ধর্মীও সম্প্রদায়

ধর্মীয় সম্প্রদায়

১২০৬ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজীর পূর্বে এদেশের রাজা ও প্রজা প্রায় সকলেই ছিল বৌদ্ধ ও হিন্দু। কেবল মুসলমানদের রাজত্ব শুরু হবার পর থেকে মুসলমান প্রবাহের শুরু হয়। এ ধর্ম কখন বিশেষভাবে প্রসার লাভ করে তার একটা পরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায় বঙ্গদেশে নির্মিত মসজিদের সংখ্যা এবং অবস্থান থেকে। ত্রয়োদশ শতকে মসজিদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৬টি। পরের শতাব্দীতে এই সংখ্যা আনুপাতিক সেটেই বৃদ্ধি পায়। এ শতাব্দীতে এরুপ মসজিদ নির্মিত হয় সাতটি। পনের শতকে এ সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং মসজিদ তৈরি হয় ৬৬টি। আর যোল শতকে ৭৫টি। তারপর সতের শতকে ঢাকা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, নোয়াখালি, কুমিল্লা ইত্যাদি অঞ্চলের মসজিদের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পায়। ক্রেমারের গবেষণা থেকে জানা যায় ১২০৪ সালে বঙ্গদেশে মোট জনসংখ্যা ছিল ১২.৫৮ মিলিয়ন (১ কোটি ২৫ লক্ষ প্রায়) তা ১৮৭২-এ দাঁড়ায় ৩৬.৭ মিলিয়ন (৩ কোটি ৭০ লক্ষ প্রায়)।

১৯০১ এ দাঁড়ায় প্রায় ৪কোটি (উভয় বাংলা)। পানিনি প্রদত্ত গ্রাফে দেখা যায় ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের পূর্ববঙ্গে মুসলমান ছিল খুবই কম। তবে ১৮৭২-এর দেখা যায় হিন্দু মুসলমান প্রায় সমান এবং গ্রাফটিতে ১৯০১-এ মুসলমানদের সংখ্যা হিন্দুদের ছাড়িয়ে যায়।

প্রায় একশত বছর পূর্বে ফরিদপুর জেলায় হিন্দু, মুসলমান, ব্রাহ্ম, খ্রিস্টান এই চার জাতির বাস ছিল। হিন্দুর সংখ্যা ৭,৩৩৫৫ জন। তম্মোধ্যে পুরুষ ৩৬০০১২ স্ত্রী ৩,৭৩,৫৪৩। ব্রাহ্ম ৮৩ জন। পুরুষ ৪০, মহিলা ৪৩। মুসলমান মোট সংখ্যা ১১,৯৯,৩৫১ জন। তম্মোধ্যে পুরুষ ৬,০৭,৬৮৮ ও স্ত্রী ৫,৯১৬৬৩ জন। খ্রিস্টান ৩,৬৫৭ জন (ফরিদপুরের ইতিহাসে আনন্দনাথ রায় পৃষ্ঠা-২২)।

১৯৬১ সালে আদমশুমারী অনুযায়ী ফরিদপুর জেলার মোট জনসংখ্যা ৩১,৭৮,৯৪৫। এরমধ্যে ২৩,৪৭,১৭৩ জন মুসলমান। ২,২৮,৫০৬ জন কাষ্ট হিন্দু। ৬,৯৬,৫৫৮ জন শিডিউল কাষ্ট (নমশুদ্র), ৯,১৫৮ জন খ্রিস্টান এবং অন্যান্য ৫৫০ জন। এ সময় গোয়ালন্দ মহকুমার হিন্দু ও মুসলমান জনসংখ্যার পরিমাণ ছিল নিম্নরুপ——

মহকুমা গোয়ালন্দ ১৯৬১ সেনসাস

মহকুমার

থান/নাম

সমস্ত ধর্মের লোকসংখ্যা মুসলমান কাষ্ট হিন্দু শিডিউলকাষ্ট হিন্দু মোট হিন্দু ক্রীশ্চিয়ান অন্যান্য
গোয়ালন্দ মহাকুমা ৪৩৪৪০৭ ৩১৫৮৮৬ ৫১০৯৩ ৬৭৩৪৯ ১১৮৪৪২ ৩০ ৭৯
পাংশা  থানা ১৫৮৩৩১ ১২৪২৯৫ ১৮০১৪ ১৬০২২ ৩৪০৩৮ ০০ ৩০
বালিয়াকান্দি থান ১১৮০৩৬ ৬৫৭১৫ ১৭৪৩২ ৩৪৮৮৯ ৫২৪৪৯ ০০ ৩০
রাজবাড়ি থানা ১১৩৪৪৯ ৮৯৩৭৬ ১৪৪৪৮ ৯৫৩৬ ২৩৯৮৪ ৩০ ৪৯
গোয়ালন্দ ঘাট ৪৪৬০১ ৩৬৫০০ ১১১৯ ৬৯০২ ৮০২৯ ০০ ০০

উল্লেখিত বিবরণ, গ্রাফ ও তথ্যসূচী থেকে জেলায় মুসলমান সংখ্যা বৃ্দ্ধির স্পষ্ট নিদর্শন মেলে।

বঙ্গে ইসলাম প্রবাহের কয়েকটি কারণ উল্লেখযোগ্য যথা—–তরবারি, সামাজিক সাম্য, পীরদরবেশ ও আউলিয়াদের ধর্ম প্রচার, বৌদ্ধ ও হিন্দুদের সামাজিক অবস্থা এবং বঙ্গের সহজ জীবন ব্যবস্থা। ভারতবর্ষে যদি কেবল তরবারির দ্বারা ইসলামের প্রসার ঘটত তাহলে দিল্লী, আগ্রাতেই মুসলমান বেশি থাকত। কিন্তু তুলনামূলক দেখা যায় ইসলাম ধর্মের প্রসার ঘটেছে দ্রুত এবং তা আবার ১৫ শতকের পর অর্থাৎ মোগল শাসনকাল থেকে। মোগলরা আবার ধর্মপ্রচারে উদাসীন ছিলেন বলেই ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয়।

নবম শতাব্দী থেকে আরব বণিকরা চট্রগ্রাম অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। অবশ্য তারা র্ধম প্রচার করতে আসেননি। বখতিয়ার খলজির মতো তারাও এসেছিলেন ইহলৌকিক লাভের আশায়। এদেশে বণিক ও যোদ্ধা ছাড়া আরো এসেছিলেন ধর্ম প্রচারকরা। তারা দেশ শাসন বা ব্যবসা করতে আসেননি। তারা এসেছিলেন ধর্মপ্রচারে দ্বারা পুণ্য অর্জন করতে। মহম্মদ এনামুল হকের মতে এ রকম একজন প্রচারক বাবা আদম এসেছিলেন দ্বাদশ শতকের গোড়ায়। জানা যায় তিনি, নাকি বল্লভ সেনের সাথে যুদ্ধ করে ১১১৯ সালে মারা যান। তারপরে আসেন শাহ মুহম্মদ সুলতান। সে কালের প্রখ্যাত সুফি সৈয়দ জালালউদ্দিন মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার কিছু আগে বঙ্গে এসেছিলেন। তারা সে সময় আগমন করলেও ইসলাম প্রচারে বিশেষ সুবিধা করতে পারেননি। কারণ তখন রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকাতার অভাব ছিল। তবে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠায় ইসলাম প্রচার প্রসারে ব্যাপক সাহায্য করেছিল। সুলতানদের লক্ষ্য না হলেও তারা আদৌ ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন না। তারা বরং বিদ্বেষের কর্তৃত্বকে প্রতিষ্ঠিত এবং জোরদার করার জন্য অকাতরে ধর্মের নাম এবং প্রতীক ব্যবহার করেছেন। সেই সঙ্গে ব্যাবহার করেছেন তরবারি। নিজেদের নামে খুৎবা প্রচলন রীতি তখন প্রকাশ্যে রীতি হিসেবে গৃহীত হয়েছিল। মুসলমানদের সংখ্যা কম হলেও তারা বহু মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন ও নির্মাণ করতে সাহায্য করেছিলেন। বস্তুত মসজিদ ধর্ম প্রচারের প্রতিকে পরিণত হয়েছিল। নতুন কর্তৃত্বের সমকালীন ঐতিহাসিক মিনহাজ এর বিবরণ থেকে জানা যায়, জাহাঙ্গীর খিলজী গোবিন্দ পালের রাজধানী অজন্তপুরী আক্রমন করে এবং রাজধানী দখলের পর বৌদ্ধবিহার লুটপাট এবং বৌদ্ধ ভিক্ষুদের  হত্যা করে। অনেক বৌদ্ধ সে সময় মুসলমানদের অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দক্ষিণ পূর্ববাংলায় এবং নেপালে আশ্রয় নেয়। হিন্দু মন্দিরও ভেঙ্গে ফেলেন। এছাড়া তাদের মূর্তিপূজা বিরোধী মনোভাব ছিল। সুলতানি আমলেও প্রথম দিকে বৌদ্ধ বিহার ও মন্দির ধবংসের ঘটনা কমবেশি ঘটে থাকলেও জোর জুলুম করে হিন্দু প্রধান বাংলায় রাজ্যশাসন স্থায়ী হবে না তা তারা বুঝেছিলেন। এছাড়া গোটা দেশ জুড়ে ছিল ছোট বড় হিন্দু রাজা ও জমিদার। তাদের বশে না-রাখতে পারলে ভূমি রাজস্ব পাওয়া যাবে না। এ কারণে সুলতানি শাসনের পরবর্তীকালে শাসকগণ ধর্ম প্রচারে উৎসাহিত ছিলেন না। বাংলায় ইসলাম ধর্মের বিকাশে যত মতবাদই থাক না কেন এদেশে মুসলিম শাসনের প্রাক্কালে আরব, তুরস্ক, ইরাক থেকে যে সংস্কৃতির প্রবাহের ঢেউ এসে ধাক্কা দেয় তা ধীরে ধীরে বাংলার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ে। একথা কোনো ইতিহাসবিদ অস্বীকার করতে পারবেন না। একথা ঠিক যে, কোনো অঞ্চলে সভ্যতার উন্মেষ ঘটলে তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ‍উভয় প্রভাব সর্বত্র ছড়েয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে প্রত্যক্ষভাবে মুসলমান বিজয়ীরা মুসলিম সংস্কৃতির বিকাশ বঙ্গে ঘটেয়েছিল। তবে প্রথম দিকে তা ফরিদপুর অঞ্চলে বা পূর্ববঙ্গে ঘটেনি। পূর্ববঙ্গ তখনও মুসলিম শাসনের আওতায় আসে নাই। ১২৭৫ খ্রি. সুলতান মুগীস উদ্দিন তুগরিল দিল্লীর বশ্যতা অস্বীকার করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং নিজ নামে খুৎবা পাঠ এবং মুদ্রা চালু করেন। তিনি পদ্মা নদীর দুই তীরবর্তী অঞ্চলে বিশেষ করে বর্তমান রাজবাড়ি ফরিদপুর এবং ঢাকা জেলার পশ্চিম-দক্ষিণাংশের উপর কর্তৃত্ব স্থাপন করেন।

সুলতান রুকুনউদ্দিন বরবক শাহের পুত্র শামসুদ্দিন ইউসুফ শাহ (১৪৭৪-১৪৮১) সাত বছর বাংলা শাসন করেন। ইউসুফ শাহের মৃত্যুর পর তার পুত্র সিকান্দার শাহকে (১৪৮১) সরিয়ে রুকুনউদ্দিন বরবক শাহের ছোট ভাই ফতেহ শাহ (১৪৮১-১৪৮৯) ক্ষমতা দখল করেন। ফতেহ শাহর সময়ে গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, ফুলেশ্বরী, ইদিলপুর, রাজবাড়ি মোগল শাসকরা বসতি স্থাপন করে। ১৪৮৭ থেকে ১৪৯৩ হাবশী ক্রীতদাসগণ বাংলা শাসন করেন। এ সময় ছিল অশান্তির যুগ। ১৪৯৩ খ্রিস্টাব্দের সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ লক্ষ্ণৌতে তথা বাংলার সিংহাসনে আসিন হন। তার সময়েই ফতেহবাদ অঞ্চল সরাসরি মুসলমানদের অধিকারে আসে। ফতেহবাদ অঞ্চলকে নুশরতশাহী, মাহমুদশাহী, ইউসুফশাহী ও মাহমুদাবাদ নামকরণ করেন। এরমধ্যে রাজবাড়ি নশরত শাহী ও ফতেহাবাদে অন্তভুক্ত হয়। (পরগনা হিসেবে রাজবাড়ি নুশরতশাহী দেখা যায়।) সুলতানি শাসনকালে প্রায় ২০০ বছর ফতেহাবাদ উল্লেখযোগ্য শাসন কেন্দ্রে পরিণত হয়। ফতেহবাদ টাকশালি থেকে মুদ্রা উত্তোলন হত। দীর্ঘকাল ও অঞ্চল মুসলিম শাসনাধীন থাকায় ইসলামের প্রসার ঘটাই স্বাভাবিক। এরমধ্যে হুসেন শাহের বংশের রাজত্বকাল ১৪৯৩-১৫৩৮। সুদীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর রাজত্বকালে হুসেন শাহ ও তার পুত্র নশরত শাহ ইসলাম ধর্ম প্রচারে অনেক মসজিদ নির্মাণ করেন। নশরত শাহের নির্মিত গৌড়ের সোনা মসজিদ, কদম-রসুল মসজিদ, বার দুয়ারী মসজিদ স্মৃতিস্বরুপ ইসলাম প্রসারের দৃষ্টান্ত বহন করে। ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী থানায় অবস্থিত সাতৈর মসজিদ তাঁর কীর্তি (ফরিদপুরের ইতিহাস, আনম আবদুস সোবহান, পৃষ্ঠা-৩৬)। নশরত শাহ ও তাঁর পিতা হুসেন শাহ প্রজাহিত কাজ ও ইসলাম প্রচারে আরো মসজিদ সরাইখানা নির্মাণ করেন। রাজবাড়ি অঞ্চলটি ফতেহাবাদ, নশরতশাহী এবং মাহমুদাবাদের অংশবিশেষ। রাজবাড়িতে কালুখালির অদূরে ‘রুপসা গায়েবী মসজিদ’, সূর্যনগরের নিকটবর্তী ‘বাগমারা গায়েবী মসজিদ’, আলাদীপুর ইউনিয়নের ‘শিঙ্গা গায়েবী মসজিদ’ নামে ৫০০-৭০০ বছরের পুরানো এসকল মসজিদের ধবংসাবশেষ এখনো দেখা যায়। এ বিষয়ে পরে আলোচনা করা যাবে। মসজিদগুলি হুশেণী বংশের রাজত্বকালে নির্মিত।

তুর্কি শাসনের শুরু থেকে বাংলায় মোগল শাসনের পূর্বকালে প্রায় ৪০০ বছর ধরে ধীরে ধীরে বঙ্গে ইসলাম প্রসার লাভ করেছে। এ প্রসারের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে (১) মুসলমানদের শাসন প্রভাব ও পৃষ্ঠপোষকতা (২) ধর্মে মূর্তির বদলে অমূর্তের আদর্শে জোরপূর্বক হিন্দু দেবদেবী ধবংস (৩) পীর আউলিয়াদের ধর্ম প্রচারে স্বেচ্ছায় ধর্মান্তরিত হওয়া ইত্যাদি। রামাই পণ্ডিতের শূন্য -পূরাণে ইসলাম ধর্মের প্রসারের চিত্র এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

যথেক দেবতাগণ/ সভে হৈয়্যা একমন/ আনন্দেতে পরিলা ইজার/ ব্রাহ্মহৈল্যা মহামদ/ বিষ্ণু হইলা পেকাস্বর/ অদম্ফ হইল্যা শুলপানি। গণেশ গাজী/ কাত্তিক হইল্যা কাজী। ফকীর হইল্যা যথামুনি তেজিয়্যা আপন ভেক/ নারদ হইল্যা শেক, পুরন্দর হইল্যা মওলানা। আপনি চণ্ডিকা দেবী/ তিহ হইল্যা হায়া বিবি/ পদ্মাবতী হইল্যা বিবিনুর। যথেক দেবতাগণ/ সভে হয়্যা একমন/ প্রবেশ করিলা জাজপুর। দেউল দোহারা ভাঙ্গে/ ক্যাড়া ফ্যিড়া খায় বঙ্গে/ পাখর পাখর বলে বোল।

এখানে জাজপুরের মন্দিরে প্রবেশ করে দেবতাদের মূর্তি ভাঙ্গার যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে তা সুলেমান কারবানীর সেনাপতি কালাপাহাড়ের মন্দির তছনছ করার ঘটনা। সে ঘটনা ঘটে ২৫৬৮তে। তবে এ কাব্য রচিত হয় কালাপাহাড় কিংবদন্তিতে পরিণত হওয়ার পর। হয়ত সপ্তদশ শতকের কোনো এক সময়ে। ফলে সত্যের সঙ্গে অতিরঞ্জন মিশে গেছে। বঙ্গদেশে ইসলাম ব্যাপকভাবে প্রচারিত ঠিকই কিন্তু দেবতারা সবাই এক হয়ে রাতারাতি মুসলমান হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিলেন তা ঠিক নয়। বরং ধারণা করা সঙ্গত হবে যে ইসলাম ধর্ম তড়িৎগতিতে নয়, পূর্ববঙ্গসহ বাংলার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল ধীরে ধীরে । তবে উক্ত চিত্র থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে মোগল শাসনের পূর্ব পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণির হিন্দু ইসলামের দীক্ষাগ্রহণ করেন। কেবল হিন্দু নয় এ অঞ্চলে ব্যাপকহারে বৌদ্ধদের বসবাস ছিল। বৌদ্ধরাই বেশি হারে ইসলাম গ্রহণ করে।

অনেক খ্যাতনামা সাহিত্যিকদের লেখায় ‘ন্যাড়া’ ‘যবন’ ইত্যাদি শব্দ পাওয়া যায়। বালিয়াকান্দি ও পাংশা এলাকায় ‘নম’; ও ‘নাড়ে’ বিপরীতমূখী দুটি কূট শব্দ সাধারণ্যে ব্যবাহর হয়। শব্দ দুটি অপমানজনক শব্দ বলে উভয় সম্প্রদায় মনে করে। এ নিয়ে অতীতে কাইজা ফ্যাসাদ ঘটত। মূলত ন্যাড়া থেকে না’ড়ে শব্দটি উদ্ভুত। বর্তমানে অন্য ধর্মের কেহ ইসলাম ধর্মগ্রহণ করলে তাকে নওমুসলিম বলা হয়। অনুরুপ ত্রয়োদশ, চতুর্দশ শতকে বৌদ্ধরা ইসলাম গ্রহণ করলে তাকে ন্যাড়া মুসলমান বলা হত। পরবতীতে স্পর্শকাতর ন্যাড়া বা না’ড়ে বলে মুসলমানদের উপহাস করা হত। ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে বাংলায় ইসলাম ধর্মের দ্রুত বিস্তার ঘটতে থাকে। এর ফলে দলে দলে দেশীয় লোকেরা অর্থাৎ বাঙালিরা ইসলাম ধর্মগ্রহণ করে। বর্ণহিন্দুদের নির্যাতন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ও নিম্নবর্ণের হিন্দুরা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়ে বাংলার মুসলমান সমাজকে বিরাট আকার প্রদান করে। বাংলাদেশের মুণ্ডিত মস্তক বৌদ্ধদের প্রায় পুরো অংশটিই মুসলমান হয়ে যাওয়ার কারণে উচ্চ বর্ণের হিন্দুরা মুসলমানদের নেড়ে বলে অভিহিত করেন। বঙ্কিমচন্দ্র এই নেড়ে শব্দ তার আনন্দমঠ উপন্যাসে মুসমানদের জন্য ব্যাবহার করেছেন।

রাজবাড়িতে ১৩৩৭ সালে বালিয়াকান্দি উপজেলার জঙ্গল ইউনিয়নের নমঃশুদ্র হিন্দু ও নাড়ুয়া ইউনিয়নের মুসলমানদের মধ্যে গরু  কোরবানী নিয়ে ব্যাপকাকারে  এক কাইজা বাঁধে। এ নিয়ে সে সময় এক গ্রাম্য সায়ের রচিত হয় সায়রের কিঞ্চিত নিম্নরুপ———

সন ১৩৩৭ সাল ৮ই জ্যৈষ্ঠ শুক্রবার

নমঃ সাথে বাধলোরে গোলমাল

দেশে এলোরে জঞ্জাল।

আজকে না’ড়ে পড়ছো ফেরে, ও শরকীর আগায় নেব জান

না’ড়ে খাব ভাতে দিয়ে কাঁদিবে তোর যতেক মুসলমান।

এরুপ না’ড়ে শব্দের গণব্যবহারে ধারণা করা যায় এ অঞ্চলের মণ্ডিত মস্তক বৌদ্ধরা বিপুলাকারে মুসলমান ধর্মে দীক্ষিত হয়। ১৮ শতকে বঙ্গে মুসলমানের সংখ্যা হিন্দুর সংখ্যা ছাড়িয়ে যায়। অবশ্য মোগলরা ইসলাম প্রচারে উদাসীন ছিলেন। তা সত্ত্বেও ইসলাম প্রসারের কারণ কী? এ বিষয়ে কয়েকটি কারণ নির্দেশ করা যাবে। প্রথমত মোগল শাসনকালে বাংলায় মুসলিম আধিপাত্য বৃদ্ধি পায়। মোগল শাসকদের মধ্যে অনেকে স্থায়ী বসতি স্থাপন করে। এছাড়া সেনাপতি, দেওয়ান, ফৌজদার, আমলা, কর্মচারী অনেকে স্থায়ী বসতবাড়ি গড়ে তোলে। তাদের শাসনকালে অনেকে ব্যাবসা, বাণিজ্য, জমিদারী কর্তৃকত্ব গ্রহণ করে। ১৫৭৪ সালে সম্রাট আকবর মোরাদ খাকে বাংলা অধিকারে পূর্ববঙ্গ পাঠান। আকবরনামায় দেখা যায় তিনি ফতেহাবাদ (ফরিদপুর) বা সরকার বাকলা বা বাকের গঞ্জকে আকবরের রাজ্যভুক্ত করেন। সুবাদারগণ ফরিদপুর শহরের তের মাইল উত্তর পশ্চিমে বর্তমান রাজবাড়ি সদর থানার অন্তর্গত খানখানাপুর গ্রামে বসবাস করতেন। মাত্র ছয়বছর রাজত্বের পর তিনি পরলোকগমন করেন। (আসকার ইবনে শাইখ, বাংলার শাসনকর্তা, পৃষ্ঠা-৩৩)। এরুপ অনেকেই বঙ্গে থেকে যান।

দ্বিতীয় যে বিশেষ কারণ তা হল পীর, আউলিয়া, দরবেশ ধর্মপ্রচারদের আগমন, স্থায়ী বসতি এবং ধর্ম প্রচার। সুলতানি আমল থেকে পীর দরবেশ আগমন করেন। তাদের সংখ্যা ছিল কম। চৌদ্দ শতকের সবচেয়ে উল্লেখ্য পীর ও ধর্ম প্রচারক হলেন হযরত শাহ জালাল (১৩৪৫)। খুলনায় পীর খানজাহান আলী (১৪৫৯)। যোদ্ধার বেশে এসে পীর খানজাহান আলী পীর পরিচিতিতে পরিচিত হন। তিনি যশোর, খুলনা জয় করে খলিফাতাবাদ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং ইসলাম প্রচার করেন। এরপর  দিনাজপুরে ইসলাম প্রচার করেন সাহ বদরুদ্দিন পাবনায়, মখদুম শাহ দৌলা , ঢাকায় শাহ আলী বাগদাদী, ফরিদপুরে  ফরিদ উদ্দিন (শেখ ফরিদ) নোয়াখালিতে আহমদ নবী এবং চট্রগ্রামে বদর শাহ। এরপর দলে-দলে আগমন করেন সূফী দরবেশ, পীর ও ফকীর। তাঁরা আবার ছিলেন বিভিন্ন তরীকাভুক্ত যেমন চিশতিয়া, কালান্দরিয়া, মাদারিয়া, কাদেরিয়া, নখশাবন্দিয়অ, আহমদিয়া ইত্যাদি।

ধর্মচেতনা, ধর্মপালন আমাদের জীবন ব্যবস্থায় নিত্যসঙ্গী। হাজার হাজার বছর ধরে বংশ পরস্পরায় মানব জাতি ধর্মাচরণে অভ্যস্থ। পৃথিবীতে যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ধর্ম সংস্কৃতির ছায়ায় মানুষ বসবাস করছে সে সব ধর্মের বিকাশ ঘটেছে খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৫০০ শত বছর পূর্বে ও পরে। এ সময়ের মধ্যে হিন্দু ধর্ম রামায়ণ, মহাভারত, ‍উপনিষদ, পুরাণ, উপপুরাণভিত্তিক স্বকীয় সত্ত্বা লাভ করে। গৌতম বুদ্ধ, যিশুখ্রিস্ট এবং হযরত মুহম্মদ (সঃ) এর আবির্ভাব এ সময়ের মধ্যে। যুগে যুগে সর্ব ধর্মই নানা ভাগে বিভক্ত হয়েছে, নানা কুসংস্কারে আটকে গেছে। বঙ্গে ইসলামের যে স্বচ্ছ ধারাটি প্রায় ৫০০ বছর ধরে চলে আসছিল উপনেবেশিক ইংরেজ শাসনকালে বিশেষ করে উনবিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকে বিংশ শতাব্দীর সংস্কার আন্দোলন পর্যন্ত তার হাল বেহাল হয়ে পড়ে। ১৯২৬ সালের ‘রওশন হেদায়েত’ পত্রিকায় এ সম্বন্ধে যা লেখা হয়েছিল তা থেকে তৎকালীন ধমীয় অবস্থার মুসলমানদের আভাস পাওয়া যায়——

 বহু নাদান মোছলমান কালী পূজা, দুর্গাপূজা, লক্ষী পূজা, সরস্বতী পূজা, বাসন্তি পূজা, চড়ক পূজা, রথ পূজা পাথর পূজা, দরগা পূজা, কদর পূজা, মানিকপীর পূজা, মাদারবাঁশ পূজা, ইত্যাদিতে যোগদান করে শেরেকের মন্ত্রতন্ত্র ব্যবহার করে, কালী, দুর্গা, কামগুরু কামাক্ষা ইত্যাদি নামের দোহাই দেয়, ইত্যাদি শরিয়ত গর্হিত কার্য করতঃ অমূল্য ইমানকে হারাইয়া কাফেরে পরিণত হইয়া জাহান্নামের পথ পরিস্কার করিতেছে। (হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি, গোলাম মুরশিদ)

উনিশ শতকে বঙ্গের মুসলমান কেবল গোত্র এবং নামেই নয় কাজকর্মেও তারা অধমে পরিণত হয়। যে মুসলমান জাতি শত শত বছর ধরে রাজা বাদশার জাতি বলে গৌরবান্বিত, মাত্র শত দেড়শত বছরের মধ্যে তাদের সামাজিক অবস্থান একেবারে পিছন কাতারে পৌঁছে গেছে। প্রায় শতভাগ মুসলমান নিম্ন বুদ্ধিজীবী, কুলি, নৌকাবাহক, পালকিবাহক, গাড়িয়াল, তেলি, কুলু, বেদে, মুটে, মজুরও জমিদারের আজ্ঞবাহকে পরিণত হল। মুসলমানদের এ দুরাবস্থার বিষয়ে ঐতিহাসিকগণ সাধারণভাবে ইংরেজি না শেখা ইংরেজদের থেকে দূরে থাকার নীতিকেই দায়ী করেন। তবে গবেষকগণ এর সাথে আরো অনেক কারণ নির্দেশ করে থাকেন। মূলত সুলতান, পাঠান ও মোগল শাসনকালে ‍সুদীর্ঘ প্রায় ৪০০ শত বছরে বঙ্গের সুলতানদের মধ্যে জাতিস্বত্ত্বার বিকাশ ঘটেনি যা হিন্দুদের মধ্যে ৭ম/৮ম শতকে ঘটেছিল। ভাগ্য-বিড়ম্বনায় ভারত তথা বঙ্গের হিন্দু মুসলিম বৃটিশ শাসনাধীনে থাকলেও শিক্ষা, সাহিত্য, রাজকাজ থেকে মুসলমানেরা দূরে ছিল। এদিকে মোগল শাসনকালে মুসলিম শাসকরা দিল্লী সালতানাতের ঐশ্চর্য বৃদ্ধিতেই ব্যস্ত থাকতেন, প্রজাপালনে নয়। এদিকে বৃটিশ শাসনকালের প্রারম্ভে বাবু ও ভদ্রলোক শ্রেণির নামকরণে একটি শ্রেণির উদ্ভব ঘটে যারা দ্রুত উচ্চ শ্রেণিতে পরিণত হয়। প্রথমত এই বাবু ভদ্রলোক শ্রেণির উন্মেষ কলিকাতা কেন্দ্রীক থাকলেও ধীরে ধীরে তা সারা বঙ্গের বাবু কালচারে পরিণত হয়।

তৎকালীন অঞ্চল বিশেষ রাজবাড়ির মুসলমানদের অবস্থা ত্রৈলোক্যনাথের লেখা ‘রাজবাড়িতে একটি মুসলমান সভা থেকে ধারণা পাওয়া যায়——-

‘১৯১২ বা ১৯১৩ সালে রাজবাড়িতে এক মসলমান সভায় সমবেত শ্রোতাদের সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। কিছু হিন্দুও যোগ দিয়েছে। সংখ্যা বিশ পঁচিশ। চট্রগ্রাম থেকে এসেছেন একজন মওলানা, সাথে কয়েকজন মৌলবি। মওলানা সাহেব ওয়াজ করছেন—-দেখ ভাইসব, ইংরেজ নহে হিন্দুরাই আমাদের উপর রাজত্ব করছে। ছোট বড় সরকারি কাজে হিন্দুদেরই প্রাধান্য। আমরা কয়জন পাই? আমরা নাকি অশিক্ষিত, মূর্খ। এখন হইতে তোমরা সজাগ হও। হিন্দুর বাড়ি চাকরি করতে যাবে না। ঘরামির কাজে যাবে না। হিন্দুর ভাত খাবে না ইত্যাদি। ঐ সভায় রাজবাড়ির দুই নামকরা মোক্তার গোবিন্দ চন্দ্র রায় ও চন্দ্রনাথ লাহিড়ী উপস্থিত ছিলেন। গোবিন্দ রায় ছিলেন হাস্যরসিক ও স্পষ্টভাষী। তিনি মওলানা সাহেবকে সম্বোধন করে বললেন শ্রদ্ধেয় মওলানা সাহেব, আপনি আমাদের যে যে উপদেশ দিলেন শুনিলাম। কিন্তু আপনার বোধ হয় ভুল হইয়া গিয়াছে আর একটি উপদেশ দিতে। আপনার বলা উচিত ছিল ‘হিন্দু বাড়ি চুরি করতেও যাইবে না’ তাহা হইলে আমরা অনেকটা নিশ্চিন্ত হইতে পারিতাম। দেখুন আমি মোক্তারী করি এই মহকুমায় যত মোকদ্দমা হয় দেখিতে পাই আসামী শ্রেণিতে মুসলমানই সংখ্যায় বেশি। অবশ্য হিন্দুর মধ্যেও বাগদী, ডোম, মুর্দাফরাস কিছু কিছু আছে। আমাদের এই অঞ্চলের মুসলমানেরা বড় গরীব তারা হিন্দুদের বাড়ি কাজ কর্ম  করিয়া দুধ বেচিয়া কোনো রকমে সংসার চালায়। মুসলমানদের অনেকেরই অনটনের সংসার। টাকার দরকার হইলে হিন্দু মহাজনের শরনাপন্ন হয়। তারপর ধান পাট জন্মাইলে বিক্রয় করিয়া দেনা শোধ করে।’ (আমার স্মৃতিকথা, ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্য, পৃ-১০১)

এ থেকে রাজবাড়িতে তৎকালীন মুসলমানদের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

শিক্ষা, সচেতনতা ও স্বাজত্ববোধ কোনো জাতি বা গোষ্ঠীর মুক্তির অনিবার্য শর্ত। ইংরেজ শাসনকালে মুসলমানদের পশ্চাৎপদতার অন্যতম কারণ শিক্ষার অভাব। ইংরেজ শাসনের শুরু থেকেই মুসলমানের ইংরেজি ও পাশ্চাত্য শিক্ষাকে পাপ মনে করে তা বর্জন করে। মুসলমানদের পুনর্জগরণ এবং চেতনা বিকাশের লক্ষ্যে আঠারো শতকের শুরু থেকে সৈয়দ আহম্মেদ, তিতুমীর নেতৃত্ব  দেন। উনিশ শতকে এনায়েত আলী, কেরামত আলী, তরীকায়ে মোহাম্মাদিয়া (মোহাম্মদের পথ) আন্দোলনের নামে শুদ্ধ পথে ধর্ম প্রচারের বন্যা বইয়ে দেন। ২৪ পরগনা, যশোর, ফরিদপুর, রাজশাহী, নোয়াখালি, ঢাকা এলাকায় তা ব্যাপক প্র্রসার লাভ করে। ফরিদপুরের কাজী শরিয়তুল্লাহ (১৭৮১-১৮৪০) ফরায়েজী আন্দোলনের নামে কোর-আন শিক্ষা বা ফরজ পালনে জোর তৎপরতা চালান। এসময় অনেক ফরায়েজী পণ্ডিত রাজবাড়ির মানুষের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি করেন। হাজী শরিয়তুল্লাহর ছেলে পীর দুদু মিয়া কোরআন সুন্নাহভিত্তিক শুদ্ধি আন্দোলন এবং নীলবিদ্রোহে নেতৃত্ব দান কালে সোনাপুরের হাসেম আলীসহ শত শত মুসলমান তার অনুগামী হয়ে ওঠেন। ফরিদপুরের নওয়াব আব্দুল লতিফ ১৮৬৩ সালে মুসলমানদের সুসংগঠিত করার ‍উদ্দেশ্যে ‘মোহামেডান লিটারেরী সোসাইটি’ স্থাপন করেন। কলিকাতাভিত্তিক এ সংগঠনে যোগদান করেন পদমদির (রাজবাড়ি) নবাব মীর মোহাম্মদ আলী। মীর মোহাম্মদ আলী কুষ্টিয়া ও পদমদিতে দুটি ইংলিশ স্কুল স্থাপন করেন। এরমধ্যে পদমদিতে ১৮৫০ এর মাঝামাঝি প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি রাজবাড়ি জেলায় স্থাপিত প্রথম মাইনর ইংলিশ স্কুল।

ঊনিশ শতকের শেষে প্রথম মুসলিম সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেনের বিষাদ সিন্ধু প্রকাশ পায়। গ্রন্থখানার মর্মবাণী মুসলমানদের হৃদয় মথিত করে। রাজবাড়ি শিক্ষিত পরিবারে গ্রন্থটির পাঠ গঠন চলতে থাকে। ইমাম হোসেন এর বিয়োগান্তক অংশটি দল বেঁধে আসা শ্রোতার চোখে অশ্রু ঝরায়। নিরক্ষর গ্রাম্য চাষীরা ইসলামের গৌরব অনুভব করে। এসব তাদের স্বাজাত্য বোধে উদ্ধুদ্ধ করে। এছাড়া তিনি লেখেন মুসলমানদের বাঙ্গালা শিক্ষা-প্রথম ভাগ, এসলামের জয়, জমিদার দর্পণ, কুলসুম জীবনী ইত্যাদি। এসব গ্রন্থ পাঠে অত্র অঞ্চলের মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার অনুরাগ বৃদ্ধি করে। বিশেষ করে মোসলমানদের বাঙ্গালা শিক্ষা গ্রন্থখানি বাংলা ভাষা শিক্ষা এবং ইসলামী মূল্যবোধের প্রসার ঘটায়। মীর মশাররফ হোসেনের সমসাময়ীক কালে পাংশায় রওশন আলী চৌধুরী ‘কোহিনুর’ পত্রিকা প্রকাশ করেন ( ১৮৯৮)। তৎকালীন সময়ের অতি আলোচিত এই পত্রিকায় মুসলিম জাগরণের পুরোধা পুরুষ  কবি কায়কোবাদ, কবি মোজাম্মেল হক, শেখ ফজলুল করিম, মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, এয়াকুব আলী চৌধুরী প্রমুখ। অত্র অঞ্চলের মুসলমান জাগরণ, সংগ্রাম ও সচেতনাত বৃদ্ধিতে পত্রিকাটি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে।

ঊনিশ শতকের শেষে রাজবাড়িতে প্রথম গ্রাজুয়েট আলীমুজ্জামান চৌধুরী। তিনি ছিলেন অত্র এলাকার সমাজসেবক ও প্রজাহিতৈষী জমিদার। ফরিদপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান।তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলমান সমাজ অগ্রগামী হয়।

বিশ শতকের শুরু থেকে বৃটিশ শাসনের অবসানকাল পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত বছরে রাজবাড়ির মুসলমান সমাজ শিক্ষা-দীক্ষাসহ সামাজিক ও আর্থিক ভিত সুদৃঢ় করে তোলে। এ সময়ের কিছু পূর্ব থেকে অত্র এলাকার প্রথম ইংরেজি উচ্চ বিদ্যালয় রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশন এবং এর ৪ বছর পর ১৮৯২ সালে গোয়ালন্দ মডেল হাই স্কুল (বর্তমান সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয়) স্থাপিত হওয়ায় গরিব মুসলমান সম্প্রদায় শিক্ষিত হয়ে উঠতে থাকে। স্থানীয় জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতা এবং স্থানীয় হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়ের উৎসাহে খানখানাপুর সুরুজমোহনী হাই স্কুল, বালিয়াকান্দি হাই স্কুল, পাংশা জর্জ হাইস্কুল, নলিয়া জামালপুর হাইস্কুল, গোয়ালন্দ নাজির উদ্দিন হাই স্কুল, বেলগাছি আলীমুজ্জাম হাই স্কুল, হাবাসপুর হাই স্কুলসহ অনেক উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। মুসলমান ছাত্রদের মধ্যে মৌলবী তমিজ উদ্দিন খান, এয়াকুব আলী চৌধুরী, কাজী মোতাহার হোসনে, কাজী আব্দুল ওদুদ, খোন্দকার নাজির উদ্দিন আহমেদ (খাতক পত্রিকার সম্পাদক) ডা. কেএস আলম,  ব্যারিস্টার শেলী, প্রিন্সিপ্যাল কেতাব উদ্দিন আহম্মেদ, আহমদ আলী মৃধা, ফখর উদ্দিন আহমেদ, কাজী আবুল কাশেম, কাজী আব্দুল মাজেদ, ডা. একে এম আসজাদ, ইউসুফ হোসেন চৌধুরী, এবিএম নুরুল ইসলাম, অধ্যাপক আব্দুল গফুর, এ্যাডভেকেট আব্দুল জলিল, এ্যাডভোকেট আবুল কাশেশ মৃধা, খলিল উদ্দিন জজ সাহেব, তোফাজ্জেল হোসেন জজ সাহেব প্রমুখ উচ্চ শিক্ষিত মুসলমান ছাত্র অঞ্চলভিত্তিক ও জাতীয় উন্নয়নে স্ব-স্ব ভূমিকা রাখেন।

১৯৪৭ সালে বৃটিশ শাসনের অবসানে পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে। ভারতের সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলমান এলাকা নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়। এ সময় পূর্ব-পাকিস্তানের অন্যান্য এলাকার মতো জমিদার শ্রেণিসহ অনেক হিন্দু পরিবার স্থায়ীভাবে রাজবাড়ি ত্যাগ করে। অন্যদিকে ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ মোহাজের ও অবাঙালি বিহারী মুসলমানের অভিবাসন ঘটে। তার স্থায়ীভাবে রাজবাড়ি শহর ও পল্লী এলাকায় স্থায়ী বসতি গড়ে তোলে। ১৯৬০ এর দশকের শুরুতে নোয়াখালি ও কুমিল্লা থেকে অনেক মুসলমান পরিবার রাজবাড়ির বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে বাণীবহ, বহরপুর, রামদিয়া, সোনাপুর বসতি স্থাপন করে। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর ভারত থেকে অনেক মোহাজের মুসলমান রাজবাড়ি বিসিক এলাকায় বসতি গড়ে তোলে। কালপ্রবাহে স্বাধীন দেশের রাজবাড়ির মুসলমান অসাম্প্রাদায়িক চেতনায় শিক্ষিত ও মর্যাদাশীল সম্প্রদায় হিসেবে বিবেচিত।