মশাররফ সাহিত্যে বিদ্রোহী প্যারীসুন্দরী

মোসতাফা সতেজ

প্যারীসুন্দরী ছিলেন নীল বিদ্রোহী জমিদারদের মধ্যে অন্যতম। নীলকরের সর্বগ্রাসী থাবা থেকে প্রজাদের রক্ষা করাই ছিল তার ধ্যান-জ্ঞান। নীল আন্দোলনের ইতিহাসে এই সাহসী নারী জমিদার উজ্জ্বল হয়ে আছেন। মীর মশাররফ হোসেনের সাহিত্যেও তিনি উঠে এসেছেন আপন মহিমায়। তৎকালীন নদীয়া জেলার কুষ্টিয়া সদরপুরের জমিদার ছিলেন প্যারীসুন্দরী। পাবনা শহরের রাধানগরে তাদের তহশীল কাচারিবাড়ি ছিল। তারা এডওয়ার্ড কলেজের জন্য কিছু জমি দান করেছিলেন। কলেজে প্যারীসুন্দরীর নামে এক সময় স্কলারশিপ দেওয়া হতো। এ রকম একজন জমিদার সুখ-স্বার্থ উপেক্ষা করে কুষ্টিয়ার শালঘর মধুয়ার নীলকর টমাস আইভান কেনির বিরুদ্ধে যেভাবে লড়েছেন, প্রজা স্বার্থে প্রাণ উৎসর্গ করেছেন তা অবশ্যই স্মরণীয়। তার বিরোধীতার কারণেই ধানি জমিতে নীল বুনতে বাধা পেয়ে বারুদ হয়ে ওঠেন কেনি। প্যারীকে ধরে নীল কুঠিতে নিয়ে যাওয়ার জন্যে তিনি পুরস্কার ঘোষণা করেন হাজার টাকা। কেনি তাকে বিলেতি সাবান দিয়ে ময়লা পরিষ্কার করে বাঙালির গন্ধ শরীর থেকে দূর করতে চেয়েছিলেন। গাউন পরিয়ে মেমসাহেব সাজিয়ে তার কুঠিতে রেখে দিতেও চেয়েছিলেন। অত্যাচারী নীলকরের এমন কথায় প্যারী সুন্দরীও পাল্টা জবাব দেন। তিনি উল্টো কেনির স্ত্রীকে ধরে তার সামনে আনার জন্যে হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেন। আজীবন তার চাকরি বজায় রেখে তার বংশ ধরদের বিশেষ বৃত্তি দানেরও ঘোষণা দেন।

অনিচ্ছাকৃত নীলচাষীরা কীভাবে তাদের সামাজিক মর্যাদা হারিয়েছেন, লাঞ্ছিত হয়েছেন, নীলকরদের হাতে সর্বস্ব হারিয়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছেন, যারা পালাতে পারেননি তারা জীবন দিয়ে চিরমুক্তি পেয়েছেন, অনেকে মামলার উপকরণ হয়েছেন- এসবই জানা যায় মীর মশাররফ হোসেনের সাহিত্যে। লেখক দেখিয়েছেন, কিছু দেশপ্রেমী মানুষ চিরকালই প্রজার পাশে থাকেন। যারা নিজের কল্যাণের আদর্শ, স্বাধীনকামী মানসিকতা নিয়ে অপরের প্রেরণা যোগান। প্যারী সুন্দরীর মধ্যে উল্লিখিত সব গুণই ছিল। পরাধীন ফ্রান্সের মুক্তিদাত্রী বীরকন্যা ‘জোয়ান অফ আর্ক’ এর সঙ্গে তাকে তুলনা করা হয়। নীল আন্দোলনের কালটি বাঙালির জাগ্রত চৈতন্যের বহুমুখী আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা গৌরবদীপ্ত অধ্যায়। সেই অধ্যায় ফুটে ওঠে মীর মশাররফ হোসেনের লেখায়। তার ভাষায় প্যারী ক্ষণপ্রভা বিজলী। তিনি ভীতু চাষীদের বুকের মধ্যে সাহসের স্রোত বাড়িয়ে দেন। যে স্রোত ছলাৎ ছলাৎ শব্দে ভয় তাড়ায়। চাষীরা তা অনুভব করে।

মীর মশাররফের ‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’ ১৮৯০ সালে প্রকাশিত হয়। আত্মজীবনীমূলক এই বইয়ের প্রধান চরিত্র শালঘর মধুয়ার অত্যাচারী নীলকর টিআই কেনি। নীল বিদ্রোহী জমিদার প্যারী সুন্দরীর স্থান এখানে ক্ষুদ্রতম। নীলকরের বিরুদ্ধে জাগ্রত জনতাকে অভিবাদন জানিয়েও লেখক হুশিয়ারীর সঙ্গে উভয়কূল রক্ষা করে আনন্দ ও উষ্মা প্রকাশ করেছেন। নীল বিদ্রোহের অদেখা সংগ্রাম সংঘর্ষ ষড়যন্ত্র ও সাজানো মামলার কথাও জানিয়েছেন তিনি। এসব লিখতে গিয়ে তিনি সংগ্রামী কৃষকদের অভাবী জীবন যেভাবে তুলে ধরেছেন তা যেন ইতিহাসের দূরবীন। যেখানে চোখ রাখলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে সব। অথচ তিনি কোন রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।

গৌরী, কালীগঙ্গা, নবকুমার ও পদ্মা অববাহিকা অঞ্চলে প্রজাপ্রেমী জমিদার ও নীলকরের দ্বন্দ্ব ঘিরে মশাররফের কাহিনি আবর্তিত। ইংরেজ দেখলে চাষী সমাজ ভয় পায়। কেন ভয় পায় প্যারী তা জানেন। উপনিবেশবাদী শাসনকে থোরাই কেয়াড় করে প্রজাদের অভয় দিয়ে তিনি বলেন, ‘সেও মানুষ, তোমরাও মানুষ। তোমাদেরও দুই হাত, দুই পা। তাহাদেরও তাই। … আছে কেবল রঙের প্রভেদ। আর একটু প্রভেদ আছে। তোমরা নীলকর কুঠীয়ালদের ন্যায় পরিশ্রমী নও। বুদ্ধিমানও নও। কেনীর ন্যায় মিথ্যাবাদীও নও। আমি শুনিয়াছিলাম যে, টিআই কেনী বিলাতের ভদ্রবংশীয়। কিন্তু এখন দেখিতেছি সে সকল কথার কথা। কেনী চামার অপেক্ষাও অধম। মেথর অপেক্ষাও নীচ।’
সাঁওতাল বড় মীর শালঘর মধুয়ার কুঠির একজন কুঠিয়ালকে ধরে দিন-দুপুরে তার একটি কান কেটে নেন। এ কথা তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়ে লাঠিয়ালদের উৎসাহ দেন- শুধু পড়ে পড়ে মার খাওয়া নয়। নীলকর কেনির কাছে ও তার স্ত্রীর কৌশলের কাছে পরাজয়ের পর প্যারী তার প্রধান কার্যকারক রামলোচনকে বলেন, ‘চেষ্টার অসাধ্য কী আছে? আবার চেষ্টা। এখন তোমাদের কার্য মোকদ্দমার জোগাড়। অন্যদিকে লাঠিয়াল সংগ্রহ। একদিন হাতে পাইবই পাইব। আরও একটা কথা আমি তোমাকে বলি। যে ব্যক্তি যে কোন কৌশলে কেনীর মাথা আমার নিকট আনিয়া দিবে; এই হাজার টাকার তোড়া আমি তাহার জন্য বাঁধিয়া রাখিলাম। এই আমার প্রতিজ্ঞা। আমার জমিদারী, বাড়ি-ঘর, নগদ টাকা, আসবাব যাহা আছে সমুদয় কেনীর জন্য রাখিলাম। ধর্ম সাক্ষী করিয়া বলিতেছি, সুন্দরপুরের সমুদয় সম্পত্তি কেনীর জন্য রহিল। অত্যাচারের কথা কহিয়া মুষ্টিভিক্ষায় জীবনযাত্রা নির্বাহ করিব। দ্বারে দ্বারে কেনীর অত্যাচারের কথা কহিয়া বেড়াইব। যে ঈশ্বর জগতের সুখ দেখাইবার পূর্বেই আহারের সংস্থান করিয়া মায়ের বুকে রাখিয়া দিয়াছেন, সেইখানেই সমাদরে স্থান পাইবে। দুরন্ত নীলকরের হস্ত হইতে প্রজাকে রক্ষা করিতে জীবন যায় সেও আমার পণ। আমি আমার জীবনের জন্য একটুকুও ভাবি না। দেশের দুর্দশা, নিরীহ প্রজার দুরবস্থার কথা শুনিয়া আমার প্রাণ ফাটিয়া যাইতেছে। মোকদ্দমার জন্য তোমরা ভাবিও না। যত প্রকারের তদবির হইতে পারে তাহা কর।’

কৃষি সমাজকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার সাহস যুগিয়ে গেছেন তিনি। যত রকম সহায়তা দেয়া যায় তাও তিনি দিয়েছেন। পরোয়া করেননি কিছুই। প্যারীর লাঠিয়াল বাহিনী নীলকুঠি লুট করেছে। এ ঘঠনায় দশজন আহত এবং তিনজন নিহত হয়েছে। প্যারী এ খবর শুনে একটুও ভয় পাননি। নির্ভয়ে রামলোচনকে বলেন, ‘আমি বাঙালির মেয়ে। সাহেবের কুঠী লুটিয়া আনিয়াছি, ইহা অপেক্ষা সুখের বিষয় আর কী আছে!’
প্যারী সুন্দরী সম্পর্কে কেনী তার শুভাকাঙ্খি জমিদার মীর মুয়াজ্জমকে বলেন, ‘আমরা বিলাতের লোক যতগুলি এই দেশে বাস করিতেছি, আপনাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করিয়া মনের কথা বলিতেছি, কিন্তু আমাদের মনের নিগূঢ় তত্ত্ব-গুপ্ত কথা কখনই পাইবেন না। আপনি দেখিবেন, কালে প্যারী সুন্দরীর যথা সর্বস্ব যাইবে। খুন্তি হস্তে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করিতে হইবে। এ ঘটনা শীঘ্র ঘটিতেছে না। কারণ এখনও টাকার অভাব হয় নাই। ঘটিতে বিলম্ব আছে। কুঠী লুটের মোকদ্দমায় আসামিরা সাতটি বৎসরের জন্য জেলে গিয়াছে। দারোগা খুনের মোকদ্দমায় স্বয়ং কোম্পানি বাদী। শীঘ্রই দেখিবেন সুন্দরপুরের জমিদারী খাস হইয়া কোম্পানির হস্তগত হইয়াছে।’

মীর মশাররফের ‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’ আজও পাঠককে বিস্মিত করে। নীল আন্দোলন চলাকালে লেখকের বয়স ছিল ১২ বছর। লেখক বলেছেন, ‘শোনা কথাই পথিকের মনের কথা। সে শোনাও সেই ছোট বেলায়। অসংলগ্ন ভুল-ভ্রান্তি হওয়াই সম্ভব।’ নীলকর কেনীর জমিদারীর কতক অংশ পাবনা অঞ্চলে। কিছু অংশ যশোর ও মাগুরার অধীনে। পাবনা থেকে কুষ্টিয়ার শালঘর মধুয়ায় যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম নৌকা। ১৮৬৯ সালের আগে পাবনায় রাস্তা ছিল না। প্রশাসনের লোকবল এ পথেই যাতায়াত করতেন। প্যারীর সাথে কেনি এঁটে উঠতে না পেরে মশাররফের পিতা জমিদার মীর মোয়াজ্জেমের সহায়তা চাইলে তিনি হাত বাড়িয়ে দেন। একথা লেখক অকপটে স্বীকার করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে মানবিকতাবোধও পরাস্ত হয় ব্যক্তি স্বার্থের কাছে। ভুললে চলবে না অত্যাচারী নীলকর মৃত্যুদূতের ভূমিকা স্বয়ং কেনিও নিয়েছিলেন খুব কুশলতায়। তার স্ত্রী সুপরিকল্পিত হত্যা ও বীভৎসতম নির্যাতনের যে নজির রেখেছেন ইতিহাসে তা খুব কমই দেখা যায়।

উদাসীন পথিকের মনের কথা’য় কেনি ঐতিহাসিক চরিত্র। তাকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে জমিদার প্যারীসুন্দরী এবং অন্যান্য জমিদার। লেখক প্যারী চরিত্রের ইতি টানেন আকস্মিকভাবে। ১৮৫০ সালে নীলকর কেনি কৌশলে প্যারীকে পরাজিত করেন। এরপর থেকে কেনির প্রতিপত্তি উত্তরোত্তর বেড়েই চলে। ১৮৫৯-৬০-এ শুরু হয় নীল বিদ্রোহ। এই বিশাল গণবিদ্রোহের নেতৃত্ব বাইরে থেকে আসেনি। এই বিদ্রোহ আপনা-আপনি গড়ে ওঠে। উত্তরবঙ্গ থেকে প্রথম নীল বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল। বিদ্রোহে কুঠির কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যায়। ১৮৭০- এ গড়াই ব্রিজ নির্মাণকালে কেনির কুঠি ভেঙে বাঁধের মুখ ফেলা হয়। কেনি চলে যান কলকাতা। হত্যা মামলায় প্যারী সুন্দরীর অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে সরকার তার সমুদয় জমিদারী ক্রোক করে নেয়। এ অবস্থায় একজন নারী জমিদার যে দৃষ্টান্ত রেখেছেন তা অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। তিনি আপীল করেন এবং অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে জমিদারী খালাস করেন।

ইতিহাসে উপেক্ষিতা নীল-সংগ্রামের এই বীর নারী তার চরিত্রের দৃঢ়তা, নির্ভীকতা, করুণা, সংকল্প, স্বাজাত্যবোধ ও প্রজাকল্যাণ-কামনার জন্য `উদাসীন পথিকের মনের কথা`য় অমর হয়ে রয়েছেন। তার প্রজাপ্রেম, নির্ভীকতা ও সাহসী ভূমিকার কথা ছড়া-প্রবাদে ছড়িয়ে পড়েছিল গ্রামে-গঞ্জে। যেমন `কেনির মুন্ডু কেটে লটকাবো দরজাতে,/প্যারী নাম রেখে যাবো জগতে।` নীলকর-সুহৃদ মোশাররফের পিতাও মুগ্ধ ও সহানুভূতিশীল ছিলেন এই নির্ভীক প্রজাদরদি সামন্ত নারীর প্রতি। তিনি প্যারীসুন্দরীর প্রজাদের দুরবস্থার কথা শুনে ব্যথিত হয়েছেন। আবার তার প্রতিরোধ-আক্রমণে কেনি অতিষ্ঠ হয়ে উঠলে তিনি সোৎসাহে মন্তব্য করেছেন : ‘ধন্য বাঙ্গালীর মেয়ে। সাবাস সাবাস! সাহেবকে একেবারে অস্থির করিয়া তুলিয়াছে। সাহেব এতদিন সকলকে যেরূপ জ্বালাতন করিয়াছেন, তাহার প্রতিশোধ বুঝি প্যারীসুন্দরীর হতে হয়।’