বাংলার দ্বারপথ গোয়ালন্দ

বাংলার দ্বারপথ গোয়ালন্দ-প্রাচীন গোয়ালন্দ ঘাটের ইতিহাস

বাংলাদেশে প্রারম্ভিক (১৯৭১-১৯৮৪) শাসনকালের সাবেক গোয়ালন্দ মহকুমাই বর্তমান রাজবাড়ী জেলা।  ইতিহাস ঐতিহ্যে গোয়ালন্দ বাংলাদেশের বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। মোগল ও বৃটিশ শাসন কালে ঢাকা, দিল্লী, কলিকাতা তথা পূর্ববাংলা ও সমগ্র ভারতবর্ষের যাতায়াত পথ ছিল গোয়ালন্দ। এ কারণে বৃটিশ শাসন কালে গোয়ালন্দ কেবল বৃহৎ গঞ্জই নয় বাংলার দ্বারপথ (Get way of Bengal) বলে খ্যাতি লাভ করে। স্থাল পথে কলিকাতা ও গোয়ালন্দের সংযোগ থাকায় প্রমত্তা পদ্মা পাড় হয়ে বাংলার পূর্ব সীমান্তের যাতায়াতে গোয়ালন্দই ছিল প্রবেশ পথ। ১৮৭১ সালে রেলপথ স্থাপন করা হলে গোয়ালন্দের গুরুত্ব অধিক মাত্রায় বেড়ে যায়। সারা ভারতবর্ষে গোয়ালন্দ একক নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। গোয়ালন্দ-দৌলতদিয়া ঘাট এখনো স্থলপথে বাংলাদেশের দক্ষিণের পথ। ঢাকা থেকে ফরিদপুর, বরিশাল, খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া এবং স্থলপথে কলিকাতা যেতে দৌলতদিয়া ঘাট পাড় হয়ে যেতে হয়।

 

প্রাচীনতার দিক থেকে পদ্ম ও যমুনার মিলনস্থল গোয়ালন্দ ইতিহাসের পাতায় চিহ্নিত। পদ্মার ভাঙ্গা গড়ার সাথে এর নানারুপ উত্থান ও পতন। কখনো গোয়ালন্দ রেল, স্টিমার, লঞ্চ, নৌকার হাজার মানুষের ভিড়ে রুপনগরী আবার কখনো প্রমত্ত পদ্মার ভাঙ্গনে, প্লাবনে পরিত্যক্ত ভূমি। এ পথেই সম্রাট বাহাদুর শাহকে পাঠান হয় রেঙ্গুনে। এ পথেই গমনাগমন করেছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম। এখানেই আস্তানা গড়ে তুলেছেলেন অমর গ্রন্থ ‘মরু তীর্থ হিংলাজে’র লেখক অবধূত। আট হাজারী দ্বিপ বলে ইতিহাস খ্যাত গোয়ালন্দের পটভূমিতেই মানিক বন্দ্যোপাধায় লিখেছেন বহুল আলোচিত উপন্যাস, পদ্মা নদীর মাঝি।

 

‘একদিন গোয়ালন্দে অধরের সঙ্গে কুবেরের দেখা হয়ে গেল। অধর বলিল, কয়েকদিন আগে কপিলা চরডাঙ্গায় আসিয়াছে কিছুদিন থাকিবে। পদ্মা নদীর মাঝি পৃষ্ঠা-১৬৫।

এ উপন্যাসটি বর্তমানে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্য। গোয়ালন্দের ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণে কলম ধরেছেন ঐতিহাসিক আনন্দনাথ রায়, রমেশ চন্দ্র মজুমদার, ডব্লিউ হান্টার। সরকারিভাবে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ারে ঘুরে ফিরে এসেছে ঘোয়ালন্ধের নাম।

১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালীশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় নসীবশাহী পরগনা এবং গোয়ালন্দ থানা হিসেবে যশোর কালেক্টরীর অন্তর্ভুক্ত হয়। নসীবশাহীর পরগনার আয়তন ছিল ৪৩০৯ একর এবং রাজস্ব নির্ধারিতত ছিল ১৫৮২১ টাকা (Faridpur District Gazetteer page 270)। মোগল শাসনকালে প্রাচীন ‘রাজগঞ্জ’ কখনো পর্তুগীজদের মুখে ‘গোয়ালীশ মুখে ‘গোয়ালীশ ল্যান্ড, কখনো জামালপুরে ইংরেজদের মুখে গ্যাংঞ্জেজ বন্দর । অবশ্য নদী ভাঙ্গনের কারণে গোদার বাজার, লক্ষ্মীকোল, লালগোলা, তেনাপচা, দুর্গাপুর, উড়াকান্দা, পুরশাহাট ঘাট পরিবর্তন হলেও গোয়ালন্দ নামেই এসব ঘাট পরিচয় বহন করে। ভাঙ্গনের বর্ণনায় ঐতিহাসিক রমেশ চন্দ্র মজুমদার লিখেছেন, বর্তমান শতাব্দি (বিংশ) আরম্ভ হইতে প্রথমে ছাত্র ও পরে শিক্ষকরুপে বহুবার স্টিমারে পদ্মা নদী দিয়া ঢাকা গিয়াছি। প্রথম প্রথম রাজবাড়ীর মঠ একটি দর্শনীয় উচ্চ চূড়া সৌধ দৃষ্টিগোচর হইত। একবার ইহার  ধার দিয়া আসিলাম কিন্তু ফিরিবার সময় তাহার দর্শন মিলিল না। বহু নগরী গ্রাম মন্দির প্রভৃতির ন্যায় এই মঠটি পদ্মার গর্ভে বিলীন হইয়াছে।  (রমেশ চন্দ্র মজুমদার প্রথম খন্ড-পৃষ্ঠা-৩)।

১৭৯৩ সালে গোয়ালন্দ থানা হিসেবে যশোরের সাথে যুক্ত হলেও গোয়ালন্দ স্থান হিসেবে এর পূর্ব পরিচিত ছিল। গোয়ালন্দ নামের পিছনে লোক মুখে নানা কথা প্রচলিত আছে। এক সময় এ অঞ্চল পর্তুগীজ, মগ, ফিরিঙ্গা জলদস্যু কবলিত ছিল। পর্তুগীজ জলদস্যু নেতা সেবাসটিয়ান গঞ্জালেশের একটি আস্তানা ছিল নদী তীরবর্তী গোয়ালন্দের কোনো স্থানে। লোকমুখে প্রচলিত গঞ্জালেশের নাম অনুসারে অপভ্রংশে গোয়ালন্দ নামরে উৎপত্তি। এক সময় গোয়ালন্দের দুগ্ধ ও মিষ্টান্ন উৎপাদনের খ্যাতি ছিল। পদ্মা পাড়ের গো-খাদ্যের প্রাচুর্য এবং বিস্তীর্ণ অনাবাদী চরাঞ্চলে গোয়ালারা দুগ্ধ উৎপত্তি। ঐতিহাসিক সূত্রে প্রাচীন রাজগঞ্জ ইংরেজ ও পর্তুগীজ বণিকদের মুখে ব্যবহৃত ‘গোয়ালীশ ল্যান্ড’ থেকে গোয়ালন্দ নামের উৎপত্তি। বার ভূঁইয়া জমিদার চাঁদ রায় ও তৎপুত্র কেদার রায়ের রাজ্য বিক্রমপুর, ঢাকা, ফরিদপুর ও বরিশালের অংশবিশেষে বিস্তৃতি লাভ করে। এ রাজ্য মকিমাবাদ, বিক্রমপুর ও রাজনগর পরগনায় বিভক্ত ছিল।  (আনন্দনাথ রায়ের ফরিদপুরের ইতিহাস, ডঃ তপন বাগচী সম্পাদিত, পৃষ্ঠা-১০০) রাজনগর পরগনা পদ্মা ও কালীগঙ্গা নদীর সঙ্গমস্থলের দক্ষিণ পূর্ব দিকে অবস্থিত ছিল। (বিক্রমপুরের ইতিহাস, যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত, পৃষ্ঠা-২০)। ফরিদপুরের পদ্মা তীরবর্তী উত্তর পর্ব অংশ রাজনগর পরগনার অন্তর্ভুক্ত ছিল।

 

কীর্তিনাশার (পদ্মার অপর নাম) দক্ষিণ তীরস্থ স্থানগুলি ফরিদপুরের অন্তর্গত হওয়ায় উহা

দক্ষিণ বিশেষণে বিশিষ্ট হইয়া দক্ষিণ বিক্রমপুর নামে অভিহিত (আনন্দনাথ রায় পৃষ্ঠা-১০২)। মোগল সম্রাট আকবরের সময় থেকে চাঁদ রায় দক্ষিণ বিক্রমপুরের শ্রীপুর নগরে রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেন এবং রাজনগর পরগনার রাজকার্য পরিচালনা করেন। Thus Rajnagar, the dominant in the south east, in the eighteen century, was curved out of the Haveli Dacca. Bikrampur and Solimabad and it continuasly got accession of territory until the end of the century. (Faridpur Gazetteer-page 209).

এ সময় রাজনগর পরগনার রাজকার্য পরিচালনার অন্তর্ভুক্ত পদ্মা তীরবর্তী অঞ্চলের রাজস্ব আদায়ের তহশীল অফিস ছিল বর্তমান রাজবাড়ির উড়াকান্দা বরাবর উত্তরে অবিস্থত- রাজগঞ্জে। পদ্মার ভাঙ্গা গড়ায় রাজগঞ্জ এখন নদীরগর্ভে। (আনন্দনাথ রায় লিখিত ফরিদপুর ইতিহাসে দ্বিতিয় খন্ড প্রকাশিত, ১২৪ পৃষ্ঠায় রাজবাড়ি থানার গ্রামসমূহের তালিকায় ‘রাজগঞ্জ’ গ্রামের নাম উল্লেখ আছে) এখানেই ছিল বিক্রমপুর/রাজনগর পরগনার তহশীল অফিস ও তাদের প্রশাসনিক কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু (রাজবাড়ি মুক্তিযুদ্ধে ড. মোঃ আব্দুস সাত্তার, পৃষ্ঠা-১৯)। সে সময় পর্তুগীজ ইংরেজ বণিকদর এদেশে আগমন ঘটেছে। রাজগঞ্জ তখন ঢাকা, বিক্রমপুরের সংযোগ নদীপথ হিসেবে বিবেচিত হত। রাজগঞ্জ অত্র অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এ পথে বৃহৎ নৌযানে পন্য আনা নেওয়া হত। পূর্ববাংলার ব্যবসা বাণিজ্যের মনোরম বন্দর রাজগঞ্জে প্রতি পর্তুগীজ ও ইংরেজ বণিকরা আকৃষ্ট হয়ে এখানে যাতায়াত করতে থাকে। বাণিজ্যের উদেশ্যে রাজগঞ্জ হয়ে ঢাকা কলিকাতা তারা যাতায়াত করে। পদ্মাতীরের রাজগঞ্জ ছিল খাওয়া ও থাকার সুভল স্থান। বিশেষ করে পদ্মার পলল মাটিতে উৎপন্ন ধান,শাকসবজি ও পদ্মার ইলিশসহ নানা জাতের মাছ ছিল সুলভ ও সুস্বাদু খাবারের উৎস। হোটেলগুলো খাবারের  একটা বিশেষ রীতি মেনে চলত আর তা হল, পেটচুক্তি খাবার। খদ্দের তার পছন্দ মতো ভাত, মাছ, মাংস, সবজি যত পরিমাণই খাবে না কেন, একটা ন্যুনতম দাম দিলেই চলবে।

 

এ ব্যবস্থা চল্লিশ বছর পূর্বেও রাজবাড়ির হোটেলগুলোতে চালু ছিল। আমি ছাত্র থাকাকালীন বর্তমান রেলগেট সংলগ্ন ইসলামিয়া হোটেল থেকে এরকম পেটচুক্তি খেয়েছি। এ বিষয়ে রাজবাড়িতে নানা গল্প প্রচলিত আছে। যেমন খদ্দেরকে পেটচুক্তি খাবার পরিবেশন করে খদ্দেরের খাওয়া অর্ধেক সমাপ্ত হলে বয় বেয়ারা বলত, ‘আরে ভাই ঐ যে ট্রেন হুইসেল দিচ্ছে এখনই ছেড়ে যাবে। খদ্দের আর কি করবে, এ কথা শুনেই অর্ধেক পেট খেয়ে দে দৌড়।

 

সস্তায় সুস্বাদু খাবার, স্থানীয় মানুষের দৃশ্যে আকৃষ্ট হয়ে পর্তুগীজ বণিকেরা রাজগঞ্জকে বলত ‘গোয়ালীশ ল্যান্ড’ বা মজার খাবারের দেশ। গোয়ালীশ পর্তুগীজ জাত শব্দ যার অর্থ অল্পজালের সিদ্ধ মাংস বা মাছের ফালি (Goulash-a stew of steak and vegetables-oxford learner’s Dictionary oxford press 1999)। এ অঞ্চলে উৎপাদিত ধনিয়া, পেঁয়াজ, রসুন, মশলায় পদ্মার স্বাদের ইলিশ, পাঙ্গাস, রুই, কাতলের কর্তিত ফালির মাছ মৃদু জ্বালে রান্নায় তা অপূর্ব স্বাদের খাবারে পরিণত হত। ফলে রাজগঞ্জ বন্দরসহ এর পার্শ্ববর্তীএলাকা গোয়ালীশ ল্যন্ড বা স্বাদের খাবারের অঞ্চল হিসেবে তাদের নিকট পরিচিত হয়ে ওঠে। পরবর্তী প্রায় চারশত বছর ধরে যাতায়াত, ব্যবসা বাণিজ্যের রাজগঞ্জ বন্দরটি পদ্মার ভাঙ্গনে বারবার ঘাটের স্থান পরিবর্তন হলেও ‘গোয়ালীশ ল্যান্ড’ নামটির পরিবর্তন হয় না। ভাষা পরিবর্তনের সাধারণ নিয়মানুযায়ী গোয়ালীশ ল্যান্ড এক সময় গোয়াল্যান্ডু বা গোয়ালন্দ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ইংরেজিতে গোয়ালন্দ বানানটি প্রাচিন নথিপত্রে ‘goalandu’ দেখা যায় ‘goalanda’ নয়। ১৭৯৩ সালে গোয়ালন্দ মহকুমা হয়নি। এ সময়েই বর্তমান রাজবড়ি জেলার নসিবশাহী, বেলগাছি, কাশিমনগর, নশরতশাহী ইত্যাদি পরগনা নাটোর রাজ, তেওতা রাজ, রানী হর্ষমুখীর জমিদারী হিসেবে যশোর কালেক্টরেভুক্ত হয়। পাংশা এলাকার মহিমশাহী পরগনা নদীয়ার অন্তর্ভুক্ত থাকে। ১৭৯৯ সালে যশোরের কালেক্টর কর্তৃক নাটোরের রাজার পরগনাগুলো নিলামে বিক্রি হয়। (আনন্দনাথ, পৃষ্ঠা-১১১)। এ সময় গোয়ালন্দ গোয়াল্যান্ড হিসেবেই সরকারী নথিপত্রে ব্যবহৃত হয়। ১৮৭১ সালে পূর্বদেশ রেল জগতি থেকে রাজগঞ্জ (রাজগঞ্জ এখন নদীগর্ভে) অভিমুখে রেল স্থাপন হয় এবং  ঐ বছরই গোয়ালন্দ মহকুমা প্রতিষ্ঠিত হয়। পরগনাভিত্তিক ঢাকা জালালপুর গঠন করা হয় ১৮০৭ সালে। ১৮১২ সালে ঢাকা জালালপুরের পশ্চিম সীমানা নির্ধারণ করা হয় চন্দনা ও গড়াই নদীর পূর্ব পাড় পর্যন্ত। ফলে পদ্মার পাড়াপড় ঘাট গোয়ালন্দ-ঢাকা-জালালপুর আওতাভুক্ত থাকে। ১৮৩৩ সালে ফরিদপুর জেলা গঠনকালে এ সীমানা অক্ষুন্ন থাকে। এ সময় পদ্মার উভয় তীরবর্তী গোয়ালন্দ ও মানিকগঞ্জ প্রায় ৩৭ বছর ফরিদপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত থেকে ১৮৫৬ সালে মানিকগঞ্জ ঢাকার অধীন হয় ( আনন্দনাথ রায়ের ফরিদপুরের ইতিহাস, ড. তপন বাগচী সম্পাদিত, পৃষ্ঠা-১১৭)।

১৮৭১ সালে ফরিদপুর জেলাকে ৪টি প্রশাসনিক ইউনিটে চারটি সাবডিভশন বা মহকুমায় বিভক্ত করা হলে গোয়ালন্দ মহকুমা গঠিত হয় এবং ঐ বছরই পূর্বদেশ রেল গোয়ালন্দ পর্যন্ত বিস্তৃত করা হয় (গৌড়ি সেতু-মীর মশাররফ হোসেন)। তবে মহকুমা প্রতিষ্ঠাকালে স্থান হিসেবে বর্তমান গোয়ালন্দ সেভাবে গেজেট ভুক্ত হয়নি। গোয়ালন্দ ঘাট পরিচয়ে নসিবশাহী, কাসিমনগর, নশরৎশাহী, পরগনা গোয়ালন্দ মহকুমায় পরিণত হয়। বেঙ্গল গেজেটিয়ার ১৯২৫ (ওমিলি প্রণীত) দেখা যায় বর্তমান গোয়ালন্দ বাজার থেকে প্রায় ১০ কিমি উত্তর পশ্চিমে এবং উড়াকান্দা বাজার থেকে প্রায় ৮ কিমি উত্তর পূর্বে পদ্মা যমুনার মিলনস্থলের নিকবর্তী কোনো স্থানে মহকুমা স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। এ সময় পূর্বদেশগামী রেলপথ পাংশা থেকে কালুখালির তিন কিলোমেটার উত্তর (বহর কালুখালি) এবং বর্তমান রাজবাড়ি ‘গোদার বাজারে’র নিকটবর্তী স্থান দিয়ে রাজগঞ্জের বিপরীত ঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। তখন থেকে ‘গোদার বাজার’, বাজার হিসেবে পরিচিত লাভ করে। পূর্ববঙ্গের শাসনকার্য পরিচালনার উদ্দেশ্য সহজ যাতায়াত এবং অত্র অঞ্চলের ব্যবসা বাণেজ্যের প্রসারের উদ্দেশ্যে রেলপথ স্থাপন করে। মহকুমার অফিস প্রতিষ্ঠানসহ রেলস্থাপনা গড়ে ওঠায় স্থানটি শহরের মর্যদা পায়। ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টারের বর্ণনায় দেখা যায় ১৮৭৫ সালের জনুয়ারি মাস পর্যন্ত ইস্টার্ন রেলওয়ে মাছপাড়া থেকে কালুখালি হয়ে বেলগাছি থেকে উত্তর পূর্ব দিকে রাজবাড়ির উত্তর দিয়ে গোয়ালন্দ ঘাটের নিকটবতী স্থানে পৌঁছায়। তৎকালীন সময়ে ১৩ লক্ষ টাকা ব্যয় ইংরেজ প্রকৌশলীগণ ঘাটের পরিকল্পনা, রেল স্টেশন, মহকুমা অফিসারের কার্যালয়, ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট স্থাপন করে। বন্যা প্রতিরোধসহ নদী শাসনে ব্যবহৃত হয় রেলের রড রেলিং ও পাথর। (উড়াকান্দার নিকটবর্তী নদীর মধ্যে এসব বৃহৎ স্থাপনার কিছু কিছু নিদর্শন বর্তমান আছে)। রাজগঞ্জকে কেন্দ্র করে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটতে থাকে। গড়ে ওঠে আড়ৎ, দোকান, হোটেল, আবাস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস ইত্যাদি। স্থানটি পূর্ববঙ্গের অন্যতম বন্দর হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। বৃটিশ শাসনকর্তা বন্দরের উন্নতি ও এর বিস্তার ঘটাতে অধিক তৎপর হয়। কিন্তু রাজগঞ্জ বন্দর অধিক সময় স্থায়ী হল না। সর্বনাশা বন্যা ও নদী ভাঙ্গনে রাজগঞ্জের সকল স্থাপনা নদীরগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। নদী ভাঙ্গন ও ঘাট বারবার স্থানান্তরিত হওয়ার কারণে গোয়ালন্দে অবস্থিত মহকুমার অফিস আদালত বিদ্যালয়সহ সকল স্থাপনা ১৮৭৫ থেকে ১৮৯০ এরমধ্যে  রাজবাড়িতে সরিয়ে আনা হয়। ‘গোয়ালন্দ মহকুমা যেখানে অবস্থিত ছিল, পদ্মাগর্ভে বিলীন হওয়ায় গভর্নমেন্ট সাহায্যকৃত হাইস্কুলটি রাজবাড়ি স্থানান্তরিত হয় এবং তৎকালীন ডিপিআই সিএ মার্টিন সাহেবের অনুরোধে লক্ষ্মীকোল রাজবাড়ির জমিদার রাজা সূর্যকুমার গুহরায় উহার পরিচালনার সম্পূর্ণ ভার নেন। (আমার স্মৃতিকথা ত্রৈলোক্যনাথ ভট্টাচার্য-পৃষ্ঠা-৪)।

 

রেল সম্প্রসারণ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা পরিচালনায় বর্তমান স্টেশন বরাবর পূর্বে ও দক্ষিণে প্রায় এক বর্গকি মিটার জায়গা হুকুম দখল করে রেল স্থাপনা গড়ে তোলা হয়। ১৮৭৫ থেকে ১৮৯৫ এই বিশ বছরে পদ্মার তীর প্রবল ভাঙ্গনের কবলে পতিত হওয়ায় গোয়ালন্দ ঘাট বারবার স্থানান্তর করা হয়। এ সময়ের মধ্যে ভাঙ্গনের প্রকোপ এত বেশি ছিল যে কয়েক মাস পর পর ঘাটের স্থান পরিবর্তন করতে হত। এভাবেই গোয়ালন্দ ঘাট লক্ষ্মীকোল থেকে লালগোলা, লালগোলা থেকে উড়াকান্দা থেকে পুরশাহাটে স্থানান্তর করা হয়। পুরশাহাট এলাকায় চর জেগে ওঠায় ঘাট জামালপুরে যায়। জামালপুরে চর জেগে উঠলে আরও পূর্বে বেথুলীতে সরে আসে। এরপর কোষাহাটা। কোষাহাটা ভেঙ্গে গেলে কাটাখালি, কাটাখালি ভেঙ্গে গেলে দুর্গাপুর, এরপর ঘিওর বাজার এবং সর্বশেষ ১৯১৪ সালে ঘাট উজানচরের ফকীরাবাদ স্থায়ী হয়। উজানচরের ফকীরাবাদে থেকে উত্তর দিকে এক থেকে ছয় নম্বর পর্যন্ত ঘাটের সংখ্যা বাড়তে থাকে। মৌসুম ভেদে পানির গভীরতা অনুযায়ী স্টিমার ভিন্ন ভিন্ন ঘাটে নোঙর করত। কোনো ঘাটে সারা বছর জাহাজ নোঙর করতে পারতো না। বর্ষামৌসুমে কখনো উড়াকান্দায় ঘাট পিছিয়ে গেছে আবার শীত মৌসুমে ঘাট ছয় নম্বর সরে এসেছে। তবে ঘাট ৪/৫ মাইলের মধ্যে অগ্র পশ্চাৎ করলেও মূল প্রশাসনিক কাজ ফকীরাবাদ থেকেই পরিচালিত হত। ফকীরাবাদ ঘাট দীর্ঘদিন স্থায়ী হয় এবং এখানে গোয়ালন্দ ঘাট থানার প্রশাসনিক স্থাপনা গড়ে ওঠে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্রের নৌ পরিবহনের হেড কোয়ার্টার স্থাপিত হয় গোয়ালন্দে। ঢাকা-কলিকাতা যাতায়াতে রেল ও স্টিমারসংযোগ পথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নৌপথে মাদারীপুর, বরিশাল, চাঁদপুর, নারায়ণগঞ্জ প্রভৃতি স্থানে যাতায়াতে স্টিমার, লঞ্চ, বড় বড় নৌকা ইত্যাদি নৌযান ব্যবহার হতে থাকে। এদিকে কলিকাতা গোয়ালন্দ স্থলপথে রেল যোগাযোগে ট্রেন সার্ভিস বৃদ্ধি পায়। ঢাকা মেল, আসাম মেল, ওয়ান আপ, টু ডাউন প্রভৃতি নামের ট্রেন গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত নিয়মিত চলাচল করতে থাকে। স্থলপথে ট্রেন এবং নৌপথে স্টিমারের সাথে যাতায়াত সংযোগ স্থাপন করা হয়। বাঙালি, বিহারী মারওয়ারী এবং কিছু বিদেশী নানা ব্যবসা জাঁকিয়ে তোলে। পদ্মার ইলিশের স্বাদ ভারত খ্যাত। ইলিশ, পাঙ্গাস, রুই ইত্যাদি মাছের চালান কলিকাতা দিল্লী পৌঁছে যেত। দেশী-বিদেশী অনেক পণ্যের বাজার বসে গোয়ালন্দে। গোয়ালন্দের চড়ে এক/ দেড়মনি তরমুজ জন্মাত। দূর ভারতে এর ব্যাপক কদর ছিল। কলিকাতা দিল্লীতে রপ্তানি হত। এ সময় স্টিমারও ট্রেন থেকে পণ্য বহনকারী প্রায় পাঁচ হাজার কুলি কাজে নিয়োজিত থাকত। তারা ঘাট কুলী বলে পরিচিত ছিল। এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা করা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। ঘাট অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। স্বদেশী, কংগ্রেসী, কমিউনিস্ট, মুসলিমলীগ সকল রাজনৈতিক কর্মকান্ড বিস্তার লাভ করে। বিশেষ করে কমিউনিস্টদের তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। সাহিত্যিক শিল্পী লেখকদের ভিড় জমে। গোয়ালন্দ কেবল গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নয়, ভারতবাসীর কাছে তা হয়ে ওঠে বাংলার দ্বারপথ। ইংরেজরা গোয়ালীশ ল্যান্ড না বলে, বলত Gate way of Bengal.

 

গোয়ালন্দ মহকুমার কাজ শুরু হয়েছিল ১৮৭১ সালে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় থেকেই গোয়ালন্দ ঘাট পুলিশ স্টেশনের ব্যবস্থা করা হয়। থানা হিসেবে বিভিন্ন সময়ে গেজেটিয়ার, ইতিহাস সেনসাসে রাজবাড়ি জেলার গোয়ালন্দ, বালিয়াকান্দি ও পাংশার নাম পাওয়া যায়। রাজবাড়ি থানার কার্যক্রম শুরু হয় পড়ে। তবে নদী ভাঙনের কারণে মহকুমা ও থানার স্থাপনা রাজবাড়িতে গড়ে ওঠে এবং প্রশাসনিক কার্য গোয়ালন্দ নামে রাজবাড়ি থেকে সম্পাদন করা হত। গোয়ালন্দে ‘ঘাট থানা’ হিসেবে থানার কাজ করা হত।

 

১৯২০ সালের একটি পরিসংখ্যান

মহকুমা থানা পুলিশ স্টেশন এরিয়া বর্গমাইল জনসংখ্যা
গোয়ালন্দ গোয়ালন্দ গোয়ালন্দ ১১৫ ৭৪৩৪৬
    গোয়ালন্দ ঘাট ৫০ ৪২২৯৬
  বালিয়াকান্দি বালিয়াকান্দি ১২৪ ৮৭৬৮৭
  পাংশা পাংশা ১৬১ ১.২০.১৯১

সূত্র: ফরিদপুর গেজেটিয়ার ১৯৭৫

 পরিসংখ্যান নির্দেশ করে ১১৫ বর্গমাইলের গোয়ালন্দ থানা বর্তমান রাজবাড়ি থানার এরিয়া নিয়ে গঠন করা হয়েছিল। গোয়ালন্দ মহকুমা ও থানার প্রশাসনিক কাজ রাজবাড়ি থেকে সম্পাদিত হলেও ইতিমধ্যে গোয়ালন্দ থানার প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানসহ নানা অফিস শিক্ষা প্রতিষ্ঠন গড়ে ওঠে। ১৯৮৪ সালে রাজবাড়ি জেলা গঠনকালে গোয়ালন্দবাসী গোয়ালন্দকে জেলা ঘোষণার দাবি রাখে। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। গোয়ালন্দ নামে মহকুমা হলেও কোর্ট কাচারী, অফিস আদালত, রেল স্থাপনাসহ রাজবাড়ি বৃহৎ শহর বিধায় রাজবাড়িবাসির দাবিতে শেষ পর্যন্ত ঐক্যমতের ভিত্তিতে ‘রাজবাড়ি’ নামে জেলা ঘোষণা করা হয়। গোয়ালন্দর সামনে চর জেগে ওঠার বিগত শতাব্দীর ৭০ দশকের মাঝামাঝি ঘাট দৌলতদিয়া স্থানান্তর করা হয়। দৌলতদিয়া এখন বাংলাদেশের দক্ষিণের দ্বারপথ।

প্রফেসর মতিয়র রহমান