মথুরাপুরে সংগ্রাম সাহের দেউল

মথুরাপুরে সংগ্রাম সাহের দেউল-প্রফেসর মতিয়ার রহমান

বর্তমান মধুখালি পূর্বে গোয়ালন্দ মহকুমা এবং বালিয়াকান্দি উপজেলাধীন ছিল। সাম্প্রতিকালে মধুখালি ফরিদপুর জেলাভুক্ত করা হয়। মধুখালির সন্নিকটে মথুরাপুরে মন্দির সদৃশ্য প্রায় ৭০‌‍‍‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌ ফুট উঁচু, ১২টি কোণ অলম্কৃত দেওয়াল এবং ফাঁকে ফাঁকে ইটের কার্ণিশ বিশিষ্ট দেওয়াল। বির্ভিন্ন থাকের ফাঁকে ফাঁকে বিশেষ করে নিচের দিকে পোড়া মাটির চিত্রফলক বসানো। এগুলিতে রামায়ণ, মহাভারত ও অন্যান্য পৌরাণিত কাহিনীর চিত্র আছে। সর্ব সাধারণ্যে এটি ‘মথুরাপুরের দেউল’ বলে পরিচিত। দেউলটির ইতিহাস এবং নির্মাণকাল নিয়ে যেমন উৎসুক্য আছে তেমনি আছে নানা মতভেদ। ঐতিহাসিক আনন্দনাথ রায় এবং সতীশ চন্দ্র মিত্রের লেখা ফরিদপুরের ইতিহাস এবং যশোর-খুলনার ইতিহাসে উক্তি দেউলকে সংগ্রাম সাহর দেউল বলা হয়েছে। অনেকই মনে করেন মানসিংহের সাথে যশোহরের ভূমিরাজ প্রতাপাদিত্যের যে যুদ্ধ হয় তাতে প্রতাপ হেরে যান। বিজয় স্তম্ভ হিসেবে মানসিংহ তা নির্মাণ করেন। উল্লেখ্য মানসিংহ আগমন করেন ১৫৯৫ সালে এবং প্রস্থান করেন ১৬০৪ সালে। তিনি বাংলায় বার-ভূঁইয়া দমনের উদ্দেশন করেছিলেন। তখন প্রতাপাদিত্য ছিলেন যশোহরের রাজা আর মুকুন্দরাম ছিলেন ভূঁইয়া দমনের উদ্দেশ্যেই আগমন করেছিলেন।

১৬০৩ সলে ধুমঘাটে প্রতাপাদিত্যের সাথে মানসিংহের যুদ্ধে প্রতাপ পরাজিত হলে মানসিংহের সাথে তার সন্ধি হয়। এরপর প্রতাপাদিত্য ১৬০৯ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেন। প্রতাপাদিত্য ১৬০৯ খ্রিস্টব্দে ইসলাম খাঁর হাতে বন্দি হন। তার পর্বেই ১৯০৪ এর মানসিংহ আগ্রায় ফিরে যান। এদিকে ভূষণার রাজা মুকুন্দরামের সাথে মানসিংহের কোনো যুদ্ধই হয় নাই। তাই ভূষণার অন্তর্গত মথুরাপুরে মানসিংহ বিজয় স্তম্ভ নির্মাণ করবেন কেন? আনম আবদুস সোবাহান লিখিত ‘ফরিদপুরের ইতিহাস-বৃহত্তর ফরিদপুর’ গ্রন্থে ৪৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন ‘সীতারাম পতনের পর ভূষণার নিকটবর্তী মথুরাপুর গ্রামে একটি বিজয়স্তম্ভ নির্মিত হয়। সীতারাম নবাব মুর্শীদকুলি খাঁর নিকট পরাজিঁত হন।

মুর্শীদকুলি খাঁর দ্বারা তা নির্মিত হলে মুসলিম স্থাপত্য বহন করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু স্তম্ভটিতে রয়েছে হিন্দু স্থাপত্যসহ রাময়ণ, মহাভারতসহ পৌরাণিক বিষয়, যে কারণে বলা যায় তা হিন্দু স্থাপত্যসহ রামায়ণ, মহাভারতসহ পৌরাণিক বিষয়, যে কারণে বলা যায় তা হিন্দু কোনো সৈনিক বা রাজা তা নির্মাণ করেন। ইতিপূর্বে আমি রাজবাড়ি জেলার ইতিহাসে স্তম্ভটিকে সীতারামের দেউল বলে উল্লেখ করেছি। বস্ত্তত প্রাচীন ইতিহাস লিখন ব্যাপক গবেষণা নির্ভর। সে সময় রাজবাড়ি জেলার ইতিহাস রচনায় অতি নির্ভর আনন্দনাথ রায়ের ফরিদপুরের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসটি কোথাও খুঁজে পাই নাই। খন্ডিত যে অংশটি পেয়েছিলাম তাতে সংগ্রাম সাহর অংশটুকু ছিল না। এ ছাড়া যশোর-খুলনার ইতিহাস (সতীশ চন্দ্র মিত্র) গ্রন্থটির পরিপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে পরি নাই। এক্ষণে আনন্দনাথ রায়ের ১০০ বছর পূর্বে লেখা ফরিদপুরের ইতিহাস গ্রন্থটি ঢাকা থেকে পুনমুদ্রন (‘ম্যাগনাম ওপাস এবং ড. তপন বাগচী সম্পাদিত-শত বছরের শ্রদ্ধাঞ্জলি- আনন্দনাথ রায়ের ফরিদপুরের ইতিহাস, আহমদ কাউছার, বইপত্র, ৩৮/৪ বাংলাবাজার ঢাকা থেকে প্রকাশিত) হয়েছে। এ ছাড়া শত বছরের পুরোন-যোগেন্দ্র নাথ রচিত ‘বিক্রমপুরের ইতিহাস’ এবং ১৯২৮ সালে প্রকাশিত এলএন মিশ্রের ‘বাংলায় রেল ভ্রমণ’ গ্রন্থগুলি আমার হাতে থাকায়, এক্ষণে দেউলটির প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরতে পারব বলে বিশ্বাস রাখি।

প্রথমেই দেউল সম্পর্কে বলা যাক – দেউল বলতে বোঝায় দেবালয়। দেবকুল শব্দ থেকে দেউল শব্দের উৎপত্তি। দেবকুলিকা শব্দের অর্থ ক্ষুদ্র দেউল বা মন্দির। গবেষক অধ্যাপক কিলহর্ন দেবকুলিকাকে ক্ষুদ্র দেবমন্দির বলে আখ্যা দিয়েছেন। আবার এ বাক্যটি হয়ত অনেকেরই জানা ‘আছিল দেউল এক পর্ব্বত সমান। কাজেই দেউল বলতে বৃহদাকার দেব মন্দিরও বোঝায়। দেউল বা দেবমন্দির নির্মাণের প্রাচীন ইতিহাস রয়েছে। সেন রাজত্বকালে তান্ত্রীক মন্ত্রে দিক্ষিত সেনেরা স্থানে স্থানে দেবদেবী পূজায় দেউল নির্মাণ করত। তৎকালীন সেন রাজাদের রাজধানী বিক্রমপুরে দেউল নির্মাণ করত। তৎকালীন সেন রাজাদের রাজধানী বিক্রমপুরে দেউল বিষয়ে যা বলছিলাম তাতে দেউলের আকার আয়তনে দৃষ্ট হয় এটি ছিল বড় আকারের দেব মন্দির-দেবালয় বা দেউল। মথুরা পুরের দেউল বিষয়ে আনন্দ নাথের ফরিদপুরের ইতিহাসের ৮২ পৃষ্ঠায় ‘১৬৫৩ হইতে ১৬৮৪ পর্যন্ত প্রায় একত্রিংশ বৎসর পর্যন্ত এইরুপে আমরা বঙ্গদেশ ও রাজপুতনায় সংগ্রামকে দেখতে পাই। আবার এই সুদীর্ঘ সময় পর্যন্ত ঔরঙ্গজের বাদশাই দিল্লীর সিংহাসনে রাজত্বকারী ছিলেন। মোগল রাজবংশ মধ্যে আওরঙ্গজেব যত দীর্ঘকাল শাসনদন্ড পরিচালনা করেন সেরুপ আর কেহ পারেন নাই। এই সম্রাটের অধীন থাকিয়া যে একই সংগ্রাম বিভিন্ন স্থানে নানা কার্যসম্পাদন করিয়াছিলেন এদ্বিষয়ে কারো সন্দেহ থাকিতে পারে না। সম্রাট মধ্যবাঙলার ভূষণা, মাহমুদপুর প্রভৃতি স্থান তাকে জায়গীর অর্পণ করেন এবং কালিয়াতেও একটা জায়গির ছিল যাকে আজও নাওয়াড়া বলিয়া প্রসিদ্ধ আছে। ভূষণা পরগনার অন্তর্গত মথুরাপুর নামক স্থান তাহার প্রকাণ্ড বাড়ি বর্তমান ছিল। এই স্থানটি ফরিদপুর জেলার কোড়কদি ও মধুখালির স্থানদ্বয়ের সন্নিকটে অবস্থিত। কোড়কদির মাননীয় ভট্টাচার্য বংশের পূর্বপুরুষ তাহার গুরু ছিলেন। অদ্যাপি তৎপ্রদত্ত কতিপয় ভূ-বৃত্তির লিখন উক্ত মহাশয়দিগের নিকট বর্তমান আছে। মথুরাপুর গ্রামে আজিও প্রকান্ড মঠ দৃষ্ট হয় যাকে সাধারণে সংগ্রামের দেউল বলে।

এদিকে শ্রদ্ধেয় সতীশ চন্দ্র মিত্রের যশোর-খুলনার ইতিহাসের ৩৩৬ পৃষ্ঠায় ‘ভূষণার নিকটবর্তী কোড়কদি গ্রামের প্রখ্যাত ভট্টাচার্যগণ সংগ্রামের বারিত হইতে বধ্য হন। এখনো তাহাদের গৃহে সংগ্রাম প্রদত্ত ভূমি বৃত্তির সনদ আছে। যশোর কালেক্টরিতে তৎপ্রদত্ত আরো কয়েকখানি ব্রক্ষোত্তর তায়দাদ পাওয়া গিয়াছে। সংগ্রামের অন্য কীর্তির মধ্যে মথুরাপুরে তাহার সময়ে নির্মিত একটি দেউল বা মন্দির বর্তমান আছে। গল্প আছে। গল্প আছে তিনি একটি বিগ্রহ পরিচালনার জন্য মন্দিরটি নির্মাণ করিতেছিলেন, কিন্তু একজন রাজমিস্ত্রী দেউলের চূড়া হইতে পড়িয়া মৃত্যুমুখে পতিত হয় বলিয়া সে সস্কল্প পরিত্যক্ত হইয়াছিল।

সংগ্রাম সাহর বিশদ আলোচনার পর এ বিষয়ে আর সন্দেহ থাকার কথা নয় যে মথুরাপুরের দেউল অন্যকারো কীর্তি নায়। নিঃসন্দেহে দেউলটি সংগ্রাম সাহর-ই কীর্তি। বর্তমানে দেউলটি ভগ্ন প্রায়। রাজবাড়ি তথা এতদ্বঅঞ্চলে প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিজড়িত এ দেউলটি সংস্কার করতঃ ঐতিহ্যটি রক্ষা করা প্রয়োজন।

রাজবাড়ী জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য
প্রফেসর মতিয়ার রহমান