বেশিরভাগ গ্রামের সাথে পুর পরিচিতি

বেশিরভাগ গ্রামের নামের সাথে পুর পরিচিতি

পূর্বে বলা হয়েছে পুর শব্দের অর্থ জননিবেশ। পুর পরিচয়ে বেশিরভাগ গ্রাম অপেক্ষাকৃত পুরাতন বসতির গ্রাম। জেলার এসব গ্রাম খ্রিস্টীয় ২/৩য় শতক থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যে গড়ে উঠেছে বলে ধারণা করা হয়।

রাজবাড়ি সদর

বিনোদপুর, চককেষ্টপুর, গঙ্গপ্রসেদপুর, ভবানীপুর, ইন্দ্রনারায়ণপুর, কালীচরণপুর, কল্যাণপুর, শিবরামপুর, রাধাকান্তপুর, বসন্তপুর, লক্ষ্মীপুর, রাজাপুর, চাঁদপুর, কৃষ্ণপুর, রামচন্দ্রপুর, জয়রামপুর, উদয়পুর, কমলাপুর, খানখানাপুর, দর্পনারায়ণপুর, গৌরীপুর, মধুপুর, রুপপুর, রামপুর, রামকান্তপুর, বাসুদেবপুর, মহাদেবপুর, গোপালপুর, ভবানীপুর, জগৎপুর, রাজেন্দ্রপুর, আহলাদীপুর, আলীপুর, বারবাকপুর, রঘুনাথপুর, মোহাম্মদপুর, নিজাতপুর, কাসিমপুর, সুলতানপুর, নুরপুর, ইত্যাদি।

 

পাংশা উপজেলা

নারায়ণপুর, বলরামপুর, গোপীনাথপুর, জয়কৃষ্ণপুর, কল্যাণপুর, কেশবপুর, রঘুনাথপুর, রামচন্দ্রপুর, শ্রীকৃষ্ণপুর, তারাপুর, গৌরীপুর, তেজপুর, কোমরপুর, শ্যামসুন্দরপুর, ব্রক্ষাপুর, কাষ্ণনপুর, মনিরামপুর, নিভাকৃষ্ণপুর, শ্যামপুর, কাশিমপুর, চাঁদপুর, গতমপুর, বাঘাবিষ্ণুপুর, গোপালপুর, রঘুনাথপুর, নিশ্চিন্তপুর, তির্তীপুর, লক্ষ্মীপুর, রায়পুর, শিবসুন্দরপুর, বাহাদুরপুর, বকশিপুর, শাহমতিপুর, জফরপুর, নিয়ামতপুর, ইত্যাদি।

 

বালিয়াকান্দি উপজেলা

নিশ্চিন্তপুর, আজীনারায়ণপুর, রায়পুর, শ্যামসুন্দরপুর, সোনাপুর, করমচাঁদপুর, নারানপুর, রাজধরপুর, দুর্গাপুর, বহরপুর, নবাবপুর, গোবিন্দপুর, জামালপুর, শাশাপুর, গঙ্গারামপুর, সদাশিবপুর, ত্রিলোচনপুর ইত্যাদি।

 

গোয়ালন্দ উপজেলা

বিষ্ণুপুর, গোপীনাথপুর, দুর্গাপুর, লক্ষ্মীমানপুর, জয়পুর, শ্যামপুর, শীতলপুর, দেবীপুর, সাইদুরপুর, কাজিমপুর, ইত্যাদি।

 

পার্শ্ববতী জেলাসমূহ বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের জেলাসমূহ থেকে রাজবাড়ি জেলার গ্রামসমূহের নামের পরিচয়ে পুরের আধিক্য রয়েছে। আবার এসব গ্রামগুলোর নাম মানুষের নামে এবং তাদের ধর্মীয় পরিচয় হিন্দু। এলাকাটি প্রাচীনকাল থেকেই হিন্দু প্রধান হওয়ায় মোগল শাসনের পূর্ব কালেই ঐ গ্রামের ভিত্তি গড়ে ওঠে। তুলনামূলক মুসলমান পরিচয়ে পুরের গ্রাম কম হওয়ায় ধারণা করা যায় ঐ সকল গ্রামের ভিত্তি গড়ে উঠেছে সপ্তদশ অষ্টদশ শতাব্দীতে।

 

দি, দিয়া, রিয়া, বাড়িয়া-সহ গ্রামের নাম ও উৎপত্তি

ভবদিয়া, মধুরদিয়া, পাকুরিয়া, চৌবাড়িয়া, গোপীনাথদিয়া, জালদিয়া, নয়নদিয়া, আড়াবাড়িয়া, বাঘিয়া, দৌলতদিয়া, হামুরিয়া, কান্তাদিয়া, নয়নদিয়া, কুলটিয়া, গজারিয়া, আমবাড়িয়া, বোয়ালিয়া, মাসুমদিয়া, পাকাশিয়া ভেল্লাবাড়িয়া, পাঁচবাড়িয়া, নাদুরিয়া, ডামকদিয়া, সূর্যদিয়া, ভারকুদিয়া, কলকলিয়া, পিপুল বাড়িয়া, মুকুদিয়া, ঘরঘরিয়া, কুলটিয়া, পাটুরিয়া, বেড়াদি, পদমদি, তেঘারিয়া, আলোকদিয়া, ভেকুলিয়া, রামদিয়া, পদমদি, লক্ষণদিয়া, পাঁচবাড়িয়া, কোলাবাড়িয়া, খালিয়া, ভারকুলিয়া, গঙ্গাসিন্দদিয়া, ধুবুরিয়া, তেলিগাতি, কলকলিয়া, পাঁচুরিয়া, মধুরদিয়া, মাসুমদিয়া, মালিয়াট, আলোকদিয়া, হাড়োয়া, রতনদিয়া, আব্দুলিয়া, প্রেমাটিয়া, দেলুয়া, ইন্দুরদি, ভান্ডারিয়া, তেলাই, কান্তদিয়া, দৌলতদিয়া ইত্যাদি।

 

দ্বীপ ও নদী সংলগ্ন এলাকাকে  দি বা দিয়ারা বলা হয়। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর ফরিদপুর জেলার নদী সংলগ্ন এলাকায় নতুন ভূমি রাজস্ব আদায়ের আওতাভুক্ত করে রাজস্বের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়। ১৮৮১ সালে দিয়ারা সার্ভেতে মোট ২৮৭৮৮ একর জমি দিয়ারা হিসেবে খাজনার আওতায় আনয়ন করা হয়। এই দিয়ারা থেকে অনেক গ্রামের নামের পরিচিতি দিয়া বা দি এবং অপভ্রংশে রিয়া, লিয়া ইত্যাদি হয়। জেলার বেশির ভাগ অঞ্চল ভাগ নদীবেষ্টিত হওয়ায় নদী সংলগ্ন জেগে ওঠা ঐ সমস্ত চরদ্বীপের পরিচিতি হিসেবে ‘দি’ ব্যবহৃত হয়েছে। উল্লেখ্য দি, দিয়া, রিয়া, ইত্যাদি নামের গ্রামের উৎপত্তি ষোড়শ শপ্তদশ শতকে গড়ে ওঠে।

 

কান্দা, কান্দি দিয়ে গ্রামের নাম  

প্রবাহমান নদীর কিনার, বাঁক এবং বিল হওড়ের পার্শ্বস্থ এলাকাকে কান্দা, কান্দি, কিনার বলা হয়। জেলায় অনেক নদীর প্রবহমান ছিল। বিশেষ করে পদ্মা,হড়াই, গড়াই ও চন্দনার তীরবর্তী অঞলে যে সব জনপদ গড়ে ওঠে তা কান্দি নামে পরিচিত হয়। উড়াকান্দা, সোনাকান্দা, আড়কান্দি, বালিয়াকান্দি, তেরাইকান্দি, মালিকান্দা, শ্যামপুরকান্দা, লিকান্দা। কান্দা পরিচিতিমূলক শব্দ হলেও আড়, পাইক বালি অর্থ যেমন পাইক অর্থ পাখি, আড় অর্থ নদীর বাঁক, বালি অর্থ বেলে চর বোঝায়।

 

বাড়ি, বাড়িয়া, নগর, গ্রাম,পাড়া দিয়ে গ্রামের নাম ও উৎপত্তি

গ্রামের ভিত্তি গড়ে উঠলে তা বাড়ি, বাড়িয়া, গ্রাম, নগর এসব নামে পরিচিত হতে থাকে। টেংড়াপাড়া, আড়াপাড়া, গোয়াবাড়ি, বিষ্ণবাড়ি, পাঁচবাড়ি, চরকান্দবাড়ি, দক্ষিণবাড়ি, দক্ষিণবাঘাবাড়ি, পশ্চিমবাঘাবাড়ি, পাটকিয়াবাড়ি, আমবাড়িয়া, পাঁচবাড়িয়া, দেবনগর, কালিনগর, ভেল্লাবাড়িয়া, রায়নগর, বনগ্রাম, চৌবাড়িয়া, জাগিয়ালপাড়া, পিপুয়ালপাড়া, দেওবাড়ি, কোলানগর, ছায়েদপাড়া, হাজারাপাড়া ইত্যাদি।

 

খাল,খালিয়া, কালিয়া,কোলা দিয়া গ্রাম

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। যত নদী এখন আছে তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি নদী ছিল ৫০০ বা একহাজার বছর পূর্বে। নদীর বিশেষত্ব এমন যে, দীর্ঘকালে নদী ভরাট হয়ে মরে যায়। অনেক ক্ষেত্রে মরা নদী দীর্ঘকালে খালে পরিণত হয়। নদীতে অনেক সময় প্রয়োজনে খাল কাটতে হয়। নদী বাঁক গ্রহন করলে কোলে পরিণত হয়। খাল সংলগ্ন অনেক গ্রামের নাম খাল, খালিয়া কোলের পাশের গ্রাম কো বা কালিয়া বা কোল। হাজরাখালি, কান্তাখালি, কালুখালি, খালিয়া, বেজকোলা, সুরামখোলা, হিম্মতখালি ইত্যাদি।

 

বিল, ইল, ঝিল, হাওড়, দোহা, দহ পারিচিতিতে গ্রামের নাম ও উৎপত্তি

নদী মরে গেলে বিল হাওড়, দহ, দোহাতে পরিণত হয়। বিলমালেঙ্গা, বিলশ্যামসুন্দরপর, বিলসারিন্দা, বিলচৈত্রা, বিলকোনা, বিলগজারিয়া, বিলজেলা, বিলরঘুয়া, বিলছালুয়া, বিলধামু, বিলটাকাপুড়া, চাষাবিলা, বিলকাউলী, বিলবড়া, ইলাতেল, লবরদোহা, বাউলদোহা, মুচিদহ, বিলচড়া, মরাবিলা ইত্যাদি। রাজবাড়ি জেলার দক্ষিণাঞ্চলে অনেক সংখ্যক বিস্তৃত বিলের অস্তিত্ব ছিল। তেঢালা, গজারিয়া, পাকুড়িয়া, কাছমিয়া ইত্যাদি বিস্তৃত বিলের অঞ্চল ভর অঞ্চল বলে পরিচিত। এসব বিলের শাপলা শালুক এক সময়ে প্রাকৃতিক সৌর্ন্দযের লীলবৈচিত্র বহন করত।

 

 

মাছ, পাখি, পশু, ফল,বৃক্ষ, ফসলের পরিচিতিতে গ্রামের নাম ও উৎপত্তি:

গ্রাম সমাজের বিকাশের ধারায় যখন মানুষ স্থায়ী বসতি গড়ে তুলতে থাকে তখন তা বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিষয়ের পারিচিতিতে নামকরণ হতে থাকে। ঐসব বিষয়ের আধিক্যহেতু ঐ সকল নামে গ্রাম পরিচিত হয়। মহিষ-মহিষাখোলা, বেজি-বেজকোলা, নিম-নিমতলা, কৈ-কৈজুরি, খলিশা-খালিশা, পাঙ্গাস-পাঙ্গাশিয়া, শোল-শৈালকাঠি, বোয়াল-বোয়ালিয়া, শিং-শিঙ্গা, ঘুঘু-ঘুঘুশালি, বাঘ-বাঘমারা, গজার-গজারিয়া, পাট-পাটবাড়িয়া, টেংড়া-টেংড়াপাড়া, আম-আমবাড়িয়া, ভেল্লা-ভেল্লাবাড়িয়া, বাঘ-বাঘাবিষ্ণুপুর ধান-ধানুরিয়া, ঝাউগাছ-ঝউগ্রাম, হলুদ-হলুদবাড়িয়া, মাছ-মাছপাড়া, বেত-বেতবাড়িয়া, বাওই-বাওইখোলা, আখ-আখরজানি, বড়ই-বরইচারা, সরিষা-সরিষা, শামুক-শামুকখোলা, হাতি-হাতিমোহন, বন-বনগ্রাম, ইন্দুর-ইন্দুবদি, মাশুর-মাশুরাডাঙ্গী ইত্যাদি।

 

গ্রামের নাম বাঘ, হরিণ, দিয়া, গ্রামের নামকরণের পেছনে এলাকার প্রাচীনত্ব নির্দেশ করে। সে সাথে একসময় বনজঙ্গলে ঘেরা রাজবাড়ি এলাকায় এসব পশুর বসবাসের অস্তিত্ব প্রমাণ করে। সে সাথে একসময় বনজঙ্গলে ঘেরা রাজবাড়ি এলাকায় এসব পশুর বসবাসের অস্তিত্ব প্রমাণ করে। বলা যায় সেদিন পর্যন্ত অর্থাৎ ২০০০ শতকের মাঝামাঝিতে বন্য শুকরের বসবাস ছিল বিভিন্ন এলাকায়। মীর মশাররফ হোসেনে তাঁর ১২ বছর বয়সে অর্থাৎ ১৮৬০ সালের দিকে যখন কুষ্টিয়া থেকে পদমদি যাতায়াত করতেন সে বর্ণনা তাঁর লেখা ‘আমরা জীবনীগ্রন্থ’-এ পাই। আমার জীবনী গ্রন্থে তিনি চন্দনা নদীর তীরবর্তী বাঘের বসবাসের কথা লিখে গেছেন। যা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। বাঘের অঞ্চলে হরিণের বসবাস সকল স্থানেই দেখা যায়। তাই সে সময় হরিণও এলাকায় বসবাস করত। এ ছাড়া বন্য হাতি, মহিষও বসবাস করত। রজবাড়ি জেলার মধ্যবতী অঞ্চল বিশেষ করে চন্দনা নদী এলাকাই ছিল এদের বসবাসের আড্ডাখানা। কালক্রমে ওসব বন্য প্রাণী দক্ষিণে সরে ‍গিয়ে বর্তমানে সুন্দরবনে স্থান করে নিয়েছে। পাঙ্গাস, ইলিশ, কৈ, মাগুর, শোল, বোয়াল, শিং, খলিশা এসব নামের গ্রাম মৎস্য সম্পদের প্রাচুর্যের নিদর্শন। এসব নামের সাথে গ্রামের প্রাচীনত্ব ‍নিদের্শ করে। এ সব গ্রামের সৃষ্টি ৫০০ বৎসরের বেশি বলে ধারণা করা যায়।

 

ডাঙ্গা অপেক্ষাকৃত উচু ভূমি। বিস্তৃত মাঠের দিকে তাকালে দেখা যাবে সকল স্থানের ভূমি একই সমতল নয়। কোথাও উঁচু কোথাও নিচু। পানির সমতল থেকে উঁচু ভূমিকে ডাঙ্গা আবার চাষযোগ্য অপেক্ষাকৃত উঁচু ভূমিকে ডাঙ্গী বলে। অপেক্ষাকৃত উঁচু ভূমিতে যে সব গ্রাম উঠেছে তা ডাঙ্গা ‍দিয়ে গঠিত হোগলাডাঙ্গী, বেড়াডাঙ্গা, মৃগিডাঙ্গা, বহলাডাঙ্গী ইত্যাদি গ্রামের নাম।