গৌরী প্রসাদ

গৌরী প্রসাদ প্রভুরামের পুত্র। তাঁর সময়কাল ১৭৫৭ থেকে ১৮০০ শতক পর্যন্ত অনুমান করা যায়। এ সময়ের মধ্যে লক্ষীকোল জমিদার এস্টেটের প্র্র্র্রভাব প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পায় ‘সরকার হইতে কোনোরুপ উপাধি না পাইলেও স্বদেশীয়রা ইহাদের রাজা বলিয়া সম্বোধন করিয়া থাকে।’ (ফরিদপুরের ইতিহাস, আনন্দনাথ রায়, পৃষ্ঠা-২০৬)। গৌরী প্রসাদের কোনো সন্তানাদি না থাকায় দীগিন্দ্র প্রসাদকে দত্তক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন।

ধর্মীও সম্প্রদায়

ধর্মীয় সম্প্রদায়

১২০৬ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজীর পূর্বে এদেশের রাজা ও প্রজা প্রায় সকলেই ছিল বৌদ্ধ ও হিন্দু। কেবল মুসলমানদের রাজত্ব শুরু হবার পর থেকে মুসলমান প্রবাহের শুরু হয়। এ ধর্ম কখন বিশেষভাবে প্রসার লাভ করে তার একটা পরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায় বঙ্গদেশে নির্মিত মসজিদের সংখ্যা এবং অবস্থান থেকে। ত্রয়োদশ শতকে মসজিদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৬টি। পরের শতাব্দীতে এই সংখ্যা আনুপাতিক সেটেই বৃদ্ধি পায়। এ শতাব্দীতে এরুপ মসজিদ নির্মিত হয় সাতটি। পনের শতকে এ সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং মসজিদ তৈরি হয় ৬৬টি। আর যোল শতকে ৭৫টি। তারপর সতের শতকে ঢাকা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, নোয়াখালি, কুমিল্লা ইত্যাদি অঞ্চলের মসজিদের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পায়। ক্রেমারের গবেষণা থেকে জানা যায় ১২০৪ সালে বঙ্গদেশে মোট জনসংখ্যা ছিল ১২.৫৮ মিলিয়ন (১ কোটি ২৫ লক্ষ প্রায়) তা ১৮৭২-এ দাঁড়ায় ৩৬.৭ মিলিয়ন (৩ কোটি ৭০ লক্ষ প্রায়)।

১৯০১ এ দাঁড়ায় প্রায় ৪কোটি (উভয় বাংলা)। পানিনি প্রদত্ত গ্রাফে দেখা যায় ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের পূর্ববঙ্গে মুসলমান ছিল খুবই কম। তবে ১৮৭২-এর দেখা যায় হিন্দু মুসলমান প্রায় সমান এবং গ্রাফটিতে ১৯০১-এ মুসলমানদের সংখ্যা হিন্দুদের ছাড়িয়ে যায়।

প্রায় একশত বছর পূর্বে ফরিদপুর জেলায় হিন্দু, মুসলমান, ব্রাহ্ম, খ্রিস্টান এই চার জাতির বাস ছিল। হিন্দুর সংখ্যা ৭,৩৩৫৫ জন। তম্মোধ্যে পুরুষ ৩৬০০১২ স্ত্রী ৩,৭৩,৫৪৩। ব্রাহ্ম ৮৩ জন। পুরুষ ৪০, মহিলা ৪৩। মুসলমান মোট সংখ্যা ১১,৯৯,৩৫১ জন। তম্মোধ্যে পুরুষ ৬,০৭,৬৮৮ ও স্ত্রী ৫,৯১৬৬৩ জন। খ্রিস্টান ৩,৬৫৭ জন (ফরিদপুরের ইতিহাসে আনন্দনাথ রায় পৃষ্ঠা-২২)।

১৯৬১ সালে আদমশুমারী অনুযায়ী ফরিদপুর জেলার মোট জনসংখ্যা ৩১,৭৮,৯৪৫। এরমধ্যে ২৩,৪৭,১৭৩ জন মুসলমান। ২,২৮,৫০৬ জন কাষ্ট হিন্দু। ৬,৯৬,৫৫৮ জন শিডিউল কাষ্ট (নমশুদ্র), ৯,১৫৮ জন খ্রিস্টান এবং অন্যান্য ৫৫০ জন। এ সময় গোয়ালন্দ মহকুমার হিন্দু ও মুসলমান জনসংখ্যার পরিমাণ ছিল নিম্নরুপ——

মহকুমা গোয়ালন্দ ১৯৬১ সেনসাস

মহকুমার

থান/নাম

সমস্ত ধর্মের লোকসংখ্যা মুসলমান কাষ্ট হিন্দু শিডিউলকাষ্ট হিন্দু মোট হিন্দু ক্রীশ্চিয়ান অন্যান্য
গোয়ালন্দ মহাকুমা ৪৩৪৪০৭ ৩১৫৮৮৬ ৫১০৯৩ ৬৭৩৪৯ ১১৮৪৪২ ৩০ ৭৯
পাংশা  থানা ১৫৮৩৩১ ১২৪২৯৫ ১৮০১৪ ১৬০২২ ৩৪০৩৮ ০০ ৩০
বালিয়াকান্দি থান ১১৮০৩৬ ৬৫৭১৫ ১৭৪৩২ ৩৪৮৮৯ ৫২৪৪৯ ০০ ৩০
রাজবাড়ি থানা ১১৩৪৪৯ ৮৯৩৭৬ ১৪৪৪৮ ৯৫৩৬ ২৩৯৮৪ ৩০ ৪৯
গোয়ালন্দ ঘাট ৪৪৬০১ ৩৬৫০০ ১১১৯ ৬৯০২ ৮০২৯ ০০ ০০

উল্লেখিত বিবরণ, গ্রাফ ও তথ্যসূচী থেকে জেলায় মুসলমান সংখ্যা বৃ্দ্ধির স্পষ্ট নিদর্শন মেলে।

বঙ্গে ইসলাম প্রবাহের কয়েকটি কারণ উল্লেখযোগ্য যথা—–তরবারি, সামাজিক সাম্য, পীরদরবেশ ও আউলিয়াদের ধর্ম প্রচার, বৌদ্ধ ও হিন্দুদের সামাজিক অবস্থা এবং বঙ্গের সহজ জীবন ব্যবস্থা। ভারতবর্ষে যদি কেবল তরবারির দ্বারা ইসলামের প্রসার ঘটত তাহলে দিল্লী, আগ্রাতেই মুসলমান বেশি থাকত। কিন্তু তুলনামূলক দেখা যায় ইসলাম ধর্মের প্রসার ঘটেছে দ্রুত এবং তা আবার ১৫ শতকের পর অর্থাৎ মোগল শাসনকাল থেকে। মোগলরা আবার ধর্মপ্রচারে উদাসীন ছিলেন বলেই ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয়।

নবম শতাব্দী থেকে আরব বণিকরা চট্রগ্রাম অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। অবশ্য তারা র্ধম প্রচার করতে আসেননি। বখতিয়ার খলজির মতো তারাও এসেছিলেন ইহলৌকিক লাভের আশায়। এদেশে বণিক ও যোদ্ধা ছাড়া আরো এসেছিলেন ধর্ম প্রচারকরা। তারা দেশ শাসন বা ব্যবসা করতে আসেননি। তারা এসেছিলেন ধর্মপ্রচারে দ্বারা পুণ্য অর্জন করতে। মহম্মদ এনামুল হকের মতে এ রকম একজন প্রচারক বাবা আদম এসেছিলেন দ্বাদশ শতকের গোড়ায়। জানা যায় তিনি, নাকি বল্লভ সেনের সাথে যুদ্ধ করে ১১১৯ সালে মারা যান। তারপরে আসেন শাহ মুহম্মদ সুলতান। সে কালের প্রখ্যাত সুফি সৈয়দ জালালউদ্দিন মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার কিছু আগে বঙ্গে এসেছিলেন। তারা সে সময় আগমন করলেও ইসলাম প্রচারে বিশেষ সুবিধা করতে পারেননি। কারণ তখন রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকাতার অভাব ছিল। তবে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠায় ইসলাম প্রচার প্রসারে ব্যাপক সাহায্য করেছিল। সুলতানদের লক্ষ্য না হলেও তারা আদৌ ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন না। তারা বরং বিদ্বেষের কর্তৃত্বকে প্রতিষ্ঠিত এবং জোরদার করার জন্য অকাতরে ধর্মের নাম এবং প্রতীক ব্যবহার করেছেন। সেই সঙ্গে ব্যাবহার করেছেন তরবারি। নিজেদের নামে খুৎবা প্রচলন রীতি তখন প্রকাশ্যে রীতি হিসেবে গৃহীত হয়েছিল। মুসলমানদের সংখ্যা কম হলেও তারা বহু মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন ও নির্মাণ করতে সাহায্য করেছিলেন। বস্তুত মসজিদ ধর্ম প্রচারের প্রতিকে পরিণত হয়েছিল। নতুন কর্তৃত্বের সমকালীন ঐতিহাসিক মিনহাজ এর বিবরণ থেকে জানা যায়, জাহাঙ্গীর খিলজী গোবিন্দ পালের রাজধানী অজন্তপুরী আক্রমন করে এবং রাজধানী দখলের পর বৌদ্ধবিহার লুটপাট এবং বৌদ্ধ ভিক্ষুদের  হত্যা করে। অনেক বৌদ্ধ সে সময় মুসলমানদের অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দক্ষিণ পূর্ববাংলায় এবং নেপালে আশ্রয় নেয়। হিন্দু মন্দিরও ভেঙ্গে ফেলেন। এছাড়া তাদের মূর্তিপূজা বিরোধী মনোভাব ছিল। সুলতানি আমলেও প্রথম দিকে বৌদ্ধ বিহার ও মন্দির ধবংসের ঘটনা কমবেশি ঘটে থাকলেও জোর জুলুম করে হিন্দু প্রধান বাংলায় রাজ্যশাসন স্থায়ী হবে না তা তারা বুঝেছিলেন। এছাড়া গোটা দেশ জুড়ে ছিল ছোট বড় হিন্দু রাজা ও জমিদার। তাদের বশে না-রাখতে পারলে ভূমি রাজস্ব পাওয়া যাবে না। এ কারণে সুলতানি শাসনের পরবর্তীকালে শাসকগণ ধর্ম প্রচারে উৎসাহিত ছিলেন না। বাংলায় ইসলাম ধর্মের বিকাশে যত মতবাদই থাক না কেন এদেশে মুসলিম শাসনের প্রাক্কালে আরব, তুরস্ক, ইরাক থেকে যে সংস্কৃতির প্রবাহের ঢেউ এসে ধাক্কা দেয় তা ধীরে ধীরে বাংলার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ে। একথা কোনো ইতিহাসবিদ অস্বীকার করতে পারবেন না। একথা ঠিক যে, কোনো অঞ্চলে সভ্যতার উন্মেষ ঘটলে তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ‍উভয় প্রভাব সর্বত্র ছড়েয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে প্রত্যক্ষভাবে মুসলমান বিজয়ীরা মুসলিম সংস্কৃতির বিকাশ বঙ্গে ঘটেয়েছিল। তবে প্রথম দিকে তা ফরিদপুর অঞ্চলে বা পূর্ববঙ্গে ঘটেনি। পূর্ববঙ্গ তখনও মুসলিম শাসনের আওতায় আসে নাই। ১২৭৫ খ্রি. সুলতান মুগীস উদ্দিন তুগরিল দিল্লীর বশ্যতা অস্বীকার করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং নিজ নামে খুৎবা পাঠ এবং মুদ্রা চালু করেন। তিনি পদ্মা নদীর দুই তীরবর্তী অঞ্চলে বিশেষ করে বর্তমান রাজবাড়ি ফরিদপুর এবং ঢাকা জেলার পশ্চিম-দক্ষিণাংশের উপর কর্তৃত্ব স্থাপন করেন।

সুলতান রুকুনউদ্দিন বরবক শাহের পুত্র শামসুদ্দিন ইউসুফ শাহ (১৪৭৪-১৪৮১) সাত বছর বাংলা শাসন করেন। ইউসুফ শাহের মৃত্যুর পর তার পুত্র সিকান্দার শাহকে (১৪৮১) সরিয়ে রুকুনউদ্দিন বরবক শাহের ছোট ভাই ফতেহ শাহ (১৪৮১-১৪৮৯) ক্ষমতা দখল করেন। ফতেহ শাহর সময়ে গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, ফুলেশ্বরী, ইদিলপুর, রাজবাড়ি মোগল শাসকরা বসতি স্থাপন করে। ১৪৮৭ থেকে ১৪৯৩ হাবশী ক্রীতদাসগণ বাংলা শাসন করেন। এ সময় ছিল অশান্তির যুগ। ১৪৯৩ খ্রিস্টাব্দের সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ লক্ষ্ণৌতে তথা বাংলার সিংহাসনে আসিন হন। তার সময়েই ফতেহবাদ অঞ্চল সরাসরি মুসলমানদের অধিকারে আসে। ফতেহবাদ অঞ্চলকে নুশরতশাহী, মাহমুদশাহী, ইউসুফশাহী ও মাহমুদাবাদ নামকরণ করেন। এরমধ্যে রাজবাড়ি নশরত শাহী ও ফতেহাবাদে অন্তভুক্ত হয়। (পরগনা হিসেবে রাজবাড়ি নুশরতশাহী দেখা যায়।) সুলতানি শাসনকালে প্রায় ২০০ বছর ফতেহাবাদ উল্লেখযোগ্য শাসন কেন্দ্রে পরিণত হয়। ফতেহবাদ টাকশালি থেকে মুদ্রা উত্তোলন হত। দীর্ঘকাল ও অঞ্চল মুসলিম শাসনাধীন থাকায় ইসলামের প্রসার ঘটাই স্বাভাবিক। এরমধ্যে হুসেন শাহের বংশের রাজত্বকাল ১৪৯৩-১৫৩৮। সুদীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর রাজত্বকালে হুসেন শাহ ও তার পুত্র নশরত শাহ ইসলাম ধর্ম প্রচারে অনেক মসজিদ নির্মাণ করেন। নশরত শাহের নির্মিত গৌড়ের সোনা মসজিদ, কদম-রসুল মসজিদ, বার দুয়ারী মসজিদ স্মৃতিস্বরুপ ইসলাম প্রসারের দৃষ্টান্ত বহন করে। ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী থানায় অবস্থিত সাতৈর মসজিদ তাঁর কীর্তি (ফরিদপুরের ইতিহাস, আনম আবদুস সোবহান, পৃষ্ঠা-৩৬)। নশরত শাহ ও তাঁর পিতা হুসেন শাহ প্রজাহিত কাজ ও ইসলাম প্রচারে আরো মসজিদ সরাইখানা নির্মাণ করেন। রাজবাড়ি অঞ্চলটি ফতেহাবাদ, নশরতশাহী এবং মাহমুদাবাদের অংশবিশেষ। রাজবাড়িতে কালুখালির অদূরে ‘রুপসা গায়েবী মসজিদ’, সূর্যনগরের নিকটবর্তী ‘বাগমারা গায়েবী মসজিদ’, আলাদীপুর ইউনিয়নের ‘শিঙ্গা গায়েবী মসজিদ’ নামে ৫০০-৭০০ বছরের পুরানো এসকল মসজিদের ধবংসাবশেষ এখনো দেখা যায়। এ বিষয়ে পরে আলোচনা করা যাবে। মসজিদগুলি হুশেণী বংশের রাজত্বকালে নির্মিত।

তুর্কি শাসনের শুরু থেকে বাংলায় মোগল শাসনের পূর্বকালে প্রায় ৪০০ বছর ধরে ধীরে ধীরে বঙ্গে ইসলাম প্রসার লাভ করেছে। এ প্রসারের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে (১) মুসলমানদের শাসন প্রভাব ও পৃষ্ঠপোষকতা (২) ধর্মে মূর্তির বদলে অমূর্তের আদর্শে জোরপূর্বক হিন্দু দেবদেবী ধবংস (৩) পীর আউলিয়াদের ধর্ম প্রচারে স্বেচ্ছায় ধর্মান্তরিত হওয়া ইত্যাদি। রামাই পণ্ডিতের শূন্য -পূরাণে ইসলাম ধর্মের প্রসারের চিত্র এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

যথেক দেবতাগণ/ সভে হৈয়্যা একমন/ আনন্দেতে পরিলা ইজার/ ব্রাহ্মহৈল্যা মহামদ/ বিষ্ণু হইলা পেকাস্বর/ অদম্ফ হইল্যা শুলপানি। গণেশ গাজী/ কাত্তিক হইল্যা কাজী। ফকীর হইল্যা যথামুনি তেজিয়্যা আপন ভেক/ নারদ হইল্যা শেক, পুরন্দর হইল্যা মওলানা। আপনি চণ্ডিকা দেবী/ তিহ হইল্যা হায়া বিবি/ পদ্মাবতী হইল্যা বিবিনুর। যথেক দেবতাগণ/ সভে হয়্যা একমন/ প্রবেশ করিলা জাজপুর। দেউল দোহারা ভাঙ্গে/ ক্যাড়া ফ্যিড়া খায় বঙ্গে/ পাখর পাখর বলে বোল।

এখানে জাজপুরের মন্দিরে প্রবেশ করে দেবতাদের মূর্তি ভাঙ্গার যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে তা সুলেমান কারবানীর সেনাপতি কালাপাহাড়ের মন্দির তছনছ করার ঘটনা। সে ঘটনা ঘটে ২৫৬৮তে। তবে এ কাব্য রচিত হয় কালাপাহাড় কিংবদন্তিতে পরিণত হওয়ার পর। হয়ত সপ্তদশ শতকের কোনো এক সময়ে। ফলে সত্যের সঙ্গে অতিরঞ্জন মিশে গেছে। বঙ্গদেশে ইসলাম ব্যাপকভাবে প্রচারিত ঠিকই কিন্তু দেবতারা সবাই এক হয়ে রাতারাতি মুসলমান হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিলেন তা ঠিক নয়। বরং ধারণা করা সঙ্গত হবে যে ইসলাম ধর্ম তড়িৎগতিতে নয়, পূর্ববঙ্গসহ বাংলার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল ধীরে ধীরে । তবে উক্ত চিত্র থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে মোগল শাসনের পূর্ব পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণির হিন্দু ইসলামের দীক্ষাগ্রহণ করেন। কেবল হিন্দু নয় এ অঞ্চলে ব্যাপকহারে বৌদ্ধদের বসবাস ছিল। বৌদ্ধরাই বেশি হারে ইসলাম গ্রহণ করে।

অনেক খ্যাতনামা সাহিত্যিকদের লেখায় ‘ন্যাড়া’ ‘যবন’ ইত্যাদি শব্দ পাওয়া যায়। বালিয়াকান্দি ও পাংশা এলাকায় ‘নম’; ও ‘নাড়ে’ বিপরীতমূখী দুটি কূট শব্দ সাধারণ্যে ব্যবাহর হয়। শব্দ দুটি অপমানজনক শব্দ বলে উভয় সম্প্রদায় মনে করে। এ নিয়ে অতীতে কাইজা ফ্যাসাদ ঘটত। মূলত ন্যাড়া থেকে না’ড়ে শব্দটি উদ্ভুত। বর্তমানে অন্য ধর্মের কেহ ইসলাম ধর্মগ্রহণ করলে তাকে নওমুসলিম বলা হয়। অনুরুপ ত্রয়োদশ, চতুর্দশ শতকে বৌদ্ধরা ইসলাম গ্রহণ করলে তাকে ন্যাড়া মুসলমান বলা হত। পরবতীতে স্পর্শকাতর ন্যাড়া বা না’ড়ে বলে মুসলমানদের উপহাস করা হত। ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে বাংলায় ইসলাম ধর্মের দ্রুত বিস্তার ঘটতে থাকে। এর ফলে দলে দলে দেশীয় লোকেরা অর্থাৎ বাঙালিরা ইসলাম ধর্মগ্রহণ করে। বর্ণহিন্দুদের নির্যাতন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ও নিম্নবর্ণের হিন্দুরা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়ে বাংলার মুসলমান সমাজকে বিরাট আকার প্রদান করে। বাংলাদেশের মুণ্ডিত মস্তক বৌদ্ধদের প্রায় পুরো অংশটিই মুসলমান হয়ে যাওয়ার কারণে উচ্চ বর্ণের হিন্দুরা মুসলমানদের নেড়ে বলে অভিহিত করেন। বঙ্কিমচন্দ্র এই নেড়ে শব্দ তার আনন্দমঠ উপন্যাসে মুসমানদের জন্য ব্যাবহার করেছেন।

রাজবাড়িতে ১৩৩৭ সালে বালিয়াকান্দি উপজেলার জঙ্গল ইউনিয়নের নমঃশুদ্র হিন্দু ও নাড়ুয়া ইউনিয়নের মুসলমানদের মধ্যে গরু  কোরবানী নিয়ে ব্যাপকাকারে  এক কাইজা বাঁধে। এ নিয়ে সে সময় এক গ্রাম্য সায়ের রচিত হয় সায়রের কিঞ্চিত নিম্নরুপ———

সন ১৩৩৭ সাল ৮ই জ্যৈষ্ঠ শুক্রবার

নমঃ সাথে বাধলোরে গোলমাল

দেশে এলোরে জঞ্জাল।

আজকে না’ড়ে পড়ছো ফেরে, ও শরকীর আগায় নেব জান

না’ড়ে খাব ভাতে দিয়ে কাঁদিবে তোর যতেক মুসলমান।

এরুপ না’ড়ে শব্দের গণব্যবহারে ধারণা করা যায় এ অঞ্চলের মণ্ডিত মস্তক বৌদ্ধরা বিপুলাকারে মুসলমান ধর্মে দীক্ষিত হয়। ১৮ শতকে বঙ্গে মুসলমানের সংখ্যা হিন্দুর সংখ্যা ছাড়িয়ে যায়। অবশ্য মোগলরা ইসলাম প্রচারে উদাসীন ছিলেন। তা সত্ত্বেও ইসলাম প্রসারের কারণ কী? এ বিষয়ে কয়েকটি কারণ নির্দেশ করা যাবে। প্রথমত মোগল শাসনকালে বাংলায় মুসলিম আধিপাত্য বৃদ্ধি পায়। মোগল শাসকদের মধ্যে অনেকে স্থায়ী বসতি স্থাপন করে। এছাড়া সেনাপতি, দেওয়ান, ফৌজদার, আমলা, কর্মচারী অনেকে স্থায়ী বসতবাড়ি গড়ে তোলে। তাদের শাসনকালে অনেকে ব্যাবসা, বাণিজ্য, জমিদারী কর্তৃকত্ব গ্রহণ করে। ১৫৭৪ সালে সম্রাট আকবর মোরাদ খাকে বাংলা অধিকারে পূর্ববঙ্গ পাঠান। আকবরনামায় দেখা যায় তিনি ফতেহাবাদ (ফরিদপুর) বা সরকার বাকলা বা বাকের গঞ্জকে আকবরের রাজ্যভুক্ত করেন। সুবাদারগণ ফরিদপুর শহরের তের মাইল উত্তর পশ্চিমে বর্তমান রাজবাড়ি সদর থানার অন্তর্গত খানখানাপুর গ্রামে বসবাস করতেন। মাত্র ছয়বছর রাজত্বের পর তিনি পরলোকগমন করেন। (আসকার ইবনে শাইখ, বাংলার শাসনকর্তা, পৃষ্ঠা-৩৩)। এরুপ অনেকেই বঙ্গে থেকে যান।

দ্বিতীয় যে বিশেষ কারণ তা হল পীর, আউলিয়া, দরবেশ ধর্মপ্রচারদের আগমন, স্থায়ী বসতি এবং ধর্ম প্রচার। সুলতানি আমল থেকে পীর দরবেশ আগমন করেন। তাদের সংখ্যা ছিল কম। চৌদ্দ শতকের সবচেয়ে উল্লেখ্য পীর ও ধর্ম প্রচারক হলেন হযরত শাহ জালাল (১৩৪৫)। খুলনায় পীর খানজাহান আলী (১৪৫৯)। যোদ্ধার বেশে এসে পীর খানজাহান আলী পীর পরিচিতিতে পরিচিত হন। তিনি যশোর, খুলনা জয় করে খলিফাতাবাদ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং ইসলাম প্রচার করেন। এরপর  দিনাজপুরে ইসলাম প্রচার করেন সাহ বদরুদ্দিন পাবনায়, মখদুম শাহ দৌলা , ঢাকায় শাহ আলী বাগদাদী, ফরিদপুরে  ফরিদ উদ্দিন (শেখ ফরিদ) নোয়াখালিতে আহমদ নবী এবং চট্রগ্রামে বদর শাহ। এরপর দলে-দলে আগমন করেন সূফী দরবেশ, পীর ও ফকীর। তাঁরা আবার ছিলেন বিভিন্ন তরীকাভুক্ত যেমন চিশতিয়া, কালান্দরিয়া, মাদারিয়া, কাদেরিয়া, নখশাবন্দিয়অ, আহমদিয়া ইত্যাদি।

ধর্মচেতনা, ধর্মপালন আমাদের জীবন ব্যবস্থায় নিত্যসঙ্গী। হাজার হাজার বছর ধরে বংশ পরস্পরায় মানব জাতি ধর্মাচরণে অভ্যস্থ। পৃথিবীতে যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ধর্ম সংস্কৃতির ছায়ায় মানুষ বসবাস করছে সে সব ধর্মের বিকাশ ঘটেছে খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৫০০ শত বছর পূর্বে ও পরে। এ সময়ের মধ্যে হিন্দু ধর্ম রামায়ণ, মহাভারত, ‍উপনিষদ, পুরাণ, উপপুরাণভিত্তিক স্বকীয় সত্ত্বা লাভ করে। গৌতম বুদ্ধ, যিশুখ্রিস্ট এবং হযরত মুহম্মদ (সঃ) এর আবির্ভাব এ সময়ের মধ্যে। যুগে যুগে সর্ব ধর্মই নানা ভাগে বিভক্ত হয়েছে, নানা কুসংস্কারে আটকে গেছে। বঙ্গে ইসলামের যে স্বচ্ছ ধারাটি প্রায় ৫০০ বছর ধরে চলে আসছিল উপনেবেশিক ইংরেজ শাসনকালে বিশেষ করে উনবিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকে বিংশ শতাব্দীর সংস্কার আন্দোলন পর্যন্ত তার হাল বেহাল হয়ে পড়ে। ১৯২৬ সালের ‘রওশন হেদায়েত’ পত্রিকায় এ সম্বন্ধে যা লেখা হয়েছিল তা থেকে তৎকালীন ধমীয় অবস্থার মুসলমানদের আভাস পাওয়া যায়——

 বহু নাদান মোছলমান কালী পূজা, দুর্গাপূজা, লক্ষী পূজা, সরস্বতী পূজা, বাসন্তি পূজা, চড়ক পূজা, রথ পূজা পাথর পূজা, দরগা পূজা, কদর পূজা, মানিকপীর পূজা, মাদারবাঁশ পূজা, ইত্যাদিতে যোগদান করে শেরেকের মন্ত্রতন্ত্র ব্যবহার করে, কালী, দুর্গা, কামগুরু কামাক্ষা ইত্যাদি নামের দোহাই দেয়, ইত্যাদি শরিয়ত গর্হিত কার্য করতঃ অমূল্য ইমানকে হারাইয়া কাফেরে পরিণত হইয়া জাহান্নামের পথ পরিস্কার করিতেছে। (হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি, গোলাম মুরশিদ)

উনিশ শতকে বঙ্গের মুসলমান কেবল গোত্র এবং নামেই নয় কাজকর্মেও তারা অধমে পরিণত হয়। যে মুসলমান জাতি শত শত বছর ধরে রাজা বাদশার জাতি বলে গৌরবান্বিত, মাত্র শত দেড়শত বছরের মধ্যে তাদের সামাজিক অবস্থান একেবারে পিছন কাতারে পৌঁছে গেছে। প্রায় শতভাগ মুসলমান নিম্ন বুদ্ধিজীবী, কুলি, নৌকাবাহক, পালকিবাহক, গাড়িয়াল, তেলি, কুলু, বেদে, মুটে, মজুরও জমিদারের আজ্ঞবাহকে পরিণত হল। মুসলমানদের এ দুরাবস্থার বিষয়ে ঐতিহাসিকগণ সাধারণভাবে ইংরেজি না শেখা ইংরেজদের থেকে দূরে থাকার নীতিকেই দায়ী করেন। তবে গবেষকগণ এর সাথে আরো অনেক কারণ নির্দেশ করে থাকেন। মূলত সুলতান, পাঠান ও মোগল শাসনকালে ‍সুদীর্ঘ প্রায় ৪০০ শত বছরে বঙ্গের সুলতানদের মধ্যে জাতিস্বত্ত্বার বিকাশ ঘটেনি যা হিন্দুদের মধ্যে ৭ম/৮ম শতকে ঘটেছিল। ভাগ্য-বিড়ম্বনায় ভারত তথা বঙ্গের হিন্দু মুসলিম বৃটিশ শাসনাধীনে থাকলেও শিক্ষা, সাহিত্য, রাজকাজ থেকে মুসলমানেরা দূরে ছিল। এদিকে মোগল শাসনকালে মুসলিম শাসকরা দিল্লী সালতানাতের ঐশ্চর্য বৃদ্ধিতেই ব্যস্ত থাকতেন, প্রজাপালনে নয়। এদিকে বৃটিশ শাসনকালের প্রারম্ভে বাবু ও ভদ্রলোক শ্রেণির নামকরণে একটি শ্রেণির উদ্ভব ঘটে যারা দ্রুত উচ্চ শ্রেণিতে পরিণত হয়। প্রথমত এই বাবু ভদ্রলোক শ্রেণির উন্মেষ কলিকাতা কেন্দ্রীক থাকলেও ধীরে ধীরে তা সারা বঙ্গের বাবু কালচারে পরিণত হয়।

তৎকালীন অঞ্চল বিশেষ রাজবাড়ির মুসলমানদের অবস্থা ত্রৈলোক্যনাথের লেখা ‘রাজবাড়িতে একটি মুসলমান সভা থেকে ধারণা পাওয়া যায়——-

‘১৯১২ বা ১৯১৩ সালে রাজবাড়িতে এক মসলমান সভায় সমবেত শ্রোতাদের সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। কিছু হিন্দুও যোগ দিয়েছে। সংখ্যা বিশ পঁচিশ। চট্রগ্রাম থেকে এসেছেন একজন মওলানা, সাথে কয়েকজন মৌলবি। মওলানা সাহেব ওয়াজ করছেন—-দেখ ভাইসব, ইংরেজ নহে হিন্দুরাই আমাদের উপর রাজত্ব করছে। ছোট বড় সরকারি কাজে হিন্দুদেরই প্রাধান্য। আমরা কয়জন পাই? আমরা নাকি অশিক্ষিত, মূর্খ। এখন হইতে তোমরা সজাগ হও। হিন্দুর বাড়ি চাকরি করতে যাবে না। ঘরামির কাজে যাবে না। হিন্দুর ভাত খাবে না ইত্যাদি। ঐ সভায় রাজবাড়ির দুই নামকরা মোক্তার গোবিন্দ চন্দ্র রায় ও চন্দ্রনাথ লাহিড়ী উপস্থিত ছিলেন। গোবিন্দ রায় ছিলেন হাস্যরসিক ও স্পষ্টভাষী। তিনি মওলানা সাহেবকে সম্বোধন করে বললেন শ্রদ্ধেয় মওলানা সাহেব, আপনি আমাদের যে যে উপদেশ দিলেন শুনিলাম। কিন্তু আপনার বোধ হয় ভুল হইয়া গিয়াছে আর একটি উপদেশ দিতে। আপনার বলা উচিত ছিল ‘হিন্দু বাড়ি চুরি করতেও যাইবে না’ তাহা হইলে আমরা অনেকটা নিশ্চিন্ত হইতে পারিতাম। দেখুন আমি মোক্তারী করি এই মহকুমায় যত মোকদ্দমা হয় দেখিতে পাই আসামী শ্রেণিতে মুসলমানই সংখ্যায় বেশি। অবশ্য হিন্দুর মধ্যেও বাগদী, ডোম, মুর্দাফরাস কিছু কিছু আছে। আমাদের এই অঞ্চলের মুসলমানেরা বড় গরীব তারা হিন্দুদের বাড়ি কাজ কর্ম  করিয়া দুধ বেচিয়া কোনো রকমে সংসার চালায়। মুসলমানদের অনেকেরই অনটনের সংসার। টাকার দরকার হইলে হিন্দু মহাজনের শরনাপন্ন হয়। তারপর ধান পাট জন্মাইলে বিক্রয় করিয়া দেনা শোধ করে।’ (আমার স্মৃতিকথা, ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্য, পৃ-১০১)

এ থেকে রাজবাড়িতে তৎকালীন মুসলমানদের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

শিক্ষা, সচেতনতা ও স্বাজত্ববোধ কোনো জাতি বা গোষ্ঠীর মুক্তির অনিবার্য শর্ত। ইংরেজ শাসনকালে মুসলমানদের পশ্চাৎপদতার অন্যতম কারণ শিক্ষার অভাব। ইংরেজ শাসনের শুরু থেকেই মুসলমানের ইংরেজি ও পাশ্চাত্য শিক্ষাকে পাপ মনে করে তা বর্জন করে। মুসলমানদের পুনর্জগরণ এবং চেতনা বিকাশের লক্ষ্যে আঠারো শতকের শুরু থেকে সৈয়দ আহম্মেদ, তিতুমীর নেতৃত্ব  দেন। উনিশ শতকে এনায়েত আলী, কেরামত আলী, তরীকায়ে মোহাম্মাদিয়া (মোহাম্মদের পথ) আন্দোলনের নামে শুদ্ধ পথে ধর্ম প্রচারের বন্যা বইয়ে দেন। ২৪ পরগনা, যশোর, ফরিদপুর, রাজশাহী, নোয়াখালি, ঢাকা এলাকায় তা ব্যাপক প্র্রসার লাভ করে। ফরিদপুরের কাজী শরিয়তুল্লাহ (১৭৮১-১৮৪০) ফরায়েজী আন্দোলনের নামে কোর-আন শিক্ষা বা ফরজ পালনে জোর তৎপরতা চালান। এসময় অনেক ফরায়েজী পণ্ডিত রাজবাড়ির মানুষের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি করেন। হাজী শরিয়তুল্লাহর ছেলে পীর দুদু মিয়া কোরআন সুন্নাহভিত্তিক শুদ্ধি আন্দোলন এবং নীলবিদ্রোহে নেতৃত্ব দান কালে সোনাপুরের হাসেম আলীসহ শত শত মুসলমান তার অনুগামী হয়ে ওঠেন। ফরিদপুরের নওয়াব আব্দুল লতিফ ১৮৬৩ সালে মুসলমানদের সুসংগঠিত করার ‍উদ্দেশ্যে ‘মোহামেডান লিটারেরী সোসাইটি’ স্থাপন করেন। কলিকাতাভিত্তিক এ সংগঠনে যোগদান করেন পদমদির (রাজবাড়ি) নবাব মীর মোহাম্মদ আলী। মীর মোহাম্মদ আলী কুষ্টিয়া ও পদমদিতে দুটি ইংলিশ স্কুল স্থাপন করেন। এরমধ্যে পদমদিতে ১৮৫০ এর মাঝামাঝি প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি রাজবাড়ি জেলায় স্থাপিত প্রথম মাইনর ইংলিশ স্কুল।

ঊনিশ শতকের শেষে প্রথম মুসলিম সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেনের বিষাদ সিন্ধু প্রকাশ পায়। গ্রন্থখানার মর্মবাণী মুসলমানদের হৃদয় মথিত করে। রাজবাড়ি শিক্ষিত পরিবারে গ্রন্থটির পাঠ গঠন চলতে থাকে। ইমাম হোসেন এর বিয়োগান্তক অংশটি দল বেঁধে আসা শ্রোতার চোখে অশ্রু ঝরায়। নিরক্ষর গ্রাম্য চাষীরা ইসলামের গৌরব অনুভব করে। এসব তাদের স্বাজাত্য বোধে উদ্ধুদ্ধ করে। এছাড়া তিনি লেখেন মুসলমানদের বাঙ্গালা শিক্ষা-প্রথম ভাগ, এসলামের জয়, জমিদার দর্পণ, কুলসুম জীবনী ইত্যাদি। এসব গ্রন্থ পাঠে অত্র অঞ্চলের মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার অনুরাগ বৃদ্ধি করে। বিশেষ করে মোসলমানদের বাঙ্গালা শিক্ষা গ্রন্থখানি বাংলা ভাষা শিক্ষা এবং ইসলামী মূল্যবোধের প্রসার ঘটায়। মীর মশাররফ হোসেনের সমসাময়ীক কালে পাংশায় রওশন আলী চৌধুরী ‘কোহিনুর’ পত্রিকা প্রকাশ করেন ( ১৮৯৮)। তৎকালীন সময়ের অতি আলোচিত এই পত্রিকায় মুসলিম জাগরণের পুরোধা পুরুষ  কবি কায়কোবাদ, কবি মোজাম্মেল হক, শেখ ফজলুল করিম, মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, এয়াকুব আলী চৌধুরী প্রমুখ। অত্র অঞ্চলের মুসলমান জাগরণ, সংগ্রাম ও সচেতনাত বৃদ্ধিতে পত্রিকাটি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে।

ঊনিশ শতকের শেষে রাজবাড়িতে প্রথম গ্রাজুয়েট আলীমুজ্জামান চৌধুরী। তিনি ছিলেন অত্র এলাকার সমাজসেবক ও প্রজাহিতৈষী জমিদার। ফরিদপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান।তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলমান সমাজ অগ্রগামী হয়।

বিশ শতকের শুরু থেকে বৃটিশ শাসনের অবসানকাল পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত বছরে রাজবাড়ির মুসলমান সমাজ শিক্ষা-দীক্ষাসহ সামাজিক ও আর্থিক ভিত সুদৃঢ় করে তোলে। এ সময়ের কিছু পূর্ব থেকে অত্র এলাকার প্রথম ইংরেজি উচ্চ বিদ্যালয় রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশন এবং এর ৪ বছর পর ১৮৯২ সালে গোয়ালন্দ মডেল হাই স্কুল (বর্তমান সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয়) স্থাপিত হওয়ায় গরিব মুসলমান সম্প্রদায় শিক্ষিত হয়ে উঠতে থাকে। স্থানীয় জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতা এবং স্থানীয় হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়ের উৎসাহে খানখানাপুর সুরুজমোহনী হাই স্কুল, বালিয়াকান্দি হাই স্কুল, পাংশা জর্জ হাইস্কুল, নলিয়া জামালপুর হাইস্কুল, গোয়ালন্দ নাজির উদ্দিন হাই স্কুল, বেলগাছি আলীমুজ্জাম হাই স্কুল, হাবাসপুর হাই স্কুলসহ অনেক উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। মুসলমান ছাত্রদের মধ্যে মৌলবী তমিজ উদ্দিন খান, এয়াকুব আলী চৌধুরী, কাজী মোতাহার হোসনে, কাজী আব্দুল ওদুদ, খোন্দকার নাজির উদ্দিন আহমেদ (খাতক পত্রিকার সম্পাদক) ডা. কেএস আলম,  ব্যারিস্টার শেলী, প্রিন্সিপ্যাল কেতাব উদ্দিন আহম্মেদ, আহমদ আলী মৃধা, ফখর উদ্দিন আহমেদ, কাজী আবুল কাশেম, কাজী আব্দুল মাজেদ, ডা. একে এম আসজাদ, ইউসুফ হোসেন চৌধুরী, এবিএম নুরুল ইসলাম, অধ্যাপক আব্দুল গফুর, এ্যাডভেকেট আব্দুল জলিল, এ্যাডভোকেট আবুল কাশেশ মৃধা, খলিল উদ্দিন জজ সাহেব, তোফাজ্জেল হোসেন জজ সাহেব প্রমুখ উচ্চ শিক্ষিত মুসলমান ছাত্র অঞ্চলভিত্তিক ও জাতীয় উন্নয়নে স্ব-স্ব ভূমিকা রাখেন।

১৯৪৭ সালে বৃটিশ শাসনের অবসানে পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে। ভারতের সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলমান এলাকা নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়। এ সময় পূর্ব-পাকিস্তানের অন্যান্য এলাকার মতো জমিদার শ্রেণিসহ অনেক হিন্দু পরিবার স্থায়ীভাবে রাজবাড়ি ত্যাগ করে। অন্যদিকে ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ মোহাজের ও অবাঙালি বিহারী মুসলমানের অভিবাসন ঘটে। তার স্থায়ীভাবে রাজবাড়ি শহর ও পল্লী এলাকায় স্থায়ী বসতি গড়ে তোলে। ১৯৬০ এর দশকের শুরুতে নোয়াখালি ও কুমিল্লা থেকে অনেক মুসলমান পরিবার রাজবাড়ির বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে বাণীবহ, বহরপুর, রামদিয়া, সোনাপুর বসতি স্থাপন করে। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর ভারত থেকে অনেক মোহাজের মুসলমান রাজবাড়ি বিসিক এলাকায় বসতি গড়ে তোলে। কালপ্রবাহে স্বাধীন দেশের রাজবাড়ির মুসলমান অসাম্প্রাদায়িক চেতনায় শিক্ষিত ও মর্যাদাশীল সম্প্রদায় হিসেবে বিবেচিত।

গোয়ালন্দের অকাল মৃত্যু

মহকুমা গোয়ালন্দের অকাল মৃত্যু

অবিভক্ত ভারতে ভৌগলিক ও প্রশাসনিক কারণে থানা ও মহকুমার আন্তঃসমন্বয় ঘটেছে বারবার। ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার কর্তৃক ১৮৭৭ সালে প্রকাশিত ‘অ্যা স্ট্যাটিস্টিক্যাল একাউন্ট অফ বেঙ্গল (ভলিউম-৫)’ পর্যালোচনায় দেখা যায়, ফরিদপুর সদর ও গোয়ালন্দ মহকুমা দুটির সমন্বয়ে ছিল ফরিদপুর জেলা এবং গোয়ালন্দ, বেলগাছি ও পাংশা এই তিনটি থানার সমন্বয়ে ছিল গোয়ালন্দ মহকুমা (সাব-ডিভিশন)।

১৯২৩ সালে প্রকাশিত বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার (ফরিদপুর) অনুসন্ধানে দেখা যায়, ফরিদপুর সদর, গোয়ালন্দ, গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুর—এই চারটি মহকুমার (সাব-ডিভিশন) সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে ফরিদপুর জেলা। আর গোয়ালন্দ ঘাট, পাংশা, বালিয়াকান্দি ও গোয়ালন্দ—এই চারটি থানার (উপজেলা) সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে গোয়ালন্দ মহকুমা (সাব-ডিভিশন)। গোয়ালন্দ মহকুমার সর্বমোট আয়তন ছিল তখন ৪৪৩ বর্গ মাইল এবং জনসংখ্যা ৩,২৮,২১৯ জন। আর গোয়ালন্দ ঘাটের আয়তন তখন ৫০ বর্গমাইল এবং জনসংখ্যা ৪৩,২৮৬ জন। মহকুমা সদর দপ্তর ছিল গোয়ালন্দ থানা।

 

বিদ্যমান প্রশাসনিক কাঠামো অনুযায়ী ব্রিটিশ আমলে কয়েকটি থানা নিয়ে একটি মহকুমা গঠিত হত এবং কয়েকটি মহকুমা নিয়ে একটি জেলা গঠিত হত। মহকুমা হিসেবে গোয়ালন্দের মর্যাদা লাভ ১৮৭১ সালে। কলকাতা হতে যে প্রধান লাইনটি গোয়ালন্দ ঘাটে এসে শেষ হয় তা ছিল পদ্মা নদীর টার্মিনাল স্টেশন। তবে এটি কখনই স্থায়ী ঘাট হিসেবে গণ্য হয়নি। কেননা নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে প্রায়ই ঘাট পরিবর্তন করতে হত। উদ্বোধনের প্রায় ৩০ বছরের মধ্যে ১০ বার এর স্থান পরিবর্তন করতে হয়। ১৯১৩ সালে প্রকাশিত ‘ফ্রম দ্যা হুগলী টু দ্য হিমালয়েজ’ হতে জানা যায়, ‘ফরমারলি গোয়ালন্দ ওয়াজ সিচুয়েটেড এক্সেক্টলি অ্যাট দ্য জাংশন অফ দ্য রিভার্স পদ্মা এন্ড ব্রম্মপুত্র, এন্ড লার্জ সামস ওয়্যার স্প্যান্ট ইন প্রটেক্টিং দ্য সাইট ফ্রম ইরোসন; বাট ইন এইটিন সেভেন্টিফাইভ দ্য স্পার ওয়াজ ওয়াসড অ্যাওয়ে, এন্ড সিন্স দ্যাট ডেইট দ্য টার্মিনাস হ্যাজ কন্সটেন্টলি বীন অন দ্য মোভ, উইথ দ্য রেজাল্ট দ্যাট ইট ইজ নাও টু বি ফাউন্ড এবাউট সেভেন মাইলস সাউথ অফ ইটস ফরমার পজিশন। দিস বিং দ্য কেইস দেয়ার আর নো পার্মানেন্ট ল্যান্ডিং স্টেইজেস’। ঘাটের ভাঙ্গন এবং ঘাট রাজবাড়ি শহরের অদূরে অবস্থিত হওয়ায় রেলের সকল স্থাপনা রাজবাড়িতে গড়ে উঠে। গোয়ালন্দ মহকুমা ও থানার প্রশাসনিক কাজ সম্পাদিত হত রাজবাড়ি থেকে।

কালের পরিক্রমায় একদিকে পলি জমে সংকুচিত হয়েছে নদীপথ, অন্যদিকে বিস্তৃত হয়েছে রেলের নেটওয়ার্ক। ইস্টার্ণ বেঙ্গল রেলওয়ে এবং আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের পাশাপাশি এগুলোকে সংযুক্ত করে গড়ে ওঠে ঢাকা-ময়মনসিংহ স্টেট রেলওয়ে, বেঙ্গল সেন্ট্রাল রেলওয়ে, নর্দার্ন বেঙ্গল স্টেট রেলওয়ে, বেঙ্গল ডুয়ার্স রেলওয়ে কোম্পানী। শিয়ালদহ থেকে চট্টগ্রাম মেইল ছাড়ত সকালবেলায়। কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের লোকেরা সাধারণত চট্টগ্রাম মেইলে যাতায়াত করতেন। অনেকে চাঁদপুর থেকে আবার আসাম মেইল ধরতেন।

কমরেড মুজফফর আহমদ‍ এর লেখা ‘কাজী নজরুল ইসলামঃ স্মৃতিকথা’ তে ঢাকা মেইলের বর্ণনা মিলে। তিনি উল্লেখ করেছেন-‘১৯২১ সালে রেলওয়ে ও স্টীমারের ভাড়া অত্যন্ত কম ছিল। তাছাড়া আমরা থার্ড ক্লাসের হিসাব করছিলাম। কলকাতা হতে আমি রাত্রের ঢাকা মেইলে রওয়ানা হয়েছিলেম। কারণ সকালের চাটগাঁ মেইলে গেলে চালু স্টীমারখানা পাওয়া যেত না।’ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘ঢাকা মেইল’ এর বগিগুলো ছিল লাল রঙের। নারায়নগঞ্জ থেকে মেইল স্টিমার ভোর ছয়টা-সাড়ে ছয়টার মধ্যে গোয়ালন্দে পৌঁছে যেত। স্টিমারের যাত্রী এবং মাছের বগি নিয়ে সকাল সাতটায় ঢাকা মেইল গোয়ালন্দ থেকে শিয়ালদহের উদ্দেশ্য ছেড়ে যেত। দর্শনায় কাষ্টম চেকিং হত। শিয়ালদহ স্টেশন পৌঁছে যেত দুপুর দেড়টা-দুটোর মধ্যেই। আবার শিয়ালদহ থেকে ছেড়ে আসা ঢাকা মেইলটি গোয়ালন্দ এসে পৌঁছাত রাত নয়টার মধ্যে। পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়ের বগিগুলো ছিল সবুজ রঙের। বগিগুলোর গায়ে লেখা থাকত ইবিআর।

 

১৯৬১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি হতে লেখা হত ইস্ট পাকিস্তান রেলওয়ে (ইপিআর)। বগিগুলো ছিল চার শ্রেণীর। ফার্স্ট ক্লাশ, সেকেন্ড ক্লাশ, ইন্টার ক্লাশ এবং থার্ড ক্লাশ। শুধু নারীদের বসার জন্য ভিন্ন বগির ব্যবস্থা ছিল। সেখানে উর্দুতে লেখা থাকত ‘জেনানা’। ইন্টার এবং থার্ড ক্লাশের বগিতে চার সারিতে বসার বেঞ্চ থাকত। দুই দিকে জানালার পাশে দুই সারি এবং মাঝখানে পিঠাপিঠি দুই সারি। সব বগি সমান আকারের হত না। কোন কোন বগি আকারে বড় হত। বগির ভেতরে ‘৪০ জন বসিবেক’, ‘২৮ জন বসিবেক’, এরূপ সব নির্দেশনা থাকত।

‘দুই দশকের গোয়ালন্দ’ শীর্ষক নিবন্ধে ভারত ভাগ পরবর্তী সময়ের কথা বলতে গিয়ে জালাল মিঞা এভাবেই স্মৃতিচারণ করেছেন। ব্রিটিশ ভারতে গোয়ালন্দ ছিল ইউরোপীয় মানের প্রথম শ্রেণীর রেল স্টেশন। বাঙালি তো নয়ই, এমনকি কোন ভারতীয়কেও স্টেশন মাস্টারের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। ভারত ভাগের আগ পর্যন্ত মাস্টারের দায়িত্বে বরাবরই ছিলেন একজন ইংরেজ। ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত ইস্ট বেঙ্গল এক্সপ্রেস নামের ট্রেনটি শিয়ালদহ হতে গেদে-দর্শনা হয়ে গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত চলাচল করত। ফিরত আবার একই পথে। আর বরিশাল এক্সপ্রেস শিয়ালদহ হতে পেট্টোপোল-বেনাপোল হয়ে খুলনা পৌঁছাত এবং সেখান থেকে পুনরায় শিয়ালদহ ফিরে আসত। আসাম মেইলের আসা যাওয়া ছিল সান্তাহার থেকে গৌহাটি পর্যন্ত। দার্জিলিং মেইল শিয়ালদহ-রানাঘাট-হার্ডিঞ্জব্রীজ-ঈশ্বরদী-সান্তাহার-পার্বতীপুর-হলদিবাড়ি-জলপাইগুড়ি-শিলিগুড়ি পথে আসা-যাওয়া করতো। কত বিস্তৃত ছিল সেকালের রেলের সীমা! আজ চিন্তা করতেই হিমসিম খেতে হয়।

এতদঞ্চলে চলাচলরত বিশ শতকের চারটি প্যাডেল স্টিমার সচল আছে এখনো। বিআইডব্লিউটিসির তত্ত্বাবধানে রয়েছে এগুলো । স্কটিশ শিপবিল্ডের ওয়েবসাইট (ডব্লিউ.ডব্লিউ.ডব্লিউ.ক্লাইডেশিপস.সিও.ইউকে) হতে প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক দেখা যায়, ‘টার্ণ’ (১৯৪৯) ও ‘অস্ট্রিচ’ (১৯২৯) ছিল ইন্ডিয়া জেনারেল নেভিগেশন কোম্পানির। আর ‘মাহসুদ’ (১৯২৯) ও ‘লেপচা’ (১৯৩৭) ছিল রিভার্স স্টিম নেভিগেশন কোম্পানির। সবগুলো প্যাডেল স্টিমারই স্কটল্যান্ডের ‘উইলিয়াম ড্যানি এন্ড ব্রাদার্স’ শিপইয়ার্ডে প্রস্তুতকৃত। ১৯৫৯ সালে এগুলো পাকিস্তান রিভার স্টিমার্স লিমিটেডের মালিকানায় আসে। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে এগুলোর মালিকানা পায় বাংলাদেশ রিভার স্টির্মাস লিঃ এবং সর্বশেষ বিআইডব্লিউটিসি। ‘অস্ট্রিচ’ বাদে অন্য তিনটি স্টিমার বর্তমানে বিভিন্ন রুটে চলাচল করছে। প্যাডেল স্টিমার বিধায় এদের নামের আগে পিএস সংযুক্ত করে ডাকা হয় পিএস টার্ণ, পিএস অস্ট্রিচ, পিএস মাহসুদ ও পিএস ল্যাপচা। ইতিমধ্যে বিআইডব্লিউটিসি স্টিমার চারটিকে রাষ্ট্রীয় ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। ‘অস্ট্রিচ’ কে ২০১৯ সালে অ্যাকর্ট রিসোর্সেস নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নিকট পাঁচ বছর মেয়াদে ইজারা দেয়া হয়েছে। প্যাডেল স্টীমারগুলো ‘রকেট’ নামেও পরিচিত। সময়ের আবর্তনে এগুলোকে স্টিম ইঞ্জিন থেকে ডিজেল ইঞ্জিনে রূপান্তর করা হয়েছে।

যেই পদ্মাকে ঘিরে গোয়ালন্দের এত অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশ; কালের পরিক্রমায় প্রমত্ত পদ্মার সেই যৌবন আর নেই। ঢেউ আছড়ে পড়ে না স্টিমারের বাজুতে। পদ্মার এমন দশায় গোয়ালন্দের সেই নাম আর জৌলুসও নেই। ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ সকল মহকুমাকে জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু গোয়ালন্দকে জেলা হিসেবে ঘোষণা না করে জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয় রাজবাড়িকে! আর গোয়ালন্দ পরিণত হয় রাজবাড়ি জেলার অন্তর্ভুক্ত একটি উপজেলায়! বর্তমানে রাজবাড়ি জেলার আওতাধীন পাঁচটি উপজেলার মধ্যে আয়তনের দিক থেকে গোয়ালন্দ ক্ষুদ্রতম (৪৭ বর্গমাইল)। শতাধিক বছরের খ্যাতি হারিয়েছে গোয়ালন্দ রেল স্টেশন। বন্ধ হয়ে গেছে গোয়ালন্দগামী বেশ কিছু রেল লাইন। গোয়ালন্দ এখন শুধুই এক সাধারণ রেল স্টেশন। ক্ষয়ে যাওয়া লাল ইটের ভবনগুলো কালের সাক্ষী হয়ে রয়ে গেছে। পাল্টে গেছে ইলিশ যাত্রার পথও। আগে গোয়ালন্দে অন্ধ মালগাড়ির যাত্রী হতো ইলিশ। আর এখন বেনাপোল কিংবা আগরতলার পথে ট্রাকের যাত্রী হয় ইলিশ। টিকেট কাটা ঘরের পরিত্যক্ত জানালা, টাকা রাখার লকার, ট্রেনকে সিগন্যাল দেয়ার জন্য লকারের ওপরে বসানো ল্যাম্প, অন্যান্য যাত্রীদের সাথে স্টিমারের ডেকে চাদর বিছিয়ে স্থান করে নেয়া, রাতের নদী, গোয়ালন্দ ঘাটে নেমে হুড়াহুড়ি করে ট্রেনে ওঠা—সবই এখন সোনালী অতীতের ধূসর স্মৃতি।

চন্দনা-নদী

চন্দনা-নদী

 

  • চন্দনা চলতে পারি মন্দ না
  • চলত যখন চাঁদ সওদাগর
  • করত সবাই বন্দনা।
  • পালের নায়ে ঘোমটা দিয়ে
  • আর চলেনা রঞ্জনা,
  • শীর্ণ বুকে পা রাখে না খঞ্জনা
  • চন্দনা, চলছি দেখ মন্দনা।

চন্দনা বর্তমান পদ্মার একটি শাখা যা পাংশার পাশ দিয়ে প্রবাহিত। কালুখালির দক্ষিণে সোনাপুরের রামদিয়ার মাঝ দিয়ে প্রবাহিত বালিয়াকান্দি হয়ে পাঁচমোহনীতে মেশেছে। এই পাঁচমোহনী চন্দনা, হড়াই, কুমার গড়াইয়ের মিলনস্থল। ড. নীহাররঞ্জন যে চন্দনার গতিপথের বর্ণনা দিয়েছেন তা চন্দনার সঠিক তথ্য বহন করে না। তিনি লিখেছেন চন্দনা পদ্মার গর্ভে ভাগিরথীতে প্রবাহিত। ফ্যানডেন ব্রকেন নকশায় তা যশোরের পশ্চিম দিয়ে প্রবাহিত। প্রকৃত চন্দনা প্রাচীন নদী যা গঙ্গা হতে প্রাবাহিত হয়ে কুমারের সাথে মিশতো। উল্লেখ্য কুমার অতি প্রাচীন নদী এবং বর্তমান চন্দনা পাঁচমোহনীতে কুমারের সাথে মিশেছে। চন্দনা প্রাচীনকালে অনেক প্রশস্ত নদী ছিল।

 

তার প্রমাণ হিসেবে বলা যায় বর্তমান বেলগাছি ও কালুখালির অদূরে চরলক্ষীপুর, চরচিলকা, চরপাড়া, চরবোয়ালিয়া, চরমদাপুর চন্দনা নদীর প্রবাহিত চর। চন্দনার এ প্রবাহের দ্বারা প্রমাণিত হয় চন্দনা অনেক পূর্ব প্রশস্ত নদী। এছাড়া চন্দনা প্রবাহের দুই কান্দায় আড়কান্দি ও বেলেকান্দি। নদি এ সময়ে আড়কান্দি এসে বাঁক নিয়েছিল বলে আড়ে আড়কান্দি আর ডানে বেলেচর বালিয়াকান্দি। আড়াকান্দি আর বালিয়াকান্দির দূরত্ব ২ মাইল প্রায়। নদীর পাড় আরাকান্দি থেকে বালিয়াকান্দি দিকে সরে গিয়েছে। সপ্তদশ শতকে এ নদী যে অনেক বড় নদী ছিল তার আরো বড় প্রমাণ মেলে বঙ্গে রেলভ্রমণ পুস্তকের ১০৯ পৃষ্ঠার বর্ণনা থেকে-‘কালুখালি জংশন থেকে আড়কান্দি স্টেশন ১২ মাইল দূরে। ঐখানে চন্দনা তীরে বাণীবহ নাওয়াড়া চৌধুরীদের নৌকা নির্মাণের প্রধান কারখানা ছিল। ইবনে বতুতা রেহেলা গ্রন্থে তৎকালীন বঙ্গে জাহাজ শিল্পের ব্যাপক উন্নতির বিষয়ে উল্লেখ করেছেন। বার্থেমাও বিভিন্ন প্রকার নৌযান ও বৃহদাকার জাহাজ নির্মাণের কথা বলেছেন।

মঙ্গলকাব্যের নায়কেরা চাঁদ সওদাগর ধনপতি এ অঞ্চলে বাণিজ্য করত। আর সে বাণীজ্যের পথ ছিল (১৪০০ শতকে) এই চন্দনা, হড়াই,গড়াই। ধারণা করা যায় শুধু সপ্তদশ শতকে আড়কান্দিতে বাণীবহের নাওয়াড়াদেরই নৌকা তৈরি হত না এর ২০০ বৎসর পূর্বে সুলতানি আমলে সওদাগরদের জন্য ডিঙ্গা জাহাজ নির্মিত হত। বর্তমানে আড়কান্দির আদূরে তুলশী বরাট নৌকা নির্মাণের ঐতিহ্যবাহী স্থান। তুলশী বরাটের নৌকা এই সেদিন পর্যন্ত এ অঞ্চলের উন্নতমানের নৌকা হিসেবে গৃহীত ছিল। এ গ্রামের অনেক মিস্ত্রির সাথে আলাপ করে জানা যায় এটা তাদের প্রাচীন পূর্বপুরুষের আদি পেশা। চন্দনা নদী এখন মৃত। মীর মশাররফ হোসেনের বর্ণনা থেকে দেখা যায় ১০০ শত বৎসর পূর্বে এটা যথেষ্ট নাব্য ছিল। হযরত সাহ্ পাহলোয়ান এই নদীর উত্তর তীরে ষোড়শ শতকে ধর্ম প্রচারের জন্য সেকাড়া গ্রামে আস্তানা গড়ে তোলেন। বর্তমানে এই নদীর মুখ কেটে এবং খনন করলে হাজার হাজার একর জমি সেচের আওতায় আনা যাবে। রাজবাড়ী জেলের কৃষি, মৎস্য, পর্যটন শিল্পে উন্নয়নের কথা ভাবতে হলে পদ্মা, গড়াই, হড়াই, চন্দনা, চত্রা,সিরাজপুরের হাওড়া নিয়ে ভাবতে হবে। রাজবাড়ীর এই সম্পদ যেমন গর্ব তেমনি উন্নয়ন প্রকল্পের সহায়ক বিষয়।

গ্রামের নামকরণ

গ্রামের নামকরণ

ঐতিহাসিক ও সমাজবিজ্ঞানীদের অনেকেরই অভিমত মানুষ প্রথমে নগর জীবনে অভ্যস্থ হয় এবং পরে গ্রাম জীবনের বিকাশ ঘটে। তবে আধুনিক নগর বলতে যা বোঝায় সে নগর তেমন ছিল না। প্রাকৃতির নানা বৈপরিত্যের কারণে মানুষেরা দল বেঁধে নানা প্রাকৃতিক সম্পদ সস্মদ্ধ নিরাপদ স্থানে বসবাস করত। আমরা নীল, রাইন, পীত, ইউফ্রেটিস, টাইগ্রীস, সিন্ধু, ভলগা, গঙ্গার তীরবর্তী অঞ্চলে প্রাচীন নগর সভ্যতার কথা জানি। পানির সহজ প্রাপ্যতা এবং উর্বর ভূমির কারণেই এ সকল অঞ্চলে নাগরিক জীবন শুরু হয়েছিল। মিশরীয় ও সুমেরীয়, আসিরীয়, মহেঞ্জোদারো, চীনের প্রচীন নগর সভ্যতার বিকাশ তা প্রমাণ করে। নাগরিক জীবন বিকাশের ফলে ফসল উৎপাদনের নিমিত্তে তারা নগর থেকে দূরবর্তী অঞ্চলে স্থায়ী বাস গড়ে তোলে। ফলে গ্রামীণ জীবন বিকাশ ঘটে। বঙ্গে এ বিষয়টি আলাদা বলে মনে করার অনেক কারণ আছে। ঐতিহাসিক সূত্রে প্রতীয়মান হয় গঙ্গার ভাটি অঞ্চলের সমতটীয় বঙ্গের আদিভিত্তি গ্রাম। নগর জীবন গড়ে উঠেছে অনেক পরে। প্রাচীন বঙ্গ, উপবঙ্গ সাগর তথা নদনদীর উত্থিত দ্বীপ ও চর সমষ্টি দ্বারা গঠিত। অসংখ্যা নদ-নদীর প্রবাহ, বিল বাওড়, হওড় জোলা এর প্রমাণ বহন করে। ইউয়ান চেয়াং ষষ্ট শতকে বঙ্গে ভ্রমণ করেন। তার বর্ণনা থেকে বঙ্গে গ্রাম জীবনের ভিত্তির সংবাদ জানা যায়। তখনকার গ্রাম এখন কার গ্রামের মতো ছিল না। উত্থিত দ্বীপ বা চরে জীবন জীবিকার অন্বেষণে মানুষ একসাথে বসবাস করত যা বর্তমান গ্রামের মতো ছিল। ক্রমে ক্রমে নদী সঙ্কুচুত হয়ে পড়ে। বিচ্ছিন্ন দ্বীপ সমষ্টিরুপ ধারণ করে। একাকার হয়ে বিস্তীর্ণ সমতল মাঠ বা প্রান্তরে রুপান্তরিত হয়। সে সব স্থানে জনবসতি গড়ে ওঠে এবং গ্রামীণ জীবনের বিকাশ ঘটে।

বাংলার প্রায় প্রতিটি গ্রামের পূর্বে বা পরে পরিচয়াত্মক শব্দ দেখতে পাওয়া যায়। যেমন পুর, ডাঙ্গা, খালি, দহ, চর, চক, দি, দিয়া, হাট, ঘাট, পাড়া ইত্যাদি। এরমধ্যে পুর অর্থ জনসমাবেশ এবং তা নগর অর্থে ব্যবহৃত হয়। পুর থেকেই পৌর বা নগর বিকাশের ক্ষেত্রে এ পরিচয়াত্মটি শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে। উর, পুর, দি, দিয়া, দিয়াড়া; বিল, নালা এগুলি বাংলায় আদি খাঁটি শব্দ যা অনার্যরা ব্যবহার করত। বঙ্গে আর্য ব্রাক্ষণদের আগমন ঘটে অনেক পর। তার পূর্বে অনার্য অধিবাসীরাই ছিল বঙ্গের অধিবাসী। তবে পুরের পরিচয়ে সকল গ্রামের নাম আদি দ্রাবিড় বা ভোটচীন গোষ্ঠীর দেওয়া নাম নয়। গ্রাম জীবনের বীকাশ ঘটেছে শত শত বছর ধরে। এরমধ্যে মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন, তুর্কী, পাঠান, সুলতান, মোগল, ইংরেজ, পাকিস্তানি শাসন চলেছে। সব কালেই নতুন নতুন গ্রামের উৎপত্তি ঘটেছে। সে ক্ষেত্রে প্রাচীন ব্যবহৃত পুর শব্দটির ব্যবহারের সাথে যোগ হয়েছে খাল, খালি, চর, দহ, দি, দিয়া, গাঁড়া, সারা, গ্রাম, বাড়ি, হাট, বজার, গঞ্জ,তালক, পাড়া, নালা, তলা, এলি, আদ, বাদ, জানি, কান্দা, কান্দি, ডাঙ্গা, লিয়া, ইল, বিল, লাট, লাটি, লি, দা, বাত, বাতান, কন্দ, জনা, ডোরা, ঝোপ, জঙ্গল, বন, ঝুপি, থুপি, তুরি, শিয়া, নগর, রাট ইত্যাদি। আবার গাছের নাম, মাছের নাম, পাখির নামও গ্রামের নাম রয়েছে। গ্রামসমূহের উৎপত্তির দিকে লক্ষ্য করলে দেখার যায় সপ্তম অষ্টম শতক থেকে শাসনতান্ত্রীক কাঠামোর মধ্যে ভুক্তি, বিষয়, মণুল বিথী ও গ্রামের উল্লেখ আছে। আজকে যেমন অনেকগুলি গ্রাম নিয়ে গঠিত হয় ইউনিয়ন, তখন কয়েকটি গ্রাম নিয়ে গঠিত হয় বিথী। কয়েকটি বিথী নিয়ে বিষয়, কয়েকটি বিষয় নিয়ে মণুল, কয়েকটি মণুল নিয়ে গঠিত হত ভুক্তি। অত্র এলাকায় স্ময়টি পদ্মাবতী বিষয়, বারক মণুল,কুমার তালক মণুল ইত্যাদির সংবাদ পাওয়া যায়। রাজবাড়ীর গ্রামগুলির উৎপত্তিকাল ঠিক কাখন থেকে তা সুনির্দিষ্ট করে বলা না গেলেও ইউয়ান চোয়াং বাংলায় যে ৩০টি বৌদ্ধ সংঘারামের কথা বলেছেন তার মধ্যে একটির অবস্থান নির্ণীত হয়েছে পাংশায় (পুরাত্ত্ববিদ পরেশনাথ বন্দ্যোপাধায়) । বৌধ ধর্মের বিকশকাল খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৫০০ খ্রিস্টীয় শতক পূর্বে থেকে ৭ম/৮ম শতকের পাল শাসন পর্যন্ত সুদীর্ঘ প্রায় এক হাজার বছর। ইউয়ান চোয়াং যে বৌদ্ধসংঘারামের কথা বলেছিলেন সে সব বৌদ্ধ সংঘারাস নিশ্চয়ই ষষ্ঠ শতকের অনেক পূর্বে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকবে। সে কারণে বলা যায় পাংশায় যে বৌদ্ধসংঘারাম ছিল তা হয়তো ১ম/২য় শতক হতে বা তার পূর্বে বা পরেও হতে পারে। তবে নিশ্চয়ই ষষ্ঠ শতকের অনেক পূর্বে। তাই রাজবাড়ির জেলের গ্রামের ভিত্তি খ্রিস্টীয় ১ম শতক বা তার পূর্ব থেকেই বিকাশ লাভ করে।

আরো একটি নিদর্শন রাজবাড়ি জেলার গ্রামবসতির প্রাচীনত্বের স্বাক্ষর বহন করে। ২০০১ সালে বালিয়াকান্দি থানার ইসলামপুর ইউনিয়নের তেঘারী গ্রামে পুকুর খনন কালে কষ্টিপাথরের তৈরি একটি বিষ্ণুমূর্তি পাওয়া যায়। মূর্তিটি বর্তমানে ঢাকা জাদুঘরে আছে। উল্লেখ্য গুপ্তরাজগণ হিন্দুতান্ত্রীক এবং কেহ কেহ পরম বৈষ্ণর ছিলেন। বালাদিত্য বৌদ্ধ ছিলেন। সমুদ্রগুপ্ত ও দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তে সময় বিষ্ণমূর্তি পূজাপদ্ধতি বিশেষভাবে প্রচলিত হয়। স্কন্ধগুপ্তের সময় বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি তারা আকৃষ্ট হয়। আমাদের দেশে যে সকল সুন্দর চতুর্ভুজ বাসুদেব প্রকৃতি বিষ্ণুমূর্তি দৃষ্ট হয় তার কতকগুলি গুপ্ত যুগে এবং কতগুলি সেন যুগে প্রতিষ্ঠিত হয়। পদ্মাবতি বিষয়, বারক মণুল, কুমার তালক মণুল, পাংশায় বৌদ্ধ সংঘারাম, তেঘারির বিষ্ণুমূর্তি এবং ১০৫৬ টি গ্রামে এরমধ্যে প্রায় ২০০টি পুর, দি, দিয়া, হওয়ায় বলা যায় গুপ্ত যুগ থেকেই ব্যাপকভাবে গ্রামসমূহের বিকাশ ঘটে।

রাজবাড়ি জেলার গ্রাম সকলের পূর্বে বা পরে পরিচায়ত্মক শব্দ হিসেবে পুর, দি,দিয়া, ধিয়া,লায়া, গাতি, কান্দা, বাড়ি, বাড়িয়া, গ্রাম, পাড়া, নগর, খাল, খালিয়া, কালিয়া, কোলা, বিল, ইল, হাওড়, কোল, দোহা, দহ, কোল, লেঙ্গা, লেঙ্গি, রেন্দা, উরি, কুড়ি, উলি, লুন্দি, কাউল, কাচু, দিলা, গিলা, মংলায়, বঙলট, ত্রিচট, পেটট, মাছের নাম, গাছের নাম, ফলের নাম, ফসলের নাম, ডাঙ্গা, ডাঙ্গী, বুনিয়া, হাট, গঞ্জ, চক, কশবা, চর, ভর, দহ, এলা, তলী ইত্যাদি রয়েছে। নামের পূর্বে বা পরে এমন পরিচয়াত্মক শব্দের আলোকে রাজবাড়ির গ্রামসমূহের উৎপত্তির ধারাবাহিকতা জানা যায়।

রাজবাড়ি জেলা প্রাচীন যশোর খুলনা সংলগ্ন হওয়ায় তা উপবঙ্গের অংশ বিশেষ। উপবঙ্গ গঙ্গার ভাটির অঞ্চলের উত্থিত দ্বীপসমূহের সমষ্টি। গঙ্গা তার বিভিন্ন শাখা উপশাখার প্রবাহিত হওয়ায় ভাটিতে উত্থিত হয় ঐ সকল দ্বীপ। দ্বীপসমূহে জনবসতি গড়ে ওঠার কারনে জনপদের সৃষ্টি হয়। রাজবাড়ি জেলা গঙ্গা মুখের অপেক্ষাকৃত কাছাকাছি থাকায় বঙ্গের দক্ষিণ অঞ্চলে থেকে জনবসতি তুলনামূলক আগে হওয়াই স্বাভাবিক। তবে জেলাটির বিশেষত্ব এমনই যে এর উত্তর দিকে পদ্মা ও দক্ষিণের গড়াই এবং মধ্য প্রবাহিত হড়াই, চন্দনাসহ আরো অনেক নদী।  প্রবহিত নদনদীর বাঁকে বাঁকে বিচ্ছিন্নভাবে দ্বীপের সৃষ্টি হতে থাকে। বর্তমান পদ্মা ও গড়াই সংলগ্ন অনেক গ্রামের আগে বা পরে পরিচয়াত্বক শব্দ চর থাকলেও প্রাচীনকালের উত্থিত চরাঞ্চল জনপদ চরের পরিচয়ে পরিচিত হত না। নদী মরে গেলে নাল, খাল, বিলে পরিণত হয়। এ কারণে অনেক গ্রামের নামের পরিচয়ে নালা, খাল, বিল, ঝিল, হাওড়, বাওর দেখা যায়। অনেক নামের পূর্বে মাছের নাম , পাখির নাম, পশুর নাম, দেখা যায়। তবে জেলার গ্রামসমূহের নামের পরিচয়াত্মক বিশেষত্ব হল অনেক বেশি গ্রামের নামের পরিচয়ে পুরের ব্যবহার। তুলনামূলক যশোর খুলনাতে খালি, কাটি, কাটা, দহ, চর, তলা, তলী, গাছ, গাছি বেশি দেখা যায়।

ইতিপূর্বে বলা হয়েছে রাজবড়ি জেলার পুর দিয়ে গ্রামের নাম বেশি। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিম্নরুপ হওয়ার বিষয় যুক্তিযুক্ত মনে করা যায়। প্রাচীন জনপদ গড়ে ওঠার বিষয়ে বলা যেতে পারে রাজবাড়ি জেলার প্রাচীন উত্থিত এবং দ্বীপসমূহ রাজবাড়ি জেলার বালিয়াকন্দি, আড়াকান্দি, নলিয়া, জামালপুর, বহরপুর, সোনাপুর, পদমদি, রামদিয়া, রাজধারপুর, বসন্দপুর সুলতানপুর, পাংশা, নারায়ণপুর অঞ্চলসমূহ।

এসব প্রাচীন জনপদের পদ্মা, হড়াই,গড়াই,চন্দনা, কুমার, কাজলী, সুতা, ফুরসুলা নদীর বাঁকে বাঁকে উত্থিত দ্বীপের ও চরের অঞ্চলে প্রাচীন বসতি গড়ে ওঠে। এ সব অঞ্চলে জনপদ গড়ে ওঠার ফলে ধীরে ধীরে প্রাচীন গ্রাম প্রাচীন ব্যবহৃত পুর, কান্দি, দি, দিয়া, দ্রাবিড় ব্যবহৃত শব্দ যোগ হয়েছে।

হড়াই-নদী

হড়াই-নদীর-ভাঙ্গাগড়ার খেলা

নদ-নদী

পদ্মা, গড়াই, হড়াই, চন্দনা বাহিত পলি, কাঁকর দিয়ে সৃষ্টি রাজবাড়ী জেলা। রাজবাড়ী প্রধান ঐতিহ্য এককালের রুপালি ইলিশ। আজও রাজবাড়ী অঞ্চলের মানুষের জীবন পরিচালিত হচ্ছে এ সব নদনদীর প্রভাবে। সঙ্গত কারণেই এ সব নদনদীর অতীত স্রোতধারা, তার জন্মকাল জানতে ইচ্ছে করে। জানতে ইচ্ছে করে এর ভাঙ্গাগড়ার খেলা।

সব নদী খান খান

হড়াই নদী সাবধান

এ প্রবাদটি রাজবাড়ী জেলার বেলগাছি, কালুখালি, মদাপুর, সূর্যনগর, রাজবাড়ী, বাণীবহতে বহুল প্রচলিত। প্রবাদটি। প্রবাদটি নাকি উৎসারিত হয়েছিল চতুর্দশ শতকের মঙ্গল কাব্যের নায়ক চাঁদ সওদাগরের মায়ের মুখ থেকে। কথা থেকে বোঝা যায় চাঁদ সওদাগরের মা তাকে সাবধান করেছিল বেগবান খরস্রোতা নদী থেকে তা সত্ত্বেও চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙ্গা নিমজ্জিত হয় বেগগাছির অদূরে হড়াইতে। সে স্থানাটি কয়েকটি উঁচু ঢিবি দেখা যায় যাকে এ অঞ্চলের মানুষ চাঁদ সওদাগরের ঢিবি বলে। এ কাহিনীর সত্যতার সাথে চাঁদ সওদাগরের কাহেনী আজ ঐতিহাসিক সত্য বলে পরিচিতি লাভ করেছে। সকল মঙ্গল কাব্যেরই নায়ক সওদাগর। এ মধ্যে চাঁদ সওদাগর, ধনপতি ও তার পুত্র শ্রীমন্ত অন্যতম। চাঁদ সওদাগরের ছিল সপ্তডিঙ্গা আর ধনপতির চৌদ্দডিঙ্গা। তাদের প্রধান ডিঙ্গার নাম ছিল মধুকর। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তারা ব্যবসার উদ্দেশ্যে সমুদ্র যাত্রা করত। চাঁদ সওদাগরের বাড়ি বর্তমান বগুড়া। মঙ্গল খাতে কলিদহের সাগর বলে পরিচিত। ধনপতি ছিলেন হুগলী অঞ্চলের। ড. নীহাররঞ্জন চাঁদ সওদাগরের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে চাঁদ সওদাগরের বাণীজ্যতরী বাজখানি রামেশ্বর পার হইয়া সাগর মুখের দিকে অগ্রসর হইতেছে। পথে পড়িতেছে অজয় নদী, উজানী, পূর্বে কাকীনাড়া, মূলজোড়া, আড়িয়াসহ চিত্রাপুর।

চাঁদ সওদাগরের কাহিনী বর্তমানে ইতিহাসের উপাদান তবে চাঁদ সাওদাগরের সপ্তডুঙ্গা যে এখানে নিমজ্জিত হয় তার সত্যতা কী? হড়াই নদীর প্রবাহ বর্ণনায় হয়ত এ সত্যতা ঐতিহাসিক আলোচনার বিষয় হতে পারে। বর্তমানে মৃত হড়াই নদীর পদ্মা উৎসারিত হয়ে বেলগাছির পশ্চিম দিক দিয়ে বাণীবহের দক্ষিণ দিয়ে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে পাঁচ মোহনীতে হড়াই, চন্দনা, গড়াই, কুমার একাকার। পদ্মা নদীর প্রাচীনত্ব ও প্রবাহ বর্ণনায় যতদূর জানা গেছে পদ্মা ষোড়শ ও সপ্তদশ শতক থেকে প্রবল হয়েছে। এর পূর্বে অর্থৎ চতুর্দশ বা তৎপূর্বে এর প্রবাহ প্রবলতার ইতিহাস নাই।

এদিকে গঙ্গার প্রাচীনত্ব অনেক পূর্বে যার প্রভাবে বাংলার সমতটীয় বদ্বীপের উত্থান। ত্রয়োদশ চতুর্দশ শতকে পদ্মার প্রবলতা না থাকায় গঙ্গার ধারা তখন কুমার, মাথাভাঙ্গা, জলঙ্গী, গড়াই, হড়াই দিয়ে প্রবাহিত হত। কুমার, মাথাভাঙ্গা বহু পূর্বে যশোন খুলনা দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় সে সব অঞ্চলের বদ্বীপ বর্তমান পরিণত ও জয়িষ্ণু বদ্বীপ। ঐ অঞ্চলে জলাধার ও বিল বাওড়া এর প্রমাণ বহণ করে। গঙ্গার মুখে ত্রয়োদশ চর্তুর্দশ শতকে এবং তারও পূর্বে যে সমস্ত নদীপ্রবাহ দ্বারা গঙ্গার বিপুল জলরাশি বাহিত হত তা কুমার, গড়াই, চন্দনা, জলঙ্গী, মাথাভাঙ্গা, হড়াই। হড়াই প্রাচীন নদী। অন্যদিকে করতোয়া বাংলার উত্তর বঙ্গের মধ্যে দিয়ে দক্ষিণগামী। করতোয়াই প্রবাহ-ই হড়াই দিয়ে প্রবাহিত হত। এ থেকে অনুমান করা যায় হড়াই তৎকালীন সময়ে এ অঞ্চলে বেগবান নদী ছিল। বর্তমান মাটিপাড়া পিঁজেঘাটা বলে পরিচিত স্থানে যে বিলের আকার দেখতে পাওয়া যায় তা হড়াইয়ের প্রাচীন প্রবাহ।

‘পিজেঘাটার ভাটিতে রাধাগঞ্জে বিল ছিল রাধাগঞ্জ বন্দর’ (ফরিদপুরের ইতিহাস, আনন্দনাথ রায়) । উল্লেখ্য নদী তার পতি বদলালে পরিত্যক্ত নদী প্রথমে কোল ও মৃত নদী পরে বিল বাওড়ে পরিণত হয়। দশম, একাদশ শতাব্দীতে বা তারও পরে হড়াই নদী হিসেবে প্রবাহিত ছিল যার প্রশস্ততা দুই/তিন মাইল। পরে তা দুটি ধারায় প্রবাহিত হয়েছে। একটি পিঁজেঘাটা দিয়ে অন্যটি বর্তমান হড়াইয়ের প্রবাহ দিয়ে। ত্রয়োদশ চতুর্দশ শতকে ভূষণা (বর্তমান মধুখালির অদূরে) সমৃদ্ধ নগর ও বন্দর ছিল। এখানকার উন্নতমানের সূতিবস্ত্রের সুনাম দেশে বিদেশে ছড়িয়ে গিয়েছিল।

 

বাংলার দ্বারপথ গোয়ালন্দ

বাংলার দ্বারপথ গোয়ালন্দ-প্রাচীন গোয়ালন্দ ঘাটের ইতিহাস

বাংলাদেশে প্রারম্ভিক (১৯৭১-১৯৮৪) শাসনকালের সাবেক গোয়ালন্দ মহকুমাই বর্তমান রাজবাড়ী জেলা।  ইতিহাস ঐতিহ্যে গোয়ালন্দ বাংলাদেশের বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। মোগল ও বৃটিশ শাসন কালে ঢাকা, দিল্লী, কলিকাতা তথা পূর্ববাংলা ও সমগ্র ভারতবর্ষের যাতায়াত পথ ছিল গোয়ালন্দ। এ কারণে বৃটিশ শাসন কালে গোয়ালন্দ কেবল বৃহৎ গঞ্জই নয় বাংলার দ্বারপথ (Get way of Bengal) বলে খ্যাতি লাভ করে। স্থাল পথে কলিকাতা ও গোয়ালন্দের সংযোগ থাকায় প্রমত্তা পদ্মা পাড় হয়ে বাংলার পূর্ব সীমান্তের যাতায়াতে গোয়ালন্দই ছিল প্রবেশ পথ। ১৮৭১ সালে রেলপথ স্থাপন করা হলে গোয়ালন্দের গুরুত্ব অধিক মাত্রায় বেড়ে যায়। সারা ভারতবর্ষে গোয়ালন্দ একক নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। গোয়ালন্দ-দৌলতদিয়া ঘাট এখনো স্থলপথে বাংলাদেশের দক্ষিণের পথ। ঢাকা থেকে ফরিদপুর, বরিশাল, খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া এবং স্থলপথে কলিকাতা যেতে দৌলতদিয়া ঘাট পাড় হয়ে যেতে হয়।

 

প্রাচীনতার দিক থেকে পদ্ম ও যমুনার মিলনস্থল গোয়ালন্দ ইতিহাসের পাতায় চিহ্নিত। পদ্মার ভাঙ্গা গড়ার সাথে এর নানারুপ উত্থান ও পতন। কখনো গোয়ালন্দ রেল, স্টিমার, লঞ্চ, নৌকার হাজার মানুষের ভিড়ে রুপনগরী আবার কখনো প্রমত্ত পদ্মার ভাঙ্গনে, প্লাবনে পরিত্যক্ত ভূমি। এ পথেই সম্রাট বাহাদুর শাহকে পাঠান হয় রেঙ্গুনে। এ পথেই গমনাগমন করেছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম। এখানেই আস্তানা গড়ে তুলেছেলেন অমর গ্রন্থ ‘মরু তীর্থ হিংলাজে’র লেখক অবধূত। আট হাজারী দ্বিপ বলে ইতিহাস খ্যাত গোয়ালন্দের পটভূমিতেই মানিক বন্দ্যোপাধায় লিখেছেন বহুল আলোচিত উপন্যাস, পদ্মা নদীর মাঝি।

 

‘একদিন গোয়ালন্দে অধরের সঙ্গে কুবেরের দেখা হয়ে গেল। অধর বলিল, কয়েকদিন আগে কপিলা চরডাঙ্গায় আসিয়াছে কিছুদিন থাকিবে। পদ্মা নদীর মাঝি পৃষ্ঠা-১৬৫।

এ উপন্যাসটি বর্তমানে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্য। গোয়ালন্দের ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণে কলম ধরেছেন ঐতিহাসিক আনন্দনাথ রায়, রমেশ চন্দ্র মজুমদার, ডব্লিউ হান্টার। সরকারিভাবে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ারে ঘুরে ফিরে এসেছে ঘোয়ালন্ধের নাম।

১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালীশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় নসীবশাহী পরগনা এবং গোয়ালন্দ থানা হিসেবে যশোর কালেক্টরীর অন্তর্ভুক্ত হয়। নসীবশাহীর পরগনার আয়তন ছিল ৪৩০৯ একর এবং রাজস্ব নির্ধারিতত ছিল ১৫৮২১ টাকা (Faridpur District Gazetteer page 270)। মোগল শাসনকালে প্রাচীন ‘রাজগঞ্জ’ কখনো পর্তুগীজদের মুখে ‘গোয়ালীশ মুখে ‘গোয়ালীশ ল্যান্ড, কখনো জামালপুরে ইংরেজদের মুখে গ্যাংঞ্জেজ বন্দর । অবশ্য নদী ভাঙ্গনের কারণে গোদার বাজার, লক্ষ্মীকোল, লালগোলা, তেনাপচা, দুর্গাপুর, উড়াকান্দা, পুরশাহাট ঘাট পরিবর্তন হলেও গোয়ালন্দ নামেই এসব ঘাট পরিচয় বহন করে। ভাঙ্গনের বর্ণনায় ঐতিহাসিক রমেশ চন্দ্র মজুমদার লিখেছেন, বর্তমান শতাব্দি (বিংশ) আরম্ভ হইতে প্রথমে ছাত্র ও পরে শিক্ষকরুপে বহুবার স্টিমারে পদ্মা নদী দিয়া ঢাকা গিয়াছি। প্রথম প্রথম রাজবাড়ীর মঠ একটি দর্শনীয় উচ্চ চূড়া সৌধ দৃষ্টিগোচর হইত। একবার ইহার  ধার দিয়া আসিলাম কিন্তু ফিরিবার সময় তাহার দর্শন মিলিল না। বহু নগরী গ্রাম মন্দির প্রভৃতির ন্যায় এই মঠটি পদ্মার গর্ভে বিলীন হইয়াছে।  (রমেশ চন্দ্র মজুমদার প্রথম খন্ড-পৃষ্ঠা-৩)।

১৭৯৩ সালে গোয়ালন্দ থানা হিসেবে যশোরের সাথে যুক্ত হলেও গোয়ালন্দ স্থান হিসেবে এর পূর্ব পরিচিত ছিল। গোয়ালন্দ নামের পিছনে লোক মুখে নানা কথা প্রচলিত আছে। এক সময় এ অঞ্চল পর্তুগীজ, মগ, ফিরিঙ্গা জলদস্যু কবলিত ছিল। পর্তুগীজ জলদস্যু নেতা সেবাসটিয়ান গঞ্জালেশের একটি আস্তানা ছিল নদী তীরবর্তী গোয়ালন্দের কোনো স্থানে। লোকমুখে প্রচলিত গঞ্জালেশের নাম অনুসারে অপভ্রংশে গোয়ালন্দ নামরে উৎপত্তি। এক সময় গোয়ালন্দের দুগ্ধ ও মিষ্টান্ন উৎপাদনের খ্যাতি ছিল। পদ্মা পাড়ের গো-খাদ্যের প্রাচুর্য এবং বিস্তীর্ণ অনাবাদী চরাঞ্চলে গোয়ালারা দুগ্ধ উৎপত্তি। ঐতিহাসিক সূত্রে প্রাচীন রাজগঞ্জ ইংরেজ ও পর্তুগীজ বণিকদের মুখে ব্যবহৃত ‘গোয়ালীশ ল্যান্ড’ থেকে গোয়ালন্দ নামের উৎপত্তি। বার ভূঁইয়া জমিদার চাঁদ রায় ও তৎপুত্র কেদার রায়ের রাজ্য বিক্রমপুর, ঢাকা, ফরিদপুর ও বরিশালের অংশবিশেষে বিস্তৃতি লাভ করে। এ রাজ্য মকিমাবাদ, বিক্রমপুর ও রাজনগর পরগনায় বিভক্ত ছিল।  (আনন্দনাথ রায়ের ফরিদপুরের ইতিহাস, ডঃ তপন বাগচী সম্পাদিত, পৃষ্ঠা-১০০) রাজনগর পরগনা পদ্মা ও কালীগঙ্গা নদীর সঙ্গমস্থলের দক্ষিণ পূর্ব দিকে অবস্থিত ছিল। (বিক্রমপুরের ইতিহাস, যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত, পৃষ্ঠা-২০)। ফরিদপুরের পদ্মা তীরবর্তী উত্তর পর্ব অংশ রাজনগর পরগনার অন্তর্ভুক্ত ছিল।

 

কীর্তিনাশার (পদ্মার অপর নাম) দক্ষিণ তীরস্থ স্থানগুলি ফরিদপুরের অন্তর্গত হওয়ায় উহা

দক্ষিণ বিশেষণে বিশিষ্ট হইয়া দক্ষিণ বিক্রমপুর নামে অভিহিত (আনন্দনাথ রায় পৃষ্ঠা-১০২)। মোগল সম্রাট আকবরের সময় থেকে চাঁদ রায় দক্ষিণ বিক্রমপুরের শ্রীপুর নগরে রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেন এবং রাজনগর পরগনার রাজকার্য পরিচালনা করেন। Thus Rajnagar, the dominant in the south east, in the eighteen century, was curved out of the Haveli Dacca. Bikrampur and Solimabad and it continuasly got accession of territory until the end of the century. (Faridpur Gazetteer-page 209).

এ সময় রাজনগর পরগনার রাজকার্য পরিচালনার অন্তর্ভুক্ত পদ্মা তীরবর্তী অঞ্চলের রাজস্ব আদায়ের তহশীল অফিস ছিল বর্তমান রাজবাড়ির উড়াকান্দা বরাবর উত্তরে অবিস্থত- রাজগঞ্জে। পদ্মার ভাঙ্গা গড়ায় রাজগঞ্জ এখন নদীরগর্ভে। (আনন্দনাথ রায় লিখিত ফরিদপুর ইতিহাসে দ্বিতিয় খন্ড প্রকাশিত, ১২৪ পৃষ্ঠায় রাজবাড়ি থানার গ্রামসমূহের তালিকায় ‘রাজগঞ্জ’ গ্রামের নাম উল্লেখ আছে) এখানেই ছিল বিক্রমপুর/রাজনগর পরগনার তহশীল অফিস ও তাদের প্রশাসনিক কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু (রাজবাড়ি মুক্তিযুদ্ধে ড. মোঃ আব্দুস সাত্তার, পৃষ্ঠা-১৯)। সে সময় পর্তুগীজ ইংরেজ বণিকদর এদেশে আগমন ঘটেছে। রাজগঞ্জ তখন ঢাকা, বিক্রমপুরের সংযোগ নদীপথ হিসেবে বিবেচিত হত। রাজগঞ্জ অত্র অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এ পথে বৃহৎ নৌযানে পন্য আনা নেওয়া হত। পূর্ববাংলার ব্যবসা বাণিজ্যের মনোরম বন্দর রাজগঞ্জে প্রতি পর্তুগীজ ও ইংরেজ বণিকরা আকৃষ্ট হয়ে এখানে যাতায়াত করতে থাকে। বাণিজ্যের উদেশ্যে রাজগঞ্জ হয়ে ঢাকা কলিকাতা তারা যাতায়াত করে। পদ্মাতীরের রাজগঞ্জ ছিল খাওয়া ও থাকার সুভল স্থান। বিশেষ করে পদ্মার পলল মাটিতে উৎপন্ন ধান,শাকসবজি ও পদ্মার ইলিশসহ নানা জাতের মাছ ছিল সুলভ ও সুস্বাদু খাবারের উৎস। হোটেলগুলো খাবারের  একটা বিশেষ রীতি মেনে চলত আর তা হল, পেটচুক্তি খাবার। খদ্দের তার পছন্দ মতো ভাত, মাছ, মাংস, সবজি যত পরিমাণই খাবে না কেন, একটা ন্যুনতম দাম দিলেই চলবে।

 

এ ব্যবস্থা চল্লিশ বছর পূর্বেও রাজবাড়ির হোটেলগুলোতে চালু ছিল। আমি ছাত্র থাকাকালীন বর্তমান রেলগেট সংলগ্ন ইসলামিয়া হোটেল থেকে এরকম পেটচুক্তি খেয়েছি। এ বিষয়ে রাজবাড়িতে নানা গল্প প্রচলিত আছে। যেমন খদ্দেরকে পেটচুক্তি খাবার পরিবেশন করে খদ্দেরের খাওয়া অর্ধেক সমাপ্ত হলে বয় বেয়ারা বলত, ‘আরে ভাই ঐ যে ট্রেন হুইসেল দিচ্ছে এখনই ছেড়ে যাবে। খদ্দের আর কি করবে, এ কথা শুনেই অর্ধেক পেট খেয়ে দে দৌড়।

 

সস্তায় সুস্বাদু খাবার, স্থানীয় মানুষের দৃশ্যে আকৃষ্ট হয়ে পর্তুগীজ বণিকেরা রাজগঞ্জকে বলত ‘গোয়ালীশ ল্যান্ড’ বা মজার খাবারের দেশ। গোয়ালীশ পর্তুগীজ জাত শব্দ যার অর্থ অল্পজালের সিদ্ধ মাংস বা মাছের ফালি (Goulash-a stew of steak and vegetables-oxford learner’s Dictionary oxford press 1999)। এ অঞ্চলে উৎপাদিত ধনিয়া, পেঁয়াজ, রসুন, মশলায় পদ্মার স্বাদের ইলিশ, পাঙ্গাস, রুই, কাতলের কর্তিত ফালির মাছ মৃদু জ্বালে রান্নায় তা অপূর্ব স্বাদের খাবারে পরিণত হত। ফলে রাজগঞ্জ বন্দরসহ এর পার্শ্ববর্তীএলাকা গোয়ালীশ ল্যন্ড বা স্বাদের খাবারের অঞ্চল হিসেবে তাদের নিকট পরিচিত হয়ে ওঠে। পরবর্তী প্রায় চারশত বছর ধরে যাতায়াত, ব্যবসা বাণিজ্যের রাজগঞ্জ বন্দরটি পদ্মার ভাঙ্গনে বারবার ঘাটের স্থান পরিবর্তন হলেও ‘গোয়ালীশ ল্যান্ড’ নামটির পরিবর্তন হয় না। ভাষা পরিবর্তনের সাধারণ নিয়মানুযায়ী গোয়ালীশ ল্যান্ড এক সময় গোয়াল্যান্ডু বা গোয়ালন্দ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ইংরেজিতে গোয়ালন্দ বানানটি প্রাচিন নথিপত্রে ‘goalandu’ দেখা যায় ‘goalanda’ নয়। ১৭৯৩ সালে গোয়ালন্দ মহকুমা হয়নি। এ সময়েই বর্তমান রাজবড়ি জেলার নসিবশাহী, বেলগাছি, কাশিমনগর, নশরতশাহী ইত্যাদি পরগনা নাটোর রাজ, তেওতা রাজ, রানী হর্ষমুখীর জমিদারী হিসেবে যশোর কালেক্টরেভুক্ত হয়। পাংশা এলাকার মহিমশাহী পরগনা নদীয়ার অন্তর্ভুক্ত থাকে। ১৭৯৯ সালে যশোরের কালেক্টর কর্তৃক নাটোরের রাজার পরগনাগুলো নিলামে বিক্রি হয়। (আনন্দনাথ, পৃষ্ঠা-১১১)। এ সময় গোয়ালন্দ গোয়াল্যান্ড হিসেবেই সরকারী নথিপত্রে ব্যবহৃত হয়। ১৮৭১ সালে পূর্বদেশ রেল জগতি থেকে রাজগঞ্জ (রাজগঞ্জ এখন নদীগর্ভে) অভিমুখে রেল স্থাপন হয় এবং  ঐ বছরই গোয়ালন্দ মহকুমা প্রতিষ্ঠিত হয়। পরগনাভিত্তিক ঢাকা জালালপুর গঠন করা হয় ১৮০৭ সালে। ১৮১২ সালে ঢাকা জালালপুরের পশ্চিম সীমানা নির্ধারণ করা হয় চন্দনা ও গড়াই নদীর পূর্ব পাড় পর্যন্ত। ফলে পদ্মার পাড়াপড় ঘাট গোয়ালন্দ-ঢাকা-জালালপুর আওতাভুক্ত থাকে। ১৮৩৩ সালে ফরিদপুর জেলা গঠনকালে এ সীমানা অক্ষুন্ন থাকে। এ সময় পদ্মার উভয় তীরবর্তী গোয়ালন্দ ও মানিকগঞ্জ প্রায় ৩৭ বছর ফরিদপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত থেকে ১৮৫৬ সালে মানিকগঞ্জ ঢাকার অধীন হয় ( আনন্দনাথ রায়ের ফরিদপুরের ইতিহাস, ড. তপন বাগচী সম্পাদিত, পৃষ্ঠা-১১৭)।

১৮৭১ সালে ফরিদপুর জেলাকে ৪টি প্রশাসনিক ইউনিটে চারটি সাবডিভশন বা মহকুমায় বিভক্ত করা হলে গোয়ালন্দ মহকুমা গঠিত হয় এবং ঐ বছরই পূর্বদেশ রেল গোয়ালন্দ পর্যন্ত বিস্তৃত করা হয় (গৌড়ি সেতু-মীর মশাররফ হোসেন)। তবে মহকুমা প্রতিষ্ঠাকালে স্থান হিসেবে বর্তমান গোয়ালন্দ সেভাবে গেজেট ভুক্ত হয়নি। গোয়ালন্দ ঘাট পরিচয়ে নসিবশাহী, কাসিমনগর, নশরৎশাহী, পরগনা গোয়ালন্দ মহকুমায় পরিণত হয়। বেঙ্গল গেজেটিয়ার ১৯২৫ (ওমিলি প্রণীত) দেখা যায় বর্তমান গোয়ালন্দ বাজার থেকে প্রায় ১০ কিমি উত্তর পশ্চিমে এবং উড়াকান্দা বাজার থেকে প্রায় ৮ কিমি উত্তর পূর্বে পদ্মা যমুনার মিলনস্থলের নিকবর্তী কোনো স্থানে মহকুমা স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। এ সময় পূর্বদেশগামী রেলপথ পাংশা থেকে কালুখালির তিন কিলোমেটার উত্তর (বহর কালুখালি) এবং বর্তমান রাজবাড়ি ‘গোদার বাজারে’র নিকটবর্তী স্থান দিয়ে রাজগঞ্জের বিপরীত ঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। তখন থেকে ‘গোদার বাজার’, বাজার হিসেবে পরিচিত লাভ করে। পূর্ববঙ্গের শাসনকার্য পরিচালনার উদ্দেশ্য সহজ যাতায়াত এবং অত্র অঞ্চলের ব্যবসা বাণেজ্যের প্রসারের উদ্দেশ্যে রেলপথ স্থাপন করে। মহকুমার অফিস প্রতিষ্ঠানসহ রেলস্থাপনা গড়ে ওঠায় স্থানটি শহরের মর্যদা পায়। ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টারের বর্ণনায় দেখা যায় ১৮৭৫ সালের জনুয়ারি মাস পর্যন্ত ইস্টার্ন রেলওয়ে মাছপাড়া থেকে কালুখালি হয়ে বেলগাছি থেকে উত্তর পূর্ব দিকে রাজবাড়ির উত্তর দিয়ে গোয়ালন্দ ঘাটের নিকটবতী স্থানে পৌঁছায়। তৎকালীন সময়ে ১৩ লক্ষ টাকা ব্যয় ইংরেজ প্রকৌশলীগণ ঘাটের পরিকল্পনা, রেল স্টেশন, মহকুমা অফিসারের কার্যালয়, ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট স্থাপন করে। বন্যা প্রতিরোধসহ নদী শাসনে ব্যবহৃত হয় রেলের রড রেলিং ও পাথর। (উড়াকান্দার নিকটবর্তী নদীর মধ্যে এসব বৃহৎ স্থাপনার কিছু কিছু নিদর্শন বর্তমান আছে)। রাজগঞ্জকে কেন্দ্র করে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটতে থাকে। গড়ে ওঠে আড়ৎ, দোকান, হোটেল, আবাস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস ইত্যাদি। স্থানটি পূর্ববঙ্গের অন্যতম বন্দর হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। বৃটিশ শাসনকর্তা বন্দরের উন্নতি ও এর বিস্তার ঘটাতে অধিক তৎপর হয়। কিন্তু রাজগঞ্জ বন্দর অধিক সময় স্থায়ী হল না। সর্বনাশা বন্যা ও নদী ভাঙ্গনে রাজগঞ্জের সকল স্থাপনা নদীরগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। নদী ভাঙ্গন ও ঘাট বারবার স্থানান্তরিত হওয়ার কারণে গোয়ালন্দে অবস্থিত মহকুমার অফিস আদালত বিদ্যালয়সহ সকল স্থাপনা ১৮৭৫ থেকে ১৮৯০ এরমধ্যে  রাজবাড়িতে সরিয়ে আনা হয়। ‘গোয়ালন্দ মহকুমা যেখানে অবস্থিত ছিল, পদ্মাগর্ভে বিলীন হওয়ায় গভর্নমেন্ট সাহায্যকৃত হাইস্কুলটি রাজবাড়ি স্থানান্তরিত হয় এবং তৎকালীন ডিপিআই সিএ মার্টিন সাহেবের অনুরোধে লক্ষ্মীকোল রাজবাড়ির জমিদার রাজা সূর্যকুমার গুহরায় উহার পরিচালনার সম্পূর্ণ ভার নেন। (আমার স্মৃতিকথা ত্রৈলোক্যনাথ ভট্টাচার্য-পৃষ্ঠা-৪)।

 

রেল সম্প্রসারণ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা পরিচালনায় বর্তমান স্টেশন বরাবর পূর্বে ও দক্ষিণে প্রায় এক বর্গকি মিটার জায়গা হুকুম দখল করে রেল স্থাপনা গড়ে তোলা হয়। ১৮৭৫ থেকে ১৮৯৫ এই বিশ বছরে পদ্মার তীর প্রবল ভাঙ্গনের কবলে পতিত হওয়ায় গোয়ালন্দ ঘাট বারবার স্থানান্তর করা হয়। এ সময়ের মধ্যে ভাঙ্গনের প্রকোপ এত বেশি ছিল যে কয়েক মাস পর পর ঘাটের স্থান পরিবর্তন করতে হত। এভাবেই গোয়ালন্দ ঘাট লক্ষ্মীকোল থেকে লালগোলা, লালগোলা থেকে উড়াকান্দা থেকে পুরশাহাটে স্থানান্তর করা হয়। পুরশাহাট এলাকায় চর জেগে ওঠায় ঘাট জামালপুরে যায়। জামালপুরে চর জেগে উঠলে আরও পূর্বে বেথুলীতে সরে আসে। এরপর কোষাহাটা। কোষাহাটা ভেঙ্গে গেলে কাটাখালি, কাটাখালি ভেঙ্গে গেলে দুর্গাপুর, এরপর ঘিওর বাজার এবং সর্বশেষ ১৯১৪ সালে ঘাট উজানচরের ফকীরাবাদ স্থায়ী হয়। উজানচরের ফকীরাবাদে থেকে উত্তর দিকে এক থেকে ছয় নম্বর পর্যন্ত ঘাটের সংখ্যা বাড়তে থাকে। মৌসুম ভেদে পানির গভীরতা অনুযায়ী স্টিমার ভিন্ন ভিন্ন ঘাটে নোঙর করত। কোনো ঘাটে সারা বছর জাহাজ নোঙর করতে পারতো না। বর্ষামৌসুমে কখনো উড়াকান্দায় ঘাট পিছিয়ে গেছে আবার শীত মৌসুমে ঘাট ছয় নম্বর সরে এসেছে। তবে ঘাট ৪/৫ মাইলের মধ্যে অগ্র পশ্চাৎ করলেও মূল প্রশাসনিক কাজ ফকীরাবাদ থেকেই পরিচালিত হত। ফকীরাবাদ ঘাট দীর্ঘদিন স্থায়ী হয় এবং এখানে গোয়ালন্দ ঘাট থানার প্রশাসনিক স্থাপনা গড়ে ওঠে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্রের নৌ পরিবহনের হেড কোয়ার্টার স্থাপিত হয় গোয়ালন্দে। ঢাকা-কলিকাতা যাতায়াতে রেল ও স্টিমারসংযোগ পথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নৌপথে মাদারীপুর, বরিশাল, চাঁদপুর, নারায়ণগঞ্জ প্রভৃতি স্থানে যাতায়াতে স্টিমার, লঞ্চ, বড় বড় নৌকা ইত্যাদি নৌযান ব্যবহার হতে থাকে। এদিকে কলিকাতা গোয়ালন্দ স্থলপথে রেল যোগাযোগে ট্রেন সার্ভিস বৃদ্ধি পায়। ঢাকা মেল, আসাম মেল, ওয়ান আপ, টু ডাউন প্রভৃতি নামের ট্রেন গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত নিয়মিত চলাচল করতে থাকে। স্থলপথে ট্রেন এবং নৌপথে স্টিমারের সাথে যাতায়াত সংযোগ স্থাপন করা হয়। বাঙালি, বিহারী মারওয়ারী এবং কিছু বিদেশী নানা ব্যবসা জাঁকিয়ে তোলে। পদ্মার ইলিশের স্বাদ ভারত খ্যাত। ইলিশ, পাঙ্গাস, রুই ইত্যাদি মাছের চালান কলিকাতা দিল্লী পৌঁছে যেত। দেশী-বিদেশী অনেক পণ্যের বাজার বসে গোয়ালন্দে। গোয়ালন্দের চড়ে এক/ দেড়মনি তরমুজ জন্মাত। দূর ভারতে এর ব্যাপক কদর ছিল। কলিকাতা দিল্লীতে রপ্তানি হত। এ সময় স্টিমারও ট্রেন থেকে পণ্য বহনকারী প্রায় পাঁচ হাজার কুলি কাজে নিয়োজিত থাকত। তারা ঘাট কুলী বলে পরিচিত ছিল। এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা করা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। ঘাট অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। স্বদেশী, কংগ্রেসী, কমিউনিস্ট, মুসলিমলীগ সকল রাজনৈতিক কর্মকান্ড বিস্তার লাভ করে। বিশেষ করে কমিউনিস্টদের তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। সাহিত্যিক শিল্পী লেখকদের ভিড় জমে। গোয়ালন্দ কেবল গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নয়, ভারতবাসীর কাছে তা হয়ে ওঠে বাংলার দ্বারপথ। ইংরেজরা গোয়ালীশ ল্যান্ড না বলে, বলত Gate way of Bengal.

 

গোয়ালন্দ মহকুমার কাজ শুরু হয়েছিল ১৮৭১ সালে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় থেকেই গোয়ালন্দ ঘাট পুলিশ স্টেশনের ব্যবস্থা করা হয়। থানা হিসেবে বিভিন্ন সময়ে গেজেটিয়ার, ইতিহাস সেনসাসে রাজবাড়ি জেলার গোয়ালন্দ, বালিয়াকান্দি ও পাংশার নাম পাওয়া যায়। রাজবাড়ি থানার কার্যক্রম শুরু হয় পড়ে। তবে নদী ভাঙনের কারণে মহকুমা ও থানার স্থাপনা রাজবাড়িতে গড়ে ওঠে এবং প্রশাসনিক কার্য গোয়ালন্দ নামে রাজবাড়ি থেকে সম্পাদন করা হত। গোয়ালন্দে ‘ঘাট থানা’ হিসেবে থানার কাজ করা হত।

 

১৯২০ সালের একটি পরিসংখ্যান

মহকুমা থানা পুলিশ স্টেশন এরিয়া বর্গমাইল জনসংখ্যা
গোয়ালন্দ গোয়ালন্দ গোয়ালন্দ ১১৫ ৭৪৩৪৬
    গোয়ালন্দ ঘাট ৫০ ৪২২৯৬
  বালিয়াকান্দি বালিয়াকান্দি ১২৪ ৮৭৬৮৭
  পাংশা পাংশা ১৬১ ১.২০.১৯১

সূত্র: ফরিদপুর গেজেটিয়ার ১৯৭৫

 পরিসংখ্যান নির্দেশ করে ১১৫ বর্গমাইলের গোয়ালন্দ থানা বর্তমান রাজবাড়ি থানার এরিয়া নিয়ে গঠন করা হয়েছিল। গোয়ালন্দ মহকুমা ও থানার প্রশাসনিক কাজ রাজবাড়ি থেকে সম্পাদিত হলেও ইতিমধ্যে গোয়ালন্দ থানার প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানসহ নানা অফিস শিক্ষা প্রতিষ্ঠন গড়ে ওঠে। ১৯৮৪ সালে রাজবাড়ি জেলা গঠনকালে গোয়ালন্দবাসী গোয়ালন্দকে জেলা ঘোষণার দাবি রাখে। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। গোয়ালন্দ নামে মহকুমা হলেও কোর্ট কাচারী, অফিস আদালত, রেল স্থাপনাসহ রাজবাড়ি বৃহৎ শহর বিধায় রাজবাড়িবাসির দাবিতে শেষ পর্যন্ত ঐক্যমতের ভিত্তিতে ‘রাজবাড়ি’ নামে জেলা ঘোষণা করা হয়। গোয়ালন্দর সামনে চর জেগে ওঠার বিগত শতাব্দীর ৭০ দশকের মাঝামাঝি ঘাট দৌলতদিয়া স্থানান্তর করা হয়। দৌলতদিয়া এখন বাংলাদেশের দক্ষিণের দ্বারপথ।

প্রফেসর মতিয়র রহমান


মহানায়ক স্বামী সমাধি প্রকাশারণ্য

মহানায়ক স্বামী সমাধি প্রকাশারণ্য-মহানায়ক যাঁর তত্ত্ব, আদেশ, উপদেশ, কর্ম পরিধি

স্বামী সমাধি প্রকাশারণ্য কিংবদন্তির মহানায়ক যাঁর তত্ত্ব, আদেশ, উপদেশ, কর্ম পরিধি, বিদেশ বিভুঁইয়েও কথিত। রাজবাড়ী জেলা নলিয়া জামালপুরের ঊনবিংশ শতাব্দীর আশির দশকে জন্মগ্রহণ করেন স্বামী সমাধি প্রকাশারণ্য। বাল্যকালে তার নাম ছিল নরেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যয়। সাধারণ লোকে বলে নরেশ পাগলা। এই নরেশ পাগলাই পরে আর্যসংঘের প্রতিষ্ঠা ও সভাপতি।

স্বামী প্রকাশারণ্য তৎকালীন সময় প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে ইংরেজিতে এমএ পাশ করেন। ছাত্রকালীন শ্রী রামকৃষ্ণের মানসপুত্র ব্রহ্মনিন্দ মহারাজদের সাথে তার আলাপচারিতা ছিল। লেখাপড়া শেষে তিনি বালিয়াকান্দি হাই স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। পনের বছর তিনি এ পেশায় ছিলেন। ব্রক্ষচারী সাধক এতে তুষ্ট হননি। পিতা বিবহ দেন কিন্তু তিনি ঘর সংসারে আটকে থাকেন না। কোন সুদূরের পিয়াসা তার মধ্যে। শিক্ষক জীবনেই তার বানপ্রস্থ অবস্থা। শিক্ষকতা কাজে থাকাকালীন তার বেশভূষা দেখলেই বোঝা যেত তিনি একজন সাধক বা সাধু পুরুষ। পরনে হাঁটু পর্যন্ত লম্বিত পাজামা, গায়ে খদ্দরের হাফ জামা, পায়ে সেন্ডেল। মাথায় তেলহীন চিকন কালো চুল। দীর্ঘ ঋজু দেহ। গৌরকান্তি তেজোদ্দীপ্ত চেহারা দেখলেই বোঝা যায় তিনি অপবিগ্রহ সাধকের মূর্ত প্রতীক।

ফরিদপুর জেলার শিক্ষক সম্মেলনে যোগদান করেন। সেখানে তাঁর অভিভাষণ থেকে চালু হয় বিদ্যালয়ে প্রাথমিক ধর্ম শিক্ষা। যেখানে ধর্ম সভা, কীর্তন, ভাগবত পাঠ, ধর্মালোচনা সেখানেই মাস্টার মশাই। বাল্যকাল থেকেই ব্রাহ্মণ হয়ে আচণ্ডাল শুদ্রদির সাথে মিশে গেছেন। তাদের অন্ন ভোজন করেন। বুঝেছিলেন জাতি ভেদ প্রথা সমাজ প্রভূত ক্ষতিসাধন করছে। এর বিরদ্ধে ঘোষণা করেছিলেন বিদ্রোহ। লিখলেন, জাতিকথা পরশমণি। এসকল পুস্তকে প্রমাণ করলেন জাতিভেদ প্রথার অসারতা। সত্যের সন্ধানে দিনাজপুরের এক হাঁড়ি তার কাছে দীক্ষা প্রার্থী হলে স্বামীজি নিজেই দীক্ষাগ্রহণ করলেন দিনাজপুরে তার বাড়িতে যেয়ে।

ব্রহ্মচারীর মুক্তি মনুষ্য জীবনের পরম কাম্য। এ পথে আসতে হলে প্রয়োজন ব্রহ্মকালচার বা সমাধি সাধন। দীক্ষা গ্রহণের পর তিনি ‘স্বামী সমাধি প্রকাশারণ্য’ নাম গ্রহণ করেন। প্রতিষ্ঠা করেন আর্য সংঘ। আর্য সংঘের মাধ্যমে তিনি তাঁর মত, পথ ওত্ত্ব প্রকাশ করেন। তিনি বলেন জন্মান্ত রবাদ কোনো মিথ্যা নয়। উহার সদৃশ্য দার্শনিক যুক্তির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব। এর থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় সাংখ্য যোগ। তিনি ঘোষণা করেন সমাধি জাত বিজ্ঞানই সম্যক বিজ্ঞান। তা দ্বারাই দুঃখের নিবৃত্তি হয়। গৌতম বু্দ্ধ বা শ্রী রামকৃষ্ণের মতো তার মতবাদ তৎকালীন পূর্ববাংলাসহ ভারতে বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তার লাভ করে। গড়ে ওঠে সংঘ, মঠ, সমাধি, আশ্রম। এরই সূত্র ধরে তৎকালীন পশ্চাৎপদ জনপদ জঙ্গল ইউনিয়নে ১৯৩৯ সালে গুরুজীর ইচ্ছা ও দরদী মনের পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় আর্য সংঘ আশ্রম, মঠ ও মন্দির। স্থাপিত হয় হাট-বাজার পোস্ট অফিস, আর্য সংঘ বিদ্যালয়। আশ্রম প্রাঙ্গণে প্রতিষ্ঠা করলেন পার্থ সারথী মন্দির। স্থানের নাম দিলেন সমাধিনগর। এখানে বরেণ্য ব্যক্তির আগমন ঘটে। সমাধিনগর পার্থ সারথী মন্দির আশ্রম ভগ্নপ্রায়।

 

(প্রফেসর মতিয়র রহমান)

হযরত জামাই পাগল মুর্শিদ (রহঃ)

হযরত জামাই পাগল মুর্শিদ (রহঃ)

হযরত জামাই পাগল মুর্শিদের (রহঃ) এঁর জামাই পাগল তাঁর প্রকৃত নাম নয়। ইহা তাঁর উপাধি। মুর্শিদের প্রকৃত নাম জানা যায় নাই। আলাদিপুরে আসার পূর্বে তিনি পাংশায় ছিলেন এবং সেখানেই ‘জামাই পাগল’ উপাধি হয়েছিল। এরপর তিনি পাংশায় বেশি দিন থাকেন নাই। পাংশা থেকে রাজবাড়ী হয়ে আলাদিপুর আসেন। এখানকার মানুষ তাঁকে ‘মুর্শিদ’ বলে সম্বোধন করতেন। এই ‘জামাই পাগল’ এবং ‘মুর্শিদ’ সংযোগে তাঁর নাম ‘জামাই পাগল মুর্শিদ’ হয়। তিনি আমাদের সকলের কাছে ‘জামাই পাগল মুর্শিদ’ নামে পরিচিত। মুর্শিদ এই অঞ্চলে কখন আসেন তা কেহ সঠিক ভাবে বলতে পারে নাই। তবে দুইটি ঘটনা থেকে তাঁর আগমন এবং বেছলের সময় নির্ণয়ের চেষ্টা করব।

কোমর পাড়ার জনাব মো: কোকিল উদ্দিন মিয়া ওরফে ছোট বিষু সাহেব বলেন, ২০০৯ সালে তাঁর বয়স একশত দশ-এগার বছর। সে হিসেবে তাঁর জন্ম সাল হয় ১৮৯৯ (বাংলায় ১৩০৬, জ্যোষ্ঠ্য মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ, শুক্রবার) এবং সঠিক। তিনি মুর্শিদকে দেখেছেন ৮ অথবা ১০ বছর বয়সে। সে হিসেবে ধরে নেওয়া যেতে পারে মুর্শিদ এখানে ১৯০৭ বা ১৯০৯ সালে ছিলেন অথবা এই সময়ের আগেই এসেছিলেন। আবার তার বয়স যখন ১৫/১৬ তখন যদি মুর্শিদ বেছালে গিয়ে থাকেন তবে মুর্শিদের বেছালের সাল হয় ১৯১৪/১৯১৫। জনাব শামসউদ্দিন আহম্মদ খান বলেন, ‘আমার বাবা মরহুম জনাব আলী মদ্দীন খান ৭০/৭২ বছর বয়সে ১৯১৬ সালে দুনিয়া ত্যাগ করেন। সে হিসেবে তাঁর জন্ম সাল হয় ১৮৯০/১৮৯২। আমার নিজের জন্ম সাল ১৯৪২ (বাংলা ১৩৪৯)। সে সময়ে আমার বড় ভাইয়ের বয়স ছিল ১০/১২ বছর। সে হিসেবে ভাইয়ের জন্ম ১৯৩২/১৯৩০ সালে। তার বয়স যখন ৬/৭ তখন ইংরেজী সাল ১৯৩৮/১৯৩৭। তখন বাবা ভাইকে নিয়ে মুর্শিদের নিকট গিয়েছিলেন’। তাহলে দেখা যায় যে, মুর্শিদ ১৯৩৮/১৯৩৭ সালের দিকেও জীবিত ছিলেন। বিষু সাহেবের দিক থেকে হিসাব করলে দেখা যায় মুর্শিদের আগমন ১৯০৬ সালের দিকে এবং ১৯১৪-১৫ সালের দিকে বেছালে যান। অর্থাৎ ১৯০৬ সালের আগে বা পরে তিনি এখানে আসেন। কিন্তু বেছালে যান। অর্থাৎ ১৯০৬ সালের আগে বা পরে তিনি এখানে আসেন। কিন্তু বেছলের সময়ে ভিন্নতা দিখা যায়। অনুমান করা যায় মুর্শিদ এই অঞ্চলে আসেন ১৯০০ সালের পরে। কারণ বিষু সাহেবের বয়স যখন এক/দেড় বছর তখন মুর্শিদ পাংশায় ছিলেন। কিন্তু একটি সুত্রে জানা যায়, মুর্শিদ ১৯৪৮ (বাংলা ১৩৫৪ সালের ১৫ ফাল্গুন) সালের মার্চ মাসের কোন একদিন বেছাল ফরমান । প্রতি বছর বাংলা ফাল্গুন মাসের পনের তারিখে উরশ শরীফ ও বাৎসরিক মাহ্‌ফিল উদ্‌যাপিত হয়।

মুর্শিদের মাজার শরীফ আলাদিপুর বাজার থেকে আধা কিলোমিটার পশ্চিমে এবং রাস্তার বাম পার্শ্বে অবস্থিত। মাজার শরীফ সুন্দর ও মনোরম পরিবেশে অবস্থিত। রাস্তা থেকে মাজার পর্যন্ত একটি খোলা মাঠ ও রাস্তা সংলগ্ন মসজিদ আছে। এই মাঠে ঈদের জামাত এবং উরশের সময় মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। মাজার শরীফটি বিঘা খানেক জায়গায় নিয়ে আছে। মাজার ভবনের মধ্যে জামাই পাগল মুর্শিূদের রওজার ডান পার্শ্বে তাঁর খাদেম নূর বাকের শাহর কবর এবং তাঁর ডানে মহিলা খাদেম গৌরী বালার কবর দেখা যায়।

মুর্শিদকে যারা দেখছেন এমন ব্যক্তিদের মধ্যে একজন বর্তমানে জীবিত আছেন। তিনি হলেন কোমর পাড়ার ছোট বিষু সাহেব। এই শতবর্ষী মানুষটি মুর্শিদের সাথে তার শৈশর জীবনের ঘটনা বলেছেন। তাছাড়া তিনি যা দেখেছেন এবং প্রত্যাক্ষ করেছেন এরুপ অনেক ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তাঁর স্বরণে যেটুকু এসেছে এবং ধৈর্য সামর্থ্য হয়েছেন ততটুকু দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। সেগুলো ইতিহাসের পাতায় লপিবদ্ধ থাকবে। মরহুম জনাব আলী মদ্দিন খানকে লোকে আলফু খাঁ বলে সম্বোধন করতেন। বিষু সাহেবের সাথে তার ভাল সম্পর্ক ছিল। তিনিও মুর্শিদকে দীঘ সময় পেয়েছিলেন। জনাব শমসউদ্দিন আহম্মদ খান তাঁর বাবা মরহুম জনাব আলী মদ্দিন খান থেকে কেছু ঘটনা শুনেছেন এবং সে গুলোর কিচ্ছু তথ্য কর্ণনা করেছেন। আর উল্লেখযোগ্য কোন ব্যক্তির নিকট থেকে তেমন কোন তথ্য নিতে পারি নাই। যদি আজ থেকে পনের-বিশ বছর পূর্বে একাজে হাত দিতাম তাহলে পান্ডুলিপির আকার অনেক বড় হত। এতে কোন সন্দেহ ছিল না। কারণ এই সময়ে মধ্যে অনেক প্রবীণবর্গ দুনিয়া ত্যাগ করেছেন যারা মুর্শিদকে দেখেছেন এবং তাঁর সান্নিধ্য লাভ করেছেন। তারা মুর্শিদের কোন ঘটনা সংরক্ষণ করে যান নাই। সে সময়ে মানুষেরা যাই দিখেছেন বা শুনেছেন কেহ তা সংরক্ষণের বিষয়ে আগ্রহ করেন নাই। সে জন্য অনেক ঘটনা বা কাহিনী কালের গহ্বরে হারিয়ে গেছে। অবশিষ্ট, মানুষের মুখে মুখে কাহিনী রুপে বিবৃত হয়ে এসেছে।

মুর্শিদ যশোরে পুলিশ ডিপার্টমেন্টে চাকুরী করতেন এবং সেখানে সার্কেল অফিসার ছিলেন। তার জন্ম স্থান, পরিবর-পরিজন, কোন বংশের সে সম্বন্ধে কোন তথ্য পাওয়া যায় না। যশোরে থাকার সময় বিয়ে-শাদি করেছিলেন কী না বা করলেও তাঁর কোন সন্তান ছিল কী না সে  বিষয়েও কোন তথ্য পাওয়া যায় না। তিনি সে সময়ে একটি জটিল রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ইতোমধ্যে তাঁর সাথে একজন দরবেশের সাক্ষাত হয়। দরবেশের নিকট তাঁর বীমারগ্রস্থতার কথা জানান। উক্ত দরবেশ তাঁকে বলেন, ‘সব ভাল হয়ে যাবে যদি সব ত্যাগ করে আসতে পার’। মুর্শিদ তাঁর কথায় সব ত্যাগ করে দরবেশের সঙ্গী হয়ে যান। এর পর তাঁর সম্পর্কে আর কিছু জানা যায় না। জীবনের কোন এক পর্যায়ে মুর্শিদ পাংশায় চলে যান। পাংশায় কখন এবং কিভাবে যান সে বিষয়ে কোন তথ্য নাই। শুনেছি পাংশা বাজারের অলি-গলিতে ঘুরে বেড়াতেন এবং নিকটস্থ কমুদিনী নামে এক মহিলার ঘরের বারান্দায় রাত কাটাতেন। কমুদিনী প্রতিদিন মুর্শিদের থাকার জায়গা লেপে-পুছে দিতেন। সেখানে মুর্শিদ ‘পাগল’ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। এক পর্যায়ে বিয়ের ঘটনা থেকে লোকে তাঁকে ‘জামাই পাগল’ বা ‘পাগল জামাই’ বলেন।

প্রত্যক্ষদশী বলেছেন মুর্শিদ খুব কালো ছিলেন। মাথায় চুল ছিল না এবং শরীর বেশ মোটা ও মেদ ছিল। উচ্চতা মাঝারী গড়নের ছিল, চক্ষুদ্বয় রক্তিম এবং ভয়ার্ত ছিল। মোট কথা তাঁকে দেখলে ভয়-ভয় লাগত। সারাক্ষনই নাকি শরীরে কাদা-মাটি মাখা থাকত এবং বসনবিহীন অবস্থায় থাকতেন। তবে কোন আলেম লোক দেখলে কারো কাছ থেকে গামছা বা কাপড় নিয়ে পর্দা করতেন। আবার কখনও লেংটি পরে থাকতেন। পেট বড় থাকায় তাঁর নফসটি দেখা যেত না। তাঁকে কোন কথা বললে তিনি একই কথা বলে পুনঃরাবৃত্তি করতেন। কথা গুলো যখন বলতেন তখন একটু কাব্য ভঙ্গিমায় বলতেন।

রামকান্তপুর রাঁধাগঞ্জ বিলের পশ্চিম তীরে মোহন সাহ’র বটতলায় একটি বড় বাজার ছিল। এই মোহন সাহ বারবাকপুরের জমিদার ছিলেন। তার কোন ওয়ারিশ না থাকায় ভাবেন তার মৃত্যুর পর তাকে কেহ স্বরণ করবে না। এই অনুভূতি থেকে তিনি ঐ জায়গায় একটি জিকা গাছ ও বটগাছ লাগান। তাই আজ মোহন সাহর বটতলা নামে খ্যাত। সত্যিই আজও মানুষ তাকে স্বরণে রেখেছে। এখন ঐ বাজারের আকার অনেক ক্ষুদ্র হয়ে এসেছে। বর্তমানে মাত্র সাত-আটটি দোকান ঘর আছে। পূর্বে দূর-দূরান্ত থেকে প্রচুর লোকের সমাগম হত। বিলটি বহু দূর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল ফলে নৌকায় করে বণিকেরা আসত তাদের পণ্য নিয়ে। এখন এই বাজারের খ্যাতি বিলিন হয়ে গেছে। বাজারের এক দোকানি মুর্শিদের সাথে অন্যায় আচরণ করে ফলে বাজারটি আগুনে ধ্বংস হয়ে যায়। তারপর থেকে ঐ বাজারের পতন ঘটতে থাকে। বিষু সাহেব বলেন তার দেখা মতে চায় বার বাজার বসানোর চেষ্টা করা হয় কিন্তু সম্ভব হয়নি। প্রায় সময়েই আগুন লেগে পুড়ে যায়। বাজারটি মোহন সাহর বটতলার বাজার নামে পরিচিত ছিল। বছর কয়েক হলো স্থানীয় লোকজন একে মুর্শিদের বাজার বলে থাকে।

রাঁধাগঞ্জ বিল এক সময় একটি খরস্রোতা নদী ছিল। তাও সাত-আটশত বছর পূর্বের কথা। হযরত শাহ্‌ জঙ্গী (রহ:) এঁর একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে মারা যায়। সেই নদীর চিহ্ন এখনও আছে সুতা গাং নামে। এই রাঁধাগঞ্জ মুর্শিদ নাক ভাসিয়ে ডুবে থাকতেন। সারা দেহে বড় বড় জোঁক লেগে থাকত। তিনি যখন উঠে দাঁড়াতেন তখন জোঁকগুলো ঝোড়ে পরে যেত। মুর্শিদ আবার জোঁকগুলোকে উঠিয়ে দিতেন আর বলতেন যাস্‌ কেন? যাস্‌ কেন? খা! খা! বিষু সাহেব বলেন, দেখেছি জোঁকগুলো মুর্শিদের দেহের রক্ত খেত না। তাঁর সাখে অন্য কেহ পানিতে নামলে তাদেরকে জোঁক স্পর্শ করত না। তিনি বিলের কাদা-মাটিতেই বোশি সময় থাকতেন তাই সারা শরীরে কাদা মাখা থাকতো। মুর্শিদের থাকার নির্দিষ্ট কোন স্থান ছিল না। কখনও মোহন সাহর বটতলায় আবার কখনও রামকান্তপুর পাঠান পাড়ায় কারও ঘরের বারান্দায় আবর কখনও রামকান্তপুর পাঠান পাড়ায় কারও ঘরের বারান্দায় আবার কখনও খড়ের গাদায় শুয়ে থাকতেন।

মুর্শিদের এরকম এলোমেলো চলাফেরার এবং নামাজ-রোজা না করার জন্য স্থানীয় কিছু সংখ্যক লোক জন তাঁর বিরোধীতা করে। এক পর্যায়ে এই বিরোধীতা চরমে পৌঁছায়। তৎকালীন সময়ে রাজবাড়ী সোনাকান্দরে জৈনপুরের পীরের মুরীদ ও খলিফা জনাব আব্দুল লতিফ মৌলভী সাহেবের দ্বারস্থ হয়েছিল এলাকাবাসী। জনাব আব্দুল লতিফ মৌলভী সাহেব তাদেরকে বলেন, আমি মুর্শিদের সঙ্গে কথা বলব তারপর যা করার করব, তার আগে যেন কোন অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। এলাবাসী মুর্শিদকে আব্দুল লতিফ মৌলভী সাহেবের আসার ব্যাপারে বলেছিলেন কি না তা জানা যায় নি। তবে আব্দুল লতিফ মৌলভীকে আসতে দেখে মুর্শিদ এক টুকরা কাপড় পরে তাঁর নিকট যান। মৌলভী সাহেবের সাথে তিনি অতি সাধারণ ও স্বাভাবিক ভাবে আলাপ আলোচনা করতে থাকেন। অভিযোগকারীরা দুরে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকেন। জনাব মৌলভী সাহেব তাঁর কাছে জানতে চান আপনি বিবস্ত্র থাকেন কী না? জবাবে মুর্শিদ বলেন, বিবস্ত্র থাকি তবে কোন মানুষের সামনে থাকি না। এ ভাবে মৌলভী সাহেবের সাথে তাঁর অনেক সময় ধরে আলোচনা হয়। আলোচনা শেষে আব্দুলি লতিফ মৌলভী স্থানীয় লোকদের বলে যান মুর্শিদ ঠিক আছে। তিনি শরীয়ত মত চলুক আর নাই চলুক তাঁর কাজ-কর্মে কোন প্রকার বাঁধা দিবে না এবং কোন প্রকার সমালোচনাও করবে না। তাঁকে তোমরা চিন নাই এবং তাঁর কর্ম-কন্ড তোমাদের বুঝের বাইরে। এলাকাবাসীকে এই উপদেশ দিয়ে তিনি চলে যান। শুনেছি, আব্দুল লতিফ মৌলভীর সাথে মুর্শিদের যোগাযোগ হতো নিয়মিত।

মৌলভী সাহেব পরে একবার এসে দেখেন, মুর্শিদ একটি দাঁড়ান কলাগাছের পাতায় দাঁড়িয়ে আছরের নামাজ আদায় করছেন। মৌলভী সাহেব এই দেখে এলাকা বাসীকে বলে যান, এই কলাগাছের জায়গাতে মুর্শিদের কবর হবে। তাই জায়গাটি পরিস্কার করে রাখতে বলেন। মূলত: সেখানেই মুর্শিদের মাজার হয়। শুনেছি, এ আব্দুল লতিফ মৌলভী সৌদি আরবে ইন্তেকাল করেন এবং জেদ্দায় মা হাওয়া (আ:) এঁর রওজার পাশে তাঁর কবর।

মুর্শিদ জীবদ্দশায় অনেক বঞ্চনার শিকার হয়েছিলেন। এই মানুষগুলো তাঁর সাথে বিরোধীতা ও নানা ধরণের অপব্যবহার করেছিল। কেহ ঘৃণার দৃষ্টি দিয়ে দেখত আবার কেহ দা-কুড়াল,লাঠি দিয়ে আঘাত করতো। একবার পাঠান পাড়ার জনৈক ব্যাক্তি মুর্শিদকে দা দিয়ে হাতে কোপ দিয়েছিল। যার জন্য এলাকায় কলেরার প্রাদুর্ভাব হয়ে শত শত লোক মারা গিয়েছিল।     ঐ ক্ষত স্থানে পোকা হয়েছিল। তিনি কখনও ঐ পোকাকে তাড়িরে দেন নাই বরং কোন পোকা পড়ে গেলে তা আবার উঠিয়ে দিতেন এবং বলতেন, যাস কেন? খা! জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি ঐ পোকা তাঁর দেহে লালন-পালন করেছেন। বলতেন, ‘ওরা যাবে কোথায়? থাকুক না এখানে। মরণের পর তো ওরা এমনিতেই খাবে’। কেমন দয়ার সাগর মুর্শিদ ছিলেন যা ইতিহাসে বেরল। তিনি নবীও নন আবার সাহাবীও নন। কিন্তু ধৈর্য-সহ্য, ত্যাগ-তিতিক্ষা, কষ্ট-সহিষ্ঞুতায় এবং ক্ষমাশীলতার অপূর্ব নিদর্শন সৃষ্টি করেছেন। যা অতীতের নবী হযরত আ’য়ুব১ (আ:) এঁর ক্ষেত্রে দেখা যায়। এরুপ কঠিন পরিক্ষায় অবর্তীণ হতেন যা যুগে যুগে নবী-রাসুলগণ এবং আল্লহ্‌র প্রেমিকগণ সকলেই উত্তীর্ণ হয়েছেন। প্রভুর প্রেমে বিভর বান্দাগণ কঠিন পরীক্ষায় আহ্! শব্দটি পর্যন্ত করেন নাই। আখেরাতের একটি আহ্‌! শব্দের উচ্চারণের মধ্যে দুনিয়ার অসংখ্য জীবনকাল অতিবাহিত হয়ে যাবে। সুতরাং মওলার প্রেমিকেরা কখনও আহ্‌! শব্দটি মুখে বা অন্তরে স্থান দেন নাই।২ মনে হয়, আল্লাহ্‌ প্রেমের অপার রহস্য এখানেই নিহিত আছে। বেছালের সময় বা পরে মানুষ তাঁর কাছে আসে নাই। কারণ, তার গায়ে পোকা ও দুর্গন্ধ ছিল তাই সাধারণ লোকেরা তাঁর কাছে আসত না। এভাবে আল্লাহ্‌র আশেকের দেহ পড়ে থাকতে পারে। তাই মহান আল্লাহ্‌ তাঁর আশেকের জানাজার জন্য অদৃশ্য জগত থেকে পবিত্র আত্নাদের পাঠিয়েছেন সকল সরঞ্জাম সহ। দুনিয়ার মানুষেরা তাঁকে না চিনলেও আল্লহ্‌ তাঁকে চিনেছেন। দুনিয়ার মানুষেরা তাঁকে গ্রহণ না করলেও তাঁর প্রভু তাঁকে ঠিকই গ্রহণ করেছেন। দুনিয়ার সকল উপাদান ত্যাগ করে যিনি এক আল্লহ্‌র হয়েছেন তাই আল্লাহ্‌ পাকও তাঁকে দুনিয়া ব্যতীত একক রুপে গ্রহণ করেছেন। এখানেই আশেক ও মাশুকের যাবতীয় খেলার রহস্য বিদ্যমান।

ইতিহাসের পাতায় অনুসন্ধান করলে দেখা যায় মানুষ যুগে যুগে অলী-আউলিয়াদের বিরোধীতা করতো। এমন কি তাঁদের সঙ্গে অবর্ণনীয় খারাপ ব্যবহার করতো। ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আবর্তে জড়িয়ে পরত। লোক মুখে প্রচারিত হতে থাকে অমুক অলী বা পাগলের সাথে এরুপ ব্যবহারের জন্য অমুকের সেরুপ ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু এরুপ দেখা যায় না যে অমুক অলীর সংস্পর্শে অমুক অলি হয়ে গেছে। এটা সে সময় মানুষের জন্য দূর্ভাগ্য ছিল। যা সময় পরিক্রমায় বর্তমানে ঢের বেশী। এ জন্য দেখা যায় অলী আল্লাহ্‌দের ঘটনা সমূহ বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে শাস্তি মুলক বিবৃত হয়েছে কিন্তু খুব কম সংখ্যকই প্রশংসা মূলক এসেছে। ইতিহাসে পরিদৃষ্ট হয় যে, মানুষ নেতিবাচক দিকগুলোই বেশী স্বরণ রাখে। ইংরেজী ১৭০০ সালের মাঝের দিকে মধ্যপ্রাচ্যে ওহাবী আন্দোলন৩ শুরু হয়েছিল। তখন প্রবল গতিতে এই মতবাদ প্রচার ঘটে ইংরেজ বাহিনীর সহায়তায়। এই মতবাদের মূলে অলী-আউলিয়া বিদ্বেষ বিদ্যমান এবং তৎকালীন সময়ে লাখ সূন্নী মুসলিম জনতাকে হত্যা করা হয়েছিল। তার প্রভাব আমাদের উপমহাদেশেও বিস্তার লাভ করেছিল এবং অলী বিদ্বেষের বিষবৃক্ষ এখানেই রোপিত হয়েছিল। বর্তমানে এই বিষবৃক্ষের শাখা-প্রশাখা বিস্তার লাভ করে সমাজ ও স্থান-কাল ভেদ সকল কিছুকে গ্রাস করে ফেলেছে।

শুনেছি, শুধু গহের ফকির মুর্শিদের সাথে চলে কিছু পেয়েছিলেন। গহের ফকিরকে নাকি রাঁধাগঞ্জ বিলের পানিতে ডুবিয়ে তার পিঠের উপর দাঁড়িয়ে থাকতেন। শুনা যায়, যারা মুর্শিদের সাথে যেয়ে ফিরে এসেছে তারা সকলেই ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। জনাব বিষু সাহেব বলেন, ‘জনৈক আলেম লোক মুর্শিদের সাথে কিছুদিন চলেন। একদিন মুর্শিদ রাঁধাগঞ্জ বিলের পানিতে ঘন ঘন ডুব দিতে থাকেন আর পায়খানা করতে থাকেন। সহচরকে বলেন,তাঁর সাথে পানিতে নেমে ডুব দিতে। কিন্তু লোকটি মুর্শিদের পায়খানা করার দৃশ্য দেখে ঘৃণা হয়। ফলে লোকটি আর পানিতে নামে না। মুর্শিদ তাকে তাড়িয়ে দেয়। শুনেছে লোকটি বেশী দিন বাঁচে নাই’। আবার কিহ বড়শি দিয়ে মাছ ধরতে থাকলে মুর্শিদ পানিতে নেমে অবিরাম ডুব দিতে থাকেন। পানিতে ঢেউ এর ফলে তারা মাছ ধরতে পারতো না। তাই মাছ ধরার লোকেরা তাঁকে বকাবকি করত। মুর্শিদ পানি থেকে উঠে এসে মাছ ধরার লোককে ধরে নিয়ে পানিতে ডুবিয়ে দিতেন আর বলতেন এখন মাছ ধর যেয়ে। এরপর তারা অনেক মাছ ধরতে পারতো। আজও মুর্শিদের স্মৃতি বিজড়িত মোহন সাহের বটতলায় কেহ জেনে শুনে প্রকৃতির কাজ সম্পন্ন করে, তাহলে তাকে তার শাস্তি পেতে হয়। দেখা যায়, দূর-দূরান্ত থেকে জাত-কূল নির্বিশেষে ভক্তবৃন্দ সেখানে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেন। অনেকে বলেছেন আজো মুর্শিদ মোহন সাহের বটতলায় গভীর রাতে বসে থাকেন। মুখে কথা বলে না, হাত বা মাথা দিয়ে সারা দেন। তাঁকে ধরেওে দেখেছে, বাড়ীতেও নিয়ে ভাত খাওয়ায়েছে। কাপড় পরিয়েছে, সঙ্গে হেঁটেছেন এরই ফাঁকে অদৃশ্য হয়ে গেছেন। হাঁটতে হাঁটতে শাহ্‌ সাহেবের মাজারের দিকে গেলেই অদৃশ্য হয়ে যান। তারা বুঝতে পারে ইনিই মুর্শিদ। এগুলো ভাবাবেগের  কথা নয় বরং এটাই সত্য। মুর্শিদের বেছালের পরে অনেকেই তাঁকে বিভিন্ন ভাবে একাধিক জয়গায়  দেখেছেন। দুঃখে ভারাক্রান্ত ভক্তের সঙ্গে নির্জনে সাক্ষাত দিতেন এবং তাদের মনবাসনা পুরণ করতেন। তত্ত্ব জ্ঞনীগণ বলেন, ‘মুর্শিদ আমাদের গৌরব, আমাদের অহংকার এবং আমাদের কিংবদন্তী’। আজও অসহায়, এতিম, অনাথ অভাবগ্রস্থ, নির্যাতিত ও নির্যাতিতা, ব্যাধিগ্রস্থ জনতা, বেদনায় কাতর যিয়ারতকারী এবং ফায়েজ অনুসন্ধানীরা খুঁজে ফেরে মুর্শিদকে তাদের মুর্শিদের মাজারে।সত্যিই মুর্শিদ তাঁদের সকলের কিংবদন্তী যে কিংবদন্তী কোন লয় নেই। তিনি সকলের আশ্রয় দানকারী, অসহায়ের সহায় অনাথের নাথ বিপদগ্রেস্থর উদ্ধাকারী। তিনি চিরন্তন হয়ে আছেন ভক্তের হৃদয়ের গভীর। চির অম্লান হয়ে থাকবেন অজস্র ভক্তের মাঝে।

জনাব বিষু সাহেব বলেন, ‘মুর্শিদের বেছালেন পর আমরা তাঁর কবর বাঁশ দিয়ে ঘিরে দিয়েছিলাম। পরবর্তীতে নূর বাকের শাহ্‌ ইট দিয়ে ভবন নির্মাণ করেন। মুর্শিদের বেছালের পর স্থানীয় লোকেরা তাঁর কবর  স্থান থেকে গভীর রাতে বাঘের ডাক শুনতেন। তাঁর মাজারের উপর যে ভবন আছে তা কতদিন পূর্বে নির্মাণ হয়েছিল তা সঠিক ভাবে জানা যায় নাই। গত শতাব্দীর শেষ প্রান্তে এসে কিছুটা বর্ধিত করা হয় এবং শোভা বর্ধন করা হয়। মাজারের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে তাঁর গোসল গাহ এখনও সংরক্ষিত আছে।

এক ভক্ত বলেন মুর্শিদের মাজারে উরসের সময় যেতাম। অনেক লোকের সমাগম হত এবং বহু দূর-দূরান্ত থেকে লোকেরা উরস ও মাহ্‌ফিল আসে। মুর্শিদের মাজারে অনেক অচেনা-অজানা পাগল, মজ্জুব অলী ও সাধকগণ আসেন। একটি সূত্রে জানা যায় যে, মুর্শিদ (বাংলা১৩৫৪ সালের ১৫ ফাল্গুন) ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসের কোন এক তারিখে বেছাল শরীফ যান। সঠিক কি না তা আল্লাহ্‌ই ভাল জানেন। প্রতি বছর ১৫ ফাল্গুন মহা সমারহে উরশ শরীফ উদ্‌যাপিত হয়। কবির ভাষায় বলতে হয়:

কঠিন জীবন-পথের অক্লান্ত সৈনক

মুর্শিদ ঘুমায় হেথা চির-নির্ভীক।

অশেষ স্মৃতি হোক চির অম্লান,

ফায়ুজাতে ভক্তগন করুক স্নান।

 

হযরত নূর বাকের শাহ্‌ (রহঃ)

জামাই পাগল মুর্শিদের পর জনাব নূর বাকের শাহ্‌ তাঁর মাজারে খেদমতে আত্ননিয়োগ করেন। তিনি সম্ভবত পাকিস্থান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কয়েক বছর পর মুর্শিদের মাজারে আসেন। ১৯৯০ ইং সালে, বাংলায় ১৩৯৭ সালের ২৫ বৈশাখ রোজ বুধবার বেছলে যান। বিষু সাহেব বলেন, ‘নূর বাকের শাহ্‌র বাড়ী  পাবনা জেলার খাঁপুরে। সেখানে তিনি চারটি ডাকাত দলের সরদার ছিলেন। সেখান থেকে কিভাবে যেন কোলার হাটের নিকটস্থ দক্ষিণ গাবলায় আসেন এবং এক বিধবা মহিলার বাড়ীতে কাজকর্ম করতেন। পাবনায় থাকা অবস্থায় তাঁর একটি কন্যা ছিল এবং স্ত্রী মারা গিয়েছিল। দক্ষিণ গাবলায় বিধবা মহিলারও একটি ছেলে ছিল। অনেদিন কাজ করার পর ঐ মহিলাকে বিয়ে করেন। নূর বাকের শাহের কন্যা ও মহিলার ছেলেটি আছে। তারপরে কোন এক সময় তিনি মুর্শিদের মাজারে আসেন। তিনি মুর্শিদদের জীবিত থাকা অবস্থায় এসেছিলেন কি না তা জানা যায় নাই। তবে খুব সম্ভব তিনি মুর্শিদকে পেয়েছিলেন।

 

জনাব হযরত নূর বকের শাহ্‌র কিছু কথা জনাব শামস্‌উদ্দিন আহম্মেদ খান সাহেবের নিকট থেকে শুনেছি। তার সাথে তাঁর ভাল সর্ম্পক ছিল। তিনি ছালা পড়তেন আবার কখনও দু’টি লাল কাপড়ের টুকরা এবং একটি থলে ব্যবহার করতো। তাঁর সময়ে মাজারে অনেক উন্নতি হয়েছে। তাঁর সময়ে গৌরী বালা নামে এক মহিলা ভক্ত মাজারে আসেন। লোক তাকে মা পগলী বলতো। তিনি বাংলা ১৪১১ সালের পৌষ মাসে (২০০৪ ইং সালের জানুয়ারী মাসে) ইন্তেকাল করেন। জনাব নূর বাকের শাহ্‌ ও গৌরী বালার কবর মুর্শিদের মাজার ভবনের মধ্যে ডান দিকে অবস্থিত।

 

হযরত গৌরী পাগলী (রহঃ) এঁর মাজার শরীফ

ঘটনা-১। ছোটটা না বড়টা

বড় ভাই রহিম আলী খান অল্প বয়সে মাতৃহারা হন। সম্ভবত এক কি দেড় বছর বয়সে তিনি মাতৃহারা হন। বাবা মাতৃহারা ছেলেকে নিয়ে সমস্যায় পরেন।  ভাই সব সময় রোগাগ্রস্থ থাকতেন এবং পেটটা বড় ছিল। যেখানে বসতো সেখানেই বসে থাকতো। যখন তার বয়স ছয় কি সাত একদিন বাবা মাকে বললেন, মনিকে নিয়ে মুর্শিদের কাছে যাব দেখি ওর অসুখটা ভাল হয় কি না। তুমি একটি মোরগ জবেহ করে রান্না কর আর পিঠা বানাও আমি মিষ্টি নিয়ে আসি। এই কথা বলে বাবা বাজারে চলে যায়। এদিকে বাড়ীতে দুইটি মোরগ ছিল। একটি বড় অপরটি ছোট। মা মোরগ জবেহ করার সময় চিন্তা করেন ছোটটা জবেহ করবো না বড়টা জবেহ করবো? এভাবে দোটানায় পরে যান। যাহোক তিনি বড়টিই জবেহ করলেন এবং রান্না করলেন। বাবা বাজার থেকে এসে ভাইকে কাঁধে নিয়ে মিষ্টি, গোস্ত ও পিঠা সহ মুর্শিদের কাছে যাইতে থাকেন।

 

মুর্শিদের থাকার সম্ভাব্য স্থানে গিয়ে মুর্শিদকে পেলেন না এবং মানুষকে জিজ্ঞাসা করেন, মুর্শিদ কোথায়? মর্শিদকে দেখেছেন? তারা বলে এই যে এখানে বসে ছিল, এখনি তো গেল। এভাবে সারাক্ষণ সন্ধান করলেন কিন্তু তাঁর দেখা পেলেন না। বাবা এদিকে সন্ধান করলে লোকে বলে ঐ দিকে আবার ঐ দিকে গেলে বলে এ দিকে। এক পর্যায়ে বাবা মুর্শিদকে না পেয়ে কেঁদে ফেলেন আর বলেন, আহা! ছেলেটা মনে হয় বাঁচবে না তাই মুর্শিদকে পেলাম না তাই বাবা বাড়ী ফিরে যাচ্ছেন এবং অনেকটা পথ চলে এসেছেন এমন সময় মুর্শিদ পিছন থেকে দৌঁড়ায়ে আসছেন আর বলছেন আহা! ছেলেটা মনে হয় বাঁচবে না তাই মুর্শিদকে পেলাম না। কাছে আসলে বাবা মুর্শিদকে মিষ্টি, পিঠা ও গোস্ত খেতে দেন। মুর্শিদ মুখে নিয়ে চিবাতে থাকেন আর পাত্রে ফেলতে থাকেন।

 

সে সময় মুর্শিদ বলতে থাকেন ‘ছোটটা না বড়টা, ছোটটা না বড়টা’। বাবা তখন বুঝতে পারেন, হয়ত এর কোন ভেদ আছে যার ফলে মুর্শিদকে পেতে এত সময় লেগেছে। মিষ্টি খেয়ে ঐ পাত্রে পায়খানা করে দেন। বাবা সব সহ বাড়ীতে নিয়ে আসেন। বড়ীতে এনে দেখে যেমন জিনিস তেমনি আছে কোথাও কোন ভাঙ্গা-চুড়া নেই বা কোন কমতি নেই। মিষ্টি চিবায়ে পাত্রে রেখেছিলেন এবং পায়খানা করেছিলেন তার কোন নমুনাই নেই। একদম ফ্রেশ। আর মাকে জানান যে, মুর্শিদ বার বার বললেন ছোটটা না বড়টা। মা বলেন, আমি মোরগ জবেহ করার সময় চিন্তা করেছিলাম মোরগ ছোটটা জবেহ করব না বড়টা জবেহ করব। হয়তো এমন ভাবাটাই ভুল হয়েছে। তখন বাবা বুঝতে পারেন কেন মুর্শিদকে পেতে এত কষ্ট হয়েছে।                 বর্ণনাকরীঃ জনাব শামস্‌ইদ্দিন আহম্মেদ খান, ১২/০৯/২০০৯ ইং

 

ঘটনা-২। অল্প সময়ে ঢাকায় গমন

ফজের মেম্বারের মায়ের কাছ থেকে যানাযায়। ফজের মেম্বারের নানা করিম মোল্লা মোহন সাহের বটতলার খেয়া ঘাট পার হলেন একঝুড়ি কলা নিয়ে। উদ্দেশ্য রাজবাড়ী বাজারে কলা বিক্রয় করে ঢাকায় যাবেন। ঐদিন ঢাকার জজ কোর্টে একটি মামলার রায় হবার কথা ছিল। করিম মোল্লা কলার ঝুড়ি রেখে অল্প সময়ের জন্য কোথাও যান। ইতিমধ্যে মুর্শিদ এসে কিছু কলা এলোমেলো করেন এবং কিছু কলা খেয়ে নেয়। করিম মোল্লা এসে দেখেন কলা এলোমেলো অবস্থা আছে। শুধু বললেন, মুর্শিদ এ কি করলেন! এগুলো বিক্রয় করে ঢাকায় যাব, সেখানে একটি মামলার রায় হবে আজ। মুর্শিদ একথা  শুনে কলার চুকলাগুলো ঝুড়িতে রেখে বলেন, যা নিয়ে যা। তিনি বাজারে নিয়ে এসে দেখেন যেমন কলা বাড়ী থেকে এনেছেলেন তেমনি আছে। কোথাও কোন কমতি নেই। কলা বিক্রয় করে তার ভাল লাভ হয় এবং ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকায় আদালত পাড়ায় হাঁটছেন আর মামলার রায়ের ব্যাপারে চিন্তা করছেন এমন সময় একটি কথা শুনতে পান যে, ‘মামলায় তোমায় কোন ক্ষতি হবে না চিন্তা করে কাম নেই বাড়ী যা’। এভাবে কয়েক বার শুনে উনার মনে হয় এতো মুর্শিদের কথা। তাকিয়ে দেখেন মুর্শিদ। করিম মোল্লা মুর্শিদকে ধরার জন্য দ্রুত হাঁটেন কিন্তু মুর্শিদ একটু বাঁক নিতেই অদৃশ্য হয়ে যান। করিম মোল্লা ঐ মামলায় জয় লাভ করেন। বড়ীতে এসে মুর্শিদকে অনেক সন্ধান করেছেন কিন্তু মুর্শিদ তাকে দেখা দেয় নাই।                                           বর্ণনাকারীঃ জনাব শামস্‌উদ্দিন আহম্মেদ খান, ১২/০৯/২০০৯ ইং

 

মুকুন্দরাম রায় (ভূঁইয়া) বর্তমান রাজবাড়ী জেলার অতীত ইতিহাস

মুকুন্দরাম রায় (ভূঁইয়া)-বর্তমান রাজবাড়ী জেলার অতীত ইতিহাস

ভূষণার উত্থান পতনের সাথে জড়িয়ে আছে বর্তমান রাজবাড়ী জেলার অতীত ইতিহাস। ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে অনেকগুলি জমিদার এক হয়ে দিল্লিশ্বরের অধীনতা থেকে তাদের মুক্ত করতে প্রয়াসী হন। তারা বার ভূঁইয়া নামে পরিচিত। ভূঁইয়াদের সংখা ১২ কি আট সে বিতর্কে না যেয়ে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্য, চন্দ্রদ্বীপের কন্দর্প রায়, বিক্রম পুরের কেদার রায়, চাঁদ রায়, ভুলুরায় লক্ষণ মানিক্য, ভূষণার মুকুন্দ রায়, ভাওয়ালের ফজল গাজী, খিজিরের ঈশা খাঁ, পাবনার বিনোদ রায় ইতিহাসের পাতায় প্রসিদ্ধ। মোগল বাদশাগণের সময়ে বাদশাহের প্রতিনিধি স্বরুপ মুসলমান নবাব দ্বারা বঙ্গদেশ শাসিত হত। তবে দেশ রক্ষা ও সাধারণ প্রজাদের রক্ষণাবেক্ষণের ভার দেশীয় জমিদারগণের উপরই নির্ভর করত। এ কারণে প্রত্যেক জমিদারের অধীনেই পদাতিক, অশ্বারোহী, নৌযান, সদা প্রস্তুত থাকত।

আইনী আকবর গ্রন্থ থেকে জানা যায় বাদশা আকবরের রাজত্বকালে স্বদেশীয় জমিদাররা ২৩৩৩০ জন অশ্বারোহী, ৮০১১,৫০ জন পদাতিক, ১৭০টি হস্তী, ৪২৬০টি কামান এবং ৪৪০০ নৌকা সম্রাটের জন্য সদা প্রস্তুত রাখতেন। আকবরের রাজত্বকালে অনেক জমিদারই তাঁর আজ্ঞা শিরোধার্য বলে বিবেচনা করত। কিন্তু দ্বাদশ ভৌমিক তার বিরুদ্ধাচরণ কেন করল সে প্রশ্ন ইতিহাসবিদদের অভিমত বাদশাহের কর্মচারীদের সাথে তাদের বনিবনাও হত না। এছাড়া পরাজিত পাঠানদের অনেকই তাদেরকে উত্তেজিত করত। উররোরণ্ড টোডর মলের অন্যায় বন্দোবস্ত ভূম্যাধিকারীদের বিদ্রোহের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ভূষণার মুকুন্দরাম এমনি একজন সাধারণ জমিদার মুকুন্দরামের পূর্ব পুরুষের বিষয়ে আনন্দনাথ এর অভিমত চাঁদ রায় ও কেদার রায়ের পূর্ব পুরুষেরা ফাতেহাবাদ আগমন করেন। বিত্রমপুরের রায়রাজগণ, চন্দ্রদ্বীপের রাজরাজগণ, ফাতেহাবাদের রাজরাজগণ সকলেই উপাধিধারী কায়স্থ ছিলেন। বখতিয়ার খলজি যখন বাংলাদেশ আক্রমণ করেন অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন সেই সময় বাকলা চন্দ্রদ্বীপের ধনুজমর্দন রায়ের বংশাবলীর অনেক পূর্বে বঙ্গের অনেক স্থানে জমিদারী, সুষ্টি করলে তারা নানা সম্প্রদায়ের বিভক্ত হয়ে পড়েন। এই সময়ে ‘ভূষণা পট্টি বলয়া’ একটা সাধারণ সমাজের সৃষ্টি হয়। বরেন্দ্র ব্রাক্ষণগণ মধ্যে ‘ভূষাণা পিট্ট বলায়’ এক সম্প্রদায়ের বর্তমান দেখা যায়। এই রাজবংশের উৎসাহে ভূষণায় বিবিধ প্রকারে শিল্পকর্মের উৎকর্ষ সংগঠিত হয়। ভূষণা বর্তমান মধুখালির অন্তর্গত। ভূষণা বিভাগের বিশেষ করে বালিয়াকান্দি অঞ্চলের উৎপাদিত কার্পাস, পাট, ইউরোপে রপ্তানি হত। ফাতেহাবাদের স্থাপতিরা এক সময় যাবতীয় নির্মাণ কাজ করত। ভূষণার কাঁসা পিতল বিখ্যাত ছিল। এ অঞ্চলে রেশম,মসলা, পান সুপারি, খয়ের, তিল, তিসি কার্পাস, জাফরান ইত্যাদি ব্যবসা জমজমাট ছিল। এই স্থানেই মুকুন্দরাম জমিদারী গড়ে তোলেন। পাঠান কোতল খাঁ ফাতেহাবাদ আক্রমণ করলে মুকুন্দ রায় মোগলদের পক্ষ অবলম্বন করেন। এতে মানসিংহ সন্ত্তষ্ট হয়ে মুসমানদের অন্য কোনো শাসনকর্তা নিয়োগ না করে মুকুন্দ রায়কে রাজোপাধি অর্পণ করে তাঁকে ফাতেহাবাদের শাসনভার অর্পণ করেন।

মোরাদ খানের মৃত্যুর পর মুকুন্দরাম মোরাদের পুত্রগণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে সম্গ্র ফতেহাবাদের রাজা হন। সম্রাট অকবরের মন্ত্রী টোডরমল মুকুন্দরামকেই ভূষণার জমিদার বলে স্বীকার করেন (১৫৮২)। মুকুন্দরাম মাঝেমধ্যে নামে মাত্র পেশকাম পাঠিয়ে দিল্লি সম্রাটের অধীনতার ভান করতেন। কিন্তু কার্যত তিনি ছিলেন স্বধীন। আকবরের রাজত্বকালে শেষে বার ভূঁইয়াদের বিদ্রোহকালে বিদ্রোহীদের নেতা ছিলেন। প্রতাপাদিত্য ও কেদার রায়ের রাজ্য উৎসন্নে গেলেও মুকুন্দরাম দমিত হন নাই। জাহাঙ্গীরের সময় ইসলাম খাঁ (১৬০৮) বঙ্গের শাসনকর্তা হয়ে আসলে তিনি মুকুন্দরামের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করেন এবং তার অধীনে একদল সৈন্য পাঠিয়ে কোষহাজো (আসামের কামরুপ) অধিকার করেন। মুকুন্দরাম তখন গৌরহাটি ও পণ্ড্রর থানাদার নিযুক্ত হন। পরে তিনি তার পুত্র ছত্রাজিতকে রেখে ভূষণায় ফিরে আসেন। এসময় তিনি প্রবল পরাক্রান্ত হয়ে নামমাত্র পেশকামও বন্ধ করে দেন। মানসিংহের সময়ে সৈয়দ খাঁ যখন বঙ্গের শাসনকর্তা তখন সৈয়দ খাঁর সাথে যে যুদ্ধ হয় তাতে মুকুন্দরাম নিহত হন। এরপর তার পুত্র ছত্রাজিত মোগল বশ্যতা স্বীকার করেন। অধ্যাপক যদুনাথ সরকার কর্তৃক আবিস্কৃত আব্দুর লতিফের ভ্রমণ কাহিনী বিষয়ক গ্রন্থ থেকে জানা যায় ইসলাম খাঁ ঢাকা যাবার পথে ভূষণার রাজা ছাত্রাজিতকে কয়েকটি হাতি উপহার দিয়ে নবাবের সাথে সাক্ষাৎ করেন। নবাব পুনরায় কোষহাজো অধিকার করার জন্য যে সৈন্য প্রেরণ করেন তার সাথে ছত্রাজিত ছিলেন। ছত্রাজিত কোষহাজোর রাজ ভ্রাতা বলদেবের সাথে গুপ্ত ষড়যন্ত্র করে মোগলদের গতিবিধি জানানোর কারণে বন্দি হয়ে ঢাকায় আনিত হন এবং নিহত হন (১৬৩৬)

তথ্যসংগ্রহঃ রাজবাড়ী জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য

প্রফেসর মতিয়র রহমান