গোয়ালন্দের অকাল মৃত্যু

মহকুমা গোয়ালন্দের অকাল মৃত্যু

অবিভক্ত ভারতে ভৌগলিক ও প্রশাসনিক কারণে থানা ও মহকুমার আন্তঃসমন্বয় ঘটেছে বারবার। ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার কর্তৃক ১৮৭৭ সালে প্রকাশিত ‘অ্যা স্ট্যাটিস্টিক্যাল একাউন্ট অফ বেঙ্গল (ভলিউম-৫)’ পর্যালোচনায় দেখা যায়, ফরিদপুর সদর ও গোয়ালন্দ মহকুমা দুটির সমন্বয়ে ছিল ফরিদপুর জেলা এবং গোয়ালন্দ, বেলগাছি ও পাংশা এই তিনটি থানার সমন্বয়ে ছিল গোয়ালন্দ মহকুমা (সাব-ডিভিশন)।

১৯২৩ সালে প্রকাশিত বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার (ফরিদপুর) অনুসন্ধানে দেখা যায়, ফরিদপুর সদর, গোয়ালন্দ, গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুর—এই চারটি মহকুমার (সাব-ডিভিশন) সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে ফরিদপুর জেলা। আর গোয়ালন্দ ঘাট, পাংশা, বালিয়াকান্দি ও গোয়ালন্দ—এই চারটি থানার (উপজেলা) সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে গোয়ালন্দ মহকুমা (সাব-ডিভিশন)। গোয়ালন্দ মহকুমার সর্বমোট আয়তন ছিল তখন ৪৪৩ বর্গ মাইল এবং জনসংখ্যা ৩,২৮,২১৯ জন। আর গোয়ালন্দ ঘাটের আয়তন তখন ৫০ বর্গমাইল এবং জনসংখ্যা ৪৩,২৮৬ জন। মহকুমা সদর দপ্তর ছিল গোয়ালন্দ থানা।

 

বিদ্যমান প্রশাসনিক কাঠামো অনুযায়ী ব্রিটিশ আমলে কয়েকটি থানা নিয়ে একটি মহকুমা গঠিত হত এবং কয়েকটি মহকুমা নিয়ে একটি জেলা গঠিত হত। মহকুমা হিসেবে গোয়ালন্দের মর্যাদা লাভ ১৮৭১ সালে। কলকাতা হতে যে প্রধান লাইনটি গোয়ালন্দ ঘাটে এসে শেষ হয় তা ছিল পদ্মা নদীর টার্মিনাল স্টেশন। তবে এটি কখনই স্থায়ী ঘাট হিসেবে গণ্য হয়নি। কেননা নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে প্রায়ই ঘাট পরিবর্তন করতে হত। উদ্বোধনের প্রায় ৩০ বছরের মধ্যে ১০ বার এর স্থান পরিবর্তন করতে হয়। ১৯১৩ সালে প্রকাশিত ‘ফ্রম দ্যা হুগলী টু দ্য হিমালয়েজ’ হতে জানা যায়, ‘ফরমারলি গোয়ালন্দ ওয়াজ সিচুয়েটেড এক্সেক্টলি অ্যাট দ্য জাংশন অফ দ্য রিভার্স পদ্মা এন্ড ব্রম্মপুত্র, এন্ড লার্জ সামস ওয়্যার স্প্যান্ট ইন প্রটেক্টিং দ্য সাইট ফ্রম ইরোসন; বাট ইন এইটিন সেভেন্টিফাইভ দ্য স্পার ওয়াজ ওয়াসড অ্যাওয়ে, এন্ড সিন্স দ্যাট ডেইট দ্য টার্মিনাস হ্যাজ কন্সটেন্টলি বীন অন দ্য মোভ, উইথ দ্য রেজাল্ট দ্যাট ইট ইজ নাও টু বি ফাউন্ড এবাউট সেভেন মাইলস সাউথ অফ ইটস ফরমার পজিশন। দিস বিং দ্য কেইস দেয়ার আর নো পার্মানেন্ট ল্যান্ডিং স্টেইজেস’। ঘাটের ভাঙ্গন এবং ঘাট রাজবাড়ি শহরের অদূরে অবস্থিত হওয়ায় রেলের সকল স্থাপনা রাজবাড়িতে গড়ে উঠে। গোয়ালন্দ মহকুমা ও থানার প্রশাসনিক কাজ সম্পাদিত হত রাজবাড়ি থেকে।

কালের পরিক্রমায় একদিকে পলি জমে সংকুচিত হয়েছে নদীপথ, অন্যদিকে বিস্তৃত হয়েছে রেলের নেটওয়ার্ক। ইস্টার্ণ বেঙ্গল রেলওয়ে এবং আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের পাশাপাশি এগুলোকে সংযুক্ত করে গড়ে ওঠে ঢাকা-ময়মনসিংহ স্টেট রেলওয়ে, বেঙ্গল সেন্ট্রাল রেলওয়ে, নর্দার্ন বেঙ্গল স্টেট রেলওয়ে, বেঙ্গল ডুয়ার্স রেলওয়ে কোম্পানী। শিয়ালদহ থেকে চট্টগ্রাম মেইল ছাড়ত সকালবেলায়। কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের লোকেরা সাধারণত চট্টগ্রাম মেইলে যাতায়াত করতেন। অনেকে চাঁদপুর থেকে আবার আসাম মেইল ধরতেন।

কমরেড মুজফফর আহমদ‍ এর লেখা ‘কাজী নজরুল ইসলামঃ স্মৃতিকথা’ তে ঢাকা মেইলের বর্ণনা মিলে। তিনি উল্লেখ করেছেন-‘১৯২১ সালে রেলওয়ে ও স্টীমারের ভাড়া অত্যন্ত কম ছিল। তাছাড়া আমরা থার্ড ক্লাসের হিসাব করছিলাম। কলকাতা হতে আমি রাত্রের ঢাকা মেইলে রওয়ানা হয়েছিলেম। কারণ সকালের চাটগাঁ মেইলে গেলে চালু স্টীমারখানা পাওয়া যেত না।’ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘ঢাকা মেইল’ এর বগিগুলো ছিল লাল রঙের। নারায়নগঞ্জ থেকে মেইল স্টিমার ভোর ছয়টা-সাড়ে ছয়টার মধ্যে গোয়ালন্দে পৌঁছে যেত। স্টিমারের যাত্রী এবং মাছের বগি নিয়ে সকাল সাতটায় ঢাকা মেইল গোয়ালন্দ থেকে শিয়ালদহের উদ্দেশ্য ছেড়ে যেত। দর্শনায় কাষ্টম চেকিং হত। শিয়ালদহ স্টেশন পৌঁছে যেত দুপুর দেড়টা-দুটোর মধ্যেই। আবার শিয়ালদহ থেকে ছেড়ে আসা ঢাকা মেইলটি গোয়ালন্দ এসে পৌঁছাত রাত নয়টার মধ্যে। পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়ের বগিগুলো ছিল সবুজ রঙের। বগিগুলোর গায়ে লেখা থাকত ইবিআর।

 

১৯৬১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি হতে লেখা হত ইস্ট পাকিস্তান রেলওয়ে (ইপিআর)। বগিগুলো ছিল চার শ্রেণীর। ফার্স্ট ক্লাশ, সেকেন্ড ক্লাশ, ইন্টার ক্লাশ এবং থার্ড ক্লাশ। শুধু নারীদের বসার জন্য ভিন্ন বগির ব্যবস্থা ছিল। সেখানে উর্দুতে লেখা থাকত ‘জেনানা’। ইন্টার এবং থার্ড ক্লাশের বগিতে চার সারিতে বসার বেঞ্চ থাকত। দুই দিকে জানালার পাশে দুই সারি এবং মাঝখানে পিঠাপিঠি দুই সারি। সব বগি সমান আকারের হত না। কোন কোন বগি আকারে বড় হত। বগির ভেতরে ‘৪০ জন বসিবেক’, ‘২৮ জন বসিবেক’, এরূপ সব নির্দেশনা থাকত।

‘দুই দশকের গোয়ালন্দ’ শীর্ষক নিবন্ধে ভারত ভাগ পরবর্তী সময়ের কথা বলতে গিয়ে জালাল মিঞা এভাবেই স্মৃতিচারণ করেছেন। ব্রিটিশ ভারতে গোয়ালন্দ ছিল ইউরোপীয় মানের প্রথম শ্রেণীর রেল স্টেশন। বাঙালি তো নয়ই, এমনকি কোন ভারতীয়কেও স্টেশন মাস্টারের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। ভারত ভাগের আগ পর্যন্ত মাস্টারের দায়িত্বে বরাবরই ছিলেন একজন ইংরেজ। ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত ইস্ট বেঙ্গল এক্সপ্রেস নামের ট্রেনটি শিয়ালদহ হতে গেদে-দর্শনা হয়ে গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত চলাচল করত। ফিরত আবার একই পথে। আর বরিশাল এক্সপ্রেস শিয়ালদহ হতে পেট্টোপোল-বেনাপোল হয়ে খুলনা পৌঁছাত এবং সেখান থেকে পুনরায় শিয়ালদহ ফিরে আসত। আসাম মেইলের আসা যাওয়া ছিল সান্তাহার থেকে গৌহাটি পর্যন্ত। দার্জিলিং মেইল শিয়ালদহ-রানাঘাট-হার্ডিঞ্জব্রীজ-ঈশ্বরদী-সান্তাহার-পার্বতীপুর-হলদিবাড়ি-জলপাইগুড়ি-শিলিগুড়ি পথে আসা-যাওয়া করতো। কত বিস্তৃত ছিল সেকালের রেলের সীমা! আজ চিন্তা করতেই হিমসিম খেতে হয়।

এতদঞ্চলে চলাচলরত বিশ শতকের চারটি প্যাডেল স্টিমার সচল আছে এখনো। বিআইডব্লিউটিসির তত্ত্বাবধানে রয়েছে এগুলো । স্কটিশ শিপবিল্ডের ওয়েবসাইট (ডব্লিউ.ডব্লিউ.ডব্লিউ.ক্লাইডেশিপস.সিও.ইউকে) হতে প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক দেখা যায়, ‘টার্ণ’ (১৯৪৯) ও ‘অস্ট্রিচ’ (১৯২৯) ছিল ইন্ডিয়া জেনারেল নেভিগেশন কোম্পানির। আর ‘মাহসুদ’ (১৯২৯) ও ‘লেপচা’ (১৯৩৭) ছিল রিভার্স স্টিম নেভিগেশন কোম্পানির। সবগুলো প্যাডেল স্টিমারই স্কটল্যান্ডের ‘উইলিয়াম ড্যানি এন্ড ব্রাদার্স’ শিপইয়ার্ডে প্রস্তুতকৃত। ১৯৫৯ সালে এগুলো পাকিস্তান রিভার স্টিমার্স লিমিটেডের মালিকানায় আসে। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে এগুলোর মালিকানা পায় বাংলাদেশ রিভার স্টির্মাস লিঃ এবং সর্বশেষ বিআইডব্লিউটিসি। ‘অস্ট্রিচ’ বাদে অন্য তিনটি স্টিমার বর্তমানে বিভিন্ন রুটে চলাচল করছে। প্যাডেল স্টিমার বিধায় এদের নামের আগে পিএস সংযুক্ত করে ডাকা হয় পিএস টার্ণ, পিএস অস্ট্রিচ, পিএস মাহসুদ ও পিএস ল্যাপচা। ইতিমধ্যে বিআইডব্লিউটিসি স্টিমার চারটিকে রাষ্ট্রীয় ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। ‘অস্ট্রিচ’ কে ২০১৯ সালে অ্যাকর্ট রিসোর্সেস নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নিকট পাঁচ বছর মেয়াদে ইজারা দেয়া হয়েছে। প্যাডেল স্টীমারগুলো ‘রকেট’ নামেও পরিচিত। সময়ের আবর্তনে এগুলোকে স্টিম ইঞ্জিন থেকে ডিজেল ইঞ্জিনে রূপান্তর করা হয়েছে।

যেই পদ্মাকে ঘিরে গোয়ালন্দের এত অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশ; কালের পরিক্রমায় প্রমত্ত পদ্মার সেই যৌবন আর নেই। ঢেউ আছড়ে পড়ে না স্টিমারের বাজুতে। পদ্মার এমন দশায় গোয়ালন্দের সেই নাম আর জৌলুসও নেই। ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ সকল মহকুমাকে জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু গোয়ালন্দকে জেলা হিসেবে ঘোষণা না করে জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয় রাজবাড়িকে! আর গোয়ালন্দ পরিণত হয় রাজবাড়ি জেলার অন্তর্ভুক্ত একটি উপজেলায়! বর্তমানে রাজবাড়ি জেলার আওতাধীন পাঁচটি উপজেলার মধ্যে আয়তনের দিক থেকে গোয়ালন্দ ক্ষুদ্রতম (৪৭ বর্গমাইল)। শতাধিক বছরের খ্যাতি হারিয়েছে গোয়ালন্দ রেল স্টেশন। বন্ধ হয়ে গেছে গোয়ালন্দগামী বেশ কিছু রেল লাইন। গোয়ালন্দ এখন শুধুই এক সাধারণ রেল স্টেশন। ক্ষয়ে যাওয়া লাল ইটের ভবনগুলো কালের সাক্ষী হয়ে রয়ে গেছে। পাল্টে গেছে ইলিশ যাত্রার পথও। আগে গোয়ালন্দে অন্ধ মালগাড়ির যাত্রী হতো ইলিশ। আর এখন বেনাপোল কিংবা আগরতলার পথে ট্রাকের যাত্রী হয় ইলিশ। টিকেট কাটা ঘরের পরিত্যক্ত জানালা, টাকা রাখার লকার, ট্রেনকে সিগন্যাল দেয়ার জন্য লকারের ওপরে বসানো ল্যাম্প, অন্যান্য যাত্রীদের সাথে স্টিমারের ডেকে চাদর বিছিয়ে স্থান করে নেয়া, রাতের নদী, গোয়ালন্দ ঘাটে নেমে হুড়াহুড়ি করে ট্রেনে ওঠা—সবই এখন সোনালী অতীতের ধূসর স্মৃতি।

প্রাচীন জনপদ

প্রাচীন জনপদ

প্রাচীন রাষ্ট্রযন্ত্রের বিন্যাসে ভূক্তি, বিষয়, মন্ডল, বীথি ও গ্রামের উল্লেখ আছে। এ ক্ষেত্রে রাষ্টীয় বিভাগের নাম ভুক্তি যা কয়েকটি বিষয় নিয়ে গঠিত হত। বিষয় গঠিত হত কয়েকটি মন্ডল নিয়ে এবং মন্ডল গঠিত হত কয়েকটি বীথি আর বীথি গঠিত হত কয়েকটি গ্রাম নিয়ে। এতে বোঝা যায় বিষয়ের আয়তন প্রদেশ প্রায় এভং মন্ডল জেলা প্রায়। নবম দশম শতকে এ অঞ্চলটি স্মাতট পদ্মাবতী বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল যার স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে কেশব সেনের ইদিলপুর লিপি বা পট্রলীতে। দশম শতকের শেষে চন্দ্র বংশীয় রাজারা বিক্রমপুর, চন্দ্রদ্বীপ, হরিকেল অর্থাৎ পূর্ব দক্ষিণ অংশ জুড়ে রাজত্ব করতেন। এই বংশের মহারাজাধিরাজ শ্রীচন্দ্র তার ইদিলপুর লিপি (বর্তমানে শরীয়তপুর) দ্বারা স্মতট পদ্মাবতী বিষেয়ের অন্তর্গত কুমার তালক মন্ডলে জনৈক ব্রাহ্মণকে একখন্ড ভূমি দান করেন। তৎকালীন সময়ে ব্রাহ্মণকে পুনর্বাসনের জন্য ভূমিদান করা হত। স্মতট পদ্মাবতী বিষয় পদ্মানদীর দুই তীরবর্তী প্রদেশকে বোঝায় তাতে সন্দেহ নেই। এ থেকে বোঝা যায় এ অঞ্চল তখন পদ্মাবতী বিষয়ের অন্তর্গত ছিল। কুমার তালক মন্ডলের উল্লেখ আরো লক্ষণীয়। ‘কুমার তালক এবং বর্তমান গড়াই নদীর অদূরে কুষ্টিয়ার অন্তর্গত কুমারখালি দুই-ই কুমার নদীর ইঙ্গিত বহন করে। বর্তমান কুমার বা কুমারখালি পদ্মা উৎসারিত মাথা ভাঙ্গা নদী থেকে বের হয়ে বর্তমানে গড়াইয়ের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।

মূলতঃ মাথাভাঙ্গা নদীয়া জেলার উত্তরে জলাঙ্গীর উৎপত্তির প্রায় ১০ মাইল পূর্ব দিকে পদ্মা হতে বের হয়ে আলমডাঙ্গা স্টেশনের প্রায় ৫ মাইল পশ্চিমে এসে দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে। কুমার নামে শাখাটি পূর্বমুখে গিয়ে আলমডাঙ্গা স্টেশনের কিছুটা উত্তরে রেল লাইনের নিচে দিয়ে নদীয়া, যশোর ও খুলনা জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। কুমারের পূর্বগামী আর একটি শাখা শৈলকুপা, শ্রীপুর, মাগুরা হয়ে গড়াইয়ে মিলেছে।

 

কুমার আবার মধুখালির পাঁচমোহনী হয়ে বর্তমান ফরিদপুরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত। অনেক সময় গড়াই ও কুমারকে অভিন্ন মনে করা হয়েছে। কুমার প্রাচীন নদী এবং এর প্রবাহ ব্যাপক। অনুমান করা যায় ফরিদপুরের পশ্চিমাঞ্চল, যশোরের উত্তরাঞ্চল এবং কুষ্টিয়া স্মতট পদ্মাবতী বিষয়। সেই হিসেবে রাজবাড়ি স্মাতট পদ্মাবতী বিষয়ের অন্তর্গত। অন্যদিকে কুমার তালক বা কুমারের তল বা নিম্নভূমি নিয়ে পদ্মাবতীর যে মন্ডল তা কুমার তালক মন্ডল। সেই হিসেবে গড়াই আর কুমার যদি অভিন্ন হয় তাহলে অবশ্যই বর্তমান রাজবাড়ি কুমার তালক মন্ডল ছিল। কুমার তালক মন্ডলের সীমানা নির্ধারণ দুরুহ। ইতিপূর্বে কুমারখালির কথা বলা হয়েছে। প্রতীয়মান হয় কুমার থেকেই কুমারখালি এসেছে এবং গড়াইকে একসময় কুমার বলা হতো। গড়াই এর আলোচনা থেকে বলা যায় গড়াইয়ের উৎস মুখ কখনো খনন করা হয়ে থাকবে বলে উৎস মুখে তা গৌড়ী এবং খননের পরে তা হয়েছে গড়াই। এ হিসেবে রাজবাড়ির বেশির ভাগ অঞ্চল বিশেষ করে পূর্বাংশে সামান্য বাদ দিয়ে এটা কুমার তালক মন্ডল আর বিষয় হিসেবে স্মতট পদ্মাবতী। *নিবন্ধটি নীহাররঞ্জন রায়ের বাঙালির আদি ইতিহাস প্রথম খন্ডের অনুসরণে লেখা। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দে দিগ্বিজয়ী বীর আলেকজান্ডার এর ইতিহাস পর্যালোচনায় অত্র অঞ্চলে গঙ্গারিডি জাতি বলে এক পরাক্রমশালী জাতির উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে গ্রীক লেখকগণের বর্ণনায় তা আরো স্পষ্ট হয়।

দিওদোরসের লেখনীতে গঙ্গারিডি জাতির বিপুল সেনাবাহিনী ও ৬ হাজার রণহস্তীর উল্লেখ আছে। খ্রিস্টীয় ১ম ও ২য় শতকে পেরিপ্লাস গ্রন্থে টলেমীর বিবরণ হতে জানা যায় এই সময়ে স্বাধীন গঙ্গারিডি রাষ্ট্র বেশ প্রবল ছিল। গঙ্গা রাষ্ট্রের বাইরে সমসাময়িক বাংলায় আর যে সব রাজা ও রাষ্ট্র বিদ্যমান ছিল তাদের সঙ্গে গঙ্গার রাষ্ট্রের কি সম্বন্ধ তা জানার উপায় নাই। তবে মহাভারত ও সিংহলী পুরানের কাহিনী থেকে কিছু সংবাদ পাওয়া যায়। রাষ্ট্র বিন্যাসের একটি আভাস পাওয়া যায় খ্রিস্টীয় ২য় শতকে মহাস্থানের শিলাখন্ড লিপিটি থেকে। মৌর্য আমলে উত্তরবঙ্গ মৌর্য শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। উত্তরবঙ্গে মৌর্যশাসনের কেন্দ্র ছিল নুডনগল বা পুন্ড্রনগর বর্তমান বগুড়া জেলার ৫ মাইল দুরে। মহাস্থান গড়ে। টলেমির বর্ণনায় দেখা যায় গঙ্গারিডি রাষ্ট্রের রাজধানী ছিল গঙ্গাবন্দর। এই গঙ্গা বন্দরের অবস্থিতি ছিল তাম্রলিপ্তি বন্দরের আরো দক্ষিণপূর্বে ক্যামবেরীখন নদী (Kamberikhon) বা কুমার নদীর মোহনায়। কুমার নদীর তল ধরেই কুমার তালক মন্ডল। গঙ্গা বন্দরে অতি সূক্ষ্ণ কার্পাস বস্ত্র উৎপন্ন হত এবং নিকটে কোথাও সোনার খনি ছিল বলে নীহাররঞ্জনের উদ্ধৃতিতে পাওয়া যায়। পেরিপ্লাস গ্রন্থে নিম্নগাঙ্গেয় ভূমিতে ক্যালটিস নামক এক প্রকার সুবর্ণ মুদ্রার ব্যবহারের উল্লেখ রয়েছে। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া অঞ্চলে প্রাপ্ত ৬ষ্ঠ শতকের একটি লিপিতে সুবর্ণ বীথির উল্লেখ আছে। ঢাকা জেলার নারায়ণগঞ্জের সুবর্ণগ্রাম, মুন্সিগঞ্জের সোনারঙ্গ, রাজবাড়ির সোনাপুর, সোনাকান্দা বাংলার পশ্চিম প্রান্তে সুবর্ণরেখা নদী একথা স্মরণ করে দেয়। রাজবাড়ি অঞ্চলে সোনার টাকা ভরা গুপ্ত ধনের গল্প কাহিনী প্রচলিত আছে। সোনাপুর রাজবাড়ির গ্রাম হিসেবে অতি পুরাতন। সোনাপুর এটা ইঙ্গিতবহ হতে পারে। নলিয়া, আড়কান্দি, বহরপুর, বালিয়াকান্দি, অত্র অঞ্চলের সর্বাপেক্ষা উঁচু ভুমি। এর উত্থান এবং প্রাচীন বসতি অনেক পূর্ব থেকে। অত্র অঞ্চল সন্ধান করলে গুপ্তধন না হোক খনিজ সম্পদ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গঙ্গা নদী প্রাচীনকালে কুমার তালক মন্ডলে। এর মোহনা থাকা স্বাভাবিক। সে মোহনায় গঙ্গা বন্দর প্রাচীন কুমার তালক মন্ডল হতে পারে। রাজবাড়ি কুমার তালক মন্ডলের বীথি হতে পারে। এ সবই প্রাচীন গঙ্গা রাষ্ট্রের অঙ্গ বা এলাকা হতে পারে।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড ঢাকা কর্তৃক ষষ্ঠ শ্রেণী সমাজ বিজ্ঞান পাঠ্যপুস্তকে প্রাচীন যুগে বাংলাদেশ পরিচ্ছেদ পৃষ্ঠা-৩৬ এ যে প্রাচীন বাংলার মানচিত্র সন্নিবেশিত হয়েছে তাতে গঙ্গারিডি রাষ্ট্রের অবস্থান বর্তমান রাজবাড়ি, ফরিদপুর, যশোর দেখা যায় মানচিত্রটি সন্নিবেশিত হল।

 

রাজবাড়ি জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য /প্রফেসর মতিয়র রহমান

প্রাচীন জনপ্রবাহ, জনপদ ও শাসন

প্রাচীন জনপ্রবাহ, জনপদ ও শাসন (প্রথম খণ্ড)

রাজবাড়ি অঞ্চলে কবে? কখন থেকে? কোথায় প্রথম জনবসতি গড়ে উঠেছে তা নির্ণয় করা অসম্ভব। তবে বঙ্গে জনপ্রবাহের আলোকে রাজবাড়িতে জন প্রবাহের ঐতিহাসিক পর্যালোচনা সম্ভব। বর্তমানে রাজবাড়িতে ১০ লক্ষাধিক লোকের বাস। এই জনপ্রবাহের পূর্বপুরুষরা কখনো এ অঞ্চলে বসবাস শুরু করে থাকেন। মানুষের ইতিহাস বহু বছর পর্যন্ত প্রাঙনরের (Hominids) ইতিহাস। চীন, জাভায়, টাঙ্গানিকায়, পূর্ব জার্মানীতে এদের কয়েকটি নানাবিধ চিহ্ন পাওয়া গেলেও বাংলায় এর কোনো সন্ধান পাওয়া যায় নাই।প্রাচীন প্রস্তাব থেকে নব্য প্রস্তর তা থেকে ক্রমে ব্রঞ্জ ও ইস্পাতের যুগ এসেছে। এর অতিক্রমণ কাল প্রায় ২ লাখ বছর। ভারতে প্রাচীন বা নব্য প্রস্তর যুগের তেমন নির্দশন পাওয়া যায় না। তবে বর্ধমান জেলার অজয় নদীর তীরে ১৯৬৩-৬৪ সালে পাণ্ড্রু রাজার ঢিবি আবিষ্কৃত হয়। যেখানে নব্য প্রস্তর যুগের সন্ধান মেলে। এ সভ্যতা খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দের তাম্র সভ্যতার যুগ। বাংলার বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের শারীরিক গঠন বিশ্লেষণ করে পণ্ডিতগণ বাংলায় যে সমস্ত জাতিকে বর্তমান বাঙালিদের পূর্বপুরুষ বলে মনে করেন তারা নিগ্রোবটু, আদি অষ্ট্রালয়েড, আদি নরডিক, আদি ভোটচীন, গোষ্ঠীর মানুষ। নিম্নবর্ণের বাঙালি এবং আদিম অধিবাসি যাদের মধ্যে জনের প্রভাব বেশি নৃতত্ত্ববিদগণ তাদের আদি অষ্ট্রালয়েড বলে নামকরণ করেছেন। পণ্ডিতগণ মনে করেন এই জন এক সময় মধ্যভারত হতে আরম্ভ করে দক্ষিণ ভারত ও সিংহল হয়ে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এ ছাড়া আলপেনীয় নিগ্রোবটু, ভোটচীন, দ্রাবিড় গোষ্ঠীর মানুষও প্রাচীন বাংলার আদিবাসী। আদিমতম স্তরে আদি অস্ট্রেলিয় তারপর দীর্ঘমুন্ডু ভূমধ্য নরগোষ্ঠী, গোলমুন্ড আলপেনীয়, দীনারীয় নরগোষ্ঠী এবং সর্বশেষ উত্তর ভারতের আদি নরডিক বা আর্যজাতীর ধারায় মিলনে গাঙ্গেয় প্রদেশের এই বাংলায় খ্রিস্টাপূর্ব ৭ম ও ৬ষ্ঠ থেকে ধর্ম, সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রবাহ প্রবাহিত হতে থাকে। খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ শতক থেকে ভারতে আর্য আগমন ঘটলেও আদি অস্ট্রেলিয়, নিগ্রোবটু, দ্রাবিড় গোষ্ঠীর কৌম সমাজের মানুষেরা বসবাস করত এরও পূর্বে।

 

প্রাচীন বাংলার জনপ্রবাহের তেমন কোনো নিদর্শন নাই। তবে জনপ্রবাহের কিন্তু সংবাদ পাওয়া যায় বেদপুরাণ, মহাভারত গ্রন্থ, আলেকজেন্ডার, টলোমির বর্ণনা এবং বিভিন্ন লিপি ও পট্টলী সংবাদ থেকে। ঐতরিয় আরণ্যক গ্রন্থে সর্বপ্রথম বঙ্গের উল্লেখ পাওয়া যায়। বোধায়ন ধর্মসূত্রে বঙ্গের স্পষ্ট উল্লেখ আছে। পুরানে দেশসমূহের তালিকায় অঙ্গ, বিদেহ, পুণ্ড্র ইত্যাদির সঙ্গে বঙ্গ যোগ করা হয়েছে। মহাভারতেও বঙ্গের উল্লেখ আছে। বঙ্গ কথাটি অনেকের মতে বঙ্গা থেকে এসেছে। বঙ্গাকৌম অর্থে বঙ্গাজনা। এভাবে  বঙ্গা, রাঢ়া,গৌড়া অর্থাৎ বঙ্গজনা, রাঢ়াজনা, গৌড়াজনা। উপরোক্ত সূত্রগুলিতে বঙ্গের উল্লেখ পাওয়া গেলেও এর ভৌগোলিক অবস্থান সম্বন্ধে কোনো সম্যক ধারণা পাওয়া যায় না। মহাভারতে বেশ কয়েকটি রাজ্যের বা ভূভাগের নাম দেওয়া আছে তা থেকে মনে হয় বঙ্গ একটি পুর্বাঞ্চলীয় দেশ যার অবস্থিতি ছিল অঙ্গ, সুম্ম, তাম্রলিপ্তি, মগধ এবং পুণ্ড্রের কাছাকাছি। কালিদাসের রঘুবংশে রঘুর ‍দিগ্বিজয়ের কথায় গঙ্গাস্রোত হন্তারেষু। তার ব্যাখ্যায় সকলে স্বীকার করেন যে, এর অর্থ গঙ্গাস্রোত অন্তর্বতী ভূভাগ অর্থাৎ ভাগীরথীর পূর্বে এবং পদ্মার দক্ষিণে ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, নদিয়া অঞ্চল নিয়েই প্রাচীন বঙ্গ। আলেকজেন্ডার ও ‍খ্রিস্টীয় প্রথম/দ্বিতিয় শতকে টলেমির বর্ণনায় যে গঙ্গারিডি জতি ও রাষ্ট্রের উল্লেখ পাওয়া যায় তা এই গঙ্গাতীরবর্তী অঞ্চলকেই বোঝায়। এ জাতির ছিল ৬ হাজার রণহস্তী এবং জাতিটি ছিল পরাক্রমশালী। বিভিন্ন লিপি, পট্টলী প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার ও ঐতিহাসিক যুক্তি প্রমাণে বারক মণ্ডল, কুমার তালক মণ্ডল ও নব্য কাশিকার সভ্যতার স্পষ্ট প্রমাণাদি পঞ্চম শতক থেকে আরম্ভ হয়েছে। ঢাকার আশ্রাফপুর, শরিয়তপুরের ইদিলপুর, নব্যকাশিকা বা কোটালীপাড়া, বারক মণ্ডল, পদ্মা স্মতট কুমার তালক মণুলে জনপ্রবাহের সৃষ্টি হয়েছিল। ঐতিহাসিকদের মতে ভারতে আর্যীকরণ আরম্ভ হয় খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ থেকে। আর্যীকরণের প্রক্রিয়ায় অষ্ট্রোলয়েড, দ্রাবিড়, নিগ্রোবটু আদিম গোষ্ঠীর মানুষ ধীরে ধীরে নব উত্থিত বঙ্গের দিকে সরে আসে এবং ইতর জীবন যাপন করে। এরা বিভিন্ন কৌমভুক্ত জাতি। মহাভারতে বাংলার বিভিন্ন কৌমভুক্ত জাতিকে মেলেচ্ছ বলা হয়েছে। আর্যবহিনর্ভূত প্রান্তসীমায় বৌদ্ধ আর্যমুঞ্জুলিকা গ্রন্থে গৌড়,সমতট ও হরিকেলের ভাষাকে অসুর ভাষা বলা হয়েছে। আর্যরা এদের দস্যু, পাপ, মেলেচ্ছ প্রভৃতি উন্নাষিকতায় চিহ্নিত করেছে। প্রাচীন বাংলায় এ অঞ্চলে আদি অষ্ট্রোলয়েড, দ্রাবিড় গোষ্ঠীর বসবাস ‍খ্রিস্টপূর্ব থেকে শুরু হতে পারে। পুণ্ড্রের উত্থান অপেক্ষাকৃত বঙ্গের সমতটীয় অঞ্চলের অনেক পূর্বে হওয়ায় তাদের আগমন ঐ অঞ্চলে পূর্বে শুরু হয়। রাজবাড়ী অঞ্চল সমতটীয় অঞ্চল হলেও ভৌগোলিক কারণেই এর উত্থান দক্ষিণাঞ্চলের পূর্বে। যে কারণে এ অঞ্চলে প্রাচীন গোষ্ঠীর কৌম সমাজের বিস্তর ঘটতে পারে। আর্যীকরণের পর বর্ণভেদের উদ্ভব হয় আর বর্ণাশ্রমের বাইরে তৎকালীন কৌম সমাজের মানুষের পরিচয় হয় চণ্ডাল, চাঁড়াল, বাউরি, ঘট্রজীবী, ঢোলবাহি, মালো, হাড্ডি, বাগদি। প্রাচীন নিগ্রোবটু ও অষ্ট্রিকজাতির সমকালে কিছু দ্রাবিড় জাতির আগমন ঘটে এবং সভ্যতার উন্নত বলে অষ্ট্রিকজাতিকে গ্রাস করে। রাজবাড়ি জেলার দক্ষিণ বালিয়াকান্দি থানার জঙ্গল ইউনিয়নে অধিবাসীদের প্রায় ৯৮% শূদ্র পর্যায়ের। এদের শরীরের রং তামাটে পীতবর্ণ। আচার আচরণে হিন্দুদের অন্যান্য বর্ণ থেকে আলাদা। এদের মুখমণ্ডল প্রশস্ত হলেও ভালোভাবে লক্ষ্য করলে দেখ যাবে নাক কিছুটা দাবা। রাজবাড়ির সার্বিক জনপ্রবাহে প্রশ্ন আসে তাদের সংখ্যা এখানে এত বেশি কেন? অনেকের ধারনা পালশাসনের সময়ে কৈবর্ত বিদ্রোহে যে বিপুল সংখ্যক কৈবর্ত এ অঞ্চলে আগমন ঘটে এরা তাদেরই একটি অংশ। এরা প্রকৃতপক্ষে প্রাচীন নিগ্রোবটু ও দ্রাবিড় গোষ্ঠীর লোক। সোনাপুর, বহরপুর, বালিয়াকান্দি, সোনাইকুড়ী, আড়াকান্দি, বাগদুল অঞ্চলের শুদ্রদের থেকে এরা আলাদা। রাজবাড়ি জেলার কালুখালির উত্তরে বর্তমানে পদ্মার পাড় এলাকায় প্রকীর্থ বলে একটি গ্রাম আছে। উক্ত গ্রামে ২০/২৫টি প্রাচীন জাতিগোষ্ঠীর লোক বাস করে। এদের চেহারা সম্পূর্ণ পীতবর্ণ এবং আচরণ সাঁওতাল জাতীয়। ধারণা করা যায় এরা আদি অষ্ট্রিক গোষ্ঠির লোক।

 

দ্রাবিড় গোষ্ঠীর ভাষা বিশ্লেষণে দেখা যায় এদের মধ্যে পুর, উর, দিয়া, দির ব্যবহার ছিল। পুর, পুরপাল বা নগরপাল। যে সমস্ত গ্রামের শেষে পুর রয়েছে তা অপেক্ষাকৃত পুরাতন জনের বাসস্থান। রাজবাড়ির পুর দিয়ে গ্রাম বিনেদপুর, ভবানীপুর, গঙ্গাপ্রসাদপুর, সজ্জনকান্দা, বেড়াডাঙ্গা থেকে বেশি পুরাতন। রাজবাড়ি জেলার সোনাপুর, বহপুর, চন্ডিপুর, মধুপুর, ‍নিশ্চিন্তপুর, তারাপুর, মদাপুর কালিকাপুর এরুপ অসংখ্যা পুরের গ্রাম। এ পুরের বেশির ভাগ গ্রামই অনেক পুরাতন। ধারণা করা যায় এক সময় এ অঞ্চলে প্রাচীন দ্রাবিড় গোষ্ঠীর ব্যবহৃত পুর থেকে এত পুরের ব্যবহার এসেছে। তা ছাড়া পদমদি, রতনদিয়া দি, দিয়া দ্রাবিড় ব্যবহৃত শব্দ। রাজবাড়ি জেলার পশ্চিমে বাগদিপাড়া ছিল। এ ছাড়া জেলার অন্যান্য স্থানে বাগদি, ডোলবহী, মুচি, চণ্ডাল, চাড়ালের আধিক্য রয়েছে। প্রকৃত অর্থই এরা আদি কোমজনের উত্তরসূরী এবং আদি গোষ্ঠীর জন। রাজবাড়ি অঞ্চলে কৌম কথাটি বহুল প্রচলিত। প্রাচীন কৌম জানা বা বিভিন্ন কৌমভুক্ত মানুষের প্রাচীন ব্যবহৃত এ কথাটি এ অঞ্চলের মানুষের পরিচয় বহন করে। বিভিন্ন লিপি ও পট্টলী থেকে পাওয়া সংবাদ এ অঞ্চলে সপ্তম, অষ্টম শতকের জনপ্রবাহের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

 

প্রাচীনকালে ভূমি ব্যবস্থা সম্পর্কিত যেসব পট্টলী বংলায় পাওয়া গেছে ঐগুলির দু’একটি কোথাও রাজবাড়ি জেলার জনসংবাদ পাওয়া যেতে পারে। খ্রিস্টোত্তর পঞ্চম হতে অষ্টম শতক পর্যন্ত পট্টলীগুলি ভূমিদান বিক্রয়রীতির বিষয়। এরমধ্যে পাহাড়পুর পট্টলী, আশ্রাফপুর পট্টলী, ইদিলপুর পট্টলী, ধনাইদহ পট্টলী, দামোদর পট্টলী, বিক্রমপুর পট্টলী, নব্যকাশিকা পট্টলী, ব্রাক্ষণকে বা দেবতার উদ্দেশ্যে ভূমিদানরীতি তাম্র পাট্টাস বা ফলকে লেখা। ভূমিদানের বিষয়ে অত্র অঞ্চলে পট্টলী চালু ছিল তা বোঝা যায় এসব পট্টলীতে ব্যবহৃত ভূমির মাপ, প্রকারভেদ, ভূমির মূল্য নিরুপন থেকে। ভূমির পরিমাপ ব্যবহারের ক্ষেত্রে নল ব্যবহার হত। নল আজও রাজবাড়ি ফরিদপুর অঞ্চলে ব্যবহার হয়। বাস্ত্তভিটায় এবং কর্ষণযোগ্য ভূমি নাল, খিল এখনো ব্যবহার হয়। এ ছাড়া জোলা, জোলক, তালক, পাঠক, খাল, বিল এখনো এ অঞ্চলে প্রচুর ব্যবহৃত দ্রাবিড় শব্দ। নীহাররঞ্জন এর কথায় – ‘পদ্মার খাঁড়িতে ফরিদপুর অঞ্চল হইতে অরম্ভ করিয়া ভাগীরথীর তীরে ডায়মন্ড হারবারের সগর সঙ্গম পর্যন্ত বাকেরগঞ্জ, ফরিদপুর, খুলনা, বরিশাল, চব্বিশ পরগনার নিম্নভূমি ঐতিহাসিক কালে কখনো সমৃদ্ধ জনপদ, কখন গভীর অরণ্য, কখনো নদীরগর্ভ বিলীন আবার কখনো খাঁড়ি খাঁড়িকা অন্তর্নিহিত হইয়া নতুন স্থল ভূমির সৃষ্টি। ফরিদপুর জেলার কোটালীপাড়া অঞ্চল ষষ্ঠ শতকের তাম্র পট্টলীতে নব্যকাশিকা বলিয়া অভিহিত হইয়াছে। ষষ্ঠ শতকে নব্যকাশিকা (কোটালীপাড়া) সমৃদ্ধ জনপদ এবং এ অঞ্চলে নৌবাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র। কোটালীপাড়া সমুদ্রতটায় আর এ অঞ্চলকে সমতটীয় অঞ্চল বলা হইয়াছে। ইউয়াং চোয়াং সপ্তম শতকে সমতটে এসেছিলেন। তার বর্ণনায় সমতট সমুদ্র তীরবর্তী দেশ। ইউয়াং চোয়াং এর সমতট বর্তমানে রাজবাড়ি, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মাগুরা, যশোর ও খুলনার পূর্ব অঞ্চল। সমতটের দক্ষিণ অঞ্চল থেকে রাজবাড়ি সাগর থেকে অনেক উত্তরে গঙ্গার মুখে থাকায় এ অঞ্চল দ্বীপ বা ভূ-উত্থান অপেক্ষাকৃত প্রাচীন যাকে পুরাতন সমতটীয় অঞ্চল বলা যেতে পারে। এ পুরাতন সমতটীয় অঞ্চলে প্রাচীন গোষ্ঠীর মানুষের বসবাস শুরু হয়ে থাকবে যা নবম দশম শতক পূর্ণরুপ গ্রহণ করেছে।

বেশিরভাগ গ্রামের সাথে পুর পরিচিতি

বেশিরভাগ গ্রামের নামের সাথে পুর পরিচিতি

পূর্বে বলা হয়েছে পুর শব্দের অর্থ জননিবেশ। পুর পরিচয়ে বেশিরভাগ গ্রাম অপেক্ষাকৃত পুরাতন বসতির গ্রাম। জেলার এসব গ্রাম খ্রিস্টীয় ২/৩য় শতক থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যে গড়ে উঠেছে বলে ধারণা করা হয়।

রাজবাড়ি সদর

বিনোদপুর, চককেষ্টপুর, গঙ্গপ্রসেদপুর, ভবানীপুর, ইন্দ্রনারায়ণপুর, কালীচরণপুর, কল্যাণপুর, শিবরামপুর, রাধাকান্তপুর, বসন্তপুর, লক্ষ্মীপুর, রাজাপুর, চাঁদপুর, কৃষ্ণপুর, রামচন্দ্রপুর, জয়রামপুর, উদয়পুর, কমলাপুর, খানখানাপুর, দর্পনারায়ণপুর, গৌরীপুর, মধুপুর, রুপপুর, রামপুর, রামকান্তপুর, বাসুদেবপুর, মহাদেবপুর, গোপালপুর, ভবানীপুর, জগৎপুর, রাজেন্দ্রপুর, আহলাদীপুর, আলীপুর, বারবাকপুর, রঘুনাথপুর, মোহাম্মদপুর, নিজাতপুর, কাসিমপুর, সুলতানপুর, নুরপুর, ইত্যাদি।

 

পাংশা উপজেলা

নারায়ণপুর, বলরামপুর, গোপীনাথপুর, জয়কৃষ্ণপুর, কল্যাণপুর, কেশবপুর, রঘুনাথপুর, রামচন্দ্রপুর, শ্রীকৃষ্ণপুর, তারাপুর, গৌরীপুর, তেজপুর, কোমরপুর, শ্যামসুন্দরপুর, ব্রক্ষাপুর, কাষ্ণনপুর, মনিরামপুর, নিভাকৃষ্ণপুর, শ্যামপুর, কাশিমপুর, চাঁদপুর, গতমপুর, বাঘাবিষ্ণুপুর, গোপালপুর, রঘুনাথপুর, নিশ্চিন্তপুর, তির্তীপুর, লক্ষ্মীপুর, রায়পুর, শিবসুন্দরপুর, বাহাদুরপুর, বকশিপুর, শাহমতিপুর, জফরপুর, নিয়ামতপুর, ইত্যাদি।

 

বালিয়াকান্দি উপজেলা

নিশ্চিন্তপুর, আজীনারায়ণপুর, রায়পুর, শ্যামসুন্দরপুর, সোনাপুর, করমচাঁদপুর, নারানপুর, রাজধরপুর, দুর্গাপুর, বহরপুর, নবাবপুর, গোবিন্দপুর, জামালপুর, শাশাপুর, গঙ্গারামপুর, সদাশিবপুর, ত্রিলোচনপুর ইত্যাদি।

 

গোয়ালন্দ উপজেলা

বিষ্ণুপুর, গোপীনাথপুর, দুর্গাপুর, লক্ষ্মীমানপুর, জয়পুর, শ্যামপুর, শীতলপুর, দেবীপুর, সাইদুরপুর, কাজিমপুর, ইত্যাদি।

 

পার্শ্ববতী জেলাসমূহ বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের জেলাসমূহ থেকে রাজবাড়ি জেলার গ্রামসমূহের নামের পরিচয়ে পুরের আধিক্য রয়েছে। আবার এসব গ্রামগুলোর নাম মানুষের নামে এবং তাদের ধর্মীয় পরিচয় হিন্দু। এলাকাটি প্রাচীনকাল থেকেই হিন্দু প্রধান হওয়ায় মোগল শাসনের পূর্ব কালেই ঐ গ্রামের ভিত্তি গড়ে ওঠে। তুলনামূলক মুসলমান পরিচয়ে পুরের গ্রাম কম হওয়ায় ধারণা করা যায় ঐ সকল গ্রামের ভিত্তি গড়ে উঠেছে সপ্তদশ অষ্টদশ শতাব্দীতে।

 

দি, দিয়া, রিয়া, বাড়িয়া-সহ গ্রামের নাম ও উৎপত্তি

ভবদিয়া, মধুরদিয়া, পাকুরিয়া, চৌবাড়িয়া, গোপীনাথদিয়া, জালদিয়া, নয়নদিয়া, আড়াবাড়িয়া, বাঘিয়া, দৌলতদিয়া, হামুরিয়া, কান্তাদিয়া, নয়নদিয়া, কুলটিয়া, গজারিয়া, আমবাড়িয়া, বোয়ালিয়া, মাসুমদিয়া, পাকাশিয়া ভেল্লাবাড়িয়া, পাঁচবাড়িয়া, নাদুরিয়া, ডামকদিয়া, সূর্যদিয়া, ভারকুদিয়া, কলকলিয়া, পিপুল বাড়িয়া, মুকুদিয়া, ঘরঘরিয়া, কুলটিয়া, পাটুরিয়া, বেড়াদি, পদমদি, তেঘারিয়া, আলোকদিয়া, ভেকুলিয়া, রামদিয়া, পদমদি, লক্ষণদিয়া, পাঁচবাড়িয়া, কোলাবাড়িয়া, খালিয়া, ভারকুলিয়া, গঙ্গাসিন্দদিয়া, ধুবুরিয়া, তেলিগাতি, কলকলিয়া, পাঁচুরিয়া, মধুরদিয়া, মাসুমদিয়া, মালিয়াট, আলোকদিয়া, হাড়োয়া, রতনদিয়া, আব্দুলিয়া, প্রেমাটিয়া, দেলুয়া, ইন্দুরদি, ভান্ডারিয়া, তেলাই, কান্তদিয়া, দৌলতদিয়া ইত্যাদি।

 

দ্বীপ ও নদী সংলগ্ন এলাকাকে  দি বা দিয়ারা বলা হয়। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর ফরিদপুর জেলার নদী সংলগ্ন এলাকায় নতুন ভূমি রাজস্ব আদায়ের আওতাভুক্ত করে রাজস্বের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়। ১৮৮১ সালে দিয়ারা সার্ভেতে মোট ২৮৭৮৮ একর জমি দিয়ারা হিসেবে খাজনার আওতায় আনয়ন করা হয়। এই দিয়ারা থেকে অনেক গ্রামের নামের পরিচিতি দিয়া বা দি এবং অপভ্রংশে রিয়া, লিয়া ইত্যাদি হয়। জেলার বেশির ভাগ অঞ্চল ভাগ নদীবেষ্টিত হওয়ায় নদী সংলগ্ন জেগে ওঠা ঐ সমস্ত চরদ্বীপের পরিচিতি হিসেবে ‘দি’ ব্যবহৃত হয়েছে। উল্লেখ্য দি, দিয়া, রিয়া, ইত্যাদি নামের গ্রামের উৎপত্তি ষোড়শ শপ্তদশ শতকে গড়ে ওঠে।

 

কান্দা, কান্দি দিয়ে গ্রামের নাম  

প্রবাহমান নদীর কিনার, বাঁক এবং বিল হওড়ের পার্শ্বস্থ এলাকাকে কান্দা, কান্দি, কিনার বলা হয়। জেলায় অনেক নদীর প্রবহমান ছিল। বিশেষ করে পদ্মা,হড়াই, গড়াই ও চন্দনার তীরবর্তী অঞলে যে সব জনপদ গড়ে ওঠে তা কান্দি নামে পরিচিত হয়। উড়াকান্দা, সোনাকান্দা, আড়কান্দি, বালিয়াকান্দি, তেরাইকান্দি, মালিকান্দা, শ্যামপুরকান্দা, লিকান্দা। কান্দা পরিচিতিমূলক শব্দ হলেও আড়, পাইক বালি অর্থ যেমন পাইক অর্থ পাখি, আড় অর্থ নদীর বাঁক, বালি অর্থ বেলে চর বোঝায়।

 

বাড়ি, বাড়িয়া, নগর, গ্রাম,পাড়া দিয়ে গ্রামের নাম ও উৎপত্তি

গ্রামের ভিত্তি গড়ে উঠলে তা বাড়ি, বাড়িয়া, গ্রাম, নগর এসব নামে পরিচিত হতে থাকে। টেংড়াপাড়া, আড়াপাড়া, গোয়াবাড়ি, বিষ্ণবাড়ি, পাঁচবাড়ি, চরকান্দবাড়ি, দক্ষিণবাড়ি, দক্ষিণবাঘাবাড়ি, পশ্চিমবাঘাবাড়ি, পাটকিয়াবাড়ি, আমবাড়িয়া, পাঁচবাড়িয়া, দেবনগর, কালিনগর, ভেল্লাবাড়িয়া, রায়নগর, বনগ্রাম, চৌবাড়িয়া, জাগিয়ালপাড়া, পিপুয়ালপাড়া, দেওবাড়ি, কোলানগর, ছায়েদপাড়া, হাজারাপাড়া ইত্যাদি।

 

খাল,খালিয়া, কালিয়া,কোলা দিয়া গ্রাম

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। যত নদী এখন আছে তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি নদী ছিল ৫০০ বা একহাজার বছর পূর্বে। নদীর বিশেষত্ব এমন যে, দীর্ঘকালে নদী ভরাট হয়ে মরে যায়। অনেক ক্ষেত্রে মরা নদী দীর্ঘকালে খালে পরিণত হয়। নদীতে অনেক সময় প্রয়োজনে খাল কাটতে হয়। নদী বাঁক গ্রহন করলে কোলে পরিণত হয়। খাল সংলগ্ন অনেক গ্রামের নাম খাল, খালিয়া কোলের পাশের গ্রাম কো বা কালিয়া বা কোল। হাজরাখালি, কান্তাখালি, কালুখালি, খালিয়া, বেজকোলা, সুরামখোলা, হিম্মতখালি ইত্যাদি।

 

বিল, ইল, ঝিল, হাওড়, দোহা, দহ পারিচিতিতে গ্রামের নাম ও উৎপত্তি

নদী মরে গেলে বিল হাওড়, দহ, দোহাতে পরিণত হয়। বিলমালেঙ্গা, বিলশ্যামসুন্দরপর, বিলসারিন্দা, বিলচৈত্রা, বিলকোনা, বিলগজারিয়া, বিলজেলা, বিলরঘুয়া, বিলছালুয়া, বিলধামু, বিলটাকাপুড়া, চাষাবিলা, বিলকাউলী, বিলবড়া, ইলাতেল, লবরদোহা, বাউলদোহা, মুচিদহ, বিলচড়া, মরাবিলা ইত্যাদি। রাজবাড়ি জেলার দক্ষিণাঞ্চলে অনেক সংখ্যক বিস্তৃত বিলের অস্তিত্ব ছিল। তেঢালা, গজারিয়া, পাকুড়িয়া, কাছমিয়া ইত্যাদি বিস্তৃত বিলের অঞ্চল ভর অঞ্চল বলে পরিচিত। এসব বিলের শাপলা শালুক এক সময়ে প্রাকৃতিক সৌর্ন্দযের লীলবৈচিত্র বহন করত।

 

 

মাছ, পাখি, পশু, ফল,বৃক্ষ, ফসলের পরিচিতিতে গ্রামের নাম ও উৎপত্তি:

গ্রাম সমাজের বিকাশের ধারায় যখন মানুষ স্থায়ী বসতি গড়ে তুলতে থাকে তখন তা বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিষয়ের পারিচিতিতে নামকরণ হতে থাকে। ঐসব বিষয়ের আধিক্যহেতু ঐ সকল নামে গ্রাম পরিচিত হয়। মহিষ-মহিষাখোলা, বেজি-বেজকোলা, নিম-নিমতলা, কৈ-কৈজুরি, খলিশা-খালিশা, পাঙ্গাস-পাঙ্গাশিয়া, শোল-শৈালকাঠি, বোয়াল-বোয়ালিয়া, শিং-শিঙ্গা, ঘুঘু-ঘুঘুশালি, বাঘ-বাঘমারা, গজার-গজারিয়া, পাট-পাটবাড়িয়া, টেংড়া-টেংড়াপাড়া, আম-আমবাড়িয়া, ভেল্লা-ভেল্লাবাড়িয়া, বাঘ-বাঘাবিষ্ণুপুর ধান-ধানুরিয়া, ঝাউগাছ-ঝউগ্রাম, হলুদ-হলুদবাড়িয়া, মাছ-মাছপাড়া, বেত-বেতবাড়িয়া, বাওই-বাওইখোলা, আখ-আখরজানি, বড়ই-বরইচারা, সরিষা-সরিষা, শামুক-শামুকখোলা, হাতি-হাতিমোহন, বন-বনগ্রাম, ইন্দুর-ইন্দুবদি, মাশুর-মাশুরাডাঙ্গী ইত্যাদি।

 

গ্রামের নাম বাঘ, হরিণ, দিয়া, গ্রামের নামকরণের পেছনে এলাকার প্রাচীনত্ব নির্দেশ করে। সে সাথে একসময় বনজঙ্গলে ঘেরা রাজবাড়ি এলাকায় এসব পশুর বসবাসের অস্তিত্ব প্রমাণ করে। সে সাথে একসময় বনজঙ্গলে ঘেরা রাজবাড়ি এলাকায় এসব পশুর বসবাসের অস্তিত্ব প্রমাণ করে। বলা যায় সেদিন পর্যন্ত অর্থাৎ ২০০০ শতকের মাঝামাঝিতে বন্য শুকরের বসবাস ছিল বিভিন্ন এলাকায়। মীর মশাররফ হোসেনে তাঁর ১২ বছর বয়সে অর্থাৎ ১৮৬০ সালের দিকে যখন কুষ্টিয়া থেকে পদমদি যাতায়াত করতেন সে বর্ণনা তাঁর লেখা ‘আমরা জীবনীগ্রন্থ’-এ পাই। আমার জীবনী গ্রন্থে তিনি চন্দনা নদীর তীরবর্তী বাঘের বসবাসের কথা লিখে গেছেন। যা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। বাঘের অঞ্চলে হরিণের বসবাস সকল স্থানেই দেখা যায়। তাই সে সময় হরিণও এলাকায় বসবাস করত। এ ছাড়া বন্য হাতি, মহিষও বসবাস করত। রজবাড়ি জেলার মধ্যবতী অঞ্চল বিশেষ করে চন্দনা নদী এলাকাই ছিল এদের বসবাসের আড্ডাখানা। কালক্রমে ওসব বন্য প্রাণী দক্ষিণে সরে ‍গিয়ে বর্তমানে সুন্দরবনে স্থান করে নিয়েছে। পাঙ্গাস, ইলিশ, কৈ, মাগুর, শোল, বোয়াল, শিং, খলিশা এসব নামের গ্রাম মৎস্য সম্পদের প্রাচুর্যের নিদর্শন। এসব নামের সাথে গ্রামের প্রাচীনত্ব ‍নিদের্শ করে। এ সব গ্রামের সৃষ্টি ৫০০ বৎসরের বেশি বলে ধারণা করা যায়।

 

ডাঙ্গা অপেক্ষাকৃত উচু ভূমি। বিস্তৃত মাঠের দিকে তাকালে দেখা যাবে সকল স্থানের ভূমি একই সমতল নয়। কোথাও উঁচু কোথাও নিচু। পানির সমতল থেকে উঁচু ভূমিকে ডাঙ্গা আবার চাষযোগ্য অপেক্ষাকৃত উঁচু ভূমিকে ডাঙ্গী বলে। অপেক্ষাকৃত উঁচু ভূমিতে যে সব গ্রাম উঠেছে তা ডাঙ্গা ‍দিয়ে গঠিত হোগলাডাঙ্গী, বেড়াডাঙ্গা, মৃগিডাঙ্গা, বহলাডাঙ্গী ইত্যাদি গ্রামের নাম।

 

চন্দনা-নদী

চন্দনা-নদী

 

  • চন্দনা চলতে পারি মন্দ না
  • চলত যখন চাঁদ সওদাগর
  • করত সবাই বন্দনা।
  • পালের নায়ে ঘোমটা দিয়ে
  • আর চলেনা রঞ্জনা,
  • শীর্ণ বুকে পা রাখে না খঞ্জনা
  • চন্দনা, চলছি দেখ মন্দনা।

চন্দনা বর্তমান পদ্মার একটি শাখা যা পাংশার পাশ দিয়ে প্রবাহিত। কালুখালির দক্ষিণে সোনাপুরের রামদিয়ার মাঝ দিয়ে প্রবাহিত বালিয়াকান্দি হয়ে পাঁচমোহনীতে মেশেছে। এই পাঁচমোহনী চন্দনা, হড়াই, কুমার গড়াইয়ের মিলনস্থল। ড. নীহাররঞ্জন যে চন্দনার গতিপথের বর্ণনা দিয়েছেন তা চন্দনার সঠিক তথ্য বহন করে না। তিনি লিখেছেন চন্দনা পদ্মার গর্ভে ভাগিরথীতে প্রবাহিত। ফ্যানডেন ব্রকেন নকশায় তা যশোরের পশ্চিম দিয়ে প্রবাহিত। প্রকৃত চন্দনা প্রাচীন নদী যা গঙ্গা হতে প্রাবাহিত হয়ে কুমারের সাথে মিশতো। উল্লেখ্য কুমার অতি প্রাচীন নদী এবং বর্তমান চন্দনা পাঁচমোহনীতে কুমারের সাথে মিশেছে। চন্দনা প্রাচীনকালে অনেক প্রশস্ত নদী ছিল।

 

তার প্রমাণ হিসেবে বলা যায় বর্তমান বেলগাছি ও কালুখালির অদূরে চরলক্ষীপুর, চরচিলকা, চরপাড়া, চরবোয়ালিয়া, চরমদাপুর চন্দনা নদীর প্রবাহিত চর। চন্দনার এ প্রবাহের দ্বারা প্রমাণিত হয় চন্দনা অনেক পূর্ব প্রশস্ত নদী। এছাড়া চন্দনা প্রবাহের দুই কান্দায় আড়কান্দি ও বেলেকান্দি। নদি এ সময়ে আড়কান্দি এসে বাঁক নিয়েছিল বলে আড়ে আড়কান্দি আর ডানে বেলেচর বালিয়াকান্দি। আড়াকান্দি আর বালিয়াকান্দির দূরত্ব ২ মাইল প্রায়। নদীর পাড় আরাকান্দি থেকে বালিয়াকান্দি দিকে সরে গিয়েছে। সপ্তদশ শতকে এ নদী যে অনেক বড় নদী ছিল তার আরো বড় প্রমাণ মেলে বঙ্গে রেলভ্রমণ পুস্তকের ১০৯ পৃষ্ঠার বর্ণনা থেকে-‘কালুখালি জংশন থেকে আড়কান্দি স্টেশন ১২ মাইল দূরে। ঐখানে চন্দনা তীরে বাণীবহ নাওয়াড়া চৌধুরীদের নৌকা নির্মাণের প্রধান কারখানা ছিল। ইবনে বতুতা রেহেলা গ্রন্থে তৎকালীন বঙ্গে জাহাজ শিল্পের ব্যাপক উন্নতির বিষয়ে উল্লেখ করেছেন। বার্থেমাও বিভিন্ন প্রকার নৌযান ও বৃহদাকার জাহাজ নির্মাণের কথা বলেছেন।

মঙ্গলকাব্যের নায়কেরা চাঁদ সওদাগর ধনপতি এ অঞ্চলে বাণিজ্য করত। আর সে বাণীজ্যের পথ ছিল (১৪০০ শতকে) এই চন্দনা, হড়াই,গড়াই। ধারণা করা যায় শুধু সপ্তদশ শতকে আড়কান্দিতে বাণীবহের নাওয়াড়াদেরই নৌকা তৈরি হত না এর ২০০ বৎসর পূর্বে সুলতানি আমলে সওদাগরদের জন্য ডিঙ্গা জাহাজ নির্মিত হত। বর্তমানে আড়কান্দির আদূরে তুলশী বরাট নৌকা নির্মাণের ঐতিহ্যবাহী স্থান। তুলশী বরাটের নৌকা এই সেদিন পর্যন্ত এ অঞ্চলের উন্নতমানের নৌকা হিসেবে গৃহীত ছিল। এ গ্রামের অনেক মিস্ত্রির সাথে আলাপ করে জানা যায় এটা তাদের প্রাচীন পূর্বপুরুষের আদি পেশা। চন্দনা নদী এখন মৃত। মীর মশাররফ হোসেনের বর্ণনা থেকে দেখা যায় ১০০ শত বৎসর পূর্বে এটা যথেষ্ট নাব্য ছিল। হযরত সাহ্ পাহলোয়ান এই নদীর উত্তর তীরে ষোড়শ শতকে ধর্ম প্রচারের জন্য সেকাড়া গ্রামে আস্তানা গড়ে তোলেন। বর্তমানে এই নদীর মুখ কেটে এবং খনন করলে হাজার হাজার একর জমি সেচের আওতায় আনা যাবে। রাজবাড়ী জেলের কৃষি, মৎস্য, পর্যটন শিল্পে উন্নয়নের কথা ভাবতে হলে পদ্মা, গড়াই, হড়াই, চন্দনা, চত্রা,সিরাজপুরের হাওড়া নিয়ে ভাবতে হবে। রাজবাড়ীর এই সম্পদ যেমন গর্ব তেমনি উন্নয়ন প্রকল্পের সহায়ক বিষয়।

গ্রামের নামকরণ

গ্রামের নামকরণ

ঐতিহাসিক ও সমাজবিজ্ঞানীদের অনেকেরই অভিমত মানুষ প্রথমে নগর জীবনে অভ্যস্থ হয় এবং পরে গ্রাম জীবনের বিকাশ ঘটে। তবে আধুনিক নগর বলতে যা বোঝায় সে নগর তেমন ছিল না। প্রাকৃতির নানা বৈপরিত্যের কারণে মানুষেরা দল বেঁধে নানা প্রাকৃতিক সম্পদ সস্মদ্ধ নিরাপদ স্থানে বসবাস করত। আমরা নীল, রাইন, পীত, ইউফ্রেটিস, টাইগ্রীস, সিন্ধু, ভলগা, গঙ্গার তীরবর্তী অঞ্চলে প্রাচীন নগর সভ্যতার কথা জানি। পানির সহজ প্রাপ্যতা এবং উর্বর ভূমির কারণেই এ সকল অঞ্চলে নাগরিক জীবন শুরু হয়েছিল। মিশরীয় ও সুমেরীয়, আসিরীয়, মহেঞ্জোদারো, চীনের প্রচীন নগর সভ্যতার বিকাশ তা প্রমাণ করে। নাগরিক জীবন বিকাশের ফলে ফসল উৎপাদনের নিমিত্তে তারা নগর থেকে দূরবর্তী অঞ্চলে স্থায়ী বাস গড়ে তোলে। ফলে গ্রামীণ জীবন বিকাশ ঘটে। বঙ্গে এ বিষয়টি আলাদা বলে মনে করার অনেক কারণ আছে। ঐতিহাসিক সূত্রে প্রতীয়মান হয় গঙ্গার ভাটি অঞ্চলের সমতটীয় বঙ্গের আদিভিত্তি গ্রাম। নগর জীবন গড়ে উঠেছে অনেক পরে। প্রাচীন বঙ্গ, উপবঙ্গ সাগর তথা নদনদীর উত্থিত দ্বীপ ও চর সমষ্টি দ্বারা গঠিত। অসংখ্যা নদ-নদীর প্রবাহ, বিল বাওড়, হওড় জোলা এর প্রমাণ বহন করে। ইউয়ান চেয়াং ষষ্ট শতকে বঙ্গে ভ্রমণ করেন। তার বর্ণনা থেকে বঙ্গে গ্রাম জীবনের ভিত্তির সংবাদ জানা যায়। তখনকার গ্রাম এখন কার গ্রামের মতো ছিল না। উত্থিত দ্বীপ বা চরে জীবন জীবিকার অন্বেষণে মানুষ একসাথে বসবাস করত যা বর্তমান গ্রামের মতো ছিল। ক্রমে ক্রমে নদী সঙ্কুচুত হয়ে পড়ে। বিচ্ছিন্ন দ্বীপ সমষ্টিরুপ ধারণ করে। একাকার হয়ে বিস্তীর্ণ সমতল মাঠ বা প্রান্তরে রুপান্তরিত হয়। সে সব স্থানে জনবসতি গড়ে ওঠে এবং গ্রামীণ জীবনের বিকাশ ঘটে।

বাংলার প্রায় প্রতিটি গ্রামের পূর্বে বা পরে পরিচয়াত্মক শব্দ দেখতে পাওয়া যায়। যেমন পুর, ডাঙ্গা, খালি, দহ, চর, চক, দি, দিয়া, হাট, ঘাট, পাড়া ইত্যাদি। এরমধ্যে পুর অর্থ জনসমাবেশ এবং তা নগর অর্থে ব্যবহৃত হয়। পুর থেকেই পৌর বা নগর বিকাশের ক্ষেত্রে এ পরিচয়াত্মটি শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে। উর, পুর, দি, দিয়া, দিয়াড়া; বিল, নালা এগুলি বাংলায় আদি খাঁটি শব্দ যা অনার্যরা ব্যবহার করত। বঙ্গে আর্য ব্রাক্ষণদের আগমন ঘটে অনেক পর। তার পূর্বে অনার্য অধিবাসীরাই ছিল বঙ্গের অধিবাসী। তবে পুরের পরিচয়ে সকল গ্রামের নাম আদি দ্রাবিড় বা ভোটচীন গোষ্ঠীর দেওয়া নাম নয়। গ্রাম জীবনের বীকাশ ঘটেছে শত শত বছর ধরে। এরমধ্যে মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন, তুর্কী, পাঠান, সুলতান, মোগল, ইংরেজ, পাকিস্তানি শাসন চলেছে। সব কালেই নতুন নতুন গ্রামের উৎপত্তি ঘটেছে। সে ক্ষেত্রে প্রাচীন ব্যবহৃত পুর শব্দটির ব্যবহারের সাথে যোগ হয়েছে খাল, খালি, চর, দহ, দি, দিয়া, গাঁড়া, সারা, গ্রাম, বাড়ি, হাট, বজার, গঞ্জ,তালক, পাড়া, নালা, তলা, এলি, আদ, বাদ, জানি, কান্দা, কান্দি, ডাঙ্গা, লিয়া, ইল, বিল, লাট, লাটি, লি, দা, বাত, বাতান, কন্দ, জনা, ডোরা, ঝোপ, জঙ্গল, বন, ঝুপি, থুপি, তুরি, শিয়া, নগর, রাট ইত্যাদি। আবার গাছের নাম, মাছের নাম, পাখির নামও গ্রামের নাম রয়েছে। গ্রামসমূহের উৎপত্তির দিকে লক্ষ্য করলে দেখার যায় সপ্তম অষ্টম শতক থেকে শাসনতান্ত্রীক কাঠামোর মধ্যে ভুক্তি, বিষয়, মণুল বিথী ও গ্রামের উল্লেখ আছে। আজকে যেমন অনেকগুলি গ্রাম নিয়ে গঠিত হয় ইউনিয়ন, তখন কয়েকটি গ্রাম নিয়ে গঠিত হয় বিথী। কয়েকটি বিথী নিয়ে বিষয়, কয়েকটি বিষয় নিয়ে মণুল, কয়েকটি মণুল নিয়ে গঠিত হত ভুক্তি। অত্র এলাকায় স্ময়টি পদ্মাবতী বিষয়, বারক মণুল,কুমার তালক মণুল ইত্যাদির সংবাদ পাওয়া যায়। রাজবাড়ীর গ্রামগুলির উৎপত্তিকাল ঠিক কাখন থেকে তা সুনির্দিষ্ট করে বলা না গেলেও ইউয়ান চোয়াং বাংলায় যে ৩০টি বৌদ্ধ সংঘারামের কথা বলেছেন তার মধ্যে একটির অবস্থান নির্ণীত হয়েছে পাংশায় (পুরাত্ত্ববিদ পরেশনাথ বন্দ্যোপাধায়) । বৌধ ধর্মের বিকশকাল খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৫০০ খ্রিস্টীয় শতক পূর্বে থেকে ৭ম/৮ম শতকের পাল শাসন পর্যন্ত সুদীর্ঘ প্রায় এক হাজার বছর। ইউয়ান চোয়াং যে বৌদ্ধসংঘারামের কথা বলেছিলেন সে সব বৌদ্ধ সংঘারাস নিশ্চয়ই ষষ্ঠ শতকের অনেক পূর্বে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকবে। সে কারণে বলা যায় পাংশায় যে বৌদ্ধসংঘারাম ছিল তা হয়তো ১ম/২য় শতক হতে বা তার পূর্বে বা পরেও হতে পারে। তবে নিশ্চয়ই ষষ্ঠ শতকের অনেক পূর্বে। তাই রাজবাড়ির জেলের গ্রামের ভিত্তি খ্রিস্টীয় ১ম শতক বা তার পূর্ব থেকেই বিকাশ লাভ করে।

আরো একটি নিদর্শন রাজবাড়ি জেলার গ্রামবসতির প্রাচীনত্বের স্বাক্ষর বহন করে। ২০০১ সালে বালিয়াকান্দি থানার ইসলামপুর ইউনিয়নের তেঘারী গ্রামে পুকুর খনন কালে কষ্টিপাথরের তৈরি একটি বিষ্ণুমূর্তি পাওয়া যায়। মূর্তিটি বর্তমানে ঢাকা জাদুঘরে আছে। উল্লেখ্য গুপ্তরাজগণ হিন্দুতান্ত্রীক এবং কেহ কেহ পরম বৈষ্ণর ছিলেন। বালাদিত্য বৌদ্ধ ছিলেন। সমুদ্রগুপ্ত ও দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তে সময় বিষ্ণমূর্তি পূজাপদ্ধতি বিশেষভাবে প্রচলিত হয়। স্কন্ধগুপ্তের সময় বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি তারা আকৃষ্ট হয়। আমাদের দেশে যে সকল সুন্দর চতুর্ভুজ বাসুদেব প্রকৃতি বিষ্ণুমূর্তি দৃষ্ট হয় তার কতকগুলি গুপ্ত যুগে এবং কতগুলি সেন যুগে প্রতিষ্ঠিত হয়। পদ্মাবতি বিষয়, বারক মণুল, কুমার তালক মণুল, পাংশায় বৌদ্ধ সংঘারাম, তেঘারির বিষ্ণুমূর্তি এবং ১০৫৬ টি গ্রামে এরমধ্যে প্রায় ২০০টি পুর, দি, দিয়া, হওয়ায় বলা যায় গুপ্ত যুগ থেকেই ব্যাপকভাবে গ্রামসমূহের বিকাশ ঘটে।

রাজবাড়ি জেলার গ্রাম সকলের পূর্বে বা পরে পরিচায়ত্মক শব্দ হিসেবে পুর, দি,দিয়া, ধিয়া,লায়া, গাতি, কান্দা, বাড়ি, বাড়িয়া, গ্রাম, পাড়া, নগর, খাল, খালিয়া, কালিয়া, কোলা, বিল, ইল, হাওড়, কোল, দোহা, দহ, কোল, লেঙ্গা, লেঙ্গি, রেন্দা, উরি, কুড়ি, উলি, লুন্দি, কাউল, কাচু, দিলা, গিলা, মংলায়, বঙলট, ত্রিচট, পেটট, মাছের নাম, গাছের নাম, ফলের নাম, ফসলের নাম, ডাঙ্গা, ডাঙ্গী, বুনিয়া, হাট, গঞ্জ, চক, কশবা, চর, ভর, দহ, এলা, তলী ইত্যাদি রয়েছে। নামের পূর্বে বা পরে এমন পরিচয়াত্মক শব্দের আলোকে রাজবাড়ির গ্রামসমূহের উৎপত্তির ধারাবাহিকতা জানা যায়।

রাজবাড়ি জেলা প্রাচীন যশোর খুলনা সংলগ্ন হওয়ায় তা উপবঙ্গের অংশ বিশেষ। উপবঙ্গ গঙ্গার ভাটির অঞ্চলের উত্থিত দ্বীপসমূহের সমষ্টি। গঙ্গা তার বিভিন্ন শাখা উপশাখার প্রবাহিত হওয়ায় ভাটিতে উত্থিত হয় ঐ সকল দ্বীপ। দ্বীপসমূহে জনবসতি গড়ে ওঠার কারনে জনপদের সৃষ্টি হয়। রাজবাড়ি জেলা গঙ্গা মুখের অপেক্ষাকৃত কাছাকাছি থাকায় বঙ্গের দক্ষিণ অঞ্চলে থেকে জনবসতি তুলনামূলক আগে হওয়াই স্বাভাবিক। তবে জেলাটির বিশেষত্ব এমনই যে এর উত্তর দিকে পদ্মা ও দক্ষিণের গড়াই এবং মধ্য প্রবাহিত হড়াই, চন্দনাসহ আরো অনেক নদী।  প্রবহিত নদনদীর বাঁকে বাঁকে বিচ্ছিন্নভাবে দ্বীপের সৃষ্টি হতে থাকে। বর্তমান পদ্মা ও গড়াই সংলগ্ন অনেক গ্রামের আগে বা পরে পরিচয়াত্বক শব্দ চর থাকলেও প্রাচীনকালের উত্থিত চরাঞ্চল জনপদ চরের পরিচয়ে পরিচিত হত না। নদী মরে গেলে নাল, খাল, বিলে পরিণত হয়। এ কারণে অনেক গ্রামের নামের পরিচয়ে নালা, খাল, বিল, ঝিল, হাওড়, বাওর দেখা যায়। অনেক নামের পূর্বে মাছের নাম , পাখির নাম, পশুর নাম, দেখা যায়। তবে জেলার গ্রামসমূহের নামের পরিচয়াত্মক বিশেষত্ব হল অনেক বেশি গ্রামের নামের পরিচয়ে পুরের ব্যবহার। তুলনামূলক যশোর খুলনাতে খালি, কাটি, কাটা, দহ, চর, তলা, তলী, গাছ, গাছি বেশি দেখা যায়।

ইতিপূর্বে বলা হয়েছে রাজবড়ি জেলার পুর দিয়ে গ্রামের নাম বেশি। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিম্নরুপ হওয়ার বিষয় যুক্তিযুক্ত মনে করা যায়। প্রাচীন জনপদ গড়ে ওঠার বিষয়ে বলা যেতে পারে রাজবাড়ি জেলার প্রাচীন উত্থিত এবং দ্বীপসমূহ রাজবাড়ি জেলার বালিয়াকন্দি, আড়াকান্দি, নলিয়া, জামালপুর, বহরপুর, সোনাপুর, পদমদি, রামদিয়া, রাজধারপুর, বসন্দপুর সুলতানপুর, পাংশা, নারায়ণপুর অঞ্চলসমূহ।

এসব প্রাচীন জনপদের পদ্মা, হড়াই,গড়াই,চন্দনা, কুমার, কাজলী, সুতা, ফুরসুলা নদীর বাঁকে বাঁকে উত্থিত দ্বীপের ও চরের অঞ্চলে প্রাচীন বসতি গড়ে ওঠে। এ সব অঞ্চলে জনপদ গড়ে ওঠার ফলে ধীরে ধীরে প্রাচীন গ্রাম প্রাচীন ব্যবহৃত পুর, কান্দি, দি, দিয়া, দ্রাবিড় ব্যবহৃত শব্দ যোগ হয়েছে।

হড়াই-নদী

হড়াই-নদীর-ভাঙ্গাগড়ার খেলা

নদ-নদী

পদ্মা, গড়াই, হড়াই, চন্দনা বাহিত পলি, কাঁকর দিয়ে সৃষ্টি রাজবাড়ী জেলা। রাজবাড়ী প্রধান ঐতিহ্য এককালের রুপালি ইলিশ। আজও রাজবাড়ী অঞ্চলের মানুষের জীবন পরিচালিত হচ্ছে এ সব নদনদীর প্রভাবে। সঙ্গত কারণেই এ সব নদনদীর অতীত স্রোতধারা, তার জন্মকাল জানতে ইচ্ছে করে। জানতে ইচ্ছে করে এর ভাঙ্গাগড়ার খেলা।

সব নদী খান খান

হড়াই নদী সাবধান

এ প্রবাদটি রাজবাড়ী জেলার বেলগাছি, কালুখালি, মদাপুর, সূর্যনগর, রাজবাড়ী, বাণীবহতে বহুল প্রচলিত। প্রবাদটি। প্রবাদটি নাকি উৎসারিত হয়েছিল চতুর্দশ শতকের মঙ্গল কাব্যের নায়ক চাঁদ সওদাগরের মায়ের মুখ থেকে। কথা থেকে বোঝা যায় চাঁদ সওদাগরের মা তাকে সাবধান করেছিল বেগবান খরস্রোতা নদী থেকে তা সত্ত্বেও চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙ্গা নিমজ্জিত হয় বেগগাছির অদূরে হড়াইতে। সে স্থানাটি কয়েকটি উঁচু ঢিবি দেখা যায় যাকে এ অঞ্চলের মানুষ চাঁদ সওদাগরের ঢিবি বলে। এ কাহিনীর সত্যতার সাথে চাঁদ সওদাগরের কাহেনী আজ ঐতিহাসিক সত্য বলে পরিচিতি লাভ করেছে। সকল মঙ্গল কাব্যেরই নায়ক সওদাগর। এ মধ্যে চাঁদ সওদাগর, ধনপতি ও তার পুত্র শ্রীমন্ত অন্যতম। চাঁদ সওদাগরের ছিল সপ্তডিঙ্গা আর ধনপতির চৌদ্দডিঙ্গা। তাদের প্রধান ডিঙ্গার নাম ছিল মধুকর। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তারা ব্যবসার উদ্দেশ্যে সমুদ্র যাত্রা করত। চাঁদ সওদাগরের বাড়ি বর্তমান বগুড়া। মঙ্গল খাতে কলিদহের সাগর বলে পরিচিত। ধনপতি ছিলেন হুগলী অঞ্চলের। ড. নীহাররঞ্জন চাঁদ সওদাগরের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে চাঁদ সওদাগরের বাণীজ্যতরী বাজখানি রামেশ্বর পার হইয়া সাগর মুখের দিকে অগ্রসর হইতেছে। পথে পড়িতেছে অজয় নদী, উজানী, পূর্বে কাকীনাড়া, মূলজোড়া, আড়িয়াসহ চিত্রাপুর।

চাঁদ সওদাগরের কাহিনী বর্তমানে ইতিহাসের উপাদান তবে চাঁদ সাওদাগরের সপ্তডুঙ্গা যে এখানে নিমজ্জিত হয় তার সত্যতা কী? হড়াই নদীর প্রবাহ বর্ণনায় হয়ত এ সত্যতা ঐতিহাসিক আলোচনার বিষয় হতে পারে। বর্তমানে মৃত হড়াই নদীর পদ্মা উৎসারিত হয়ে বেলগাছির পশ্চিম দিক দিয়ে বাণীবহের দক্ষিণ দিয়ে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে পাঁচ মোহনীতে হড়াই, চন্দনা, গড়াই, কুমার একাকার। পদ্মা নদীর প্রাচীনত্ব ও প্রবাহ বর্ণনায় যতদূর জানা গেছে পদ্মা ষোড়শ ও সপ্তদশ শতক থেকে প্রবল হয়েছে। এর পূর্বে অর্থৎ চতুর্দশ বা তৎপূর্বে এর প্রবাহ প্রবলতার ইতিহাস নাই।

এদিকে গঙ্গার প্রাচীনত্ব অনেক পূর্বে যার প্রভাবে বাংলার সমতটীয় বদ্বীপের উত্থান। ত্রয়োদশ চতুর্দশ শতকে পদ্মার প্রবলতা না থাকায় গঙ্গার ধারা তখন কুমার, মাথাভাঙ্গা, জলঙ্গী, গড়াই, হড়াই দিয়ে প্রবাহিত হত। কুমার, মাথাভাঙ্গা বহু পূর্বে যশোন খুলনা দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় সে সব অঞ্চলের বদ্বীপ বর্তমান পরিণত ও জয়িষ্ণু বদ্বীপ। ঐ অঞ্চলে জলাধার ও বিল বাওড়া এর প্রমাণ বহণ করে। গঙ্গার মুখে ত্রয়োদশ চর্তুর্দশ শতকে এবং তারও পূর্বে যে সমস্ত নদীপ্রবাহ দ্বারা গঙ্গার বিপুল জলরাশি বাহিত হত তা কুমার, গড়াই, চন্দনা, জলঙ্গী, মাথাভাঙ্গা, হড়াই। হড়াই প্রাচীন নদী। অন্যদিকে করতোয়া বাংলার উত্তর বঙ্গের মধ্যে দিয়ে দক্ষিণগামী। করতোয়াই প্রবাহ-ই হড়াই দিয়ে প্রবাহিত হত। এ থেকে অনুমান করা যায় হড়াই তৎকালীন সময়ে এ অঞ্চলে বেগবান নদী ছিল। বর্তমান মাটিপাড়া পিঁজেঘাটা বলে পরিচিত স্থানে যে বিলের আকার দেখতে পাওয়া যায় তা হড়াইয়ের প্রাচীন প্রবাহ।

‘পিজেঘাটার ভাটিতে রাধাগঞ্জে বিল ছিল রাধাগঞ্জ বন্দর’ (ফরিদপুরের ইতিহাস, আনন্দনাথ রায়) । উল্লেখ্য নদী তার পতি বদলালে পরিত্যক্ত নদী প্রথমে কোল ও মৃত নদী পরে বিল বাওড়ে পরিণত হয়। দশম, একাদশ শতাব্দীতে বা তারও পরে হড়াই নদী হিসেবে প্রবাহিত ছিল যার প্রশস্ততা দুই/তিন মাইল। পরে তা দুটি ধারায় প্রবাহিত হয়েছে। একটি পিঁজেঘাটা দিয়ে অন্যটি বর্তমান হড়াইয়ের প্রবাহ দিয়ে। ত্রয়োদশ চতুর্দশ শতকে ভূষণা (বর্তমান মধুখালির অদূরে) সমৃদ্ধ নগর ও বন্দর ছিল। এখানকার উন্নতমানের সূতিবস্ত্রের সুনাম দেশে বিদেশে ছড়িয়ে গিয়েছিল।

 

‘শখের পালঙ্ক’

মূলঘর ও পালঙ্ক কাহিনী

‘শখের পালঙ্ক’ শিরোনামে দৈনিক পত্রিকার পাতায় একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। পালঙ্কটি অনেক বছর পূর্বে জাতিয় জাদুঘরকর্তৃক রাজবাড়ী জেল থেকে সংগৃহীত হয়। বর্ণনানুসারে কাঠ, লোহা, কাচ ও কাপড় দিয়ে তৈরি গোটা খাটটি চারটি বাঘের থাবার উপর দাঁড়িয়ে আছে। থাবার উপরিভাগে টুলের অনুরুপ প্রায় বৃত্তাকার পাটাতনের উপর একটি হস্তি শাবক। তার পিঠের উপর একটি সিংহ শাবক আক্রমণোদ্যত ভঙ্গিতে দুই পা দিয়ে হস্তির শুঁর আঁকাড়ে ধরে আছে। সিংহ শাবকটিকে আবার ঠোকরাচ্ছে একটি উড়ন্ত গরুড় পাখি। জোড়াবিহীন কাঠের বাঘের থাবার উপর পর পর তিনটি জীব জানোয়ারের ফিগার অনুপম সৌন্দর্য দান করেছে। গোটা পালঙ্কটি চারপায়াসদৃশ্য চার খুঁটির উপর ন্যাস্ত। বিশাল পাটাতন, পাটাতনটির বেদ আনুমানিক দেড়ফুট। ভেলভেট কাপড় আচ্ছাদিত নরম বিছানা। চার পায়ার উপর নৃত্যরত ভঙিমায় দাঁড়ানো কম বয়সী চার নগ্ন রমণী। নগ্নিকা রমণীর ডানহাত স্পর্শ করে আছে মশারীর স্ট্যান্ড। শয্যায় উঠার জন্য তিন ধাপ বিশিষ্ট আলাদা ছোট সিঁড়ি। বিছানার প্রবেশপথে অতন্দ্র প্রহরীর মতো বসে আছে দুটি সিংহ। পাটাতনের কাঠামোতে লোকজ চিত্রকর্ম, ফুল লতাপাতার অলঙ্করণ। শিয়য়ের ডানে ও বাঁয়ে হস্তিশাবকের কাছেই দু’জন তরুণী। পালঙ্কটির শিরোভাগে প্রসাধনী সামগ্রী রাখার জন্য আছে একটি কাঠের বাক্স। এ খাটের মালিক কোনো সুরুচিবোধের জমিদার সে খোঁজ করতে করতে পাওয়া গেল মূলঘর জমিদার বংশের ইতিহাস। খাটটির মালিক ছিলেন মূলঘরের কোনো এক ভূমিপতি। নবাব, মোগল ও ইংরেজ শাসনকালে বঙ্গে আচার্য, বৈদ্য, কাশ্যপ, মজুমদার, রায়, রায়বাহাদুর, মুন্সি, রায়চৌধুরী, সেন ইত্যাদি জমিদার বংশের বিকাশ ঘটে। এরা,রায়বাহাদুর, মুন্সি, রায়চৌধুরী, সেন ইত্যাদি জমিদার বংশের বিকাশ ঘটে। এরা বিত্তে, শিক্ষায়, শাস্ত্রে উচ্চবংশীয় হিন্দু। তাদের মধ্যে সুরুযপারী গ্রহবিপ্রগণ বেদ-বেদান্ত, জ্যোতিষশাস্ত্র চর্চাকারী শাস্ত্রীয় সুপণ্ডিত। ভক্তি, শোধন, সাধনে সদা সর্বদা নিয়োজিত। তৎকালীন ফরিপুর জেলার গোয়ালন্দ মহকুমার (রাজবাড়ী জেলা) মূলঘর, দ্বাদশী, পাঁচথুপী, খালকুলায় তাদের বসতি গড়ে ওঠে।

প্রায় চারশত বছর পূর্বে কাশ্যপ গোত্রীয় মধুসূদন উপাধ্যায় নামক এক জ্যোর্তিবিদ পন্ডিত এ বংশের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি পঞ্চকোটের রাজার সভাপন্ডিত ছিলেন। সপ্তদশ শতকের প্রারম্ভে চন্দ্রনাথ তীর্থ দর্শন শেষে পঞ্চকোটে প্রত্যাগমণকালে ভূষণার মুকুন্দরাম রায়ের সভায় উপস্থিত হন। সঙ্গে ছিলেন পুত্র বিশ্বরুপ। মধুসূদনের মতই যুবক পুত্র সুপন্ডিত ছিলেন। জ্যোতিষশাস্ত্রে তিদের অগাধ পান্ডিত্য ছিল। মুকন্দরামের সভায় এরুপ মহাপন্ডিতের অভাব ছিল। মুকুন্দরাম তাঁকে সভায় থেকে যওয়ার অনুরোধ করেন। মধুসূদন তাতে রাজী হন না তবে পুত্র বিশ্বরুপকে প্রেরণ করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। মধুসূদন পঞ্চকোর্ট ফিরে পুত্রকে স্বীয় আরাধ্য বাসুদেবসহ ভূষাণায় প্রেরণ করেন। মুকুন্দরাম চন্দনা নদীর তীরে পাঁচশত বিঘা ব্রক্ষত্রা ভূমিসহ বিশ্বরুপকে বাসস্থান প্রদান করেন। বাসুদেব বিগ্রহের নামানুসারে স্থানটির নাম হয় বাসুদেবপুর। এ স্থানটি এখন ব্যাসপুর নামে খ্যাত। বিশ্বরুপের অধস্তন একাদশ পরুষ মহাদেব আচার্য। তিনি মহাদেব ঠাকুর নামে বিখ্যাত ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন সাধক। অতঃপর ব্যাসপুরের কিছু অংশ চন্দনাগর্ভে বিলীন হলে তিনি বর্তমান মূলঘর গ্রামে কিছুদিনের জন্য বসতি স্থাপন করেন। পরে মহাদেব আচার্য সীতারাম কর্তৃক শিবত্রা ও ব্রক্ষত্রা পাঁচষশত বুঘাপ্রাপ্ত জমি দান সূত্রে পাওয়া এবং সীতারামের অনুরোধে চন্দনা নদীর তীরে বাগাট গ্রামে বসবাস করেন। তবে মূলঘেরর সরুজপারী গ্রহবিপ্রকূলের রামকন্ত আর্চাযের পূর্বে পুরুষেরা মূলঘরে থেকে যায়। এই রামকান্ত আচার্যের পূর্ববংশীয় সুরুজপারীসকল, ষ্ফটিক পাথরের একটি সূর্যমূর্তি ও দামোদর নামক এক নারায়ণমূর্তির সেবা করতেন। সূর্যমূর্তিটি ছিল গোলাকার। প্রতিদিন পূজার পূর্বে চন্দন দিয়ে ধৌত করার পর অপূর্ব রশ্মি নির্গত হত। কোন যুগে বা কোথা থেকে এমন উজ্জ্বল ষ্ফটিক পাথরের মূর্তি আনা হয়েছিল তা জানা যায় না। অন্য আর একটি মূর্তি দামোদরমূর্তি। দামোদর প্রকান্ড নারায়ণমূর্তি। এই মূর্তিটি ছিল বেশ ভারি। বিগ্রহ দুটির জন্য তৎকালীন রাজারা প্রচুর সম্পত্তি দেবত্রা ও ব্রক্ষত্রা হিসেবে দান করেন। রাজা সীতারামের রাজ্যের অধীন এ অঞ্চলটি সীতারামের মৃত্যুর পর নাটোর রাজা রামজীবন এর জমিদারীপ্রাপ্ত হন। তিনিও ২৫ বিঘা দেবত্র সম্পত্তি তাম্রপাত্রে লিখে রামকান্ত আচার্যকে দান করেন। রামকান্তের বংশের অধস্তন পুরুষ পুত্রহীন হওয়ায় দ্বাদশীর ভরদ্বাজ গোষ্ঠীর হরিপ্রসাদ ঐ বংশের একমাত্র কন্যাকে বিবাহ করে মূলঘরবাসী হন। তাঁর বংশধরেরা উক্ত বিপুল পরিমান ব্রক্ষত্রা, দেবত্র সম্পত্তি ভোগ দখল করে আসছিলেন। তখন ফরিদপুর জেলা প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি। ঐ সকল জমি যশোর জেলার অধীন ছিল। কিছু জমি বেদখল হয়। ঐ বংশের গোলকচন্দ্র সে সব জমি উদ্ধার করেন।

প্রাচীন এই গ্রামের প্রাচীন নির্দশন হিসেবে বড় বড় দিঘিকা (দিঘি) দেখা যায়। আচার্য মহাশয়দের বিস্তৃত ভূমি ছিল অরণ্যাকার। নিবিড় অরণ্যসম স্থানে বৃক্ষরাজি, গভীর জলাশয়, দামদল ফসলের মাঠ এক অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যভূমি। এ সব জলাশয়ে কুম্ভীর ও বনে ব্যাঘ্র বাস করত। আম, কাঁঠাল, শুপারি ফলবন বৃক্ষের আস্বাদনের ছায়ায় শিল্প চর্চায় নুবৃত্ত কোনো সুরুচিবান আচার্য প্রাকৃতিক পরিবেশের ব্যাঘ্র, হাতি, এবং নানা জীব জানোয়ারের প্রতীক নিয়ে ঐ অনুপম সৌন্দর্যের খাট নির্মাণ করেন। ইতিহাসের ঘটনা প্রবাহে খানখানাপুরের জামিদার মাখন বাবু খাটটির মালিক হন। এরপর মাখন বাবুর নিকট থেকে খাটটি আসে গোয়ালন্দ নিবাসী মোস্তফা সাহেবের ঘরে । মোস্তফা সাহেবের নিকট থেকে ঢাকা জাদুঘর খাটটি অধিগ্রহণ করে।

রাজবিড়ি জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য (পৃষ্ঠা-১২৮)

বাংলার দ্বারপথ গোয়ালন্দ

বাংলার দ্বারপথ গোয়ালন্দ-প্রাচীন গোয়ালন্দ ঘাটের ইতিহাস

বাংলাদেশে প্রারম্ভিক (১৯৭১-১৯৮৪) শাসনকালের সাবেক গোয়ালন্দ মহকুমাই বর্তমান রাজবাড়ী জেলা।  ইতিহাস ঐতিহ্যে গোয়ালন্দ বাংলাদেশের বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। মোগল ও বৃটিশ শাসন কালে ঢাকা, দিল্লী, কলিকাতা তথা পূর্ববাংলা ও সমগ্র ভারতবর্ষের যাতায়াত পথ ছিল গোয়ালন্দ। এ কারণে বৃটিশ শাসন কালে গোয়ালন্দ কেবল বৃহৎ গঞ্জই নয় বাংলার দ্বারপথ (Get way of Bengal) বলে খ্যাতি লাভ করে। স্থাল পথে কলিকাতা ও গোয়ালন্দের সংযোগ থাকায় প্রমত্তা পদ্মা পাড় হয়ে বাংলার পূর্ব সীমান্তের যাতায়াতে গোয়ালন্দই ছিল প্রবেশ পথ। ১৮৭১ সালে রেলপথ স্থাপন করা হলে গোয়ালন্দের গুরুত্ব অধিক মাত্রায় বেড়ে যায়। সারা ভারতবর্ষে গোয়ালন্দ একক নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। গোয়ালন্দ-দৌলতদিয়া ঘাট এখনো স্থলপথে বাংলাদেশের দক্ষিণের পথ। ঢাকা থেকে ফরিদপুর, বরিশাল, খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া এবং স্থলপথে কলিকাতা যেতে দৌলতদিয়া ঘাট পাড় হয়ে যেতে হয়।

 

প্রাচীনতার দিক থেকে পদ্ম ও যমুনার মিলনস্থল গোয়ালন্দ ইতিহাসের পাতায় চিহ্নিত। পদ্মার ভাঙ্গা গড়ার সাথে এর নানারুপ উত্থান ও পতন। কখনো গোয়ালন্দ রেল, স্টিমার, লঞ্চ, নৌকার হাজার মানুষের ভিড়ে রুপনগরী আবার কখনো প্রমত্ত পদ্মার ভাঙ্গনে, প্লাবনে পরিত্যক্ত ভূমি। এ পথেই সম্রাট বাহাদুর শাহকে পাঠান হয় রেঙ্গুনে। এ পথেই গমনাগমন করেছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম। এখানেই আস্তানা গড়ে তুলেছেলেন অমর গ্রন্থ ‘মরু তীর্থ হিংলাজে’র লেখক অবধূত। আট হাজারী দ্বিপ বলে ইতিহাস খ্যাত গোয়ালন্দের পটভূমিতেই মানিক বন্দ্যোপাধায় লিখেছেন বহুল আলোচিত উপন্যাস, পদ্মা নদীর মাঝি।

 

‘একদিন গোয়ালন্দে অধরের সঙ্গে কুবেরের দেখা হয়ে গেল। অধর বলিল, কয়েকদিন আগে কপিলা চরডাঙ্গায় আসিয়াছে কিছুদিন থাকিবে। পদ্মা নদীর মাঝি পৃষ্ঠা-১৬৫।

এ উপন্যাসটি বর্তমানে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্য। গোয়ালন্দের ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণে কলম ধরেছেন ঐতিহাসিক আনন্দনাথ রায়, রমেশ চন্দ্র মজুমদার, ডব্লিউ হান্টার। সরকারিভাবে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ারে ঘুরে ফিরে এসেছে ঘোয়ালন্ধের নাম।

১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালীশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় নসীবশাহী পরগনা এবং গোয়ালন্দ থানা হিসেবে যশোর কালেক্টরীর অন্তর্ভুক্ত হয়। নসীবশাহীর পরগনার আয়তন ছিল ৪৩০৯ একর এবং রাজস্ব নির্ধারিতত ছিল ১৫৮২১ টাকা (Faridpur District Gazetteer page 270)। মোগল শাসনকালে প্রাচীন ‘রাজগঞ্জ’ কখনো পর্তুগীজদের মুখে ‘গোয়ালীশ মুখে ‘গোয়ালীশ ল্যান্ড, কখনো জামালপুরে ইংরেজদের মুখে গ্যাংঞ্জেজ বন্দর । অবশ্য নদী ভাঙ্গনের কারণে গোদার বাজার, লক্ষ্মীকোল, লালগোলা, তেনাপচা, দুর্গাপুর, উড়াকান্দা, পুরশাহাট ঘাট পরিবর্তন হলেও গোয়ালন্দ নামেই এসব ঘাট পরিচয় বহন করে। ভাঙ্গনের বর্ণনায় ঐতিহাসিক রমেশ চন্দ্র মজুমদার লিখেছেন, বর্তমান শতাব্দি (বিংশ) আরম্ভ হইতে প্রথমে ছাত্র ও পরে শিক্ষকরুপে বহুবার স্টিমারে পদ্মা নদী দিয়া ঢাকা গিয়াছি। প্রথম প্রথম রাজবাড়ীর মঠ একটি দর্শনীয় উচ্চ চূড়া সৌধ দৃষ্টিগোচর হইত। একবার ইহার  ধার দিয়া আসিলাম কিন্তু ফিরিবার সময় তাহার দর্শন মিলিল না। বহু নগরী গ্রাম মন্দির প্রভৃতির ন্যায় এই মঠটি পদ্মার গর্ভে বিলীন হইয়াছে।  (রমেশ চন্দ্র মজুমদার প্রথম খন্ড-পৃষ্ঠা-৩)।

১৭৯৩ সালে গোয়ালন্দ থানা হিসেবে যশোরের সাথে যুক্ত হলেও গোয়ালন্দ স্থান হিসেবে এর পূর্ব পরিচিত ছিল। গোয়ালন্দ নামের পিছনে লোক মুখে নানা কথা প্রচলিত আছে। এক সময় এ অঞ্চল পর্তুগীজ, মগ, ফিরিঙ্গা জলদস্যু কবলিত ছিল। পর্তুগীজ জলদস্যু নেতা সেবাসটিয়ান গঞ্জালেশের একটি আস্তানা ছিল নদী তীরবর্তী গোয়ালন্দের কোনো স্থানে। লোকমুখে প্রচলিত গঞ্জালেশের নাম অনুসারে অপভ্রংশে গোয়ালন্দ নামরে উৎপত্তি। এক সময় গোয়ালন্দের দুগ্ধ ও মিষ্টান্ন উৎপাদনের খ্যাতি ছিল। পদ্মা পাড়ের গো-খাদ্যের প্রাচুর্য এবং বিস্তীর্ণ অনাবাদী চরাঞ্চলে গোয়ালারা দুগ্ধ উৎপত্তি। ঐতিহাসিক সূত্রে প্রাচীন রাজগঞ্জ ইংরেজ ও পর্তুগীজ বণিকদের মুখে ব্যবহৃত ‘গোয়ালীশ ল্যান্ড’ থেকে গোয়ালন্দ নামের উৎপত্তি। বার ভূঁইয়া জমিদার চাঁদ রায় ও তৎপুত্র কেদার রায়ের রাজ্য বিক্রমপুর, ঢাকা, ফরিদপুর ও বরিশালের অংশবিশেষে বিস্তৃতি লাভ করে। এ রাজ্য মকিমাবাদ, বিক্রমপুর ও রাজনগর পরগনায় বিভক্ত ছিল।  (আনন্দনাথ রায়ের ফরিদপুরের ইতিহাস, ডঃ তপন বাগচী সম্পাদিত, পৃষ্ঠা-১০০) রাজনগর পরগনা পদ্মা ও কালীগঙ্গা নদীর সঙ্গমস্থলের দক্ষিণ পূর্ব দিকে অবস্থিত ছিল। (বিক্রমপুরের ইতিহাস, যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত, পৃষ্ঠা-২০)। ফরিদপুরের পদ্মা তীরবর্তী উত্তর পর্ব অংশ রাজনগর পরগনার অন্তর্ভুক্ত ছিল।

 

কীর্তিনাশার (পদ্মার অপর নাম) দক্ষিণ তীরস্থ স্থানগুলি ফরিদপুরের অন্তর্গত হওয়ায় উহা

দক্ষিণ বিশেষণে বিশিষ্ট হইয়া দক্ষিণ বিক্রমপুর নামে অভিহিত (আনন্দনাথ রায় পৃষ্ঠা-১০২)। মোগল সম্রাট আকবরের সময় থেকে চাঁদ রায় দক্ষিণ বিক্রমপুরের শ্রীপুর নগরে রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেন এবং রাজনগর পরগনার রাজকার্য পরিচালনা করেন। Thus Rajnagar, the dominant in the south east, in the eighteen century, was curved out of the Haveli Dacca. Bikrampur and Solimabad and it continuasly got accession of territory until the end of the century. (Faridpur Gazetteer-page 209).

এ সময় রাজনগর পরগনার রাজকার্য পরিচালনার অন্তর্ভুক্ত পদ্মা তীরবর্তী অঞ্চলের রাজস্ব আদায়ের তহশীল অফিস ছিল বর্তমান রাজবাড়ির উড়াকান্দা বরাবর উত্তরে অবিস্থত- রাজগঞ্জে। পদ্মার ভাঙ্গা গড়ায় রাজগঞ্জ এখন নদীরগর্ভে। (আনন্দনাথ রায় লিখিত ফরিদপুর ইতিহাসে দ্বিতিয় খন্ড প্রকাশিত, ১২৪ পৃষ্ঠায় রাজবাড়ি থানার গ্রামসমূহের তালিকায় ‘রাজগঞ্জ’ গ্রামের নাম উল্লেখ আছে) এখানেই ছিল বিক্রমপুর/রাজনগর পরগনার তহশীল অফিস ও তাদের প্রশাসনিক কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু (রাজবাড়ি মুক্তিযুদ্ধে ড. মোঃ আব্দুস সাত্তার, পৃষ্ঠা-১৯)। সে সময় পর্তুগীজ ইংরেজ বণিকদর এদেশে আগমন ঘটেছে। রাজগঞ্জ তখন ঢাকা, বিক্রমপুরের সংযোগ নদীপথ হিসেবে বিবেচিত হত। রাজগঞ্জ অত্র অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এ পথে বৃহৎ নৌযানে পন্য আনা নেওয়া হত। পূর্ববাংলার ব্যবসা বাণিজ্যের মনোরম বন্দর রাজগঞ্জে প্রতি পর্তুগীজ ও ইংরেজ বণিকরা আকৃষ্ট হয়ে এখানে যাতায়াত করতে থাকে। বাণিজ্যের উদেশ্যে রাজগঞ্জ হয়ে ঢাকা কলিকাতা তারা যাতায়াত করে। পদ্মাতীরের রাজগঞ্জ ছিল খাওয়া ও থাকার সুভল স্থান। বিশেষ করে পদ্মার পলল মাটিতে উৎপন্ন ধান,শাকসবজি ও পদ্মার ইলিশসহ নানা জাতের মাছ ছিল সুলভ ও সুস্বাদু খাবারের উৎস। হোটেলগুলো খাবারের  একটা বিশেষ রীতি মেনে চলত আর তা হল, পেটচুক্তি খাবার। খদ্দের তার পছন্দ মতো ভাত, মাছ, মাংস, সবজি যত পরিমাণই খাবে না কেন, একটা ন্যুনতম দাম দিলেই চলবে।

 

এ ব্যবস্থা চল্লিশ বছর পূর্বেও রাজবাড়ির হোটেলগুলোতে চালু ছিল। আমি ছাত্র থাকাকালীন বর্তমান রেলগেট সংলগ্ন ইসলামিয়া হোটেল থেকে এরকম পেটচুক্তি খেয়েছি। এ বিষয়ে রাজবাড়িতে নানা গল্প প্রচলিত আছে। যেমন খদ্দেরকে পেটচুক্তি খাবার পরিবেশন করে খদ্দেরের খাওয়া অর্ধেক সমাপ্ত হলে বয় বেয়ারা বলত, ‘আরে ভাই ঐ যে ট্রেন হুইসেল দিচ্ছে এখনই ছেড়ে যাবে। খদ্দের আর কি করবে, এ কথা শুনেই অর্ধেক পেট খেয়ে দে দৌড়।

 

সস্তায় সুস্বাদু খাবার, স্থানীয় মানুষের দৃশ্যে আকৃষ্ট হয়ে পর্তুগীজ বণিকেরা রাজগঞ্জকে বলত ‘গোয়ালীশ ল্যান্ড’ বা মজার খাবারের দেশ। গোয়ালীশ পর্তুগীজ জাত শব্দ যার অর্থ অল্পজালের সিদ্ধ মাংস বা মাছের ফালি (Goulash-a stew of steak and vegetables-oxford learner’s Dictionary oxford press 1999)। এ অঞ্চলে উৎপাদিত ধনিয়া, পেঁয়াজ, রসুন, মশলায় পদ্মার স্বাদের ইলিশ, পাঙ্গাস, রুই, কাতলের কর্তিত ফালির মাছ মৃদু জ্বালে রান্নায় তা অপূর্ব স্বাদের খাবারে পরিণত হত। ফলে রাজগঞ্জ বন্দরসহ এর পার্শ্ববর্তীএলাকা গোয়ালীশ ল্যন্ড বা স্বাদের খাবারের অঞ্চল হিসেবে তাদের নিকট পরিচিত হয়ে ওঠে। পরবর্তী প্রায় চারশত বছর ধরে যাতায়াত, ব্যবসা বাণিজ্যের রাজগঞ্জ বন্দরটি পদ্মার ভাঙ্গনে বারবার ঘাটের স্থান পরিবর্তন হলেও ‘গোয়ালীশ ল্যান্ড’ নামটির পরিবর্তন হয় না। ভাষা পরিবর্তনের সাধারণ নিয়মানুযায়ী গোয়ালীশ ল্যান্ড এক সময় গোয়াল্যান্ডু বা গোয়ালন্দ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ইংরেজিতে গোয়ালন্দ বানানটি প্রাচিন নথিপত্রে ‘goalandu’ দেখা যায় ‘goalanda’ নয়। ১৭৯৩ সালে গোয়ালন্দ মহকুমা হয়নি। এ সময়েই বর্তমান রাজবড়ি জেলার নসিবশাহী, বেলগাছি, কাশিমনগর, নশরতশাহী ইত্যাদি পরগনা নাটোর রাজ, তেওতা রাজ, রানী হর্ষমুখীর জমিদারী হিসেবে যশোর কালেক্টরেভুক্ত হয়। পাংশা এলাকার মহিমশাহী পরগনা নদীয়ার অন্তর্ভুক্ত থাকে। ১৭৯৯ সালে যশোরের কালেক্টর কর্তৃক নাটোরের রাজার পরগনাগুলো নিলামে বিক্রি হয়। (আনন্দনাথ, পৃষ্ঠা-১১১)। এ সময় গোয়ালন্দ গোয়াল্যান্ড হিসেবেই সরকারী নথিপত্রে ব্যবহৃত হয়। ১৮৭১ সালে পূর্বদেশ রেল জগতি থেকে রাজগঞ্জ (রাজগঞ্জ এখন নদীগর্ভে) অভিমুখে রেল স্থাপন হয় এবং  ঐ বছরই গোয়ালন্দ মহকুমা প্রতিষ্ঠিত হয়। পরগনাভিত্তিক ঢাকা জালালপুর গঠন করা হয় ১৮০৭ সালে। ১৮১২ সালে ঢাকা জালালপুরের পশ্চিম সীমানা নির্ধারণ করা হয় চন্দনা ও গড়াই নদীর পূর্ব পাড় পর্যন্ত। ফলে পদ্মার পাড়াপড় ঘাট গোয়ালন্দ-ঢাকা-জালালপুর আওতাভুক্ত থাকে। ১৮৩৩ সালে ফরিদপুর জেলা গঠনকালে এ সীমানা অক্ষুন্ন থাকে। এ সময় পদ্মার উভয় তীরবর্তী গোয়ালন্দ ও মানিকগঞ্জ প্রায় ৩৭ বছর ফরিদপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত থেকে ১৮৫৬ সালে মানিকগঞ্জ ঢাকার অধীন হয় ( আনন্দনাথ রায়ের ফরিদপুরের ইতিহাস, ড. তপন বাগচী সম্পাদিত, পৃষ্ঠা-১১৭)।

১৮৭১ সালে ফরিদপুর জেলাকে ৪টি প্রশাসনিক ইউনিটে চারটি সাবডিভশন বা মহকুমায় বিভক্ত করা হলে গোয়ালন্দ মহকুমা গঠিত হয় এবং ঐ বছরই পূর্বদেশ রেল গোয়ালন্দ পর্যন্ত বিস্তৃত করা হয় (গৌড়ি সেতু-মীর মশাররফ হোসেন)। তবে মহকুমা প্রতিষ্ঠাকালে স্থান হিসেবে বর্তমান গোয়ালন্দ সেভাবে গেজেট ভুক্ত হয়নি। গোয়ালন্দ ঘাট পরিচয়ে নসিবশাহী, কাসিমনগর, নশরৎশাহী, পরগনা গোয়ালন্দ মহকুমায় পরিণত হয়। বেঙ্গল গেজেটিয়ার ১৯২৫ (ওমিলি প্রণীত) দেখা যায় বর্তমান গোয়ালন্দ বাজার থেকে প্রায় ১০ কিমি উত্তর পশ্চিমে এবং উড়াকান্দা বাজার থেকে প্রায় ৮ কিমি উত্তর পূর্বে পদ্মা যমুনার মিলনস্থলের নিকবর্তী কোনো স্থানে মহকুমা স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। এ সময় পূর্বদেশগামী রেলপথ পাংশা থেকে কালুখালির তিন কিলোমেটার উত্তর (বহর কালুখালি) এবং বর্তমান রাজবাড়ি ‘গোদার বাজারে’র নিকটবর্তী স্থান দিয়ে রাজগঞ্জের বিপরীত ঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। তখন থেকে ‘গোদার বাজার’, বাজার হিসেবে পরিচিত লাভ করে। পূর্ববঙ্গের শাসনকার্য পরিচালনার উদ্দেশ্য সহজ যাতায়াত এবং অত্র অঞ্চলের ব্যবসা বাণেজ্যের প্রসারের উদ্দেশ্যে রেলপথ স্থাপন করে। মহকুমার অফিস প্রতিষ্ঠানসহ রেলস্থাপনা গড়ে ওঠায় স্থানটি শহরের মর্যদা পায়। ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টারের বর্ণনায় দেখা যায় ১৮৭৫ সালের জনুয়ারি মাস পর্যন্ত ইস্টার্ন রেলওয়ে মাছপাড়া থেকে কালুখালি হয়ে বেলগাছি থেকে উত্তর পূর্ব দিকে রাজবাড়ির উত্তর দিয়ে গোয়ালন্দ ঘাটের নিকটবতী স্থানে পৌঁছায়। তৎকালীন সময়ে ১৩ লক্ষ টাকা ব্যয় ইংরেজ প্রকৌশলীগণ ঘাটের পরিকল্পনা, রেল স্টেশন, মহকুমা অফিসারের কার্যালয়, ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট স্থাপন করে। বন্যা প্রতিরোধসহ নদী শাসনে ব্যবহৃত হয় রেলের রড রেলিং ও পাথর। (উড়াকান্দার নিকটবর্তী নদীর মধ্যে এসব বৃহৎ স্থাপনার কিছু কিছু নিদর্শন বর্তমান আছে)। রাজগঞ্জকে কেন্দ্র করে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটতে থাকে। গড়ে ওঠে আড়ৎ, দোকান, হোটেল, আবাস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস ইত্যাদি। স্থানটি পূর্ববঙ্গের অন্যতম বন্দর হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। বৃটিশ শাসনকর্তা বন্দরের উন্নতি ও এর বিস্তার ঘটাতে অধিক তৎপর হয়। কিন্তু রাজগঞ্জ বন্দর অধিক সময় স্থায়ী হল না। সর্বনাশা বন্যা ও নদী ভাঙ্গনে রাজগঞ্জের সকল স্থাপনা নদীরগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। নদী ভাঙ্গন ও ঘাট বারবার স্থানান্তরিত হওয়ার কারণে গোয়ালন্দে অবস্থিত মহকুমার অফিস আদালত বিদ্যালয়সহ সকল স্থাপনা ১৮৭৫ থেকে ১৮৯০ এরমধ্যে  রাজবাড়িতে সরিয়ে আনা হয়। ‘গোয়ালন্দ মহকুমা যেখানে অবস্থিত ছিল, পদ্মাগর্ভে বিলীন হওয়ায় গভর্নমেন্ট সাহায্যকৃত হাইস্কুলটি রাজবাড়ি স্থানান্তরিত হয় এবং তৎকালীন ডিপিআই সিএ মার্টিন সাহেবের অনুরোধে লক্ষ্মীকোল রাজবাড়ির জমিদার রাজা সূর্যকুমার গুহরায় উহার পরিচালনার সম্পূর্ণ ভার নেন। (আমার স্মৃতিকথা ত্রৈলোক্যনাথ ভট্টাচার্য-পৃষ্ঠা-৪)।

 

রেল সম্প্রসারণ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা পরিচালনায় বর্তমান স্টেশন বরাবর পূর্বে ও দক্ষিণে প্রায় এক বর্গকি মিটার জায়গা হুকুম দখল করে রেল স্থাপনা গড়ে তোলা হয়। ১৮৭৫ থেকে ১৮৯৫ এই বিশ বছরে পদ্মার তীর প্রবল ভাঙ্গনের কবলে পতিত হওয়ায় গোয়ালন্দ ঘাট বারবার স্থানান্তর করা হয়। এ সময়ের মধ্যে ভাঙ্গনের প্রকোপ এত বেশি ছিল যে কয়েক মাস পর পর ঘাটের স্থান পরিবর্তন করতে হত। এভাবেই গোয়ালন্দ ঘাট লক্ষ্মীকোল থেকে লালগোলা, লালগোলা থেকে উড়াকান্দা থেকে পুরশাহাটে স্থানান্তর করা হয়। পুরশাহাট এলাকায় চর জেগে ওঠায় ঘাট জামালপুরে যায়। জামালপুরে চর জেগে উঠলে আরও পূর্বে বেথুলীতে সরে আসে। এরপর কোষাহাটা। কোষাহাটা ভেঙ্গে গেলে কাটাখালি, কাটাখালি ভেঙ্গে গেলে দুর্গাপুর, এরপর ঘিওর বাজার এবং সর্বশেষ ১৯১৪ সালে ঘাট উজানচরের ফকীরাবাদ স্থায়ী হয়। উজানচরের ফকীরাবাদে থেকে উত্তর দিকে এক থেকে ছয় নম্বর পর্যন্ত ঘাটের সংখ্যা বাড়তে থাকে। মৌসুম ভেদে পানির গভীরতা অনুযায়ী স্টিমার ভিন্ন ভিন্ন ঘাটে নোঙর করত। কোনো ঘাটে সারা বছর জাহাজ নোঙর করতে পারতো না। বর্ষামৌসুমে কখনো উড়াকান্দায় ঘাট পিছিয়ে গেছে আবার শীত মৌসুমে ঘাট ছয় নম্বর সরে এসেছে। তবে ঘাট ৪/৫ মাইলের মধ্যে অগ্র পশ্চাৎ করলেও মূল প্রশাসনিক কাজ ফকীরাবাদ থেকেই পরিচালিত হত। ফকীরাবাদ ঘাট দীর্ঘদিন স্থায়ী হয় এবং এখানে গোয়ালন্দ ঘাট থানার প্রশাসনিক স্থাপনা গড়ে ওঠে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্রের নৌ পরিবহনের হেড কোয়ার্টার স্থাপিত হয় গোয়ালন্দে। ঢাকা-কলিকাতা যাতায়াতে রেল ও স্টিমারসংযোগ পথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নৌপথে মাদারীপুর, বরিশাল, চাঁদপুর, নারায়ণগঞ্জ প্রভৃতি স্থানে যাতায়াতে স্টিমার, লঞ্চ, বড় বড় নৌকা ইত্যাদি নৌযান ব্যবহার হতে থাকে। এদিকে কলিকাতা গোয়ালন্দ স্থলপথে রেল যোগাযোগে ট্রেন সার্ভিস বৃদ্ধি পায়। ঢাকা মেল, আসাম মেল, ওয়ান আপ, টু ডাউন প্রভৃতি নামের ট্রেন গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত নিয়মিত চলাচল করতে থাকে। স্থলপথে ট্রেন এবং নৌপথে স্টিমারের সাথে যাতায়াত সংযোগ স্থাপন করা হয়। বাঙালি, বিহারী মারওয়ারী এবং কিছু বিদেশী নানা ব্যবসা জাঁকিয়ে তোলে। পদ্মার ইলিশের স্বাদ ভারত খ্যাত। ইলিশ, পাঙ্গাস, রুই ইত্যাদি মাছের চালান কলিকাতা দিল্লী পৌঁছে যেত। দেশী-বিদেশী অনেক পণ্যের বাজার বসে গোয়ালন্দে। গোয়ালন্দের চড়ে এক/ দেড়মনি তরমুজ জন্মাত। দূর ভারতে এর ব্যাপক কদর ছিল। কলিকাতা দিল্লীতে রপ্তানি হত। এ সময় স্টিমারও ট্রেন থেকে পণ্য বহনকারী প্রায় পাঁচ হাজার কুলি কাজে নিয়োজিত থাকত। তারা ঘাট কুলী বলে পরিচিত ছিল। এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা করা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। ঘাট অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। স্বদেশী, কংগ্রেসী, কমিউনিস্ট, মুসলিমলীগ সকল রাজনৈতিক কর্মকান্ড বিস্তার লাভ করে। বিশেষ করে কমিউনিস্টদের তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। সাহিত্যিক শিল্পী লেখকদের ভিড় জমে। গোয়ালন্দ কেবল গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নয়, ভারতবাসীর কাছে তা হয়ে ওঠে বাংলার দ্বারপথ। ইংরেজরা গোয়ালীশ ল্যান্ড না বলে, বলত Gate way of Bengal.

 

গোয়ালন্দ মহকুমার কাজ শুরু হয়েছিল ১৮৭১ সালে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় থেকেই গোয়ালন্দ ঘাট পুলিশ স্টেশনের ব্যবস্থা করা হয়। থানা হিসেবে বিভিন্ন সময়ে গেজেটিয়ার, ইতিহাস সেনসাসে রাজবাড়ি জেলার গোয়ালন্দ, বালিয়াকান্দি ও পাংশার নাম পাওয়া যায়। রাজবাড়ি থানার কার্যক্রম শুরু হয় পড়ে। তবে নদী ভাঙনের কারণে মহকুমা ও থানার স্থাপনা রাজবাড়িতে গড়ে ওঠে এবং প্রশাসনিক কার্য গোয়ালন্দ নামে রাজবাড়ি থেকে সম্পাদন করা হত। গোয়ালন্দে ‘ঘাট থানা’ হিসেবে থানার কাজ করা হত।

 

১৯২০ সালের একটি পরিসংখ্যান

মহকুমা থানা পুলিশ স্টেশন এরিয়া বর্গমাইল জনসংখ্যা
গোয়ালন্দ গোয়ালন্দ গোয়ালন্দ ১১৫ ৭৪৩৪৬
    গোয়ালন্দ ঘাট ৫০ ৪২২৯৬
  বালিয়াকান্দি বালিয়াকান্দি ১২৪ ৮৭৬৮৭
  পাংশা পাংশা ১৬১ ১.২০.১৯১

সূত্র: ফরিদপুর গেজেটিয়ার ১৯৭৫

 পরিসংখ্যান নির্দেশ করে ১১৫ বর্গমাইলের গোয়ালন্দ থানা বর্তমান রাজবাড়ি থানার এরিয়া নিয়ে গঠন করা হয়েছিল। গোয়ালন্দ মহকুমা ও থানার প্রশাসনিক কাজ রাজবাড়ি থেকে সম্পাদিত হলেও ইতিমধ্যে গোয়ালন্দ থানার প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানসহ নানা অফিস শিক্ষা প্রতিষ্ঠন গড়ে ওঠে। ১৯৮৪ সালে রাজবাড়ি জেলা গঠনকালে গোয়ালন্দবাসী গোয়ালন্দকে জেলা ঘোষণার দাবি রাখে। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। গোয়ালন্দ নামে মহকুমা হলেও কোর্ট কাচারী, অফিস আদালত, রেল স্থাপনাসহ রাজবাড়ি বৃহৎ শহর বিধায় রাজবাড়িবাসির দাবিতে শেষ পর্যন্ত ঐক্যমতের ভিত্তিতে ‘রাজবাড়ি’ নামে জেলা ঘোষণা করা হয়। গোয়ালন্দর সামনে চর জেগে ওঠার বিগত শতাব্দীর ৭০ দশকের মাঝামাঝি ঘাট দৌলতদিয়া স্থানান্তর করা হয়। দৌলতদিয়া এখন বাংলাদেশের দক্ষিণের দ্বারপথ।

প্রফেসর মতিয়র রহমান


মহানায়ক স্বামী সমাধি প্রকাশারণ্য

মহানায়ক স্বামী সমাধি প্রকাশারণ্য-মহানায়ক যাঁর তত্ত্ব, আদেশ, উপদেশ, কর্ম পরিধি

স্বামী সমাধি প্রকাশারণ্য কিংবদন্তির মহানায়ক যাঁর তত্ত্ব, আদেশ, উপদেশ, কর্ম পরিধি, বিদেশ বিভুঁইয়েও কথিত। রাজবাড়ী জেলা নলিয়া জামালপুরের ঊনবিংশ শতাব্দীর আশির দশকে জন্মগ্রহণ করেন স্বামী সমাধি প্রকাশারণ্য। বাল্যকালে তার নাম ছিল নরেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যয়। সাধারণ লোকে বলে নরেশ পাগলা। এই নরেশ পাগলাই পরে আর্যসংঘের প্রতিষ্ঠা ও সভাপতি।

স্বামী প্রকাশারণ্য তৎকালীন সময় প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে ইংরেজিতে এমএ পাশ করেন। ছাত্রকালীন শ্রী রামকৃষ্ণের মানসপুত্র ব্রহ্মনিন্দ মহারাজদের সাথে তার আলাপচারিতা ছিল। লেখাপড়া শেষে তিনি বালিয়াকান্দি হাই স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। পনের বছর তিনি এ পেশায় ছিলেন। ব্রক্ষচারী সাধক এতে তুষ্ট হননি। পিতা বিবহ দেন কিন্তু তিনি ঘর সংসারে আটকে থাকেন না। কোন সুদূরের পিয়াসা তার মধ্যে। শিক্ষক জীবনেই তার বানপ্রস্থ অবস্থা। শিক্ষকতা কাজে থাকাকালীন তার বেশভূষা দেখলেই বোঝা যেত তিনি একজন সাধক বা সাধু পুরুষ। পরনে হাঁটু পর্যন্ত লম্বিত পাজামা, গায়ে খদ্দরের হাফ জামা, পায়ে সেন্ডেল। মাথায় তেলহীন চিকন কালো চুল। দীর্ঘ ঋজু দেহ। গৌরকান্তি তেজোদ্দীপ্ত চেহারা দেখলেই বোঝা যায় তিনি অপবিগ্রহ সাধকের মূর্ত প্রতীক।

ফরিদপুর জেলার শিক্ষক সম্মেলনে যোগদান করেন। সেখানে তাঁর অভিভাষণ থেকে চালু হয় বিদ্যালয়ে প্রাথমিক ধর্ম শিক্ষা। যেখানে ধর্ম সভা, কীর্তন, ভাগবত পাঠ, ধর্মালোচনা সেখানেই মাস্টার মশাই। বাল্যকাল থেকেই ব্রাহ্মণ হয়ে আচণ্ডাল শুদ্রদির সাথে মিশে গেছেন। তাদের অন্ন ভোজন করেন। বুঝেছিলেন জাতি ভেদ প্রথা সমাজ প্রভূত ক্ষতিসাধন করছে। এর বিরদ্ধে ঘোষণা করেছিলেন বিদ্রোহ। লিখলেন, জাতিকথা পরশমণি। এসকল পুস্তকে প্রমাণ করলেন জাতিভেদ প্রথার অসারতা। সত্যের সন্ধানে দিনাজপুরের এক হাঁড়ি তার কাছে দীক্ষা প্রার্থী হলে স্বামীজি নিজেই দীক্ষাগ্রহণ করলেন দিনাজপুরে তার বাড়িতে যেয়ে।

ব্রহ্মচারীর মুক্তি মনুষ্য জীবনের পরম কাম্য। এ পথে আসতে হলে প্রয়োজন ব্রহ্মকালচার বা সমাধি সাধন। দীক্ষা গ্রহণের পর তিনি ‘স্বামী সমাধি প্রকাশারণ্য’ নাম গ্রহণ করেন। প্রতিষ্ঠা করেন আর্য সংঘ। আর্য সংঘের মাধ্যমে তিনি তাঁর মত, পথ ওত্ত্ব প্রকাশ করেন। তিনি বলেন জন্মান্ত রবাদ কোনো মিথ্যা নয়। উহার সদৃশ্য দার্শনিক যুক্তির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব। এর থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় সাংখ্য যোগ। তিনি ঘোষণা করেন সমাধি জাত বিজ্ঞানই সম্যক বিজ্ঞান। তা দ্বারাই দুঃখের নিবৃত্তি হয়। গৌতম বু্দ্ধ বা শ্রী রামকৃষ্ণের মতো তার মতবাদ তৎকালীন পূর্ববাংলাসহ ভারতে বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তার লাভ করে। গড়ে ওঠে সংঘ, মঠ, সমাধি, আশ্রম। এরই সূত্র ধরে তৎকালীন পশ্চাৎপদ জনপদ জঙ্গল ইউনিয়নে ১৯৩৯ সালে গুরুজীর ইচ্ছা ও দরদী মনের পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় আর্য সংঘ আশ্রম, মঠ ও মন্দির। স্থাপিত হয় হাট-বাজার পোস্ট অফিস, আর্য সংঘ বিদ্যালয়। আশ্রম প্রাঙ্গণে প্রতিষ্ঠা করলেন পার্থ সারথী মন্দির। স্থানের নাম দিলেন সমাধিনগর। এখানে বরেণ্য ব্যক্তির আগমন ঘটে। সমাধিনগর পার্থ সারথী মন্দির আশ্রম ভগ্নপ্রায়।

 

(প্রফেসর মতিয়র রহমান)