বাংলার বারো ভুঁইয়া

বারো ভুঁইয়া, মোগল সম্রাট আকবর-এর আমলে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল শাসনকারী কতিপয় জমিদার বা ভূস্বামী, বারো জন এমন শাসক ছিলেন, যাঁদেরকে বোঝানো হতো ‘বারো ভূঁইয়া’ বলে। বাংলায় পাঠান কর্‌রানী বংশের রাজত্ব দূর্বল হয়ে পড়লে বাংলাদেশের সোনারগাঁও, খুলনা, বরিশাল প্রভৃতি অঞ্চলে কিছু সংখ্যক জমিদার স্বাধীন রাজার মতো রাজত্ব করতে থাকেন। সম্রাট আকবর ১৫৭৫ সালে বাংলা দখল করার পর এসকল জমিদার ঐক্যবদ্ধ হয়ে মোগল সৈন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন।

বারো ভুঁইয়া নামে পরিচিত যে সকল জমিদাররা হলেন:

১. ঈসা খাঁ – খিজিরপুর বা কত্রাভূ,
২. প্রতাপাদিত্য – যশোর বা চ্যাণ্ডিকান,
৩. চাঁদ রায়, কেদার রায় – শ্রীপুর বা বিক্রমপুর,
৪. কন্দর্প রায় ও রামচন্দ্ররায় – বাক‌্লা বা চন্দ্রদ্বীপ,
৫. লক্ষ্মণমাণিক্য – ভুলুয়া,
৬. মুকুন্দরাম রায় ভূষণা বা ফতেহাবাদ,
৭. ফজল গাজী – ভাওয়াল ও চাঁদপ্রতাপ,
৮. হামীর মল্ল বা বীর হাম্বীর – বিষ্ণুপুর,
৯. কংসনারায়ন – তাহিরপুর,
১০. রামকৃষ্ণ – সাতৈর বা সান্তোল,
১১. পীতম্বর ও নীলম্বর – পুঁটিয়া, এবং
১২. ঈশা খাঁ লোহানী ও উসমান খাঁ লোহানীঃ – উড়িষ্যা ও হিজলী।

সম্রাট আকবর (১৫৫৬-১৬০৫) তাঁর জীবদ্দশায় সমগ্র বাংলার উপর মুঘল অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হননি।কারণ বাংলার বড় বড় জমিদারেরা স্বাধীনতা রক্ষার জন্যে মুঘলদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তেন।তাঁরা বারভূঁইয়া নামে পরিচিত।এখানে ‘বারো’ বলতে অনির্দিষ্ট সংখ্যা বুঝায়।

বার ভূঁইয়াদের নেতা ছিলেন ঈসা খাঁ। মুঘল সেনাপতি মানসিংহ জীবনে দুব্যক্তিকে পরাজিত করতে পারেননি-চিতরের রানা প্রতাপ সিং ও ঈসা খাঁ। ১৫৩৭ সালে ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার সরাইল পরগণায় ঈসা খাঁর জন্ম। তাঁর পিতা কালিদাস গজদানী ভাগ্যান্বেষণে অযোধ্যা থেকে গৌড়ে এসে স্বীয় প্রতিভা গুণে রাজস্বমন্ত্রী পদে উন্নীত হন।পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে তাঁর নাম হয় সুলাইমান খাঁ। তিনি সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহের (১৫৩৩-৩৮) মেয়েকে বিয়ে করে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার সরাইল পরগণা ও পূর্ব মোমেনশাহী অঞ্চলের জায়গীরদারী লাভ করেন।

১৫৪৫ সালে শের শাহের পুত্র ইসলাম শাহ দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করার পর সুলাইমান খাঁ দিল্লীর আনুগত্য অস্বীকার করলে কৌশলে তাঁকে হত্যা করে তাঁর দুই নাবালক পুত্র ঈসা খাঁ এবং ইসমাইল খাঁকে একদল তুরানী বণিকের নিকট বিক্রি করা হয়। ১৫৬৩ সালে ঈসা খাঁর চাচা কুতুব খাঁ রাজকার্যে নিযুক্তি লাভ করে বহু অনুসন্ধানের পর সুদূর তুরান দেশের এক ধনাঢ্য ব্যক্তির কাছ থেকে প্রচুর অর্থের বিনিময়ে ২ ভ্রাতুস্পুত্রকে উদ্ধার করেন। এ সময় ঈসা খাঁর বয়স মাত্র ছিল ২৭ বছর। সুলতান তাজ খাঁ কররানী (১৫৬৪-৬৫) সিংহাসনে আরোহণ করে ঈসা খাঁকে তাঁর পিতার জায়গীরদারী ফেরত দেন। বাংলার শেষ স্বাধীন সুলতান দাউদ খাঁ কররানীর রাজত্বকালে (১৫৭২-৭৬) ঈসা খাঁ বিশেষ প্রতিপত্তি লাভ করেন অসাধারণ বীরত্বের জন্যে।