বার ভূঁইয়াদের স্মৃতি

বার ভূঁইয়াদের স্মৃতি ও শাসনাধীন

বঙ্গে শাসনতান্ত্রিক ধারায় ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় পাল ও সেন রাজাদের শাসনের পর বঙ্গ ধীরে ধীরে মুসলিম শাসনাধীন হয়। ১২০৪ মতান্তরে ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজির বঙ বিজয় থেকে শুরু হয়ে ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে নবাবই সিরাজ-উদ্-দৌলার পতন পর্যন্ত বঙে মুসলিম শাসনকাল স্থায়ী হলেও সমগ্র বঙে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা ছিল এক দীর্ঘকালীন প্রচেষ্টা। গৌড় অধিকার করেই পাঠানেরা বঙ্গের রাজা হয় নাই, বঙ্গ অধিকার করতে তাদের অনেকদিন লেগেছিল।খিলজীর পরবর্তী পাঠান রাজারা দেশীয় জমিদার ও প্রজার উপর অধিকার প্রতিষ্ঠা নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন। এ ছাড়াও তারা দিল্লীর সম্রাটদের সন্ত্তষ্ট রাখাতে ব্যাস্ত থাকত। দিল্লীতে সুলতান মইজুদ্দিন তুঘলকের মৃত্যুর পর সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের বংশধরগণ বাংলাদেশ শাসন করেন। তাদের মধ্যে প্রথম সুলতান বুঘরা খান ১২৮১ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু করে ১২৮৭ পর্যন্ত ছয় বছর ধরে লক্ষ্ণৌতে দিল্লীর শাসনকর্তা হিসেবে শাসন করেন। কিন্তু সুলতান বলবনের মৃত্যুর পর বুঘরা খান নেজেকে বাংলার স্বাধীন সুলতান বলে ঘোষণা করেন। এরপর থেকেই বাংলার স্বাধীন সুলতানি যুগের সুচনা। এ যুগেই মুসলমান রাজাদের ইতিহাসে বাংলার ইতিহাসের অধ্যায়ের সূচনা করে। এ সময় সমগ্র বংলাদেশ চারটি সুনির্দিষ্ট বিভাগে বিভক্ত হয় যথা লক্ষ্ণৌতি, সাতগাঁও, সোনারগাঁও, চাটিগাঁও (চট্টগ্রাম)। এ সময় শক্তি, সম্পদ ও ঐশ্বর্যে সোনারগাঁ লেক্ষ্ণৌতিকে অতিক্রম করে। তবে ২০/২২ জন পাঠান নৃপতি ১৪০ বছর যাবৎ বঙ্গদেশ শাসন করলেও সমগ্র বাংলা তাদের করায়ত্ব হয় নাই। খণ্ডিতভাবে সুলতানদের দ্বারা বাংলা শাসিত হত।

শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহ (১৩০১-১৩২২) কেবল পূর্ববঙ্গ অধিকার করতে সমর্থ হন। এরপর ১৩৩৯ খ্রিস্টাব্দে ফখরউদ্দিন মোবারক শাহ পূর্ববঙ্গ এবং শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ পশ্চিমবঙ্গে দিল্লীর অধীনতা অস্বীকার করে বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। পরে ইলিয়াস শাহ সমগ্র বঙ্গের স্বাধীন নৃপতি হন। এই সময় থেকেই সমগ্র বাংলাদেশ ‘বাঙলা সুবে’ বা ‘সুবে বাঙলা’ নামে আখ্যায়িত হয়। ১৩৫৮ সালে তাঁর মৃত্যুর পর নানা অরাজগতা শুরু হয়। বস্ত্তত বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমলে বিশেষ করে মোগল সম্রাট আকবরের বঙ্গ বিজয়ের (১৫৭৬) পূর্ব পর্যন্ত পাঠান, আফগান সুর করবানী বংশীয় শাসনকালে স্থানীয় জমিদর, প্রভাবশালী বীর সেনানায়কদের দ্বারা সুলতানগণ প্রায়শঃই প্রতিবাদের সম্মুখীন হতেন। ১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে দাউদ খান করবানীর পরাজয় ও হত্যার ফলে বাংলা মোগল সাম্রাজ্যের অধিকারভূক্ত হয়। কিন্তু বিশ বছর যাবৎ মোগলদের রাজ্য শাসন এদেশে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। বাংলায় একজন মোগল সবাদার ছিলেন এবং অল্প কয়টি সেনানিবাস স্থাপিত হয়েছিল। কেবলমাত্র রাজধানী ও সেনানিবাসের জনপদগুলো মোগল শাসন মেনে চলত, অন্যত্র ব্যাপক অরাজগতা ও বিশৃংখলা চরম পৌঁছেছিল। আফগান সৈন্যরা লুটতরাজ করত এবং মোগল সেনারাও এভাবে অর্থ উপার্জন করত। বাংলার বড় বড় জমিদারগণ করবানী রাজত্বের অবসানের পর নিজেদের জমিদারীতে স্বাধীনতা অবলম্বন করন। তাদের শক্তিশালী সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী ছিল।

এই সকল জমিদারগণ, ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি অবলম্বন করে পার্শ্ববতী অঞ্চল দখল করতে সচেষ্ট থাকতেন। কখনো কখনো জমিদারগণ সাময়িকভাবে বাংলায় মোগল শাসন প্রতিষ্ঠায় আকবরের সেনাপতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হতেন। এই জমিদারেরা বাংলায় বার ভূঁইয়া নামে পরিচিত। ভূঁইয়াদের বিষয়ে শ্রী সতীশ চন্দ্র মিত্র বলেন- ‘উহাদের কাহারো বা শাসনস্থল একটি পরগনাও নহে, আবার কেহ বা একখণ্ড রাজ্যের অধীশ্বর। কোথাও বা দশ বারোজন ভূঁইয়া একজনকে প্রধান বলিয়া মানিয়া তাহার বশ্যতা স্বীকার করিত। প্রতাপান্বিত ভূঁইয়ার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হইতেন। তখন রণবঙ্গ রাজায় রাজায় না হইয়া ভূঁইয়া ভূঁইয়া চলিত। আর প্রজাদিগের সকলেই সেই যুদ্ধ ব্যাপারে যোগ দিয়া ফলত্যাগী হইতে হইত। এই অরাজগতার যুগে কেহ নির্লিপ্ত থাকিতে পারিতেন না। সকলকেই রাজনৈতিকতায় যোগ দিতে হইত নইলে আত্ম পরিবারের প্রাণ রক্ষা পর্যন্ত অসম্ভব হইত। ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে বাবরের রাজ্য আরম্ভ হতে ১৫৫৬ খ্রিস্টব্দে আকবরের রাজ্য লাভ পর্যন্ত বঙ্গে কোনো সুশাসন প্রতিষ্ঠা হয় নাই। সুলেমান ফরায়েজীর কঠোর শাসনের মধ্যে যে শান্তিটুকু ছিল সেনাপতি কালাপাহাড়ের অত্যাচারে তাও তিরোহিত হয়। এই সময় সাধারণ প্রজাকুল মোগল কর্মচারী কর্তৃক নানাভাবে প্রতারিত হতে থাকে। কম্কনের ভাষায় তার পরিচয় পাওয়া যায় –মোগল ডিহিদার বা তহশীলদের ঘুষ নিয়ে খিল (পতিত) ভীমিতে নাল লিখে প্রজাদের প্রতারিত করত। ভূঁইয়াগণ ঐ সময় অনেক স্থলে ডিহিদারের হাত থেকে বিদ্রোহী প্রজাদের আশ্রয় দিত।

সরকার হইলা কাল, খিল ভূমি লেখে নাল
বিনা উপকারে খায় অতি (ঘুষ)
পোদ্দার হইল যম, টাকায় আড়াই আনা কম,
পায় লভ্য, পায় দিন প্রতি।
জমিদর পতিত আছে, প্রজারা পালায় আছে
দুয়ার চাপিয়া খায় থানা
প্রজা হইল ব্যকুলী, বেঁচে ঘরের কুড়ালী,
টাকার দ্রব্য বেঁচে দশ আনা-
(কবি কষ্কন চণ্ডী, পৃষ্ঠা-৫)

উক্ত ভূঁইয়া বা ভূঁইয়াগণকে শুদ্ধ ভাষায় ভৌমিক বলা হয়। ইংরেজ আমলে যাদের জামিদার বলা হত অনেকটা সেরকম। ভূঁয়াগণ আত্নরক্ষা ও রাজস্ব সংগ্রহের জন্য যথেষ্ট সৈন্য সংগ্রহে রাখতেন। অস্ত্রসহ দুর্গ ও নৌবাহিনীর আয়োজন করতেন। বীর বলে তাদের খ্যাতি ছিল। প্রজারা তাদের ভয় ভক্তিও করত। ঐতিহাসিকদের মতে সে সময় যে কত পরিচিত ও অপরিচিত ভূঁইয়া ছিলেন তার হিসেব কেউ রাখতেন না। তবে তাদের মধ্যে যারা বীরত্বে অগ্রগণ্য, যাদের রাজত্ব বিস্তীর্ণ এবং যারা বিপুল সৈন্যবলে শক্তি সম্পন্ন হতেন তাদের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ত। ইতিহাসগতভাবে এরুপ ১২ জন ভূঁইয়ার বিশেষ পরিচিতি পাওয়া যায় এবং তারা বঙ্গদেশে বার ভূঁইয়া বলে পরিচিত। তারা হলেন-

(১)  ঈশা খাঁ-মসনদ আলী খিজিরপুর বা কত্রাস্থ-সোনারগাঁ।
(২)  প্রতাপাদিত্য –যশোহর বা চাণ্ডিক্যান- বর্তমান রাজবাড়ীর পশ্চিমাংশ।
(৩)  চাঁদ রায় ও কেদার রায় – শ্রীপুর বা বিক্রমপুর।
(৪)  কন্দর্প রায় ও রামচন্দ্র রায়- বাকলা বা চন্দ্রদ্বীপ-বরিশাল।
(৫)  লক্ষণ মাণিক্য- ভূলুয়া- নোয়াখালি।
(৬)  মুকন্দরাম রায়- ভূষণা বা ফতেহাবাদ-ফরিদপুর- রাজবাড়ী।
(৭)  ফজল গাজী, চাঁদ গাজী- ভাওয়াল।
(৮)  হামীদ মল্ল বা বীর হম্বির- বিষ্ণুপুর।
(৯)  কংস নারায়ণ- তাহিরপুর।
(১০)  রামকৃষ্ণ- সঁ-তৈর বা সান্তোল।
(১১)  পিতাম্বর ও নীলাম্বর-পুঁঠিয়া।
(১২)  ঈসা খাঁ লোহানী ও ওসমান খাঁ-উড়িষ্যা ও হিলি।

ঐতিহাসিকদের মতে এদের মধ্যে প্রথম ছয়জন খুবই বিখ্যাত। ফলে দেখা যায় ভূঁইয়াদের উত্থান ঘটেছিল সোনার গাঁ, বিক্রমপুর, নোয়াখালি , ফরিদপুর, যশোহর ও বরিশাল। তাদের মধ্যে ভূষণা বা ফতেহাবাদের মুকুন্দরাম রায় ও প্রতাপাদিত্য রাজবাড়ী জেলার ইতিহাসে বিবেচ্য। (ইতিপূর্বে) ভূষণাধিপতি, অন্যতম ভূঁইয়া মুকুন্দরাম রায় আলোচিত।

রাজবাড়ি জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য

প্রফেসর মতিয়ার রহমান