জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম-রাজবাড়ী মাটি ও মানুষের সাথে কবির ঘনিষ্ঠতা।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর স্পর্স পেয়েছে রাজবাড়ীর মাটি ও মানুষ। গোয়ালন্দ তৎকালীন বাংলার প্রবেশ পথ হওয়ার তিনি রেলপথে ঢাকা, কুমিল্লা যাতায়াত করেছেন ট্রেন ও স্টিমারযোগে গোয়ালন্দ দিয়ে। পূর্ববাংলার প্রকৃতি ও মানুষের সাথে ছিল তাঁর নিবিড় বন্ধন। ১৯৪০ সালে গোয়ালন্দ ঘাটে বসে ‘আমি পূরব দেশের পুরনারী’ সঙ্গীত রচনা করেন। ১৯২৫ সালে মহাত্মাগান্ধী ফরিদপুরে কংগ্রেসের প্রাদিশিক সম্মেলনে যোগদনকালে গান্ধীজীর সাথে কাজী নজরুল ইসলামের পরিচয় ঘটে। নজরুলের কণ্ঠে তার চরকার গান শুনে গান্ধীজী মুগ্ধ হন। সে সূত্রে নজরুল ইসলাম কংগ্রেসে যোগদান করেন।

১৯২৬ সালে নজরুল তমিজ উদ্দিন খান (খানখানাপুর, রাজবাড়ী) এর সাথে বঙ্গীয় বিধান সভায় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করে যান। নির্বাচনে কবির প্রতিদ্বন্দিতা সম্পর্কে ১২ অক্টোবর ১৯২৬ গণবাণীতে লেখা হয় ‘কালের বরেণ্য কবি কাজী নজরুল ইসলাম ঢাকা বিভাগের মুসলমান কেন্দ্র হতে ভারতীয় ব্যাবস্থাপক সভার সদস্য পদপ্রাথী হইয়াছেন’ (নজরুল রচনাবলী ২য় খণ্ড কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড-২৫ ডিসেম্বর ১৯৬৭ পৃষ্ঠা-৫৪৮)। উল্লেখ্য তখন ফরিদপুর, রাজবাড়ী ঢাকা নির্বাচন এলাকাভুক্ত ছিল। তমিজ উদ্দিন খান তাঁর আত্মজীবনীতে ১৯২৬ সালের নির্বচনে নজরুলের বিষয়ে কিছু বলেননি। এ নির্বাচন বিষয়ে নানা মতভেদ রয়েছে। তবে আবুল আহসান চৌধুরী নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর অপ্রকাশিত পত্রাবলীর গ্রন্থের ১৬ পৃষ্ঠায় লিখেছেন-‘হেমন্ত কুমার সরকার ও কাজী নজরুল ইসলামের উদ্যোগে ১৯২৬ সালে Bengal peasants and worker’s party প্রতিষ্ঠিত হয়। উল্লেখিত নানা তথ্যে প্রতীয়মান হয় ১৯২৬ এ নবগঠিত Bengal peasants and worker’s party থেকে প্রতিনিধিত্ব করেন বা নির্দলীয় প্রাথী হন। এ ক্ষেত্রে তমিজ উদ্দিন খান তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দী মোহন মিয়ার কথাই উল্লেখ করেছেন। গুরুত্বহীন peasants পার্টি বা উদীয়মান একজন কবিকে দুর্বল প্রার্থী ভেবে লেখার প্রয়োজন মনে করেননি। গোলাম মুরশীদ তার হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি গ্রন্থের ১৬৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন-

১৯২৬ সালের শেষ দিকে যখন নির্বাচন অনুষ্ঠান হয়, ৩৯টি মুসলিম আসনের মধ্যে ৩৮টি আসনে জয়ী হন আব্দুর রহিমের দলের প্রার্থীরা। কাজী নজরুল ইসলাম তখন অত্যন্ত জনপ্রীয় কবি। কৃষক শ্রমিকদের জন্য উচ্চকণ্ঠে বিদ্রোহের বাণীও শুনেছিলেন তিনি। তা সত্ত্বেও মুসলামান প্রধান ফরিদপুর থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও তিনি জিততে পারেননি। কারণ আব্দুর রহিমের সাম্প্রদায়িকতার শর্ত তিনি পূরণ করতে পারেননি।

এ সময় রাজবাড়ী মানুষের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। আরএসকে স্কুলের গণিত শাস্ত্রের প্রাক্তন শিক্ষক দেব ভট্টাচার্য (ডা. মাখনলাল মহাশয়ের বাড়িতে দীর্ঘদিন ভাড়ায় বসবাস করতেন) এর নিকট থেকে জানা যায় নজরুল সেসময় তাদের স্থায়ী বসতি পাংশার রুপিয়াট জমিদার বাড়ির সাথে গবীর আত্নীয়তা গেড়ে তোলেন। দেবুর পিতা অতুল দত্ত তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। নজরুল এ পথে আসলে রুপিয়াট জমিদার বাড়ি না হয়ে যেতেন না। দেবুর পিতা ও মাতার সাথে পত্রালাপ হত। কিন্তু পত্র তার নিকট ছিল কিন্তু যুদ্ধের সময় তা হারিয়ে যায়। দেবুর মায়ের নামে নজরুল একটি কাব্যগ্রন্থ উৎসর্গ করেন। রাজবাড়ীর নজরুল বিশেষজ্ঞ গোলাপ ভাইয়ের নিকট থেকে জানা যায় নজরুল ১৯৩০ এর দশকের কোনো এক সময় প্রাক্তন চেয়ারম্যান হবিবুর রহমান সাহেবের বাড়িতে আসেন। হাসিবুর রহমান তখন যুবক। তিনি নজরুলের সাথে একই খাটে শয়ন করেছিলেন। সাহিত্যিক এয়াকুব আলী চৌধুরীর (পাংশা) সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের গভীর সখ্যতা ছিল। ১৯১৯ সালে প্রথম মহাযুদ্ধের পর কবি ফিরে এসে ‘বঙ্গীয় সাহিত্য সমিতিতে’ যোগ দেন। কর্মসূত্রে সেখানেই এয়াকুব আলী চৌধুরী নজরুলকে আর্শিবাদ স্বরুপ বলেছিলেন-‘আপনাকে বাংলার মুসলমান বারীন ঘোষ হতে হবে। (সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতায় রাজবাড়ী, অধ্যাপক আবুল হোসেন মল্লিক, পৃষ্ঠা-৪৬)। কবি ১৯৩৩ সালে কলিকাত থেকে পাংশা সফরে আসেন। তিনি এখানে এক দিন এক রাত যাপন করেন। পাংশায় আনার দায়িত্ব দেওয়া হয় এয়াকুব আলী চৌধুরীকে। বিপুল আয়োজনে পাংশায় তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সংবর্ধনা কমিটিতে থাকেন এয়াকুব আলী চৌধুরী, তাহের উদ্দিন আহমেদ (সহসম্পাদক, দি মুসলমান পত্রিকা, কলিকাতা), সৈয়দ মাহমুদ (ডিএসআর), সুবোধচন্দ্র সাহা (কংগ্রেস নেতা, পাংশা), শ্রী অতুলচন্দ্র দত্ত (সিনেমা বিষয়ক পত্রিকা ‘জলসা’র সম্পাদক), খোন্দকার নজির উদ্দিন আহমদ (সম্পাদক খাতক), শ্যামলাল কুণ্ডু প্রমুখ। তাঁর থাকার ব্যবস্থা হয় শ্যামলাল কুণ্ডুর দ্বিতল ভবনে। বৃটিশ রাজরোষে পতিত হওয়া কারণে তাঁকে খোলা মাঠে সংবর্ধনা দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় মুচিরাম সাহার গুদাম ঘরে তাঁকে সংবর্ধনার ব্যবস্থা করা হয়। এ অনুষ্ঠানে কবি স্বকণ্ঠে ‘বিদ্রোহী’ ও ‘নারী’ কবিতা দুটি আবৃত্তি করেন। ‘টুনির মা’ নামে এক মহিলা নিজ হাতে সেলাই করা একখানি নকশী কাঁথা কবিকে উপহার দেন। পাংশা আড়ং বাজার রেলঘাটে তাঁর আগমন উপলক্ষ্যে যে মেলার আয়োজন করা হয় তা আজও বৈশাখা মেলা-(১ এপ্রিল) হিসেবে স্মৃতি বহন করছে। সেদিন এক ময়রা কবিকে কেজি চমচম উপহার হিসেবে দেন। প্রচুর লোক সমাগমে কবি সবাইকে শুভেচ্ছা বাণী দেন।

পাংশার কবি বন্ধু দি মুসলমান পত্রিকার সম্পাদক তাহের উদ্দিন তাঁর বিবাহ বৌভাতে আমন্ত্রণ করেন। দাওয়াত রক্ষায় অপারগ হলে কবি তাঁকে আশীর্বাদ স্বরুপ লেখেন।

রুপার সওদা সার্থক হল
রুপার শাহজাদী এসে
তব বাণিজ্য তরণী ভিড়িল
স্বপন পরীর দেশে।
অর্থের নীতি যাহার যাদুতে
হইল অর্থহীন
বেঁচে থাক সেই ফুলের ডেরারায়
ফুল হয়ে নিশিদিন।

কাজী নজরুল ইসলামের গভীর সখ্যতা ছিল পাংশার বাগমারা গ্রামের জাতীয় অধ্যাপক প্রখ্যাত সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, জাতীয় চেতনার দিশারী ড. কাজী মোতাহার হোসেনের সঙ্গে। কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন নজরুল অন্তরঙ্গ বন্ধু। নজরুল বন্ধুত্বে গভীর আলিঙ্গনে মোতাহার হোসেনকে ডাকতেন, আমার মতিহার । তাদের বন্ধুত্ব আজীবন অটুট ছিল। মোতাহার হোসেনের লেখা ‘নজরুল কাব্য পরিচিতি’ তাঁর অমর প্রতিদান।

মোতাহার হোসেনের কন্যা রবীন্দ্র গবেষক, শিল্পী সনজিদা খাতুন রচিত ‘মোতাহার হোসেন’ গ্রন্থ থেকে জানা যায় কাজী নজরুল ইসলাম ঢাকা এলে তাদের বাড়িতেই থাকতেন। নজরুল যেমন ছিলেন জাতীয় চেতনায় বিদ্রোহী সত্ত্বার অধিকারী তেমনি দৈহিক শাক্তি প্রয়োগে বিদ্রপ নিরসনের নায়ক। একদিন ঢাকায় দুইদল যুবক পরস্পর ঝগড়ার পর্যায়ে হাতাহাতিতে লিপ্ত হলে নজরুল তা নিষেধ করেন। কিন্তু নজরুলের কথা তারা শুনছিল না। এক পর্যায়ে নজরুল একটি লাঠি নিয়ে ভোঁ ভোঁ করে ঘোরাতে থাকেন এবং সকলকে তাড়িয়ে দেন। এই লাঠি নিয়েই মোতাহার হোসেনের বাসায় যান। এই লাঠি দীর্ঘদিন তাদের বাসায় ছিল আর লাঠির নামকরণ হয়েছিল, নজরুল মারা লাঠি। বন্ধুত্বের সূত্রে নজরুল কয়েকবার মোতাহার হোসেনের গ্রামের বাড়ি বাগমারা এসেছেন বলে জানা যায়। কাজী নজরুল ইসলাম সহসঙ্গী মোতাহার হোসেনের উদ্দেশ্যে ‘দাড়ি বিলাপ’ কবিতাটি রচনা করেন। দাড়ি বিলাপ কবিতার পাদটিকায় কোনো প্রফেসর বন্ধুর দাড়ি কর্তন উপলক্ষে লেখা আছে।

হে আমার দাড়ি
একাদশ বর্ষ পরে গেলে আজি ছাড়ি
আমারে কাঙ্গাল করে শূন্য করি বুক
শূন্য এ চোয়াল আজি, শূন্য এ চিবক।

কাজী মোতাহার হোসেন ছাত্রজীবন থেকেই দাড়ি কামাতেন না। দাড়ি ওঠার ১১ বছর পর তিনি একবার দাড়ি কর্তন করলে কবি এ কবিতাটি রচনা করেন। এ প্রসঙ্গে পথেয় ১৩৩৫ সালে ঢাকা সাপ্তহিক দরদীতে এবং দাড়ি বিলাপ মাসিক ‘শান্তি’তে প্রকাশিত হয়। দাড়ি বিলাপ কবিতার পাদটিকায় উল্লেখিত কোনো প্রফেসর বন্ধু হলেন অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন (নজরুল রচনাবলী, প্রাগুপ্ত, পৃ-৬৫৫)। ঢাকার বিদূষী কন্যা ফজিলাতুননেসার সঙ্গে নজরুল প্রণয়ে প্রয়াসী হন। এর মাধ্যম ছিলেন কাজী মোতাহার হেসেন। শিল্পী কাজী আবুল কাশেম (রাজবাড়ী) নজরুলের লেখা ‘দাদা মেখে দেয় দাড়িতে খেজাব’ কার্টুন এঁকে নজরুলকে দেখান। নজরুল তা দেখে খুব হেসেছিলেন।

সাহিত্যিক কাজী আব্দুল ওদুদ (বাগমারা নিবাসী) কাজী নজরুল ইসলামের অত্যন্ত গুণাগ্রাহী ছিলেন। এদিকে কাজী মোতাহার ও আব্দুল ওদুদ একই গ্রামবাসী ও হরিহর বন্ধু। কাজী নজরুল আব্দুল ওদুদের সাথে ঘনিষ্ঠতা সূতা ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনে উভয়কে পৃষ্ঠাপোষকতা দান করেন। কাজী আব্দুল ওদুদ ‘নজরুল প্রতিভা’ (১৯৪৯) রচনা করেন। চিল্লশের দশকের প্রথমে আব্দুল ওদুদ কলিকাতাবাসী হন। এ সময় কাজী নজরুল ও তার পরিবারের সাথে অতি ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েন। ১৯৫২ সাল। নজরুল পরিবারে তখন দুরাবস্থা। নানাভাবে নজরুলের চিকিৎসা করান হলেও উন্নতি নেই। আর্থিক অনটন লেগেই আছে। আব্দুল ওদুদ পরিবারে আর্থিক সাহায্য সহযোগিতা দিয়ে আসছিলেন। কবির উন্নত ও শেষ চিকিৎসার জন্য কবিকি ইউরোপ পাঠান দারকার। অনেক টাকার প্রয়োজন। কাজী আব্দুল ওদুদের উদ্যোগে কলিকাতা ‘নজরুল সাহায্য সমিতি’ গঠন করা হল। তাঁর উদ্যোগেই নজরুলকে ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়। তারপর ভিয়েনা। নজরুল আর সুস্থ হয়ে ওঠেননি। এভাবেই রাজবাড়ী মাটি ও মানুষের সাথে কবির ঘনিষ্ঠতা।

রাজবাড়ি জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য
প্রফেসর মতিয়র রহমান
(পৃষ্ঠা-২৯২)