প্রাচীন শাসন

প্রাচীন শাসন

রাজবাড়ি জেলা প্রাচীনবঙ্গের জনপদ। পদ্মার প্রবাহের দক্ষিণের ভাগিরথী ও প্রাচীন ব্রক্ষপুত্রের মধ্যবতী অঞ্চলের ব-দ্বীপের প্রাচীন পরিচিতি বঙ্গ। সমুদ্র গুপ্তের রাজত্ব কালে (৩৮০-৪১২ খ্রিস্টাব্দে) কবি কালিদাসের রঘু বংশের বঙ্গ পরিচিতে দেখা যায় গঙ্গার মুখের শাখা প্রশাখা দ্বীপ পুঞ্জই বঙ্গ যার অধিবাসীগণ জীবনের সকল স্তরে এমন কি যুদ্ধ  ও সমুদ্র ব্যবহারে নৌকা ব্যবহার করত। বঙ্গের শাসনকালের প্রাথমিক ধাপে গুপ্ত সাম্রাজ্যের (৩৮০-৫১২) পরিচয় পাওয়া যায়। সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ প্রশস্তি এবং দ্বিতীয় চন্দ্র গুপ্ত ও সমুদ্র গুপ্তের স্বর্ণ মুদ্রার আবিস্কারের পর থেকে জানা যায় এ অঞ্চল তাদের অধীন ছিল। গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া ফোর্টের সন্নিকটে পাওখোলা গ্রামের সোনাকান্দুরিতে স্বর্ণ মুদ্রা আবিস্কৃত হয়। চন্দ্র গুপ্তের ও স্কন্ধ গুপ্তের শাসন বলতে দক্ষিণ বঙ্গের ফরিপুর, বরিশাল, যশোরের কিয়দংশকে বোঝানো হয়েছে। পরবর্তীতে এখানে তাম্র পট্টলি পাওয়া যায় যাকে ই-ই পার্জিটার বিশ্লেষণ করে মতামত দেন ষষ্ঠ শতকে এখানে আর একটি রাজ্যের উত্থান ঘটে। ৫৩১ এবং ৫৬৭ সালের তাম্র পট্টলির ব্যাখ্যা দিয়ে পার্জিটার ধর্মাদিত্য ও গোপ চন্দ্রের রাজত্বকালে নির্ধারণ করেন। ধর্মাদিত্য ছিলেন অতি ন্যায়পরায়ন ও ধার্মিক রাজা। গোপচন্দ্র বলে পরিচিত ছিলেন। কোটালীপাড়া ফোর্টের পশ্চিমাঞ্চলে ঘাঘর নদীর পিনহারির নিকট ঘুঘরাহাটিতে আর একটি তাম্র পট্টলি আবিষ্কৃত হয়। এতে রাজা সমাচার দেবের নাম দেখা যায়। পার্জিটারের মতে ৬১৫-৬২০খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সমাচার দেব অত্র অঞ্চলে রাজত্ব করেন। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পর এ দেশের অঞ্চল সমাচার দেবের রাজত্বকাল ছিল। সমাচার দেবের রাজত্ব কালের  আরো নিদর্শন পাওয়া যায় মুহাম্মদপুরের নিকটবর্তী আমুখালি নদীর তীরে আরো দুটি স্বর্ণ মুদ্রা আবিস্কারের মধ্য ‍দিয়ে। নালিনীকান্ত ভট্টশালী এ মতামত  স্বীকার করেন এবং বলেন সমাচার দেব ছিলেন রাজা (Monarch) তিনি গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধিকারী নন। তিনি শশাম্কের পূর্ব পর্যন্ত রাজত্ব করেন। ইউয়াং চোয়াং-এর বর্ণনা মতে বঙ্গ যথাসম্ভব ৭ম শতাব্দীর মাঝামাঝি সম্রাট হর্ষবর্ধনের আয়ত্বাধীন হয়। উল্লেখ্য, চৌনিক পরিব্রাজক ইউয়াং চোয়াং (৬৩০-৬৪৩ খ্রিস্টাব্দে) ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল ভ্রমণ করেন।

৬৪৭ খ্রিস্টাব্দে হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর তার সাম্রাজ্য ভেঙ্গে যায় এবং বাংলার স্বাধীন রাজত্বের উদ্ভব হয়। ঢাকার অদূরে আশ্রাফপুর পট্টলিপিতে এর প্রমাণ মেলে। এ সময় স্কন্ধ রাজবংশের উদ্ভব হয়। স্কন্ধ রাজবংশীয়রা ছিলেন বুদ্ধিষ্ট এবং রাজধনী ছিল কুমিল্লার সন্নিকটে বড়কামতা।

নবম এবং দশম শতকে চন্দ্রবংশীয় রাজাদের রাজত্ব বঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়। চন্দ্রবংশীয় রাজারা ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। তাদের রাজধানী ছিল ঢাকার ‍বিক্রমপুরে। শরিয়াতপুর জেলার ইদিলপুর তাম্র পট্টলী থেকে জানা যায়। এ বংশের শ্রীচন্দ্র তার ইদিলপুর পট্টলী দ্বারা স্মতট পদ্মাবতী অঞ্চলে জনৈক ব্রাক্ষণকে একখন্ড ভূমি দান করেন। স্মতট পদ্মাবতী বিষয়ে ইতিপূর্বে আলোচিত হয়েছে। উল্লেখ্য ৮ম শতকের পুণ্ড্রভূমিতে (মহাস্থানগর বর্তমান বগুড়া) পাল শাসনের স্থাপত্য রয়েছে। পাল শাসনের নিদর্শন বঙ্গে তেমন না থাকলেও রাজবাড়ি পুণ্ড্রভূমির দক্ষিণ সীমান্তের কাছাকাছি বলে এ অঞ্চলে পাল শাসন অধীন হয়। কালুখালির হারোয়াতে মদন মোহন জিউর বলে যে মূর্তিটি রয়েছে, অনেকে তা পাল শাসনের স্মৃতি বলে মনে করেন। ২০০৩ সালে রাজবাড়ির তেঘারিতে একটি বিষ্ণুমূর্তি পাওয়া যায় যা বর্তমান ঢাকা মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।  চন্দ্রবংশীয় রাজাদের পর বিক্রমপুরে বর্ম রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্ম রাজবংশের বজ্রবর্মা, হরিবর্মা, সমলা বর্মা, ভোজ বর্মা এবং চন্দ্রবর্মা ১০৮০ থেকে ১১৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। কোটালীপাড়া চন্দ্রবর্মা ফোর্ট এ অঞ্চলে তাদের রাজত্বের নিদর্শন বহন করে।

পরবর্তীতে ১১৫০ থেকে ১২৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সেনবংশের রাজত্বকাল। সেনবংশের প্রথম রাজা বিজয় সেন। তিনি সম্ভবত বার’শ খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে বাংলার দক্ষিণপূর্ব থেকে পালদের বিতাড়িত করেন। বল্লাল সেন বিজয় সেনের উত্তরাধিকারী এবং তিনি ছিলেন পণ্ডিত। বিজয় সেন এবং বল্লাল সেন উভয়েই শিবের পূজারী ছিলেন। বল্লাল সেনের পুত্র লক্ষণ সেন ১১৭৮ থেকে ১২০৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলায় রাজত্ব করেন। বল্লাল সেনের রাজত্বকালে ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়র খলজী নদীয়া আক্রমণ করেন। লক্ষণ সেন পরাজিত হন এবং পলায়ন করে বিক্রমপুর আসেন। পরবর্তীতে লক্ষণ সেনের বংশধরগণ বেশ কিছুকাল বঙ্গে রাজত্ব করেন। এ বংশের বিশ্বরুপ সেনের শাসন ব্যবস্থার নির্দশন কোটালীপাড়ার দক্ষিণ পশ্চিমে পিঞ্জরীর নিকটপ্রাপ্ত তাম্র পট্রলী থেকে পাওয়া যায়। এ বংশ ত্রয়োদশ শতকের মধ্যবর্তীকাল পর্যন্ত নির্বিঘ্নে বঙ্গ শাসন করেন।

সেন বংশের শাসনের অবসান কালে বঙ্গের একক শাসন শক্তি লোপ পায়। এ সময় দেব বংশের দশরথ দেব দক্ষিণপূর্ববাংলা (কুমিল্ল নোয়াখালি অঞ্চল) শাসন করেন। তার রাজ্য পরবর্তীতে ফরিদপুর অঞ্চলে বিস্তৃত হয়। দেব বংশের সমাচার দেবের রাজত্ব সম্বেন্ধে ঘুঘ্রাঘাটি লিপিতে পাওয়া যায়। সমাচার দেবের ঘুঘ্রাঘাটি লিপিতে সুবর্ণবিথীর উল্লেখ আছে। এই সুবর্ণবিথী নব্যকাশিকার (কোটালীপাড়া) অন্তর্ভুক্ত ছিল। সুবর্ণবিথীর অন্তর্ভুক্ত ছিল বারব মণ্ডল, ধ্রবিলাটি ।

ধ্রবিলাটি বর্তমানে ধুলদি গেট (ফরিদপুর)। দেব বংশের রাজা দনুজমর্দন দেব সোনারগাঁকে রাজধানী করে স্বাধীনভাবে বঙ্গ শাসন করেন। তার রাজত্বকাল ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত চলে। ১২৬৮ খ্রিস্টাব্দে তুঘরল খান দিল্লীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং স্বাধীনতা ঘোষনা করেন। বরনীর বিবরণ থেকে জানা যায় তুঘরিল খান লক্ষ্ণৌতি রাজ্যের সীমানা বৃদ্ধির জন্য মনোযোগ দেন। তিনি দনুজমর্দন দেবের শক্তি সোনারগাঁ দখল করার জন্য সোনারগাঁ রাজ্যের অদূরে একটি দুর্গ নির্মাণ করেন। বরণী এ কিল্লাকে নরকিল্লা বা নারকিল্লা বলেছেন। ফরিদপুরের ইতিহাস লেখক আনম আব্দুস সোবহান নারকিল্লাকে রাজবাড়ির দক্ষিণপূর্বে ১০ মাইল অদূরে মনে করেন। এটা বর্তমানের নলিয়া হতে পারে। দনুজমর্দন দেবের সময় শাসন কেন্দ্র দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তা মুসলিম শাসনভুক্ত হয়। স্যার উইলিয়াম হান্টারের Statistical Account of the Dacca District ১১৯ পৃষ্ঠায় Professor Blochman এর দক্ষিণ বাংলার শাসন সম্বন্ধে বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে মুসলমান দ্বারা বিজিত হলেও দক্ষিণ বাংলা শতাব্দীকালেরও উর্ধে্ব বল্লাল সেনের বংশধর ও অন্যান্য স্থানীয় রাজাদের দ্বারা শাসিত হয়। ১৩৩০ সালে মুহম্মদ তুঘলক পূর্ববাংলা দখল করেন এবং লক্ষ্ণৌতি সাতগাঁ ও সোনারগাঁ তিনটি প্রদেশে বিভক্ত করেন (ঢাকাসহ)। সোনারগাঁয়ের গভর্ণর ছিলেন তাতার বাহরাম খান। ১৩৩৮ সালে তার মৃত্যুর পর ফকরউদ্দিন মোবারক শাহ সিংহাসন দখল করেন এবং মুবারক শাহ নাম ধারণ করে প্রায় দশ বৎসরকাল রাজত্ব করেন। সোনারগাঁ পূর্ববাংলার শাসন কেন্দ্রে পরিণত হয়। ফকরউদ্দিন মবারক শাহ এবং তার বংশধরদের রাজত্বকালে বাংলা বিভিন্ন কারণে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। অতঃপর ১৩৫১ সালে শামসুদ্দিন ইলিয়াশ শাহ সোনারগাঁ, সাতগাঁ ও লক্ষ্ণৌতিকে একত্র করে একচ্ছত্র স্বাধীন সুলতান হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তার সময়েই বাংলা একক স্বাধীন বাংলায় পরিণত হয় যা ইতিহাসে ‘সুবে বাংলা’ বলে পরিচিত । ১৩৫২ সালে সেনারগাঁ টাকশাল থেকে তার নামে মুদ্রা উৎকীর্ণ হয়। ইলিয়াস শাহের পুত্র সিকান্দার শাহ সোনারগাঁ শাসন করেন। তার বংশধরগণের শাসনকালে শাসন কেন্দ্র সোনারগাঁ দিল্লীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং স্বাধীন সুলতান হিসেবে সোনারগাঁ শাসন করে। সিকান্দর শাহের পুত্র আযম শাহ স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং কবি হাফিজকে সোনারগাঁয়ে আমন্ত্রণ করেন। আযম শাহের পর সোনারগাঁ সিংহাসন রাজা কানস এর দ্বারা অধিকৃত হয়। কিন্তু ১৪৪৫ সালের মধ্যে বাংলা পুনরায় মাহমুদ শাহের অধীনে একত্রিত হয়। এ সময় ইলিয়াস শাহের বংশধরগণের দ্বারা ১৪৮৭ ‍খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সোনারগাঁ শাসিত হয়। এদের মধ্যে জালাল উদ্দিন ইতিহাসে বিশেষভাবে পরিচিত। মাহমুদ শাহের রাজত্বকালে বাংলার পূর্বাঞ্চল মেঘনা থেকে সিলেট পর্যন্ত মোয়াজ্জামাবাদ প্রদেশ গঠিত হয়। কিন্তু ঢাকার অঞ্চল বিশেষ করে ফরিদপুর এবং বাকেরগঞ্জ নিয়ে গঠিত হয় জালালাবাদ ও ফতেহাবাদ প্রদেশ। ফতেহাবাদ যে ফরিদপুর তা আজ ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। যদিও চট্রগ্রামের ৮ মাইল উত্তরে অন্য একটি ফতেহাবাদের উল্লেখ রয়েছে। ফতেহাবাদ সম্বন্ধে ড. আব্দুল করিম বাংলার ইতিহাস সুলতানি আমল পুস্তকের ২৪৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন, ‘জালালউদ্দিন ফতেহাবাদ ও রোতসপুর হতে মুদ্রা উৎকীর্ণ করেন। ফতেহাবাদ ও আধুনিক ফরিদপুর অভিন্ন।’ ইতিপূর্বে ফরিদপুর এলাকা মুসলমানদের অধীনে ছিল না। সেই অঞ্চলে এতদিন ছোট ছোট হিন্দু রাজারা রাজত্ব করতেন। সুতরাং ফতেহাবাদ হতে মুদ্রা উৎকীর্ণ হওয়ায় আমরা বলতে পারি যে, জালাউদ্দিন ফরিদপুর জয় করেন এবং দক্ষিণ বঙ্গের দিকে রাজ্য বিস্তার করেন। মধ্যযুগের কবি বিজয় গুপ্ত ১৪৯৪-৯৫ সালের মধ্যে মনসামঙ্গল বা পদ্মাপুরাণ কাব্য রচনা করেন।

কবি তার আত্মপরিচয়ে বলেন….

মূল্লুক ফতেহাবাদ বঙ্গজোড়া ইকলিম,

পশ্চিমে ঘাঘরা নদী পূর্বে ঘন্টেশ্বর।

 

ফতেহাবাদ মুল্লুকে ঘাঘড়া ও ঘন্টেশ্বরী নদীর মধ্যবর্তীস্থান ফুল্লেশ্রী গ্রামে কবির জন্ম। ফুল্লেশ্রী বর্তমান বরিশালের গৈলাগ্রামের একটি পল্লী। ফতেহাবাদ রাজ্যের অন্তর্গত ছিল বর্তমান রাজবাড়ির কিছু অংশ। সুলতান নাসিরুদ্দীন মাহমুদের রাজত্বকালের মুদ্রা ভাগলপুর, সাতগাঁও বাগেরহাট হতে উৎকীর্ণ হয়েছে এবং তার শাসনামলের শিলালিপি পাওয়া গেছে। ১৪৫৯ সালে তিনি যশোহর, খুলনা পুনরুদ্ধারের জন্য খান জাহান আলী নামে এক সেনাপতিকে পাঠান। তিনি এ অঞ্চল জয় করে খলিফাতাবাদ শহর এবং প্রশাসনিক বিভাগ ইকলিম হিসেবে ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। রাজবাড়ি জেলার ভৌগোলিক অবস্থানের বিশেষত্ব এই যে বর্তমান জেলাটি পুরাতন ফরিদপুর ও যশোর জেলার সংলগ্ন। আবার উত্তরে পাবনার সাথেও এর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তবে রাজবাড়ি জেলার অংশবিশেষ বেশির ভাগ সময় ফরিদপুর ও যশোর জোলার সাথে সংযুক্ত দেখা যায়। ১৭৯৩ সালে জেলাটির কিছু অংশ ঘাট গোয়ালন্দ হিসেবে যশোরের সাথে সংযুক্ত ছিল। কাজেই রাজবাড়ি তৎকালীন সময়ে ফতেহবাদ ও খলিফাতাবাদের সাথে সংযুক্ত থাকাই স্বাভাবিক এবং রাজবাড়ির পূর্বাংশ বাদ দিয়ে বাকি অংশ খলিফাতাবাদ প্রশাসনিক অঞ্চলের সাথে যুক্ত ছিল।

১৪৯৩ থেকে ১৫১৯ পর্যন্ত আলাউদ্দিন হুসেন শাহের রাজত্বকাল। Mr. Vincent Smith এর মতে হুসেন শাহ ছিলেন বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ মুসলিম শাসক। Professor Blochman বলেন, Hussain shah first obtained power in the district of Faridpur, Fathahabad where his earliest coins were struck. হুসেন শাহের সময় রাজবাড়ি তার অধিকারভুক্ত হয়। রাজবাড়ি জেলার নসিবশাহী পরগনা, নশরতশাহী পরগনা, মাহমুদশাহী পরগনা, ইউসুফশাহী পরগনার নামকরণ হুসেনশাহের ভ্রাতা ইউসুফ শাহ এবং ইউসুফ শাহের সন্তান নশরত শাহ এবং মাহমুদ শাহের নামকরণে এসব পরগনার নামকরণ হয়। উল্লেখ্য পাংশা, বালিয়াকান্দি, গোয়ালন্দ ও রাজবাড়ি উপজেলা নশরতশাহী, মাহমুদশাহী, নসিবশাহী, ইউসুফশাহী পরগনার নামে প্রাচীন পরিচিতি রয়েছে। এ সময় ফতেহাবাদ ছিল হুসেন শাহের প্রধান শাসন কেন্দ্র যা বর্তমান ফরিদপুর শহর। আইন-ই আকবরী গ্রন্থে দেখা যায় জালালুদ্দিন ফতেহ শাহ লক্ষ্ণৌতির শাসনকর্তা ছিলেন। (১৪৮১-১৪৮৭)। তিনি কতকগুলি সরকারে বিভক্ত করেন। এই সরকারে ফরিদপুরের অংশবিশেষ, ঢাকার অংশবিশেষ, বাকেরগঞ্জ নিয়ে জালালবাদ সরকার এবং ফরিদপুরের পশ্চিম অঞ্চল, যশোর এবঙ কুষ্টিয়অসহ মাহমুদাবাদ সরকার গঠিত হয়। বর্তমান রাজবাড়ি স্বাধীন সুলতানি আমলে ফতেহাবাদ, খলিফাতাবাদ, মাহমুদাবাদ রাজ্য হিসেবে শাসিত। মোগল শাসনকালে আকবর নামায় দেখা যায় ১৫৭৪ ‍খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণপূর্ববাংলা জয় করার জন্য সেনাপতি মোরাদ খানকে পাঠান। সেনাপতি মোরাদ খান ফতেহাবাদ জয় করেন এবং বাকলা ও তার অধিকারভুক্ত হয়। মোরাদ খান এখানেই থেকে যান এবং সাত বৎসর পর মৃত্যুবরণ করেন। আকবর নামায় দেখা যায় ফরিদপুরের উত্থান ইতিহাস খ্যাত। তাদের দমনের জন্য সম্রাট আকবর মানসিংহসহ একের পর এক সেনাপতি পাঠান। সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে (১৬০৬-১৬২৭) ইসলাম খান (১৬০৮-১৬১৩) বাংলার সুবাদার নিযুক্ত হন তিনি সমগ্র বাংলার একচ্ছত্র শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হন। ইসলাম খানের পর ১৭৫৭ পর্যন্ত ২১ জন সুবেদার বাংলা শাসন করেন। শেষের দিকে বাংলার সুবেদারগণ স্বাধীন নবাব হিসেবে বাংলায় রাজত্ব করতেন। খলিফাতাবাদ যশোর খুলনা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। যশোরের পরগনাসমূহের মধ্যে মাহমুদশাহী, মহিমশাহী, ইউসুফশাহী, নসিবশাহী, নশরতশাহী পরগণার মধ্যে রাজবাড়ির বালিয়াকান্দি নসিবশাহী, পাংশা কালুখালির মহিমশাহী নশরতশাহী বিদ্যামান।