সুফিয়া কাঙ্গালি – বঞ্চিত নারীদের কথা

তার গানের মাধ্যমে নিপীড়িত এবং সুবিধাবঞ্চিত নারীদের কঠিন বাস্তবতার কথা উঠে আসে। তিনি একজন সুপরিচিত লোক গায়ক, পাশাপাশি একটি সামাজিক মিশন আছে। তার সাধারণ থিম নারীদের দৈনন্দিন মুখোমুখি যে বৈষম্য, নিপীড়ন ও শোষণ হয়, সেটাই তুলে ধরা।

সুফিয়া কাঙ্গালি (বর্তমানে রাজবাড়ি জেলার) বৃহত্তর ফরিদপুর রামদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। একটি দরিদ্র হিন্দু পরিবারে তিনি মানুষ হন। তার পিতা খোকন হালদার ও মা তুলু হালদার।

তিনি ছোটবেলা থেকে গান পাগল ছিলেন। অল্পবয়সী মেয়ে হিসাবে, তিনি তার সহকর্মীরা বাদে নিজ পায়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করেন। ১৪ বছর বয়সে তিনি গ্রামের ফাংশন এ গাওয়া শুরু করেন এবং অনুনাদী সাধুবাদ সঙ্গে গৃহীত হয়েছে। তিনি সুধীর হালদার বিয়ে করেন, মুক্তিযুদ্ধের তিন বছর পর।

তার গানের ধরন, তাল অন্য শিল্পি থেকে ভিন্ন। তাদের গানের সাথে শরিলের তাল সত্যিই অসম। তিনি প্রথমে ফরিদপুর সুপরিচিত উস্তাদ হালিম বয়াতি ও আয়নাল বয়াতির তালিম গ্রহণ করেন।

মুস্তাফা মনোয়ার শিল্পকলা একাডেমীর সাবেক ডিজি, তার “কাঙ্গালি সুফিয়া” নামকরণ করেন এবং সে পরবর্তীতে সারা দেশে এই নামের খ্যাতি সাধিত।

কাঙ্গালি সুফিয়া বাংলাদেশ বেতার ও বিটিভি এর নিয়মিত শিল্পী। বিভিন্ন প্রাইভেট চ্যানেল গুলোতেও তার গান পরিবেশন হয়। এছাড়া বাংলাদেশ থেকে তিনি যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া, কাতার, ইতালি, হংকং, মার্কিন, থাইল্যান্ড, চীন ও ভারতের মধ্যে সম্পাদিত হয়েছে। তিনি সাধারণত বাউল জাহাঙ্গীর, বাউল মান্দেরের ফকির, পুস্প (সোফিয়া এর বোন), চুমকি কাঙ্গালি (সুফিয়া নাতনী) ও বিলকিস বানু পাঁচ সদস্যের দল সঙ্গে সঞ্চালিত।

সুফিয়া এর দ্বিতীয় স্বামী বাউল সেকম একটি দোতারা প্লেয়ার নিয়া তিনি কাজ করেন এবং লন্ডনে বসবাস করেন।

সুফিয়া সবচেয়ে বেশী জনপ্রিয় হয়েছেন যে সব গানেঃ “নারীর কাছে কেও যাইওনা”, “নারীর কোলে জন্ম নিয়া ঠেকলাম বিষণ দায়”, “বন্ধু বিচ্ছেদ”, “অন্তকথা”, “পরানের বান্ধব রে” এবং “কোনবা পথে নিতায় গঞ্জ যায়”।

লেজার ভিশন, সাউন্ডটেক, সংগীতা, কনকর্ড স্টুডিও থেকে অনেক গান রিলিজ হয়েছে। সে কিছু ছবিতেও গান করছেন “দরদি শত্রু”, “আগুন” এবং “রাজ সিংহাসন”।

কাঙ্গালি সুফিয়াকে শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়া উভয় খুব ভালবাসেন।

কাঙ্গালি সুফিয়া বলেন,
আমি অভিভূত আমার পাগল ভক্তদের দেখে এবং যারা আমার গান গাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।

কীভাবে শুরু ইংরেজি নববর্ষ?

ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে আবারো চলে এলো আরো একটি নতুন বছর। কয়েকঘণ্টা পরই সারাবিশ্ব বিদায় জানাবে ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দকে। আজ রাত ১২টা এক মিনিটে গোটা বিশ্ব বরণ করে নেবে নতুন বছর ২০২০ খ্রিষ্টাব্দকে।

কিন্তু কীভাবে এলো ইংরেজি নববর্ষ। আর কি-ই বা এর ইতিহাস। সেটিই (রাজবাড়ী শহর-Rajbari Town) অনলাইনের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো

ইংরেজি নববর্ষের ইতিহাস

আধুনিক গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার ও জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে জানুয়ারির ১ তারিখ থেকে শুরু হয় নতুন বছর। তবে ইংরেজি নতুন বছর উদযাপনের ধারণাটি আসে খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ অব্দে। তখন মেসোপটেমিয় সভ্যতার (বর্তমান ইরাক) লোকেরা নতুন বছর উদযাপন শুরু করে। তারা তাদের নিজস্ব গণনা বছরের প্রথম দিন নববর্ষ উদযাপন করতো।

তবে রোমে নতুন বছর পালনের প্রচলন শুরু হয় খ্রিষ্টপূর্ব ১৫৩ সালে। পরে খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬ অব্দে সম্রাট জুলিয়াস সিজার একটি নতুন বর্ষপঞ্জিকার প্রচলন করেন। যা জুলিয়ান ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত।

রোমে জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের অন্তর্গত বছরের প্রথম দিনটি জানুস দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়। জানুস হলেন প্রবেশপথ বা সূচনার দেবতা। তার নাম অনুসারেই বছরের প্রথম মাসের নাম জানুয়ারি নামকরণ করা হয়।

এতো গেলো যিশুর জন্মের আগের কথা। যিশুখ্রিষ্টের জন্মের পর তার জন্মের বছর গণনা করে ১৫৮২ সালে পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি এই ক্যালেন্ডারের নতুন সংস্কার করেন। যা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত। বর্তমানে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই কার্যত দিনপঞ্জি হিসেবে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করা হয়।

নতুন বছর পালন

আনুষ্ঠানিকভাবে নিউ ইয়ার পালন শুরু হয় ১৯ শতক থেকে। নতুন বছরের আগের দিন অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বর হচ্ছে নিউ ইয়ার ইভ। এদিন নতুন বছরের আগমনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিরাজ করে উৎসবমুখর পরিবেশ।

ইংরেজি নতুন বছরকে ঘিরে বাংলাদেশেও উৎসব মুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। আজ মধ্যরাতে থেকেই রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে ব্যাপকভাবে নিউ ইয়ার উদযাপিত হবে। তবে বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে ছুটি থাকলেও আগামীকাল সরকারি বন্ধ নেই বাংলাদেশে।

এদিকে ইংরেজি নতুন বর্ষ পালনে ব্যতিক্রমও রয়েছে। যেমন ইসরায়েল, দেশটি গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করলেও ইংরেজি নববর্ষ পালন করে না। কারণ বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী অ-ইহুদি উৎস হতে উৎপন্ন এই রীতি পালনের বিরোধিতা করে থাকে। আবার কিছু দেশ গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারকে গ্রহণই করেনি। যেমন সৌদি আরব, নেপাল, ইরান, ইথিওপিয়া ও আফগানিস্তান। এসব দেশও ইংরেজি নববর্ষ পালন করে না।

বিভিন্ন দেশে নতুন বছরের প্রথম দিনটি পাবলিক হলিডে। প্রতিবছর ৩১ ডিসেম্বর রাত ১২টা এক মিনিট থেকেই শুরু হয় নতুন বছর উদযাপনের উন্মাদনা। আকাশে ছড়িয়ে পড়ে আতশবাজির আলোকছটা। বিশ্বব্যাপী নিউ ইয়ার ডে সর্বজনীন একটি উৎসবে রূপান্তরিত হয়েছে।

নতুন বছরে পাঠকদের (রাজবাড়ী শহর-Rajbari Town) অনলাইনের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা। আগামী বছর আপনাদের আনন্দ ও সুখ-সমৃদ্ধির মধ্য দিয়ে যাক, এটাই প্রত্যাশা।

রাসসুন্দরী দাসী বাংলা সাহত্যিরে প্রথম পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনী রচনাকার

বাংলা ভাষা ও সাহত্যিরে প্রথম পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনী রচনাকার রাসসুন্দরী দাসী। রাসসুন্দরী আমাদের রাজবাড়ীর অখ্যাত এক গ্রামের বধূ । রাজবাড়ী জেলার ‘ভর রামদিয়া’ গ্রামে বসে দেড়শো বছর আগে নিজেকে লেখিকা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেন তিনি। নির্দিষ্ট কোন এলাকার সীমানায় তাকে আসলে বাঁধা যায় না।

রাসসুন্দরী এমন এক নারী, এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি পিঞ্জরে বাঁধা থেকেও একান্ত মানসিক শক্তির জোরেই দূর আকাশে মুক্ত ডানা মেলতে পেরেছেন। এখন থেকে ঠিক দুশো বছর আগে রাসসুন্দরীর জন্ম। পাবনা জেলার পোতাদিয়া গ্রামে এক বর্ধিষ্ণু পরিবারে ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে তার জন্ম। পিতা পদ্মলোচন রায় রাসসুন্দরীর অতি শৈশবে মারা যান। কন্যা হিসেবে জন্ম নিলেও মা এবং অন্যান্য পরিজনের কাছে তিনি খুব আদুরে ছিলেন। রাসসুন্দরীর পরিজনেরা অতিমাত্রায় রক্ষণশীল ছিলেন না। ছোটবেলা থেকেই দৈহিক রূপের কারণে সবাই তাকে ‘সোনার পুতলী’ বলতো।

ছোটবেলা থেকে মায়ের হাতে শাঁখা বা শরীরে কোন গয়না না দেখে রাসসুন্দরীর বিশ্বাস ছিল তার মায়ের বিয়ে হয়নি। আট বছর বয়সে অন্যের মুখে বাবা হিসেবে পদ্মলোচন রায়ের নাম শুনে ভীষণ মানসিক দ্বন্দ্বে পড়ে যান তিনি। ‘এত দিবস আমি জানিতাম, আমি আমার মায়ের কন্যা’। রাসসুন্দরীর জীবনে তাঁর মায়ের আদর্শ এবং ভূমিকা ছিল অপরিসীম। বাবার বাড়ির বিগ্রহের নাম ‘দয়ামাধব’ শ্বশুর বাড়ির ‘মদন গোপাল’। ১২ বছর বয়সে বিয়ে হয় রাসসুন্দরীর। রাসসুন্দরীর বিয়ে হয়েছিল রাজবাড়ী জেলার ‘ভর রামদিয়া’ গ্রামের জোতদার ও অবস্থাপন্ন এক পরিবারে। স্বামী নীলমনি সরকার। তিনি শ্বশুরবাড়ি যখন প্রথম এলেন তখন শাশুড়ি জীবিত। তিনিই পরিবারের প্রধান। ক্রমে তিনি অসুস্থ হলেন। এক সময় মারা গেলেন। সংসারের কর্তৃত্ব এল রাসসুন্দরীর ওপর। দেওর-ভাসুর কেউ ছিল না। কিন্তু একে একে তিন ননদ বিধবা হয়ে সংসারে এল। তাদেরকেও মেনে চলতে হতো পদে পদে।

এরই মধ্যে এক এক করে বারোটি সন্তানের মা হয়েছেন। ক্রমে পুত্রবধূ, জামাতা, নাতি, নাতনী। সংসারের এক অবস্থা থেকে আর এক অবস্থায় নিজের অবস্থান পাল্টেছে। শরীরের, মনের পরিবর্তন হয়েছে। ভূমিকা পাল্টে গেছে। এই সব কিছুই সবিস্ময়ে বিশ্লেষণ ও লক্ষ্য করেছেন রাসসুন্দরী। তার ভাষায় এক সময়_ ‘নতুন বউ নামটি বাদ গেল। মা, বউ, বউঠাকুরানী, বাবুর মা, কর্তা মা, কর্তা ঠাকুরানী এই প্রকার অনেক নতুন নতুন নাম হইল। এককালে বাল্যকাল পরিবর্তিত হইয়া আমি একজন পুরাতন মানুষ হইলাম।’ নিজেই বিস্মিত হতেন নিজের পরিবর্তনে ‘আমি এখন আচ্ছা একজন গৃহস্থ হইয়াছি এ আবার কি কা-। এখন অধিকাংশ লোক আমাকে বলে কর্তা ঠাকুরানী। দেখা যাক, আরও কী হয়’। নারী হিসেবে এই সমাজে জন্মে যে বিড়ম্বনা তা প্রতিমুহূর্তে রাসসুন্দরী উপলদ্ধি করেছেন। ব্যক্তি মানুষ হিসেবে নারী হিসেবে বঞ্চনার দিকগুলো তিনি সুচিহ্নিত করেছেন। ধীর গতিতে, শান্ত মেজাজে, সুকোমল স্পর্শে সংসারে তিনি সব সময় কল্যাণী নারী হিসেবে সকলের কাছে পরিচিত হয়েছেন। কিন্তু তার মনের মধ্যে সব সময়ের দ্বন্দ্বের যে ওঠানামা, নিজেকে প্রকাশের জন্যে অস্থিরতা, নিজেকে প্রকাশের জন্যে যে ব্যাকুলতা তা যদি তিনি প্রায় ৬০ থেকে ৮৮ বছর বয়স পর্যন্ত সময় ধরে না লিখে যেতেন তাহলে এক অবগুণ্ঠিত সাধারণ নারীর অসাধারণত্ব চেনাজানার আড়ালেই থেকে যেত।

রাসসুন্দরীর জীবনের সবচেয়ে বড়ো নিষ্ঠার, একাগ্রতার ও ধৈর্যের জায়গা ছিল তার লেখাপড়া শেখাটা। যে যুগে তিনি জন্মেছিলেন সে যুগে মেয়েদের লেখাপড়া শেখাটা রীতিমতো সামাজিক অপরাধ হিসেবে পণ্য হতো। ১৮৭৬ সনে রাসসুন্দরীর ৬৭ বছর বয়সে প্রথম বইটি ছাপা হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় বইটির সংস্কারণ প্রকাশিত হয়। তার ৮৮ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি লিখতেই থাকেন। সম্পাদক ও প্রকাশকদের মতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রথম পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনী রাসসুন্দরী’র লেখা ‘আমার জীবন’ সেই হিসাবেও তার লেখার মূল্যায়ন অপরিসীম।রাসসুন্দরীর সহজ-সরল ব্যক্তিত্বকে আমরা খুঁজে পাই তার লেখায়। তারই মতো তার ভাষা এবং প্রকাশ অত্যন্ত অনায়াস ও সরল। বারবারই যে কথাটি না বললে নয়, তিনি তার জীবনে সাংসারিক সমস্ত দায়দায়িত্ব অত্যন্ত সুষ্ঠু এবং বিচক্ষণতার সাথে পালন করেছেন। কিন্তু সংসারের বিষয় ঐশ্বর্যের মোহ তাকে কখনো স্পর্শ করেনি। মায়ের মৃত্যু, ১২টি গর্ভজাত সন্তানের মধ্যে চোখের সামনে সাত সাতজনের মৃত্যু; নাতি-নাতনীর মৃত্যু, তাকে প্রচ- কষ্ট দিয়েছে। শেষ বয়সে এসে স্বামী হারিয়েছেন। স্বামীর প্রতি সমীহ ছিল। উচ্ছ্বাস ছিল না। সে যুগের প্রভাবশালী সামন্ত জোতদার পরিবারের বউ হিসেবে স্বামীর প্রতি স্ত্রীর দায়িত্বকর্তব্য পালনে ত্রুটি করেননি। স্বামীর মৃত্যুতে বলেছেন_ ‘এক্ষণে শেষ দশাতে বৈধব্য দশা ঘটিয়েছে। কিন্তু একটি কথা বলিতেও লজ্জা হয়। শুনিতেও দুঃখের বিষয় বটে। _শত পুত্রবতী যদি পতিহীন হয়।তথাপি তাহাকে লোকে অভাগিনী কয়_বাস্তবিক যদি আর কিছু না বলে তুমি বিধবা হইয়াছ, কথাটি বলিতেই চাহে’। সে যুগের বিধবা হিন্দু নারীর চুল কেটে ফেলতে হতো। এ বিষয়েও সমাজকে তিনি কটাক্ষ করেই কথা বলেছেন। স্বামী ছাড়া নারী সমাজের চোখে হেয় এই মানসিকতাকে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।রাসসুন্দরীর জীবন সম্পূর্ণভাবে নিজের হাতে গড়া। পরিপূর্ণ ব্যক্তিত্ব নিয়ে নিজেকে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রবল প্রতিপত্তিশালী স্বামী অর্থাৎ কর্তা ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার বিনা অনুমতিতে প্রজাদের দুঃখ-কষ্ট লাঘবের জন্যে পার্শ্ববর্তী তেতুলিয়া গ্রামের মীর আমুদে নামের প্রতিপত্তিশালী জোতদারকে চিঠি দিয়ে ডেকে আনেন। এবং তার সাথে তিন পুরুষের চলমান মামলা-মোকদ্দমার লিখিত আপোষ নিষ্পত্তি করেন।

এক হাত ঘোমটা দেওয়া এক অন্তঃপুরবাসিনীর এই দুঃসাহস তার বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের পরিচয় বহন করে। এই ব্যক্তিত্বের কাছে কর্তা ব্যক্তিটিও শেষ পর্যন্ত বিনত হতে বাধ্য হন।৯০ বছর বয়সে রাসসুন্দরী (ইং ১৮৯৯ সনে) মারা গেছেন। প্রায় একশত বছরের সামাজিক পরিবর্তনকে কিছুটা হলেও তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। তার ৮৮ বছর বয়সের লেখায় বারবার এসেছে মেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার কথা। তিনি অত্যন্ত আনন্দ পেয়েছেন এই পরিবর্তনে। রক্ষণশীল সামন্ত সমাজের মন মানসিকতার বিরুদ্ধে তার অবস্থান অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং সুদৃঢ়। আমরা যদি এই মহীয়সী নারীর সঠিক মূল্যায়ন করতে না পারি, সে ব্যর্থতার দায়ভার আমাদের।রাসসুন্দরী প্রথাগতভাবে নিজের নামের শেষে ‘দাসী’ ব্যবহার করেছেন।

পরবর্তী যুগ তাকে ‘দেবী’র সম্মান দিয়েছে।আমরা শুধু এটুকুই বলবো, আমরা যারা বিভিন্ন মানবাধিকার বা নারীর মানবাধিকার আন্দোলনের কর্মী হিসেবে দাবি করি, আমরা যারা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চার দাবি করি, আমরা যারা শিক্ষার আলো ঘরে ঘরে জ্বালো’ বলে সেস্নাগান দেই তাদের সকলের কাছে রাসসুন্দরী এক অনন্য অগ্রবর্তী পথিক। রাসসুন্দরীর দুশো বছরের জন্মবার্ষিকীতে তাদের সকলের হয়ে এই বিশাল ব্যক্তিত্বের প্রতি বিনত চিত্তে জানাই আন্তরিক শ্রদ্ধা। তার জীবন, তার ‘আমার জীবন’ আমাদের কাছে আজও এক গভীর বিস্ময়। আমরা তার সঠিক মূল্যায়ন হয়তো আজও করতে পারিনি। অথচ এমন জীবনই তো নির্দ্বিধায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের জন্যে রেখে যেতে পারে সেই স্পর্ধিত অহংকার যা বলতে পারে, ‘আমার জীবনের লভিয়া জীবন, জাগোরে সকল দেশ’।

রশিদ হোসেন চৌধুরী বাংলাদেশী চিত্রশিল্পী

রশিদ হোসেন চৌধুরী (যিনি রশিদ চৌধুরী নামে পরিচিত ছিলেন) বাংলাদেশী চিত্রশিল্পী ভাস্কর লেখক এবং অধ্যাপক। বাংলাদেশে শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে শিল্পী জয়নুল আবেদীন প্রবর্তিত উত্তর-উপনিবেশিক পর্বে সৃজনশীল ও মৌলিকত্বে তিনি ছিলেন সর্বজন প্রশংসিত ব্যক্তিত্ব। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যেও অন্যতম ছিলেন এবং পঞ্চাশের দশকে বাংলাদেশের আধুনিক শিল্প-আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে স্বকীয় শিল্পচর্চার সূচনা করেছিলেন তিনি।

রশিদ চৌধুরী সাদাকালো আবক্ষ ব্যক্তি প্রতিকৃতি রশিদ চৌধুরীর আলোকচিত্র

জন্ম রশিদ হোসেন চৌধুরী ১ এপ্রিল ১৯৩২ ফরিদপুর (বর্তমানে রাজবাড়ি), ব্রিটিশ ভারত (বর্তমানে বাংলাদেশ)
মৃত্যু ১২ ডিসেম্বর ১৯৮৬ (বয়স ৫৪)
ঢাকা, বাংলাদেশ মৃত্যুর কারণ
ফুসফুস ক্যান্সার সমাধি

বাংলাদেশ জাতীয়তা ব্রিটিশ ভারতীয় (১৯৩২-১৯৪৭) পাকিস্তানি (১৯৪৭-১৯৭১) বাংলাদেশী (১৯৭১-১৯৮৬)অন্য নাম কনক শিক্ষা স্নাতোকোত্তর যেখানের শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পেশা চিত্রশিল্পী ভাস্কর লেখক অধ্যাপক কার্যকাল
১৯৬০–১৯৮৬

যে জন্য পরিচিত
তাপিশ্রী মাধ্যমে অনন্য অবদান
উল্লেখযোগ্য কর্ম আদি শহর
ফরিদপুর জেলা দাম্পত্য সঙ্গী
অ্যানি (বি. ১৯৬২–১৯৭৭) জান্নাত (বি ১৯৭৭–১৯৮৬) সন্তান রোজা রীতা পিতা-মাতা খানবাহাদুর ইউসুফ হোসেন চৌধুরী (পিতা) শিরিন নেসা চৌধুরানী (মাতা)

পুরস্কার একুশে পদক ১৯৭৭
ভারত উপমহাদেশে, বিংশ শতাব্দীর তাপিশ্রী শিল্পী হিসেবে তিনি অন্যতম অগ্রগামী। এ-মাধ্যমেই তিনি সর্বাধিক মৌলিক এবং আধুনিক শিল্পধারার চর্চাকারী হিসেবে অগ্রগণ্য। তাপিশ্রীর পাশাপাশি প্রচলিত তেলরঙ ছাড়াও তিনি কাজ করেছেন টেম্পেরা, গুয়াশ এবং জলরঙ ইত্যাদি অপ্রচলিত মাধ্যমসমূহে।দেশে এবং বিদেশে বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি এবং রাষ্ট্রীয় ও সাধারণ ভবনসমূহে তাপিশ্রী মাধ্যমে বহুসংখ্যক কাজ করেছেন তিনি। এই তাপিশ্রী শিল্পে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৭৭ সালে তাকে বাংলাদেশের জাতীয় এবং সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদক এবং ১৯৮০ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার প্রদান করা হয়।

রশিদ বিশ্বশিল্পের প্রাণকেন্দ্র মাদ্রিদ এবং প্যারিসে শিল্প বিষয়ক শিক্ষা গ্রহণ করায় তার শিল্পকর্মে পশ্চিমা আধুনিক শিল্পের আঙ্গিক এবং প্রাচ্যের দেশজ ঐতিহাসিক শিল্পের অবয়ব ও বর্ণের উল্লেখযোগ্য সমন্বয় ঘটেছে। তৎকালীন সময়ে ঢাকায় রঙের খুব আক্রা থাকলেও রং ব্যবহারে তার কার্পণ্য ছিল না। তার শিল্পদর্শনে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আধুনিক শিল্পের দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়। বাংলাদেশে শিল্প আন্দোলনের পাশাপাশি শিল্প শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলার পেছনেও রয়েছে তার বিশেষ অবদান। তার অনেক শিল্পকর্ম বর্তমানে দেশের ও বিদেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এবং ব্যক্তিগত সংগ্রহে সংরক্ষিত রয়েছে।