‘শখের পালঙ্ক’

মূলঘর ও পালঙ্ক কাহিনী

‘শখের পালঙ্ক’ শিরোনামে দৈনিক পত্রিকার পাতায় একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। পালঙ্কটি অনেক বছর পূর্বে জাতিয় জাদুঘরকর্তৃক রাজবাড়ী জেল থেকে সংগৃহীত হয়। বর্ণনানুসারে কাঠ, লোহা, কাচ ও কাপড় দিয়ে তৈরি গোটা খাটটি চারটি বাঘের থাবার উপর দাঁড়িয়ে আছে। থাবার উপরিভাগে টুলের অনুরুপ প্রায় বৃত্তাকার পাটাতনের উপর একটি হস্তি শাবক। তার পিঠের উপর একটি সিংহ শাবক আক্রমণোদ্যত ভঙ্গিতে দুই পা দিয়ে হস্তির শুঁর আঁকাড়ে ধরে আছে। সিংহ শাবকটিকে আবার ঠোকরাচ্ছে একটি উড়ন্ত গরুড় পাখি। জোড়াবিহীন কাঠের বাঘের থাবার উপর পর পর তিনটি জীব জানোয়ারের ফিগার অনুপম সৌন্দর্য দান করেছে। গোটা পালঙ্কটি চারপায়াসদৃশ্য চার খুঁটির উপর ন্যাস্ত। বিশাল পাটাতন, পাটাতনটির বেদ আনুমানিক দেড়ফুট। ভেলভেট কাপড় আচ্ছাদিত নরম বিছানা। চার পায়ার উপর নৃত্যরত ভঙিমায় দাঁড়ানো কম বয়সী চার নগ্ন রমণী। নগ্নিকা রমণীর ডানহাত স্পর্শ করে আছে মশারীর স্ট্যান্ড। শয্যায় উঠার জন্য তিন ধাপ বিশিষ্ট আলাদা ছোট সিঁড়ি। বিছানার প্রবেশপথে অতন্দ্র প্রহরীর মতো বসে আছে দুটি সিংহ। পাটাতনের কাঠামোতে লোকজ চিত্রকর্ম, ফুল লতাপাতার অলঙ্করণ। শিয়য়ের ডানে ও বাঁয়ে হস্তিশাবকের কাছেই দু’জন তরুণী। পালঙ্কটির শিরোভাগে প্রসাধনী সামগ্রী রাখার জন্য আছে একটি কাঠের বাক্স। এ খাটের মালিক কোনো সুরুচিবোধের জমিদার সে খোঁজ করতে করতে পাওয়া গেল মূলঘর জমিদার বংশের ইতিহাস। খাটটির মালিক ছিলেন মূলঘরের কোনো এক ভূমিপতি। নবাব, মোগল ও ইংরেজ শাসনকালে বঙ্গে আচার্য, বৈদ্য, কাশ্যপ, মজুমদার, রায়, রায়বাহাদুর, মুন্সি, রায়চৌধুরী, সেন ইত্যাদি জমিদার বংশের বিকাশ ঘটে। এরা,রায়বাহাদুর, মুন্সি, রায়চৌধুরী, সেন ইত্যাদি জমিদার বংশের বিকাশ ঘটে। এরা বিত্তে, শিক্ষায়, শাস্ত্রে উচ্চবংশীয় হিন্দু। তাদের মধ্যে সুরুযপারী গ্রহবিপ্রগণ বেদ-বেদান্ত, জ্যোতিষশাস্ত্র চর্চাকারী শাস্ত্রীয় সুপণ্ডিত। ভক্তি, শোধন, সাধনে সদা সর্বদা নিয়োজিত। তৎকালীন ফরিপুর জেলার গোয়ালন্দ মহকুমার (রাজবাড়ী জেলা) মূলঘর, দ্বাদশী, পাঁচথুপী, খালকুলায় তাদের বসতি গড়ে ওঠে।

প্রায় চারশত বছর পূর্বে কাশ্যপ গোত্রীয় মধুসূদন উপাধ্যায় নামক এক জ্যোর্তিবিদ পন্ডিত এ বংশের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি পঞ্চকোটের রাজার সভাপন্ডিত ছিলেন। সপ্তদশ শতকের প্রারম্ভে চন্দ্রনাথ তীর্থ দর্শন শেষে পঞ্চকোটে প্রত্যাগমণকালে ভূষণার মুকুন্দরাম রায়ের সভায় উপস্থিত হন। সঙ্গে ছিলেন পুত্র বিশ্বরুপ। মধুসূদনের মতই যুবক পুত্র সুপন্ডিত ছিলেন। জ্যোতিষশাস্ত্রে তিদের অগাধ পান্ডিত্য ছিল। মুকন্দরামের সভায় এরুপ মহাপন্ডিতের অভাব ছিল। মুকুন্দরাম তাঁকে সভায় থেকে যওয়ার অনুরোধ করেন। মধুসূদন তাতে রাজী হন না তবে পুত্র বিশ্বরুপকে প্রেরণ করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। মধুসূদন পঞ্চকোর্ট ফিরে পুত্রকে স্বীয় আরাধ্য বাসুদেবসহ ভূষাণায় প্রেরণ করেন। মুকুন্দরাম চন্দনা নদীর তীরে পাঁচশত বিঘা ব্রক্ষত্রা ভূমিসহ বিশ্বরুপকে বাসস্থান প্রদান করেন। বাসুদেব বিগ্রহের নামানুসারে স্থানটির নাম হয় বাসুদেবপুর। এ স্থানটি এখন ব্যাসপুর নামে খ্যাত। বিশ্বরুপের অধস্তন একাদশ পরুষ মহাদেব আচার্য। তিনি মহাদেব ঠাকুর নামে বিখ্যাত ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন সাধক। অতঃপর ব্যাসপুরের কিছু অংশ চন্দনাগর্ভে বিলীন হলে তিনি বর্তমান মূলঘর গ্রামে কিছুদিনের জন্য বসতি স্থাপন করেন। পরে মহাদেব আচার্য সীতারাম কর্তৃক শিবত্রা ও ব্রক্ষত্রা পাঁচষশত বুঘাপ্রাপ্ত জমি দান সূত্রে পাওয়া এবং সীতারামের অনুরোধে চন্দনা নদীর তীরে বাগাট গ্রামে বসবাস করেন। তবে মূলঘেরর সরুজপারী গ্রহবিপ্রকূলের রামকন্ত আর্চাযের পূর্বে পুরুষেরা মূলঘরে থেকে যায়। এই রামকান্ত আচার্যের পূর্ববংশীয় সুরুজপারীসকল, ষ্ফটিক পাথরের একটি সূর্যমূর্তি ও দামোদর নামক এক নারায়ণমূর্তির সেবা করতেন। সূর্যমূর্তিটি ছিল গোলাকার। প্রতিদিন পূজার পূর্বে চন্দন দিয়ে ধৌত করার পর অপূর্ব রশ্মি নির্গত হত। কোন যুগে বা কোথা থেকে এমন উজ্জ্বল ষ্ফটিক পাথরের মূর্তি আনা হয়েছিল তা জানা যায় না। অন্য আর একটি মূর্তি দামোদরমূর্তি। দামোদর প্রকান্ড নারায়ণমূর্তি। এই মূর্তিটি ছিল বেশ ভারি। বিগ্রহ দুটির জন্য তৎকালীন রাজারা প্রচুর সম্পত্তি দেবত্রা ও ব্রক্ষত্রা হিসেবে দান করেন। রাজা সীতারামের রাজ্যের অধীন এ অঞ্চলটি সীতারামের মৃত্যুর পর নাটোর রাজা রামজীবন এর জমিদারীপ্রাপ্ত হন। তিনিও ২৫ বিঘা দেবত্র সম্পত্তি তাম্রপাত্রে লিখে রামকান্ত আচার্যকে দান করেন। রামকান্তের বংশের অধস্তন পুরুষ পুত্রহীন হওয়ায় দ্বাদশীর ভরদ্বাজ গোষ্ঠীর হরিপ্রসাদ ঐ বংশের একমাত্র কন্যাকে বিবাহ করে মূলঘরবাসী হন। তাঁর বংশধরেরা উক্ত বিপুল পরিমান ব্রক্ষত্রা, দেবত্র সম্পত্তি ভোগ দখল করে আসছিলেন। তখন ফরিদপুর জেলা প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি। ঐ সকল জমি যশোর জেলার অধীন ছিল। কিছু জমি বেদখল হয়। ঐ বংশের গোলকচন্দ্র সে সব জমি উদ্ধার করেন।

প্রাচীন এই গ্রামের প্রাচীন নির্দশন হিসেবে বড় বড় দিঘিকা (দিঘি) দেখা যায়। আচার্য মহাশয়দের বিস্তৃত ভূমি ছিল অরণ্যাকার। নিবিড় অরণ্যসম স্থানে বৃক্ষরাজি, গভীর জলাশয়, দামদল ফসলের মাঠ এক অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যভূমি। এ সব জলাশয়ে কুম্ভীর ও বনে ব্যাঘ্র বাস করত। আম, কাঁঠাল, শুপারি ফলবন বৃক্ষের আস্বাদনের ছায়ায় শিল্প চর্চায় নুবৃত্ত কোনো সুরুচিবান আচার্য প্রাকৃতিক পরিবেশের ব্যাঘ্র, হাতি, এবং নানা জীব জানোয়ারের প্রতীক নিয়ে ঐ অনুপম সৌন্দর্যের খাট নির্মাণ করেন। ইতিহাসের ঘটনা প্রবাহে খানখানাপুরের জামিদার মাখন বাবু খাটটির মালিক হন। এরপর মাখন বাবুর নিকট থেকে খাটটি আসে গোয়ালন্দ নিবাসী মোস্তফা সাহেবের ঘরে । মোস্তফা সাহেবের নিকট থেকে ঢাকা জাদুঘর খাটটি অধিগ্রহণ করে।

রাজবিড়ি জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য (পৃষ্ঠা-১২৮)