চন্দনা-নদী

চন্দনা-নদী

 

  • চন্দনা চলতে পারি মন্দ না
  • চলত যখন চাঁদ সওদাগর
  • করত সবাই বন্দনা।
  • পালের নায়ে ঘোমটা দিয়ে
  • আর চলেনা রঞ্জনা,
  • শীর্ণ বুকে পা রাখে না খঞ্জনা
  • চন্দনা, চলছি দেখ মন্দনা।

চন্দনা বর্তমান পদ্মার একটি শাখা যা পাংশার পাশ দিয়ে প্রবাহিত। কালুখালির দক্ষিণে সোনাপুরের রামদিয়ার মাঝ দিয়ে প্রবাহিত বালিয়াকান্দি হয়ে পাঁচমোহনীতে মেশেছে। এই পাঁচমোহনী চন্দনা, হড়াই, কুমার গড়াইয়ের মিলনস্থল। ড. নীহাররঞ্জন যে চন্দনার গতিপথের বর্ণনা দিয়েছেন তা চন্দনার সঠিক তথ্য বহন করে না। তিনি লিখেছেন চন্দনা পদ্মার গর্ভে ভাগিরথীতে প্রবাহিত। ফ্যানডেন ব্রকেন নকশায় তা যশোরের পশ্চিম দিয়ে প্রবাহিত। প্রকৃত চন্দনা প্রাচীন নদী যা গঙ্গা হতে প্রাবাহিত হয়ে কুমারের সাথে মিশতো। উল্লেখ্য কুমার অতি প্রাচীন নদী এবং বর্তমান চন্দনা পাঁচমোহনীতে কুমারের সাথে মিশেছে। চন্দনা প্রাচীনকালে অনেক প্রশস্ত নদী ছিল।

 

তার প্রমাণ হিসেবে বলা যায় বর্তমান বেলগাছি ও কালুখালির অদূরে চরলক্ষীপুর, চরচিলকা, চরপাড়া, চরবোয়ালিয়া, চরমদাপুর চন্দনা নদীর প্রবাহিত চর। চন্দনার এ প্রবাহের দ্বারা প্রমাণিত হয় চন্দনা অনেক পূর্ব প্রশস্ত নদী। এছাড়া চন্দনা প্রবাহের দুই কান্দায় আড়কান্দি ও বেলেকান্দি। নদি এ সময়ে আড়কান্দি এসে বাঁক নিয়েছিল বলে আড়ে আড়কান্দি আর ডানে বেলেচর বালিয়াকান্দি। আড়াকান্দি আর বালিয়াকান্দির দূরত্ব ২ মাইল প্রায়। নদীর পাড় আরাকান্দি থেকে বালিয়াকান্দি দিকে সরে গিয়েছে। সপ্তদশ শতকে এ নদী যে অনেক বড় নদী ছিল তার আরো বড় প্রমাণ মেলে বঙ্গে রেলভ্রমণ পুস্তকের ১০৯ পৃষ্ঠার বর্ণনা থেকে-‘কালুখালি জংশন থেকে আড়কান্দি স্টেশন ১২ মাইল দূরে। ঐখানে চন্দনা তীরে বাণীবহ নাওয়াড়া চৌধুরীদের নৌকা নির্মাণের প্রধান কারখানা ছিল। ইবনে বতুতা রেহেলা গ্রন্থে তৎকালীন বঙ্গে জাহাজ শিল্পের ব্যাপক উন্নতির বিষয়ে উল্লেখ করেছেন। বার্থেমাও বিভিন্ন প্রকার নৌযান ও বৃহদাকার জাহাজ নির্মাণের কথা বলেছেন।

মঙ্গলকাব্যের নায়কেরা চাঁদ সওদাগর ধনপতি এ অঞ্চলে বাণিজ্য করত। আর সে বাণীজ্যের পথ ছিল (১৪০০ শতকে) এই চন্দনা, হড়াই,গড়াই। ধারণা করা যায় শুধু সপ্তদশ শতকে আড়কান্দিতে বাণীবহের নাওয়াড়াদেরই নৌকা তৈরি হত না এর ২০০ বৎসর পূর্বে সুলতানি আমলে সওদাগরদের জন্য ডিঙ্গা জাহাজ নির্মিত হত। বর্তমানে আড়কান্দির আদূরে তুলশী বরাট নৌকা নির্মাণের ঐতিহ্যবাহী স্থান। তুলশী বরাটের নৌকা এই সেদিন পর্যন্ত এ অঞ্চলের উন্নতমানের নৌকা হিসেবে গৃহীত ছিল। এ গ্রামের অনেক মিস্ত্রির সাথে আলাপ করে জানা যায় এটা তাদের প্রাচীন পূর্বপুরুষের আদি পেশা। চন্দনা নদী এখন মৃত। মীর মশাররফ হোসেনের বর্ণনা থেকে দেখা যায় ১০০ শত বৎসর পূর্বে এটা যথেষ্ট নাব্য ছিল। হযরত সাহ্ পাহলোয়ান এই নদীর উত্তর তীরে ষোড়শ শতকে ধর্ম প্রচারের জন্য সেকাড়া গ্রামে আস্তানা গড়ে তোলেন। বর্তমানে এই নদীর মুখ কেটে এবং খনন করলে হাজার হাজার একর জমি সেচের আওতায় আনা যাবে। রাজবাড়ী জেলের কৃষি, মৎস্য, পর্যটন শিল্পে উন্নয়নের কথা ভাবতে হলে পদ্মা, গড়াই, হড়াই, চন্দনা, চত্রা,সিরাজপুরের হাওড়া নিয়ে ভাবতে হবে। রাজবাড়ীর এই সম্পদ যেমন গর্ব তেমনি উন্নয়ন প্রকল্পের সহায়ক বিষয়।