গ্রামের নামকরণ

গ্রামের নামকরণ

ঐতিহাসিক ও সমাজবিজ্ঞানীদের অনেকেরই অভিমত মানুষ প্রথমে নগর জীবনে অভ্যস্থ হয় এবং পরে গ্রাম জীবনের বিকাশ ঘটে। তবে আধুনিক নগর বলতে যা বোঝায় সে নগর তেমন ছিল না। প্রাকৃতির নানা বৈপরিত্যের কারণে মানুষেরা দল বেঁধে নানা প্রাকৃতিক সম্পদ সস্মদ্ধ নিরাপদ স্থানে বসবাস করত। আমরা নীল, রাইন, পীত, ইউফ্রেটিস, টাইগ্রীস, সিন্ধু, ভলগা, গঙ্গার তীরবর্তী অঞ্চলে প্রাচীন নগর সভ্যতার কথা জানি। পানির সহজ প্রাপ্যতা এবং উর্বর ভূমির কারণেই এ সকল অঞ্চলে নাগরিক জীবন শুরু হয়েছিল। মিশরীয় ও সুমেরীয়, আসিরীয়, মহেঞ্জোদারো, চীনের প্রচীন নগর সভ্যতার বিকাশ তা প্রমাণ করে। নাগরিক জীবন বিকাশের ফলে ফসল উৎপাদনের নিমিত্তে তারা নগর থেকে দূরবর্তী অঞ্চলে স্থায়ী বাস গড়ে তোলে। ফলে গ্রামীণ জীবন বিকাশ ঘটে। বঙ্গে এ বিষয়টি আলাদা বলে মনে করার অনেক কারণ আছে। ঐতিহাসিক সূত্রে প্রতীয়মান হয় গঙ্গার ভাটি অঞ্চলের সমতটীয় বঙ্গের আদিভিত্তি গ্রাম। নগর জীবন গড়ে উঠেছে অনেক পরে। প্রাচীন বঙ্গ, উপবঙ্গ সাগর তথা নদনদীর উত্থিত দ্বীপ ও চর সমষ্টি দ্বারা গঠিত। অসংখ্যা নদ-নদীর প্রবাহ, বিল বাওড়, হওড় জোলা এর প্রমাণ বহন করে। ইউয়ান চেয়াং ষষ্ট শতকে বঙ্গে ভ্রমণ করেন। তার বর্ণনা থেকে বঙ্গে গ্রাম জীবনের ভিত্তির সংবাদ জানা যায়। তখনকার গ্রাম এখন কার গ্রামের মতো ছিল না। উত্থিত দ্বীপ বা চরে জীবন জীবিকার অন্বেষণে মানুষ একসাথে বসবাস করত যা বর্তমান গ্রামের মতো ছিল। ক্রমে ক্রমে নদী সঙ্কুচুত হয়ে পড়ে। বিচ্ছিন্ন দ্বীপ সমষ্টিরুপ ধারণ করে। একাকার হয়ে বিস্তীর্ণ সমতল মাঠ বা প্রান্তরে রুপান্তরিত হয়। সে সব স্থানে জনবসতি গড়ে ওঠে এবং গ্রামীণ জীবনের বিকাশ ঘটে।

বাংলার প্রায় প্রতিটি গ্রামের পূর্বে বা পরে পরিচয়াত্মক শব্দ দেখতে পাওয়া যায়। যেমন পুর, ডাঙ্গা, খালি, দহ, চর, চক, দি, দিয়া, হাট, ঘাট, পাড়া ইত্যাদি। এরমধ্যে পুর অর্থ জনসমাবেশ এবং তা নগর অর্থে ব্যবহৃত হয়। পুর থেকেই পৌর বা নগর বিকাশের ক্ষেত্রে এ পরিচয়াত্মটি শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে। উর, পুর, দি, দিয়া, দিয়াড়া; বিল, নালা এগুলি বাংলায় আদি খাঁটি শব্দ যা অনার্যরা ব্যবহার করত। বঙ্গে আর্য ব্রাক্ষণদের আগমন ঘটে অনেক পর। তার পূর্বে অনার্য অধিবাসীরাই ছিল বঙ্গের অধিবাসী। তবে পুরের পরিচয়ে সকল গ্রামের নাম আদি দ্রাবিড় বা ভোটচীন গোষ্ঠীর দেওয়া নাম নয়। গ্রাম জীবনের বীকাশ ঘটেছে শত শত বছর ধরে। এরমধ্যে মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন, তুর্কী, পাঠান, সুলতান, মোগল, ইংরেজ, পাকিস্তানি শাসন চলেছে। সব কালেই নতুন নতুন গ্রামের উৎপত্তি ঘটেছে। সে ক্ষেত্রে প্রাচীন ব্যবহৃত পুর শব্দটির ব্যবহারের সাথে যোগ হয়েছে খাল, খালি, চর, দহ, দি, দিয়া, গাঁড়া, সারা, গ্রাম, বাড়ি, হাট, বজার, গঞ্জ,তালক, পাড়া, নালা, তলা, এলি, আদ, বাদ, জানি, কান্দা, কান্দি, ডাঙ্গা, লিয়া, ইল, বিল, লাট, লাটি, লি, দা, বাত, বাতান, কন্দ, জনা, ডোরা, ঝোপ, জঙ্গল, বন, ঝুপি, থুপি, তুরি, শিয়া, নগর, রাট ইত্যাদি। আবার গাছের নাম, মাছের নাম, পাখির নামও গ্রামের নাম রয়েছে। গ্রামসমূহের উৎপত্তির দিকে লক্ষ্য করলে দেখার যায় সপ্তম অষ্টম শতক থেকে শাসনতান্ত্রীক কাঠামোর মধ্যে ভুক্তি, বিষয়, মণুল বিথী ও গ্রামের উল্লেখ আছে। আজকে যেমন অনেকগুলি গ্রাম নিয়ে গঠিত হয় ইউনিয়ন, তখন কয়েকটি গ্রাম নিয়ে গঠিত হয় বিথী। কয়েকটি বিথী নিয়ে বিষয়, কয়েকটি বিষয় নিয়ে মণুল, কয়েকটি মণুল নিয়ে গঠিত হত ভুক্তি। অত্র এলাকায় স্ময়টি পদ্মাবতী বিষয়, বারক মণুল,কুমার তালক মণুল ইত্যাদির সংবাদ পাওয়া যায়। রাজবাড়ীর গ্রামগুলির উৎপত্তিকাল ঠিক কাখন থেকে তা সুনির্দিষ্ট করে বলা না গেলেও ইউয়ান চোয়াং বাংলায় যে ৩০টি বৌদ্ধ সংঘারামের কথা বলেছেন তার মধ্যে একটির অবস্থান নির্ণীত হয়েছে পাংশায় (পুরাত্ত্ববিদ পরেশনাথ বন্দ্যোপাধায়) । বৌধ ধর্মের বিকশকাল খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৫০০ খ্রিস্টীয় শতক পূর্বে থেকে ৭ম/৮ম শতকের পাল শাসন পর্যন্ত সুদীর্ঘ প্রায় এক হাজার বছর। ইউয়ান চোয়াং যে বৌদ্ধসংঘারামের কথা বলেছিলেন সে সব বৌদ্ধ সংঘারাস নিশ্চয়ই ষষ্ঠ শতকের অনেক পূর্বে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকবে। সে কারণে বলা যায় পাংশায় যে বৌদ্ধসংঘারাম ছিল তা হয়তো ১ম/২য় শতক হতে বা তার পূর্বে বা পরেও হতে পারে। তবে নিশ্চয়ই ষষ্ঠ শতকের অনেক পূর্বে। তাই রাজবাড়ির জেলের গ্রামের ভিত্তি খ্রিস্টীয় ১ম শতক বা তার পূর্ব থেকেই বিকাশ লাভ করে।

আরো একটি নিদর্শন রাজবাড়ি জেলার গ্রামবসতির প্রাচীনত্বের স্বাক্ষর বহন করে। ২০০১ সালে বালিয়াকান্দি থানার ইসলামপুর ইউনিয়নের তেঘারী গ্রামে পুকুর খনন কালে কষ্টিপাথরের তৈরি একটি বিষ্ণুমূর্তি পাওয়া যায়। মূর্তিটি বর্তমানে ঢাকা জাদুঘরে আছে। উল্লেখ্য গুপ্তরাজগণ হিন্দুতান্ত্রীক এবং কেহ কেহ পরম বৈষ্ণর ছিলেন। বালাদিত্য বৌদ্ধ ছিলেন। সমুদ্রগুপ্ত ও দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তে সময় বিষ্ণমূর্তি পূজাপদ্ধতি বিশেষভাবে প্রচলিত হয়। স্কন্ধগুপ্তের সময় বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি তারা আকৃষ্ট হয়। আমাদের দেশে যে সকল সুন্দর চতুর্ভুজ বাসুদেব প্রকৃতি বিষ্ণুমূর্তি দৃষ্ট হয় তার কতকগুলি গুপ্ত যুগে এবং কতগুলি সেন যুগে প্রতিষ্ঠিত হয়। পদ্মাবতি বিষয়, বারক মণুল, কুমার তালক মণুল, পাংশায় বৌদ্ধ সংঘারাম, তেঘারির বিষ্ণুমূর্তি এবং ১০৫৬ টি গ্রামে এরমধ্যে প্রায় ২০০টি পুর, দি, দিয়া, হওয়ায় বলা যায় গুপ্ত যুগ থেকেই ব্যাপকভাবে গ্রামসমূহের বিকাশ ঘটে।

রাজবাড়ি জেলার গ্রাম সকলের পূর্বে বা পরে পরিচায়ত্মক শব্দ হিসেবে পুর, দি,দিয়া, ধিয়া,লায়া, গাতি, কান্দা, বাড়ি, বাড়িয়া, গ্রাম, পাড়া, নগর, খাল, খালিয়া, কালিয়া, কোলা, বিল, ইল, হাওড়, কোল, দোহা, দহ, কোল, লেঙ্গা, লেঙ্গি, রেন্দা, উরি, কুড়ি, উলি, লুন্দি, কাউল, কাচু, দিলা, গিলা, মংলায়, বঙলট, ত্রিচট, পেটট, মাছের নাম, গাছের নাম, ফলের নাম, ফসলের নাম, ডাঙ্গা, ডাঙ্গী, বুনিয়া, হাট, গঞ্জ, চক, কশবা, চর, ভর, দহ, এলা, তলী ইত্যাদি রয়েছে। নামের পূর্বে বা পরে এমন পরিচয়াত্মক শব্দের আলোকে রাজবাড়ির গ্রামসমূহের উৎপত্তির ধারাবাহিকতা জানা যায়।

রাজবাড়ি জেলা প্রাচীন যশোর খুলনা সংলগ্ন হওয়ায় তা উপবঙ্গের অংশ বিশেষ। উপবঙ্গ গঙ্গার ভাটির অঞ্চলের উত্থিত দ্বীপসমূহের সমষ্টি। গঙ্গা তার বিভিন্ন শাখা উপশাখার প্রবাহিত হওয়ায় ভাটিতে উত্থিত হয় ঐ সকল দ্বীপ। দ্বীপসমূহে জনবসতি গড়ে ওঠার কারনে জনপদের সৃষ্টি হয়। রাজবাড়ি জেলা গঙ্গা মুখের অপেক্ষাকৃত কাছাকাছি থাকায় বঙ্গের দক্ষিণ অঞ্চলে থেকে জনবসতি তুলনামূলক আগে হওয়াই স্বাভাবিক। তবে জেলাটির বিশেষত্ব এমনই যে এর উত্তর দিকে পদ্মা ও দক্ষিণের গড়াই এবং মধ্য প্রবাহিত হড়াই, চন্দনাসহ আরো অনেক নদী।  প্রবহিত নদনদীর বাঁকে বাঁকে বিচ্ছিন্নভাবে দ্বীপের সৃষ্টি হতে থাকে। বর্তমান পদ্মা ও গড়াই সংলগ্ন অনেক গ্রামের আগে বা পরে পরিচয়াত্বক শব্দ চর থাকলেও প্রাচীনকালের উত্থিত চরাঞ্চল জনপদ চরের পরিচয়ে পরিচিত হত না। নদী মরে গেলে নাল, খাল, বিলে পরিণত হয়। এ কারণে অনেক গ্রামের নামের পরিচয়ে নালা, খাল, বিল, ঝিল, হাওড়, বাওর দেখা যায়। অনেক নামের পূর্বে মাছের নাম , পাখির নাম, পশুর নাম, দেখা যায়। তবে জেলার গ্রামসমূহের নামের পরিচয়াত্মক বিশেষত্ব হল অনেক বেশি গ্রামের নামের পরিচয়ে পুরের ব্যবহার। তুলনামূলক যশোর খুলনাতে খালি, কাটি, কাটা, দহ, চর, তলা, তলী, গাছ, গাছি বেশি দেখা যায়।

ইতিপূর্বে বলা হয়েছে রাজবড়ি জেলার পুর দিয়ে গ্রামের নাম বেশি। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিম্নরুপ হওয়ার বিষয় যুক্তিযুক্ত মনে করা যায়। প্রাচীন জনপদ গড়ে ওঠার বিষয়ে বলা যেতে পারে রাজবাড়ি জেলার প্রাচীন উত্থিত এবং দ্বীপসমূহ রাজবাড়ি জেলার বালিয়াকন্দি, আড়াকান্দি, নলিয়া, জামালপুর, বহরপুর, সোনাপুর, পদমদি, রামদিয়া, রাজধারপুর, বসন্দপুর সুলতানপুর, পাংশা, নারায়ণপুর অঞ্চলসমূহ।

এসব প্রাচীন জনপদের পদ্মা, হড়াই,গড়াই,চন্দনা, কুমার, কাজলী, সুতা, ফুরসুলা নদীর বাঁকে বাঁকে উত্থিত দ্বীপের ও চরের অঞ্চলে প্রাচীন বসতি গড়ে ওঠে। এ সব অঞ্চলে জনপদ গড়ে ওঠার ফলে ধীরে ধীরে প্রাচীন গ্রাম প্রাচীন ব্যবহৃত পুর, কান্দি, দি, দিয়া, দ্রাবিড় ব্যবহৃত শব্দ যোগ হয়েছে।