রোজিনা রাজবাড়ীর আলোকিত সন্তান

রোজিনা একজন বাংলাদেশী চলচ্চিত্র অভিনেত্রী। ঢালিউডের আশির দশকের জনপ্রিয় নায়িকা রোজিনা। চলচ্চিত্রে আসার আগে তিনি ঢাকায় মঞ্চ নাটক করতেন। তখন তিনি বেশ কিছু বিজ্ঞাপনে কাজ করেছেন।

রোজিনা রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দে নানা বাড়িতে জন্মগ্রহন করেন। রাজবাড়ীতেই নিজস্ব বাড়ী। শিশু ও কৈশোর সময়টা কেটেছে নিজ বাড়ী রাজবাড়ী শহরেই। পিতা দলিল উদ্দিন এবং মা খোদেজা বেগম। দলিল উদ্দিন ছিলেন একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ি,মা গৃহিনী। তারা চার বোন ও দুই ভাই। রোজিনার পারিবারিক বা প্রকৃত নাম রেনু। তার স্বামী আনোয়ার শরীফ। মরহুম চিত্র প্রযোজক ফজলুর রশিদ ঢালী তার স্বামী ছিলেন।

১৯৭৭ সালে মহসীন পরিচালিত আয়না ছবিতে তিনি ছোট একটি চরিত্রে শায়লা নাম নিয়ে প্রথম দর্শকের সামনে আসেন। এফ কবীর চৌধুরী পরিচালিত রাজমহল ছবিতে নায়িকা হিসেবে তার অভিষেক হয়। নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় রোজিনা। এই ছবিতে তার বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন সেই সময়ের জনপ্রিয় নায়ক ওয়াসীম। ছবিটি ১৯৭৮ সালে মুক্তি পায়। ছবিটি সুপার ডুপার হিট ব্যবসা করায় রোজিনাকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। পুরো আশির দশকে রোজিনা ছিলেন ঢালিউডের চাহিদা সম্পন্ন নায়িকা। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তার অভিনীত ছবির সংখ্যা দাড়ায় ২৫৫টি। ১৯৯০ সালের পর তিনি কোলকাতায় পাড়ি জমান এবং সেখানে প্রায় ২০ টি সফল ছবিতে নায়িকা হিসাবে অভিনয় করেন। ২০০৬ সালে রোজিনা ঢাকায় ফিরে আসেন। তারপর ইমপ্রেস টেলিফিল্ম প্রযোজিত রাক্ষুসী ছবিতে তিনি অভিনয় করেন।

উল্লেখযোগ্য ছবি:

  1. জানোয়ার।
  2. রাজমহল।
  3. মাটির মানুষ।
  4. অভিযান।
  5. শীর্ষনাগ।
  6. চম্পা চামেলী।
  7. মোকাবেলা।
  8. সংঘর্ষ।
  9. আনারকলি।
  10. রাজনন্দিনী।
  11. রাজকন্যা।
  12. শাহী দরবার।
  13. আলীবাবা সিন্দবাদ।
  14. সুলতানা ডাকু।
  15. যুবরাজ।
  16. রাজসিংসন।
  17. শাহীচোর।
  18. দ্বীপকন্যা।
  19. জিপ্সী সরদার।
  20. কসাই।
  21. জীবনধারা।

১৯৮০ সালে রোজিনা কসাই ছবির জন্য জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রীর পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৮৮ সালে তিনি জাতীয় পুরস্কার পান শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে জীবন ধারা ছবির জন্য। শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে তিনি বাচসাস পুরষ্কারও লাভ করেন। রোজিনা দিনকাল ছবিতে অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার অর্জন করেন। ১৯৮৬ সালে পাকিস্তানে হাম দো হায় ছবিতে অভিনয়ের জন্য জার্মানিতে নিগার এ্যাওয়ার্ড লাভ করে ভারতীয় উপ-মহাদেশে চমক সৃষ্টি করেন এবং বাংলাদেশের জন্য সুনাম বয়ে নিয়ে আসেন। রোজিনা তৎকালীন ভারতের জনপ্রিয় নায়ক মিঠুন,পাকিস্তানের জনপ্রিয় নায়ক নাদিমসহ ভারতীয় উপমহাদেশের বিখ্যাত বহু অভিনেতার বিপরীতে নায়িকা হিসাবে অভিনয় করেছেন। অভিনয়ের জন্য চিত্রনায়িকা রোজিনা ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশ হতে ছোট বড় প্রায় ১৫ টি অন্তর্জাতিক পুরষ্কার লাভ করে নজির সৃষ্টি করেন।
তিনি শরৎচন্দ্র ও নজরুল ইসলামের লেখা কাহিনী ও গল্প নিয়ে ষোড়শী,মেজদিদি,বনের পাপিয়া সহ ইত্যাদি গঠনমূলক নাটক নির্মাণ করেছেন। কবি কিংকর চৌধুরীর কাহিনী অবলম্বনে বদনাম নামের একটি ধারাবাহিক নাটকও নির্মাণ করেছেন। রোজিনা চ্যানেল আইয়ের জন্য মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক নাটক আলোর পথের যাত্রী নির্মাণ করেন।

তথ্যসূত্র: মোঃ সাইফুল ইসলাম রকি, রাজবাড়ি ইনফো।

পাংশা-হযরত শাহ জুঁই (রহঃ) মাজার শরীফ

সমসাময়িক পঞ্চদশ থেকে ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি অত্র অঞ্চলে যে সমস্ত পীর আওলীয়াগণ বাগদাদ, আফগানিস্তান থেকে ইসলাম প্রচারে আগমন করেন তাদের মধ্যে শা জুঁই অন্যতম।

তৎকালীন পশ্চাৎপদ পাংশা এলাকায় তিনি আস্তানা স্থাপন করে ধর্ম প্রচারে ব্রতী হন। আচরণ এবং ইসলামের উদার আর্দশে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেক বর্ণ হিন্দু, বৌদ্ধ, নিম্ন বর্ণের নানা সম্প্রদায়ের মানুষ ইসলাম ধর্মে দীক্ষা লাভ করে।

মৃত্যুর পর তাকে পংশা পুরাতন বাজারের নিকটস্থ সমাহিত করা হয়। পাকা ভবন নির্মিত তার মাজারটি জেলার ঐতিহ্য। তার নামানুসারে পাংশায় শাহ জুঁই মাদ্রাসা প্রিতষ্ঠিত হয়েছে।

 

রাজবাড়ি জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য

প্রফেসর মতিয়র রহমান

(পৃষ্ঠা-১৪৯-১৫০)

মশাররফ সাহিত্যে বিদ্রোহী প্যারীসুন্দরী

মোসতাফা সতেজ

প্যারীসুন্দরী ছিলেন নীল বিদ্রোহী জমিদারদের মধ্যে অন্যতম। নীলকরের সর্বগ্রাসী থাবা থেকে প্রজাদের রক্ষা করাই ছিল তার ধ্যান-জ্ঞান। নীল আন্দোলনের ইতিহাসে এই সাহসী নারী জমিদার উজ্জ্বল হয়ে আছেন। মীর মশাররফ হোসেনের সাহিত্যেও তিনি উঠে এসেছেন আপন মহিমায়। তৎকালীন নদীয়া জেলার কুষ্টিয়া সদরপুরের জমিদার ছিলেন প্যারীসুন্দরী। পাবনা শহরের রাধানগরে তাদের তহশীল কাচারিবাড়ি ছিল। তারা এডওয়ার্ড কলেজের জন্য কিছু জমি দান করেছিলেন। কলেজে প্যারীসুন্দরীর নামে এক সময় স্কলারশিপ দেওয়া হতো। এ রকম একজন জমিদার সুখ-স্বার্থ উপেক্ষা করে কুষ্টিয়ার শালঘর মধুয়ার নীলকর টমাস আইভান কেনির বিরুদ্ধে যেভাবে লড়েছেন, প্রজা স্বার্থে প্রাণ উৎসর্গ করেছেন তা অবশ্যই স্মরণীয়। তার বিরোধীতার কারণেই ধানি জমিতে নীল বুনতে বাধা পেয়ে বারুদ হয়ে ওঠেন কেনি। প্যারীকে ধরে নীল কুঠিতে নিয়ে যাওয়ার জন্যে তিনি পুরস্কার ঘোষণা করেন হাজার টাকা। কেনি তাকে বিলেতি সাবান দিয়ে ময়লা পরিষ্কার করে বাঙালির গন্ধ শরীর থেকে দূর করতে চেয়েছিলেন। গাউন পরিয়ে মেমসাহেব সাজিয়ে তার কুঠিতে রেখে দিতেও চেয়েছিলেন। অত্যাচারী নীলকরের এমন কথায় প্যারী সুন্দরীও পাল্টা জবাব দেন। তিনি উল্টো কেনির স্ত্রীকে ধরে তার সামনে আনার জন্যে হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেন। আজীবন তার চাকরি বজায় রেখে তার বংশ ধরদের বিশেষ বৃত্তি দানেরও ঘোষণা দেন।

অনিচ্ছাকৃত নীলচাষীরা কীভাবে তাদের সামাজিক মর্যাদা হারিয়েছেন, লাঞ্ছিত হয়েছেন, নীলকরদের হাতে সর্বস্ব হারিয়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছেন, যারা পালাতে পারেননি তারা জীবন দিয়ে চিরমুক্তি পেয়েছেন, অনেকে মামলার উপকরণ হয়েছেন- এসবই জানা যায় মীর মশাররফ হোসেনের সাহিত্যে। লেখক দেখিয়েছেন, কিছু দেশপ্রেমী মানুষ চিরকালই প্রজার পাশে থাকেন। যারা নিজের কল্যাণের আদর্শ, স্বাধীনকামী মানসিকতা নিয়ে অপরের প্রেরণা যোগান। প্যারী সুন্দরীর মধ্যে উল্লিখিত সব গুণই ছিল। পরাধীন ফ্রান্সের মুক্তিদাত্রী বীরকন্যা ‘জোয়ান অফ আর্ক’ এর সঙ্গে তাকে তুলনা করা হয়। নীল আন্দোলনের কালটি বাঙালির জাগ্রত চৈতন্যের বহুমুখী আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা গৌরবদীপ্ত অধ্যায়। সেই অধ্যায় ফুটে ওঠে মীর মশাররফ হোসেনের লেখায়। তার ভাষায় প্যারী ক্ষণপ্রভা বিজলী। তিনি ভীতু চাষীদের বুকের মধ্যে সাহসের স্রোত বাড়িয়ে দেন। যে স্রোত ছলাৎ ছলাৎ শব্দে ভয় তাড়ায়। চাষীরা তা অনুভব করে।

মীর মশাররফের ‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’ ১৮৯০ সালে প্রকাশিত হয়। আত্মজীবনীমূলক এই বইয়ের প্রধান চরিত্র শালঘর মধুয়ার অত্যাচারী নীলকর টিআই কেনি। নীল বিদ্রোহী জমিদার প্যারী সুন্দরীর স্থান এখানে ক্ষুদ্রতম। নীলকরের বিরুদ্ধে জাগ্রত জনতাকে অভিবাদন জানিয়েও লেখক হুশিয়ারীর সঙ্গে উভয়কূল রক্ষা করে আনন্দ ও উষ্মা প্রকাশ করেছেন। নীল বিদ্রোহের অদেখা সংগ্রাম সংঘর্ষ ষড়যন্ত্র ও সাজানো মামলার কথাও জানিয়েছেন তিনি। এসব লিখতে গিয়ে তিনি সংগ্রামী কৃষকদের অভাবী জীবন যেভাবে তুলে ধরেছেন তা যেন ইতিহাসের দূরবীন। যেখানে চোখ রাখলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে সব। অথচ তিনি কোন রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।

গৌরী, কালীগঙ্গা, নবকুমার ও পদ্মা অববাহিকা অঞ্চলে প্রজাপ্রেমী জমিদার ও নীলকরের দ্বন্দ্ব ঘিরে মশাররফের কাহিনি আবর্তিত। ইংরেজ দেখলে চাষী সমাজ ভয় পায়। কেন ভয় পায় প্যারী তা জানেন। উপনিবেশবাদী শাসনকে থোরাই কেয়াড় করে প্রজাদের অভয় দিয়ে তিনি বলেন, ‘সেও মানুষ, তোমরাও মানুষ। তোমাদেরও দুই হাত, দুই পা। তাহাদেরও তাই। … আছে কেবল রঙের প্রভেদ। আর একটু প্রভেদ আছে। তোমরা নীলকর কুঠীয়ালদের ন্যায় পরিশ্রমী নও। বুদ্ধিমানও নও। কেনীর ন্যায় মিথ্যাবাদীও নও। আমি শুনিয়াছিলাম যে, টিআই কেনী বিলাতের ভদ্রবংশীয়। কিন্তু এখন দেখিতেছি সে সকল কথার কথা। কেনী চামার অপেক্ষাও অধম। মেথর অপেক্ষাও নীচ।’
সাঁওতাল বড় মীর শালঘর মধুয়ার কুঠির একজন কুঠিয়ালকে ধরে দিন-দুপুরে তার একটি কান কেটে নেন। এ কথা তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়ে লাঠিয়ালদের উৎসাহ দেন- শুধু পড়ে পড়ে মার খাওয়া নয়। নীলকর কেনির কাছে ও তার স্ত্রীর কৌশলের কাছে পরাজয়ের পর প্যারী তার প্রধান কার্যকারক রামলোচনকে বলেন, ‘চেষ্টার অসাধ্য কী আছে? আবার চেষ্টা। এখন তোমাদের কার্য মোকদ্দমার জোগাড়। অন্যদিকে লাঠিয়াল সংগ্রহ। একদিন হাতে পাইবই পাইব। আরও একটা কথা আমি তোমাকে বলি। যে ব্যক্তি যে কোন কৌশলে কেনীর মাথা আমার নিকট আনিয়া দিবে; এই হাজার টাকার তোড়া আমি তাহার জন্য বাঁধিয়া রাখিলাম। এই আমার প্রতিজ্ঞা। আমার জমিদারী, বাড়ি-ঘর, নগদ টাকা, আসবাব যাহা আছে সমুদয় কেনীর জন্য রাখিলাম। ধর্ম সাক্ষী করিয়া বলিতেছি, সুন্দরপুরের সমুদয় সম্পত্তি কেনীর জন্য রহিল। অত্যাচারের কথা কহিয়া মুষ্টিভিক্ষায় জীবনযাত্রা নির্বাহ করিব। দ্বারে দ্বারে কেনীর অত্যাচারের কথা কহিয়া বেড়াইব। যে ঈশ্বর জগতের সুখ দেখাইবার পূর্বেই আহারের সংস্থান করিয়া মায়ের বুকে রাখিয়া দিয়াছেন, সেইখানেই সমাদরে স্থান পাইবে। দুরন্ত নীলকরের হস্ত হইতে প্রজাকে রক্ষা করিতে জীবন যায় সেও আমার পণ। আমি আমার জীবনের জন্য একটুকুও ভাবি না। দেশের দুর্দশা, নিরীহ প্রজার দুরবস্থার কথা শুনিয়া আমার প্রাণ ফাটিয়া যাইতেছে। মোকদ্দমার জন্য তোমরা ভাবিও না। যত প্রকারের তদবির হইতে পারে তাহা কর।’

কৃষি সমাজকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার সাহস যুগিয়ে গেছেন তিনি। যত রকম সহায়তা দেয়া যায় তাও তিনি দিয়েছেন। পরোয়া করেননি কিছুই। প্যারীর লাঠিয়াল বাহিনী নীলকুঠি লুট করেছে। এ ঘঠনায় দশজন আহত এবং তিনজন নিহত হয়েছে। প্যারী এ খবর শুনে একটুও ভয় পাননি। নির্ভয়ে রামলোচনকে বলেন, ‘আমি বাঙালির মেয়ে। সাহেবের কুঠী লুটিয়া আনিয়াছি, ইহা অপেক্ষা সুখের বিষয় আর কী আছে!’
প্যারী সুন্দরী সম্পর্কে কেনী তার শুভাকাঙ্খি জমিদার মীর মুয়াজ্জমকে বলেন, ‘আমরা বিলাতের লোক যতগুলি এই দেশে বাস করিতেছি, আপনাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করিয়া মনের কথা বলিতেছি, কিন্তু আমাদের মনের নিগূঢ় তত্ত্ব-গুপ্ত কথা কখনই পাইবেন না। আপনি দেখিবেন, কালে প্যারী সুন্দরীর যথা সর্বস্ব যাইবে। খুন্তি হস্তে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করিতে হইবে। এ ঘটনা শীঘ্র ঘটিতেছে না। কারণ এখনও টাকার অভাব হয় নাই। ঘটিতে বিলম্ব আছে। কুঠী লুটের মোকদ্দমায় আসামিরা সাতটি বৎসরের জন্য জেলে গিয়াছে। দারোগা খুনের মোকদ্দমায় স্বয়ং কোম্পানি বাদী। শীঘ্রই দেখিবেন সুন্দরপুরের জমিদারী খাস হইয়া কোম্পানির হস্তগত হইয়াছে।’

মীর মশাররফের ‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’ আজও পাঠককে বিস্মিত করে। নীল আন্দোলন চলাকালে লেখকের বয়স ছিল ১২ বছর। লেখক বলেছেন, ‘শোনা কথাই পথিকের মনের কথা। সে শোনাও সেই ছোট বেলায়। অসংলগ্ন ভুল-ভ্রান্তি হওয়াই সম্ভব।’ নীলকর কেনীর জমিদারীর কতক অংশ পাবনা অঞ্চলে। কিছু অংশ যশোর ও মাগুরার অধীনে। পাবনা থেকে কুষ্টিয়ার শালঘর মধুয়ায় যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম নৌকা। ১৮৬৯ সালের আগে পাবনায় রাস্তা ছিল না। প্রশাসনের লোকবল এ পথেই যাতায়াত করতেন। প্যারীর সাথে কেনি এঁটে উঠতে না পেরে মশাররফের পিতা জমিদার মীর মোয়াজ্জেমের সহায়তা চাইলে তিনি হাত বাড়িয়ে দেন। একথা লেখক অকপটে স্বীকার করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে মানবিকতাবোধও পরাস্ত হয় ব্যক্তি স্বার্থের কাছে। ভুললে চলবে না অত্যাচারী নীলকর মৃত্যুদূতের ভূমিকা স্বয়ং কেনিও নিয়েছিলেন খুব কুশলতায়। তার স্ত্রী সুপরিকল্পিত হত্যা ও বীভৎসতম নির্যাতনের যে নজির রেখেছেন ইতিহাসে তা খুব কমই দেখা যায়।

উদাসীন পথিকের মনের কথা’য় কেনি ঐতিহাসিক চরিত্র। তাকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে জমিদার প্যারীসুন্দরী এবং অন্যান্য জমিদার। লেখক প্যারী চরিত্রের ইতি টানেন আকস্মিকভাবে। ১৮৫০ সালে নীলকর কেনি কৌশলে প্যারীকে পরাজিত করেন। এরপর থেকে কেনির প্রতিপত্তি উত্তরোত্তর বেড়েই চলে। ১৮৫৯-৬০-এ শুরু হয় নীল বিদ্রোহ। এই বিশাল গণবিদ্রোহের নেতৃত্ব বাইরে থেকে আসেনি। এই বিদ্রোহ আপনা-আপনি গড়ে ওঠে। উত্তরবঙ্গ থেকে প্রথম নীল বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল। বিদ্রোহে কুঠির কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যায়। ১৮৭০- এ গড়াই ব্রিজ নির্মাণকালে কেনির কুঠি ভেঙে বাঁধের মুখ ফেলা হয়। কেনি চলে যান কলকাতা। হত্যা মামলায় প্যারী সুন্দরীর অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে সরকার তার সমুদয় জমিদারী ক্রোক করে নেয়। এ অবস্থায় একজন নারী জমিদার যে দৃষ্টান্ত রেখেছেন তা অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। তিনি আপীল করেন এবং অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে জমিদারী খালাস করেন।

ইতিহাসে উপেক্ষিতা নীল-সংগ্রামের এই বীর নারী তার চরিত্রের দৃঢ়তা, নির্ভীকতা, করুণা, সংকল্প, স্বাজাত্যবোধ ও প্রজাকল্যাণ-কামনার জন্য `উদাসীন পথিকের মনের কথা`য় অমর হয়ে রয়েছেন। তার প্রজাপ্রেম, নির্ভীকতা ও সাহসী ভূমিকার কথা ছড়া-প্রবাদে ছড়িয়ে পড়েছিল গ্রামে-গঞ্জে। যেমন `কেনির মুন্ডু কেটে লটকাবো দরজাতে,/প্যারী নাম রেখে যাবো জগতে।` নীলকর-সুহৃদ মোশাররফের পিতাও মুগ্ধ ও সহানুভূতিশীল ছিলেন এই নির্ভীক প্রজাদরদি সামন্ত নারীর প্রতি। তিনি প্যারীসুন্দরীর প্রজাদের দুরবস্থার কথা শুনে ব্যথিত হয়েছেন। আবার তার প্রতিরোধ-আক্রমণে কেনি অতিষ্ঠ হয়ে উঠলে তিনি সোৎসাহে মন্তব্য করেছেন : ‘ধন্য বাঙ্গালীর মেয়ে। সাবাস সাবাস! সাহেবকে একেবারে অস্থির করিয়া তুলিয়াছে। সাহেব এতদিন সকলকে যেরূপ জ্বালাতন করিয়াছেন, তাহার প্রতিশোধ বুঝি প্যারীসুন্দরীর হতে হয়।’

রোকনুজ্জামান খান – প্রতিষ্ঠিত লেখক ও সংগঠক

রোকনুজ্জামান খান (জন্মঃ ৯ এপ্রিল, ১৯২৫ – মৃত্যুঃ ৩ ডিসেম্বর, ১৯৯৯) বাংলাদেশের একজন প্রতিষ্ঠিত লেখক ও সংগঠক ছিলেন। কিন্তু তিনি দাদাভাই নামেই সম্যক পরিচিত ছিলেন। তার জন্ম রাজবাড়ী জেলারপাংশা উপজেলায়। বাংলাদেশের বহুল প্রচারিত দৈনিক ইত্তেফাকের শিশু-কিশোরদের উপযোগী কচিকাঁচার আসর বিভাগের পরিচালক হিসেবে আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করেন।

রোকনুজ্জামান খান জন্ম ৯ এপ্রিল ১৯২৫ পাংশা, রাজবাড়ী , বাংলা প্রদেশ, ব্রিটিশ ভারত। মৃত্যু৩ ডিসেম্বর ১৯৯৯ (বয়স ৭৪) জাতীয়তা বাংলাদেশী জাতি সত্তা বাঙ্গালী পেশা লেখক, সংগঠক দাম্পত্য সঙ্গী নূরজাহান বেগম পুরস্কার স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার।

কর্ম জীবন সম্পাদনা

১৯৪৮ সালে আবুল মনসুর আহমদ সম্পাদিত ইত্তেহাদপত্রিকার ‘মিতালী মজলিস’ নামীয় শিশু বিভাগের দায়িত্ব লাভের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে শিশু সওগাত পত্রিকায় দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫২ সালে দৈনিক মিল্লাতেরকিশোর দুনিয়া’র শিশু বিভাগের পরিচালক ছিলেন। ১৯৫৫ সালে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় তরুণ সাংবাদিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। ২রা এপ্রিল শিশু-কিশোরদের উপযোগী কচিকাঁচার আসর বিভাগের পরিচালক নিযুক্ত হন এবং আসর পরিচালকের নামকরণ করা হয় দাদাভাই। সেই থেকে তিনি নতুন পরিচয় পান দাদাভাই। তার পরিচিতিতেই ছোটদের উপযোগী করে লিখতেন – সুফিয়া কামাল, আব্দুল্লাহ আল মুতি শরফুদ্দিন, শওকত ওসমান, আহসান হাবীব, ফয়েজ আহমেদ, হোসনে আরা, নাসির আলী, হাবীবুর রহমানসহবিখ্যাত অনেক লেখক।

১৯৫৬ সালে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শিশু-কিশোর সংগঠন কচিকাঁচার মেলা প্রতিষ্ঠা করেন রোকনুজ্জামান খান। বিখ্যাত অনেক ব্যক্তিত্ব এর সদস্য ছিলেন – সুলতানা কামাল, হাশেম খান, মাহবুব তালুকদার, কৌতুক অভিনেতা রবিউল প্রমূখ।

রচনা সমগ্র সম্পাদনা

বাক বাক্‌ কুম পায়রা
মাথায় দিয়ে টায়রা
বউ সাজবে কাল কি
চড়বে সোনার পালকি

তার অসামান্য শিশুতোষ ছড়া হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। হাট্টিমাটিম টিম, খোকন খোকন ডাক পাড়ি, আজব হলেও গুজব নয় প্রভৃতি বই লিখেছেন দাদাভাই। সম্পাদনা করেছেন – আমার প্রথম লেখা, ঝিকিমিকি, বার্ষিক কচি ও কাচা, ছোটদের আবৃত্তি ইত্যাদি পুস্তক।

শিশু সংগঠনে অসামান্য অবদান রাখায় রোকনুজ্জামান খান ২০০০ সালে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারে ভূষিত হন। ৩ ডিসেম্বর, ১৯৯৯ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

কাজী আবদুল ওদুদ – বাঙালি সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ ভাষা

কাজী আবদুল ওদুদ (২৬ এপ্রিল ১৮৯৪–১৯ মে ১৯৭০) একজন বাঙালি প্রাবন্ধিক, বিশিষ্ট সমালোচক, নাট্যকার ও জীবনীকার ছিলেন। তিনি বৃহত্তর ফরিদপুর (বর্তমান) রাজবাড়ী, পাংশা, একটি নিম্ন – মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ওরফে কাজী সৈয়দ হোসেন কাজী।

শিক্ষা জীবন সম্পাদনা

১৯১৩ সালে তিনি ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন । তারপর তিনি আইএ এবং বিএ পাশ করেন প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতা থেকে। অর্থনীতিতে এমএ পাশ করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

অবদান সম্পাদনা

১৯২৬ সালে তিনি ঢাকা মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রতিষ্ঠাতা এবং তিনি অজ্ঞতা থেকে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন কিছু তরুণ লেখকদের সঙ্গে। তার সংবাদপত্র শিখা আন্দোলনের বেগ বৃদ্ধি করতে সাহায্য করেছিল। সৈয়দ আবদুল হোসেন ও কাজী মোতাহার হোসেন এই আন্দোলনে যোগ দেন।কাজী আবদুল ওদুদ ঘনিষ্ঠভাবে বাঙালি মুসলমান সাহিত্য আন্দোলনের সাথে সম্পর্কিত ছিলেন। ১৯৭০ সালে তিনি ‘শিশির কুমার পদক’ লাভ করেন।

পেশা সম্পাদনা

তিনি কলকাতা পাঠ্যপুস্তক বোর্ড এ চাকরি নেন। তারপর ১৯২০ সালে তিনি সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজে (বর্তমানে ঢাকা কলেজ) যোগদান করেন। ১৯৪৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে শিক্ষকতার জন্য প্রস্তাব দেয় কিন্তু তিনি কলকাতায় লেখার জন্য আরো সুযোগ পেয়েছেন এবং তার জীবনের বাকি সময়টুকু সেখানেই কাটান।

বিবাহ সম্পাদনা

১৯১৬ সালে তিনি তার চাচার বড় মেয়ে জামিলা খাতুনকে বিয়ে করেন। জামিলা খাতুন ১৯৫৪ সালে মারা যান।

প্রবন্ধ সম্পাদনা

… (১৯৫১)

সমাজ ও সাহিত্য (১৯৩৪)
রবিন্দ্রকাব্য পাঠ (১৩৪৩)
হিন্দু-মুসলমান বিরোধ (১৯৩৬)
নব পর্যায় (২খণ্ড)

অন্যান্য বইসম্পাদনা

শাশ্বত বঙ্গ
মির পরিবার (গল্প), ১৯১৮
পথ ও বিপথ (নাটক), ১৩৪৬
আজাদ (উপন্যাস), ১৯৪৮
নদীবক্ষে (উপন্যাস), ১৯৫১

তার সম্পাদনায় প্রকাশিত জনপ্রিয় বাংলা অভিধান – ব্যবহারিক শব্দকোষ।