যশোহর রাজ প্রতাপাদিত্যের সেনাপতি রঘুর বংশধর বাগডুলিতে

যশোহর রাজ প্রতাপাদিত্যের সেনাপতি রঘুর বংশধর বাগডুলিতে

পাংশা উপজেলার রঘুবীর সম্বন্ধে কথিত নানা কাহিনী লোকমুখে শোনা যায়। পাংশার কোনো একজন ব্যক্তি আমাকে বলেছিলেন কথিত আছে এ অঞ্চলে রঘুবীর নামক এক অসম বীর ছিলেন যিনি বড় আকারের একটি নৌকা মাথায় করে বহন করতে পারতেন। খাদ্যখানা ছিল দিনে ২০/২৫ জন মানুষের খাদ্যের সমান। হাজার লোকও তার সাথে লড়তে সাহস পেত না—-ইত্যাদি। ভদ্রলোক আমাকে এ বীরের কাহিনীর সত্যতা খুঁজে পেতে অনুরোধ করেছিলেন। এক্ষণে এর রঘুবীরের সন্ধান করা গেছে যিনি যশোহর রাজ প্রতাপাদিত্যের অন্যতম সেনাপতি ছিলেন। তবে রঘু নয় রঘুর ছেলে বাস করতেন পাংশার বাগডুলিতে।

বাংলায় বারভূঁইয়াদের মধ্যে স্বাধীনচেতা যশোহর-খুলনার পরাক্রমশালী ভূঁইয়া ছিলেন প্রতাপাদিত্য। পিতা বিক্রমাদিত্যর ১৫৮৩ সালে মৃত্যুর পর ১৫৮৪ সালে প্রতাপাদিত্যের রাজ্যাভিষেক হয়। সে সময় সম্রাট ছিলেন মহামতি আকবর। প্রতাপাদিত্য প্রবল ও পরাক্রমশালী জমিদার হিসেবে অচিরেই আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি বিভিন্ন স্থানে দুর্গ নির্মাণ এবং সুশৃঙ্খল সৈন্যদল গঠন করে যশোর খুলনাসহ উড়িষ্যা পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করেন। প্রতাপাদিত্যের সময়ে সম্রাট আকবরের সেনাপতি মানসিংহ বঙ্গের সুবেদার হয়ে আসেনে (১৫৮৯-১৬০৪) এবং রাজমহলে রাজধানী স্থাপন করেন। ১৬০৩-০৪ খ্রিস্টাব্দে মানসিংহ যশোহর আক্রমণ করেন। প্রতাপের সাথে মানসিংহের যুদ্ধ ও সন্ধি হয়। ১৬১০-১১ ধুমধাটের নৌ-যুদ্ধে প্রতাপের পরাজয় হলে প্রতাপ পিঞ্জিরাবদ্ধ হয়ে আগ্রায় প্রেরিত হন। পরে বারানসীতে তাঁর মৃত্যু হয়। প্রতাপাদিত্যের ছিল ৫২ হাজার ঢালী, ৫১ হাজার তীরন্দাজ, বিশ হাজার পদাতিক এবং বিপুল পরিমাণ কুকী সৈন্য। তাঁর কয়েকজন সেনাপতির মধ্যে রঘু ও মুঘা ছিলেন অন্যতম। সেনাপতি রঘুর অধীনে ছিল একদল পার্বত্য কুকীর সুঠাম দেহের শক্তিশালী সৈন্যদল। তারা তীর, ধনুক, বর্শা ও টাঙ্গী দিয়ে যুদ্ধ করত। তারা নৌবিদ্যায়ও পারদর্শী ছিল। যশোর-খুলনার ইতিহাসের ২৬৯ পৃষ্ঠায়—‘প্রতাপাদিত্যের সেনাপতি রঘুর নিবাস ছিল রাজবাড়ি জেলার দক্ষিণে গড়াই নদীর ওপারে বর্তমান ঝিনাইদহ জেলার শ্রীপুরে। তিনি সৌপায়ন গোত্রীয় নাগবংশীয় বরেণ্য কায়স্থ ছিলেন। পূর্বপুরুষ কর্কট তারা উজালীয়া পরগানার অধীশ্বর হয়ে শৈলকুপায় ছিলেন। রাজা কর্কটের বংশধর রাজবল্লভ। রাজা রাজবল্লভের পৌত্র রঘুনাথ ছিলেন রাজা প্রতাপাদিত্যের সেনাপতি। তিনি পূর্ব দেশীয় সৈন্যদলের অধিনায়ক ও দুর্গাধ্যক্ষ ছিলেন।’ কিঙ্কর রায় রচিত—-নাগবংশ ঢাকুর পৃষ্ঠা-১৪-১৫

  • প্রতাপ আদিত্য রাজা বঙ্গ-অধিপতি,
  • পূর্ব খণ্ডে ছিল তাঁর রঘু সেনাপতি
  • মানসিং হস্তে সদা—–প্রতাপ পড়িল
  • মাহযুদ্ধে রঘুবীর প্রাণ বিসর্জিল
  • বিস্ময় বিভব সব পর হস্তগত
  • দেবালয় সমজিদে হইল পরিণত।

রঘুবীরের মৃত্যুর পর তাঁর জমিদারী মানসিংহের সময়ে বাজেয়াপ্ত হয় নাই। সম্ভব ত ইসলাম খাঁর সেনানী ইনায়েত খাঁর আদেশে তা সাধিত হয়। তখন রঘুর পুত্র রামনারায়ন রাজ্যহীন হয়ে শৈলকুপা ত্যাগ করে বাগডুলী গ্রামে (রাজবাড়ি জেলার পাংশা থানার অন্তর্গত) বাস করেন। এরপর এ বংশ নান স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। সম্ভবত বাগডুলীতে বসবাসরত রঘুর পুত্রের কারণে অত্র অঞ্চলে রঘুবীর সম্বন্ধে নানা কাহিনী ছড়িয়ে পড়ে।