মহানায়ক স্বামী সমাধি প্রকাশারণ্য

মহানায়ক স্বামী সমাধি প্রকাশারণ্য-মহানায়ক যাঁর তত্ত্ব, আদেশ, উপদেশ, কর্ম পরিধি

স্বামী সমাধি প্রকাশারণ্য কিংবদন্তির মহানায়ক যাঁর তত্ত্ব, আদেশ, উপদেশ, কর্ম পরিধি, বিদেশ বিভুঁইয়েও কথিত। রাজবাড়ী জেলা নলিয়া জামালপুরের ঊনবিংশ শতাব্দীর আশির দশকে জন্মগ্রহণ করেন স্বামী সমাধি প্রকাশারণ্য। বাল্যকালে তার নাম ছিল নরেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যয়। সাধারণ লোকে বলে নরেশ পাগলা। এই নরেশ পাগলাই পরে আর্যসংঘের প্রতিষ্ঠা ও সভাপতি।

স্বামী প্রকাশারণ্য তৎকালীন সময় প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে ইংরেজিতে এমএ পাশ করেন। ছাত্রকালীন শ্রী রামকৃষ্ণের মানসপুত্র ব্রহ্মনিন্দ মহারাজদের সাথে তার আলাপচারিতা ছিল। লেখাপড়া শেষে তিনি বালিয়াকান্দি হাই স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। পনের বছর তিনি এ পেশায় ছিলেন। ব্রক্ষচারী সাধক এতে তুষ্ট হননি। পিতা বিবহ দেন কিন্তু তিনি ঘর সংসারে আটকে থাকেন না। কোন সুদূরের পিয়াসা তার মধ্যে। শিক্ষক জীবনেই তার বানপ্রস্থ অবস্থা। শিক্ষকতা কাজে থাকাকালীন তার বেশভূষা দেখলেই বোঝা যেত তিনি একজন সাধক বা সাধু পুরুষ। পরনে হাঁটু পর্যন্ত লম্বিত পাজামা, গায়ে খদ্দরের হাফ জামা, পায়ে সেন্ডেল। মাথায় তেলহীন চিকন কালো চুল। দীর্ঘ ঋজু দেহ। গৌরকান্তি তেজোদ্দীপ্ত চেহারা দেখলেই বোঝা যায় তিনি অপবিগ্রহ সাধকের মূর্ত প্রতীক।

ফরিদপুর জেলার শিক্ষক সম্মেলনে যোগদান করেন। সেখানে তাঁর অভিভাষণ থেকে চালু হয় বিদ্যালয়ে প্রাথমিক ধর্ম শিক্ষা। যেখানে ধর্ম সভা, কীর্তন, ভাগবত পাঠ, ধর্মালোচনা সেখানেই মাস্টার মশাই। বাল্যকাল থেকেই ব্রাহ্মণ হয়ে আচণ্ডাল শুদ্রদির সাথে মিশে গেছেন। তাদের অন্ন ভোজন করেন। বুঝেছিলেন জাতি ভেদ প্রথা সমাজ প্রভূত ক্ষতিসাধন করছে। এর বিরদ্ধে ঘোষণা করেছিলেন বিদ্রোহ। লিখলেন, জাতিকথা পরশমণি। এসকল পুস্তকে প্রমাণ করলেন জাতিভেদ প্রথার অসারতা। সত্যের সন্ধানে দিনাজপুরের এক হাঁড়ি তার কাছে দীক্ষা প্রার্থী হলে স্বামীজি নিজেই দীক্ষাগ্রহণ করলেন দিনাজপুরে তার বাড়িতে যেয়ে।

ব্রহ্মচারীর মুক্তি মনুষ্য জীবনের পরম কাম্য। এ পথে আসতে হলে প্রয়োজন ব্রহ্মকালচার বা সমাধি সাধন। দীক্ষা গ্রহণের পর তিনি ‘স্বামী সমাধি প্রকাশারণ্য’ নাম গ্রহণ করেন। প্রতিষ্ঠা করেন আর্য সংঘ। আর্য সংঘের মাধ্যমে তিনি তাঁর মত, পথ ওত্ত্ব প্রকাশ করেন। তিনি বলেন জন্মান্ত রবাদ কোনো মিথ্যা নয়। উহার সদৃশ্য দার্শনিক যুক্তির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব। এর থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় সাংখ্য যোগ। তিনি ঘোষণা করেন সমাধি জাত বিজ্ঞানই সম্যক বিজ্ঞান। তা দ্বারাই দুঃখের নিবৃত্তি হয়। গৌতম বু্দ্ধ বা শ্রী রামকৃষ্ণের মতো তার মতবাদ তৎকালীন পূর্ববাংলাসহ ভারতে বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তার লাভ করে। গড়ে ওঠে সংঘ, মঠ, সমাধি, আশ্রম। এরই সূত্র ধরে তৎকালীন পশ্চাৎপদ জনপদ জঙ্গল ইউনিয়নে ১৯৩৯ সালে গুরুজীর ইচ্ছা ও দরদী মনের পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় আর্য সংঘ আশ্রম, মঠ ও মন্দির। স্থাপিত হয় হাট-বাজার পোস্ট অফিস, আর্য সংঘ বিদ্যালয়। আশ্রম প্রাঙ্গণে প্রতিষ্ঠা করলেন পার্থ সারথী মন্দির। স্থানের নাম দিলেন সমাধিনগর। এখানে বরেণ্য ব্যক্তির আগমন ঘটে। সমাধিনগর পার্থ সারথী মন্দির আশ্রম ভগ্নপ্রায়।

 

(প্রফেসর মতিয়র রহমান)