আরএসকে ইনস্টিটিউট

শ্রী ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্য-মানুষ গড়ার কারিগর।

মনে পড়ে কোনো এক উপন্যাসে পড়েছিলাম শিক্ষক হল মানুষ গড়ার কারিগর। যখন স্নাতক শ্রেণিতে পড়ি, ইংরেজি পাঠে বার্ট্রান্ড রাসেলের ‘Function of a teacher’ এ পড়েছিলাম, Teacher is the guardian of civilization, archiect of nation. শিক্ষককে মানুষ গড়ার কারিগর (Technician- যান্ত্রিক, কুশল প্রকর্মী) বলে সবাই সম্বোধন করে কিন্তু জাতি গঠনের স্থপতি বলতে নারাজ। যে শিক্ষক অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর করে আলোর নেশায় মাতিয়ে তোলেন, জাতি গঠনের ভিত রচনা করেন, মানুষকে অগ্রচিন্তার নায়কে পরিণত করেন, তিনি কি কেবলিই একজন সাধারণ কুশলী? নাকি জাতির শ্রেষ্ঠতম উপাধি ধারণের অধিকর্তা? ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্য তো নয়ই আমি কোনো শিক্ষককে মানুষ গড়ার কারিগর বলতে নারাজ। শব্দমানে তাঁদের ‘মানুষ গড়ার শিল্পী’ বলা যায়।

শ্রী ত্রৈলোক্যনাথ কেবল মানুষ গড়ার শিল্পী ছিলেন না, তিনি জাতি গঠনের স্থপতির দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিলেন। অন্ধকারে জ্ঞানের আলো জ্বেলে উপনিবেশিক শাসন, শোষণ, বঞ্চনার মুক্তির পথের সন্ধান দিয়ে গেছেন। সে সময় রাজবাড়ি জেলায় কোনো উচ্চ বিদ্যালয় ছিল না। রাজা সূর্যকুমারের হাতে গড়া আরএসকে ইনস্টিটিউশনের ছাত্র হিসেবে পাঁচ আর সহকারী ও প্রধান শিক্ষক হিসেবে ৪২ বছর শিক্ষক হিসেবে এ জেলাতে বটেই তৎকালীন গোটা ভারতবর্ষে শিক্ষার আলো দান করেছেন। শিক্ষার ভিত রচনা করেছেন, জাতি ও জাতিত্ব বোধের উন্মেষ ঘটিয়েছেন। কেবল বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা নয়, রাজা সূর্যকুমারের পরামর্শে নিজ উদ্যোগে নিজ হাতে প্রতিষ্ঠানটির ভিত রচনা করেছেন, কলেবর বৃদ্ধি করেছেন, দেশের অন্যতম প্রতিষ্ঠান হিসেব গড়ে তুলেছেন। কেবল আর এসকে ইনস্টিটিউশনই নয় প্রতিষ্ঠা করেছেন পাবনার সাড়া হাই স্কুল, রতনদিয়া হাই স্কুল। সে সব বিদ্যালয়ে যথাক্রমে ৪ ও ১০ বছর প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর শিক্ষকতাকাল মোট ৫৮ বছর।

ত্রৈলোক্যনাথ ১৮৭৫ সালে তৎকালীন ফরিদপুর জেলার গোয়ালন্দ মহকুমার (বর্তমান রাজবাড়ি জেলা) বহরকালুখালি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা প্রাণনাথ ভট্রাচর্য পরে রতনদিয়া এসে স্থায়ী বসতি গড়ে তোলেন। ১৮৮৫ সালে বোয়ালিয়া নিম্ন প্রাইমারি স্কুল হতে উত্তীর্ণ হয়ে ২ টাকা বৃত্তি লাভ করেন। এরপর উচ্চ প্রাইমারি ছাত্রবৃত্তি পরিক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে বৃত্তি পান। ১৮৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত রাজা সূর্যকুমার (আর এসকে) ইনস্টিটিউশনে ভর্তি হন এবং ১৮৯৪ সালে ঐ স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে এন্ট্রান্স (প্রবেশিকা) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। ঐ বছর কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ৫,৫০০ ছাত্র এন্ট্রান্স পরীক্ষা দেয় যার মধ্যে ৩৯৩ জন প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয় (আমার স্মৃতিকথা পৃষ্ঠা-২)। উল্লেখ্য তিনি রাজা সূর্যকুমারের বাড়ি থেকে উক্ত বিদ্যালয়ে পড়তেন। এন্ট্রান্স পাস করার পর তিনি কলিকাতা কলেজে ভর্তি হন এবং সেখানেও রাজা সূর্যকুমারের বাসায় থেকে তাঁর সাহচার্যে লেখাপড়া করেন। কলিকাতার মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশন (বর্তমান বিদ্যাসাগর কলেজ) থেকে বিএ পাস করেন। অতঃপর জেনারেল এসেমব্লিজ (বর্তমান স্কটিশ চার্চস কলেজ) থেকে ইংলিশে এমএ পরীক্ষা দেওয়ার সময় গুরতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। এখানেই শিক্ষা-জীবন শেষ হয়। ১৯০০ সালে তিনি প্রথমে ২৫০ টাকা বর্তমান মূল্যস্তরের তুলনায় অনেক টাকা। পঁচিশ পয়সায় এক হালি ইলিশ বা ৩ টাকায় ১ মণ চাল পাওয়া যেত। কিন্তু অর্থের চেয়ে সেবাই যার ব্রত, মানুষ তৈরির স্বপ্ন যার মনে, জাতি গঠনের ইচ্ছায় যিনি সদাতৎপর তিনি টাকার অঙ্কের চেয়ে সেবার মানের দাম বেশি ভেবে চাকরি ইস্তফা দিয়ে ৫০ টাকা বেতনে আরএসকে ইনস্টিটিউশনে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে যোগদান করেন। ব্রতচারী শিক্ষক হিসেবে পাঠদান করেছেন, প্রধান শিক্ষক হিসেবে প্রায় ৫০ বছর ধরে কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করে দিকে দিকে শিক্ষা বিস্তারে অসামান্য অবদান রেখেছেন।

ছোটখাট গড়নের মানুষটি ছিলেন হালকা পাতলা। কিন্তু চোখের দিপ্তি ছিল প্রখর, ব্যক্তিত্বে অনড়, শব্দ ব্যবহারে সংযত, কর্তব্যে নিষ্ঠাবান। তাঁর তেজস্বীতায় ছাত্র ও শিক্ষক যেমন ভয় পেত তেমনি তাঁর নিরলস কর্তব্যকর্মের নিষ্ঠতায় তাকে ভক্তি করত। তাঁর সামনে বেয়াদবি করে এমন সাহস কোনো ছাত্রের ছিল না। ত্রৈলোক্যনাথ ছিলেন রাজা সূর্যকুমারের অতি স্নেহের ও আদরের পাত্র। সূর্যকুমার তাঁর হাতে গড়া বিদ্যালয়টির সমুদয় ভার ত্রৈলোক্যনাথের উপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। ত্রৈলোক্যনাথ রাজবাড়ি জেলায় প্রতিষ্ঠিত প্রথম উচ্চ বিদ্যালয়টিকে মনের মতো করে গড়ে তোলেন। বিদ্যালয়ের ঘর, দালান, আসবাবপত্র, বোর্ডিং নির্মাণ করেন। এ বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে রাজবাড়িতে উচ্চ শিক্ষার সূচনা হয়। দূর দূরান্ত থেকে ছাত্ররা এখানে পড়তে আসত। প্রখাত সাহিত্যিক ও কলিকাতার স্টেটসম্যান পত্রিকার সম্পাদক সন্তোষ ঘোষ, সাহিত্যিক এয়াকুব আলী চৌধুরী, সাহিত্যিক উপেন্দ্র চন্দ্র দাস, বিখ্যাত ‍উকিল লালন চন্দ্র ঘোষ, হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট জীতেন্দ্র নাথ গুহসহ অনেক নামিদামি মানুষ আরএসকে এবং ত্রৈলোক্যনাথের ছাত্র। রাজবাড়ি শহরে অনেক প্রবীণ এ শিক্ষকের গুণের কথা বলেন। শিক্ষাকতার সফলতায় ১৯১১ সালে গভর্নমেন্ট হতে তিনি সার্টিফিকেট অব অনারপ্রাপ্ত হন ‘For good work as a Head Master and Honorary Magistrate’।

তিনি কেবল শিক্ষকই ছিলেন না। রাজবাড়ি শহর ও জনকল্যাণের প্রবাদ পুরুষ রাজা সূর্যকুমারের হাতে গড়া হাসপাতালের সেক্রেটারি, অনারারি ম্যাজিট্রেট, লোকাল বোর্ডের চেয়ারম্যান, মিউনিসিপ্যালিটির ভাইস চেয়ারম্যান, রাজবাড়ি জেল ভিজিটর, রাজার স্টেটের একজিকিউটিভ হিসেবে কাজ করেছেন। তখনকার দিনে রাজবাড়িতে ‘অনুশীলন সমিতি’ ‘নামে রাজনৈতিক সমিতি থাকলেও বিনোদন বা সেবামূলক কোনো সংঘ, সমিতি বা ক্লাব ছিল না। ত্রৈলোক্যনাথের উদ্যোগে ‘আমাদের সংঘ’ নামে একটি সংঘ গঠিত হয়। সমিতির মেম্বার ছিলেন ব্রজবন্ধু ভৌমিক (এসডিও গোয়ালন্দ), জীতেন্দ্রনাথ মিত্র (ইঞ্জিনিয়ার), যোগেন্দ্রনাথ দত্ত (সাব ইঞ্জিনিয়র) কালী বন্দ্যোপাধ্যায় (স্টেশন মাস্টার), কুমুদিনী গাঙ্গুলী (হেড মাস্টার গোয়ালন্দ হাই স্কুল, (বর্তমান জেলা স্কুল), কালীকুমার দাস, (নায়েব জলকর) চন্দ্র বাবু (ডুগি তবলা, হারমোনিয়াম বাজিয়ে) প্রমুখ। রোগীর চিকিৎসা গরিব ছাত্রদের সাহায্য দান, সমাজসেবা কাজ সংঘের মাধ্যম করা হত।

ত্রৈলোক্যনাথ অগ্নিযুগের মানুষ। তখন অনুশীলন, স্বরাজ, অসহযোগ এবং বৃটিশ খেদাও আন্দোলনের কাল। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের আন্দোলন তুঙ্গে। ত্রৈলোক্যনাথ কেবল এর সাঙ্গী নন, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তা সমর্থন করেছেন, প্রয়োজনে সক্রিয় হয়েছেন। জাতীয় চেতনায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। ফরিদপুরের কংগ্রেস নেতা অম্বিকাচরণ মজুমদার ছিলেন অতি ঘনিষ্ঠজন। রাজনৈতিক মতাদর্শে তাঁরা ছিলেন অভিন্ন হৃদয়। তাঁর লেখা ‘আমার স্মৃতিকথা’ গ্রন্থটি অত্র অঞ্চলের নানা ঘটনার প্রামাণ্য দলিল। অনুশীলন, স্বদেশী, স্বরাজ, খেলাফত, অসহযোগ, কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, রেলপথ স্থাপন, রেল শ্রমিক আন্দোলনসহ নানা ঘটনা এবং ‘লক্ষীকোল রাজবাড়ি আশ্রয়লাভ’ ‘রাজা সূর্যকুমার গুহরায় গ্রীনবোটে সাক্ষাৎ’, ‘রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশন’, ‘রতনদিয়া গ্রাম’ আমার রাজবাড়ি স্কুলে শিক্ষকতা কালে’, ‘আমাদের সংঘ’, ‘রাজবাড়ি শহরে একটি মুসলমান সংঘ’, ‘ফেরিফান্ড রোড’, ‘মাদারীপুর রাজরাজেশ্বর’, ‘চাঁদ সওদাগরের ঢিবি’, ‘ভাগ্যবান মালো’, ‘রতনদিয়ার দুর্গোৎসব’, ‘রতনদিয়ার সাহিত্যিক’, ইত্যাদি বিষয়ে ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ রেখে গেছেন। শতবছর পরে লেখা রাজবাড়ি জেলার ইতিহাস গ্রন্থখানা তাঁর লেখার উদ্ধৃতিতে সমৃদ্ধ হয়েছে। এ গ্রন্থটি হাতে না পেলে আমি রাজবাড়িবাসীকে অনেক ঘটনা বিশেষ করে রাজা সূর্যকুমারের বিষয়ে প্রামাণ্য লেখচিত্র তুলে ধরতে পারতাম না। তিনি কেবল ‘আমার স্মৃতিকথা’ গ্রন্থটিই লেখেননি তিনি ‘আনান্দবাজার’  ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় শিক্ষা, শিক্ষার অবনতি, শিক্ষকের দায় দায়িত্বের বিষয়ে নিয়মিত লিখতেন। কর্মঠ ও নিষ্ঠাবান শিক্ষক হিসেবে জীবন অতিবাহিত করেছেন। কর্মই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত। আর ছাত্র হেমচন্দ্র লিখেছেন, ‘তিনি যে কি প্রকার কর্মঠ ছিলেন তাহা বলিয়া শেষ করা যায় না। ক্ষণিকের নিমিত্তে তাকে বসিয়া গল্পগুজব অথবা আমোদ প্রমোদ করিয়া সময় কাটাইতে দেখা যায় নাই। কর্মই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত। তাঁহাকে প্রকৃতই কর্মবীর বলা যায়। তিনি ১৯৫৮ সালে রাজবাড়ি থেকে পশ্চিমবঙ্গে বরাহনগরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। দুই জামাতা, দুটি কন্যা ও পুত্রবধূর অকাল মৃত্যুতে পরিবারটি শোকে বিহবল বিদ্ধস্ততার মুখে পতিত হয়। পুত্র ধীরেন্দ্র (এসবি) চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করায় নিষ্ঠাবান পরিবারটি আর্থিক অসচ্ছলতায় পড়ে। সমাজ ও মানুষের জন্য তাঁর অবদান মূল্যায়নের ভাষা নেই। কেবল গ্রন্থের পাতায় তিনি শ্রেষ্ঠতম।

যশোহর রাজ প্রতাপাদিত্যের সেনাপতি রঘুর বংশধর বাগডুলিতে

যশোহর রাজ প্রতাপাদিত্যের সেনাপতি রঘুর বংশধর বাগডুলিতে

পাংশা উপজেলার রঘুবীর সম্বন্ধে কথিত নানা কাহিনী লোকমুখে শোনা যায়। পাংশার কোনো একজন ব্যক্তি আমাকে বলেছিলেন কথিত আছে এ অঞ্চলে রঘুবীর নামক এক অসম বীর ছিলেন যিনি বড় আকারের একটি নৌকা মাথায় করে বহন করতে পারতেন। খাদ্যখানা ছিল দিনে ২০/২৫ জন মানুষের খাদ্যের সমান। হাজার লোকও তার সাথে লড়তে সাহস পেত না—-ইত্যাদি। ভদ্রলোক আমাকে এ বীরের কাহিনীর সত্যতা খুঁজে পেতে অনুরোধ করেছিলেন। এক্ষণে এর রঘুবীরের সন্ধান করা গেছে যিনি যশোহর রাজ প্রতাপাদিত্যের অন্যতম সেনাপতি ছিলেন। তবে রঘু নয় রঘুর ছেলে বাস করতেন পাংশার বাগডুলিতে।

বাংলায় বারভূঁইয়াদের মধ্যে স্বাধীনচেতা যশোহর-খুলনার পরাক্রমশালী ভূঁইয়া ছিলেন প্রতাপাদিত্য। পিতা বিক্রমাদিত্যর ১৫৮৩ সালে মৃত্যুর পর ১৫৮৪ সালে প্রতাপাদিত্যের রাজ্যাভিষেক হয়। সে সময় সম্রাট ছিলেন মহামতি আকবর। প্রতাপাদিত্য প্রবল ও পরাক্রমশালী জমিদার হিসেবে অচিরেই আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি বিভিন্ন স্থানে দুর্গ নির্মাণ এবং সুশৃঙ্খল সৈন্যদল গঠন করে যশোর খুলনাসহ উড়িষ্যা পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করেন। প্রতাপাদিত্যের সময়ে সম্রাট আকবরের সেনাপতি মানসিংহ বঙ্গের সুবেদার হয়ে আসেনে (১৫৮৯-১৬০৪) এবং রাজমহলে রাজধানী স্থাপন করেন। ১৬০৩-০৪ খ্রিস্টাব্দে মানসিংহ যশোহর আক্রমণ করেন। প্রতাপের সাথে মানসিংহের যুদ্ধ ও সন্ধি হয়। ১৬১০-১১ ধুমধাটের নৌ-যুদ্ধে প্রতাপের পরাজয় হলে প্রতাপ পিঞ্জিরাবদ্ধ হয়ে আগ্রায় প্রেরিত হন। পরে বারানসীতে তাঁর মৃত্যু হয়। প্রতাপাদিত্যের ছিল ৫২ হাজার ঢালী, ৫১ হাজার তীরন্দাজ, বিশ হাজার পদাতিক এবং বিপুল পরিমাণ কুকী সৈন্য। তাঁর কয়েকজন সেনাপতির মধ্যে রঘু ও মুঘা ছিলেন অন্যতম। সেনাপতি রঘুর অধীনে ছিল একদল পার্বত্য কুকীর সুঠাম দেহের শক্তিশালী সৈন্যদল। তারা তীর, ধনুক, বর্শা ও টাঙ্গী দিয়ে যুদ্ধ করত। তারা নৌবিদ্যায়ও পারদর্শী ছিল। যশোর-খুলনার ইতিহাসের ২৬৯ পৃষ্ঠায়—‘প্রতাপাদিত্যের সেনাপতি রঘুর নিবাস ছিল রাজবাড়ি জেলার দক্ষিণে গড়াই নদীর ওপারে বর্তমান ঝিনাইদহ জেলার শ্রীপুরে। তিনি সৌপায়ন গোত্রীয় নাগবংশীয় বরেণ্য কায়স্থ ছিলেন। পূর্বপুরুষ কর্কট তারা উজালীয়া পরগানার অধীশ্বর হয়ে শৈলকুপায় ছিলেন। রাজা কর্কটের বংশধর রাজবল্লভ। রাজা রাজবল্লভের পৌত্র রঘুনাথ ছিলেন রাজা প্রতাপাদিত্যের সেনাপতি। তিনি পূর্ব দেশীয় সৈন্যদলের অধিনায়ক ও দুর্গাধ্যক্ষ ছিলেন।’ কিঙ্কর রায় রচিত—-নাগবংশ ঢাকুর পৃষ্ঠা-১৪-১৫

  • প্রতাপ আদিত্য রাজা বঙ্গ-অধিপতি,
  • পূর্ব খণ্ডে ছিল তাঁর রঘু সেনাপতি
  • মানসিং হস্তে সদা—–প্রতাপ পড়িল
  • মাহযুদ্ধে রঘুবীর প্রাণ বিসর্জিল
  • বিস্ময় বিভব সব পর হস্তগত
  • দেবালয় সমজিদে হইল পরিণত।

রঘুবীরের মৃত্যুর পর তাঁর জমিদারী মানসিংহের সময়ে বাজেয়াপ্ত হয় নাই। সম্ভব ত ইসলাম খাঁর সেনানী ইনায়েত খাঁর আদেশে তা সাধিত হয়। তখন রঘুর পুত্র রামনারায়ন রাজ্যহীন হয়ে শৈলকুপা ত্যাগ করে বাগডুলী গ্রামে (রাজবাড়ি জেলার পাংশা থানার অন্তর্গত) বাস করেন। এরপর এ বংশ নান স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। সম্ভবত বাগডুলীতে বসবাসরত রঘুর পুত্রের কারণে অত্র অঞ্চলে রঘুবীর সম্বন্ধে নানা কাহিনী ছড়িয়ে পড়ে।

প্রাচীন শাসন

প্রাচীন শাসন

রাজবাড়ি জেলা প্রাচীনবঙ্গের জনপদ। পদ্মার প্রবাহের দক্ষিণের ভাগিরথী ও প্রাচীন ব্রক্ষপুত্রের মধ্যবতী অঞ্চলের ব-দ্বীপের প্রাচীন পরিচিতি বঙ্গ। সমুদ্র গুপ্তের রাজত্ব কালে (৩৮০-৪১২ খ্রিস্টাব্দে) কবি কালিদাসের রঘু বংশের বঙ্গ পরিচিতে দেখা যায় গঙ্গার মুখের শাখা প্রশাখা দ্বীপ পুঞ্জই বঙ্গ যার অধিবাসীগণ জীবনের সকল স্তরে এমন কি যুদ্ধ  ও সমুদ্র ব্যবহারে নৌকা ব্যবহার করত। বঙ্গের শাসনকালের প্রাথমিক ধাপে গুপ্ত সাম্রাজ্যের (৩৮০-৫১২) পরিচয় পাওয়া যায়। সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ প্রশস্তি এবং দ্বিতীয় চন্দ্র গুপ্ত ও সমুদ্র গুপ্তের স্বর্ণ মুদ্রার আবিস্কারের পর থেকে জানা যায় এ অঞ্চল তাদের অধীন ছিল। গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া ফোর্টের সন্নিকটে পাওখোলা গ্রামের সোনাকান্দুরিতে স্বর্ণ মুদ্রা আবিস্কৃত হয়। চন্দ্র গুপ্তের ও স্কন্ধ গুপ্তের শাসন বলতে দক্ষিণ বঙ্গের ফরিপুর, বরিশাল, যশোরের কিয়দংশকে বোঝানো হয়েছে। পরবর্তীতে এখানে তাম্র পট্টলি পাওয়া যায় যাকে ই-ই পার্জিটার বিশ্লেষণ করে মতামত দেন ষষ্ঠ শতকে এখানে আর একটি রাজ্যের উত্থান ঘটে। ৫৩১ এবং ৫৬৭ সালের তাম্র পট্টলির ব্যাখ্যা দিয়ে পার্জিটার ধর্মাদিত্য ও গোপ চন্দ্রের রাজত্বকালে নির্ধারণ করেন। ধর্মাদিত্য ছিলেন অতি ন্যায়পরায়ন ও ধার্মিক রাজা। গোপচন্দ্র বলে পরিচিত ছিলেন। কোটালীপাড়া ফোর্টের পশ্চিমাঞ্চলে ঘাঘর নদীর পিনহারির নিকট ঘুঘরাহাটিতে আর একটি তাম্র পট্টলি আবিষ্কৃত হয়। এতে রাজা সমাচার দেবের নাম দেখা যায়। পার্জিটারের মতে ৬১৫-৬২০খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সমাচার দেব অত্র অঞ্চলে রাজত্ব করেন। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পর এ দেশের অঞ্চল সমাচার দেবের রাজত্বকাল ছিল। সমাচার দেবের রাজত্ব কালের  আরো নিদর্শন পাওয়া যায় মুহাম্মদপুরের নিকটবর্তী আমুখালি নদীর তীরে আরো দুটি স্বর্ণ মুদ্রা আবিস্কারের মধ্য ‍দিয়ে। নালিনীকান্ত ভট্টশালী এ মতামত  স্বীকার করেন এবং বলেন সমাচার দেব ছিলেন রাজা (Monarch) তিনি গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধিকারী নন। তিনি শশাম্কের পূর্ব পর্যন্ত রাজত্ব করেন। ইউয়াং চোয়াং-এর বর্ণনা মতে বঙ্গ যথাসম্ভব ৭ম শতাব্দীর মাঝামাঝি সম্রাট হর্ষবর্ধনের আয়ত্বাধীন হয়। উল্লেখ্য, চৌনিক পরিব্রাজক ইউয়াং চোয়াং (৬৩০-৬৪৩ খ্রিস্টাব্দে) ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল ভ্রমণ করেন।

৬৪৭ খ্রিস্টাব্দে হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর তার সাম্রাজ্য ভেঙ্গে যায় এবং বাংলার স্বাধীন রাজত্বের উদ্ভব হয়। ঢাকার অদূরে আশ্রাফপুর পট্টলিপিতে এর প্রমাণ মেলে। এ সময় স্কন্ধ রাজবংশের উদ্ভব হয়। স্কন্ধ রাজবংশীয়রা ছিলেন বুদ্ধিষ্ট এবং রাজধনী ছিল কুমিল্লার সন্নিকটে বড়কামতা।

নবম এবং দশম শতকে চন্দ্রবংশীয় রাজাদের রাজত্ব বঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়। চন্দ্রবংশীয় রাজারা ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। তাদের রাজধানী ছিল ঢাকার ‍বিক্রমপুরে। শরিয়াতপুর জেলার ইদিলপুর তাম্র পট্টলী থেকে জানা যায়। এ বংশের শ্রীচন্দ্র তার ইদিলপুর পট্টলী দ্বারা স্মতট পদ্মাবতী অঞ্চলে জনৈক ব্রাক্ষণকে একখন্ড ভূমি দান করেন। স্মতট পদ্মাবতী বিষয়ে ইতিপূর্বে আলোচিত হয়েছে। উল্লেখ্য ৮ম শতকের পুণ্ড্রভূমিতে (মহাস্থানগর বর্তমান বগুড়া) পাল শাসনের স্থাপত্য রয়েছে। পাল শাসনের নিদর্শন বঙ্গে তেমন না থাকলেও রাজবাড়ি পুণ্ড্রভূমির দক্ষিণ সীমান্তের কাছাকাছি বলে এ অঞ্চলে পাল শাসন অধীন হয়। কালুখালির হারোয়াতে মদন মোহন জিউর বলে যে মূর্তিটি রয়েছে, অনেকে তা পাল শাসনের স্মৃতি বলে মনে করেন। ২০০৩ সালে রাজবাড়ির তেঘারিতে একটি বিষ্ণুমূর্তি পাওয়া যায় যা বর্তমান ঢাকা মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।  চন্দ্রবংশীয় রাজাদের পর বিক্রমপুরে বর্ম রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্ম রাজবংশের বজ্রবর্মা, হরিবর্মা, সমলা বর্মা, ভোজ বর্মা এবং চন্দ্রবর্মা ১০৮০ থেকে ১১৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। কোটালীপাড়া চন্দ্রবর্মা ফোর্ট এ অঞ্চলে তাদের রাজত্বের নিদর্শন বহন করে।

পরবর্তীতে ১১৫০ থেকে ১২৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সেনবংশের রাজত্বকাল। সেনবংশের প্রথম রাজা বিজয় সেন। তিনি সম্ভবত বার’শ খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে বাংলার দক্ষিণপূর্ব থেকে পালদের বিতাড়িত করেন। বল্লাল সেন বিজয় সেনের উত্তরাধিকারী এবং তিনি ছিলেন পণ্ডিত। বিজয় সেন এবং বল্লাল সেন উভয়েই শিবের পূজারী ছিলেন। বল্লাল সেনের পুত্র লক্ষণ সেন ১১৭৮ থেকে ১২০৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলায় রাজত্ব করেন। বল্লাল সেনের রাজত্বকালে ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়র খলজী নদীয়া আক্রমণ করেন। লক্ষণ সেন পরাজিত হন এবং পলায়ন করে বিক্রমপুর আসেন। পরবর্তীতে লক্ষণ সেনের বংশধরগণ বেশ কিছুকাল বঙ্গে রাজত্ব করেন। এ বংশের বিশ্বরুপ সেনের শাসন ব্যবস্থার নির্দশন কোটালীপাড়ার দক্ষিণ পশ্চিমে পিঞ্জরীর নিকটপ্রাপ্ত তাম্র পট্রলী থেকে পাওয়া যায়। এ বংশ ত্রয়োদশ শতকের মধ্যবর্তীকাল পর্যন্ত নির্বিঘ্নে বঙ্গ শাসন করেন।

সেন বংশের শাসনের অবসান কালে বঙ্গের একক শাসন শক্তি লোপ পায়। এ সময় দেব বংশের দশরথ দেব দক্ষিণপূর্ববাংলা (কুমিল্ল নোয়াখালি অঞ্চল) শাসন করেন। তার রাজ্য পরবর্তীতে ফরিদপুর অঞ্চলে বিস্তৃত হয়। দেব বংশের সমাচার দেবের রাজত্ব সম্বেন্ধে ঘুঘ্রাঘাটি লিপিতে পাওয়া যায়। সমাচার দেবের ঘুঘ্রাঘাটি লিপিতে সুবর্ণবিথীর উল্লেখ আছে। এই সুবর্ণবিথী নব্যকাশিকার (কোটালীপাড়া) অন্তর্ভুক্ত ছিল। সুবর্ণবিথীর অন্তর্ভুক্ত ছিল বারব মণ্ডল, ধ্রবিলাটি ।

ধ্রবিলাটি বর্তমানে ধুলদি গেট (ফরিদপুর)। দেব বংশের রাজা দনুজমর্দন দেব সোনারগাঁকে রাজধানী করে স্বাধীনভাবে বঙ্গ শাসন করেন। তার রাজত্বকাল ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত চলে। ১২৬৮ খ্রিস্টাব্দে তুঘরল খান দিল্লীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং স্বাধীনতা ঘোষনা করেন। বরনীর বিবরণ থেকে জানা যায় তুঘরিল খান লক্ষ্ণৌতি রাজ্যের সীমানা বৃদ্ধির জন্য মনোযোগ দেন। তিনি দনুজমর্দন দেবের শক্তি সোনারগাঁ দখল করার জন্য সোনারগাঁ রাজ্যের অদূরে একটি দুর্গ নির্মাণ করেন। বরণী এ কিল্লাকে নরকিল্লা বা নারকিল্লা বলেছেন। ফরিদপুরের ইতিহাস লেখক আনম আব্দুস সোবহান নারকিল্লাকে রাজবাড়ির দক্ষিণপূর্বে ১০ মাইল অদূরে মনে করেন। এটা বর্তমানের নলিয়া হতে পারে। দনুজমর্দন দেবের সময় শাসন কেন্দ্র দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তা মুসলিম শাসনভুক্ত হয়। স্যার উইলিয়াম হান্টারের Statistical Account of the Dacca District ১১৯ পৃষ্ঠায় Professor Blochman এর দক্ষিণ বাংলার শাসন সম্বন্ধে বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে মুসলমান দ্বারা বিজিত হলেও দক্ষিণ বাংলা শতাব্দীকালেরও উর্ধে্ব বল্লাল সেনের বংশধর ও অন্যান্য স্থানীয় রাজাদের দ্বারা শাসিত হয়। ১৩৩০ সালে মুহম্মদ তুঘলক পূর্ববাংলা দখল করেন এবং লক্ষ্ণৌতি সাতগাঁ ও সোনারগাঁ তিনটি প্রদেশে বিভক্ত করেন (ঢাকাসহ)। সোনারগাঁয়ের গভর্ণর ছিলেন তাতার বাহরাম খান। ১৩৩৮ সালে তার মৃত্যুর পর ফকরউদ্দিন মোবারক শাহ সিংহাসন দখল করেন এবং মুবারক শাহ নাম ধারণ করে প্রায় দশ বৎসরকাল রাজত্ব করেন। সোনারগাঁ পূর্ববাংলার শাসন কেন্দ্রে পরিণত হয়। ফকরউদ্দিন মবারক শাহ এবং তার বংশধরদের রাজত্বকালে বাংলা বিভিন্ন কারণে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। অতঃপর ১৩৫১ সালে শামসুদ্দিন ইলিয়াশ শাহ সোনারগাঁ, সাতগাঁ ও লক্ষ্ণৌতিকে একত্র করে একচ্ছত্র স্বাধীন সুলতান হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তার সময়েই বাংলা একক স্বাধীন বাংলায় পরিণত হয় যা ইতিহাসে ‘সুবে বাংলা’ বলে পরিচিত । ১৩৫২ সালে সেনারগাঁ টাকশাল থেকে তার নামে মুদ্রা উৎকীর্ণ হয়। ইলিয়াস শাহের পুত্র সিকান্দার শাহ সোনারগাঁ শাসন করেন। তার বংশধরগণের শাসনকালে শাসন কেন্দ্র সোনারগাঁ দিল্লীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং স্বাধীন সুলতান হিসেবে সোনারগাঁ শাসন করে। সিকান্দর শাহের পুত্র আযম শাহ স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং কবি হাফিজকে সোনারগাঁয়ে আমন্ত্রণ করেন। আযম শাহের পর সোনারগাঁ সিংহাসন রাজা কানস এর দ্বারা অধিকৃত হয়। কিন্তু ১৪৪৫ সালের মধ্যে বাংলা পুনরায় মাহমুদ শাহের অধীনে একত্রিত হয়। এ সময় ইলিয়াস শাহের বংশধরগণের দ্বারা ১৪৮৭ ‍খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সোনারগাঁ শাসিত হয়। এদের মধ্যে জালাল উদ্দিন ইতিহাসে বিশেষভাবে পরিচিত। মাহমুদ শাহের রাজত্বকালে বাংলার পূর্বাঞ্চল মেঘনা থেকে সিলেট পর্যন্ত মোয়াজ্জামাবাদ প্রদেশ গঠিত হয়। কিন্তু ঢাকার অঞ্চল বিশেষ করে ফরিদপুর এবং বাকেরগঞ্জ নিয়ে গঠিত হয় জালালাবাদ ও ফতেহাবাদ প্রদেশ। ফতেহাবাদ যে ফরিদপুর তা আজ ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। যদিও চট্রগ্রামের ৮ মাইল উত্তরে অন্য একটি ফতেহাবাদের উল্লেখ রয়েছে। ফতেহাবাদ সম্বন্ধে ড. আব্দুল করিম বাংলার ইতিহাস সুলতানি আমল পুস্তকের ২৪৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন, ‘জালালউদ্দিন ফতেহাবাদ ও রোতসপুর হতে মুদ্রা উৎকীর্ণ করেন। ফতেহাবাদ ও আধুনিক ফরিদপুর অভিন্ন।’ ইতিপূর্বে ফরিদপুর এলাকা মুসলমানদের অধীনে ছিল না। সেই অঞ্চলে এতদিন ছোট ছোট হিন্দু রাজারা রাজত্ব করতেন। সুতরাং ফতেহাবাদ হতে মুদ্রা উৎকীর্ণ হওয়ায় আমরা বলতে পারি যে, জালাউদ্দিন ফরিদপুর জয় করেন এবং দক্ষিণ বঙ্গের দিকে রাজ্য বিস্তার করেন। মধ্যযুগের কবি বিজয় গুপ্ত ১৪৯৪-৯৫ সালের মধ্যে মনসামঙ্গল বা পদ্মাপুরাণ কাব্য রচনা করেন।

কবি তার আত্মপরিচয়ে বলেন….

মূল্লুক ফতেহাবাদ বঙ্গজোড়া ইকলিম,

পশ্চিমে ঘাঘরা নদী পূর্বে ঘন্টেশ্বর।

 

ফতেহাবাদ মুল্লুকে ঘাঘড়া ও ঘন্টেশ্বরী নদীর মধ্যবর্তীস্থান ফুল্লেশ্রী গ্রামে কবির জন্ম। ফুল্লেশ্রী বর্তমান বরিশালের গৈলাগ্রামের একটি পল্লী। ফতেহাবাদ রাজ্যের অন্তর্গত ছিল বর্তমান রাজবাড়ির কিছু অংশ। সুলতান নাসিরুদ্দীন মাহমুদের রাজত্বকালের মুদ্রা ভাগলপুর, সাতগাঁও বাগেরহাট হতে উৎকীর্ণ হয়েছে এবং তার শাসনামলের শিলালিপি পাওয়া গেছে। ১৪৫৯ সালে তিনি যশোহর, খুলনা পুনরুদ্ধারের জন্য খান জাহান আলী নামে এক সেনাপতিকে পাঠান। তিনি এ অঞ্চল জয় করে খলিফাতাবাদ শহর এবং প্রশাসনিক বিভাগ ইকলিম হিসেবে ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। রাজবাড়ি জেলার ভৌগোলিক অবস্থানের বিশেষত্ব এই যে বর্তমান জেলাটি পুরাতন ফরিদপুর ও যশোর জেলার সংলগ্ন। আবার উত্তরে পাবনার সাথেও এর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তবে রাজবাড়ি জেলার অংশবিশেষ বেশির ভাগ সময় ফরিদপুর ও যশোর জোলার সাথে সংযুক্ত দেখা যায়। ১৭৯৩ সালে জেলাটির কিছু অংশ ঘাট গোয়ালন্দ হিসেবে যশোরের সাথে সংযুক্ত ছিল। কাজেই রাজবাড়ি তৎকালীন সময়ে ফতেহবাদ ও খলিফাতাবাদের সাথে সংযুক্ত থাকাই স্বাভাবিক এবং রাজবাড়ির পূর্বাংশ বাদ দিয়ে বাকি অংশ খলিফাতাবাদ প্রশাসনিক অঞ্চলের সাথে যুক্ত ছিল।

১৪৯৩ থেকে ১৫১৯ পর্যন্ত আলাউদ্দিন হুসেন শাহের রাজত্বকাল। Mr. Vincent Smith এর মতে হুসেন শাহ ছিলেন বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ মুসলিম শাসক। Professor Blochman বলেন, Hussain shah first obtained power in the district of Faridpur, Fathahabad where his earliest coins were struck. হুসেন শাহের সময় রাজবাড়ি তার অধিকারভুক্ত হয়। রাজবাড়ি জেলার নসিবশাহী পরগনা, নশরতশাহী পরগনা, মাহমুদশাহী পরগনা, ইউসুফশাহী পরগনার নামকরণ হুসেনশাহের ভ্রাতা ইউসুফ শাহ এবং ইউসুফ শাহের সন্তান নশরত শাহ এবং মাহমুদ শাহের নামকরণে এসব পরগনার নামকরণ হয়। উল্লেখ্য পাংশা, বালিয়াকান্দি, গোয়ালন্দ ও রাজবাড়ি উপজেলা নশরতশাহী, মাহমুদশাহী, নসিবশাহী, ইউসুফশাহী পরগনার নামে প্রাচীন পরিচিতি রয়েছে। এ সময় ফতেহাবাদ ছিল হুসেন শাহের প্রধান শাসন কেন্দ্র যা বর্তমান ফরিদপুর শহর। আইন-ই আকবরী গ্রন্থে দেখা যায় জালালুদ্দিন ফতেহ শাহ লক্ষ্ণৌতির শাসনকর্তা ছিলেন। (১৪৮১-১৪৮৭)। তিনি কতকগুলি সরকারে বিভক্ত করেন। এই সরকারে ফরিদপুরের অংশবিশেষ, ঢাকার অংশবিশেষ, বাকেরগঞ্জ নিয়ে জালালবাদ সরকার এবং ফরিদপুরের পশ্চিম অঞ্চল, যশোর এবঙ কুষ্টিয়অসহ মাহমুদাবাদ সরকার গঠিত হয়। বর্তমান রাজবাড়ি স্বাধীন সুলতানি আমলে ফতেহাবাদ, খলিফাতাবাদ, মাহমুদাবাদ রাজ্য হিসেবে শাসিত। মোগল শাসনকালে আকবর নামায় দেখা যায় ১৫৭৪ ‍খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণপূর্ববাংলা জয় করার জন্য সেনাপতি মোরাদ খানকে পাঠান। সেনাপতি মোরাদ খান ফতেহাবাদ জয় করেন এবং বাকলা ও তার অধিকারভুক্ত হয়। মোরাদ খান এখানেই থেকে যান এবং সাত বৎসর পর মৃত্যুবরণ করেন। আকবর নামায় দেখা যায় ফরিদপুরের উত্থান ইতিহাস খ্যাত। তাদের দমনের জন্য সম্রাট আকবর মানসিংহসহ একের পর এক সেনাপতি পাঠান। সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে (১৬০৬-১৬২৭) ইসলাম খান (১৬০৮-১৬১৩) বাংলার সুবাদার নিযুক্ত হন তিনি সমগ্র বাংলার একচ্ছত্র শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হন। ইসলাম খানের পর ১৭৫৭ পর্যন্ত ২১ জন সুবেদার বাংলা শাসন করেন। শেষের দিকে বাংলার সুবেদারগণ স্বাধীন নবাব হিসেবে বাংলায় রাজত্ব করতেন। খলিফাতাবাদ যশোর খুলনা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। যশোরের পরগনাসমূহের মধ্যে মাহমুদশাহী, মহিমশাহী, ইউসুফশাহী, নসিবশাহী, নশরতশাহী পরগণার মধ্যে রাজবাড়ির বালিয়াকান্দি নসিবশাহী, পাংশা কালুখালির মহিমশাহী নশরতশাহী বিদ্যামান।

রাজা সূর্যকুমার গুহরায়

রাজা ‍সূর্যকুমার গুহরায়

‘রাজা সূর্যকুমার’ এক কিংবদন্তি নাম। জেলার নামকরণে লক্ষীকোল জমিদার বাড়ির পরিচিতি ‘রাজবাড়ি জেলার নামকরণ’ শিরোনাম নিবন্ধে আলোচনা করেছি। এ বিষয়ে আবশ্যকীয় মন্তব্য হল ১৮৮০‘র দশকে জমিদার সূর্যকুমার বৃটিশ রাজ কর্তৃক ‘রাজা’ উপাধিপ্রাপ্ত হলে ‘লক্ষীকোলের রাজার বাড়ি’ রাজবাড়ির ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। প্রায় এক দশক যাবৎ বিভিন্ন সূত্র থেকে রাজা সূর্যকুমারের জীবন ইতিহাস জানার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তাঁর সামগ্রীক জীবনপঞ্জী সংগ্রহ করতে পারিনি। লক্ষীকোল রাজার বাড়ি দর্শন, রাজার পারিবারিক সূত্র, লোকমুখে এবং শ্রী ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্য লিখিত ‘আমার স্মৃতিকথা’ গ্রন্থ থেকে সূর্যকুমার সম্বন্ধে যতটা জেনেছি সে তথ্যবলীর আশ্রয়ে রাজা সূর্যকুমারের জীবন ইতিহাস লিখিত হল। উল্লেখ্য শ্রী ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্য রাজার আশ্রয়ে তাঁর বাসভবনে থেকে রাজার হাতে গড়া ‘রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশনের’ (R.S.k) লেখাপড়া করেন। ১৮৮৮ সালে রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশনটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৮৯ সালে ত্রৈলোক্যনাথ ঐ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ১৮৯৪ সালে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা (বর্তমান এসএসসি) পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এ সময় তিনি রাজার বাড়িতে লজিং থেকে সূর্যকুমার ও রানী মাতাদের স্নেহ মমতায় লেখাপড়া করেন। ত্রৈলোক্যনাথ যখন কলিকাতায় এফএ (বর্তমান আই,এ) পড়তে যান তখনও তিনি রাজার কলিকাতার বাড়িতে থাকতেন। অতঃপর ত্রৈলোক্যনাথ ১৯০০ সালে আরএসকে ইনস্টিটিউশনে প্রথমে সহকারী প্রধান এবং পরে প্রধান শিক্ষক হিসেবে রাজার জীবিতকালে ও পরে শিক্ষাকতা করেন। রাজাকে তিনি কাছে থেকে দেখেছেন, রাজার স্টেটের ইকসিকিউটর ছিলেন। রাজার শ্যালক, সন্তান ও আত্মীয়দের সাথে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। রাজা, রানী, রাজার বাড়ি, লক্ষীকোল এস্টেটের অনেক কাহিনী ও ঘটনার সাক্ষী ত্রৈলোক্যনাথ। এর অনেক বিষয় তিনি ‘আমার স্মৃতিকথা’ গ্রন্থে লিখেছেন। গ্রন্থটির বিষয়ে জানা থাকলেও কোনোভাবেই তা সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছিল না। অনেক চেষ্টার পর আমার বন্ধু প্রফেসর ও প্রাক্তন অধ্যক্ষ নিত্যরঞ্জন ভট্রাচর্যা জানুয়ারি ২০০৯ এ কলিকাতা থেকে গ্রন্থটি সংগ্রহ করে আমার হাতে দেন। তাঁর এ অবদান স্মরণীয়।

বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী সূর্যকুমার ছিলেন দরদী ও প্রজাপ্রেমী। সমাজসচেতন রাজা, সমাজ উন্নয়নের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন গেছেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, পাঠাগার, রাস্তাঘাট, পোস্ট অফিস, মন্দির। তাঁর আশ্রয়ে লালিত পালিত হয়েছেন ছাত্র, আশ্রয়হীন বালক, দরিদ্র ঘরের অসহায় সন্তান। রাজার দুই রানী। কোনো রানীরই সন্তান না থাকায় রাজা যেন সকলের সন্তানকে আপন সন্তান ভাবতেন। নিজের শ্যালকদের পুত্রবৎ স্নেহে স্বগহে আশ্রয় দিয়ে পালন করেছেন। তৎকালীন জমিদারের শোষণ, অত্যাচারের নানা কাহিনী ইতিহাসে লেখা আছে কিন্তু প্রতাপশালী রাজা সূর্যকুমারের এরুপ কোনো ঘটনা রাজবাড়ির কোনো মানুষের মুখে শোনা যায় না। বরং একজন তেজস্বী, অথচ কোমল হৃদয়ের মানুষ হিসেবে তিনি পরিচিত। প্রতাপশালী বৃটিশ রাজার কাছে তিনি মাথা নোয়াবার পাত্র ছিলেন না। স্বদেশী ও স্বরাজ আন্দোলনে পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন। জাতীয় চেতনায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত সজাগ। লোকমুখে জানা যায় একবার বড়লাট অত্র এলাকার সকল জমিদারদের দরবারে ডেকে পাঠান। সবাই জুতা খুলে লাটের দরবারে প্রবেশ করেছিল কিন্তু সুর্যকুমার জুতা পায়ে লাটের দরবারে প্রবেশ করলে লাট সাহেব বললেন ‘রাজা বটে’? অনেকে মনে করেন সেই ঘটনা থেকে রাজা বলে পরিচিত। কিন্তু ব্যাপারটা এমন নয়। সূর্যকুমারের ব্যক্তিত্ব, জনহিতকর কাজ, শিক্ষার প্রতি অনুরাগ এবং প্রজা প্রেমের জন্য ১৮৮০‘র দশকে কারোনোশনের মাধ্যমে তাঁকে ‘রাজা’ উপাধি দেওয়া হয়। লক্ষীকোল এস্টেটের উত্তরাধিকারী জমিদার দীগিন্দ্র প্রসাদ গুহ রায়ের কোনো সন্তান না থাকায় অনুমান ১৮৪০ এর দশকের শেষে সূর্যকুমারকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেন। প্রবীনদের মুখে শোনা যায় দীগিন্দ্র প্রসাদ দত্তক গ্রহণে সূর্যনগরের নিকটবর্তী কোনো গ্রামে (মতভেদে চরনারায়ণপুর) পালকি প্রেরণ করেন। সুর্য্যকুমারেরা ছিলেন দুই ভ্রাতা। দৈহিক কান্তির যে ছেলেটিকে দত্তক নেওয়ার কথা ছিল সে পালকিতে চড়ে না। শীর্ণকায় ভাইটি পালকিতে ওঠে। এই ভাইটি সুর্যকুমার। দীগিন্দ্র প্রসাদের মৃত্যুর পর সূর্যকুমার এস্টেটের উত্তরাধিকারী নিযুক্ত হন। প্রথম অবস্থায় লক্ষীকোল, বিনোদপুর মৌজা এবং লক্ষীকোলের উত্তর পূর্বে কাশিমনগর পরগনার পদ্মা তীরের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে লক্ষীকোল এস্টেটের বিস্তৃতি ছিল। উল্লেখ্য রাজা সূর্যকুমারের মৃত্যুর পর লক্ষীকোল এস্টেট তেঁওতার রাজার সাথে মামলায় জড়িয়ে পরে। এ প্রসঙ্গে ত্রৈলোক্যনাথ লিখেছেন ‘আমি যখন এই বিল্ডিং এর কাজে হাত দিলাম (RSK-১৯১৪) ঠিক সেই সময়ে লক্ষীকোল স্টেট একটি বড় রকমের মোকদ্দমায় জড়িত হইয়া পড়ে। পদ্মার চর লইয়া তেঁওতার জমিদারদের সঙ্গে মামলার জন্য স্টেট হইতে টাকা দিয়া বিল্ডিং শেষ করা সম্ভব হয় নাই’ (আমার স্মৃতিকথা-ত্রৈলোক্যনাথ – পৃষ্ঠা-২৬)। কাশিমনগর পরগনার পদ্মার তীরবর্তী অঞ্চল, (পদ্মা তখন লক্ষীকোল থেকে ৬ মাইল/প্রায় ১০ কিমি উত্তর দিয়ে প্রবাহমান ছিল), সূর্যনগর, দিনাজপুর, ভুবেনেশ্বর, কলিকাতা, কাবিলপুর পরগনায় সূর্যকুমারের জমিদারী প্রতিষ্ঠা পায়। এ সকল জমিদারী থেকে লক্ষীকোলে এস্টেটের বাৎসরিক আয় তখনকার দিনে ছিল প্রায় দেড় লক্ষ টাকা। রাজপ্রাসাদ ও রাজার বাড়ির নাম ছিল দেশখ্যাত। প্রায় ৬০ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত প্রাসাদ, অতিথিশালা, পোস্ট অফিস, আঙ্গীনা, বাগানবাড়ি, শান বাঁধানো পুকুর ঘাট, টোল, বৈঠকখানা, অফিস কর্মচারী, পাইক পেয়াদা, গোশালা, আস্তাবল নিয়ে রাজার বাড়ি ছিল জমজমাট। এ ছাড়া রাজা কলিকাতায় বাসস্থান নির্মাণ করেন। দুই রানীর মধ্যে কোনো রানীরই সন্তানদি না থাকায় রাজা ১৮৯০ এর দশকের শুরুতে নরেন্দ্রনাথকে প্রথমে দত্তক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। নরেন্দ্রনাথ মেট্রোপলিটান কলেজিয়েট স্কুলে পড়ালেখা করতেন এবং ক্লাসে প্রথম স্থান অধিকার করতে থাকে। কিন্তু সহসাই কলেরা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এর পূর্বে রাজার এক শ্যালক হীরালাল যাকে রাজা পুত্রবৎ স্নেহ করতেন তিনিও রাজবাড়িতে দুর্ঘটানায় মারা যান। স্নেহপ্রবণ রাজা শ্যালক ও পুত্রের অকাল মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে পুরিধামে গমন করেন এবং পুরিতে ৬০,০০০.০০ (ষাট হাজার) টাকা ব্যয়ে সমুদ্র তীরে বাড়ি নির্মাণ করে বাস করতে থাকেন। রাজা ঐ বাড়ির নাম রাখেন, নরেন্দ্র কুটির। পুত্রের স্মৃতি রক্ষার্থেই এ নামকরণ করা হয়। অবশ্য রাজার মৃত্যুর পর ঐ বাড়ির নাম দেওয়া হয়, ভিক্টোরিয়া ক্লাব। রাজা ভবেশ্বরেও একখানি বাড়ি তৈরি করেন এবং সেখানে অনক ভূ-সম্পত্তি করেন।

রাজা সূর্য কুমার ১৮৬০ দশকের মাঝমাঝি বরিশালের গাভা নিবাসি উমাচরণ ঘোষ দস্তিদারের কন্যা ক্ষীরোদ রানীকে বিবাহ করেন। বিবাহের সময় রাজা দুই শ্যালক হীরালাল ও মতিলালকে সঙ্গে নিয়ে আসেন এবং পুত্রবৎ তাদের লালন পালন করেন। ১৭/১৮ বছর দাম্পত্য জীবনে ক্ষীরোদ রানীর গর্ভে সন্তানাদি জন্মায় না। রানীর পরামর্শে রাজা লক্ষীকোলের নিকটবর্তী গ্রাম ভবদিয়ায় বসবাসরত কুচবিহারের মোক্তার অভয়চরণ মজুমদারের কন্যা শরৎ সুন্দরীকে বিবাহ করেন। এ ঘরেও কোনো  সন্তানাদি জন্মায় না। অনুমান ১৮৯১ সালে রাজা স্ত্রীদের পরামর্শে রাজবাড়িতেই নরেন্দ্রনাথকে পোষ্যপুত্র গ্রহণ করেন। এ সময় ত্রৈলোক্যনাথ রাজার বাড়িতে সূর্যকুমার ইনস্টিটিউমনে লেখাপড়া করতেন। রাজার দুই শ্যালক, ত্রৈলোক্যনাথ এবং পোষ্যপুত্র নরেন্দ্র একসাথে চলাফেরা করতেন। বিশেষ করে রাজার শ্যালকদের সাথে ত্রৈলোক্যনাথের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। এ সময় একটি দুর্ঘটনা ঘটে। ত্রৈলোক্যনাথের কথায়—‘এ সময় রাজবাড়িতে একটি দুর্ঘটনা ঘটে। পুত্রেষ্টি উপলক্ষে রাজবাড়িতে খুব ধুমধাম হয়। যাত্রা, থিয়েটার, বাজী পোড়ান ইত্যাদিতে বহু অর্থ ব্যয় হয়। বাহির আঙ্গিনায় বৃহৎ মঞ্চ তৈয়ারী হইতেছে, মঞ্চ বাঁধিতে অন্যসব লোকের সঙ্গে রাজার শ্যালক হীরালালও মঞ্চে গিয়া ওঠে এবং হঠাৎ পড়িয়া গিয়া প্রাণ হারায়। যাহা হউক উৎসব নিরানন্দের মধ্যে কোনো রকমে শেষ হইয়া গেল বটে কিন্তু রাজা এই দারুণ ধাক্কা সহ্য করিতে পারিলেন না—–দেশত্যাগী হইয়া কলিকাতাবাসী হইলেন। রাজা তখন স্বপরিবারে কলিকাতাবাসী হলেও রাজবাড়ির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হয় না। নরেন্দ্রের মৃত্যুর পর রাজা পুরিধামে বসবাস করতে থাকেন এবং পুনরায় দত্তক গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। রাজা ও দুই রানীসহ রাজা শ্রীমান সৌরেন্দ্র মোহনকে দত্তক গ্রহণ করেন। এ উৎসব পুরিধামে নিজ বাড়িতে সম্পন্ন হয়।’ (আমার স্মৃতিকথা, ত্রেলোক্যনাথ, পৃ-১১)।

যথা সময়ে সৌরিন্দ্র মোহন সাবালক হলে লক্ষীকোল এস্টেটের উত্তরাধিকারী হন। তিনি ‘কুমার বাহদুর’ হিসেবে রাজবাড়িতে সকলের নিকট পরিচিত ছিলেন। রাজা সূর্য কুমারের অমর কীর্তির মধ্যে লক্ষীকোলে সুদৃশ্য প্রাসাদ নির্মাণ, লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা, হাসপাতাল নির্মাণ, লক্ষীকোল পোস্ট অফিস স্থাপন, রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশন প্রতিষ্ঠা, নিজ জমিদারী সূর্যনগরে রেলস্টেশন প্রতিষ্ঠা অন্যতম কাজ। লক্ষীকোল রাজার বাড়ি ছিল ঐতিহ্যের ধারক। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ‘রাজবাড়ি’ দর্শনে আসত। দেশের দর্শনীয় ঐতিহ্য হিসেবে পরিগণিত হত। স্বাধীনতার পর লক্ষীকোল রাজবাড়ির ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে ‘রাজবাড়ি’ একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। চলচ্চিত্রটি কয়েকবার টিভি পর্দায় দেখান হয়েছে। রাজার বাড়ির ধবংসাবশেষ বলতে বর্তমানে কিছুই নেই। ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি বটবৃক্ষ। শান বাঁধানো পুকুরট ভরাট হলেও পুকুরের স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে। প্রতি বছর এখানে নববর্ষের আগমনে বৈশাখী মেলা বসে। তবে ১৮৮৮ সালে তাঁর হাতে গড়া রাজা সূর্যকুমার প্রতিষ্ঠিত আর.এস.কে ইনস্টিটিউশন তাঁর স্মৃতি বহন করছে।

রাজা সূর্যকুমার আমোদপ্রবণ ও রসিক প্রকৃতির ছিলেন। তাঁর সময়েই লক্ষীকোল মেলা জেলার ঐতিহ্যবাহী মেলায় পরণত হয়। রাজবাড়িকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের উৎসব অনুষ্ঠান হত। বসত সঙ্গীত, যাত্রা ও পালাগানের আসর। রাজার বাড়ির অন্দর মহলের আনন্দ উচ্ছাস বিষয়ে ত্রৈলোক্যনাথের কথায়—–‘রাত্রে রাজবাড়ির চেহারা বদলাইয়া যাইত। বৈঠকখানায় গান, বাজনা, আমোদ প্রমোদ—–মদ পর্যন্ত চলত। রাজা মদ খাইতেন কোনো কোনো দিন নামমাত্র-ইয়ার বন্ধুদের যোগাইতেন প্রচুর। বড় মা (বড় রানী) আমাকে একদিন বলিলেন তুমি নায়েব মশাইকে বল চাকর গিয়া টাকা চাহিলেও যেন না দেন। বলিবে আমার হুকুম। আমি বলিলাম, কিন্তু রাজা যদি আমাকে ঘাড় ধরিয়া বাহির করিয়া দেন তখন? বটে! তাহা আমি বুঝিব, তুমি যাও। আমি তাহার আদেশ পালন করিলাম। রাজা আমাদের ষড়যন্ত্র টের পাইলেন। তবে আমাকে কিছু বলিলেন না। বরং তখন হইতে আমাকে অধিকতর স্নেহ করিতে লাগিলেন। তার কিছু দিন পর অনুমান ১৮৯১ নরেন্দ্রনাথকে পোষ্যপুত্র লওয়া হইল। তখন রাজবাড়ি হইতে মদ‘তো উঠিয়া গেলই বাদ্যযন্ত্র সব, পাখোয়াজ, তবলা, বেহালা প্রভৃতি বন্ধুবান্ধদিগের মধ্যে বিলাইয়া দিলেন, বলিলেন—–এসব থাকিলে ছেলে নষ্ট হইবে—-তার লেখাপড়া কিছু হইবে না।’ (আমার স্মৃতিকথা-৯ পৃষ্ঠা)। পারিবারিক স্নেহ মমতায় আবিষ্ট রাজা ছিলেন অত্যন্ত কৌতুক প্রিয় এবং গভীর জ্ঞানের অধিকারী। আমাদের দেশে এখনো নতুন ঘর বা পাকা বাড়ি নির্মাণের সময় প্রথমত দুই চার কোপ মাটি কেটে মোনাজাত করা হয়। অনেক সময় গর্তের মধ্যে টাকা পয়সা ফেলা হয়। তখনকার দিনে গর্তমধ্যে সোনা, রুপা দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। রাজা আর,এস,কে স্কুলের মূল বিল্ডিংটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকালে সোনা আনা হয়েছিল কিন্তু রুপা আনা হয় নাই। ত্রৈলোক্যনাথের পকেটে দুই আনার রুপার মুদ্রা ছিল। তিনি তা গর্তমধ্যে ফেললে রাজা হেসে বললেন, ‘বেশ হইল, এই স্কুল বিল্ডিং এর দুই আনা যত্ন হইল তোমার।’  আমি বলিলাম এ হাতি পোষা রাজরাজাদেরই খাটে—-গরীব স্কুল মাস্টারের কাজ নয় (স্মৃতিকথা-২১)।

আর একদিনের কথা, স্বাস্থ্য পরিবর্তনের জন্য রাজা ঢাকা থেকে গ্রীনবোট এনে বেলগাছি নিয়ে পদ্মা নদীতে অবস্থান করছিলেন। ত্রৈলোক্যনাথের কথায়—-‘আমি গিয়া বোটে উঠিলাম। রাজা তখন নৌকায় বসিয়া ছিপ দিয়া মাছ ধরিতেছিলেন। আমাকে দেখিয়াই বলিলেন, কী হে, ব্যাপার কী? ঠিক ঐ সময়ে ভারী ওজনের একটি কাতলা মাছ লাফ দিয়া নৌকা গর্ভে পড়িল। তিনি আনন্দিত হইয়া বলিলেন—-‘তুমি তো আচ্ছা মৎস্যরাশির মানুষ? আমি এক ঘন্টা বসিয়া আছি একটি মাছেও টোপ গিলছে না, আর তুমি আসা মাত্র তোমাকে দেখিতে আসিল। (পৃষ্ঠা-১৭)।

ত্রৈলোক্যনাথ গ্রীনবোটে রাজার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন একটি বিষয়ে পরামর্শ করতে। ফরিদপুরের সেটেলমেন্ট অফিসার জ্যাক সাহেব (আইসিএস) গ্রাজুয়েটদের মধ্য থেকে কানুনগো নিয়োগ করছেন। যারা এখন ঢুকবে তারা কানুগো কাজ শেষ হইলে সাব ডেপুটির কাজ পাবে। ত্রৈলোক্যনাথ জ্যাক সাহেবের সাথে দেখা করে চাকরিত যোগদানের জন্য সাতদিনের সময় নিয়ে এসেছেন। এখন রাজার অনুমতি পেলে যোগদান করবেন। ত্রৈলোক্যনাথের সব কথা শুনে রাজা বললেন, ‘বেশ তো স্কুল ঘরে তালা লাগাইয়া যাও। আমি স্কুল করিয়াছিলাম যখন রাজবাড়ির চর্তুদিকে ২০ মাইলের মধ্যে কোনো স্কুল ছিল না। একমাত্র ফরিদপুর জেলা স্কুল ছাড়া রাজবাড়িতে মাত্র ঈশ্বর পণ্ডিতের ছাত্রবৃত্তি স্কুল ছিল। তাহাও ভালোরুপ চলিত না। আমি স্কুল করিবার ৫ বছর পর বাণীবহের বাবুরা স্কুল করিলেন (গোয়ালন্দ হাইস্কুল)। তখান আর আমার স্কুল রাখিবার কী প্রয়োজন ছিল? একমাত্র তোমার জন্যই স্কুল রাখিয়াছিলাম। তুমি ডাকঘরে চাকরি পাইলে তাতে মন বসিল না। আসিলে রাজবাড়ি স্কুলে-২৫০ টাকা ছাড়িয়া ৫০টাকায় এখন চাও মেঠো আমিনী করিতে। জ্যাক সাহেবের বাচ্চা —-জল কাদা ভাঙ্গিয়া, ঝড় বৃষ্টি মাথায় করিয়া বুট পায়ে ছুটবে মাঠে ঘাটে। তোমাকেও দৌড়াইতে হইবে। তোমাকেও সঙ্গে সঙ্গে দৌড়াইতে হইবে। পারিবে তাল সামলাইতে?’ (পৃ-১৭১৮)। এরপর ত্রৈলোক্যনাথ স্কুল ছেড়ে যাননি। সুদীর্ঘ ৪২ বছর উক্ত বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।

রাজা বিদ্যান ছিলেন না কিন্তু বিদ্যার প্রতি ছিল গভীর অনুরাগ। গোয়ালন্দ মহকুমার গভর্ণমেন্ট সাহায্যকৃত হাইস্কুলটি পদ্মার ভাঙ্গনে নদীগর্ভে বিলীন হলে রাজবাড়ি উঠে আসে এবং তৎকালীন ডিপিআইসিএ মার্টিন সাহেবের অনুরোধে রাজা সূর্যকুমার এর পরিচালনার ভার গ্রহণ করেন। রাজা সূর্যকুমার প্রতিষ্ঠিত হাসপাতাল সংলগ্ন স্থানে (বর্তমান এসপি ও সিভিল সার্জন এর বাসা যে স্থানে ঐ স্থানটিতে সূর্যকুমার প্রতিষ্ঠিত হাসপাতল ছিল। পরে তা সিভিল সার্জনের অফিস ছিল)। স্থানান্তর করা হয়। কোনো কারণে বিদ্যালয়টি পরিচালনা সম্ভব না হওয়ায় রাজা ১৮৮৮ সালে রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশনটি (R.s.k) প্রতিষ্ঠা করেন। কেবল রাজবাড়ির ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর এস কে ইনস্টিটিউশনর প্রতিষ্ঠাতাই নন, নিজ গৃহে গড়ে তোলেন লাইব্রেরি। রাজার মৃত্যুর পর শ্যালক মতিলাল জমিদারী দেখাশোনা করতেন। তিনি কিছুটা অপ্রকৃতস্থ ছিলেন। লাইব্রেরি বিষয়ে ত্রৈলোক্যনাথ লিখেছেন—‘একদিন শুনিলাম মতিলাল রাজার লাইব্রেরিটি রাজবাড়ি উডহেড লাইব্রেরিকে দান করিয়া বসিয়াছেন। —-আলমারী বুককেসসহ এবং এসডিও আর এস দাসকে কথা পর্যন্ত দিয়া ফেলিয়াছেন। আমি সারা থেকে (ত্রৈলোক্যনাথ ১৯১৯ হইতে ১৯২৪ পর্যন্ত সারা স্কুলে ছিলেন) ছুটিয়া আসিয়া এসডিও’র সঙ্গে দেখা করিয়া বললেন, ঐ লাইব্রেরিটি রানীদের —-তাহারা বহু টাকা ব্যয় করিয়াছেন উহার পিছনে। তাহারা এখনো জীবিত। তাছাড়া আমরা স্টেটের  একজিকিউটর মাত্র। স্টেটের বা অন্যের সম্পত্তি দান করিবার কোনো অধিকার আমাদের নেই। আপনি কিছু মনে করিবেন না।’ অতঃপর মতিকে বললেন, ‘একি তোমার পৈত্রিক সম্পত্তি যে দান করিয়া বসেছিলে।’ (পৃষ্ঠা-৮০)? এর পর মতিলাল ঘোষ দস্তিদার কাবিলপুর পরগনা পরিদর্শন করতে যেয়ে ‘জগন্নথ’ বেশ ধারণ করেন। প্রকৃতপক্ষে তার মুস্তস্ক বিকৃতি ঘটে(১৯২২)। পূর্বেই বলা হয়েছে রাজা ভুবেনশ্বরে একখানি বাড়ি এবং ভূ-সম্পত্তি করেন। রানীদের নিয়ে রাজা শেষজীবন ভূবেনশ্বরেই কাটান। অনুমান ১৯১২ সালে রাজা ভূবেনশ্বরে দেহত্যাগ করেন। সেখানেই রাজার শ্রদ্ধাদি এবং পারলৌকিক কার্যাদি সম্পন্ন হয়। রাজার শ্রদ্ধাতে এক হাজার ব্রাহ্মণ নিমন্ত্রিত হন। পাণ্ডাদের সাহায্যে এবং নিমন্ত্রিত অতিথেদের ভোজন ও দক্ষিণা দ্বারা আপ্যায়িথ ও পরিতুষ্ট করা হয়। পূর্ব হইতেই রাজাকে যেখানে দাহ করা হয় সেখানে শিব মন্দির প্রতিষ্ঠার সঙ্কল্প ছিল এবং যথাসময়ে রাজার প্রথম পক্ষের শ্যালক এবং দ্বিতীয় পক্ষের সম্পর্কীয় শ্যালক অম্বিকাচরণ মজুমদার (ফরিদপুর) এবং ত্রৈলোক্যনাথ এর সহযোগিতায় শিবমন্দির নির্মাণ করা হয় শিবমন্দির নির্মাণ করতে অনেক টাকা কড়ি খরচ হয় যা রাজবাড়ির জমিদারী থেকে লওয়া হয়।

মৃত্যুর পূর্বে রাজা উইল রেখে যান। উক্ত উইলে রাজার দুই রানী, শ্যালক মতিলাল ঘোষ এবং শ্রী ত্রৈলোক্যনাথকে এস্টেটের একজিকিউটর নিযুক্ত করেছেন। উইলে আরো একটি শর্ত ছিল রাজার জীবনান্তে মতিলাল ও তার স্ত্রী পুত্রগণ (সাবালক না হওয়া পর্যন্ত ) মাসোহারা পাইবেন। কুমারের (সৌরিন্দ্র) তখন সাবালক হওয়ার এক বছর বাকি ছিল। এরমধ্যে মতিলাল জমিদারী দেখাশোনা করলেও তার মানসিক ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। ত্রৈলোক্যনাথ তখন ফরিদপুরের ডিএস-জেএ উডহেড (আইসিএস) এবং উকিল অম্বিকাচরণ মজুমদারের সাথে আলাপ করে সৌরেন্দ্র মোহনের হাতে স্টেটের ভার বুঝিয়া দেওয়ার প্রস্তাব করেন। এতে ডিএস সম্মত হন। সৌরেন্দ্র মোহনকে স্টেটের ভার বুঝিয়ে দিওয়া হয়। এদিকে অপ্রকৃতস্থ মতিলালকে একরকম জোর করে বরিশালে নেওয়া হয়। সে খুব কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করতে থাকে। অপ্রকৃতস্থ হলেও মতিলাল রাজবাড়ি এসে উকিলের সাহয্যে উইলের শর্ত ধরে কুমারের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তাকে ১০ হাজার টাকা দিয়ে ত্রৈলোক্যনাথ মামলা তুলে নেওয়ার ব্যাবস্থা করেন। সৌরিন্দ্র মোহন এস্টেটের মালিক হয়ে জমিদারী পরিচালনা করেন। উল্লেখ্য সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জেসমিন চৌধুরী পিএইচডি এর লক্ষে, ‘রাজা সুর্যকুমার ও সমকালীন মুসলমানদের আর্থ সামাজিক অবস্থা’ অভিসন্দর্ভ (থিসিস) রচনায় কর্মরত আছে।

প্রাচীন জনপদ

প্রাচীন জনপদ

প্রাচীন রাষ্ট্রযন্ত্রের বিন্যাসে ভূক্তি, বিষয়, মন্ডল, বীথি ও গ্রামের উল্লেখ আছে। এ ক্ষেত্রে রাষ্টীয় বিভাগের নাম ভুক্তি যা কয়েকটি বিষয় নিয়ে গঠিত হত। বিষয় গঠিত হত কয়েকটি মন্ডল নিয়ে এবং মন্ডল গঠিত হত কয়েকটি বীথি আর বীথি গঠিত হত কয়েকটি গ্রাম নিয়ে। এতে বোঝা যায় বিষয়ের আয়তন প্রদেশ প্রায় এভং মন্ডল জেলা প্রায়। নবম দশম শতকে এ অঞ্চলটি স্মাতট পদ্মাবতী বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল যার স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে কেশব সেনের ইদিলপুর লিপি বা পট্রলীতে। দশম শতকের শেষে চন্দ্র বংশীয় রাজারা বিক্রমপুর, চন্দ্রদ্বীপ, হরিকেল অর্থাৎ পূর্ব দক্ষিণ অংশ জুড়ে রাজত্ব করতেন। এই বংশের মহারাজাধিরাজ শ্রীচন্দ্র তার ইদিলপুর লিপি (বর্তমানে শরীয়তপুর) দ্বারা স্মতট পদ্মাবতী বিষেয়ের অন্তর্গত কুমার তালক মন্ডলে জনৈক ব্রাহ্মণকে একখন্ড ভূমি দান করেন। তৎকালীন সময়ে ব্রাহ্মণকে পুনর্বাসনের জন্য ভূমিদান করা হত। স্মতট পদ্মাবতী বিষয় পদ্মানদীর দুই তীরবর্তী প্রদেশকে বোঝায় তাতে সন্দেহ নেই। এ থেকে বোঝা যায় এ অঞ্চল তখন পদ্মাবতী বিষয়ের অন্তর্গত ছিল। কুমার তালক মন্ডলের উল্লেখ আরো লক্ষণীয়। ‘কুমার তালক এবং বর্তমান গড়াই নদীর অদূরে কুষ্টিয়ার অন্তর্গত কুমারখালি দুই-ই কুমার নদীর ইঙ্গিত বহন করে। বর্তমান কুমার বা কুমারখালি পদ্মা উৎসারিত মাথা ভাঙ্গা নদী থেকে বের হয়ে বর্তমানে গড়াইয়ের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।

মূলতঃ মাথাভাঙ্গা নদীয়া জেলার উত্তরে জলাঙ্গীর উৎপত্তির প্রায় ১০ মাইল পূর্ব দিকে পদ্মা হতে বের হয়ে আলমডাঙ্গা স্টেশনের প্রায় ৫ মাইল পশ্চিমে এসে দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে। কুমার নামে শাখাটি পূর্বমুখে গিয়ে আলমডাঙ্গা স্টেশনের কিছুটা উত্তরে রেল লাইনের নিচে দিয়ে নদীয়া, যশোর ও খুলনা জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। কুমারের পূর্বগামী আর একটি শাখা শৈলকুপা, শ্রীপুর, মাগুরা হয়ে গড়াইয়ে মিলেছে।

 

কুমার আবার মধুখালির পাঁচমোহনী হয়ে বর্তমান ফরিদপুরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত। অনেক সময় গড়াই ও কুমারকে অভিন্ন মনে করা হয়েছে। কুমার প্রাচীন নদী এবং এর প্রবাহ ব্যাপক। অনুমান করা যায় ফরিদপুরের পশ্চিমাঞ্চল, যশোরের উত্তরাঞ্চল এবং কুষ্টিয়া স্মতট পদ্মাবতী বিষয়। সেই হিসেবে রাজবাড়ি স্মাতট পদ্মাবতী বিষয়ের অন্তর্গত। অন্যদিকে কুমার তালক বা কুমারের তল বা নিম্নভূমি নিয়ে পদ্মাবতীর যে মন্ডল তা কুমার তালক মন্ডল। সেই হিসেবে গড়াই আর কুমার যদি অভিন্ন হয় তাহলে অবশ্যই বর্তমান রাজবাড়ি কুমার তালক মন্ডল ছিল। কুমার তালক মন্ডলের সীমানা নির্ধারণ দুরুহ। ইতিপূর্বে কুমারখালির কথা বলা হয়েছে। প্রতীয়মান হয় কুমার থেকেই কুমারখালি এসেছে এবং গড়াইকে একসময় কুমার বলা হতো। গড়াই এর আলোচনা থেকে বলা যায় গড়াইয়ের উৎস মুখ কখনো খনন করা হয়ে থাকবে বলে উৎস মুখে তা গৌড়ী এবং খননের পরে তা হয়েছে গড়াই। এ হিসেবে রাজবাড়ির বেশির ভাগ অঞ্চল বিশেষ করে পূর্বাংশে সামান্য বাদ দিয়ে এটা কুমার তালক মন্ডল আর বিষয় হিসেবে স্মতট পদ্মাবতী। *নিবন্ধটি নীহাররঞ্জন রায়ের বাঙালির আদি ইতিহাস প্রথম খন্ডের অনুসরণে লেখা। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দে দিগ্বিজয়ী বীর আলেকজান্ডার এর ইতিহাস পর্যালোচনায় অত্র অঞ্চলে গঙ্গারিডি জাতি বলে এক পরাক্রমশালী জাতির উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে গ্রীক লেখকগণের বর্ণনায় তা আরো স্পষ্ট হয়।

দিওদোরসের লেখনীতে গঙ্গারিডি জাতির বিপুল সেনাবাহিনী ও ৬ হাজার রণহস্তীর উল্লেখ আছে। খ্রিস্টীয় ১ম ও ২য় শতকে পেরিপ্লাস গ্রন্থে টলেমীর বিবরণ হতে জানা যায় এই সময়ে স্বাধীন গঙ্গারিডি রাষ্ট্র বেশ প্রবল ছিল। গঙ্গা রাষ্ট্রের বাইরে সমসাময়িক বাংলায় আর যে সব রাজা ও রাষ্ট্র বিদ্যমান ছিল তাদের সঙ্গে গঙ্গার রাষ্ট্রের কি সম্বন্ধ তা জানার উপায় নাই। তবে মহাভারত ও সিংহলী পুরানের কাহিনী থেকে কিছু সংবাদ পাওয়া যায়। রাষ্ট্র বিন্যাসের একটি আভাস পাওয়া যায় খ্রিস্টীয় ২য় শতকে মহাস্থানের শিলাখন্ড লিপিটি থেকে। মৌর্য আমলে উত্তরবঙ্গ মৌর্য শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। উত্তরবঙ্গে মৌর্যশাসনের কেন্দ্র ছিল নুডনগল বা পুন্ড্রনগর বর্তমান বগুড়া জেলার ৫ মাইল দুরে। মহাস্থান গড়ে। টলেমির বর্ণনায় দেখা যায় গঙ্গারিডি রাষ্ট্রের রাজধানী ছিল গঙ্গাবন্দর। এই গঙ্গা বন্দরের অবস্থিতি ছিল তাম্রলিপ্তি বন্দরের আরো দক্ষিণপূর্বে ক্যামবেরীখন নদী (Kamberikhon) বা কুমার নদীর মোহনায়। কুমার নদীর তল ধরেই কুমার তালক মন্ডল। গঙ্গা বন্দরে অতি সূক্ষ্ণ কার্পাস বস্ত্র উৎপন্ন হত এবং নিকটে কোথাও সোনার খনি ছিল বলে নীহাররঞ্জনের উদ্ধৃতিতে পাওয়া যায়। পেরিপ্লাস গ্রন্থে নিম্নগাঙ্গেয় ভূমিতে ক্যালটিস নামক এক প্রকার সুবর্ণ মুদ্রার ব্যবহারের উল্লেখ রয়েছে। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া অঞ্চলে প্রাপ্ত ৬ষ্ঠ শতকের একটি লিপিতে সুবর্ণ বীথির উল্লেখ আছে। ঢাকা জেলার নারায়ণগঞ্জের সুবর্ণগ্রাম, মুন্সিগঞ্জের সোনারঙ্গ, রাজবাড়ির সোনাপুর, সোনাকান্দা বাংলার পশ্চিম প্রান্তে সুবর্ণরেখা নদী একথা স্মরণ করে দেয়। রাজবাড়ি অঞ্চলে সোনার টাকা ভরা গুপ্ত ধনের গল্প কাহিনী প্রচলিত আছে। সোনাপুর রাজবাড়ির গ্রাম হিসেবে অতি পুরাতন। সোনাপুর এটা ইঙ্গিতবহ হতে পারে। নলিয়া, আড়কান্দি, বহরপুর, বালিয়াকান্দি, অত্র অঞ্চলের সর্বাপেক্ষা উঁচু ভুমি। এর উত্থান এবং প্রাচীন বসতি অনেক পূর্ব থেকে। অত্র অঞ্চল সন্ধান করলে গুপ্তধন না হোক খনিজ সম্পদ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গঙ্গা নদী প্রাচীনকালে কুমার তালক মন্ডলে। এর মোহনা থাকা স্বাভাবিক। সে মোহনায় গঙ্গা বন্দর প্রাচীন কুমার তালক মন্ডল হতে পারে। রাজবাড়ি কুমার তালক মন্ডলের বীথি হতে পারে। এ সবই প্রাচীন গঙ্গা রাষ্ট্রের অঙ্গ বা এলাকা হতে পারে।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড ঢাকা কর্তৃক ষষ্ঠ শ্রেণী সমাজ বিজ্ঞান পাঠ্যপুস্তকে প্রাচীন যুগে বাংলাদেশ পরিচ্ছেদ পৃষ্ঠা-৩৬ এ যে প্রাচীন বাংলার মানচিত্র সন্নিবেশিত হয়েছে তাতে গঙ্গারিডি রাষ্ট্রের অবস্থান বর্তমান রাজবাড়ি, ফরিদপুর, যশোর দেখা যায় মানচিত্রটি সন্নিবেশিত হল।

 

রাজবাড়ি জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য /প্রফেসর মতিয়র রহমান

প্রাচীন জনপ্রবাহ, জনপদ ও শাসন

প্রাচীন জনপ্রবাহ, জনপদ ও শাসন (প্রথম খণ্ড)

রাজবাড়ি অঞ্চলে কবে? কখন থেকে? কোথায় প্রথম জনবসতি গড়ে উঠেছে তা নির্ণয় করা অসম্ভব। তবে বঙ্গে জনপ্রবাহের আলোকে রাজবাড়িতে জন প্রবাহের ঐতিহাসিক পর্যালোচনা সম্ভব। বর্তমানে রাজবাড়িতে ১০ লক্ষাধিক লোকের বাস। এই জনপ্রবাহের পূর্বপুরুষরা কখনো এ অঞ্চলে বসবাস শুরু করে থাকেন। মানুষের ইতিহাস বহু বছর পর্যন্ত প্রাঙনরের (Hominids) ইতিহাস। চীন, জাভায়, টাঙ্গানিকায়, পূর্ব জার্মানীতে এদের কয়েকটি নানাবিধ চিহ্ন পাওয়া গেলেও বাংলায় এর কোনো সন্ধান পাওয়া যায় নাই।প্রাচীন প্রস্তাব থেকে নব্য প্রস্তর তা থেকে ক্রমে ব্রঞ্জ ও ইস্পাতের যুগ এসেছে। এর অতিক্রমণ কাল প্রায় ২ লাখ বছর। ভারতে প্রাচীন বা নব্য প্রস্তর যুগের তেমন নির্দশন পাওয়া যায় না। তবে বর্ধমান জেলার অজয় নদীর তীরে ১৯৬৩-৬৪ সালে পাণ্ড্রু রাজার ঢিবি আবিষ্কৃত হয়। যেখানে নব্য প্রস্তর যুগের সন্ধান মেলে। এ সভ্যতা খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দের তাম্র সভ্যতার যুগ। বাংলার বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের শারীরিক গঠন বিশ্লেষণ করে পণ্ডিতগণ বাংলায় যে সমস্ত জাতিকে বর্তমান বাঙালিদের পূর্বপুরুষ বলে মনে করেন তারা নিগ্রোবটু, আদি অষ্ট্রালয়েড, আদি নরডিক, আদি ভোটচীন, গোষ্ঠীর মানুষ। নিম্নবর্ণের বাঙালি এবং আদিম অধিবাসি যাদের মধ্যে জনের প্রভাব বেশি নৃতত্ত্ববিদগণ তাদের আদি অষ্ট্রালয়েড বলে নামকরণ করেছেন। পণ্ডিতগণ মনে করেন এই জন এক সময় মধ্যভারত হতে আরম্ভ করে দক্ষিণ ভারত ও সিংহল হয়ে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এ ছাড়া আলপেনীয় নিগ্রোবটু, ভোটচীন, দ্রাবিড় গোষ্ঠীর মানুষও প্রাচীন বাংলার আদিবাসী। আদিমতম স্তরে আদি অস্ট্রেলিয় তারপর দীর্ঘমুন্ডু ভূমধ্য নরগোষ্ঠী, গোলমুন্ড আলপেনীয়, দীনারীয় নরগোষ্ঠী এবং সর্বশেষ উত্তর ভারতের আদি নরডিক বা আর্যজাতীর ধারায় মিলনে গাঙ্গেয় প্রদেশের এই বাংলায় খ্রিস্টাপূর্ব ৭ম ও ৬ষ্ঠ থেকে ধর্ম, সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রবাহ প্রবাহিত হতে থাকে। খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ শতক থেকে ভারতে আর্য আগমন ঘটলেও আদি অস্ট্রেলিয়, নিগ্রোবটু, দ্রাবিড় গোষ্ঠীর কৌম সমাজের মানুষেরা বসবাস করত এরও পূর্বে।

 

প্রাচীন বাংলার জনপ্রবাহের তেমন কোনো নিদর্শন নাই। তবে জনপ্রবাহের কিন্তু সংবাদ পাওয়া যায় বেদপুরাণ, মহাভারত গ্রন্থ, আলেকজেন্ডার, টলোমির বর্ণনা এবং বিভিন্ন লিপি ও পট্টলী সংবাদ থেকে। ঐতরিয় আরণ্যক গ্রন্থে সর্বপ্রথম বঙ্গের উল্লেখ পাওয়া যায়। বোধায়ন ধর্মসূত্রে বঙ্গের স্পষ্ট উল্লেখ আছে। পুরানে দেশসমূহের তালিকায় অঙ্গ, বিদেহ, পুণ্ড্র ইত্যাদির সঙ্গে বঙ্গ যোগ করা হয়েছে। মহাভারতেও বঙ্গের উল্লেখ আছে। বঙ্গ কথাটি অনেকের মতে বঙ্গা থেকে এসেছে। বঙ্গাকৌম অর্থে বঙ্গাজনা। এভাবে  বঙ্গা, রাঢ়া,গৌড়া অর্থাৎ বঙ্গজনা, রাঢ়াজনা, গৌড়াজনা। উপরোক্ত সূত্রগুলিতে বঙ্গের উল্লেখ পাওয়া গেলেও এর ভৌগোলিক অবস্থান সম্বন্ধে কোনো সম্যক ধারণা পাওয়া যায় না। মহাভারতে বেশ কয়েকটি রাজ্যের বা ভূভাগের নাম দেওয়া আছে তা থেকে মনে হয় বঙ্গ একটি পুর্বাঞ্চলীয় দেশ যার অবস্থিতি ছিল অঙ্গ, সুম্ম, তাম্রলিপ্তি, মগধ এবং পুণ্ড্রের কাছাকাছি। কালিদাসের রঘুবংশে রঘুর ‍দিগ্বিজয়ের কথায় গঙ্গাস্রোত হন্তারেষু। তার ব্যাখ্যায় সকলে স্বীকার করেন যে, এর অর্থ গঙ্গাস্রোত অন্তর্বতী ভূভাগ অর্থাৎ ভাগীরথীর পূর্বে এবং পদ্মার দক্ষিণে ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, নদিয়া অঞ্চল নিয়েই প্রাচীন বঙ্গ। আলেকজেন্ডার ও ‍খ্রিস্টীয় প্রথম/দ্বিতিয় শতকে টলেমির বর্ণনায় যে গঙ্গারিডি জতি ও রাষ্ট্রের উল্লেখ পাওয়া যায় তা এই গঙ্গাতীরবর্তী অঞ্চলকেই বোঝায়। এ জাতির ছিল ৬ হাজার রণহস্তী এবং জাতিটি ছিল পরাক্রমশালী। বিভিন্ন লিপি, পট্টলী প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার ও ঐতিহাসিক যুক্তি প্রমাণে বারক মণ্ডল, কুমার তালক মণ্ডল ও নব্য কাশিকার সভ্যতার স্পষ্ট প্রমাণাদি পঞ্চম শতক থেকে আরম্ভ হয়েছে। ঢাকার আশ্রাফপুর, শরিয়তপুরের ইদিলপুর, নব্যকাশিকা বা কোটালীপাড়া, বারক মণ্ডল, পদ্মা স্মতট কুমার তালক মণুলে জনপ্রবাহের সৃষ্টি হয়েছিল। ঐতিহাসিকদের মতে ভারতে আর্যীকরণ আরম্ভ হয় খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ থেকে। আর্যীকরণের প্রক্রিয়ায় অষ্ট্রোলয়েড, দ্রাবিড়, নিগ্রোবটু আদিম গোষ্ঠীর মানুষ ধীরে ধীরে নব উত্থিত বঙ্গের দিকে সরে আসে এবং ইতর জীবন যাপন করে। এরা বিভিন্ন কৌমভুক্ত জাতি। মহাভারতে বাংলার বিভিন্ন কৌমভুক্ত জাতিকে মেলেচ্ছ বলা হয়েছে। আর্যবহিনর্ভূত প্রান্তসীমায় বৌদ্ধ আর্যমুঞ্জুলিকা গ্রন্থে গৌড়,সমতট ও হরিকেলের ভাষাকে অসুর ভাষা বলা হয়েছে। আর্যরা এদের দস্যু, পাপ, মেলেচ্ছ প্রভৃতি উন্নাষিকতায় চিহ্নিত করেছে। প্রাচীন বাংলায় এ অঞ্চলে আদি অষ্ট্রোলয়েড, দ্রাবিড় গোষ্ঠীর বসবাস ‍খ্রিস্টপূর্ব থেকে শুরু হতে পারে। পুণ্ড্রের উত্থান অপেক্ষাকৃত বঙ্গের সমতটীয় অঞ্চলের অনেক পূর্বে হওয়ায় তাদের আগমন ঐ অঞ্চলে পূর্বে শুরু হয়। রাজবাড়ী অঞ্চল সমতটীয় অঞ্চল হলেও ভৌগোলিক কারণেই এর উত্থান দক্ষিণাঞ্চলের পূর্বে। যে কারণে এ অঞ্চলে প্রাচীন গোষ্ঠীর কৌম সমাজের বিস্তর ঘটতে পারে। আর্যীকরণের পর বর্ণভেদের উদ্ভব হয় আর বর্ণাশ্রমের বাইরে তৎকালীন কৌম সমাজের মানুষের পরিচয় হয় চণ্ডাল, চাঁড়াল, বাউরি, ঘট্রজীবী, ঢোলবাহি, মালো, হাড্ডি, বাগদি। প্রাচীন নিগ্রোবটু ও অষ্ট্রিকজাতির সমকালে কিছু দ্রাবিড় জাতির আগমন ঘটে এবং সভ্যতার উন্নত বলে অষ্ট্রিকজাতিকে গ্রাস করে। রাজবাড়ি জেলার দক্ষিণ বালিয়াকান্দি থানার জঙ্গল ইউনিয়নে অধিবাসীদের প্রায় ৯৮% শূদ্র পর্যায়ের। এদের শরীরের রং তামাটে পীতবর্ণ। আচার আচরণে হিন্দুদের অন্যান্য বর্ণ থেকে আলাদা। এদের মুখমণ্ডল প্রশস্ত হলেও ভালোভাবে লক্ষ্য করলে দেখ যাবে নাক কিছুটা দাবা। রাজবাড়ির সার্বিক জনপ্রবাহে প্রশ্ন আসে তাদের সংখ্যা এখানে এত বেশি কেন? অনেকের ধারনা পালশাসনের সময়ে কৈবর্ত বিদ্রোহে যে বিপুল সংখ্যক কৈবর্ত এ অঞ্চলে আগমন ঘটে এরা তাদেরই একটি অংশ। এরা প্রকৃতপক্ষে প্রাচীন নিগ্রোবটু ও দ্রাবিড় গোষ্ঠীর লোক। সোনাপুর, বহরপুর, বালিয়াকান্দি, সোনাইকুড়ী, আড়াকান্দি, বাগদুল অঞ্চলের শুদ্রদের থেকে এরা আলাদা। রাজবাড়ি জেলার কালুখালির উত্তরে বর্তমানে পদ্মার পাড় এলাকায় প্রকীর্থ বলে একটি গ্রাম আছে। উক্ত গ্রামে ২০/২৫টি প্রাচীন জাতিগোষ্ঠীর লোক বাস করে। এদের চেহারা সম্পূর্ণ পীতবর্ণ এবং আচরণ সাঁওতাল জাতীয়। ধারণা করা যায় এরা আদি অষ্ট্রিক গোষ্ঠির লোক।

 

দ্রাবিড় গোষ্ঠীর ভাষা বিশ্লেষণে দেখা যায় এদের মধ্যে পুর, উর, দিয়া, দির ব্যবহার ছিল। পুর, পুরপাল বা নগরপাল। যে সমস্ত গ্রামের শেষে পুর রয়েছে তা অপেক্ষাকৃত পুরাতন জনের বাসস্থান। রাজবাড়ির পুর দিয়ে গ্রাম বিনেদপুর, ভবানীপুর, গঙ্গাপ্রসাদপুর, সজ্জনকান্দা, বেড়াডাঙ্গা থেকে বেশি পুরাতন। রাজবাড়ি জেলার সোনাপুর, বহপুর, চন্ডিপুর, মধুপুর, ‍নিশ্চিন্তপুর, তারাপুর, মদাপুর কালিকাপুর এরুপ অসংখ্যা পুরের গ্রাম। এ পুরের বেশির ভাগ গ্রামই অনেক পুরাতন। ধারণা করা যায় এক সময় এ অঞ্চলে প্রাচীন দ্রাবিড় গোষ্ঠীর ব্যবহৃত পুর থেকে এত পুরের ব্যবহার এসেছে। তা ছাড়া পদমদি, রতনদিয়া দি, দিয়া দ্রাবিড় ব্যবহৃত শব্দ। রাজবাড়ি জেলার পশ্চিমে বাগদিপাড়া ছিল। এ ছাড়া জেলার অন্যান্য স্থানে বাগদি, ডোলবহী, মুচি, চণ্ডাল, চাড়ালের আধিক্য রয়েছে। প্রকৃত অর্থই এরা আদি কোমজনের উত্তরসূরী এবং আদি গোষ্ঠীর জন। রাজবাড়ি অঞ্চলে কৌম কথাটি বহুল প্রচলিত। প্রাচীন কৌম জানা বা বিভিন্ন কৌমভুক্ত মানুষের প্রাচীন ব্যবহৃত এ কথাটি এ অঞ্চলের মানুষের পরিচয় বহন করে। বিভিন্ন লিপি ও পট্টলী থেকে পাওয়া সংবাদ এ অঞ্চলে সপ্তম, অষ্টম শতকের জনপ্রবাহের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

 

প্রাচীনকালে ভূমি ব্যবস্থা সম্পর্কিত যেসব পট্টলী বংলায় পাওয়া গেছে ঐগুলির দু’একটি কোথাও রাজবাড়ি জেলার জনসংবাদ পাওয়া যেতে পারে। খ্রিস্টোত্তর পঞ্চম হতে অষ্টম শতক পর্যন্ত পট্টলীগুলি ভূমিদান বিক্রয়রীতির বিষয়। এরমধ্যে পাহাড়পুর পট্টলী, আশ্রাফপুর পট্টলী, ইদিলপুর পট্টলী, ধনাইদহ পট্টলী, দামোদর পট্টলী, বিক্রমপুর পট্টলী, নব্যকাশিকা পট্টলী, ব্রাক্ষণকে বা দেবতার উদ্দেশ্যে ভূমিদানরীতি তাম্র পাট্টাস বা ফলকে লেখা। ভূমিদানের বিষয়ে অত্র অঞ্চলে পট্টলী চালু ছিল তা বোঝা যায় এসব পট্টলীতে ব্যবহৃত ভূমির মাপ, প্রকারভেদ, ভূমির মূল্য নিরুপন থেকে। ভূমির পরিমাপ ব্যবহারের ক্ষেত্রে নল ব্যবহার হত। নল আজও রাজবাড়ি ফরিদপুর অঞ্চলে ব্যবহার হয়। বাস্ত্তভিটায় এবং কর্ষণযোগ্য ভূমি নাল, খিল এখনো ব্যবহার হয়। এ ছাড়া জোলা, জোলক, তালক, পাঠক, খাল, বিল এখনো এ অঞ্চলে প্রচুর ব্যবহৃত দ্রাবিড় শব্দ। নীহাররঞ্জন এর কথায় – ‘পদ্মার খাঁড়িতে ফরিদপুর অঞ্চল হইতে অরম্ভ করিয়া ভাগীরথীর তীরে ডায়মন্ড হারবারের সগর সঙ্গম পর্যন্ত বাকেরগঞ্জ, ফরিদপুর, খুলনা, বরিশাল, চব্বিশ পরগনার নিম্নভূমি ঐতিহাসিক কালে কখনো সমৃদ্ধ জনপদ, কখন গভীর অরণ্য, কখনো নদীরগর্ভ বিলীন আবার কখনো খাঁড়ি খাঁড়িকা অন্তর্নিহিত হইয়া নতুন স্থল ভূমির সৃষ্টি। ফরিদপুর জেলার কোটালীপাড়া অঞ্চল ষষ্ঠ শতকের তাম্র পট্টলীতে নব্যকাশিকা বলিয়া অভিহিত হইয়াছে। ষষ্ঠ শতকে নব্যকাশিকা (কোটালীপাড়া) সমৃদ্ধ জনপদ এবং এ অঞ্চলে নৌবাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র। কোটালীপাড়া সমুদ্রতটায় আর এ অঞ্চলকে সমতটীয় অঞ্চল বলা হইয়াছে। ইউয়াং চোয়াং সপ্তম শতকে সমতটে এসেছিলেন। তার বর্ণনায় সমতট সমুদ্র তীরবর্তী দেশ। ইউয়াং চোয়াং এর সমতট বর্তমানে রাজবাড়ি, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মাগুরা, যশোর ও খুলনার পূর্ব অঞ্চল। সমতটের দক্ষিণ অঞ্চল থেকে রাজবাড়ি সাগর থেকে অনেক উত্তরে গঙ্গার মুখে থাকায় এ অঞ্চল দ্বীপ বা ভূ-উত্থান অপেক্ষাকৃত প্রাচীন যাকে পুরাতন সমতটীয় অঞ্চল বলা যেতে পারে। এ পুরাতন সমতটীয় অঞ্চলে প্রাচীন গোষ্ঠীর মানুষের বসবাস শুরু হয়ে থাকবে যা নবম দশম শতক পূর্ণরুপ গ্রহণ করেছে।

‘শখের পালঙ্ক’

মূলঘর ও পালঙ্ক কাহিনী

‘শখের পালঙ্ক’ শিরোনামে দৈনিক পত্রিকার পাতায় একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। পালঙ্কটি অনেক বছর পূর্বে জাতিয় জাদুঘরকর্তৃক রাজবাড়ী জেল থেকে সংগৃহীত হয়। বর্ণনানুসারে কাঠ, লোহা, কাচ ও কাপড় দিয়ে তৈরি গোটা খাটটি চারটি বাঘের থাবার উপর দাঁড়িয়ে আছে। থাবার উপরিভাগে টুলের অনুরুপ প্রায় বৃত্তাকার পাটাতনের উপর একটি হস্তি শাবক। তার পিঠের উপর একটি সিংহ শাবক আক্রমণোদ্যত ভঙ্গিতে দুই পা দিয়ে হস্তির শুঁর আঁকাড়ে ধরে আছে। সিংহ শাবকটিকে আবার ঠোকরাচ্ছে একটি উড়ন্ত গরুড় পাখি। জোড়াবিহীন কাঠের বাঘের থাবার উপর পর পর তিনটি জীব জানোয়ারের ফিগার অনুপম সৌন্দর্য দান করেছে। গোটা পালঙ্কটি চারপায়াসদৃশ্য চার খুঁটির উপর ন্যাস্ত। বিশাল পাটাতন, পাটাতনটির বেদ আনুমানিক দেড়ফুট। ভেলভেট কাপড় আচ্ছাদিত নরম বিছানা। চার পায়ার উপর নৃত্যরত ভঙিমায় দাঁড়ানো কম বয়সী চার নগ্ন রমণী। নগ্নিকা রমণীর ডানহাত স্পর্শ করে আছে মশারীর স্ট্যান্ড। শয্যায় উঠার জন্য তিন ধাপ বিশিষ্ট আলাদা ছোট সিঁড়ি। বিছানার প্রবেশপথে অতন্দ্র প্রহরীর মতো বসে আছে দুটি সিংহ। পাটাতনের কাঠামোতে লোকজ চিত্রকর্ম, ফুল লতাপাতার অলঙ্করণ। শিয়য়ের ডানে ও বাঁয়ে হস্তিশাবকের কাছেই দু’জন তরুণী। পালঙ্কটির শিরোভাগে প্রসাধনী সামগ্রী রাখার জন্য আছে একটি কাঠের বাক্স। এ খাটের মালিক কোনো সুরুচিবোধের জমিদার সে খোঁজ করতে করতে পাওয়া গেল মূলঘর জমিদার বংশের ইতিহাস। খাটটির মালিক ছিলেন মূলঘরের কোনো এক ভূমিপতি। নবাব, মোগল ও ইংরেজ শাসনকালে বঙ্গে আচার্য, বৈদ্য, কাশ্যপ, মজুমদার, রায়, রায়বাহাদুর, মুন্সি, রায়চৌধুরী, সেন ইত্যাদি জমিদার বংশের বিকাশ ঘটে। এরা,রায়বাহাদুর, মুন্সি, রায়চৌধুরী, সেন ইত্যাদি জমিদার বংশের বিকাশ ঘটে। এরা বিত্তে, শিক্ষায়, শাস্ত্রে উচ্চবংশীয় হিন্দু। তাদের মধ্যে সুরুযপারী গ্রহবিপ্রগণ বেদ-বেদান্ত, জ্যোতিষশাস্ত্র চর্চাকারী শাস্ত্রীয় সুপণ্ডিত। ভক্তি, শোধন, সাধনে সদা সর্বদা নিয়োজিত। তৎকালীন ফরিপুর জেলার গোয়ালন্দ মহকুমার (রাজবাড়ী জেলা) মূলঘর, দ্বাদশী, পাঁচথুপী, খালকুলায় তাদের বসতি গড়ে ওঠে।

প্রায় চারশত বছর পূর্বে কাশ্যপ গোত্রীয় মধুসূদন উপাধ্যায় নামক এক জ্যোর্তিবিদ পন্ডিত এ বংশের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি পঞ্চকোটের রাজার সভাপন্ডিত ছিলেন। সপ্তদশ শতকের প্রারম্ভে চন্দ্রনাথ তীর্থ দর্শন শেষে পঞ্চকোটে প্রত্যাগমণকালে ভূষণার মুকুন্দরাম রায়ের সভায় উপস্থিত হন। সঙ্গে ছিলেন পুত্র বিশ্বরুপ। মধুসূদনের মতই যুবক পুত্র সুপন্ডিত ছিলেন। জ্যোতিষশাস্ত্রে তিদের অগাধ পান্ডিত্য ছিল। মুকন্দরামের সভায় এরুপ মহাপন্ডিতের অভাব ছিল। মুকুন্দরাম তাঁকে সভায় থেকে যওয়ার অনুরোধ করেন। মধুসূদন তাতে রাজী হন না তবে পুত্র বিশ্বরুপকে প্রেরণ করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। মধুসূদন পঞ্চকোর্ট ফিরে পুত্রকে স্বীয় আরাধ্য বাসুদেবসহ ভূষাণায় প্রেরণ করেন। মুকুন্দরাম চন্দনা নদীর তীরে পাঁচশত বিঘা ব্রক্ষত্রা ভূমিসহ বিশ্বরুপকে বাসস্থান প্রদান করেন। বাসুদেব বিগ্রহের নামানুসারে স্থানটির নাম হয় বাসুদেবপুর। এ স্থানটি এখন ব্যাসপুর নামে খ্যাত। বিশ্বরুপের অধস্তন একাদশ পরুষ মহাদেব আচার্য। তিনি মহাদেব ঠাকুর নামে বিখ্যাত ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন সাধক। অতঃপর ব্যাসপুরের কিছু অংশ চন্দনাগর্ভে বিলীন হলে তিনি বর্তমান মূলঘর গ্রামে কিছুদিনের জন্য বসতি স্থাপন করেন। পরে মহাদেব আচার্য সীতারাম কর্তৃক শিবত্রা ও ব্রক্ষত্রা পাঁচষশত বুঘাপ্রাপ্ত জমি দান সূত্রে পাওয়া এবং সীতারামের অনুরোধে চন্দনা নদীর তীরে বাগাট গ্রামে বসবাস করেন। তবে মূলঘেরর সরুজপারী গ্রহবিপ্রকূলের রামকন্ত আর্চাযের পূর্বে পুরুষেরা মূলঘরে থেকে যায়। এই রামকান্ত আচার্যের পূর্ববংশীয় সুরুজপারীসকল, ষ্ফটিক পাথরের একটি সূর্যমূর্তি ও দামোদর নামক এক নারায়ণমূর্তির সেবা করতেন। সূর্যমূর্তিটি ছিল গোলাকার। প্রতিদিন পূজার পূর্বে চন্দন দিয়ে ধৌত করার পর অপূর্ব রশ্মি নির্গত হত। কোন যুগে বা কোথা থেকে এমন উজ্জ্বল ষ্ফটিক পাথরের মূর্তি আনা হয়েছিল তা জানা যায় না। অন্য আর একটি মূর্তি দামোদরমূর্তি। দামোদর প্রকান্ড নারায়ণমূর্তি। এই মূর্তিটি ছিল বেশ ভারি। বিগ্রহ দুটির জন্য তৎকালীন রাজারা প্রচুর সম্পত্তি দেবত্রা ও ব্রক্ষত্রা হিসেবে দান করেন। রাজা সীতারামের রাজ্যের অধীন এ অঞ্চলটি সীতারামের মৃত্যুর পর নাটোর রাজা রামজীবন এর জমিদারীপ্রাপ্ত হন। তিনিও ২৫ বিঘা দেবত্র সম্পত্তি তাম্রপাত্রে লিখে রামকান্ত আচার্যকে দান করেন। রামকান্তের বংশের অধস্তন পুরুষ পুত্রহীন হওয়ায় দ্বাদশীর ভরদ্বাজ গোষ্ঠীর হরিপ্রসাদ ঐ বংশের একমাত্র কন্যাকে বিবাহ করে মূলঘরবাসী হন। তাঁর বংশধরেরা উক্ত বিপুল পরিমান ব্রক্ষত্রা, দেবত্র সম্পত্তি ভোগ দখল করে আসছিলেন। তখন ফরিদপুর জেলা প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি। ঐ সকল জমি যশোর জেলার অধীন ছিল। কিছু জমি বেদখল হয়। ঐ বংশের গোলকচন্দ্র সে সব জমি উদ্ধার করেন।

প্রাচীন এই গ্রামের প্রাচীন নির্দশন হিসেবে বড় বড় দিঘিকা (দিঘি) দেখা যায়। আচার্য মহাশয়দের বিস্তৃত ভূমি ছিল অরণ্যাকার। নিবিড় অরণ্যসম স্থানে বৃক্ষরাজি, গভীর জলাশয়, দামদল ফসলের মাঠ এক অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যভূমি। এ সব জলাশয়ে কুম্ভীর ও বনে ব্যাঘ্র বাস করত। আম, কাঁঠাল, শুপারি ফলবন বৃক্ষের আস্বাদনের ছায়ায় শিল্প চর্চায় নুবৃত্ত কোনো সুরুচিবান আচার্য প্রাকৃতিক পরিবেশের ব্যাঘ্র, হাতি, এবং নানা জীব জানোয়ারের প্রতীক নিয়ে ঐ অনুপম সৌন্দর্যের খাট নির্মাণ করেন। ইতিহাসের ঘটনা প্রবাহে খানখানাপুরের জামিদার মাখন বাবু খাটটির মালিক হন। এরপর মাখন বাবুর নিকট থেকে খাটটি আসে গোয়ালন্দ নিবাসী মোস্তফা সাহেবের ঘরে । মোস্তফা সাহেবের নিকট থেকে ঢাকা জাদুঘর খাটটি অধিগ্রহণ করে।

রাজবিড়ি জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য (পৃষ্ঠা-১২৮)

মথুরাপুরে সংগ্রাম সাহের দেউল

মথুরাপুরে সংগ্রাম সাহের দেউল-প্রফেসর মতিয়ার রহমান

বর্তমান মধুখালি পূর্বে গোয়ালন্দ মহকুমা এবং বালিয়াকান্দি উপজেলাধীন ছিল। সাম্প্রতিকালে মধুখালি ফরিদপুর জেলাভুক্ত করা হয়। মধুখালির সন্নিকটে মথুরাপুরে মন্দির সদৃশ্য প্রায় ৭০‌‍‍‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌ ফুট উঁচু, ১২টি কোণ অলম্কৃত দেওয়াল এবং ফাঁকে ফাঁকে ইটের কার্ণিশ বিশিষ্ট দেওয়াল। বির্ভিন্ন থাকের ফাঁকে ফাঁকে বিশেষ করে নিচের দিকে পোড়া মাটির চিত্রফলক বসানো। এগুলিতে রামায়ণ, মহাভারত ও অন্যান্য পৌরাণিত কাহিনীর চিত্র আছে। সর্ব সাধারণ্যে এটি ‘মথুরাপুরের দেউল’ বলে পরিচিত। দেউলটির ইতিহাস এবং নির্মাণকাল নিয়ে যেমন উৎসুক্য আছে তেমনি আছে নানা মতভেদ। ঐতিহাসিক আনন্দনাথ রায় এবং সতীশ চন্দ্র মিত্রের লেখা ফরিদপুরের ইতিহাস এবং যশোর-খুলনার ইতিহাসে উক্তি দেউলকে সংগ্রাম সাহর দেউল বলা হয়েছে। অনেকই মনে করেন মানসিংহের সাথে যশোহরের ভূমিরাজ প্রতাপাদিত্যের যে যুদ্ধ হয় তাতে প্রতাপ হেরে যান। বিজয় স্তম্ভ হিসেবে মানসিংহ তা নির্মাণ করেন। উল্লেখ্য মানসিংহ আগমন করেন ১৫৯৫ সালে এবং প্রস্থান করেন ১৬০৪ সালে। তিনি বাংলায় বার-ভূঁইয়া দমনের উদ্দেশন করেছিলেন। তখন প্রতাপাদিত্য ছিলেন যশোহরের রাজা আর মুকুন্দরাম ছিলেন ভূঁইয়া দমনের উদ্দেশ্যেই আগমন করেছিলেন।

১৬০৩ সলে ধুমঘাটে প্রতাপাদিত্যের সাথে মানসিংহের যুদ্ধে প্রতাপ পরাজিত হলে মানসিংহের সাথে তার সন্ধি হয়। এরপর প্রতাপাদিত্য ১৬০৯ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেন। প্রতাপাদিত্য ১৬০৯ খ্রিস্টব্দে ইসলাম খাঁর হাতে বন্দি হন। তার পর্বেই ১৯০৪ এর মানসিংহ আগ্রায় ফিরে যান। এদিকে ভূষণার রাজা মুকুন্দরামের সাথে মানসিংহের কোনো যুদ্ধই হয় নাই। তাই ভূষণার অন্তর্গত মথুরাপুরে মানসিংহ বিজয় স্তম্ভ নির্মাণ করবেন কেন? আনম আবদুস সোবাহান লিখিত ‘ফরিদপুরের ইতিহাস-বৃহত্তর ফরিদপুর’ গ্রন্থে ৪৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন ‘সীতারাম পতনের পর ভূষণার নিকটবর্তী মথুরাপুর গ্রামে একটি বিজয়স্তম্ভ নির্মিত হয়। সীতারাম নবাব মুর্শীদকুলি খাঁর নিকট পরাজিঁত হন।

মুর্শীদকুলি খাঁর দ্বারা তা নির্মিত হলে মুসলিম স্থাপত্য বহন করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু স্তম্ভটিতে রয়েছে হিন্দু স্থাপত্যসহ রাময়ণ, মহাভারতসহ পৌরাণিক বিষয়, যে কারণে বলা যায় তা হিন্দু স্থাপত্যসহ রামায়ণ, মহাভারতসহ পৌরাণিক বিষয়, যে কারণে বলা যায় তা হিন্দু কোনো সৈনিক বা রাজা তা নির্মাণ করেন। ইতিপূর্বে আমি রাজবাড়ি জেলার ইতিহাসে স্তম্ভটিকে সীতারামের দেউল বলে উল্লেখ করেছি। বস্ত্তত প্রাচীন ইতিহাস লিখন ব্যাপক গবেষণা নির্ভর। সে সময় রাজবাড়ি জেলার ইতিহাস রচনায় অতি নির্ভর আনন্দনাথ রায়ের ফরিদপুরের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসটি কোথাও খুঁজে পাই নাই। খন্ডিত যে অংশটি পেয়েছিলাম তাতে সংগ্রাম সাহর অংশটুকু ছিল না। এ ছাড়া যশোর-খুলনার ইতিহাস (সতীশ চন্দ্র মিত্র) গ্রন্থটির পরিপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে পরি নাই। এক্ষণে আনন্দনাথ রায়ের ১০০ বছর পূর্বে লেখা ফরিদপুরের ইতিহাস গ্রন্থটি ঢাকা থেকে পুনমুদ্রন (‘ম্যাগনাম ওপাস এবং ড. তপন বাগচী সম্পাদিত-শত বছরের শ্রদ্ধাঞ্জলি- আনন্দনাথ রায়ের ফরিদপুরের ইতিহাস, আহমদ কাউছার, বইপত্র, ৩৮/৪ বাংলাবাজার ঢাকা থেকে প্রকাশিত) হয়েছে। এ ছাড়া শত বছরের পুরোন-যোগেন্দ্র নাথ রচিত ‘বিক্রমপুরের ইতিহাস’ এবং ১৯২৮ সালে প্রকাশিত এলএন মিশ্রের ‘বাংলায় রেল ভ্রমণ’ গ্রন্থগুলি আমার হাতে থাকায়, এক্ষণে দেউলটির প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরতে পারব বলে বিশ্বাস রাখি।

প্রথমেই দেউল সম্পর্কে বলা যাক – দেউল বলতে বোঝায় দেবালয়। দেবকুল শব্দ থেকে দেউল শব্দের উৎপত্তি। দেবকুলিকা শব্দের অর্থ ক্ষুদ্র দেউল বা মন্দির। গবেষক অধ্যাপক কিলহর্ন দেবকুলিকাকে ক্ষুদ্র দেবমন্দির বলে আখ্যা দিয়েছেন। আবার এ বাক্যটি হয়ত অনেকেরই জানা ‘আছিল দেউল এক পর্ব্বত সমান। কাজেই দেউল বলতে বৃহদাকার দেব মন্দিরও বোঝায়। দেউল বা দেবমন্দির নির্মাণের প্রাচীন ইতিহাস রয়েছে। সেন রাজত্বকালে তান্ত্রীক মন্ত্রে দিক্ষিত সেনেরা স্থানে স্থানে দেবদেবী পূজায় দেউল নির্মাণ করত। তৎকালীন সেন রাজাদের রাজধানী বিক্রমপুরে দেউল নির্মাণ করত। তৎকালীন সেন রাজাদের রাজধানী বিক্রমপুরে দেউল বিষয়ে যা বলছিলাম তাতে দেউলের আকার আয়তনে দৃষ্ট হয় এটি ছিল বড় আকারের দেব মন্দির-দেবালয় বা দেউল। মথুরা পুরের দেউল বিষয়ে আনন্দ নাথের ফরিদপুরের ইতিহাসের ৮২ পৃষ্ঠায় ‘১৬৫৩ হইতে ১৬৮৪ পর্যন্ত প্রায় একত্রিংশ বৎসর পর্যন্ত এইরুপে আমরা বঙ্গদেশ ও রাজপুতনায় সংগ্রামকে দেখতে পাই। আবার এই সুদীর্ঘ সময় পর্যন্ত ঔরঙ্গজের বাদশাই দিল্লীর সিংহাসনে রাজত্বকারী ছিলেন। মোগল রাজবংশ মধ্যে আওরঙ্গজেব যত দীর্ঘকাল শাসনদন্ড পরিচালনা করেন সেরুপ আর কেহ পারেন নাই। এই সম্রাটের অধীন থাকিয়া যে একই সংগ্রাম বিভিন্ন স্থানে নানা কার্যসম্পাদন করিয়াছিলেন এদ্বিষয়ে কারো সন্দেহ থাকিতে পারে না। সম্রাট মধ্যবাঙলার ভূষণা, মাহমুদপুর প্রভৃতি স্থান তাকে জায়গীর অর্পণ করেন এবং কালিয়াতেও একটা জায়গির ছিল যাকে আজও নাওয়াড়া বলিয়া প্রসিদ্ধ আছে। ভূষণা পরগনার অন্তর্গত মথুরাপুর নামক স্থান তাহার প্রকাণ্ড বাড়ি বর্তমান ছিল। এই স্থানটি ফরিদপুর জেলার কোড়কদি ও মধুখালির স্থানদ্বয়ের সন্নিকটে অবস্থিত। কোড়কদির মাননীয় ভট্টাচার্য বংশের পূর্বপুরুষ তাহার গুরু ছিলেন। অদ্যাপি তৎপ্রদত্ত কতিপয় ভূ-বৃত্তির লিখন উক্ত মহাশয়দিগের নিকট বর্তমান আছে। মথুরাপুর গ্রামে আজিও প্রকান্ড মঠ দৃষ্ট হয় যাকে সাধারণে সংগ্রামের দেউল বলে।

এদিকে শ্রদ্ধেয় সতীশ চন্দ্র মিত্রের যশোর-খুলনার ইতিহাসের ৩৩৬ পৃষ্ঠায় ‘ভূষণার নিকটবর্তী কোড়কদি গ্রামের প্রখ্যাত ভট্টাচার্যগণ সংগ্রামের বারিত হইতে বধ্য হন। এখনো তাহাদের গৃহে সংগ্রাম প্রদত্ত ভূমি বৃত্তির সনদ আছে। যশোর কালেক্টরিতে তৎপ্রদত্ত আরো কয়েকখানি ব্রক্ষোত্তর তায়দাদ পাওয়া গিয়াছে। সংগ্রামের অন্য কীর্তির মধ্যে মথুরাপুরে তাহার সময়ে নির্মিত একটি দেউল বা মন্দির বর্তমান আছে। গল্প আছে। গল্প আছে তিনি একটি বিগ্রহ পরিচালনার জন্য মন্দিরটি নির্মাণ করিতেছিলেন, কিন্তু একজন রাজমিস্ত্রী দেউলের চূড়া হইতে পড়িয়া মৃত্যুমুখে পতিত হয় বলিয়া সে সস্কল্প পরিত্যক্ত হইয়াছিল।

সংগ্রাম সাহর বিশদ আলোচনার পর এ বিষয়ে আর সন্দেহ থাকার কথা নয় যে মথুরাপুরের দেউল অন্যকারো কীর্তি নায়। নিঃসন্দেহে দেউলটি সংগ্রাম সাহর-ই কীর্তি। বর্তমানে দেউলটি ভগ্ন প্রায়। রাজবাড়ি তথা এতদ্বঅঞ্চলে প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিজড়িত এ দেউলটি সংস্কার করতঃ ঐতিহ্যটি রক্ষা করা প্রয়োজন।

রাজবাড়ী জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য
প্রফেসর মতিয়ার রহমান

বার ভূঁইয়াদের স্মৃতি

বার ভূঁইয়াদের স্মৃতি ও শাসনাধীন

বঙ্গে শাসনতান্ত্রিক ধারায় ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় পাল ও সেন রাজাদের শাসনের পর বঙ্গ ধীরে ধীরে মুসলিম শাসনাধীন হয়। ১২০৪ মতান্তরে ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজির বঙ বিজয় থেকে শুরু হয়ে ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে নবাবই সিরাজ-উদ্-দৌলার পতন পর্যন্ত বঙে মুসলিম শাসনকাল স্থায়ী হলেও সমগ্র বঙে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা ছিল এক দীর্ঘকালীন প্রচেষ্টা। গৌড় অধিকার করেই পাঠানেরা বঙ্গের রাজা হয় নাই, বঙ্গ অধিকার করতে তাদের অনেকদিন লেগেছিল।খিলজীর পরবর্তী পাঠান রাজারা দেশীয় জমিদার ও প্রজার উপর অধিকার প্রতিষ্ঠা নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন। এ ছাড়াও তারা দিল্লীর সম্রাটদের সন্ত্তষ্ট রাখাতে ব্যাস্ত থাকত। দিল্লীতে সুলতান মইজুদ্দিন তুঘলকের মৃত্যুর পর সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের বংশধরগণ বাংলাদেশ শাসন করেন। তাদের মধ্যে প্রথম সুলতান বুঘরা খান ১২৮১ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু করে ১২৮৭ পর্যন্ত ছয় বছর ধরে লক্ষ্ণৌতে দিল্লীর শাসনকর্তা হিসেবে শাসন করেন। কিন্তু সুলতান বলবনের মৃত্যুর পর বুঘরা খান নেজেকে বাংলার স্বাধীন সুলতান বলে ঘোষণা করেন। এরপর থেকেই বাংলার স্বাধীন সুলতানি যুগের সুচনা। এ যুগেই মুসলমান রাজাদের ইতিহাসে বাংলার ইতিহাসের অধ্যায়ের সূচনা করে। এ সময় সমগ্র বংলাদেশ চারটি সুনির্দিষ্ট বিভাগে বিভক্ত হয় যথা লক্ষ্ণৌতি, সাতগাঁও, সোনারগাঁও, চাটিগাঁও (চট্টগ্রাম)। এ সময় শক্তি, সম্পদ ও ঐশ্বর্যে সোনারগাঁ লেক্ষ্ণৌতিকে অতিক্রম করে। তবে ২০/২২ জন পাঠান নৃপতি ১৪০ বছর যাবৎ বঙ্গদেশ শাসন করলেও সমগ্র বাংলা তাদের করায়ত্ব হয় নাই। খণ্ডিতভাবে সুলতানদের দ্বারা বাংলা শাসিত হত।

শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহ (১৩০১-১৩২২) কেবল পূর্ববঙ্গ অধিকার করতে সমর্থ হন। এরপর ১৩৩৯ খ্রিস্টাব্দে ফখরউদ্দিন মোবারক শাহ পূর্ববঙ্গ এবং শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ পশ্চিমবঙ্গে দিল্লীর অধীনতা অস্বীকার করে বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। পরে ইলিয়াস শাহ সমগ্র বঙ্গের স্বাধীন নৃপতি হন। এই সময় থেকেই সমগ্র বাংলাদেশ ‘বাঙলা সুবে’ বা ‘সুবে বাঙলা’ নামে আখ্যায়িত হয়। ১৩৫৮ সালে তাঁর মৃত্যুর পর নানা অরাজগতা শুরু হয়। বস্ত্তত বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমলে বিশেষ করে মোগল সম্রাট আকবরের বঙ্গ বিজয়ের (১৫৭৬) পূর্ব পর্যন্ত পাঠান, আফগান সুর করবানী বংশীয় শাসনকালে স্থানীয় জমিদর, প্রভাবশালী বীর সেনানায়কদের দ্বারা সুলতানগণ প্রায়শঃই প্রতিবাদের সম্মুখীন হতেন। ১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে দাউদ খান করবানীর পরাজয় ও হত্যার ফলে বাংলা মোগল সাম্রাজ্যের অধিকারভূক্ত হয়। কিন্তু বিশ বছর যাবৎ মোগলদের রাজ্য শাসন এদেশে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। বাংলায় একজন মোগল সবাদার ছিলেন এবং অল্প কয়টি সেনানিবাস স্থাপিত হয়েছিল। কেবলমাত্র রাজধানী ও সেনানিবাসের জনপদগুলো মোগল শাসন মেনে চলত, অন্যত্র ব্যাপক অরাজগতা ও বিশৃংখলা চরম পৌঁছেছিল। আফগান সৈন্যরা লুটতরাজ করত এবং মোগল সেনারাও এভাবে অর্থ উপার্জন করত। বাংলার বড় বড় জমিদারগণ করবানী রাজত্বের অবসানের পর নিজেদের জমিদারীতে স্বাধীনতা অবলম্বন করন। তাদের শক্তিশালী সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী ছিল।

এই সকল জমিদারগণ, ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি অবলম্বন করে পার্শ্ববতী অঞ্চল দখল করতে সচেষ্ট থাকতেন। কখনো কখনো জমিদারগণ সাময়িকভাবে বাংলায় মোগল শাসন প্রতিষ্ঠায় আকবরের সেনাপতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হতেন। এই জমিদারেরা বাংলায় বার ভূঁইয়া নামে পরিচিত। ভূঁইয়াদের বিষয়ে শ্রী সতীশ চন্দ্র মিত্র বলেন- ‘উহাদের কাহারো বা শাসনস্থল একটি পরগনাও নহে, আবার কেহ বা একখণ্ড রাজ্যের অধীশ্বর। কোথাও বা দশ বারোজন ভূঁইয়া একজনকে প্রধান বলিয়া মানিয়া তাহার বশ্যতা স্বীকার করিত। প্রতাপান্বিত ভূঁইয়ার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হইতেন। তখন রণবঙ্গ রাজায় রাজায় না হইয়া ভূঁইয়া ভূঁইয়া চলিত। আর প্রজাদিগের সকলেই সেই যুদ্ধ ব্যাপারে যোগ দিয়া ফলত্যাগী হইতে হইত। এই অরাজগতার যুগে কেহ নির্লিপ্ত থাকিতে পারিতেন না। সকলকেই রাজনৈতিকতায় যোগ দিতে হইত নইলে আত্ম পরিবারের প্রাণ রক্ষা পর্যন্ত অসম্ভব হইত। ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে বাবরের রাজ্য আরম্ভ হতে ১৫৫৬ খ্রিস্টব্দে আকবরের রাজ্য লাভ পর্যন্ত বঙ্গে কোনো সুশাসন প্রতিষ্ঠা হয় নাই। সুলেমান ফরায়েজীর কঠোর শাসনের মধ্যে যে শান্তিটুকু ছিল সেনাপতি কালাপাহাড়ের অত্যাচারে তাও তিরোহিত হয়। এই সময় সাধারণ প্রজাকুল মোগল কর্মচারী কর্তৃক নানাভাবে প্রতারিত হতে থাকে। কম্কনের ভাষায় তার পরিচয় পাওয়া যায় –মোগল ডিহিদার বা তহশীলদের ঘুষ নিয়ে খিল (পতিত) ভীমিতে নাল লিখে প্রজাদের প্রতারিত করত। ভূঁইয়াগণ ঐ সময় অনেক স্থলে ডিহিদারের হাত থেকে বিদ্রোহী প্রজাদের আশ্রয় দিত।

সরকার হইলা কাল, খিল ভূমি লেখে নাল
বিনা উপকারে খায় অতি (ঘুষ)
পোদ্দার হইল যম, টাকায় আড়াই আনা কম,
পায় লভ্য, পায় দিন প্রতি।
জমিদর পতিত আছে, প্রজারা পালায় আছে
দুয়ার চাপিয়া খায় থানা
প্রজা হইল ব্যকুলী, বেঁচে ঘরের কুড়ালী,
টাকার দ্রব্য বেঁচে দশ আনা-
(কবি কষ্কন চণ্ডী, পৃষ্ঠা-৫)

উক্ত ভূঁইয়া বা ভূঁইয়াগণকে শুদ্ধ ভাষায় ভৌমিক বলা হয়। ইংরেজ আমলে যাদের জামিদার বলা হত অনেকটা সেরকম। ভূঁয়াগণ আত্নরক্ষা ও রাজস্ব সংগ্রহের জন্য যথেষ্ট সৈন্য সংগ্রহে রাখতেন। অস্ত্রসহ দুর্গ ও নৌবাহিনীর আয়োজন করতেন। বীর বলে তাদের খ্যাতি ছিল। প্রজারা তাদের ভয় ভক্তিও করত। ঐতিহাসিকদের মতে সে সময় যে কত পরিচিত ও অপরিচিত ভূঁইয়া ছিলেন তার হিসেব কেউ রাখতেন না। তবে তাদের মধ্যে যারা বীরত্বে অগ্রগণ্য, যাদের রাজত্ব বিস্তীর্ণ এবং যারা বিপুল সৈন্যবলে শক্তি সম্পন্ন হতেন তাদের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ত। ইতিহাসগতভাবে এরুপ ১২ জন ভূঁইয়ার বিশেষ পরিচিতি পাওয়া যায় এবং তারা বঙ্গদেশে বার ভূঁইয়া বলে পরিচিত। তারা হলেন-

(১)  ঈশা খাঁ-মসনদ আলী খিজিরপুর বা কত্রাস্থ-সোনারগাঁ।
(২)  প্রতাপাদিত্য –যশোহর বা চাণ্ডিক্যান- বর্তমান রাজবাড়ীর পশ্চিমাংশ।
(৩)  চাঁদ রায় ও কেদার রায় – শ্রীপুর বা বিক্রমপুর।
(৪)  কন্দর্প রায় ও রামচন্দ্র রায়- বাকলা বা চন্দ্রদ্বীপ-বরিশাল।
(৫)  লক্ষণ মাণিক্য- ভূলুয়া- নোয়াখালি।
(৬)  মুকন্দরাম রায়- ভূষণা বা ফতেহাবাদ-ফরিদপুর- রাজবাড়ী।
(৭)  ফজল গাজী, চাঁদ গাজী- ভাওয়াল।
(৮)  হামীদ মল্ল বা বীর হম্বির- বিষ্ণুপুর।
(৯)  কংস নারায়ণ- তাহিরপুর।
(১০)  রামকৃষ্ণ- সঁ-তৈর বা সান্তোল।
(১১)  পিতাম্বর ও নীলাম্বর-পুঁঠিয়া।
(১২)  ঈসা খাঁ লোহানী ও ওসমান খাঁ-উড়িষ্যা ও হিলি।

ঐতিহাসিকদের মতে এদের মধ্যে প্রথম ছয়জন খুবই বিখ্যাত। ফলে দেখা যায় ভূঁইয়াদের উত্থান ঘটেছিল সোনার গাঁ, বিক্রমপুর, নোয়াখালি , ফরিদপুর, যশোহর ও বরিশাল। তাদের মধ্যে ভূষণা বা ফতেহাবাদের মুকুন্দরাম রায় ও প্রতাপাদিত্য রাজবাড়ী জেলার ইতিহাসে বিবেচ্য। (ইতিপূর্বে) ভূষণাধিপতি, অন্যতম ভূঁইয়া মুকুন্দরাম রায় আলোচিত।

রাজবাড়ি জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য

প্রফেসর মতিয়ার রহমান