটিতে মিশে আছে রাজবাড়ী বাসীর শত বছরের ইতিহাস ঐতিহ্য । কিন্তু অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে থাকা এই ভবনটি আজ ধ্বংসের মুখে । পেজের পক্ষ থেকে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসনের ভবনটির ধ্বংসাবশেষ রক্ষার বিনীত অনুরোধ করছি । এছাড়া রাজবাড়ীর পাচুরিয়ায় ততকালীন জমিদারদের বাড়ি রয়েছে ।

এভাবেই আজকের রাজবাড়ী।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম-রাজবাড়ী মাটি ও মানুষের সাথে কবির ঘনিষ্ঠতা।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর স্পর্স পেয়েছে রাজবাড়ীর মাটি ও মানুষ। গোয়ালন্দ তৎকালীন বাংলার প্রবেশ পথ হওয়ার তিনি রেলপথে ঢাকা, কুমিল্লা যাতায়াত করেছেন ট্রেন ও স্টিমারযোগে গোয়ালন্দ দিয়ে। পূর্ববাংলার প্রকৃতি ও মানুষের সাথে ছিল তাঁর নিবিড় বন্ধন। ১৯৪০ সালে গোয়ালন্দ ঘাটে বসে ‘আমি পূরব দেশের পুরনারী’ সঙ্গীত রচনা করেন। ১৯২৫ সালে মহাত্মাগান্ধী ফরিদপুরে কংগ্রেসের প্রাদিশিক সম্মেলনে যোগদনকালে গান্ধীজীর সাথে কাজী নজরুল ইসলামের পরিচয় ঘটে। নজরুলের কণ্ঠে তার চরকার গান শুনে গান্ধীজী মুগ্ধ হন। সে সূত্রে নজরুল ইসলাম কংগ্রেসে যোগদান করেন।

১৯২৬ সালে নজরুল তমিজ উদ্দিন খান (খানখানাপুর, রাজবাড়ী) এর সাথে বঙ্গীয় বিধান সভায় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করে যান। নির্বাচনে কবির প্রতিদ্বন্দিতা সম্পর্কে ১২ অক্টোবর ১৯২৬ গণবাণীতে লেখা হয় ‘কালের বরেণ্য কবি কাজী নজরুল ইসলাম ঢাকা বিভাগের মুসলমান কেন্দ্র হতে ভারতীয় ব্যাবস্থাপক সভার সদস্য পদপ্রাথী হইয়াছেন’ (নজরুল রচনাবলী ২য় খণ্ড কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড-২৫ ডিসেম্বর ১৯৬৭ পৃষ্ঠা-৫৪৮)। উল্লেখ্য তখন ফরিদপুর, রাজবাড়ী ঢাকা নির্বাচন এলাকাভুক্ত ছিল। তমিজ উদ্দিন খান তাঁর আত্মজীবনীতে ১৯২৬ সালের নির্বচনে নজরুলের বিষয়ে কিছু বলেননি। এ নির্বাচন বিষয়ে নানা মতভেদ রয়েছে। তবে আবুল আহসান চৌধুরী নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর অপ্রকাশিত পত্রাবলীর গ্রন্থের ১৬ পৃষ্ঠায় লিখেছেন-‘হেমন্ত কুমার সরকার ও কাজী নজরুল ইসলামের উদ্যোগে ১৯২৬ সালে Bengal peasants and worker’s party প্রতিষ্ঠিত হয়। উল্লেখিত নানা তথ্যে প্রতীয়মান হয় ১৯২৬ এ নবগঠিত Bengal peasants and worker’s party থেকে প্রতিনিধিত্ব করেন বা নির্দলীয় প্রাথী হন। এ ক্ষেত্রে তমিজ উদ্দিন খান তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দী মোহন মিয়ার কথাই উল্লেখ করেছেন। গুরুত্বহীন peasants পার্টি বা উদীয়মান একজন কবিকে দুর্বল প্রার্থী ভেবে লেখার প্রয়োজন মনে করেননি। গোলাম মুরশীদ তার হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি গ্রন্থের ১৬৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন-

১৯২৬ সালের শেষ দিকে যখন নির্বাচন অনুষ্ঠান হয়, ৩৯টি মুসলিম আসনের মধ্যে ৩৮টি আসনে জয়ী হন আব্দুর রহিমের দলের প্রার্থীরা। কাজী নজরুল ইসলাম তখন অত্যন্ত জনপ্রীয় কবি। কৃষক শ্রমিকদের জন্য উচ্চকণ্ঠে বিদ্রোহের বাণীও শুনেছিলেন তিনি। তা সত্ত্বেও মুসলামান প্রধান ফরিদপুর থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও তিনি জিততে পারেননি। কারণ আব্দুর রহিমের সাম্প্রদায়িকতার শর্ত তিনি পূরণ করতে পারেননি।

এ সময় রাজবাড়ী মানুষের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। আরএসকে স্কুলের গণিত শাস্ত্রের প্রাক্তন শিক্ষক দেব ভট্টাচার্য (ডা. মাখনলাল মহাশয়ের বাড়িতে দীর্ঘদিন ভাড়ায় বসবাস করতেন) এর নিকট থেকে জানা যায় নজরুল সেসময় তাদের স্থায়ী বসতি পাংশার রুপিয়াট জমিদার বাড়ির সাথে গবীর আত্নীয়তা গেড়ে তোলেন। দেবুর পিতা অতুল দত্ত তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। নজরুল এ পথে আসলে রুপিয়াট জমিদার বাড়ি না হয়ে যেতেন না। দেবুর পিতা ও মাতার সাথে পত্রালাপ হত। কিন্তু পত্র তার নিকট ছিল কিন্তু যুদ্ধের সময় তা হারিয়ে যায়। দেবুর মায়ের নামে নজরুল একটি কাব্যগ্রন্থ উৎসর্গ করেন। রাজবাড়ীর নজরুল বিশেষজ্ঞ গোলাপ ভাইয়ের নিকট থেকে জানা যায় নজরুল ১৯৩০ এর দশকের কোনো এক সময় প্রাক্তন চেয়ারম্যান হবিবুর রহমান সাহেবের বাড়িতে আসেন। হাসিবুর রহমান তখন যুবক। তিনি নজরুলের সাথে একই খাটে শয়ন করেছিলেন। সাহিত্যিক এয়াকুব আলী চৌধুরীর (পাংশা) সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের গভীর সখ্যতা ছিল। ১৯১৯ সালে প্রথম মহাযুদ্ধের পর কবি ফিরে এসে ‘বঙ্গীয় সাহিত্য সমিতিতে’ যোগ দেন। কর্মসূত্রে সেখানেই এয়াকুব আলী চৌধুরী নজরুলকে আর্শিবাদ স্বরুপ বলেছিলেন-‘আপনাকে বাংলার মুসলমান বারীন ঘোষ হতে হবে। (সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতায় রাজবাড়ী, অধ্যাপক আবুল হোসেন মল্লিক, পৃষ্ঠা-৪৬)। কবি ১৯৩৩ সালে কলিকাত থেকে পাংশা সফরে আসেন। তিনি এখানে এক দিন এক রাত যাপন করেন। পাংশায় আনার দায়িত্ব দেওয়া হয় এয়াকুব আলী চৌধুরীকে। বিপুল আয়োজনে পাংশায় তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সংবর্ধনা কমিটিতে থাকেন এয়াকুব আলী চৌধুরী, তাহের উদ্দিন আহমেদ (সহসম্পাদক, দি মুসলমান পত্রিকা, কলিকাতা), সৈয়দ মাহমুদ (ডিএসআর), সুবোধচন্দ্র সাহা (কংগ্রেস নেতা, পাংশা), শ্রী অতুলচন্দ্র দত্ত (সিনেমা বিষয়ক পত্রিকা ‘জলসা’র সম্পাদক), খোন্দকার নজির উদ্দিন আহমদ (সম্পাদক খাতক), শ্যামলাল কুণ্ডু প্রমুখ। তাঁর থাকার ব্যবস্থা হয় শ্যামলাল কুণ্ডুর দ্বিতল ভবনে। বৃটিশ রাজরোষে পতিত হওয়া কারণে তাঁকে খোলা মাঠে সংবর্ধনা দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় মুচিরাম সাহার গুদাম ঘরে তাঁকে সংবর্ধনার ব্যবস্থা করা হয়। এ অনুষ্ঠানে কবি স্বকণ্ঠে ‘বিদ্রোহী’ ও ‘নারী’ কবিতা দুটি আবৃত্তি করেন। ‘টুনির মা’ নামে এক মহিলা নিজ হাতে সেলাই করা একখানি নকশী কাঁথা কবিকে উপহার দেন। পাংশা আড়ং বাজার রেলঘাটে তাঁর আগমন উপলক্ষ্যে যে মেলার আয়োজন করা হয় তা আজও বৈশাখা মেলা-(১ এপ্রিল) হিসেবে স্মৃতি বহন করছে। সেদিন এক ময়রা কবিকে কেজি চমচম উপহার হিসেবে দেন। প্রচুর লোক সমাগমে কবি সবাইকে শুভেচ্ছা বাণী দেন।

পাংশার কবি বন্ধু দি মুসলমান পত্রিকার সম্পাদক তাহের উদ্দিন তাঁর বিবাহ বৌভাতে আমন্ত্রণ করেন। দাওয়াত রক্ষায় অপারগ হলে কবি তাঁকে আশীর্বাদ স্বরুপ লেখেন।

রুপার সওদা সার্থক হল
রুপার শাহজাদী এসে
তব বাণিজ্য তরণী ভিড়িল
স্বপন পরীর দেশে।
অর্থের নীতি যাহার যাদুতে
হইল অর্থহীন
বেঁচে থাক সেই ফুলের ডেরারায়
ফুল হয়ে নিশিদিন।

কাজী নজরুল ইসলামের গভীর সখ্যতা ছিল পাংশার বাগমারা গ্রামের জাতীয় অধ্যাপক প্রখ্যাত সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, জাতীয় চেতনার দিশারী ড. কাজী মোতাহার হোসেনের সঙ্গে। কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন নজরুল অন্তরঙ্গ বন্ধু। নজরুল বন্ধুত্বে গভীর আলিঙ্গনে মোতাহার হোসেনকে ডাকতেন, আমার মতিহার । তাদের বন্ধুত্ব আজীবন অটুট ছিল। মোতাহার হোসেনের লেখা ‘নজরুল কাব্য পরিচিতি’ তাঁর অমর প্রতিদান।

মোতাহার হোসেনের কন্যা রবীন্দ্র গবেষক, শিল্পী সনজিদা খাতুন রচিত ‘মোতাহার হোসেন’ গ্রন্থ থেকে জানা যায় কাজী নজরুল ইসলাম ঢাকা এলে তাদের বাড়িতেই থাকতেন। নজরুল যেমন ছিলেন জাতীয় চেতনায় বিদ্রোহী সত্ত্বার অধিকারী তেমনি দৈহিক শাক্তি প্রয়োগে বিদ্রপ নিরসনের নায়ক। একদিন ঢাকায় দুইদল যুবক পরস্পর ঝগড়ার পর্যায়ে হাতাহাতিতে লিপ্ত হলে নজরুল তা নিষেধ করেন। কিন্তু নজরুলের কথা তারা শুনছিল না। এক পর্যায়ে নজরুল একটি লাঠি নিয়ে ভোঁ ভোঁ করে ঘোরাতে থাকেন এবং সকলকে তাড়িয়ে দেন। এই লাঠি নিয়েই মোতাহার হোসেনের বাসায় যান। এই লাঠি দীর্ঘদিন তাদের বাসায় ছিল আর লাঠির নামকরণ হয়েছিল, নজরুল মারা লাঠি। বন্ধুত্বের সূত্রে নজরুল কয়েকবার মোতাহার হোসেনের গ্রামের বাড়ি বাগমারা এসেছেন বলে জানা যায়। কাজী নজরুল ইসলাম সহসঙ্গী মোতাহার হোসেনের উদ্দেশ্যে ‘দাড়ি বিলাপ’ কবিতাটি রচনা করেন। দাড়ি বিলাপ কবিতার পাদটিকায় কোনো প্রফেসর বন্ধুর দাড়ি কর্তন উপলক্ষে লেখা আছে।

হে আমার দাড়ি
একাদশ বর্ষ পরে গেলে আজি ছাড়ি
আমারে কাঙ্গাল করে শূন্য করি বুক
শূন্য এ চোয়াল আজি, শূন্য এ চিবক।

কাজী মোতাহার হোসেন ছাত্রজীবন থেকেই দাড়ি কামাতেন না। দাড়ি ওঠার ১১ বছর পর তিনি একবার দাড়ি কর্তন করলে কবি এ কবিতাটি রচনা করেন। এ প্রসঙ্গে পথেয় ১৩৩৫ সালে ঢাকা সাপ্তহিক দরদীতে এবং দাড়ি বিলাপ মাসিক ‘শান্তি’তে প্রকাশিত হয়। দাড়ি বিলাপ কবিতার পাদটিকায় উল্লেখিত কোনো প্রফেসর বন্ধু হলেন অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন (নজরুল রচনাবলী, প্রাগুপ্ত, পৃ-৬৫৫)। ঢাকার বিদূষী কন্যা ফজিলাতুননেসার সঙ্গে নজরুল প্রণয়ে প্রয়াসী হন। এর মাধ্যম ছিলেন কাজী মোতাহার হেসেন। শিল্পী কাজী আবুল কাশেম (রাজবাড়ী) নজরুলের লেখা ‘দাদা মেখে দেয় দাড়িতে খেজাব’ কার্টুন এঁকে নজরুলকে দেখান। নজরুল তা দেখে খুব হেসেছিলেন।

সাহিত্যিক কাজী আব্দুল ওদুদ (বাগমারা নিবাসী) কাজী নজরুল ইসলামের অত্যন্ত গুণাগ্রাহী ছিলেন। এদিকে কাজী মোতাহার ও আব্দুল ওদুদ একই গ্রামবাসী ও হরিহর বন্ধু। কাজী নজরুল আব্দুল ওদুদের সাথে ঘনিষ্ঠতা সূতা ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনে উভয়কে পৃষ্ঠাপোষকতা দান করেন। কাজী আব্দুল ওদুদ ‘নজরুল প্রতিভা’ (১৯৪৯) রচনা করেন। চিল্লশের দশকের প্রথমে আব্দুল ওদুদ কলিকাতাবাসী হন। এ সময় কাজী নজরুল ও তার পরিবারের সাথে অতি ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েন। ১৯৫২ সাল। নজরুল পরিবারে তখন দুরাবস্থা। নানাভাবে নজরুলের চিকিৎসা করান হলেও উন্নতি নেই। আর্থিক অনটন লেগেই আছে। আব্দুল ওদুদ পরিবারে আর্থিক সাহায্য সহযোগিতা দিয়ে আসছিলেন। কবির উন্নত ও শেষ চিকিৎসার জন্য কবিকি ইউরোপ পাঠান দারকার। অনেক টাকার প্রয়োজন। কাজী আব্দুল ওদুদের উদ্যোগে কলিকাতা ‘নজরুল সাহায্য সমিতি’ গঠন করা হল। তাঁর উদ্যোগেই নজরুলকে ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়। তারপর ভিয়েনা। নজরুল আর সুস্থ হয়ে ওঠেননি। এভাবেই রাজবাড়ী মাটি ও মানুষের সাথে কবির ঘনিষ্ঠতা।

রাজবাড়ি জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য
প্রফেসর মতিয়র রহমান
(পৃষ্ঠা-২৯২)

মোরাদ খান

 

সুলতানি শাসনামল থেকে দক্ষিণ বংলায় ফতেহাবাদ, খলিফাতাবাদ ও মাহমুদাবাদ রাজ্যের উদ্ভব ঘটে। এসব রাজ্যের রাজা দিল্লী সম্রাটের নামমাত্র বশ্যতা স্বীকার করে স্বাধীনভাবে রাজ্যশাসন করতেন। ফতেহাবাদকে এখন ফরিদপুর বলে। সম্ভবত বঙ্গেশ্বর ফতেশাহের রাজত্বকালে ১৪৮২-৮৭ তে ফতেহবাদ নামের উৎপত্তি হয়। ফতেহ শাহ হতে হোসেন শাহ, নশরত শাহ প্রভৃতি বহু নৃপতির নামাষ্কিত মুদ্রা পাওয়া যায়। (Catalogue of coins in Indian Museum Voll-11: Nos 153-54 168, 169-70 and 202- Ain-e-Akbari Bloch Ann p-374)

ফতেহাবাদ, খলিফাবাদ মাহমুদাবাদ পরবর্তীতে চাকলা ও সরকারে বিভক্ত হয়। বর্তমান ফরিদপুর ,রাজবাড়ী ও গোপালগঞ্জ ফতেহাবাদ,খলিফাতাবাদ, মাহমুদাবাদ জেলার অংশবিশেষ এ সকল সরকারের কিছু অংশ চাকলা ভূষণা ও চাকলা জাহাঙ্গীর নগরের অঙ্গীভূত থাকে। সে সময় দাউদ নামে এক পাঠান রাজা ছিলেন ভূষণাদিপতি। সম্ভবত তিনি ১৫৬৫ সালে ভূষণার অধিপতি হন এবং তার উত্তরঞ্চলীয় রাজধানী ছিল বর্তমান রাজবাড়ীতে। (রিজা-উস-সালাতিন পৃষ্ঠা-৪২)। কেহ কেহ অনুমান করেন রাজবাড়ীতে কোন বিদ্রোহী রাজার রাজধানী ছিল। এর অনেকটাই সত্যতা মেলে যখন দেখি আকবর সেনাপতি মোরাদ খান দাউদকে পরাজিত করে রাজবাড়ীর অনতিদূরে খানখানাপুরে স্থায়ী বসতি গড়ে তোলেন। দাউদ খান বিদ্রোহী হলে ১৫৭৪ সালে সম্রাট আকবর, বিদ্রোহ দমনে সেনাপতি মুনেম খাকে পাঠান। এ প্রসঙ্গে সতিশ চন্দ্র মিত্রের যশোর-খুলনার ইতিহাসে ২২ পৃষ্ঠায়। ‘সেনাপতি মুনেম খাঁ নামক একজন সেনানী তাহার সহচর ছিলেন। তিনি ফতেহাবাদ সরকারে বিদ্রোহ দমন করেন। ভূষণাই এই সরকারের জমিদারী ছিল। দাউদের সহিত মুনেন খাঁর সন্ধি হলে মোরাদ জলেশ্বরের শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। মনেমের মৃত্যুর পর দাউদ পুনরায় বিদ্রোহী হইয়া ভদ্রকের শাসনকর্তা নজর বাহাদুরকে হত্যা করেন। তখন মোরাদ পুনরায় ফতেহাবাদে প্রেরিত হন এবং তথার মৃত্যু হয়।’

আনন্দনাথ রায়ের ফরিদপুরের ইতিহাসের ৭১ পৃষ্ঠায়, ‘হিজরী ৯৮৮ সালে সম্রাট আকবরের বঙ্গাধিকারের সময়কালে মোরাদ খাঁ পাঠান সবেদার দাউদের অধীন থাকিয়া ফতেহবাদ শসন করিতেন। পর মেদিনীপুর ও জলেশ্বরের মধ্যবর্তী মোগলমারী (তুকারো) নামক স্থানে মোগল পাঠানে যে যুদ্ধ হয় পাঠানেরা পরাস্থ হইয়া প্রস্থান করিলে পর হিজলীর (উড়িষ্যা) সামার খাঁ, ফতেহবাদের মোরাদ খাঁ এবং সাতগাঁর মিরজানবাদ মোগল রাজ্যের বশ্যতা স্বীকার করে।’ প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ তমিজউদ্দিন খান এর ‘The Test of time- my life and days’ গ্রন্থের ২ পৃষ্ঠায়-

The gteat Moghul Akbar had dispatched a big army in 1574 for the subjugation of A separate force was dispatched from the army under the command of South-East Bengal. According to the Akbarnama (Akbar memories) Murad Khan couquered Fatahabad which has now become Faridupur as well as Bakergong. He did not return to Delhi of completing his task.But settledalong with a number of his men in the Fatehabad. Accding to some historians, he took up residence in at village he honourd by conferring on it in the name of Khnkhanapur is largest village of the Goalanda Sub-division of the districts of Faridpur.

আসকার ইবনে শাইখ রচিত বাংলার শাসনকর্তা গ্রন্থের ৩৩ পৃষ্ঠায়- ‘১৫৭৪ সালে সম্রাট আকবর মোরাদ খাঁকে বাংলা অধিকারে পূর্ববঙ্গে পাঠান। আকবরনামায় দেখা যায় তিনি ফতেহাবাদ (ফরিদপুর) বা সরকার বাকলা বা বাকেরগঞ্জকে আকবরের রজ্যভুক্ত করেন। সুবেদারগণ ফরিদপুর শহরের ১৩ মাইল উত্তর পশ্চিমে বর্তমান রাজবাড়ী সদর থানার অন্তর্গত খানখানাপুর গ্রামে বসবাস করতেন। মত্র ৬ বছর রাজত্বের পর তিনি পরলোকগমন করেন।

সতীশ চন্দ্র মিত্র, আনন্দনাথ, তিমজদ্দিন খান, আসকার ইবনে শইফ এর উদ্ধৃতি থেকে সহজেই প্রতীয়মান হয় মোরাদ খাঁ ফতেহাবাদ শাসন করতেন। আকবর নামায় মুকুন্দরাম জমিদার অংশে দেখা যায় ‘১৫৭৪ সালে দক্ষিণবঙ্গ জয় করার জন্য সেনাপতি মোরাদ খানকে পাঠান হয়। সেনাপতি মোরাদ খান ফতেহবাদ জয় করেন এবং বাকলা (বাখরগঞ্জ) তার অধিকারভুক্ত হয়। ফরিদপুরের পশ্চিমে খানখানাপুরে তাঁর বাসস্থন ছিল। তিনি ফতেহবাদ থেকে যান এবং ৭৬ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। মোরাদ সম্ভবত খানখানাপুরে অবস্থান করতেন।’ মোগল শাসনকালে আমীর খানকেও এ অঞ্চলে শাসনকর্তা করে পাঠানো হয়। তার নামে আমিরাবাদ বলে একটি পরগনা ছিল।

মোগল সেনাপতি হোসেন কুলি খাঁর মৃত্যু হলে পাঠান কোতল খাঁ পুনরায় বাঙ্গলা আক্রমণ করেন। কোতল খাঁ প্রথমত সাতগর শাসনকর্তা মিরজাদাদ খাঁকে আক্রমণ করেন। মিরজাদাদ পলায়নপূর্বক সেলিমাবাদ প্রস্থন করেন। এদিকে কোতল খাঁর আক্রমণের এই সময় ভূষণায় মুকুন্দরাম নামে এক সামান্য জমিদার ছিলেন। মোরাদ খাঁর সাথে তার বিশেষ সখ্যতা ছিল। মোরাদ চার পত্রকে নিয়ে মুকুন্দেকে কোতল খাঁর বিরুদ্ধে সাহায্য করতে বদ্ধপরিকর হলেন। পাঠান কোতল খাঁ ফতেহাবাদ আক্রমণ করল। এ সময় মোরাদ খাঁ অস্থায়ী নিবাস খানখানাপুরে বাস করেন। মুকুন্দ ও মোরাদের সৈন্যদল কতোল খাঁর বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হলেন। উপায়ন্তর না দেখে পাঠান খাঁ খানখানাপুরে মৃত্যুবরণ করেন। এর পরবর্তী ঘটনায় তাঁর চার ছেলেকে কৌশলে হত্যা করে ভূষণাধিপতি মুকুন্দরাম সমগ্র ফতেহবাদ অধিকার করেন।
Murad Khan died a natural. Mukundu the land lond of that part of the country invited his sons as his guests and put them to death and laid hold of his estate (Akbarnama Beveridge vol-III p-469)
মোরাদ খানের সাথে এভাবেই জড়িয়ে আছে রাজা ফতেহবাদ, চাকলা ভূষণা তথা রাজবাড়ী জেলার ইতিহিস।

রাজবাড়ি জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য
প্রফেসর মতিয়র রহমান
(পৃষ্ঠা-৫৬)

ধুঞ্চি গ্রামের ঐতিহ্য

রাজবাড়ী জেলায় ১০৫৬টি গ্রাম। এরমধ্যে কাজীকান্দা, পদমদি, বেলগাছি, খানখানাপুর, বাণীবহ, মুলঘর, রাজাপুর, নলিয়া, জামালপুর, বহরপুর, খালকুলা, সোনাপুর, রতনদিয়, মাজবাড়ি, মাগুরা ডাঙ্গি, হাবাসপুর, কসবা মাঝাইল, সমাধিনগর, যশাই ঐতিহ্যবাহী এমন গ্রাম রয়েছে। এরমধ্যে ধুঞ্চি গ্রামটি একটু আলাদা।

এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের সাথে যেমন জগিয়ে আছে এর ইতিহাস তেমনি এ গ্রামটি প্রাচীন পদ্মার প্রবাহমানতার স্বাক্ষী। এ গ্রামটি একদিকে যেমন এ অঞ্চলে কাপড় উৎপাদনের ক্ষেত্র তেমনি গ্রামটিতে জন্ম নিয়েছেন অনেক খ্যাতিমান পুরুষ। এ গ্রামের পূর্ব পুরুষেরা প্রায় ৩০০ বৎসর পূর্বে পাবনা জেলার রাজরামবাড়ি থেকে বর্তমান ধুঞ্চি গ্রাম বসতি স্থাপন করেন। তাদের পূর্ব পুরুষেরা হযরত আবু আইয়ুব আনসারীর বংশ। হযরত আবু আইয়ুব আনসারী ছিলেন হযরত (সঃ) এর হিজরতের সঙ্গী। পরবর্তীকালে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে আবু আইয়ুব আনসারীর ধর্ম প্রচারক দলের কেহ পাবনার রাজরামবাড়ি বাসিন্দাদের পূর্বপুরুষ বলে তারা দাবি করেন। পদ্মা প্রবাহের আলোচনায় দেখা যায় প্রয় ৩০০ বছর পূর্বে পদ্মার প্রবাহ বর্তমান রাজবাড়ীর অতি নিকটবর্তী ছিল। রাজরামবাড়ি তখন পদ্মার ওপারের গ্রাম।

পদ্মা ভেঙ্গে উত্তরে সরে গেলে ভাঙ্গনের মুখে রাজরামবাড়ি থেকে তারা পদ্মার এপারে ধুঞ্চি চরে স্থান নেয়। যে কারণে পরবর্তীতে তা ধুঞি গ্রাম নামে পরিচিত পায়। তৎকালীন সময় এ অঞ্চলে বিভিন্ন স্থানে তাতশিল্পীদের আধিক্য ছিল। উল্লেখ্য যারা রাজবাড়ী থেকে ধুঞ্চি চরে আসেন তারা সবাই পেশায় ছিলেন তাঁত শিল্প। এসব তাঁতশিল্পরা পেশাদক্ষতায় ছিল উন্নত। অন্যান্য অঞ্চল থেকে অতি অল্প সময়ে তারা প্রাধান্য অর্জন করে এবং ধুঞ্চি হয় এ অঞ্চলে কাপড় উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ।

ধুঞ্চি গ্রামে কৃতি সন্তান

ধুঞ্চি গ্রামে জন্ম নিয়েছেন অনেক বরেণ্য রাজনীতিবিদ, সাহিত্যিক, প্রতিভাবান ব্যক্তি, খেলোয়াড়। রাজবাড়ীর বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবক কাজী হেদায়েত হোসেনের জন্মাস্থান রাজবাড়ীর ধুঞ্চি গ্রামে। উক্ত গ্রামের ছবের মোল্লা পরিবারের কৃতি সন্তান আযহার উদ্দিন ১৯২৫ সালে অত্র অঞ্চলের তাঁতী সম্প্রদায়ের মধ্যে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ পাস করেন। একজন ইসলামী চিন্তাবিদ হিসেবে তিনি কোরআনের আলো, হাদীসের আলো ও আরবের আলো প্রভৃতি পুস্তক প্রণেতা। তাঁর পুত্র কামাল উদ্দিন পাকিস্থান ও বাংলাদেশ সরকারের ভূমি, খাদ্য, পরিকল্পনা ও স্বরষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রাক্তন সচিব ছিলেন। তিনি বেলজিয়ামে রাষ্ট্রদূত থাকাকালীন সরকারি চাকরি হতে অবসর নেন। এই পরিবারের আরেক কৃতি সন্তান ডা.তালেবর রহমান প্রেমের কবিতা ‘মনের হেনা’ নামক পুস্তকের রচয়িতা। এই গ্রামের ইখলাস উদ্দিনের ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব’ বইটি ধর্মীয় চিন্তবিদদের কাছে একটি প্রিয় বই। এ গ্রামের প্রতিভাবান ছেলে নেহাল উদ্দিন। তিনি ক্যামব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এ্যাটমিক এনার্জির ওপর ডক্টরেট করেন। বর্তমানে তিনি কানাডায় মন্ট্রিল ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা করেন। এ গ্রামের আর এক সন্তান প্রতিভাবান সন্তান মিরাজ উদ্দিন মিয়া। তিনি বহুবিধ প্রতিভার অধিকরী ছিলেন। অনর্গল ইংরেজি ও বাংলায় বক্তৃতা এবং ইসলাম ধর্মের উপর পন্ডিত্য এলাকার মানুষকে মুগ্ধ করত। অত্র গ্রামের মাহবুবুল আলম দুলাল প্রথম চার্টার্ড এ্যাকাউন্টেন্ট। তিনি বর্তমানে কর্ণফুলি ফার্টিলাইজার কোম্পানিতে জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত আছেন। এই গ্রামে বসবাসকারী অসংখ্য সংসারী মানুষের পাশাপাশি সংসার ত্যাগী, খোদার ধ্যানে আত্মমগ্ন মানুষ সর্বজন শ্রদ্ধেয় হযরত কাসেম আলী ফকির ও হযরত শাহ সাহেব এর মাজার বিদ্যমান আছে।

এই গ্রামের বিশিষ্ট ফুটবলার এনায়েত করিম খোকা (মৃত), এনায়েতুর রহমান মনা। এ গ্রামের আর এক কৃতি সন্তান আরজু, বকুডনে রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন।

ধুঞ্চি গ্রামের এ ঐতিহ্য গ্রাস করতে চলেছে পদ্মার ভাঙ্গন। দীর্ঘকালের মরা পদ্মা বলে পরিচিত পদ্মার কোল সাবেক নদীর রুপ নিয়েছে। ভাঙ্গন ধুঞ্চি গ্রামের কাছাকাছি। এ ভাঙ্গন না ঠেকালে শুধু গ্রামই নয়, শহর রক্ষাও দুষ্কর হবে। এ ব্যাপারে রাজবাড়িবসীকে এখনই ব্যবস্থ নেওয়া প্রয়োজন।

তথ্যসংগ্রহঃ রাজবাড়ী জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য

              প্রফেসর মতিয়র রহমান

                           (পৃষ্ঠা-১৩৩)

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাজবাড়ী জেলার মাটি ও মানুষের নিবিড় সম্পর্ক

রাজবাড়ী জেলার মাটি ও মানুষের সাথে নিবিড় সম্পর্ক ও আত্নীয়তার সূত্রে তাঁকে স্মরণে আনার এ ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। রবীন্দ্রনাথ ১৮৯০ থেকে ১৯০১ পর্যন্ত শিলাইদহে থেকে এস্টট পরিচালনায় দায়িত্ব পালন করেন। এই ঠাকুর এস্টেটের অন্তর্ভুক্ত ছিল বর্তমান রাজবাড়ী জেলার অংশত।

গোরাই নদী কুস্টিয়া ও কুমারখালির পদধৌত করে প্রবাহিত।এর তীরে ঠাকুর এস্টেটের
তিনটি বড় বড় মহাল এবং গঞ্জ-কয়া, কুমারখালি ও জানিপুর। কিছুদূরে গড়াইয়ের
একটি শাখা নদীর (ডাকুয়া খাল) তীরে ঠাকুর জমিদারীর পান্টিমহাল যশোর জেলার
সীমানা-রবীন্দ্রনাথ ও শিলাইদহ যুগলবন্দী-প্রেক্ষণ। (আবুল আহনাস চৌধুরী, পৃষ্ঠা-২)

ঠাকুর এস্টেটের বিরাহিম পরগনার অন্তরর্গত ছিল বর্তমান রাজবাড়ী জেলার পাংশার পাট্টা ইউনিয়নের ‘কয়া’ যা বর্তমানে জাগির কয়া। সে সময় পাংশার পশ্চিম অংশত কুমারখালি প্রশাসনের অন্তর্গত ছিল। বর্তমান জেলার পাংশা সীমানা শিলাইদহ সংলগ্ন। এছাড়া কবি দু’বার ট্রেনে রাজবাড়ী ও গোয়ালন্দ হয়ে ঢাকা যাতায়াত করেছেন। রাজবাড়ী আরএসকে ইনস্টিটিউশনের প্রধান শিক্ষক ত্রৈলোক্যনাথ ভট্টাচার্য দু’বার তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছেন। একবার বিজন স্কোয়ারে কংগ্রেস অধিবেশনে অন্যবার জোড়াসাঁকোর ভবনে। আমরা বিএ ক্লাসের কয়েকজন ছাত্র গিয়েছিলাম তাহার কাছে-তাঁহাকে অনুরোধ জানাইয়াছিলাম শেলীর Loves’ Philosophyর The fountain mingles with the sea বঙ্গানুবাদ করিয়া দিন গানের ছন্দে ছন্দে। একটু দেখিয়া লইয়া বলিলেন বস-

নিঝর মিশিছে তটিনীর সালে
তটিনী ছুটেছে সাগর পানে,
পবনের মনে মিশিছে পবন,
চির সুখময় আমোদ ভরে।
ঐ দেখ গিরি চুমীছে আকাশ
ঢেউ পড়ে ঢেউ পড়িছে চলি
সে কুল বালারে কেবা না দুষিরে
ভাইটিরে যদি যায় সে ভুলি?
জগতে কেহিই নহে কো একালা
সকলি বিধির বিধান গুণে
একের সহিত মিলিছে অপরে
আমি কেন না, বা তোমারই মনে?

এভাবে কবি রাজবাড়ীর মাটি ও মানুষের সাথে সম্পর্কিত।

তথ্যসংগ্রহঃ রাজবাড়ী জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য (প্রফেসর মতিয়র রহমান)

পৃষ্ঠা-(২৯১)

 

মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরী

মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরী (জন্ম:– ১৮৮৮ মৃত্যু:–১৫ ডিসেম্বর ১৯৪০) যিনি সচরাচর সাহিত্যিক এয়াকুব আলী চৌধুরী নামে অভিহিত বাংলাভাষার একজন লেখক এবং সাংবাদিক। তিনি শিক্ষা সংস্কারের মাধ্যমে পশ্চাৎপদ মুসলমানদের অগ্রগামী করেন।

জন্ম রাজবাড়ী জেলার পাংশার মাগুরাডাঙ্গা গ্রামে ১৮ কার্তিক ১২৯৫-এ (১৮৮৮)। পিতা পুলিশ অফিসার এনায়েতুল্লাহ চৌধুরী। পাংশা হাইস্কুল থেকে এমই এবং রাজবাড়ী সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশন থেকে এন্ট্রান্স পাস করেন। কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি ভর্তি হলেও বিএ ক্লাসে পড়ার সময় দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে পড়ায় পড়ালেখা ছাড়তে বাধ্য হন।

কর্মজীবন
প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় স্বীয় অগ্রজ মাসিক সাহিত্য পত্রিকা কোহিনূর (১৩০৫–১৩০৮,১৩১১–১৩১৩,১৩১৮–১৩১৯ ও ১৩২২) সম্পাদক রওশন আলী চৌধুরী রোগাক্রান্ত হয়ে অক্ষম হয়ে পড়লে তিনি ঐ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ।১৯১৪-১৫ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাই থানার জোরওয়ারগঞ্জ হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেন। এরপর রাজবাড়ী সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশনে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯২৯–২১ খ্রিষ্টাব্দে পাংশা হাইস্কুলে শিক্ষকতা করার সময় অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনে যোগদান করেন এবং ফলস্বরূপ ব্রিটিশ সরকারের হাতে কারাদণ্ড ভোগ করেন। কারামুক্তির পর শিক্ষকতায় ইস্তফা দিয়ে কলকাতায় যান এবং মেজো ভাই আওলাদ আলী চৌধুরীর সাথে সাংবাদিকতায় যোগ দেন। তিনি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির (৪ সেপ্টেম্বর, ১৯১১) প্রতিষ্ঠাতাদের একজন ছিলেন। এ সমিতির সম্পাদক হিসেবেও কয়েক বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। সমিতির মাসিক পত্র সাহিত্যিক-এর (১৯২৬) যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। এয়াকুব আলী চৌধুরী ও কবি গোলাম মোস্তফার যুগ্ম সম্পাদনায় এটি এক বছর যাবৎ প্রকাশিত হয়েছিল। রওশন আলী চৌধুরী ও আওলাদ আলী চৌধুরীর অকাল মৃত্যুতে তাদের পরিবারের দায়িত্ব নেন এয়াকুব আলী। শোক-দুঃখ-দারিদ্র্যে নিপতিত হয়ে মাত্র ৪৭-৪৮ বছর বয়সে ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হন। শেষ জীবনের চার-পাঁচ বছর জীবনমৃত অবস্থায় গ্রামের বাড়িতে বাস করেন। মৃত্যুর দুই বছর আগে বঙ্গীয় সরকার মাসিক ২৫ টাকা হিসেবে সাহিত্যিক বৃত্তি মঞ্জুর করেন তার জন্য।

বাংলা গদ্যের একজন শক্তিশালী শিল্পী ছিলেন। ইসলামি দর্শন ও সংস্কৃতি তার রচনার মূল উপজীব্য। বক্তব্যের বলিষ্ঠতায়, ভাষার মাধুর্যে ও ভাবের গাম্ভীর্যে তার রচনাবলি বিশেষ মর্যাদার দাবিদার। হিন্দু-মুসলমানের সমপ্রীতিতে বিশ্বাসী। বিশ শতকের প্রথম দিকে বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা বাংলা না উর্দু- এ বিতর্কে তিনি বাংলা ভাষার পক্ষাবলম্বন করেন। সুবক্তা হিসেবেও খ্যাত।

প্রকাশিত গ্রন্থ

তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৩টি। নূরনবী গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথের প্রশংসাবাণী সংযোজিত হয়েছে।


  1. ধর্মের কাহিনী (১৯১৪),
  2. নূরনবী (১৯১৮),
  3. শান্তিধারা (১৯১৯),
  4. মানব মুকুট (১৯২২)।

এছাড়া বাংলা একাডেমি প্রকাশ করেছে এয়াকুব আলী চৌধুরী অপ্রকাশিত রচনা নামীয় একটি গ্রন্থ। এর সম্পাদক আমীনুর রহমান।

চিরকুমার এয়াকুব আলী ছিলেন উজ্জ্বল চরিত্রের অধিকারী এবং ন্যায়ের ধ্বজাধারী। তাঁর প্রচন্ড আর্থিক অনটন ও ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি শেষ জীবন গ্রামের বাড়িতে কাটান। ১৯৪০ সালের ১৫ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়।

বিষাদ-সিন্ধু – মীর মশাররফ হোসেন

বিষাদ-সিন্ধু কারবালার যুদ্ধক্ষেত্রকে উপাত্ত করে রচিত
মীর মশাররফ হোসেনের ঐতিহাসিক উপন্যাস। এটি
যথাক্রমে ১৮৮৫, ১৮৮৭ ও ১৮৯১ সালে তিন ভাগে
প্রকাশিত হয়; পরবর্তীতে সেগুলি একখন্ডে মুদ্রিত হয়।

বিষাদ-সিন্ধুর প্রধান চরিত্রগুলো নামের দিক থেকে
ঐতিহাসিক, কিন্তু ঘটনা বর্ণনায় ও চরিত্র সৃষ্টিতে
কাল্পনিক। এই গ্রন্থে কিছু উপকাহিনী আছে,
যেগুলো যথার্থ ঐতিহাসিক নয়। গ্রন্থের মুখবন্ধে
লেখক মীর মশাররফ হোসেন লিখেছেন- ‘পারস্য ও
আরব্য গ্রন্থ হইতে মূল ঘটনার সারাংশ লইয়া বিষাদ-
সিন্ধু বিরচিত হইল।’ লক্ষণীয় বিষয়, মীর মশাররফ
হোসেন বিষাদ-সিন্ধু গ্রন্থে বর্ণিত ঘটনাসমূহ কোন
কোন আরবি এবং ফারসি গ্রন্থ হতে সংগ্রহ করেছেন
তার নাম উল্লেখ করেননি। এ কারণে ‘সমালোচকবৃন্দ’
লেখকের ‘বক্তব্য অনুমোদনে দ্বিধান্বিত’। মুনীর চৌধুরী
লেখকের দাবী সম্পর্কে যৌক্তিক সংশয় পোষণ
করেছেন। তিনি দোভাষী পুঁথির সঙ্গে বিষাদ-সিন্ধুর
বেশ সাদৃশ্য আবিষ্কার করে নিশ্চিন্ত হয়েছেন যে
মশাররফের অবলম্বন ছিল কারবালাবিষয়ক জনপ্রিয়
বাংলা পুঁথিই। গোলাম সাকলায়েনের অভিমতও অভিন্ন।
আনিসুজ্জামান ও মুস্তাফা নূরউল ইসলামও মনে করেন
দোভাষী পুঁথিই মশাররফের কাহিনীর প্রধান প্রেরণা ও
মূল উৎস। কাজী আবদুল মান্নান অনুমান করেছেন,
‘গ্রন্থটির প্রতি ধর্মপ্রাণ মুসলমান সমাজের শ্রদ্ধা এবং
আকর্ষণ সৃষ্টির জন্যই মশাররফ কাহিনী-উৎসের প্রশ্নে
আরবি-ফারসি গ্রন্থেও প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন।

মীর মশাররফ হোসেনের বিষাদ-সিন্ধুর মূল বিষয়বস্ত্ত
হচ্ছে- হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র ইমাম
হোসেনের মৃত্যুর জন্য দায়ী ঘটনাসমূহ। অবশ্য ইমাম
হোসেনের মৃত্যুর ফলে যে সকল ঘটনা ঘটেছিল
তারও বর্ণনা রয়েছে এ গ্রন্থে। বিষাদ-সিন্ধু
উপন্যাসের প্রধান চরিত্রগুলির সন্ধান ইতিহাসে
পাওয়া যায়, কিন্তু কোনো কোনো অপ্রধান চরিত্রের
উল্লেখ বা সন্ধান ঐতিহাসিক কোনো গ্রন্থে পাওয়া
যায় না। কিন্তু গবেষকের সিদ্ধান্ত- ‘যেহেতু ইতিহাসের
ওপর ভিত্তি করেই এই গ্রন্থ রচিত হয়েছে, সুতরাং
এটিকে ঐতিহাসিক উপন্যাস বলা যায়।’ এতে একই
সঙ্গে উপন্যাসের চরিত্রচিত্রণ, মানবজীবনের দুঃখ-
যন্ত্রণা, হিংসা-বিদ্বেষ ইত্যাদি যেমন চিত্রিত হয়েছে
তেমনি ইতিহাসের পটভূমিকায় সিংহাসন নিয়ে দ্বন্দ্ব,
সংগ্রাম, রক্তপাত, হত্যাকান্ড ইত্যাদি বর্ণিত হয়েছে।
সারকথা বিষাদ-সিন্ধুতে বর্ণিত ইতিহাসের চরিত্র ও
ইতিহাসের লক্ষণকে প্রত্যক্ষ করে গবেষক একে
ঐতিহাসিক উপন্যাসের মর্যাদা দিতে দ্বিধা করেননি।
তবে এতে এমন কিছু ঘটনার উল্লেখ আছে যেগুলো
ইতিহাসের আলোকে বিচার করা চলে না। এমনকি
বাস্তব জীবনেও সেগুলির অস্তিত্ব সম্পর্কে সন্দেহ
পোষণ করা চলে, যেমন-কিছু অতিপ্রাকৃত ঘটনা,
এগুলির কোনোটির উৎপত্তি ধর্মীয় বিশ্বাসে, আবার
কোনটির উৎপত্তি ঐন্দ্রজালিক শক্তিতে ও আস্থায়।

বিষাদ-সিন্ধুর সূচনা হচ্ছে- হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর এক
ভবিষ্যদ্বাণীতে এবং ভবিষ্যদ্বাণী সত্যে পরিণত
হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রন্থের উপসংহার হবে। এই
ভবিষ্যদ্বাণী ছাড়াও এতে কিছু অতিপ্রাকৃত ঘটনার
উল্লেখ রয়েছে। যেমন-এজিদের চোখের সামনে
থেকে হোসেনের খন্ডিত শির অদৃশ্য হওয়া, কারবালা
প্রান্তরের বৃক্ষ থেকে রক্তক্ষরিত হওয়া, হোসেনের
মৃতদেহের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় হোসেনের
পিতামাতার মর্তে আগমন এবং দু্ই পাহাড়ের
মধ্যবর্তীস্থানে হানিফার বন্দি হওয়া ইত্যাদি। কোনো
উপন্যাসে কেবল বাস্তব জীবনের ঘটনা চিহ্নিত হলে
তাকে সাধারণত উপন্যাস হিসেবে গণ্য করা হয় না।
কিন্তু বিষাদ-সিন্ধুতে বাস্তব ঘটনা এবং অতিপ্রাকৃত
বিষয়ের অবতারণা করা হলেও তা পাঠকদের
অবিশ্বাস উদ্রেক করে না। বিষাদ-সিন্ধুর ঘটনাস্থান ও
ঘটনাকাল সপ্তম শতাব্দীর আরবদেশ। এ উপন্যাস
বিচারকালে কোনো কোনো গবেষক সেই বিশেষ
যুগের ও মানুষের বিশ্বাসের কথাটি মনে রাখার পক্ষে
মত দিয়ে বলেছেন- হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর
বংশধরেরা যদি দৈবশক্তিতে বিশ্বাসী হন, আশ্চর্য
হবার কিছু নেই। কারণ তাঁরা বিশ্বাস করতেন-
বিধাতার স্থিরীকৃত পথ থেকে কেউ বিচ্যুত হতে পারে
না। বিষাদ-সিন্ধু পাঠকালে কখনো কখনো মনে হয়
যেন ইমাম হাসান ও ইমাম হোসেন রক্তমাংসের
কোনো মানুষ নয়, কেননা তারা সম্পূর্ণরূপে দৈবের
ওপর নির্ভরশীল এবং তারা কেউ নিজেদের
কৃতকর্মের ফলের জন্য নিজেদের দায়ী বলে মনে
করে না। অপরদিকে এজিদ, জায়েদা, মায়মুনা এবং
মরওয়ান-এরা পাষন্ড হলেও এদের অনেকটা
রক্তমাংসের মানুষ মনে হয়। কারণ এরা মনে করে-
তাদের বর্তমান ক্রিয়াকর্মের ফলেই ভবিষ্যৎ ঘটনাবলী
প্রভাবান্বিত হবে। এজিদ হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর
বংশধরদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে অনবরত সংগ্রাম
করতে থাকে, কিন্তু সর্বক্ষণই এজিদ আপন বাহুবল ও
কলাকৌশলের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু ইমাম হাসান
এবং ইমাম হোসেন মৃত্যুকে বরণ করে বিনা
প্রতিবাদে, বিনা প্রতিরোধে। কেননা, তাঁরা বিশ্বাস
করে- বিধাতার অভিপ্রায়ই তাই, ফলে তাঁকে
মৃত্যুবরণ করতে হবে।

মীর মশাররফ হোসেন জন্মগ্রহণ করেন ঊনবিংশ
শতাব্দীর মধ্যভাগে এবং তিনি যে পরিবেশে বেড়ে
উঠেন সেটি ছিল সে-যুগের পূর্ববর্তী সময়ের রীতি-
নীতি ও বিশ্বাসদ্বারা লালিত। অধিকাংশ গবেষক
বিষাদ-সিন্ধুকে মহাকাব্যের সঙ্গে তুলনা করে
বলেছেন- ‘এতে রয়েছে মহাকাব্যের বিশাল পটভূমি।
এটি ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির সংঘর্ষের কাহিনী নয়-এ
হচ্ছে প্রভুত্ব নিয়ে দুই নৃপতির মধ্যে সংঘর্ষ। এই
সংঘর্ষের সঙ্গে জড়িত ছিল বহু লোকের জীবন, বহু
লোকের ভাগ্য।’ এতে প্রায় শ’খানেক পাত্রপাত্রী
আছে; এর মধ্যে রয়েছে অনেক কাহিনী শাখা-
প্রশাখায় বিস্তৃত। হিংসা বিদ্বেষজর্জরিত মানুষের
কামনা, বাসনা, প্রভুত্বের নিষ্ঠুরতা, রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম,
আর এসব ঘটেছিল একটি নারীকে কেন্দ্র করে। ঠিক
এমন ঘটনা গ্রিক সাহিত্যের ইলিয়াড মহাকাব্যে
ঘটেছিল।

বিষাদ-সিন্ধুর অধিকাংশ ঘটনাই জয়নাবকে কেন্দ্র
করে। এজিদ ও ইমাম হাসান-হোসেনের সংঘর্ষের
মূল কারণ জয়নাব। জয়নাব সতীসাধ্বী স্ত্রী। প্রথম
স্বামী কর্তৃক পরিত্যক্ত হয়ে দ্বিতীয়বার পরিণীতা হন
ইমাম হাসানের সঙ্গে। ভাগ্যের পরিহাসে ইমাম
হাসানের মৃত্যুর পর সে এজিদের কারাগারে বন্দিনী
হন। কারাগারে বন্দিনী থাকাকালে তার মনে হতো
কারবালার রক্তপাতের জন্য সেই যেন দায়ী।
এজিদকে স্বামীত্বে বরণ করে নিলেই তো আর এসব
ঘটনা ঘটত না। সাহিত্য সৃষ্টির দিক থেকে
মাইকেলের মেঘনাদবধ কাব্যের সীতা-চরিত্রের সঙ্গে
জয়নাবের তুলনা করা চলে।

বিষাদ-সিন্ধু পাঠ্যপুস্তক হিসেবেই প্রথমে জনপ্রিয়তা
লাভ করে এবং গ্রামে গ্রামে পঠিত হতে থাকে।
পরবর্তীতে বিষাদ-সিন্ধুর এই জনপ্রিয়তার সূত্র ধরে
বাংলাদেশের জারিগানের আসরে প্রথমত
প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠানের প্রশ্নোত্তর পর্বে
আত্তীকৃত হয়, পরবর্তীতে জারিগানের গীত-নৃত্যমূলক
পরিবেশনায় বিষাদ-সিন্ধুর পদ্যগীতে রূপান্তরিত হয়ে
পরিবেশিত হতে থাকে। আধুনিক বাংলা ভাষার
গদ্যরীতিতে রচিত মীর মশাররফ হোসেনের লিখিত
সাহিত্য বিষাদ-সিন্ধুর পুরো পাঠটিই বাংলাদেশের
নেত্রকোণা অঞ্চলে প্রচলিত জারিগানের আদলে
আত্তীকৃত হয়েছে।

বিষাদ-সিন্ধু ও জারিগানের তুলনামূলক পাঠের ভেতর
দিয়ে পাঠক-গবেষক স্পষ্টভাবে প্রত্যক্ষ করতে
পারবেন, আধুনিক বাংলা ভাষার লিখিত সাহিত্য
বিষাদ-সিন্ধু কীভাবে গ্রামের স্বল্পশিক্ষিত ‘বয়াতি’,
‘জারিয়াল’ বা ‘খেলোয়াড়’ কর্তৃক জারিগানের আসরে
আত্তীকৃত হয়ে কতটা প্রাণবন্তভাবেই না গ্রামীণ
আসরে পরিবেশিত হয়ে থাকে। উপস্থাপিত পাঠের
ভেতর দিয়ে মূলত নৃত্য-গীত আশ্রিত জারিপালার
আত্তীকৃত পাঠকে প্রত্যক্ষ করা যাবে। কিন্তু মনে রাখা
দরকার যে, জারিগানের আসরে লিখিত সাহিত্য
বিষাদ-সিন্ধু আত্তীকৃত হবার ইতিহাস হতে জানা যায়
সাধারণত দুইভাবে আত্তীকৃত হয়ে বিষাদ-সিন্ধুর
আখ্যান গ্রামীণ আসরে পরিবেশিত হয়ে আসছে।
ক্ষেত্রসমীক্ষণে জারিগানের বয়াতিদের ভাষ্যমতে,
জারিগানের আসরে বিষাদ-সিন্ধু প্রথমবারের মতো
আত্তীকৃত হয়েছিল মূলত প্রতিযোগিতামূলক আসরে
প্রশ্নোত্তরের একটি আকর্ষণীয় তথ্যনির্ভর উপাদান
হিসেবে, দ্বিতীয়ত প্রতিযোগিতামূলক জারিগানের
আসর হতেই পর্যায়ক্রমে বিষাদ-সিন্ধু গীত-নৃত্য
আশ্রিত জারিপালায় প্রবেশ করে বয়াতিদের মুখে মুখে
সৃজিত ছন্দের গাঁথুনিতে রূপান্তরিত হয়ে। দ্বিতীয়
পর্যায়ে বিষাদ-সিন্ধুর গদ্যরীতি জারিগানের সৃজনশীল
বয়াতিদের দ্বারা ছন্দবদ্ধ গীতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে
মূলত ‘ক্ষুদ্র পয়ার’ বা ‘দীর্ঘ পয়ার’ ছন্দগীত প্রযুক্ত
হলেও তাতে বৈচিত্র্য প্রদান করে পালার পয়ারের
পূর্বে এবং মধ্যে মধ্যে গীত দোহারদের দিশা-দোহার
বা ধূয়া এবং ডাক। দিশা-দোহার বা ধূয়াতে বিচিত্র
ছন্দের প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। মূলত দোহার-
দিশাতেই বিচিত্র ছন্দ প্রয়োগ করা হয়, পালার
পয়ারের প্রচলিত কাঠামোর ওপরে সাধারণত ত্রিপদী,
চৌপদী ইত্যাদি ছন্দের আবরণ দিয়েই জারিগানে
বৈচিত্র্য সৃজন করা হয়। জারিগানের আসরের নৃত্য-
গীতের মধ্যে বৈচিত্র্য সৃজন করে দোহার-
খোলোয়াড়দের মুখে উচ্চারিত আরেকটি উপাদান তা
হলো ‘ডাক’।

বিষাদ-সিন্ধু কেন্দ্রিক নৃত্য-গীত আশ্রিত জারিগানের
আসরে লিখিত সাহিত্য এ উপন্যাসে নির্ধারিত প্রবাহ
হতে কখনো মূলপাঠ আবার কখনো মূলপাঠের কথার
কাট-ছাট উপস্থাপন করে তার আগে ও পরে ছন্দগীত
আকারে জারিপালা পরিবেশন করে থাকেন।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে কারবালাবিষয়ক কাব্য
রচনায় কবি হায়াত মামুদ, ফকির গরীবুল্লাহ এবং
সৈয়দ হামজা সর্বাপেক্ষা কৃতিত্বের পরিচয় দেন। মীর
মশাররফ হোসেনের কাহিনীতে কবি হায়াত মামুদ ও
ফকির গরীবুল্লাহ’র কাহিনীর সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়।
পূর্বসূরী ফকির গরীবুল্লাহ’র রচনা থেকে উপকরণ
নিলেও বিষাদ-সিন্ধু গ্রন্থের কাহিনী-নির্বাচন, নির্মাণ
ও চরিত্র সৃষ্টি মীর মশাররফের একান্ত নিজস্ব।

গবেষকঃ সাইমন জাকারিয়া

রাজবাড়ী জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য গ্রন্থের লেখক প্রফেসর মতিয়র রহমান

রাজবাড়ী জেলার (ইতিহাস ও ঐতিহ্য গ্রন্থের লেখক বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর মতিয়ার রহমান) গত ৭ই জুলাই ২০১৭ ইং। রাত সাড়ে ৮টায় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন(ইন্না লিল্লাহি —রাজেউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

মরহুমের স্বজনরা জানান, গত ৭ই জুলাই ২০১৭ ইং রাতে সাড়ে ৮টার দিকে রাজবাড়ী শহরের ২নং রেলগেট এলাকায় তিনি অসুস্থ্য হয়ে পড়লে তাৎক্ষনিকভাবে তাকে সদর হাসপাতালে নেয়া হয়। হাসপাতালে নেয়ার কিছুক্ষণ পরেই তিনি মারা যান।

প্রফেসর মতিয়ার রহমান ১৯৪৭ সালের ৩০শে জুলাই রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার নারুয়া ইউনিয়নের বিলমালেঙ্গা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম মরহুম শফি উদ্দিন মোল্লা ও মাতার নাম মরহুমা নজিরন নেছা।

১৯৬৩ সালে নাড়–য়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাশ করেন এবং ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে কৃতিত্বের সাথে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন।

কর্মময় জীবনে তিনি রাজবাড়ী সরকারী কলেজ, শরিয়তপুর সরকারী কলেজ ও ফরিদপুর সরকারী রাজেন্দ্র কলেজে অর্থনীতি বিভাগের প্রধান হিসেবে শিক্ষকতা করেছেন। ২০০৪ সালে ফরিদপুর সরকারী রাজেন্দ্র কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান পদ থেকে অবসর গ্রহন করেন। তিনি রাজবাড়ী শহরের ১নং বেড়াডাঙ্গায় বসবাস করতেন।

কর্মময় জীবনে সফল শিক্ষক হিসেবে তিনি ৩ বার শ্রেষ্ঠ কলেজ শিক্ষকের মর্যাদা লাভ করেন। তিনি রাজবাড়ী জেলার সাহিত্য ও সংস্কৃতিক সংসদের সভাপতি এবং অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মচারী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। উল্লেখ্য, তার লেখা রাজবাড়ী জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য গ্রন্থটি জেলায় একমাত্র ইতিহাস গ্রন্থ। তার সহধর্মিনী শাহীনুর বেগমও শিক্ষকতা করেছেন। তিনি ২কন্যা ও ১পুত্র সন্তানের জনক ছিলেন।

তার মৃত্যুতে রাজবাড়ীতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ৮ই জুলাই রাজবাড়ী শহরের রেলওয়ে ঈদগাহ মাঠে দুপুর ২টায় তার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। মৃত্যুকালে স্ত্রী, সন্তান, আত্মীয় স্বজনসহ তিনি বহু শুভাকাঙ্খী রেখে গেছেন।

শোক প্রকাশ: প্রফেসর মতিয়ার রহমানের মৃত্যুতে রাজবাড়ী-১ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব কাজী কেরামত আলী এবং সাবেক এমপি ও জেলা বিএনপির সভাপতি আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম গভীর শোক প্রকাশ করাসহ মরহুমের পরিবারবর্গের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন।

পাংশা নামকরণের মতভেদ রয়েছে।

পাংশা নামকরণের মতভেদ রয়েছে। ১৮৬৩ সালে
পাংশা থানা প্রতিষ্ঠা পায়। এক্ষেত্রে পাংশার নামকরণ
এর অনেক পূর্বথেকে প্রচলিত ছিল তা সহজেই
অনুমান করা যায়। বাংলাদেশ পপুলেশান সেনসাসে
এর নামকরণ সম্বন্ধে দুটি মত ব্যক্ত করা হয়েছে৷
পাঞ্জুশাহ নামক একজন ধর্ম প্রচারক সুদূর আরব
থেকে এখানে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে আসেন৷ তার সঙ্গী
ছিলেন পাঁচ আউলিয়া৷ তাদের নাম পাংশা উপজেলায় রক্ষিত৷

পাঞ্জুশাহ থেকে পানজু থেকে পান এবং শা যোগে নাম হয়েছে পাংশা৷
পাংশা উপজেলার ইতিহাস লেখক শেখ মুহাম্মদ সবুর উদ্দিন এ মতটিই
সর্মথন করেছেন৷ তবে পাঞ্জুশাহ বলে অত্র অঞ্চলে যিনি লালনের অনুসারী
তাঁর জন্ম ঝিনাইদহের শৈলকূপা থানার হরিশপুরে ১৮৫১ সালে৷ পাঞ্জুশাহের
শিষ্য মাতাম শাহ ছিলেন চরম আধ্যাত্মিক শক্তির অধিকারী৷ মাতাম শাহের
পাংশা এলাকায় পাঁচটি আস্তানা ছিল বলে জানা যায়। বিষয়টি বাংলা একাডেমী
কর্তৃক প্রকাশিত পাঞ্জুশাহ পুস্তকে লিখিত আছে। পাঞ্জুশাহ সম্বন্ধে এখানে
মতভেদ দেখা যায়। শেষোক্ত পাঞ্জুশাহ থেকে পাংশার নামকরণ যুক্তিসঙ্গত নয়।
কারণ তান জন্ম ১৮৫১ সালে আর পাংশা থানা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬৩ সালে৷

ধারণা করা যায় পাংশার নাম পাঞ্জুশাহেরও অনেক পূর্বে প্রচলিত ছিল।
পাঞ্জুশাহ যিনি সুদূর আরব থেকে ষোড়শ শতকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে
এখানে আসেন তারও কোন স্মৃতি চিহ্ন পাওয়া যায় না৷ ষোড়শ শতকের
দিকে যিনি পাংশা ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে আসেন তিনি হযরত শাহজুঁই৷
তিনি আফগানিস্তান থেকে আগমন করেন। পাংশায় তার মাজার শরীফ
রয়েছে। আলোচনা থেকে ধারণা করা যায় পাঞ্জুশাহের যে পরিচিতি
রয়েছে তা আধ্যাত্মিক সাধক পাঞ্জুশাহ যিনি মাতাম শাহের পাঁচ আস্তানার
পরিচিততে বিশেষ ভাবে পরিচিত হন। এক্ষেত্রে পাঞ্জুশাহের নামে নামকরণ
যুক্তি সঙ্গত হয় না। অনেকের ধারণা পানশী (ছইওয়ালা বড় নৌকা )
থেকে পাংশার নামকরন হয়েছে। পাংশার পার্শ্ব দিয়ে প্রবাহিত চন্দনা
একদিন প্রশস্ত ও বেগবান ছিল।

এঅঞ্চলে চন্দনা নদীর তীরে অনেক নৌকার ভীর জমত৷ এই পানশী
থেকে পাংশার নামকরণ হয়েছে। মীর মোশাররফ হোসেনের আমার জীবনী
গ্রন্থে অত্র অঞ্চলে পানশী নৌকার ব্যবহার এবং পাংশা এর ভীড়ের কথা
জানা যায়। অধ্যাপক আব্দর রব মিয়ার চন্দনা/পাংশা থানা সমিতি,
ঢাকা, স্মরণিকা ১৯৮২ সংখ্যায় সাঁওতাল কন্যা পানশীর প্রেম ঘটিত
বিষয়ে পাংশার নামকরণ হয়েছে তারও ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না।

তাছাড়া এরকম কোন শ্রুতি পাংশাতে নেই। অনেকে মনে করেন
পদ্মা ও চন্দনায় প্রচুর পাঙ্গাশ মাছের অধিক্য থেকে এঅঞ্চলের নাম পাংশা হয়েছে।
এরও তেমন কোন যুক্তি ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। এ রকম আলোচনা থেকে
পানশী থেকে পাংশা নামের উৎপত্তি অধিক যুক্তি নির্ভর। জন শ্রুতি আছে নবাব
সিরাজ উদ্দৌলার পতনের পর নবাব পরিবারের বন্দী সদস্যদের এ পানশী
নৌকাতেই এ পাংশা হয়ে জিনজিরা নিয়ে যাওয়া হয়। নদীপথে মোঘল
শাসনামলে পানশী করেই এ পথে দিল্লি যাতায়াত করত। নবাব শায়েস্তা খানের
সময় যে ফেরী ফান্ড রাস্তা হয় (ফেলুমেন্টের রাস্ত) তা পাংশা পর্যন্ত বিস্তৃত।
এই রাস্ত ধরেই পাংশা নসরত শাহী, মহিমমাহী, বেলগাছি,
নলদি ও বিরাহিম পরগণাভূক্ত ছিল।