পদ্মা নদীর-জন্মকাল ও ভাঙ্গাগড়ার খেলা

পদ্মা নদীর-জন্মকাল ও ভাঙ্গাগড়ার খেলা

নদ-নদী

পদ্মা, গড়াই, হড়াই, চন্দনা বাহিত পলি, কাঁকর দিয়ে সৃষ্টি রাজবাড়ী জেলা। রাজবাড়ীর প্রধান ঐতিহ্য এককালের রুপালি ইলিশ। আজও রাজবাড়ী অঞ্চলের মানুষের জীবন পরিচালিত হচ্ছে এ সব নদনদীর প্রভাবে। সঙ্গত কারণেই এ সব নদনদীর অতীত স্রোতধারা, তার জন্মকাল জানতে ইচ্ছে করে। জানতে ইচ্ছে করে এর ভাঙ্গাগড়ার খেলা।

 

পদ্মা

          নটিনী তটিনী আমি

          নির্ঝরিণী নিঃসঙ্গ,

          তরঙ্গ ভঙ্গিমায় ভঙ্গিল দেহ

          জন্ম নিলাম প্রমত্ত পদ্মা আমি

৫০০ বৎসর পূর্বে পদ্মা এমন ছিল না। তখন গঙ্গার প্রধান ধারা ভাগীরথী দিয়ে চলত। পলি পড়ে ভাগীরথীর নদীতল উঁচু হয়ে উঠলে ক্রমশঃ পূর্বে জলঙ্গী, মাথাভাঙ্গা, কুমার, গড়াই, হড়াই, চন্দনা দিয়ে গঙ্গার প্রধান প্রবাহ চলতে থাকে। গঙ্গা পরে তার পূর্বমুখী ধারা খুজে পায়। এ ক্ষেত্রে গঙ্গার প্রবাহ খুজতে গিয়ে মূলত গঙ্গার প্রাচীনত্বের ব্যাখ্যা প্রয়োজন যা অতি জটিল অধ্যয়ন। মধ্যপুরাণ ও মহাভারতে গঙ্গার পূর্বগামী ৩টি ধারা হলদিনী, পাবনী ও নলিনীর, উল্লেখ রয়েছে। অনেকের ধারণা পাবনী থেকে পন্মার নাম এসেছে যা পাবনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ২য় শতকে টলেমীর নকশা, সপ্তম শতকে হিউয়েন সাং এর বর্ণনা, ষোড়শ শতকে ডি ব্যরসের নকশা, বিখ্যাত সেচ ইঞ্জিনিয়ার উলিয়াম উইলকক্স, নীহাররঞ্জন ও কপিল ভট্টাচার্যের নদীর গতিপথ বর্ণনাসহ আনুষঙ্গিত উপাদানের সাহায্যে পদ্মার ঐতিহাসিক পর্যালোচনা করা যাবে, যা থেকে অতীত ও বর্তমান পদ্মা সম্বন্ধে একটি ধারণা পাওয়া সম্ভব। রাজমহলের সোজা উত্তর-পশ্চিম তেলিয়াগড় ও সিক্রিগলির গিরিবর্ত্ম গঙ্গার বাংলায় প্রবেশ পথ। প্রাচীন গৌড়ের প্রায় ২৫ মাইল দক্ষিণে গঙ্গার ধারা ভাগীরথী ও পদ্মা এই দুই ধারায় প্রবাহিত। ড. নীহাররঞ্জন ভাগীরথীকে মূলধারা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ঐতিহাসিক রাধাকমল মুখোপাধ্যায় মনে করেন ষোড়শ শতক থেকে পদ্মার পূর্বযাত্রা বা সূত্রপাত। রেনেল ও ফ্যানডেন ব্রকের নকশায় দেখা যায় ষোড়শ শতকে পদ্মা বেগবতী নদী। সিহাবুদ্দিন তালিশ (১৬৬৬), মির্যা নাথনের (১৬৬৪) বিবরণীতে গঙ্গা ব্রক্ষপুত্রের সঙ্গমে ইছামতির উল্লেখ করেছে।

 

ইছামতির তীরে যাত্রাপুর এবং তিন মাইল উত্তর পশ্চিমে ডাকচড়া (মানিকগঞ্জ) এবং ঢাকার দক্ষিণে গঙ্গা ব্রক্ষপুত্রের সম্মিলন প্রবাহের সমুদ্র যাত্রা। ড. নীহাররঞ্জন, ‘তখন গঙ্গার এ প্রবাহে পদ্মার নামকরণ দেখছি না। আইন-ই-আকবরী গ্রন্থে আবুল ফজল লিখেছেন (১৫৯৬-৯৭),‌ ‘কাজীর হাটের কাছে পদ্মা দ্বিধা বিভক্ত হয়ে একটি শাখা পূর্বগামিনী পদ্মাবতী নাম নিয়ে চট্টগ্রামের নিকট সুমদ্রে মিশেছে। মির্যা নাথানের বর্ণনায় করতোয়া বালিয়ার কাছে একটি বড় নদীতে পড়েছে। এই বড় নদীটির নাম পদ্মাবতী। ত্রিপুরা রাজ বিজয় মাণিক্য ১৫৫৯ ত্রিপুরা হতে ঢাকায় এসে ইছামতি বেয়ে যাত্রাপুর এসে পদ্মাবতীতে তীর্থস্নান করেছিলেন। এ হিসেবে তখনকার পদ্মা বর্তমান অবস্থান থেকে ১৫/২০ মাইল  উত্তরে প্রবাহিত হত এবং তা রেনেলের নকশা এবং টেলরের বর্ণনার সাথে মিলে যায়।

 

ষোড়শ শতকে পদ্মা ও ইছামতি প্রসিদ্ধ নদী। ষোড়শ শতকের ব্যারস এবং সপ্তদশ শদকের ব্রকের নকশায়ও তা পাওয়া যায়। চতুর্দশ শতকে ইবনে বতুতা (১৩৪৫-৪৬) চীন দেশে যাওয়ার পথ চট্টগ্রাম নেমেছিলেন। তিনি চট্টগ্রামের হিন্দু তীর্থস্থান গঙ্গা নদী ও যামুনা নদীর সঙ্গমস্থল বলেছেন। তাতে বোঝা যায় চর্তুদশ শতকে গঙ্গার মধ্যেবর্তী প্রবাহ পদ্মা চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তটভূমি প্রসারের সাথে সাথে চট্টগ্রাম এখন অনেক পূর্ব দক্ষিণে সরে গিয়েছে। ঢাকাও এখন পদ্মার উপর অবিস্থিত নয়। পদ্মা এখন অনেক দক্ষিণে নেমে এসেছে। ঢাকা এখন পুরাতন গঙ্গা পদ্মার খাত বুড়িগঙ্গার উপর অবস্থিত আর পদ্মা ব্রক্ষপুত্রের (যমুনা) সঙ্গম গোয়ালন্দের অদূরে।

পদ্মা তার খাত বারবার পরিবর্তন করেছে তার যথেষ্ট প্রমাণাদি এ পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। দশম শতকের শেষে এবং একাদশ শতকের গোড়ায় চন্দ্রবংশীয় রাজারা বিক্রমপুর, হরিকেল অর্থাৎ পূর্ব ও দক্ষিণ বঙ্গের অনেকটা জুড়ে রাজত্ব করতেন। এই বংশের মহারাজধিরাজ শ্রীচন্দ্র তার ইদিলপুর পট্টলীদ্বারা স্মতট পদ্মাবতী অঞ্চলের অন্তর্গত কুমার তালক মন্ডলের জনৈক ব্রাক্ষণকে একখন্ড ভূমি দান করেছিলেন। পট্টলীও সমসাময়িক সাহিত্য গ্রন্থেও পদ্মা নদীর উল্লেখ আছে। ‘বাজলার পাঁড়ী, পঁ-ঊ-আ খালে বাঁহিউ’ অর্থাৎ পদ্মাখালে বজরা নৌকা পাড়ি দিতেছে। এতে অনুমান করা যাচ্ছে নবম দশম শতকেও পদ্মার অস্তিত্ব ছিল তবে তা ছিল ক্ষীণতোয়া অপ্রশস্ত খাল বিশেষ। ব্রক্ষপুত্র বর্তমান যমুনার খাতে প্রবাহিত হতে শুরু করার আগে পদ্মা ধলেশ্বরী বুড়িগঙ্গার খাতে প্রবাহিত হত। ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে তিস্তা অকস্মাৎ তার পূর্ব যাত্রা পরিত্যাগ করে এবং তার বিপুল বন্যার বারিরাশি ব্রক্ষপুত্রের বন্যার পানির সঙ্গে মিশে যমুনার খাতে বইতে শুরু করে দেয় গোয়ালন্দের পাড়ে।

 

প্রাচীন রাজধানী বিক্রমপুরের মন্দির প্রাসাদ ধ্বংস করে পদ্মা কীর্তিনাশা নাম ধারণ করে। জেমস টেলরের বর্ণনায় কীর্তিনাশা ঢাকার শ্রীপুরের মফলৎগঞ্জ ও রাজনগরের কিছুটা উত্তর দিয়ে প্রবাহিত। এটাই গঙ্গার প্রধান শাখা যা প্রশস্ততা ছিল ৩/৪ মাইল। রেনেলের মানচিত্রে টেলরের বর্ণনায় কীর্তিনাশা কার্তিকপুরের উত্তরে মেঘনার সাথে মিলিত হয়েছে। গঙ্গার দ্বিতীয় শাখা টেলরের বর্ণনায় নয়াভাঙ্গনী নদী (আড়িয়াল খাঁ) ঢাকা জেলার কোল বেয়ে বকেরগঞ্জের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। মূলতঃ ৩০০/৪০০ বৎসর পূর্বে পদ্মার ধারা বর্তমান ধারা থেকে আরো উত্তরে বোয়ালিয়া (রাজশাহী শহর) পাবনার চলনবিল, ইছামতি (মানিকগঞ্জ) ধলেশ্বরী একাকারে ঢাকার দক্ষিণ দিয়ে শ্রীপুরের কীর্তিনাশা হয়ে সোজা দক্ষিণে প্রবাহিত হত। ২০০ থেকে ২৫০ বছরের মধ্যে পদ্মা অনেক দক্ষিণে সরে এসে বর্তমান খাতে রাজবাড়ী জেলার কোল ঘেঁষে জেলার উত্তর সীমানা দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। আবার কখনো উত্তরে ৫/৬ মাইল সরে গেছে। বর্তমানে রাজবাড়ী জেলার উত্তরে হাবাশপুর, ধাওয়াপাড়া ঘাট সোজা এসে মিজানপুর থেকে বাঁক নিয়ে ৬/৭ মাইল উত্তরে প্রবাহিত হয়ে পূর্বদিকে গোয়ালন্দের ৩ কিমি উত্তরে দৌলতদিয়ার অদূরে যমুনার ধারা বুকে নিয়ে পূর্ব মুখে প্রবাহিত হচ্ছে। পদ্মার তিনশত বছরের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় বর্তমান গোয়ালন্দ, রাজবাড়ী ও পাংশা থানার উত্তরাংশ পদ্মার নব উত্থিত চর দ্বারা সৃষ্টি। এসব দ্বীপ গোয়ালন্দের পঞ্চাশ হাজারী সমন্বিত চর বলে খ্যাত।

 

 

রাজবাড়ি জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য

প্রফেসর মতিয়র রহমান

(পৃষ্ঠা-৩০-৩২)