রাজা সূর্যকুমার গুহরায়

রাজা ‍সূর্যকুমার গুহরায়

‘রাজা সূর্যকুমার’ এক কিংবদন্তি নাম। জেলার নামকরণে লক্ষীকোল জমিদার বাড়ির পরিচিতি ‘রাজবাড়ি জেলার নামকরণ’ শিরোনাম নিবন্ধে আলোচনা করেছি। এ বিষয়ে আবশ্যকীয় মন্তব্য হল ১৮৮০‘র দশকে জমিদার সূর্যকুমার বৃটিশ রাজ কর্তৃক ‘রাজা’ উপাধিপ্রাপ্ত হলে ‘লক্ষীকোলের রাজার বাড়ি’ রাজবাড়ির ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। প্রায় এক দশক যাবৎ বিভিন্ন সূত্র থেকে রাজা সূর্যকুমারের জীবন ইতিহাস জানার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তাঁর সামগ্রীক জীবনপঞ্জী সংগ্রহ করতে পারিনি। লক্ষীকোল রাজার বাড়ি দর্শন, রাজার পারিবারিক সূত্র, লোকমুখে এবং শ্রী ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্য লিখিত ‘আমার স্মৃতিকথা’ গ্রন্থ থেকে সূর্যকুমার সম্বন্ধে যতটা জেনেছি সে তথ্যবলীর আশ্রয়ে রাজা সূর্যকুমারের জীবন ইতিহাস লিখিত হল। উল্লেখ্য শ্রী ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্য রাজার আশ্রয়ে তাঁর বাসভবনে থেকে রাজার হাতে গড়া ‘রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশনের’ (R.S.k) লেখাপড়া করেন। ১৮৮৮ সালে রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশনটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৮৯ সালে ত্রৈলোক্যনাথ ঐ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ১৮৯৪ সালে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা (বর্তমান এসএসসি) পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এ সময় তিনি রাজার বাড়িতে লজিং থেকে সূর্যকুমার ও রানী মাতাদের স্নেহ মমতায় লেখাপড়া করেন। ত্রৈলোক্যনাথ যখন কলিকাতায় এফএ (বর্তমান আই,এ) পড়তে যান তখনও তিনি রাজার কলিকাতার বাড়িতে থাকতেন। অতঃপর ত্রৈলোক্যনাথ ১৯০০ সালে আরএসকে ইনস্টিটিউশনে প্রথমে সহকারী প্রধান এবং পরে প্রধান শিক্ষক হিসেবে রাজার জীবিতকালে ও পরে শিক্ষাকতা করেন। রাজাকে তিনি কাছে থেকে দেখেছেন, রাজার স্টেটের ইকসিকিউটর ছিলেন। রাজার শ্যালক, সন্তান ও আত্মীয়দের সাথে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। রাজা, রানী, রাজার বাড়ি, লক্ষীকোল এস্টেটের অনেক কাহিনী ও ঘটনার সাক্ষী ত্রৈলোক্যনাথ। এর অনেক বিষয় তিনি ‘আমার স্মৃতিকথা’ গ্রন্থে লিখেছেন। গ্রন্থটির বিষয়ে জানা থাকলেও কোনোভাবেই তা সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছিল না। অনেক চেষ্টার পর আমার বন্ধু প্রফেসর ও প্রাক্তন অধ্যক্ষ নিত্যরঞ্জন ভট্রাচর্যা জানুয়ারি ২০০৯ এ কলিকাতা থেকে গ্রন্থটি সংগ্রহ করে আমার হাতে দেন। তাঁর এ অবদান স্মরণীয়।

বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী সূর্যকুমার ছিলেন দরদী ও প্রজাপ্রেমী। সমাজসচেতন রাজা, সমাজ উন্নয়নের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন গেছেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, পাঠাগার, রাস্তাঘাট, পোস্ট অফিস, মন্দির। তাঁর আশ্রয়ে লালিত পালিত হয়েছেন ছাত্র, আশ্রয়হীন বালক, দরিদ্র ঘরের অসহায় সন্তান। রাজার দুই রানী। কোনো রানীরই সন্তান না থাকায় রাজা যেন সকলের সন্তানকে আপন সন্তান ভাবতেন। নিজের শ্যালকদের পুত্রবৎ স্নেহে স্বগহে আশ্রয় দিয়ে পালন করেছেন। তৎকালীন জমিদারের শোষণ, অত্যাচারের নানা কাহিনী ইতিহাসে লেখা আছে কিন্তু প্রতাপশালী রাজা সূর্যকুমারের এরুপ কোনো ঘটনা রাজবাড়ির কোনো মানুষের মুখে শোনা যায় না। বরং একজন তেজস্বী, অথচ কোমল হৃদয়ের মানুষ হিসেবে তিনি পরিচিত। প্রতাপশালী বৃটিশ রাজার কাছে তিনি মাথা নোয়াবার পাত্র ছিলেন না। স্বদেশী ও স্বরাজ আন্দোলনে পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন। জাতীয় চেতনায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত সজাগ। লোকমুখে জানা যায় একবার বড়লাট অত্র এলাকার সকল জমিদারদের দরবারে ডেকে পাঠান। সবাই জুতা খুলে লাটের দরবারে প্রবেশ করেছিল কিন্তু সুর্যকুমার জুতা পায়ে লাটের দরবারে প্রবেশ করলে লাট সাহেব বললেন ‘রাজা বটে’? অনেকে মনে করেন সেই ঘটনা থেকে রাজা বলে পরিচিত। কিন্তু ব্যাপারটা এমন নয়। সূর্যকুমারের ব্যক্তিত্ব, জনহিতকর কাজ, শিক্ষার প্রতি অনুরাগ এবং প্রজা প্রেমের জন্য ১৮৮০‘র দশকে কারোনোশনের মাধ্যমে তাঁকে ‘রাজা’ উপাধি দেওয়া হয়। লক্ষীকোল এস্টেটের উত্তরাধিকারী জমিদার দীগিন্দ্র প্রসাদ গুহ রায়ের কোনো সন্তান না থাকায় অনুমান ১৮৪০ এর দশকের শেষে সূর্যকুমারকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেন। প্রবীনদের মুখে শোনা যায় দীগিন্দ্র প্রসাদ দত্তক গ্রহণে সূর্যনগরের নিকটবর্তী কোনো গ্রামে (মতভেদে চরনারায়ণপুর) পালকি প্রেরণ করেন। সুর্য্যকুমারেরা ছিলেন দুই ভ্রাতা। দৈহিক কান্তির যে ছেলেটিকে দত্তক নেওয়ার কথা ছিল সে পালকিতে চড়ে না। শীর্ণকায় ভাইটি পালকিতে ওঠে। এই ভাইটি সুর্যকুমার। দীগিন্দ্র প্রসাদের মৃত্যুর পর সূর্যকুমার এস্টেটের উত্তরাধিকারী নিযুক্ত হন। প্রথম অবস্থায় লক্ষীকোল, বিনোদপুর মৌজা এবং লক্ষীকোলের উত্তর পূর্বে কাশিমনগর পরগনার পদ্মা তীরের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে লক্ষীকোল এস্টেটের বিস্তৃতি ছিল। উল্লেখ্য রাজা সূর্যকুমারের মৃত্যুর পর লক্ষীকোল এস্টেট তেঁওতার রাজার সাথে মামলায় জড়িয়ে পরে। এ প্রসঙ্গে ত্রৈলোক্যনাথ লিখেছেন ‘আমি যখন এই বিল্ডিং এর কাজে হাত দিলাম (RSK-১৯১৪) ঠিক সেই সময়ে লক্ষীকোল স্টেট একটি বড় রকমের মোকদ্দমায় জড়িত হইয়া পড়ে। পদ্মার চর লইয়া তেঁওতার জমিদারদের সঙ্গে মামলার জন্য স্টেট হইতে টাকা দিয়া বিল্ডিং শেষ করা সম্ভব হয় নাই’ (আমার স্মৃতিকথা-ত্রৈলোক্যনাথ – পৃষ্ঠা-২৬)। কাশিমনগর পরগনার পদ্মার তীরবর্তী অঞ্চল, (পদ্মা তখন লক্ষীকোল থেকে ৬ মাইল/প্রায় ১০ কিমি উত্তর দিয়ে প্রবাহমান ছিল), সূর্যনগর, দিনাজপুর, ভুবেনেশ্বর, কলিকাতা, কাবিলপুর পরগনায় সূর্যকুমারের জমিদারী প্রতিষ্ঠা পায়। এ সকল জমিদারী থেকে লক্ষীকোলে এস্টেটের বাৎসরিক আয় তখনকার দিনে ছিল প্রায় দেড় লক্ষ টাকা। রাজপ্রাসাদ ও রাজার বাড়ির নাম ছিল দেশখ্যাত। প্রায় ৬০ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত প্রাসাদ, অতিথিশালা, পোস্ট অফিস, আঙ্গীনা, বাগানবাড়ি, শান বাঁধানো পুকুর ঘাট, টোল, বৈঠকখানা, অফিস কর্মচারী, পাইক পেয়াদা, গোশালা, আস্তাবল নিয়ে রাজার বাড়ি ছিল জমজমাট। এ ছাড়া রাজা কলিকাতায় বাসস্থান নির্মাণ করেন। দুই রানীর মধ্যে কোনো রানীরই সন্তানদি না থাকায় রাজা ১৮৯০ এর দশকের শুরুতে নরেন্দ্রনাথকে প্রথমে দত্তক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। নরেন্দ্রনাথ মেট্রোপলিটান কলেজিয়েট স্কুলে পড়ালেখা করতেন এবং ক্লাসে প্রথম স্থান অধিকার করতে থাকে। কিন্তু সহসাই কলেরা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এর পূর্বে রাজার এক শ্যালক হীরালাল যাকে রাজা পুত্রবৎ স্নেহ করতেন তিনিও রাজবাড়িতে দুর্ঘটানায় মারা যান। স্নেহপ্রবণ রাজা শ্যালক ও পুত্রের অকাল মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে পুরিধামে গমন করেন এবং পুরিতে ৬০,০০০.০০ (ষাট হাজার) টাকা ব্যয়ে সমুদ্র তীরে বাড়ি নির্মাণ করে বাস করতে থাকেন। রাজা ঐ বাড়ির নাম রাখেন, নরেন্দ্র কুটির। পুত্রের স্মৃতি রক্ষার্থেই এ নামকরণ করা হয়। অবশ্য রাজার মৃত্যুর পর ঐ বাড়ির নাম দেওয়া হয়, ভিক্টোরিয়া ক্লাব। রাজা ভবেশ্বরেও একখানি বাড়ি তৈরি করেন এবং সেখানে অনক ভূ-সম্পত্তি করেন।

রাজা সূর্য কুমার ১৮৬০ দশকের মাঝমাঝি বরিশালের গাভা নিবাসি উমাচরণ ঘোষ দস্তিদারের কন্যা ক্ষীরোদ রানীকে বিবাহ করেন। বিবাহের সময় রাজা দুই শ্যালক হীরালাল ও মতিলালকে সঙ্গে নিয়ে আসেন এবং পুত্রবৎ তাদের লালন পালন করেন। ১৭/১৮ বছর দাম্পত্য জীবনে ক্ষীরোদ রানীর গর্ভে সন্তানাদি জন্মায় না। রানীর পরামর্শে রাজা লক্ষীকোলের নিকটবর্তী গ্রাম ভবদিয়ায় বসবাসরত কুচবিহারের মোক্তার অভয়চরণ মজুমদারের কন্যা শরৎ সুন্দরীকে বিবাহ করেন। এ ঘরেও কোনো  সন্তানাদি জন্মায় না। অনুমান ১৮৯১ সালে রাজা স্ত্রীদের পরামর্শে রাজবাড়িতেই নরেন্দ্রনাথকে পোষ্যপুত্র গ্রহণ করেন। এ সময় ত্রৈলোক্যনাথ রাজার বাড়িতে সূর্যকুমার ইনস্টিটিউমনে লেখাপড়া করতেন। রাজার দুই শ্যালক, ত্রৈলোক্যনাথ এবং পোষ্যপুত্র নরেন্দ্র একসাথে চলাফেরা করতেন। বিশেষ করে রাজার শ্যালকদের সাথে ত্রৈলোক্যনাথের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। এ সময় একটি দুর্ঘটনা ঘটে। ত্রৈলোক্যনাথের কথায়—‘এ সময় রাজবাড়িতে একটি দুর্ঘটনা ঘটে। পুত্রেষ্টি উপলক্ষে রাজবাড়িতে খুব ধুমধাম হয়। যাত্রা, থিয়েটার, বাজী পোড়ান ইত্যাদিতে বহু অর্থ ব্যয় হয়। বাহির আঙ্গিনায় বৃহৎ মঞ্চ তৈয়ারী হইতেছে, মঞ্চ বাঁধিতে অন্যসব লোকের সঙ্গে রাজার শ্যালক হীরালালও মঞ্চে গিয়া ওঠে এবং হঠাৎ পড়িয়া গিয়া প্রাণ হারায়। যাহা হউক উৎসব নিরানন্দের মধ্যে কোনো রকমে শেষ হইয়া গেল বটে কিন্তু রাজা এই দারুণ ধাক্কা সহ্য করিতে পারিলেন না—–দেশত্যাগী হইয়া কলিকাতাবাসী হইলেন। রাজা তখন স্বপরিবারে কলিকাতাবাসী হলেও রাজবাড়ির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হয় না। নরেন্দ্রের মৃত্যুর পর রাজা পুরিধামে বসবাস করতে থাকেন এবং পুনরায় দত্তক গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। রাজা ও দুই রানীসহ রাজা শ্রীমান সৌরেন্দ্র মোহনকে দত্তক গ্রহণ করেন। এ উৎসব পুরিধামে নিজ বাড়িতে সম্পন্ন হয়।’ (আমার স্মৃতিকথা, ত্রেলোক্যনাথ, পৃ-১১)।

যথা সময়ে সৌরিন্দ্র মোহন সাবালক হলে লক্ষীকোল এস্টেটের উত্তরাধিকারী হন। তিনি ‘কুমার বাহদুর’ হিসেবে রাজবাড়িতে সকলের নিকট পরিচিত ছিলেন। রাজা সূর্য কুমারের অমর কীর্তির মধ্যে লক্ষীকোলে সুদৃশ্য প্রাসাদ নির্মাণ, লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা, হাসপাতাল নির্মাণ, লক্ষীকোল পোস্ট অফিস স্থাপন, রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশন প্রতিষ্ঠা, নিজ জমিদারী সূর্যনগরে রেলস্টেশন প্রতিষ্ঠা অন্যতম কাজ। লক্ষীকোল রাজার বাড়ি ছিল ঐতিহ্যের ধারক। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ‘রাজবাড়ি’ দর্শনে আসত। দেশের দর্শনীয় ঐতিহ্য হিসেবে পরিগণিত হত। স্বাধীনতার পর লক্ষীকোল রাজবাড়ির ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে ‘রাজবাড়ি’ একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। চলচ্চিত্রটি কয়েকবার টিভি পর্দায় দেখান হয়েছে। রাজার বাড়ির ধবংসাবশেষ বলতে বর্তমানে কিছুই নেই। ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি বটবৃক্ষ। শান বাঁধানো পুকুরট ভরাট হলেও পুকুরের স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে। প্রতি বছর এখানে নববর্ষের আগমনে বৈশাখী মেলা বসে। তবে ১৮৮৮ সালে তাঁর হাতে গড়া রাজা সূর্যকুমার প্রতিষ্ঠিত আর.এস.কে ইনস্টিটিউশন তাঁর স্মৃতি বহন করছে।

রাজা সূর্যকুমার আমোদপ্রবণ ও রসিক প্রকৃতির ছিলেন। তাঁর সময়েই লক্ষীকোল মেলা জেলার ঐতিহ্যবাহী মেলায় পরণত হয়। রাজবাড়িকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের উৎসব অনুষ্ঠান হত। বসত সঙ্গীত, যাত্রা ও পালাগানের আসর। রাজার বাড়ির অন্দর মহলের আনন্দ উচ্ছাস বিষয়ে ত্রৈলোক্যনাথের কথায়—–‘রাত্রে রাজবাড়ির চেহারা বদলাইয়া যাইত। বৈঠকখানায় গান, বাজনা, আমোদ প্রমোদ—–মদ পর্যন্ত চলত। রাজা মদ খাইতেন কোনো কোনো দিন নামমাত্র-ইয়ার বন্ধুদের যোগাইতেন প্রচুর। বড় মা (বড় রানী) আমাকে একদিন বলিলেন তুমি নায়েব মশাইকে বল চাকর গিয়া টাকা চাহিলেও যেন না দেন। বলিবে আমার হুকুম। আমি বলিলাম, কিন্তু রাজা যদি আমাকে ঘাড় ধরিয়া বাহির করিয়া দেন তখন? বটে! তাহা আমি বুঝিব, তুমি যাও। আমি তাহার আদেশ পালন করিলাম। রাজা আমাদের ষড়যন্ত্র টের পাইলেন। তবে আমাকে কিছু বলিলেন না। বরং তখন হইতে আমাকে অধিকতর স্নেহ করিতে লাগিলেন। তার কিছু দিন পর অনুমান ১৮৯১ নরেন্দ্রনাথকে পোষ্যপুত্র লওয়া হইল। তখন রাজবাড়ি হইতে মদ‘তো উঠিয়া গেলই বাদ্যযন্ত্র সব, পাখোয়াজ, তবলা, বেহালা প্রভৃতি বন্ধুবান্ধদিগের মধ্যে বিলাইয়া দিলেন, বলিলেন—–এসব থাকিলে ছেলে নষ্ট হইবে—-তার লেখাপড়া কিছু হইবে না।’ (আমার স্মৃতিকথা-৯ পৃষ্ঠা)। পারিবারিক স্নেহ মমতায় আবিষ্ট রাজা ছিলেন অত্যন্ত কৌতুক প্রিয় এবং গভীর জ্ঞানের অধিকারী। আমাদের দেশে এখনো নতুন ঘর বা পাকা বাড়ি নির্মাণের সময় প্রথমত দুই চার কোপ মাটি কেটে মোনাজাত করা হয়। অনেক সময় গর্তের মধ্যে টাকা পয়সা ফেলা হয়। তখনকার দিনে গর্তমধ্যে সোনা, রুপা দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। রাজা আর,এস,কে স্কুলের মূল বিল্ডিংটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকালে সোনা আনা হয়েছিল কিন্তু রুপা আনা হয় নাই। ত্রৈলোক্যনাথের পকেটে দুই আনার রুপার মুদ্রা ছিল। তিনি তা গর্তমধ্যে ফেললে রাজা হেসে বললেন, ‘বেশ হইল, এই স্কুল বিল্ডিং এর দুই আনা যত্ন হইল তোমার।’  আমি বলিলাম এ হাতি পোষা রাজরাজাদেরই খাটে—-গরীব স্কুল মাস্টারের কাজ নয় (স্মৃতিকথা-২১)।

আর একদিনের কথা, স্বাস্থ্য পরিবর্তনের জন্য রাজা ঢাকা থেকে গ্রীনবোট এনে বেলগাছি নিয়ে পদ্মা নদীতে অবস্থান করছিলেন। ত্রৈলোক্যনাথের কথায়—-‘আমি গিয়া বোটে উঠিলাম। রাজা তখন নৌকায় বসিয়া ছিপ দিয়া মাছ ধরিতেছিলেন। আমাকে দেখিয়াই বলিলেন, কী হে, ব্যাপার কী? ঠিক ঐ সময়ে ভারী ওজনের একটি কাতলা মাছ লাফ দিয়া নৌকা গর্ভে পড়িল। তিনি আনন্দিত হইয়া বলিলেন—-‘তুমি তো আচ্ছা মৎস্যরাশির মানুষ? আমি এক ঘন্টা বসিয়া আছি একটি মাছেও টোপ গিলছে না, আর তুমি আসা মাত্র তোমাকে দেখিতে আসিল। (পৃষ্ঠা-১৭)।

ত্রৈলোক্যনাথ গ্রীনবোটে রাজার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন একটি বিষয়ে পরামর্শ করতে। ফরিদপুরের সেটেলমেন্ট অফিসার জ্যাক সাহেব (আইসিএস) গ্রাজুয়েটদের মধ্য থেকে কানুনগো নিয়োগ করছেন। যারা এখন ঢুকবে তারা কানুগো কাজ শেষ হইলে সাব ডেপুটির কাজ পাবে। ত্রৈলোক্যনাথ জ্যাক সাহেবের সাথে দেখা করে চাকরিত যোগদানের জন্য সাতদিনের সময় নিয়ে এসেছেন। এখন রাজার অনুমতি পেলে যোগদান করবেন। ত্রৈলোক্যনাথের সব কথা শুনে রাজা বললেন, ‘বেশ তো স্কুল ঘরে তালা লাগাইয়া যাও। আমি স্কুল করিয়াছিলাম যখন রাজবাড়ির চর্তুদিকে ২০ মাইলের মধ্যে কোনো স্কুল ছিল না। একমাত্র ফরিদপুর জেলা স্কুল ছাড়া রাজবাড়িতে মাত্র ঈশ্বর পণ্ডিতের ছাত্রবৃত্তি স্কুল ছিল। তাহাও ভালোরুপ চলিত না। আমি স্কুল করিবার ৫ বছর পর বাণীবহের বাবুরা স্কুল করিলেন (গোয়ালন্দ হাইস্কুল)। তখান আর আমার স্কুল রাখিবার কী প্রয়োজন ছিল? একমাত্র তোমার জন্যই স্কুল রাখিয়াছিলাম। তুমি ডাকঘরে চাকরি পাইলে তাতে মন বসিল না। আসিলে রাজবাড়ি স্কুলে-২৫০ টাকা ছাড়িয়া ৫০টাকায় এখন চাও মেঠো আমিনী করিতে। জ্যাক সাহেবের বাচ্চা —-জল কাদা ভাঙ্গিয়া, ঝড় বৃষ্টি মাথায় করিয়া বুট পায়ে ছুটবে মাঠে ঘাটে। তোমাকেও দৌড়াইতে হইবে। তোমাকেও সঙ্গে সঙ্গে দৌড়াইতে হইবে। পারিবে তাল সামলাইতে?’ (পৃ-১৭১৮)। এরপর ত্রৈলোক্যনাথ স্কুল ছেড়ে যাননি। সুদীর্ঘ ৪২ বছর উক্ত বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।

রাজা বিদ্যান ছিলেন না কিন্তু বিদ্যার প্রতি ছিল গভীর অনুরাগ। গোয়ালন্দ মহকুমার গভর্ণমেন্ট সাহায্যকৃত হাইস্কুলটি পদ্মার ভাঙ্গনে নদীগর্ভে বিলীন হলে রাজবাড়ি উঠে আসে এবং তৎকালীন ডিপিআইসিএ মার্টিন সাহেবের অনুরোধে রাজা সূর্যকুমার এর পরিচালনার ভার গ্রহণ করেন। রাজা সূর্যকুমার প্রতিষ্ঠিত হাসপাতাল সংলগ্ন স্থানে (বর্তমান এসপি ও সিভিল সার্জন এর বাসা যে স্থানে ঐ স্থানটিতে সূর্যকুমার প্রতিষ্ঠিত হাসপাতল ছিল। পরে তা সিভিল সার্জনের অফিস ছিল)। স্থানান্তর করা হয়। কোনো কারণে বিদ্যালয়টি পরিচালনা সম্ভব না হওয়ায় রাজা ১৮৮৮ সালে রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশনটি (R.s.k) প্রতিষ্ঠা করেন। কেবল রাজবাড়ির ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর এস কে ইনস্টিটিউশনর প্রতিষ্ঠাতাই নন, নিজ গৃহে গড়ে তোলেন লাইব্রেরি। রাজার মৃত্যুর পর শ্যালক মতিলাল জমিদারী দেখাশোনা করতেন। তিনি কিছুটা অপ্রকৃতস্থ ছিলেন। লাইব্রেরি বিষয়ে ত্রৈলোক্যনাথ লিখেছেন—‘একদিন শুনিলাম মতিলাল রাজার লাইব্রেরিটি রাজবাড়ি উডহেড লাইব্রেরিকে দান করিয়া বসিয়াছেন। —-আলমারী বুককেসসহ এবং এসডিও আর এস দাসকে কথা পর্যন্ত দিয়া ফেলিয়াছেন। আমি সারা থেকে (ত্রৈলোক্যনাথ ১৯১৯ হইতে ১৯২৪ পর্যন্ত সারা স্কুলে ছিলেন) ছুটিয়া আসিয়া এসডিও’র সঙ্গে দেখা করিয়া বললেন, ঐ লাইব্রেরিটি রানীদের —-তাহারা বহু টাকা ব্যয় করিয়াছেন উহার পিছনে। তাহারা এখনো জীবিত। তাছাড়া আমরা স্টেটের  একজিকিউটর মাত্র। স্টেটের বা অন্যের সম্পত্তি দান করিবার কোনো অধিকার আমাদের নেই। আপনি কিছু মনে করিবেন না।’ অতঃপর মতিকে বললেন, ‘একি তোমার পৈত্রিক সম্পত্তি যে দান করিয়া বসেছিলে।’ (পৃষ্ঠা-৮০)? এর পর মতিলাল ঘোষ দস্তিদার কাবিলপুর পরগনা পরিদর্শন করতে যেয়ে ‘জগন্নথ’ বেশ ধারণ করেন। প্রকৃতপক্ষে তার মুস্তস্ক বিকৃতি ঘটে(১৯২২)। পূর্বেই বলা হয়েছে রাজা ভুবেনশ্বরে একখানি বাড়ি এবং ভূ-সম্পত্তি করেন। রানীদের নিয়ে রাজা শেষজীবন ভূবেনশ্বরেই কাটান। অনুমান ১৯১২ সালে রাজা ভূবেনশ্বরে দেহত্যাগ করেন। সেখানেই রাজার শ্রদ্ধাদি এবং পারলৌকিক কার্যাদি সম্পন্ন হয়। রাজার শ্রদ্ধাতে এক হাজার ব্রাহ্মণ নিমন্ত্রিত হন। পাণ্ডাদের সাহায্যে এবং নিমন্ত্রিত অতিথেদের ভোজন ও দক্ষিণা দ্বারা আপ্যায়িথ ও পরিতুষ্ট করা হয়। পূর্ব হইতেই রাজাকে যেখানে দাহ করা হয় সেখানে শিব মন্দির প্রতিষ্ঠার সঙ্কল্প ছিল এবং যথাসময়ে রাজার প্রথম পক্ষের শ্যালক এবং দ্বিতীয় পক্ষের সম্পর্কীয় শ্যালক অম্বিকাচরণ মজুমদার (ফরিদপুর) এবং ত্রৈলোক্যনাথ এর সহযোগিতায় শিবমন্দির নির্মাণ করা হয় শিবমন্দির নির্মাণ করতে অনেক টাকা কড়ি খরচ হয় যা রাজবাড়ির জমিদারী থেকে লওয়া হয়।

মৃত্যুর পূর্বে রাজা উইল রেখে যান। উক্ত উইলে রাজার দুই রানী, শ্যালক মতিলাল ঘোষ এবং শ্রী ত্রৈলোক্যনাথকে এস্টেটের একজিকিউটর নিযুক্ত করেছেন। উইলে আরো একটি শর্ত ছিল রাজার জীবনান্তে মতিলাল ও তার স্ত্রী পুত্রগণ (সাবালক না হওয়া পর্যন্ত ) মাসোহারা পাইবেন। কুমারের (সৌরিন্দ্র) তখন সাবালক হওয়ার এক বছর বাকি ছিল। এরমধ্যে মতিলাল জমিদারী দেখাশোনা করলেও তার মানসিক ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। ত্রৈলোক্যনাথ তখন ফরিদপুরের ডিএস-জেএ উডহেড (আইসিএস) এবং উকিল অম্বিকাচরণ মজুমদারের সাথে আলাপ করে সৌরেন্দ্র মোহনের হাতে স্টেটের ভার বুঝিয়া দেওয়ার প্রস্তাব করেন। এতে ডিএস সম্মত হন। সৌরেন্দ্র মোহনকে স্টেটের ভার বুঝিয়ে দিওয়া হয়। এদিকে অপ্রকৃতস্থ মতিলালকে একরকম জোর করে বরিশালে নেওয়া হয়। সে খুব কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করতে থাকে। অপ্রকৃতস্থ হলেও মতিলাল রাজবাড়ি এসে উকিলের সাহয্যে উইলের শর্ত ধরে কুমারের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তাকে ১০ হাজার টাকা দিয়ে ত্রৈলোক্যনাথ মামলা তুলে নেওয়ার ব্যাবস্থা করেন। সৌরিন্দ্র মোহন এস্টেটের মালিক হয়ে জমিদারী পরিচালনা করেন। উল্লেখ্য সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জেসমিন চৌধুরী পিএইচডি এর লক্ষে, ‘রাজা সুর্যকুমার ও সমকালীন মুসলমানদের আর্থ সামাজিক অবস্থা’ অভিসন্দর্ভ (থিসিস) রচনায় কর্মরত আছে।