হড়াই-নদী

হড়াই-নদীর-ভাঙ্গাগড়ার খেলা

নদ-নদী

পদ্মা, গড়াই, হড়াই, চন্দনা বাহিত পলি, কাঁকর দিয়ে সৃষ্টি রাজবাড়ী জেলা। রাজবাড়ী প্রধান ঐতিহ্য এককালের রুপালি ইলিশ। আজও রাজবাড়ী অঞ্চলের মানুষের জীবন পরিচালিত হচ্ছে এ সব নদনদীর প্রভাবে। সঙ্গত কারণেই এ সব নদনদীর অতীত স্রোতধারা, তার জন্মকাল জানতে ইচ্ছে করে। জানতে ইচ্ছে করে এর ভাঙ্গাগড়ার খেলা।

সব নদী খান খান

হড়াই নদী সাবধান

এ প্রবাদটি রাজবাড়ী জেলার বেলগাছি, কালুখালি, মদাপুর, সূর্যনগর, রাজবাড়ী, বাণীবহতে বহুল প্রচলিত। প্রবাদটি। প্রবাদটি নাকি উৎসারিত হয়েছিল চতুর্দশ শতকের মঙ্গল কাব্যের নায়ক চাঁদ সওদাগরের মায়ের মুখ থেকে। কথা থেকে বোঝা যায় চাঁদ সওদাগরের মা তাকে সাবধান করেছিল বেগবান খরস্রোতা নদী থেকে তা সত্ত্বেও চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙ্গা নিমজ্জিত হয় বেগগাছির অদূরে হড়াইতে। সে স্থানাটি কয়েকটি উঁচু ঢিবি দেখা যায় যাকে এ অঞ্চলের মানুষ চাঁদ সওদাগরের ঢিবি বলে। এ কাহিনীর সত্যতার সাথে চাঁদ সওদাগরের কাহেনী আজ ঐতিহাসিক সত্য বলে পরিচিতি লাভ করেছে। সকল মঙ্গল কাব্যেরই নায়ক সওদাগর। এ মধ্যে চাঁদ সওদাগর, ধনপতি ও তার পুত্র শ্রীমন্ত অন্যতম। চাঁদ সওদাগরের ছিল সপ্তডিঙ্গা আর ধনপতির চৌদ্দডিঙ্গা। তাদের প্রধান ডিঙ্গার নাম ছিল মধুকর। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তারা ব্যবসার উদ্দেশ্যে সমুদ্র যাত্রা করত। চাঁদ সওদাগরের বাড়ি বর্তমান বগুড়া। মঙ্গল খাতে কলিদহের সাগর বলে পরিচিত। ধনপতি ছিলেন হুগলী অঞ্চলের। ড. নীহাররঞ্জন চাঁদ সওদাগরের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে চাঁদ সওদাগরের বাণীজ্যতরী বাজখানি রামেশ্বর পার হইয়া সাগর মুখের দিকে অগ্রসর হইতেছে। পথে পড়িতেছে অজয় নদী, উজানী, পূর্বে কাকীনাড়া, মূলজোড়া, আড়িয়াসহ চিত্রাপুর।

চাঁদ সওদাগরের কাহিনী বর্তমানে ইতিহাসের উপাদান তবে চাঁদ সাওদাগরের সপ্তডুঙ্গা যে এখানে নিমজ্জিত হয় তার সত্যতা কী? হড়াই নদীর প্রবাহ বর্ণনায় হয়ত এ সত্যতা ঐতিহাসিক আলোচনার বিষয় হতে পারে। বর্তমানে মৃত হড়াই নদীর পদ্মা উৎসারিত হয়ে বেলগাছির পশ্চিম দিক দিয়ে বাণীবহের দক্ষিণ দিয়ে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে পাঁচ মোহনীতে হড়াই, চন্দনা, গড়াই, কুমার একাকার। পদ্মা নদীর প্রাচীনত্ব ও প্রবাহ বর্ণনায় যতদূর জানা গেছে পদ্মা ষোড়শ ও সপ্তদশ শতক থেকে প্রবল হয়েছে। এর পূর্বে অর্থৎ চতুর্দশ বা তৎপূর্বে এর প্রবাহ প্রবলতার ইতিহাস নাই।

এদিকে গঙ্গার প্রাচীনত্ব অনেক পূর্বে যার প্রভাবে বাংলার সমতটীয় বদ্বীপের উত্থান। ত্রয়োদশ চতুর্দশ শতকে পদ্মার প্রবলতা না থাকায় গঙ্গার ধারা তখন কুমার, মাথাভাঙ্গা, জলঙ্গী, গড়াই, হড়াই দিয়ে প্রবাহিত হত। কুমার, মাথাভাঙ্গা বহু পূর্বে যশোন খুলনা দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় সে সব অঞ্চলের বদ্বীপ বর্তমান পরিণত ও জয়িষ্ণু বদ্বীপ। ঐ অঞ্চলে জলাধার ও বিল বাওড়া এর প্রমাণ বহণ করে। গঙ্গার মুখে ত্রয়োদশ চর্তুর্দশ শতকে এবং তারও পূর্বে যে সমস্ত নদীপ্রবাহ দ্বারা গঙ্গার বিপুল জলরাশি বাহিত হত তা কুমার, গড়াই, চন্দনা, জলঙ্গী, মাথাভাঙ্গা, হড়াই। হড়াই প্রাচীন নদী। অন্যদিকে করতোয়া বাংলার উত্তর বঙ্গের মধ্যে দিয়ে দক্ষিণগামী। করতোয়াই প্রবাহ-ই হড়াই দিয়ে প্রবাহিত হত। এ থেকে অনুমান করা যায় হড়াই তৎকালীন সময়ে এ অঞ্চলে বেগবান নদী ছিল। বর্তমান মাটিপাড়া পিঁজেঘাটা বলে পরিচিত স্থানে যে বিলের আকার দেখতে পাওয়া যায় তা হড়াইয়ের প্রাচীন প্রবাহ।

‘পিজেঘাটার ভাটিতে রাধাগঞ্জে বিল ছিল রাধাগঞ্জ বন্দর’ (ফরিদপুরের ইতিহাস, আনন্দনাথ রায়) । উল্লেখ্য নদী তার পতি বদলালে পরিত্যক্ত নদী প্রথমে কোল ও মৃত নদী পরে বিল বাওড়ে পরিণত হয়। দশম, একাদশ শতাব্দীতে বা তারও পরে হড়াই নদী হিসেবে প্রবাহিত ছিল যার প্রশস্ততা দুই/তিন মাইল। পরে তা দুটি ধারায় প্রবাহিত হয়েছে। একটি পিঁজেঘাটা দিয়ে অন্যটি বর্তমান হড়াইয়ের প্রবাহ দিয়ে। ত্রয়োদশ চতুর্দশ শতকে ভূষণা (বর্তমান মধুখালির অদূরে) সমৃদ্ধ নগর ও বন্দর ছিল। এখানকার উন্নতমানের সূতিবস্ত্রের সুনাম দেশে বিদেশে ছড়িয়ে গিয়েছিল।